অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অপরাহ্ণ সুসমিতো -
উই ডু নট সে গুডবাই

কবি আসাদ চৌধুরী। ফাইল ছবি

চারতলার কাচ মোড়ানো জানালা থেকে পড়ে যাওয়া দুপুরটা দেখা যায়। কেমন এলানো দুপুর নেমে যাচ্ছে। ছোট্ট অডিটোরিয়ামটায় লোকজন চলে এসেছে।

তিনি এলেন। আমরা এগিয়ে তাকে বরণ করলাম। তার সাথে আমার গতকালও দেখা হয়েছিল একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে। গতকালের কথাটা মাথায় ভাসছে। অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ পর্যায়। খাবারদাবারও সমাপ্তির লগন ছুঁয়ে যাচ্ছে। শহর থেকে কোভিডের বাধা উঠে যাচ্ছে। কবি তখন লাঠি ব্যবহার করেন হাঁটার সময়।

এই হচ্ছে বয়স। সময়ের গ্রাস কখনো চলন ক্ষমতা হ্রাস করে, সীমিত করে। কবি মৃদু হেঁটে আমার কাছে এলেন।

: অপরাহ্ণ, তোমার কাছে একটা সিগারেট হবে?

চমকে উঠি। যতদূর জানি কবি ধূমপান করেন না। আমি খাবার রেখেই প্রায় দৌড়ে গেলাম পরিচিত এক ভদ্রলোকের কাছে। একটা সিগারেট চেয়ে এনে কবির হাতে দিলাম। তিনি বসে পড়লেন। কৌটা থেকে সুগন্ধী পান বের করলেন। আমাকে সাধলেন না।

আজ এই প্রায় বিকালেও আমার মাথায় জুয়েল আইচ-সদৃশ রহস্য কাটছে না। কাল তিনি সিগারেট নিয়ে কী করেছিলেন!

কবি ও তাঁর স্ত্রী হেঁটে মঞ্চের কাছাকাছি গেলেন। মুগ্ধ দৃষ্টিতে ব্যানারটা দেখছেন। আমরা দাঁড়ানো পাশেই। কবি সেই হাসি ঝুলিয়ে আলতো করে বললেন— সানু, দেখ ব্যানারের ছবিতে আমাকে সত্যি কবির মতো লাগছে।

সানু মানে সাহানা চৌধুরী কোনো জবাব দিলেন না। আমরা হেসে দিলাম। বুঝতে পেরেছি যে অনুষ্ঠানের ব্যানার তিনি পছন্দ করেছেন।

আরও একবার কবির সাথে রাকীব মনিকার বাড়িতে দেখা। ওদের বাসার সামনে গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে ঝাঁকড়া চুলের অদম্য এক পুরুষ আমাকে জাপটে ধরলেন।

: দোস্ত, আইয়া পড়সো?

এর আগে আমাদের কখনো দেখা হয়নি, কথা হয়নি। কী করে যে আমাকে ও চিনে ফেলল এবং প্রথম সংলাপ ‘দোস্ত’ দিয়ে শুরু।

: আমি কালাচান।

রাকীব মনিকাদের বাসার পেছনে বয়ে যাওয়া নদী। দূর দূরান্ত থেকে অনেক লেখক-কবি বন্ধু এসেছেন। কবি নদীর পাশে একটা নাম না জানা গাছের নিচে একটা আরাম চেয়ারায় বসা। আমরা পরস্পর সম্ভাষণ বিনিময় করলাম। সাহিত্য আড্ডা শেষ হলো। আমি কবিকে সেই বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্মৃতির ‘প্রচ্ছদ’ অনুষ্ঠানের কথা মনে করিয়ে দিলাম। তিনি কথার সাগরে ডুবলেন।

একজন মানুষ এত সুন্দর করে কথা বলতে পারেন, বাংলা ভাষার সংলাপে তিনি ইংরেজি ব্যবহার করেন না। অথচ ছড়াকার মিহিরের কাছে শুনেছি একবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল ঢাকায় এলে তিনি চোস্ত ইংরেজিতে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছিলেন। এক পর্যায়ে লুৎফর রহমান রিটন এসে আড্ডায় যোগ দিলে সেই বিকেল-সন্ধ্যা হয়ে ওঠে অমৃত পাত্র। পাশের নদীতে স্রোত মৃদু বয়ে যায়, আমাদের সন্ধ্যা থমকে থাকে কবির হাত ধরে মরমিয়া।

কালাচানের সাথে আড্ডা হচ্ছে। হা হা হি হি হচ্ছে। কবি আবার আমাকে মৃদু বললেন, তোমাকে ঢাকায় দেখিনি কেন বলো তো?

এর জবাব আমি কী দিই!

কাল রাতে আমি ঘুমাচ্ছিলাম না। সামনের বইমেলার জন্য নিজের এক নভেলা তৈরি করছিলাম। আমার প্রথম নভেলা। রাত প্রায় ৪টা হবে। কী মনে করে প্রথম আলো খুললাম। প্রথমেই চোখ আটকে গেল শিরোনামে কবি আর নেই। এক ঘণ্টা আগের নিউজ।

চুপ করে রইলাম। চুপ করে থাকলাম। আমার চোখও চুপ করে রইল। সময়টাও বিষণ্ণ হুইসেল বাজিয়ে সটান থমকে রইল রাতের শেষ কড়া নাড়ায়।

তিনি নেই, তিনি নেই। কবি নেই।

নাদিম ইকবালের লেখা থেকে প্রতিদিন আপডেট পাচ্ছিলাম। খুঁটে খুঁটে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিলাম ওয়াল্ট হুইটম্যানের মতো, কোথাও ক্যাপ্টেনের সুসংবাদ আছে কিনা। কবির মঙ্গল খবর আছে কিনা।

কত কী আশঙ্কা অলীক স্বপ্ন বানিয়ে ভাবি কত কী যে হয় পৃথিবীতে। দিঘির পাশে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বকও কখনো থির পানির সৌন্দর্য দেখে থমকে যায় সুস্বাদু মাছের দিকে ঠোকর দিতে। হয়তো কবির সাথে আবার তবক দেওয়া পানের মতো দেখা হবে। আমাকে বলবেন, আরেকটা কবিতা পড়ো। ইভাও খুব ভালো পড়ে…।

আমি কবির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকব। চোখের কোণায় ঈগল পাখির পায়ের ছাপ সরিয়ে বিড়বিড় করব—

কোথায় পালাল সত্য?

দুধের বোতলে, ভাতের হাঁড়িতে! নেই তো

রেস্টুরেন্টে, হোটেলে, সেলুনে,

গ্রন্থাগারের গভীর গন্ধে,

টেলিভিশনে বা সিনেমা, বেতারে,

নৌকার খোলে, সাপের ঝাঁপিতে নেই তো।

প্রিয় আসাদ ভাই, আপনি কোথায় পালালেন? আপনি তো জানেন— উই ডু নট সে গুড বাই, আসাদ ভাই!

 

Read Previous

ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ি 

Read Next

লর্ড ডানসানি’র সাতটি উপকথা

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *