অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

এম এ রাজ্জাক -
একজন সত্যের সাধক প্রফেসর সনৎকুমার সাহা

আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন ছাত্র। ১৯৯৪ সালে এ বিভাগ থেকেই মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি। সুতরাং অর্থনীতি বিভাগের প্রতি আমার দুর্বলতা আজীবন। সে সময়কার স্যারদের পঠনপাঠনের স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো আজও আমার মানসপটে ভাসে। একথা সত্য যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ জ্ঞানের আধার। আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্যারদের পাঠদান আমাকে বিমোহিত করত। মাস্টার্সে আমার বিষয় ছিল Micro Economics, Macro Economics, International Economics & Economic Development. অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন পার্ট ছিল Econometrics, যেটি সর্বোচ্চ মেধাবীরাই পড়ত। আর সেই বিষয়টিতে যিনি পাঠদান করতেন, তিনি আমার শ্রদ্ধাভাজন স্যার প্রফেসর সনৎকুমার সাহা। আমি অত ভালো ছাত্র ছিলাম না। সুতরাং সনৎ স্যারের ক্লাস করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে, আমার মাস্টার্সের ভাইভা বোর্ডের প্রধান ছিলেন প্রফেসর সাহা স্যার। তিনি আমাকে ‘International Economics’-এর ‘লিওনট্রিফ প্যারাডক্স’ সম্পর্কে প্রথমে যে প্রশ্নটি করেছিলেন, তার উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। সঙ্গত কারণে আমাকে মৌখিক পরীক্ষায় ৬০% নম্বর দিয়েছিলেন। শ্রদ্ধেয় এ গুণী স্যারের বর্তমান বয়স ৮৪ বছরের অধিক। স্যারের ছাত্র হিসেবে তাঁর বর্ণময় জীবনের দু’একটি কথা না লিখলে মনের অতৃপ্ততা থেকে যাবে।

প্রফেসর সনৎকুমার সাহা ১৯৪১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে জামনগর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শচীকান্ত সাহা ছিলেন রাজশাহী বি. বি. একাডেমির শিক্ষক। পিতার বি. বি. একাডেমি থেকেই তিনি ১৯৫৫ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তারপর রাজশাহী কলেজ থেকে তিনি ১৯৫৭ সালে প্রথম বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে অর্থনীতি বিভাগে বি. এ. সম্মান এবং ১৯৬১ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর ১৯৬২ সালের ১৪ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে তিনি ‘প্রভাষক’ হিসেবে যোগদান করেন। ইতোমধ্যে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স যান এবং গবেষণার পূর্বশর্ত হিসেবে ইকোনোমিক্স এ্যান্ড ইকোনোমিক্স শাখা থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৭২ সালে তিনি পুনরায় রাবিতে যোগদান করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পিস কনফারেন্সে যোগদান করেন। তারপর ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্সটিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৯৩ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন এলিজাবেথ হাউজে ভিজিটিং স্কলার হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৬ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপনার পাঠ শেষ করে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে দু’একটি কথা না বললেই নয়। তিনি নিয়মিত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও জার্নালে প্রবন্ধ, গবেষণাকর্ম ও সাহিত্যপত্র নিয়ে লিখে যান। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু সমাজ-রাষ্ট্র-সভ্যতা-সংস্কৃতি-সাহিত্য। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২২টি। এছাড়াও দেশি-বিদেশি বহু নামকরা জার্নালে তাঁর কুড়িটিরও বেশি প্রবন্ধ ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো— ‘সমাজ সংসার কলর’ (২০০০), ‘আকাশ পৃথিবী রবীন্দ্রনাথ’ (২০০১), ‘ভাবনা অর্থনীতির : বিশ্বায়ন, উন্নয়ন ও অন্যান্য’ (২০০৩), ‘কথায় ও কথার পিঠে’ (২০০৮), ‘এই বাংলায়’ (২০১০), ‘কবিতা-অকবিতা রবীন্দ্রনাথ’ (২০১১), ‘ফিরে দেখা : রবীন্দ্রনাথ’ (২০১২), ‘এলোমেলো হাওয়া’ (২০১৩), ‘দেখা-অদেখা’ (২০১৪), ‘বাংলাদেশ : ভাবনা দুর্ভাবনা’ (২০১৬), ‘পুরানো জানিয়া’ (২০১৬), ‘পৌরাণিক-সাম্প্রদায়িক’ (২০১৬), ‘একটু-আধটু পড়া’ (২০১৮), ‘আমার আঙিনায়’ (২০১৯), ‘বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ’ (২০২০), ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে : রেনেসাঁ থেকে সমাজতন্ত্র’ (২০২০), ‘অমর্ত্য সেনের মর্ত্য-ভাবনা’ (২০২১), ‘চেনা-শোনা’ (২০২১), ‘সম্পদে-সংকটে : অর্থনীতির ইতিহাস, চর্চা ও প্রয়োগ’ (২০২৩), ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত দশক’ (২০২৩), ‘প্রতিধ্বনির প্রতিধ্বনি : পাঁচ ভাষার কবিতা’ (২০২৩), ‘অর্থনীতির ন্যায়-অন্যায়’ (২০২৩)।

তাঁর গবেষণাকর্ম নিয়ে আমার মতো নগণ্য জনের কথা বলা বাতুলতা বৈ আর কিছু নয়। তবুও এই সৌভাগ্যবান স্যারের ছাত্র হিসেবে দু’একটি কথা উল্লেখ না করে আমি পারছি না। তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধ ‘চেনা-শোনা’ যেটি আমাদেরই বন্ধু ১৯৯৪ মাস্টার্সের সেরা শিক্ষার্থীনি ড. আবহার রুখ হোসেন কাঁকনকে উৎসর্গ করে লেখা হয়েছে। বিদগ্ধ প্রাবন্ধিক শ্রদ্ধেয় সনৎ স্যার প্রবন্ধটিতে বেশকিছু গুণীজনের কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন— বেগম রোকেয়া, অধ্যাপক অমিয় কুমার দাশগুপ্ত, ড. আনিসুজ্জামান, এবিএম হোসেন (ইতিহাসবিদ), শাহানারা হোসেন ও তাঁর স্বামী এবি মোশাররফ হোসেন (উভয়ই রাবি’র শিক্ষক), বিশিষ্ট নাট্যকার মমতাজ উদদীন আহমদ, কৃতবিদ্য শিক্ষক এবাদত হোসেন মোল্লা, করুণাময় গোস্বামী, শিশির কুমার ভট্টাচার্য, আবুল হাসনাত, কালীরঞ্জন শীল প্রমুখ।

তাঁর রচনায় আলোচনার ধরন, বিশ্লেষণ, ভাষাশৈলী, বিষয়ের গভীরতা, শব্দচয়নের বৈচিত্র্য, ভাবের ব্যঞ্জনা, বাক্যের অলংকারিত্ব সত্যিই অসাধারণ! যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর লেখা আমি পড়েছি, মনে হয়েছে আমি নিস্তব্ধ-নির্বাক, অভিভূত, হতবাক, নীরব-নিবদ্ধ পাঠক এক। অত্যন্ত উঁচু মানের লেখা তাঁর। স্যারের প্রতিটি লেখা সত্যিই অনন্য, অসাধারণ।

একজন অধ্যাপক , রবীন্দ্র গবেষক ও প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৩ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি থেকে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ এবং ‘সাদত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘একুশে পদক’ প্রদান করেন। এছাড়াও তাঁর ‘কবিতা-অকবিতা রবীন্দ্রনাথ’ বইটি ১৪১৭ বঙ্গাব্দে সাহিত্যের মননশীল শাখায় ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা’ পুরস্কার লাভ করে। চিরকুমার অধ্যাপক ডক্টর সনৎকুমার সাহা ৮৪তম বছর বয়সেও দু’ হাতে সমানতালে লেখে যাচ্ছেন, দিয়ে যাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের বৈচিত্র্য, বারতা। অমিতব্যয়ী, সদাচারী, সুমিষ্টভাষী প্রিয় সনৎকুমার সাহা স্যার যুগ যুগ ধরে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকুন, সৃষ্টিশীল কর্ম দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনকে আরও ধন্য করুন— এমনটিই প্রত্যাশা।

সহকারী অধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিক 

ab2000razzak@gmail.com

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

কৃষ্ণচূড়া

Read Next

ড. জসীমউদ্দিন আহমেদ : ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনের অনন্য পথিকৃৎ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *