অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশির আজম -
বালজাক

বালজাক

শিশির আজম

 

রদাঁর এই ভাস্কর্যটা আমার কাছে একই সঙ্গে বিপজ্জনক, আবার অনুপ্রেরণাদায়ক। এর ডিটেলসগুলো খেয়াল করলে নিজের রুচি, চেতনা, অভিজ্ঞতা, ভাবনা-কাঠামো বিপর্যকর অবস্থায় পড়তে পারে। বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক বালজাকের ওপর কাজটা শুরু করেন প্রথাবিরোধী ফরাসি মাস্টার স্কাল্পটর অগুস্ত রদাঁ, ১৮৯৩ সালে, প্যারির মেয়রের অনুরোধে। সেসময় তরুন ভক্তকূলের অভাব না হলেও ফরাসি এস্টাব্লিশমেন্টের কাছে রদাঁ ব্রাত্য বলা চলে। তবু এই কাজটা তিনি পেয়ে যান। আমলাদের কাছে আর্ট আর কমোডিটি একই। আর রাজনীতিবিদরা মিষ্টি মিষ্টি প্রতিশ্রুতি আর ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যাচার দিয়ে পাবলিককে মোহগ্রস্ত করে রাখতে পছন্দ করেন। তো তারা রদাঁকে কাজটা করতে দিয়েছেন যেন তাদের প্রিয় লেখক বালজাকের ভাস্কর্য তাদের মন ভরিয়ে দেয়। একাজের জন্য শিল্পীকে টাকাও তো কম দেওয়া হয়নি। আর সেটা উনি আগামও নিয়েছেন। কিন্তু শিল্প উপভোগের এই রীতির সঙ্গে রদাঁর ভাবনার মিল নেই আদৌ। শিল্প উপভোগ বা নিছক আনন্দ দেবার জন্য শিল্প সৃষ্টি- সেটা কোনো শিল্পই নয়। এমনটা ভাবেন রদাঁ। মানবশরীর ‘ভেনাস ডি মিলো’ না। আর শিল্পী তো শরীর গড়েন না। শরীরের উপরিত্বক থেকে ভালোবাসা, ক্ষত, ক্ষোভ, অসহায়তা, দ্রোহের কতটা দেখা যায়, উপলব্ধি করা যায়? গ্রেকোরোমান আর্টের সম্পূর্ণতা, নমনীয়তা, কমনীয়তা, নন্দনবোধ কি পেরেছে আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অস্থিরতাকে ছুঁতে? ভাস্কর্যকে নিখুঁত হবার দরকার নেই। তথাকথিত নান্দনিকতা-মানবিকতার জায়গা থেকে তাকে সরিয়ে দরকার মেধা-মনন-দ্রোহের উজ্জীবন। যা তুলে আনে মানুষের ভেতরকার হিংসা, ক্ষোভ, কলুষতাকে। রদাঁ যখন দ্য বার্গারস অব ক্যালাইসতৈরি করেন তা গৌরবব্যাঞ্জক ছিল না। কেবল দেশাত্মবোধের ব্যাপার ছিল না। রদাঁ দেখিয়েছেন তাদের ভেতরকার ভয়, আত্মত্যাগ আর অসহনীয় মানসিক দ্বন্দ্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের হিংসা আর লোভের বলি থেকে বেঁচে যাওয়া এক জাপানি সেনার মুখ থেকে যে বাস্তব অনুভূতি আমরা পাই তা উশকে দেয় বুর্জোয়া সভ্যতার ঘা আর পুঁতিদুর্গন্ধকে। আহত অবস্থায় যখন উনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তখন দেশমাতৃকার কথা তার মনে পড়েনি। মনে পড়েছে মা-বাবার কথা, স্ত্রী-সন্তানের মুখ। এ এক কঠিন বাস্তবতা। মিথ্যা ‘দেশপ্রেম’ দিয়ে এই বাস্তবতা ঢেকে রাখা যায় না। রদাঁ এই বাস্তবতা স্বীকার করেছিলেন। শিল্পকে মোহনীয় হতেই হবে? রদাঁ ভাস্কর্যকে নিটোল বা মসৃণ করে তোলেননি। মানবশরীর কখনো নিখুঁত হয় না। শিল্পকে কেন নিখুঁত হতে হবে? পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি ব্রাঙ্কুসি বা জিয়াকমেত্তির মতো ভাস্করগণ রদাঁকে গুরু মেনে চিরাচরিত নন্দনবোধের সংজ্ঞাকে উলটেপালটে দিয়েছেন। লিওনার্দো, রাফায়েল, মাইকেলাঞ্জেলো চেয়েছিলেন দেবতারা সাধারণ মানুষের ঘরের পিঁড়িতে এসে বসুক। রেমব্রাঁর আঁধারে আমরা অনুভব করতে পেরেছি মানুষের ভালবাসার যন্ত্রণার আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। আর্টকে সুন্দর করে তুলতে হয় না। আর্ট নিজেই সুন্দর। ফ্যাসিবাদের অনুকৃতি পিকাসোর ‘গোয়ের্নিকা’য় কি নান্দনিকতার কোনো ঘাটতি আছে? দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ থেকে রদাঁ নিজেই তো সৃষ্টি করেছেন মহাকাব্যিক ব্যাঞ্জনার ‘দ্য গেটস অব হেল’। সফিউদ্দিনের ‘দুমকা’ সিরিজ বা ‘মাছ’ সিরিজ যেমন আমাদেরকে অস্তিত্বের শিকড়ের প্রতি নমিত করে তেমনি জয়নুলের ‘দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা’ সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়ন-নিষ্ঠুরতা আর বুর্জোয়া সমাজের নষ্টামীর প্রতিকৃতি সবার সামনে দেখিয়ে দেয়। এটাও আর্টের সৌন্দর্য! হ্যাঁ, চূড়ান্ত এই ভাবনার সঙ্গে প্যারির এস্টাব্লিশমেন্টের দ্বন্দ্ব অবধারিত। লেখক বালজাক মারা যান ১৮৫০ সালে। ফলে শিল্পী তাকে মডেল করতে পারেননি। আর শারীরিক অনুকরণ তার জন্য মুখ্যও ছিল না। ফলে ড্রেসিং গাউনে মোড়া বিশাল মনুমেন্টাল ফর্মে গড়া মূর্তিটিতে তিনি মনযোগ কেন্দ্রীভূত করেছিলেন দার্শনিক মনস্তত্ত্ব, সৃজনশীলতা আর সুষম টেক্সচারের ওপর আস্থা রেখে। কাজের সময় বাড়িয়ে বাড়িয়ে যখন ১৮৯৮ সালে ‘বালজাক’ নির্মাণ শেষ হয় তখন প্যারির মেয়র ও আমলারা রেগে আগুন। কিম্ভূতকিমাকার কী বানিয়েছেন এটা রদাঁ? তাদের প্রিয় লেখকের এরকম বিশ্রী বেঢপ পেট? এটা তো তাদের প্রিয় লেখকের জন্য চূড়ান্ত অবমাননাকর। আর প্যারির দর্শকদের জন্যও চূড়ান্ত অবজ্ঞা। এ ভাস্কর্য তারা প্যারির মিউনিসিপ্যালিটির জন্য গ্রহণ করবেন না। উপরন্ত সুদে-আসলে সব টাকা ফেরত দিতে হবে। কী করবেন রদাঁ? কোথায় পাবেন এতগুলো টাকা? কে উদ্ধার করবেন তাকে? কে আবার- ওরেস লেকক্! তার গুরু। প্রাণপ্রিয় শিষ্যের এই বিপদে এগিয়ে এলেন তিনি। পৌর কর্তৃপক্ষকে সমস্ত টাকা পরিশোধ করলেন আর ‘বালজাক’কে নিয়ে নিলেন নিজের জিম্মায়। লেকক্ আগেই সব শুনেছেন। ছাত্রের প্রতি অগাধ আস্থা তার। জানেন রদাঁর এই সৃষ্টির কাছেই একদিন প্যারি মাথা নোয়াবে। অথচ এই বালজাক রদাঁর অতি প্রিয় লেখক, অন্য সবার মতো। তাই তো রদাঁ বালজাককে অনুভব করতে চেয়েছেন ভেতর থেকে। ভেতরটা কেমন এটা তো প্যারিকে জানানো দরকার। প্যারির রুগ্নতা আর অভিজাততন্ত্রের নষ্টামী ফরাসিদের সামনে উনি চাইলেন উম্মুক্ত করতে। ভেতরের পুঁতিদুর্গন্ধ বাইরে আসতে দেওয়া হোক। প্যারি দেখুক। যেমনটা চেয়েছেন বালজাক। শিল্পী বালজাককে সৃষ্টি করলেন এভাবেই। প্যারিকে ভয়ংকর এক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন রদাঁ। প্যারির জন্য এটা মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব! নিজের শয়তানি, নিজের লুম্পেনগিরির মুখোমুখি হতে কে চায়? বরং নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোটা শ্রেয়! রদাঁ ভয়ংকর এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন প্যারিকে। হ্যাঁ, যখন এই ভাস্কর্যের সামনে নিজেকে আমি দেখি, প্রতিবার, নিজেকে শুধরাবার সুযোগ পাই। বুঝি শিল্পে লুতুপুতুর কোনো জায়গা নেই। নিজের কাছে সৎ থাকা দরকার সর্বাগ্রে, দৃঢ়তা দরকার। পাঠকের কাছে নিজেকে বিক্রি করবার দরকার নেই। আর্টের সমঝদারি উপভোগের আকাঙ্ক্ষা আর্টিস্টের জন্য আত্মহত্যার সামিল। আর যারা আর্টের সত্যিকার সমঝদার এটা তাদের প্রতিও প্রতারণা। আমি মানি, সত্য দেখা যায় না, সত্য অনুভব করতে হয়।

লেখক পরিচিতি :
শিশির আজম
জন্ম : ২৭ অক্টোবর, ১৯৭৮।
জন্মস্থান, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা :
এলাংগী, কোটচাঁদপুর
ঝিনাইদহ -৭৩৩০
বাংলাদেশ।

Read Previous

গুস্তাভ ক্লিম্টের এক রহস্যময় চিত্রকর্ম

Read Next

শানু মজুমদার-এর যুগল কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *