অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দেবেশ চন্দ্র সান্যাল -
আমার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

picture.jpg

picture.jpg

আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমার নাম দেবেশ চন্দ্র সান্যাল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন পর্যন্ত আমাদের দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। দেশের ক্রান্তিকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের আহ্বানের কথা শুনে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে গেরিলা/ সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশে যাত্রা করার দিনটি ছিল ২৩ জুলাই ১৯৭১ (৬ শ্রাবণ ১৩৭৮), শুক্রবার।

রাত ৯টায় আমি শাহজাদপুরের তদানীন্তন এমপিএ আব্দুর রহমান স্যারের সাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য ভারতের উদ্দেশে রওনা হই। আমরা এক সাথে ২২ জন রওনা হলাম। পাকিস্তানি হানাদারেরা ২৫ মার্চ ’৭১ রাত সাড়ে ১১টার পর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিকল্পনা করে জঘন্যতম জ্বালাও-পোড়াও ও হত্যাসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী কাজ শুরু করেছে। এই ‘অপারেশন সার্চলাইট’টি ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অনুমোদন ও আদেশক্রমে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং মেজর রাও ফারমান আলীর নেতৃত্বে।

২৬ মার্চ ’৭১ সকাল ১১টার দিকে তৎকালীন এসডিও এ. কে. শামসুদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ওয়ারলেস মেসেজটি সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের কাছে দিয়ে ছিলেন। তখন সারাদেশের অধিকাংশ স্থান পাকিস্তানি হানাদারদের দখলে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। টিক্কা খানের প্রলোভনে ৭০-এর নির্বাচনে পরাজিত আমাদের দেশের জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামি অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তাদের সহযোগী হয়েছে। এ দেশীয় দোসরদের নেতৃত্বে সারা দেশে পাকিস্তানি সৈন্যদের সহযোগিতা করার জন্য পিস কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও অন্যান্য বাহিনী গড়ে উঠেছে। সারাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা জ্বালাও-পোড়াও, লুটতরাজ, হত্যা, গণহত্যা নারী নির্যাতন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী কাজ করে চলেছে। পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রধান টার্গেট ছিল এদেশের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা।

২৫ এপ্রিল ’৭১ সকালে আমাদের ইপিআরসহ অন্যান্য প্রতিরোধকারীরা বাঘাবাড়ি উত্তর পাড় থেকে অবস্থান ছেড়ে দিলেন। পাকিস্তানি হানাদারেরা বাঘাবাড়ি বড়াল নদী পার হয়ে কামান দাগাতে দাগাতে ও রাস্তার দু’পাশের বাড়িঘর পোড়াতে পোড়াতে ভয়াবহ ত্রাস সৃষ্টি করে চান্দাই কোনা পর্যন্ত যায়। এই দিন উল্লাপাড়া উপজেলার চরিয়া নামক গ্রামে গণহত্যা করে। এই গণহত্যায় চরিয়া ও আশপাশের গ্রামের ১২৯ জনের অধিক নারী-পুরুষকে ধরে এনে নির্যাতন করে এবং নির্মমভাবে হত্যা করে। ঐদিন রাতে এসে পাকিস্তানি সৈন্যরা উল্লাপাড়া সদরে ক্যাম্প করে অবস্থান করে। ২৬ এপ্রিল ’৭১ সকালে পাকিস্তানি সৈন্যরা শাহজাদপুরে আসে। শাহজাদপুর ঢুকেই স্থানীয় খারাপ যুবকদের দিয়ে হিন্দুদের দোকানপাট ও বাড়িঘর লুট করায়। গান পাউডার দিয়ে ৪-৫ টি দোকান ছাড়া দ্বারিয়াপুর, মনিরামপুর, চালাশাহজাদপুর, সাহাপাড়াসহ বিভিন্ন পাড়ার দোকান ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়।

পাকিস্তানি সৈন্য ও স্থানীয় দোসররা ৮ মে ’৭১ সাঁথিয়া উপজেলার করঞ্জা গণহত্যা করে। এই গণহত্যায় অন্যান্যের সাথে আমাদের এক আত্মীয়কে অমানবিক নির্যাতন করে গুলি করে হত্যা করে। ৯ মে ’৭১ শাহজাদপুর কাঠের ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে নির্যাতন করে এক হিন্দু মেয়েকে গুলি করে হত্যা করে। শাহজাদপুর থানা সদর পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্প থেকে আর্মি নিয়ে গিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা বিভিন্ন গ্রাম জ্বালাও-পোড়াও ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী কাজ শুরু করে। পোঁতাজিয়া ঘোষ পাড়া লুট করায় এবং আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।

১৪ মে ’৭১ ডেমরা বাইশ গাডি ও রূপসী গ্রামে পাকিস্তানি হানাদারেরা গণহত্যা করে। আসাদ নামক এক পাকিস্তানি দালাল বেড়া পাকিস্তানি হানাদার ক্যাম্প থেকে লঞ্চযোগে পাঁচ শতাধিক আর্মি নিয়ে এসেছিল। পাকিস্তানি হানাদারেরা মধ্য রাতের পর তিনটি গ্রাম ঘিরে নিয়ে গণহত্যা করে। এই গণহত্যা আমাদের আত্মীয় প্রবোধ কুমার মজুমদার (মোনা মজুমদার) লালু চক্রবর্তী বলারাম রায়-সহ সাত শতাধিক নারী-পুরুষকে নির্যাতন ও নির্মমভাবে হত্যা করে। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। ১ সেপ্টেম্বর ’৭১ চর কৈজুরি রাজাকার ক্যাম্পের রাজাকারেরা ব্যারিস্টার কোরবান আলীর ভাই ছগির উদ্দিনের নেতৃত্বে পুঠিয়া গ্রামের প্রখ্যাত শিক্ষক হিতেন্দ্র নাথ চন্দ-কে রাত ৩টায় বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর বিভিন্নভাবে অমানবীয় অত্যাচার করে। তারপর গুলি করে হত্যা করে রাস্তার উপর ফেলে রেখে যায়। পোরজনা রাজাকার ক্যাম্পের রাজাকার কমান্ডার আতাউর রহমান আতার নেতৃত্বে পোরজনা গ্রামের ধনাঢ্য মনীন্দ্র নাথ ঘোষকে বাড়ির থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে গুলি করে হত্যা করে। ২২ আগস্ট ’৭১ শাহজাদপুর রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। শাহজাদপুর, চরকৈজুরী, পোরজনা ও করশালিকা গ্রামে রাজাকার ক্যাম্প করা হয়েছিল। পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের এদেশীয় দোসররা বেলতৈল গ্রামে ঢুকে হিন্দুদের বাড়িঘর লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও নারী- পুরুষ কে নির্যাতন করে। বেলতৈল গ্রামের বটেশ্বর ঘোষের ছেলে সুনীল ঘোষকে ও অনিল ঘোষকে বেলতৈল বাজার থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে গুলি করে হত্যা করে। কয়েকজন রাজাকার চালা শাহজাদপুরের গিরিধারী কুণ্ডুর মেয়ে মনোরমা কুণ্ডু (মনো) কে ধরে নিয়ে জোর করে ধর্মান্তরিত করিয়ে এক রাজাকারের বাড়িতে আটকে রেখে তারা শাহজাদপুর থেকে পালিয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নির্যাতন ও ধর্ষণ করেছে। খারাপ মানুষেরা দেশের দুর্দিনে ব্যক্তিগত শত্রুতার সুযোগ নেয়। ভৈরবপাড়ার নারায়ণ চন্দ্র সরকারকে হত্যা করার জন্য তার শত্রুরা কিছু অস্ত্রধারী দুষ্কৃতকারীকে ঠিক করেছিল। নভেম্বর ’৭১ মাসের মাঝামাঝি সময়ে রতনকান্দি হাটের দিনে শুক্রবার বেলা ৪টার দিকে হাটভরা লোকের মধ্যে দুষ্কৃতকারী অস্ত্রধারীরা নারায়ণ চন্দ্র সরকারকে ধরল। নারায়ণ চন্দ্র সরকার ইলিশ মাছ কিনেছিলেন। দুষ্কৃতকারীরা চোখ বেঁধে নারায়ণ চন্দ্র সরকারকে রাইফেল দিয়ে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের গ্রামের কিছু হিন্দু মুসলমান তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে করতে দুষ্কৃতকারীদের পিছু পিছু গেলেন। জিগারবাড়িয়া গ্রামের কাছে গিয়ে অস্ত্রধারীরা অনুরোধকারীদের দিকে অস্ত্র তাক করল এবং পিছু হটতে বলল। নিরুপায় হয়ে এলাকাবাসী ফিরে এলেন। দুষ্কৃতকারীরা নারায়ণ চন্দ্র সরকারকে নির্যাতন করে গুলি হত্যা করে লাশ দরগার চরে ফেলে রেখে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর বিধবা মা, স্ত্রী ও সন্তানদের আহাজারিতে এলাকায় শোকের ছায়া পড়ল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর বিধবা মা, স্ত্রী ও অন্যরা আহজারি করে কাঁদতে কাঁদতে ভারতে চলে গিয়েছেন। পাকিস্তানি হানাদারেরা এদেশের হিন্দুদের খুঁজে বের করার জন্য মানুষকে জিজ্ঞেস করত— মালাউন কাহা হ্যায়! পুরুষ কাউকে ধরলে বলত, তুম মুসলিম হ্যায়? কলেমা বাতাও।

পুরুষদের উলঙ্গ করে হিন্দু মুসলমান পরীক্ষা করত। পাকিস্তানি সৈন্যদের সহযোগিতা করছে এদেশের বিভিন্ন স্বাধীনতাবিরোধীরা। আমি মুক্তিযুদ্ধে গেলে নিশ্চিত মারা যাব। এই ভেবে বাবা-মা কিছুতেই মুক্তিযুদ্ধে যেতে সম্মতি দিতেন না। তাই বাবা-মা ও পরিবারের অন্য কাউকে না জানিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হলাম। রওনা হওয়ার আগে মাকে একটা চিরকুট লিখলাম— ‘মা, প্রণাম নিও, বাবাকে আমার প্রণাম দিও। বড় দাদা, মেজদাদা, ও বৌদিকে প্রণাম দিও। ছোট ভাই বোনকে স্নেহাশিষ দিও। আমি মুক্তিযুদ্ধে গেলাম। তোমাদেরকে বলে গেলে যেতে দিতে না জন্য না বলে চলে গেলাম। অপরাধ ক্ষমা করিও। আশীর্বাদ করিও। আমি যেন বিজয়ী হয়ে তোমাদের কাছে ফিরে আসতে পারি।

ইতি— তোমার ছেলে দেবেশ।’

যাওয়ার সময়ে বাড়ির কাউকে জানিয়ে যাইনি। আমরা সুজানগর সাত বাড়িয়া হয়ে পদ্মা নদী পার হয়ে কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার চিলমারি ইউনিয়নের খারিজাথাক গ্রাম দিয়ে বাংলাদেশের বর্ডার অতিক্রম করলাম। আমরা ভারতের পশ্চিম বাংলার জলঙ্গী বর্ডার দিয়ে ভারতে ঢুকলাম। এমপিএ স্যার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি অস্থায়ী প্রবাসী সরকারের উদ্দেশে কলিকাতা চলে গেলেন। আমরা রাত ৯টার দিকে কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছালাম। তাঁরা আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। পরদিন সকালে আমাদের সবাইকে ফলোইং করালেন। বয়সের স্বল্পতার কারণে ট্রেনিং কর্তৃপক্ষ আমাকে ভর্তি করতে চাইলেন না। নিরুপায় হয়ে আমি আমার ওল্ড মালদহের পিশে মহাশয় বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। তখন ভারতীয়রা বাংলাদেশের লোকদের ‘জয় বাংলার লোক’ বলত। ভারতের ট্রেন ও বাসে বাংলাদেশের লোকের কোনো ভাড়া লাগত না। বাস ও ট্রেনে ভাড়া চাইতে এলে ‘জয় বাংলা’ বললেই বুঝতে পারতেন আমরা বাংলাদেশের শরণার্থী।

কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে একটি বাসে কাছাকাছির একটি রেলস্টেশনে গেলাম। তারপর ট্রেন ধরলাম। বারসই রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে ট্রেন বদলাতে হলো। আমি স্টেশনে বসে আসি। মোবাইল কোর্টের লোক আমাকে ধরে নিয়ে গেল। একটি রুমে বসাল। যাদের ট্রেনের টিকেট নাই তাদের ম্যাজিস্ট্রেট এক এক করে ডেকে ডেকে জরিমানা করলেন। পর্যাক্রমে আমার পালা এল। আমাকে নাম জিজ্ঞাসা করায় আমি বললাম, ‘জয় বাংলা’। ওনারা বুঝতে পারলেন আমি বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি। আমাকে জরিমানা না করে ছেড়ে দিলেন। পরবর্তী ট্রেনে উঠে ওল্ড মালদহ স্টেশনে নেমে পিসে মহাশয়ের বাড়িতে গেলাম। কয়েক দিন ওল্ড মালদহ, গাজল, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়িতে আত্মীয়বাড়ি ঘুরলাম।

আমার পিসে মহাশয়ের ভগ্নিপতি ছিলেন একটি শরণার্থী ক্যাম্পের ইনচার্জ। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন— ‘তুমি ছোট মানুষ, তোমার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজন নাই। আমি তোমাকে শরণার্থী ক্যাম্পে ভর্তি করে নিচ্ছি। তুমি রেশন, লাড়কি ও অন্য সকল সুবিধা পাবে।’

আমি বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে এসে শরণার্থী শিবিরে বসে বসে খাব এটাতে সম্মত হতে পারলাম না। আবার ফিরে এলাম কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে। আমাদের শাহজাদপুরের রবীন্দ্রনাথ বাগচী ও রতন কুমার দাসসহ কয়েকজনকে পেলাম। তারা আমাকে পরামর্শ দিলেন— তুমি মালঞ্চ (কুরমাইল) ক্যাম্পের ইনচার্জ ৭ নম্বর সেক্টরের উপদেষ্টা বেড়া সাঁথিয়ার এমএনএ অধ্যাপক আবু সাইয়িদ স্যারের কাছে যাও। আমি তাদের পরামর্শে অধ্যাপক আবু সাইয়িদ স্যারের কাছে গেলাম। আমার পরিচয় দিয়ে আমাকে মুক্তিযুদ্ধে ভর্তি করার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করলাম। তিনি একজন লোকের সাথে আমাকে কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে ভর্তি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠালেন। কামাপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পের ভর্তি কর্তৃপক্ষকে আমাকে ভর্তি করার জন্য বিশেষ অনুরোধ করলাম। কর্তৃপক্ষ আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। আমার দেশপ্রেম, সাহসী মনোভাব ও অন্যান্য শুনে ভর্তি করলেন। প্রাথমিক ট্রেনিং ক্যাম্পে আমাদের ফলোইং করিয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ানো, পিটি প্যারেড করানো হতো। কদিন কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে থাকার পর আমাকে, রবীন্দ্র নাথ বাগচী, রতন কুমার দাস ও নজরুল ইসলামকে ট্রান্সফার করল মালঞ্চ ট্রানজিট ক্যাম্পে, তারপর মালঞ্চ থেকে কুড়মাইল ট্রানজিট ক্যাম্পে। কুড়মাইল থেকে আমাদের আনা হলো পতিরাম ক্যাম্পে। পতিরাম ক্যাম্প থেকে একযোগে ভারতীয় আর্মি লরিতে ২০/২২ জনকে নিয়ে আসা হলো দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার পানিঘাটা নামক ইন্ডিয়ান আর্মি ট্রেনিং ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ শুরুর দিনে কো-অর্ডিনেটর প্রথমে ফলইন করিয়ে প্রশিক্ষণের বিভিন্ন নিয়মকানুন বিষয়ে বললেন। তারপর তিনি বললেন দুপুর ১২-০০টায় প্রশিক্ষণ প্রধান ডিএস ভিলন স্যার আসবেন। ঠিক দুপুর ১২টায় প্রশিক্ষণ প্রধান শিখ সেনা ডিএস ভিলন এলেন। তিনি আমাদের সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন— …আপনাদেরকে স্যালুট। আপনারা বীর, আপনারা আপনাদের দেশ-মাতাকে হানাদারমুক্ত করতে যুদ্ধ করতে এসেছেন। আমরা আপনাদের জন্য তেমন কিছু করতে পারব না। আমরা মানবিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেব। আপনাদের দেশকে আপনাদেরই স্বাধীন করতে হবে। আপনাদের জন্মদাতা পিতা-মাতাকে স্যালুট জানাচ্ছি। তারা দেশের জন্য তাদের সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছেন…।

পানিঘাটা ট্রেনিং ক্যাম্পটি ছিল ভারতের শিলিগুড়ি মহকুমার ৭ নম্বর সেক্টর অধীন। পানিঘাটা স্থানটি ছিল চারিদিকে পাহাড়ের মধ্যে। কার্শিয়ান পাহাড় হইতে নেমে আসা একটি ক্যানেলের দক্ষিণ পার্শে¦র বনাঞ্চল। চাঁনমারি স্থানের বামপাশে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে ঝরনার জল। ক্যাম্পে নিয়ে আমাদের তাঁবুর মধ্যে থাকার সিট করে দিল। আমাদের প্রত্যেক কে একটা মগ, একটা প্লেট, দুই টা প্যান্ট, ২টা গেঞ্জি, একটি মশারি, ও বিছানাপত্র দেওয়া হলো। ট্রেনিং শুরু হলো। আমাদের ২১ দিনের ট্রেনিং হলো। আমাদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এলএমজি, এসএলআর, স্টেনগান, টুইঞ্চ মর্টার, হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ, এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার, ফাস্টএইডসহ অন্যান্য ট্রেনিং দিল। যুদ্ধে সহযোদ্ধা আহত হলে বা শহীদ হলে করণীয় সম্পর্কে এবং ফাস্টএইড সম্পর্কে ধারণা দিল। ভারতীয় কয়েক জন হিন্দু বিহারী ও শিখ সৈন্য প্রশিক্ষণ দিলেন আমাদের কোম্পানির। আমাদের কোম্পানির নাম ছিল ডেল্টা কোম্পানি। প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন শিখ সেনা ডিএস ভিলন। এফএফধারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিদায়ের পূর্বে শ্লেটে চক দিয়ে এফএফ নম্বর লিখে বুকের উপর ধরিয়ে ছবি তোলা হতো। কিন্তু আমাদের কোম্পানির প্রশিক্ষণার্থীদের বিদায়ের পূর্বে কদিন ধরে বৃষ্টি হলো। আবহাওয়াজনিত কারণে আমাদের ছবি তুলতে পারলেন না। বিদায়ের সময়ে জানতে পারলাম আমার এফএফ নম্বর ৪৭৪২। ট্রেনিং শেষে ইন্ডিয়ান আর্মি ট্রাক যোগে আমাকে, রবীন্দ্রনাথ বাগচী, নজরুল ইসলাম ও রতন কুমার দাস ও অন্যান্য প্রায় ৫০ জনকে নিয়ে আসা হলো ৭ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার তরঙ্গপুরে। এটা ছিল পশ্চিমবঙ্গের কালিয়াগঞ্জ থানার তরঙ্গপুর নামক স্থানে অবস্থিত। তরঙ্গপুর এনে সিরাজগঞ্জ জেলার ১০ জনের সমন্বয়ে একটি গেরিলা গ্রুপ করা হলো। আমাদের গ্রুপের গ্রুপ লিডার নিযুক্ত হলেন বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রামের এমএ মান্নান। ডেপুটি লিডার নিযুক্ত হলেন শাহজাদপুর উপজেলার জামিরতা গ্রামের অধিবাসী বাবু রবীন্দ্রনাথ বাগচী। আমাদের তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র, গোলা-বারুদ, রেশনিং ও পকেট মানি দেওয়া হলো। আমার নামে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এক ম্যাগজিন গুলি, একটি হেলমেট ইস্যু করা হলো। অন্যান্য গোলা বারুদ, মাইন, গ্রেনেড ও এক্সপ্লোসিভ কমান্ডার স্যারের কাছে দিলেন। মৃত্যু যে হবে না এমন কোনো গ্যারান্টি ছিল না। তাই আমি মৃত্যুর প্রস্তুতি ও যুদ্ধজয়ের জন্য তরঙ্গপুর বাজার থেকে একখানা শ্রী শ্রী চন্ডী গ্রন্থ, একটি মানচিত্রখচিত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও একটি ৪ ব্যান্ডের রেডিও কিনলাম। তরঙ্গপুর থেকে কালিয়াগঞ্জ পর্যন্ত বাসে এসে ট্রেনে উঠলাম। শিলিগুড়ি রেলওয়ে জংশন স্টেশনে এসে আমাদের ট্রেন বদলাতে হলো। শিলিগুড়ি স্টেশনের প্লাটফরমে গ্রুপের সকলের সাথে বসে আছি। দেখলাম আমাদের প্লাটফরমের সামনের লাইনে একটা ফাঁকা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। আমি টয়লেট করার জন্য ট্রেনের একটি বাথরুমে ঢুকলাম। এমন অবস্থায় ট্রেনটি স্টার্ট করল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাড়াহুড়া করে বাথরুম থেকে বের হয়ে লাফ দিয়ে প্লাটফরমের উপর নেমে পড়লাম। আমার হাঁটুতে ব্যথা লাগল। আজ ভাবি— তখন পকেটে কোনো আইডি কার্ড ছিল না। আমার অপরিচিত জায়গা। ওখানকার একজন মানুষও আমাকে চেনে না। আমি মারা গেলে আমার সাথীরাও আমাকে খুঁজে পেতেন না। আমার বাবা-মা সারা জীবন আমার পথপানে চেয়ে থাকবেন। আমার লাশটাও পেতেন না। পরে ট্রেন বদলিয়ে আসামগামী ট্রেনে উঠলাম। আসামগামী ট্রেনে ধুপরী নামক স্টেশনে আমরা নামলাম। তারপর বাসযোগে মানিকার চরে এলাম। রাত হয়ে যাওয়ার কারণে রাতে মানিকার চর একটা ভাড়া বোর্ডিংয়ে থাকলাম। পরদিন সকালে মানিকার চর থেকে নদী পার হয়ে এলাম তদানীন্তন রংপুর জেলার কুড়িগ্রাম মহকুমার (বর্তমানে জেলা) মুক্তাঞ্চলে স্থাপিত রৌমারী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। রৌমারী ক্যাম্পে আমরা স্নান খাওয়াদাওয়া করলাম। আমাদের কমান্ডার স্যার সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তাঞ্চল যমুনার চরে পৌঁছানোর জন্য একটি বড় ছইওয়ালা নৌকা ভাড়া করলেন। রৌমারী ক্যাম্প থেকে রাতের খাবার খেয়ে রাত ৯টার দিকে আমাদের নৌকা ছাড়ল। এটা ছিল ৬ সেপ্টেম্বর ’৭১। নৌকা বাহাদুরাবাদ ঘাট, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দিয়ে আসতে হয়। আমরা জানতে পেরেছিলাম। বাহাদুরাবাদ ঘাট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ঐ ক্যাম্পের পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারেরা ভয়ানক। তারা স্পিড বোট নিয়ে রাতে নদী টইল দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা পেলে ধরে নিয়ে যায়। ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক অত্যাচার করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। আমাদের কমান্ডার জনাব এমএ মান্নান স্যার নির্দেশ দিলেন— আপনারা সবাই নৌকার ডওরার মধ্যে পজিশন অবস্থায় থাকুন। পাকিস্তানি হানাদারেরা ধরতে এলে আমরা ধরা দেব না। যুদ্ধ করব। যুদ্ধ করে শহীদ হব কিন্তু ওদের হাতে ধরা দিব না।

রাত ২টার দিকে আমরা বাহাদুরাবাদ ঘাট এলাকা অতিক্রম করতে থাকলাম। ওদের সার্চ লাইটের আলো এসে বারবার আমাদের নৌকাতে পড়ছিল। ভগবানের কৃপায় ওরা আর স্পিড বোট নিয়ে ধরতে এল না। আমরা বাহাদুরাবাদ ঘাট এলাকা অতিক্রম করলাম। আমাদের সাথে চিড়া-গুড় ছিল। ভোরে মাঝিরা এক কাইসা খেতের মধ্যে নৌকা ঢুকিয়ে দিল। আমরা নিচে নেমে খেতের মধ্যে প্রাকৃতিক ক্রিয়া সম্পন্ন করলাম। সাথে থাকা চিড়া ও গুড় দিয়ে সকালের জলখাবার খেলাম। তার পর নৌকা আবার ছাড়ল। তখন কাজিপুর থানার অধিকাংশ এলাকাসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা পাকিস্তানি হানাদারদের দখলে। কাজিপুর থানার সম্মুখ দিয়ে আমাদের নৌকা আসবে। দেখে-শুনে খোঁজ নিয়ে থামিয়ে থামিয়ে ৪ দিন ভরে নৌকা এসে পৌঁছাল সিরাজগঞ্জ হানাদার মুক্তাঞ্চল যমুনার চরে। এটা ছিল টাঙ্গাইল জেলার সিংগুলির চড়ের নিকটবর্তী। নৌকাতেই রান্নার ব্যবস্থা ছিল। মাঝিরা কোনো রকমে ডাল-ভাত অথবা খিচুড়ি রান্না করে আমাদের খাওয়াত। এই ভাবে খেয়ে না খেয়ে চলছিলাম। পরদিন রাতে যমুনা নদীর এপাড়ে চলে এলাম। চলে এলাম বেলকুচি-কামারখন্দ নির্বাচনী এলাকার এমএনএ আব্দুল মোমিন তালুকদারের গ্রামের বাড়িতে। তিনি তখন বাড়িতে ছিলেন না। তার ভাই রশিদ তালুকদার আমাদের থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতা করলেন। অক্টোবর ’৭১ মাসের মাঝামাঝির আগ পর্যন্ত আমাদের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা কম থাকায় সম্মুখযুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কমান্ডার স্যার নেননি।

আমরা পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য ও তাদের দোসরদের আতঙ্কে রাখার জন্য গেরিলা কার্যক্রম ‘হিট অ্যান্ড রান’ চালাতাম। পাকিস্তানি সৈন্য বা রাজাকার ক্যাম্পের নিকটবর্তী গিয়ে ২/৪ টা থ্রি নট থ্রি রাইফেলের আকাশমুখী ফাঁকা গুলি ছুড়ে চলে আসতাম। পাকিস্তানি দালাল, পিস কমিটির লোক ও অন্যরা আমাদের অস্তিত্বের কথা জানতে পারত। আমরা দিনের বেলা স্কুলে বা কারও বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকতাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন দেশের অভ্যন্তরে ছিল দুইটি পক্ষ। একটি স্বাধীনতার পক্ষে। অন্যটি স্বাধীনতার বিপক্ষে। স্বাধীনতার বিপক্ষের পিস কমিটির সদস্য, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও অন্যরা। স্বাধীনতাবিরোধীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের তথ্য দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে এসে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, চাঁদাবাজি করত। বাড়ির মালিককে ধরে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করত। হিন্দু ও আওয়ামী লীগ নেতারা ছিল ওদের বড় টার্গেট। হিন্দু নারী-পুরুষকে ধরে নিয়ে যেত। নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা করত। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারাও পাকিস্তানি হানাদার পক্ষ ত্যাগ ও তাদের সহযোগিতা করার জন্য বিশেষভাবে অত্যাচারী পাকিস্তানি দালাল ও রাজাকারদের হত্যা করত। গণহত্যা, ধর্ষণ ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী কাজে সরাসরি জড়িত কোনো পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যকে ধরতে পারলে ফায়ারিং স্কোয়াডে বিচার করার পরিকল্পনা ছিল। যে কারণে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপে সাহসী একজনকে জল্লাদ হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। আমাদের গ্রুপের জল্লাদ হিসেবে মনোনীত ছিলেন দৌলতপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক। আমরা এমন কোনো পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য ধরতে পারি নাই। আমরা কখনো কাউকে মারি নাই। আমাদের গ্রুপের নীতি ছিল ‘আমরা আমাদের দেশি কোনো ভাইকে হত্যা করব না। বুঝিয়ে তাদেরকে স্বাধীনতার পক্ষে আনব।’ যে কারণে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ কোনো স্বাধীনতাবিরোধীকে ধরি নাই, অত্যাচার বা হত্যা করি নাই। আমরা নিজেরা বা তাদের আত্মীয়ের মাধ্যমে বুঝিয়ে বিভিন্নভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বাধীনতার পক্ষে আনার চেষ্টা করতাম। আমরা প্রতিটি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকতাম। যে কোনো সময় পাকিস্তানি হানাদাররা আমাদের আক্রমণ করতে পারে। আমাদের থাকা খাবার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। আমরা আজ এ শেল্টারে কাল সে শেল্টারে থাকতাম। কোনো শেল্টারেই একাধিক দিন থাকতাম না। কোনো কোনো দিন শেল্টারের অভাবে সারারাত চিড়া গুড় খেয়ে রাত জেগে স্কুলের বেঞ্চে শুয়ে থাকতে হতো। কী যে অমানবিক কষ্ট। আমাদের শেল্টার পালাক্রমে আমরা দু’জন করে করে পাহারা দিতাম। প্রতি রাতে কমান্ডার স্যার আমাদের পাশ ওয়ার্ড দিতেন। আমরা রাতে বিভিন্ন রাজাকারের বাড়িতে গিয়ে তাদের বোঝাতাম। সকালে আমরা অস্ত্রে ফুল থ্রু মারতাম, পরিষ্কার করতাম ও অস্ত্রে তেল দিতাম। তখন দেশের অধিকাংশ মানুষ ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। তবুও স্বাধীনতাবিরোধীদের ভয়ে অনেকে আমাদের শেল্টার বা খাবার দিতে সাহস পেতেন না। কারণ অধিকাংশ গ্রামেই ছিল পাকিস্তানি দালাল ও রাজাকার। তারা খোঁজ জানলে পার্শ্ববর্তী আর্মি বা রাজাকার ক্যাম্পে সংবাদ দিয়ে তাদের নিয়ে এসে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেবে, বাড়ির মালিককে ধরে নিয়ে হত্যা করবে ও অত্যাচার চালাবে এই ছিল তাদের ভয়। আমাদের সাথে সব সময় চিড়া-গুড় থাকত। স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ট্রেনিং দিইয়ে আমাদের সাথে নিলাম। আমি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে আমার পিতৃদেব ও মাতৃদেবী পাগলপ্রায় হয়ে গিয়ে ছিলেন। রাজাকারদের আলটিমেটামে গণহত্যার হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য গোটা পরিবার বাড়িঘর সব ফেলে ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে ভারতের আসামের মানিকার চর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। কোথায় ও আক্রমণের পূর্বে আমরা রেকি করে দেখতাম। তারপর আক্রমণ করতাম। আমি আমার রণাঙ্গনের সাথীদের বলে রেখেছিলাম— ‘আমি রণাঙ্গনে মারা গেলে, তরঙ্গপুর বাজার থেকে কেনা জাতীয় পতাকা দিয়ে মুড়িয়ে আমার দেহ নদীতে দিয়ে দেবেন।’

আমাদের গ্রুপের গেরিলা/ সম্মুখযুদ্ধগুলো হলো—

বেলকুচি থানা আক্রমণ যুদ্ধ

বেলকুচি সিরাজগঞ্জ জেলার একটি উল্লেখযোগ্য থানা। অক্টোবর ’৭১ মাসের শেষের দিকে আমরা এই থানা আক্রমণ করেছিলাম। এই থানা আক্রমণ যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন আমাদের গ্রুপ কমান্ডার জনাব এমএ মান্নান স্যার। কমান্ডার স্যারের ও আরও ৩ জনের রেকিতে একযোগে বেলকুচি থানা ও মুসলিম লীগ নেতা আব্দুল মতিনের বাড়ি আক্রমণ করলাম। সন্ধ্যায় বানিয়া গাতি গ্রামের এক বাড়ির শেল্টারে কমান্ডার স্যার বিস্তারিত ব্রিফ করলেন। আমাদের দুই গ্রুপে ভাগ করে দিলেন। সিদ্ধান্ত হলো কমান্ডার স্যারের নেতৃত্বে বড় গ্রুপটি থানা আক্রমণ করবে। অন্য গ্রুপটি রবীন্দ্র নাথ বাগচীর নেতৃত্বে মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমণ করে মতিন সাহেবকে ধরে আনবে। আমি কমান্ডার স্যারের গ্রুপে থেকে থানা আক্রমণযুদ্ধে অংশ নিলাম। রাত ৯টায় বানিয়াগাতি থেকে যাত্রা করলাম। থানার কাছে গিয়ে দু গ্রুপ টার্গেটের উদ্দেশে ভাগ হলাম। নির্দিষ্ট সময়ে রাত ১২টায় একযোগে আক্রমণের সিদ্ধান্ত। পরিকল্পনা মোতাবেক থানার পশ্চিম পাশ দিয়ে স্ক্রলিং করে থানার সামনে যেতেই সেন্ট্রি দেখে ফেলল। হুইসেল বাজিয়ে থানার সবাইকে জানিয়ে দিয়ে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করল। আমাদের কমান্ডার স্যার কমান্ড করে ফায়ার ওপেন করলেন। সবাই একযোগে গুলি করলাম। একঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধ চলল। ভয়াবহ পরিস্থিতি। আমার মাথায় হেলমেট। দুইটি গুলি এসে হেলমেটে লাগল। আমার ডান পাশে আমার কমান্ডার। হয় বিজয় আর না হয় মৃত্যু ছাড়া কোনো পথ নাই। বৃষ্টির মতো গুলি চালিয়ে যাচ্ছি। যুদ্ধের সময়ে এক সময়ে কমান্ডার স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেবেশ, মাথা তুলো না, গুলি চালিয়ে যাও।’ আমাদের বৃষ্টির মতো গুলিতে থানার বিহারি পুলিশ ও রাজাকার থানার পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে সোহাগপুর নদীতে থাকা একটি লঞ্চে চড়ে আমাদের রেঞ্জের বাইরে যমুনার মধ্যে চলে গেল। থানার সেন্ট্রি গুলি করা বন্ধ করে দুই হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণ করল।

আমরা থানার ভিতরে ঢুকে পড়লাম। আমরা থানার মালখানা থেকে সকল গোলাবারুদ নিলাম। থানার দু’জন রাজাকারকে জ্যান্ত বেঁধে ধরে নিয়ে এলাম। রাজাকাররা যাতে আমাদের শেল্টার চিনতে না পারে সেই জন্য তাদের চোখ বেঁধে নিয়ে এলাম। ভোর হয়ে গেল। মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমণ করা দলটিও এল। মতিন সাহেব পালিয়ে গেছে। তাকে ধরা সম্ভব হয় নাই। থানার আশপাশের লোকজন দোকান ও বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিল। বিজয়ী হয়ে চলে এলাম। পরদিন সিরাজগঞ্জ থেকে শতাধিক পাকি হানাদার ও রাজাকার এসে থানার আশে পাশে আগুন দিয়েছিল এবং মানুষদের নির্যাতন করেছিল। বেলকুচি থানা আক্রমণ যুদ্ধে আমরা ২ জন রাজাকারকে ধরে এনেছিলাম। কিছু সময় চোখ বেঁধে আমাদের শেল্টারের ও আলাদা রুমে রেখে ছিলাম। তাদের চোখ বেঁধে পাশের রুমে রাখা হয়েছিল। আমি কমান্ডার স্যারের অনুমতি নিয়ে ওদের সাথে কথাবার্তা বললাম। তাদেরকে রাজাকার হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম ও শুনলাম। ওদের সাথে জিজ্ঞাসা বাদে মনে হলো ওরা সহজ সরল ও অভাবি মানুষ। ওদের বাড়িতে স্ত্রী ও পুত্র কন্যা আছে। পিস কমিটির লোকদের কথায় বিশ্বাস করে ওরা রাজাকার হয়েছে। ওরা মনে করে ছিল এটা একটা চাকরি। উপার্জন করে সংসার পরিচালনার জন্য ওরা রাজাকার হয়েছে।

তারা বলল, আমরা কাউকে কোনো অত্যাচার করি নাই। কোনো বাড়িঘর লুটতরাজ করি নাই। পাকিস্তানি হানাদের নিয়ে এসে কোনো গণহত্যা করি নাই। কোনো বাড়িতে আগুন দিই নাই…। তাদের কথায় আমার মায়া হলো। আমি তাদের চোখ বাঁধা খুলে দিলাম। তাদেরকে বিভিন্নভাবে বোঝালাম। রাত্রিতে শেল্টার পরিবর্তনের সময় কমান্ডার স্যারকে অনুরোধ করে রাজাকার দুইজনকে ছেড়ে দিয়েছিলাম।

কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে স্টেশনে পাকিস্তানি সৈন্য ও ব্রিজ পাহারারত রাজাকারদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করার জন্য অ্যাম্বুশ

কালিয়া হরিপুর সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ থানার একটি রেলওয়ে স্টেশন। এই অ্যাম্বুশের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার এমএ মান্নান স্যার। ৪ নভেম্বর ’৭১ আমাদের গ্রুপের ঝাঐল গ্রামের সিরাজগঞ্জের এমএনএ মোতাহার হোসেন তালুকদারের ভায়রা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হামিদ তালুকদারের রেকির ভিত্তিতে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে স্টেশনে পাকিস্তানি সৈন্য ও ব্রিজ পাহারারত রাজাকারদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করা জন্য অ্যাম্বুশ করেছিলাম। ঐ অ্যাম্বুশে যুদ্ধ হয় নাই। কমান্ডার স্যার ক্রলিং করে রেল লাইনে বৈদ্যুতিক মাইন বসিয়ে এসেছিলেন। তথ্য ছিল ঈশ্বরদী থেকে পাকি হানাদার নিয়ে একটি ট্রেন সিরাজগঞ্জ যাবে। কমান্ডার স্যার ট্রেনটি উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন। আমরা ধানখেতের মধ্যে পজিশন অবস্থায় থাকলাম। কামান্ডার স্যারের হাতে মাইনের তার ও ব্যাটারি। টর্চ লাইট ও হ্যারিকেন হাতে পাকি মিলিশিয়া ও রাজাকারেরা স্টেশনে টহল দিচ্ছিল। ওদের পায়ে লেগে হঠাৎ আমাদের মাইনের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। মাইনটি ওদের নজরে পড়ল। হুইসেল দিয়ে রাজাকারদের লাইং পজিশনে রেডি থাকতে বলল। আমাদের দিকে টর্চলাইট মেরে মেরে উর্দুতে বকাবকি করতে থাকল। ইতোমধ্যে ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জগামী পাকি হানাদারবাহী ট্রেন এল। পাকি হানাদারেরা সিগন্যাল দিল। স্টেশনে ট্রেনটি থামিয়ে দিল। ট্রেনের পাকি হানাদারেরা অস্ত্র তাক করা অবস্থায় নেমে আমাদের খুঁজতে থাকল। মাইনের বৈদ্যুতিক তার বিচ্ছিন্ন হয়ে পরায়। আমাদের মাইনটি ব্রাস্ট করা সম্ভব হলো না। পাকি হানাদারদের সংখ্যাধিক্যতায় ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কমান্ডার স্যার উইথড্র হওয়ার কমান্ড করলেন। আমরা উইথড্র হয়ে কমান্ডার স্যারের বাড়ি বেলকুচি থানার তামাই গ্রামে এলাম। পরের দিন সিরাজগঞ্জ থেকে পাকি হানাদার ও রাজাকারেরা এসে কালিয়া হরিপুর ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের কয়েকটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। কিছু লোকের উপর নির্যাতন চালিয়েছিল। আমরা কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে স্টেশন অ্যাম্বুশ থেকে ফিরে এসে তামাই গ্রামে কমান্ডার স্যারের বাড়িতে একত্রিত হই। কমান্ডার স্যারের মা আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। আমরা কমান্ডার স্যারের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর সবাইকে বসিয়ে কমান্ডার স্যার ব্রিফ করলেন। স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং দেওয়া বেশ কিছু যুবককে আমাদের গ্রুপে ভর্তি করা হয়েছিল। এত বড় প্লাটুন এক শেল্টারে শেল্টার নেওয়া সমস্যা। তাই কমান্ডার স্যার ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগচীকে কমান্ডার করে আমাদের ১১ জনের আর একটি গ্রুপ করে দিলেন।

কল্যাণপুর যুদ্ধ

কল্যাণপুর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার একটি গ্রাম। ৫ নভেম্বর ’৭১ কল্যাণপুর গ্রামে একটি যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি কমান্ডার (কমান্ডার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত) বাবু রবীন্দ্রনাথ বাগচী। কমান্ডার স্যারের নির্দেশে আমরা ১১ জন রবীন্দ্রনাথ বাগচীর কমান্ড-অধীন হয়ে হেঁটে ভোরে বেলকুচি উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামে এক বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। বাড়ির মালিক আমাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। আমরা সারারাত নিদ্রাহীন থেকে ও হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সকালের খাবার খেয়ে প্রকাশ্যে পিটি, প্যারেড করলাম। অস্ত্র পরিষ্কার করলাম। অস্ত্রে ফুলতুরী মারলাম। একজন করে করে আমাদের অবস্থান পাহারা দিতে থাকলাম। অন্যদের মধ্যে কেউ কেউ ঘুম বা রেস্টে থাকলাম।

কল্যাণপুর একটি নিভৃত গ্রাম। আমাদের ধারণা ছিল এই গ্রামে পাকি হানাদার ও রাজাকার আসবে না। বেলা ১০টার দিকে সেন্ট্রিরত সহযোদ্ধা রতনকুমার দাস দৌড়ে এসে জানালেন আমাদের ধরার জন্য বেলকুচি থানা থেকে কয়েকজন পাকি হানাদার মিলে শিয়া ও রাজাকার আসছে। বওড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে কল্যাণপুরের দিকে আসছে। দুইজন পাকিস্তানি দালাল গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে নিয়ে হানাদার ও রাজাকারদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আসছে। দূর থেকে অনুমান হলো এই দলে ৫ জন মিলেশিয়া ও ৪ জন রাজাকার আছে। আমাদের কমান্ডার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা কল্যাণপুরে রাস্তার ধারে বাঁশঝাড়ের মধ্যে পজিশন নিলাম। বাঁশঝাড়ের সামনে দিয়ে চলা রাস্তা ধরে পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারেরা আসছিল। আমাদের রেঞ্জের মধ্যে আসার সাথে সাথে আমাদের কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগচী কমান্ড ও ফায়ার ওপেন করলেন। আমরা একযোগে গুলি করা শুরু করলাম। এক লাফে হানাদারেরা রাস্তার উত্তর পাশে পজিশন নিল। ওরাও আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাল। আমরাও একযোগে বৃষ্টির মতো গুলি ছাড়তে থাকলাম। গোলাগুলির শব্দ পেয়ে আশপাশে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এলেন। এক ঘণ্টার অধিক সময় সম্মুখযুদ্ধ চলল। তারপর পাকি হানাদারেরা পিছিয়ে গেল। যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা বিজয় উল্লাস করলাম। সকল স্তরের মানুষের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হলো। এক বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করলাম। তারপর হেঁটে দৌলতপুর গ্রামের সহযোদ্ধা মুক্তি শামসুল হকের বাড়িতে শেল্টার নিলাম।

১৪ নভেম্বর ’৭১ এই শেল্টারে আমার মেজো দাদা সমরেন্দ্র নাথ সান্যাল আমাদের সাথে যোগ দিলেন। কয়েক দিন দৌলতপুর, তেঞাশিয়া, খুকনী, বাজিয়ারপাড়া, দরগার চর ও অন্যান্য গ্রামে থাকতে থাকলাম।

ধীতপুর যুদ্ধ

ধীতপুর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার একটি গ্রাম। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি কমান্ডার (কমান্ডার হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত) বাবু রবীন্দ্রনাথ বাগচী। ডিসেম্বর ’৭১ মাসের প্রথম সপ্তাহের পর আমরা শেল্টার নিলাম সৈয়দপুর গ্রামের কালা চক্রবর্ত্তী ও অন্যান্যের বাড়িতে। ১৩ ডিসেম্বর ’৭১-এ সংবাদ পেলাম পাকি হানাদারেরা কৈজুরী হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। টাঙ্গাইলের যুদ্ধে পাকি হানাদারেরা পরাজিত হয়ে লঞ্চে যমুনা নদী পাড় হয়ে মালিপাড়া ক্যাম্পে এসেছে। মালিপাড়া ক্যাম্প থেকে রাস্তা চেনানোর জন্য দুই জন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়েছে। আমরা পাকি হানাদারদের আক্রমণ করার জন্য ওদের পিছু নিলাম। সংবাদ পেয়ে শাহজাদপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপগুলোও আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে এল। ওরা ক্ষুধার্ত। কৈজুরী গ্রামের একজনের মুলা খেত থেকে মুলা খাওয়ার চেষ্টা করল। ওরা হয়তো জানতো না কাঁচা মুলা খাওয়া যায় না। ওয়াপদা বাঁধ ধরে ওরা অগ্রসর হতে লাগল। আমরাও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অস্ত্র তাক করে ওদের পিছু পিছু হাঁটতে থাকলাম। ওরা ভীষণ ক্রোধী। ধীতপুর নামক স্থানে গিয়ে ওরা আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করল। আমরা জাম্প করে ওয়াপদা বাঁধের পশ্চিম দিকে পজিশন নিলাম। ওদের উপর গুলি ছুড়তে শুরু করলাম। ওরা ওয়াপদা বাঁধের পূর্ব পাশে পজিশন নিল। একঘণ্টাব্যাপী গুলি পাল্টা গুলি চলতে থাকল। গুলির শব্দে বেড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা দল আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এল। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। হানাদারেরা গুলি করা বন্ধ করল। আমরাও অন্ধকারে গুলি করা বন্ধ করলাম। সারারাত আমরা না খেয়ে পজিশন অবস্থায় ছিলাম। আমাদের গ্রুপটি ছিল বাবু রবীন্দ্রনাথ বাগচীর কমান্ডানাধীন। আমার বাম পাশের এলএমজি চালাচ্ছিলেন কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগচী স্যার। আমার ডান পাশের থ্রি নট থ্রি চালাচ্ছিলেন আমার মেজো দাদা সমরেন্দ্র নাথ সান্যাল, তাঁর ডান পাশে আমার গ্রুপের অন্যরা স্টেনগান ও থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালাচ্ছিলেন। যুদ্ধটি ছিল ভীষণ ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধ। তথাকথিত হিংস্র পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। হয় যুদ্ধে বিজয়ী হতে হবে। অন্যথায় সবার জীবন যাবে।

রাতে ধীতপুর সার গুদাম থেকে মাঝে মাঝে ২/১টা করে গুলি আসছিল। ওদের গুলির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ২/১টা করে গুলি করছিলাম। ভোরে ফর্সা হলে আমাদের কমান্ডার বরীন্দ্রনাথ বাগচী ও বেড়ার কমান্ডার জনাব এসএম আমির আলী ও অন্যরা ক্রলিং করে ধীতপুর সার গুদামে এগিয়ে গেলেন। সার গোডাউনে গিয়ে দেখা গেল দুজন রাজাকার সারারাত কভারিং ফায়ার করেছে। কমান্ড করে রাজাকার দুজনকে সারেন্ডার করালেন। রাজাকার দুজনের নাম ছিল লতিফ ও কালাম। তারা দুইজন আত্মসমর্পণ করল। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে নেওয়া হলো। তাদের কাছ থেকে জানা গেল রাত ১১টার দিকে হানাদারেরা ক্রলিং করে নিরাপদ দূরত্বে এসে হেঁটে বেড়া নদী পার হয়ে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে পালিয়েছে। পরে জানা গেল। পাকি হানাদারেরা বেড়া ঘাটে গিয়ে ভেড়াকোলা গ্রামের হলদারদের নৌকায় নদী পাড় হয়ে নগরবাড়ি ঘাট হয়ে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ধীতপুরের যুদ্ধে বেড়ার এসএম আমির আলীর গ্রুপের বৃশালিকা গ্রামের আব্দুল খালেক ও ছেচানিয়া গ্রামের আমজাদ হোসেন শহীদ হয়েছেন এবং অন্যান্য গ্রুপের ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছেন। স্থানীয় দুজন পথচারী গোলাগুলির সময়ে গুলি লেগে ওয়াপদা বাঁধের উপর মারা গিয়েছেন।

ধীতপুর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমরা জামিরতা হাই স্কুলে ক্যাম্প করে অবস্থান নিয়েছিলাম। ১৪ ডিসেম্বর ’৭১ শাহজাদপুর উপজেলা হানাদারমুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধা প্রশাসন গড়ে উঠে। আব্দুল বাকি মির্জা শাহজাদপুর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাধিনায়ক ও থানা প্রশাসক মনোনীত হন। তিনি সিও (ডেভ) অফিসে বসতেন। শাহজাদপুর থেকে সারা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সমস্ত খরচ বহন করতেন। ১৯ ডিসেম্বর ব্যর্থ প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনী প্রধান ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে জোর করে ক্ষমতা কেড়ে নেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি ৮ জানুয়ারি ’৭২ আমাদের জাতির পিতাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দেন। জাতির পিতা ঐ দিনই লাহোর থেকে সকালে বিমানে যাত্রা করে বিকালে অবরতরণ করেন। ইংল্যান্ডের হিব্রো বিমান বন্দরে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বাঙালিদের জাতির পিতাকে বিশেষ সম্মান দেখিয়ে সংবর্ধনা দেন। জাতির পিতা ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশের বিশেষ বিমানযোগে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

বাংলাদেশে আসার পথে ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ভারতে যাত্রা বিরতি করেন। তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে এলেন। ১২ জানুয়ারি জাতির পিতা প্রথমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে এবং পরক্ষণেই রাষ্ট্রপতি পদের ইস্তফা দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রথা চালু করে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেশের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করলেন। জাতির পিতা আমাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমাদের গ্রুপ ২৪ জানুয়ারি ’৭২ রবিবার সিরাজগঞ্জ সদরস্থ ইব্রাহিম বিহারির বাসায় অস্ত্র জমা নেওয়ার ক্যাম্পে অস্ত্র ও গোলা বারুদ্ধ জমা দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্ব শেষ করলাম। সরকারের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য ন্যাশনাল মিলিশিয়া ক্যাম্প করা হলো। আমি ন্যাশনাল মিলিশিয়া ক্যাম্পে ভর্তি না হয়ে বাড়িতে চলে এলাম। কয়েক দিন পর রতনকান্দি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমার বড় দাদা দেবেন্দ্রনাথ সান্যালের কাছ থেকে অষ্টম শ্রেণির অটোপাসের টিসি নিয়ে শাহজাদপুর বহুপার্শ্বিক উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শুরু করলাম।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক ব্যাংকার।

বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র সান্যাল, পিতা : দ্বিজেন্দ্রনাথ সান্যাল, মাতা : নীলিমা সান্যাল, গ্রাম ও ডাকঘর : রতনকান্দি, ইউনিয়ন : হাবিবুল্লাহনগর, উপজেলা : শাহজাদপুর, জেলা : সিরাজগঞ্জ। গেজেট নম্বর : বেসামরিক সিরাজগঞ্জ- ১৬৭৯। ভারতীয় প্রশিক্ষণ : এফএফ নম্বর- ৪৭৪২। সমন্বিত তালিকা জেলাভিত্তিক-১৪১১, উপজেলাভিত্তিক- ১৫৮

মুক্তিযোদ্ধা পরিচিতি : ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম, ডিজিটাল সনদ ও পরিচয় পত্র নম্বর- ০১৮৮০০০১৪১১।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

মুদ্রিত দুঃখের ধারাপাতে

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৫ম সংখ্যা (অক্টোবর-২০২৩)

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *