অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
মে ১৮, ২০২৪
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
মে ১৮, ২০২৪
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রুখসানা কাজল -
পান্না কায়সার : অকুতোভয় বলিষ্ঠ লড়াকু

শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের যোগ্য স্ত্রী হিসেবে পান্না কায়সার যেমন আমরণ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সমুন্নত রেখে কাজ করে গেছেন, তেমনি দেশব্যাপী নিজ অস্তিত্বের একটি পৃথক পরিচিতিও গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে থেকে মাস্টার্স পরীক্ষার পর, দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার সূত্রে শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে তার স্বল্প পরিচয় ঘটে। মাত্র সাতদিনের মধ্যে শহীদুল্লা কায়সারের মায়ের আগ্রহে তাদের বিয়ে হয়। এটি ছিল শহীদুল্লা কায়সারের দ্বিতীয় বিয়ে। তিনি প্রথম বিয়ে করেছিলেন দেশভাগের কিছুদিন পরে, পশ্চিমবঙ্গের পুনর্বাসন মন্ত্রী ডা. রাফিউদ্দিন আহমদের মেয়ে জোহরা খাতুনকে। এটি ছিল নিতান্ত স্বল্পকালের বিয়ে।

(সূত্র : বাংলাপিডিয়া। লেখক মোহাম্মাদ শামসুল আলম)।

সে ছিল এক উত্তাল সময়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে দেশ জ্বলছে গনগনে প্রতিবাদে। ছাত্রজনতার আন্দোলনকে বানচাল করতে পাকিস্তান সরকার কার্ফু ঘোষণা করে দিয়েছে। এরই মধ্যে বিয়েটা সেরে নিলেন দুই পরিবারের সদস্যরা। পান্না কায়সার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিয়ের দিন সুনসান ঢাকা শহরকে দেখে তার স্বামী শহীদুল্লা কায়সার নাকি উল্লসিত হয়ে বলে উঠেছিলেন, পাকিস্তান সরকারের দেওয়া এসব কার্ফুতে বাঙালির মনে ভয় ধরানো যাবে না।

পান্না কায়সারের স্বামী শহীদুল্লা কায়সার ১৯৪৭ সাল থেকেই ছিলেন বাম রাজনীতির সক্রিয় সমর্থক ও কর্মী। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন দুর্দান্ত কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক। তার সাহচর্যে এসে পান্না কায়সারের ভেতরের সচেতনতাবোধ, সাহিত্যপ্রীতি ও প্রগতিশীল সমাজ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার উত্তরণ ঘটে। যদিও পান্না কায়সারের জীবনী জানলে এটাও জানা যায়, তিনি তার নিজের জীবনবোধ এবং লক্ষ্য সম্পর্কে ছিলেন যথেষ্ট সচেতন। ১৯৫০ সালের ২৫ মে, কুমিল্লার বরুরা উপজেলার পায়রাগাছা গ্রামে এক শিক্ষানুরাগী সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় সাইফুন্নাহার চৌধুরী। পিতা ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও মাইজভাণ্ডারী পীরের অনুসারী। পারিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রাইমারি ও হাইস্কুল থেকে পাস করে তিনি কুমিল্লা মহিলা কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। এই সময় তার পিতা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয় পড়ে এবং পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। কলেজে পড়াকালীন অবস্থায় ঢাকার এক উচ্চবিত্ত পরিবারে সাইফুন্নাহার চৌধুরী পান্নার বিয়ে দেওয়া হয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরিবারের অবরুদ্ধ ও অনগ্রসর পরিস্থিতিতে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থাকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। প্রচণ্ড প্রতিকূল অবস্থার বিপরীতে থেকেও নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন সাইফুন্নাহার চৌধুরী পান্না। অল্পদিনেই এই বিয়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। গ্রামে ফিরে এসে তিনি আবার কুমিল্লা মহিলা কলেজে পড়শোনার জন্য চলে গিয়েছিলেন। সেই সময় একজন মুসলিম তরুণীর পক্ষে এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া সামাজিকভাবে খুব দুঃসাহসের ব্যাপার ছিল। যদিও তার ভাগ্য ভালো ছিল। তিনি নিজের পরিবারকে পাশে পেয়েছিলেন। অর্থাৎ এই ঘটনা থেকে এটা বোঝা যায়, তার নিজের পরিবারটিও ছিল মুক্তমনা, সাহসী এবং সময়ের পথে অগ্রগামী একটি সাংস্কৃতিবান পরিবার। দেশ টিভির ‘বেলা অবেলা সারাবেলা’তে উপস্থাপক আসাদুজ্জামান নূরকে দেওয়া সাক্ষাৎকার দেখে আরও জানা গেছে, পান্না কায়সার পিতার সাহচর্যে শৈশব থেকেই গান, নাচ ও কলেজজীবনে এসে লেখালেখি শুরু করেছিলেন।

কুমিল্লা মহিলা কলেজ থেকে গ্রাজ্যুয়েশন শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হন। তখন বাংলা বিভাগ ছিল মণিমুক্তার খনি। পূর্বপাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদের উৎস ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। এখানে পড়তে এসে শিক্ষক হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহীমের মতো শিক্ষকদের। যদিও রাজনীতিতে তখনও তিনি সক্রিয় ছিলেন না। মালেকা বেগমের মত কয়েকজন নারী নেত্রীকে সামান্য চিনতেন। ৬৯ সালে মাস্টার্স পরীক্ষা দেওয়ার কিছু পরে শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে যায়। ভাগ্যের কী নির্মম খেলা, মাত্র দুই বছর দশ মাসের সংসারে তিনি জীবনের স্মরণীয় দুটি ঘটনার মুখোমুখি হন। এক. বহু কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা লাভ; দুই. এই মুক্তি সংগ্রামে তার প্রাণপ্রিয় স্বামী শহীদুল্লা কায়সারকে হারিয়ে ফেলা। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর, বাঙালির ব্জয় আর পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয় সুনিশ্চিত বুঝে দেশীয় বিশ্বাসঘাতক আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার যে নীলনকশা করেছিল, তাতে শত শত বুদ্ধিজীবীসহ শহীদুল্লা কায়সারকেও জীবন বলি দিতে হয়েছিল।

আলবদর বাহিনীর হাতে স্বামীর মৃত্যুর পর, তিনি একাই পিতা এবং মায়ের দায়িত্ব পালন করে দুটি শিশুসন্তানকে বড় করে তুলেছেন। সংসার চালাতে কিছুদিন রুশ এমব্যাসিতে কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে তিনি বলেছিলেন, কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাই না বলে একটি চাকরি চাই। পরে তাজউদ্দীন আহমদের কথায় তিনি বিসিএস পরীক্ষা দেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি বেগম বদরুন্নেসা কলেজসহ ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। এরই সঙ্গে তিনি নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন নানাবিধ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। শিশুকিশোরদের সংগঠন খেলাঘরের সঙ্গে তার বন্ধন ছিল আজীবনের। তিনি প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে এই সংগঠনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি। ১৯৯৬-২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদেও কাজ করেছেন। শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে কাজ করে গেছেন। এছাড়াও তিনি তার নিজের বাড়িতে গরিব মেহনতি মানুষদের ছেলেমেয়েদের জন্য অবৈতনিক স্কুল খুলেছেন।

মানুষকে ভালোবাসার মন্ত্র তিনি তার শহীদ স্বামীর কাছ থেকে শিখেছিলেন। এই সমস্ত সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রচুর সময় দিয়েও তিনি তার সৃজনশীল মনন ও মেধার পরিচয় দিয়ে গেছেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেছেন। গল্প উপন্যাস প্রবন্ধসহ নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখাগুলো অন্যমাত্রা বহন করেছে। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ— আগে ও পরে, মুক্তি, নীলিমায় নীল, হৃদয়ে বাংলাদেশ, মানুষ, অন্য কোনখানে, তুমি কি কেবলি ছবি, রাসেলের যুদ্ধযাত্রা, দাঁড়িয়ে আছ গানের ওপারে, আমি, না পান্না না চুনি, অন্য রকম ভালোবাসা ও সুখ এবং আরও অন্যান্য। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় তার ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেব ২০২১ সালে মর্যাদাপূর্ণ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

পাকিস্তানি দুর্বৃত্ত এবং দেশীয় বিশ্বাসঘাতকরা একাত্তরে চলমান মুক্তিসংগ্রামের গতি প্রকৃতি, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘ এবং বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সহানুভূতি ও সমর্থন দেখে বুঝতে পেরেছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আর দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই স্বাধীন বাংলাদেশ যেন বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে পঙ্গু এবং শূন্য হয়ে থাকে— এই ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শহীদুল্লা কায়সারের যোগ্য স্ত্রী হিসেবে পান্না কায়সার সেই শূন্যতা পূরণ করার প্রচেষ্টা নিয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য তিনি স্বদেশপ্রেম ও দেশসেবার এক অনন্য কাজ করে গেছেন।

পান্না কায়সারের মানসিক দৃঢ়তা ছিল অতুলনীয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, স্বামীর মৃতদেহ খুঁজতে তিনি রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে নেমে পড়েছিলেন। অনেকগুলো অর্ধগলিত লাশ উল্টেপাল্টে খুঁজে দেখেছেন। মাত্র বাইশ বছরের সদ্য বিধবা নারীটি বুঝতে পেরেছিলেন তার জীবনে আরেকটি লড়াই শুরু হয়ে গেছে। সন্তানদের উপযুক্ত লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করে তুলতে হবে। তাই ব্যক্তিগত শোককে সামলে তিনি জীবন সংগ্রামে নেমে পড়েছিলেন। ‘বেলা অবেলা সারাবেলা’য় তিনি বলেছিলেন, একমাত্র শৈশবে বাবা মায়ের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো আর স্বামীর সঙ্গে কাটানো দুই বছর দশ মাসের দিনগুলো ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের সময়। পরবর্তী জীবনে এই লড়াকু শহীদজায়া বাংলাদেশের একজন অমিত শক্তিময়ী নারীতে পরিণত হয়েছিলেন। ছিলেন অনেকের আশ্রয়। রাজনীতিতে তিনি কখনো সেভাবে সক্রিয় ছিলেন না। ব্রত নিয়েছিলেন সেবার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাই করে গেছেন। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম একজন নেতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত কমিশনের একজন মুখ্য সাক্ষী। বাংলাদেশে অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে দেশের সাংস্কৃতিক জগৎকে মুক্ত রাখার লড়াইয়ের একজন অকুতোভয় বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।

এই বরেণ্য লেখক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক পান্না কায়সার মারা গেছেন গত ৪ আগস্ট শুক্রবার, ২০২৩, সকাল ১০টায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। বড় কোনো রোগভোগ না করে তিনি অপার শান্তিতে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন। চুয়াত্তর বছর বয়সে এই কর্মব্যস্ত মানুষটি একজন সার্থক নাগরিক এবং যোগ্য মা হিসেবে জীবনের সীমারেখা এঁকে আশ্রয় নিয়েছেন পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে। মৃত্যুকালে দুটি কীর্তিমান সন্তান, কন্যা অভিনেত্রী শমী কায়সার ও ব্যাংকার পুত্র অমিতাভ কায়সার ছাড়াও প্রিয় খেলাঘর এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে দেশি-বিদেশি সর্বস্তরের মানুষ শোক জানিয়েছে, তার অক্লান্ত কর্মময় পরিশ্রমের প্রশংসা করেছে।

 

Read Previous

ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ি 

Read Next

লর্ড ডানসানি’র সাতটি উপকথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *