অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চন্দনকৃষ্ণ পাল -
কিছু মনে পড়ে, কিছু পড়ে না

অনেক কিছুই আজ ঝাপসা, কুয়াশার চাদরে ঢাকা

শ্রীমঙ্গল শহরের কলেজ রোডে ছিল হাসান ভাইয়ের দোকান। অন্য সবকিছুর সাথে হাসান ভাইয়ের দোকানে পত্রিকাও পাওয়া যেত। আমার পছন্দের তালিকায় ছিল তিনটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। তিনটিই সিলেট থেকে প্রকাশিত হতো। সাপ্তাহিক যুগভেরী, সাপ্তাহিক দেশবার্তা আর সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার। ১৯৮০ সালে সিলেট থেকে আর কী কী পত্রিকা প্রকাশিত হতো আজ আর মনে পড়ে না। আমিনুর রশীদ চৌধুরীর সম্পাদনায় যুগভেরী, হিমাংশু শেখর ধর-এর সম্পাদনায় দেশবার্তা আর আবদুল ওয়াহেদ-এর সম্পাদনায় বের হতো সিলেট সমাচার। তিনটি পত্রিকায়ই সাহিত্য সাময়িকী ও শিশুদের পাতা থাকত। যুগভেরীর শিশুদের পাতার নাম ছিল ‘শাপলার মেলা’ আর দেশবার্তার ‘পাতাবাহার’। সিলেট সমাচার-র শিশুদের পাতার নাম আজ আর মনে নেই। আমার পছন্দের এ পাতাগুলোর জন্য অপেক্ষায় দিন কাটত।

১৯৮০ সালের শেষদিকে শ্রীমঙ্গল কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলাম। আসা-যাওয়ার পথে হাসান ভাইয়ের দোকানের দিকে তাকালেই চোখে পড়ত পত্রিকাগুলো ক্লিপে ঝুলে আছে। যেদিন পত্রিকা শ্রীমঙ্গলে আসত সেদিনই ফেরার পথে নিয়ে নিতাম। যাওয়ার পথে নূতন পত্রিকার গন্ধ নিতে নিতে চোখ বোলাতাম পত্রিকার শরীরে। ১৯৮১-৮২র দিকে নিজে ছড়া এবং শিশুতোষ গল্প লিখতে শুরু করলাম। পাঠাব কি পাঠাব না এই দ্বন্দ্বে কাটল কিছু দিন। মাহমুদ হক, তুষার কর, গোবিন্দ পাল, হীরা শামীম, রোকেয়া খাতুন রুবী, এনামুল হক, জুবের, আবদুল হামিদ মাহবুব, সেলিম আউয়াল, ফতেহ ওসমানী, কবি দিলওয়ার, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, আবদুল হামিদ মানিক প্রমুখের ছড়া কবিতা গল্প ও প্রবন্ধ দেখি আর ভাবি আমার নিজের নামটা কবে দেখব এসব পাতায়?

রজতকান্তি পাল-এর ‘অন্বেষা’, টিটোর ‘দোস্ত…

১৯৮১ সালের জানুয়ারি। রজতদা (রজতকান্তি পাল, বর্তমানে কানাডা প্রবাসী) বললেন, একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ম্যাগাজিন বের হবে। লেখা দিস।

আমি একটু অবাকই হলাম। আমি তো লিখি না। শুধু পড়ি। পড়তে পড়তে অন্ধ হওয়ার জোগাড়। বোর্ডের লেখা দেখি না। সদ্য চোখের ডাক্তার দেখিয়ে চশমা নিয়েছি। পাওয়ার মাইনাস টু। পাঠক কি লেখক হবে? টিটোকে জিজ্ঞেস করি (ফরহাদ মান্নান টিটো, বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারের প্রাক্তন ক্রীড়া ভাষ্যকার, সাংবাদিক, বর্তমানে প্রবাসী)। টিটো আর মুজিব তফাদার সুজা ছড়া কবিতা টুকটাক লেখে। টিটো বলে, ‘লিখে ফ্যাল দোস্ত। চেষ্টা কর, হয়ে যাবে।’ রাতে পড়তে বসে কলেজের নোট বুকের পাতায় লিখলাম— ‘ইঁদুর যেমন মাঠের ধান/ গর্তে নিয়ে যায়/ শোষক তেমনি মোদের রক্ত/ শুষে নিয়ে খায়/ শোষিতদের শোষণ করে/ শোষকেরা হাসে/ শোষিতদের দুর্দিনেতে/ কেউ আসে না পাশে।’

পরদিন কলেজে টিটোকে দেখালাম। দোস্ত ফাটিয়ে ফেলেছিস। পুলকিত হলাম। ভাবলাম আমিও পারি। ফ্রেশ কপি করে রজতদার হাতে। ভেতরে তুলকালাম। প্রথম লেখা ছাপা হচ্ছে একুশের সংকলন ‘অন্বেষা’য়। একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে শহীদ মিনারে হাতে হাতে পৌঁছে গেল ছোট্ট এক ফর্মার সংকলন ‘অন্বেষা’। ছাপার অক্ষরে আমার ছড়া। নিজের নাম। আজ ভাবি ঐ দিন রজতদা আমাকে নাও বলতে পারতেন। টিটো অনেক ভালো ছড়া লিখত ঐ সময়। আজ মনে পড়ে ওর ছড়া ছিল সুকুমার রায় স্টাইলে লেখা। ও যদি না বলত ‘দোস্ত…।’ আজ যতটুকুই লিখি এটা কি সম্ভব হতো। রজতদা, বন্ধু টিটো তোমাদের জন্য আমার স্যালুট…।

শুরু হলো পথচলা, সাহিত্যের আঙিনায়

বাইরে কোথাও লেখা পাঠাতে হবে। নিজেকে প্রকাশ করতে হবে। এই বোধটা সৃষ্টি হতে শুরু করেছে তখন। প্রচুর ছড়া লেখার চেষ্টা করছি। কী হচ্ছে না হচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। এরই মধ্যে দু তিনটি ছড়া কপি করে দেশবার্তার ‘পাতাবাহার’ বিভাগে পাঠিয়ে দিলাম। অপেক্ষার দিন আর শেষ হয় না। খুব দেরি হলো না। পরের সপ্তাহে পাতাবাহারে সীসার অক্ষরে ছাপা হয়ে গেলো আমার ছড়া। একটি ব্রডশিট পত্রিকায় নিজের নাম। কতবার যে দেখলাম। বাড়ির সবাইকে দেখালাম। আমার বড়দা (নির্মলেন্দু পাল নিমু) তখন ‘সিলেট সমাচারে’র নিয়মিত লেখক। দেখে বললেন, প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। এটুকুই। পরের দিন পত্রিকা নিয়ে গেলাম কলেজে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দেখালাম। টিটো বলল— দোস্ত, তুই তো ফার্স্ট হয়ে গেলি।

টিটোর লেখা শ্রীমঙ্গলের ম্যাগাজিনগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল। সম্ভবত ঐ কারণেই তার এ মন্তব্য। মুজিব তফাদার সুজা তখন শ্রীমঙ্গলের তরুণ কবিদের সেরা। ওর কবিতার কিছুই আমাদের বোধগম্য হয় না। দুএকজন বলে, ও-তো কঠিন শব্দ বেছে বেছে বসিয়ে দেয়, কবিতা কোথায়? আজ বুঝি সুজা আসলে কবিতার ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে ছিল। ও বলত, কবিতা লেখ, ছড়ায় কিছু হবে না। আমি শুধু উপভোগ করলাম। শুরু হলো পথচলা। দেশবার্তায় নিয়মিত হলাম। এরপর যুগভেরীর ‘শাপলার মেলা’য়। একে একে সাপ্তাহিক সুর, সিলেট বাণী, সিলেট কণ্ঠ, সুপান্থ ইত্যাদি। সিলেটের বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পাতা/ ছোটদের পাতা পড়তে পড়তে বৃহত্তর সিলেটে অনেক লেখকের নাম জানা হয়ে গিয়েছিল। খুব ইচ্ছে হতো তাঁদের সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু সময়, অর্থ, পরিচিতির সীমাবদ্ধতা আমাকে দমিয়ে রাখে।

ছড়ার পাশাপাশি কবিতা, শিশুতোষ গল্প, নিবন্ধ, কলাম লিখতে শুরু করেছি। তখন শ্রীমঙ্গল মৌলভীবাজার থেকে অনেকগুলো সাহিত্য সংকলন বের হতো। আমার সৌভাগ্য প্রায় সবগুলো সংকলন/সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকরা লেখা চাইতেন। লেখা দিতে আমার কখনও উৎসাহের কমতি হতো না। কলেজে দেয়াল পত্রিকা শুরু করলাম। লেখালেখির আনন্দ স্রোতে সেই যে গা ভাসালাম সেটা চলছে আজও। হ্যাঁ মাঝে মাঝে নানা কারণে স্থবির হয়ে গেছে সব। আবার আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠা।

মাহমুদ হক : একবার দেখা পাওয়া প্রিয় গুণীজন

১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল কলেজ এর সরস্বতী পুজোর কমিটিতে রাখা হলো আমাকেও। বিজয়দা (বিজয় রায়) সহপাঠী ও সিনিয়র ভাই সাধারণ সম্পাদক। তার মন্তব্য ‘এবার দেখিয়ে দিতে হবে।’ দেখানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেল। বিজয়দার গাড়ি নিয়ে এলাকার চা-বাগানের ম্যানেজারদের সাথে দেখা করা এবং চাঁদা নেওয়া। না, জোর জবরদস্তি নয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দিলেন সবাই। ভালো একটা আয়োজনে ভালো নিমন্ত্রণপত্র প্রয়োজন, প্রয়োজন ভালো রশিদ। আর সে দায়িত্ব আমার। সিলেট থেকে করিয়ে আনার জন্য আমাকে যেতে হলো দেশবার্তার প্রেসে। পরিচয় হলো মাহমুদ ভাইয়ের সাথে। মাহমুদ হক। কবি ও গীতিকার। সিলেট রেডিওতে চাকরি। দেশবার্তা পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সে সুবাদে আমার নাম জানা ছিল। দেখে বললেন, আমার ধারণা ছিল আপনি আরও বয়স্ক হবেন।

আমাদের কাজের পাশাপাশি দুপুর থেকে বিকেল অব্ধি দীর্ঘ আলোচনা হলো মাহমুদ হক-এর সাথে। কে জানত এ দেখাই প্রথম আর শেষ দেখা। লেখালেখি নিয়ে অনেক দিকনির্দেশনা দিলেন মাহমুদ ভাই। আমি তো জানি আমার নিজেকে পরিশীলিত করতে একজন মাহমুদ হক-এর ভূমিকা কী ছিল। আজ অবাক বিস্ময়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি মাহমুদ হক-এর মতো মানুষকে সবাই ভুলে গেছে। আর তার প্রকাশনা, ব্যক্তিমানস কোনো কিছুই কারও জানা নেই। অথচ ঐ সময়ে তার সহকর্মী তার লেখক বন্ধুর অনেকেই আজ মহীরুহ।

মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি বিস্মৃতিপ্রবণ না কি হীনম্মন্য? সিলেটের আমার অনেক বন্ধুর কাছে মাহমুদ হক-এর প্রকাশনার বিষয়ে জানতে চেয়েছি। কিন্তু কেউই কোনো তথ্য দিতে পারেননি। হয়তো আমিই ভুল জায়গায় পা ফেলেছি। হারিয়ে যাওয়া মেধাবী মানুষদের (যার যার সাধ্য মতো) কাজ নূতন করে তুলে আনা কি খুবই কঠিন। তাঁদের সম্মান করা কি আমাদের নিজেকে সম্মানিত করা নয়?

সেই সময়ে আমরা কজন

আমাদের সেই সময়টা ছিল স্বপ্নের মতো। কলেজ, টিউশনি, বাড়ির নানা কাজের সাথে সাথে উদীচীর মতো সংগঠনের কাজ আর লেখালেখি। পরিবার ও এলাকার অনেকেই ভাবতেন, অনেকে বলতেনও ‘ঘরের খেয়ে বনের…’। আমরা পাত্তা দিইনি। টিউশনির টাকা সম্বল করে বের করলাম ছড়া ত্রৈমাসিক ‘প্রবাহ’। চারটা সংখ্যা করেছিলাম। পঞ্চম সংখ্যা করাটা কঠিন হয়ে উঠেছিল। আগের সংখ্যাগুলোতে টিউশনির টাকা বিনিয়োগ করলাম। কটা বিজ্ঞাপন ছিল। পত্রিকা প্রকাশের পর বিজ্ঞাপনদাতারা টাকা দিলেন না। এক বড়ভাই এগিয়ে এলেন। তিনি স্পন্সর হবেন। খুশি হলাম। কিন্তু তার শর্ত শুনে আমার আক্কেলগুড়ুম। সম্পাদক হবেন তিনি। আমি সহযোগী! তার দিকে তাকালাম। তাকে আর মানুষ বলে মনে হলো না আমার। প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল। অবিনাশের (অবিনাশ আচার্য) প্রাণশক্তি ছিল প্রচুর। ও থাকত শ্রীমঙ্গল শহরে। বড় ভাই ছোট ভাই সবার সাথে ছিল ভালো ও কার্যকরী সম্পর্ক। ও একটা একটা করে বেশ কটি সংকলন করে ফেলল। এর মধ্যে লিমেরিক তরুনিমা, ম্যাগাজিন তরুনিমা, সময় ছিল মনে রাখার মতো। আর পুজো সংকলনে আগের মতো আজও অবিনাশ অনবদ্য।

আমার ও অবিনাশ এর বোঝাপাড়া খুবই ভালো ছিল। শ্রীমঙ্গল আর মৌলভীবাজারের সাহিত্যাঙ্গনকে আমরা একসূত্রে গাথতে পেরেছিলাম। মৌলভীবাজারের সাহিত্যাঙ্গনে তখন তুমুলভাবে বিরাজমান আবদুল হামিদ মাহবুব, আকমল হোসেন নিপু, আতাউর রহমান মিলাদ, মহসীন বখত, সৌমিত্র দেব টিটো, শফিউল ইসলাম শফি প্রমুখ। শমসেরনগরে শহীদ সাগ্নিক, বাবুল মোর্শেদ, সায়েক আহমেদ হিমু, দীপংকর মোহান্ত, আহমেদ সিরাজ, সত্যব্রত দেবরায় শংকর প্রমুখ। খুব মনে পড়ে কাকলী কুঞ্জ সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত শফিউল ইসলাম শফি’র ‘অনামিকা’, শব্দরূপ সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত কাজল রশীদ সম্পাদিত ‘পোস্টার’ ইত্যাদির কথা। এছাড়াও সৌমিত্র দেব টিটোর অনেকগুলো সম্পাদনা ছিল যার নাম আজ আর মনে পড়ে না। ১৯৯৩-১৯৯৪ দিকে বেশ কিছু সংকলন মৌলভীবাজার এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রকাশ হতো। এর মধ্যে বালাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এর মুখপত্র ‘শিখা’ ছিল অন্যতম। সৌমিত্র দেব টিটো, সালেহ এলাহী কুটি সম্ভবত বিভিন্ন সময়ে ‘শিখা’ সম্পাদনা করেছেন। পুলক কান্তি ধর সম্পাদিত ‘আরতি’ (পুজো সংকলন), নূরুল কাদের রিপন সম্পাদিত ‘অর্ণব’, শোয়াইব আহমেদ শোয়েব ও আতিকুর রহমান সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘ঊর্মি’, মুজিবুর রহমান মুজিব সম্পাদিত ‘কল্পতরু’ ছয়ফুর রহমান সেতু সম্পাদিত ‘ঋতুপত্র’-এর কথাও আজ খুব মনে পড়ে।

মৌলভীবাজার টু শ্রীমঙ্গল, স্মৃতি…

আমার ছড়াপত্র ‘প্রবাহ’ এর জন্য আর অবিনাশের তরুনিমার জন্য লেখা আনতে গিয়েছি মৌলভীবাজার। দুপুরে গিয়েছি। বিকেলে ফিরব। টিটো, শফি, মাহবুব ভাই, নিপু, ভাইয়ের সাথে দেখা শেষ করে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছেই আক্কেলগুড়ুম। বাস কেন, কোনো গাড়িই চলছে না। কারণ শ্রীমঙ্গল রোডে মোকাম বাজারের নিকট সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের প্রাণহানি ঘটেছে। অতএব রাস্তা বন্ধ।

কখন যে ছাড়বে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমাদের দুজনেরই অনেকগুলো টিউশনি। সামনে বাচ্চাদের পরীক্ষা। কী আর করা। পাই ভরসা। দুজনে মিলে হাঁটা শুরু করলাম। রাত সম্ভবত সাড়ে দশটার দিকে শ্রীমঙ্গলে পৌঁছালাম। কীসের টিউশনি। দুপায়ে রাজ্যির ব্যথা। আজ চিন্তা করলে অবাকই হই।

আমাদের দুজনেরই অর্থকষ্ট ছিল। সম্ভবত এটাই আমাদের হেঁটে আসতে বাধ্য করেছিল। না হলে প্রায় ২০ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আসা…।

একজন ইরম, একজন জিবরান…

অবিনাশ বলল, দুটি নূতন ছেলে দুটো ম্যাগাজিন করছে। লেখা দিও।

লেখা দিলাম যথাসময়ে ছাপা হয়ে ডাক মারফত হাতে চলে এল। এর একটি মো. শোয়েবুর রহমান শোয়েব ও মো. আতিকুর রহমান সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘ঊর্মি’ এবং অন্যটি মো. মুজিবুর রহমান মুজিব সম্পাদিত ‘কল্পতরু’। যে দুটো ম্যাগাজিনই ভালো লেখায় সসুজ্জিত। মনে পড়ে বেশ কিছুদিন ওরা নিয়মিতই ছিল। তারপর আমার ঢাকায় চলে আসা। মাঝখানে জগন্নাথপুর কলেজে চাকরি পুনরায় ঢাকা এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চাকরি আমাকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

৯০ পরবর্তী সময়ে লিটনম্যাগ দ্রষ্টব্য করতে গিয়ে নূতন-পুরাতন অনেকের সাথেই দেখা হয়ে যায় শাহবাগের আড্ডায়। ঐ সময় সরকার আমিন সম্পাদিত ‘মঙ্গলসন্ধ্যা’, আতিক রহমান সম্পাদিত ‘স্বাতন্ত্র্য’, মুরুফুল আলম সম্পাদিত ‘প্রতিশিল্প’ শোয়াইব জিবরান ও আজিজুন মাগফুরা সম্পাদিত ‘শব্দপাঠ’ কে ঘিরে ঝিমিয়ে পড়া লিটল ম্যাগাজিন দাঁড়াচ্ছে। তখন সরকার আমিন, শাহ্‌নাজ মুন্নী, মুজিব ইরম, শোয়াইব জিবরান, আতিক রহমান, কবির হুমায়ূন প্রমুখের আড্ডাতে আমিও মাঝে মাঝে শরিক হতাম। সেখানেই একদিন মুজিব ইরম-এর সাথে দেখা এবং পরিচয়। মুজিবই শোয়াইব ও অন্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই মুজিবই আমাদের ‘কল্পতরু’ সম্পাদক মুজিবুর রহমান মুজিব, শোয়েবুর রহমান শোয়েবই আজকের শোয়াইব জিবরান। মুজিবের এর কাছ থেকে জানা গেলো আমাদের প্রিয় কবি দিলওয়ারই তাদের মূল নামের সাথে ইরম ও জিবরান সংযুক্ত করে পুরোপুরি কবিতার কাছে সমর্পণ করেছেন।

আজ ২০১৩ সালে কবি মুজিব ইরম আর কবি ও সম্পাদক ড. শোয়াইব জিবরানকে সাহিত্য জগতের কে-না চেনে! অনেক দিন দুজনকে দেখি না। জানি না, সামনাসামনি দেখা হলে ওরা আমাকে চিনতে পারবে কিনা।

আমাদের নূতন সাহিত্যযোদ্ধারা…

‘মনুবার্তা’ প্রকাশকালে মাঝে মধ্যে মৌলভীবাজার যাওয়া হতো। তখন নিপু ভাই, মাহবুব ভাই, পুলক ধরসহ ‘মনুবার্তা’র অনেকের সাথে একটু সময়ের জন্য হলেও দেখা হতো। মনুবার্তা বন্ধ হওয়ার পর সত্যি একটা বড় গ্যাপ সৃষ্টি হয়ে গেল। ‘একফর্মা ছড়াপত্র’র সুবাদে তাও দু একজনের সাথে যোগাযোগ হতো। এর মধ্যে মাহবুব ভাই আর পাপড়ি ভাবি অন্যতম। ‘পূর্বদিক’ বের হওয়ার খবরও মাহবুব ভাইয়ের কাছ থেকেই পাই। উদ্বোধনী সংখ্যাটিও পেয়ে যাই ছড়াকার আবদাল মাহবুব কোরেশীর সৌজন্যে।

কবি জয়নাল আবেদীন শিবুর আর মহসীন মুরাদ-এর সুবাদে ‘পূর্বদিক’ নিয়মিত পাচ্ছিলাম। বর্তমানে মহসীন মুরাদ নিয়মিত ফেসবুকে ট্যাগ করছেন। ফলে দিব্যি নেট থেকে পড়ে নিচ্ছি। সম্প্রতি ‘ছড়াপত্র’ প্রকাশের ব্যাপারে ছড়াপত্রের উপদেষ্টা আবদুল হামিদ মাহবুব আমাদের মাহবুব ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলে কবি ও ‘কোরাস’ সম্পাদক মুজাহিদ আহমেদ এর সাথেও দেখা হয়ে যায়। মুজাহিদ-এর আমন্ত্রণে পূর্বদিক অফিসে এক আড্ডায় দেখা হয়ে যায় এক ঝাঁক তুমুল তরুণ কবি ও ছড়াকারের সাথে। এরা হলেন— সাকী সায়ন্ত, রুহুল রুহিন, আবদাল মাহবুব কোরেশী, জয়নাল আবেদীন শিবু, আবু সাঈদ রুপিয়ান, নায়েম লিটু, সামন্ত সাবুল আর মহসীন মুরাদ।

আমি অভিভূত তাদের প্রজ্ঞায়। তাদের অসাধারণ ছড়া ও কবিতা আমাকে মুগ্ধ করে। আাঞ্চলিক ভাষায় যে অসাধারণ সব ছড়া এবং দীর্ঘ কাহিনীমূলক ছড়া লেখা যায় বা সম্ভব আমি ভাবিনি কখনো। তারা নীরবে সে কাজটি করে যাচ্ছেন। জাতীয় পত্রপত্রিকায় হয়তো এই মুহূর্তে তাদের উপস্থিতি তেমন নেই। তবে আমি জানি এই তুমুল তরুণরা একদিন সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গন মুখরিত করবে। জাতীয় পত্রিকার মেধাহীন অযোগ্য সাহিত্য সম্পাদকরা আজ যাদের পাঠানো খাম ও মেইল খুলেও দেখে না। একদিন তারা ঐ লেখকদের লেখা পাওয়ার জন্য লালায়িত হবে। এটা আমার বিশ্বাস।

আমি জানি, আমার বিশ্বাস একদিক আলোর মুখ দেখবে।

সেই দিনটির অপেক্ষায়…।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

কৃষ্ণচূড়া

Read Next

ড. জসীমউদ্দিন আহমেদ : ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনের অনন্য পথিকৃৎ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *