অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আনোয়ার রশীদ সাগর-এর গুচ্ছ কবিতা

আনোয়ার রশীদ সাগর-এর গুচ্ছ কবিতা

পালক

পালক পাখিহীন পিলপিল করে উড়ছে,
পালকগুলো এখন হালকা বাতাসেও সড়সড় শব্দ করছে।
দুদিন আগেও পালকগুলো প্রাণ নিয়ে আকাশে-বাতাসে বিদ্রোহের দামামা বাজিয়েছিল।
উড়িয়েছিল, দিগন্ত থেকে দিগন্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে বিপ্লবী পতাকা;
অথচ ছিটকে পড়ে, টুকরো টুকরো হওয়ার চিহ্ন ওরা দেখেনি।
ঝরে পড়বে অথবা পড়েছে তা পালক গুলো  এখনো বোঝেনি অথবা বুঝতে চেষ্টাও করেনি।
হয়তোবা মাঠেঘাটে বা রাজপথে তাদের শুকনো পাতার সাথে দেখা যাবে,
দেখা যাবে হাঙরের মুখে খাবার হিসেবে হিসহিস শব্দ করে গুড়িয়ে যেতে।
কী এক দুর্ভাগা পালকের জাতটা!—মনে রাখে না অতীত ইতিহাস।
পাখির পাখায় থেকে থেকে বাজপাখির ছোঁ শিখেছে, দেখেনি বা সয়নি কোনোদিন  পালক থেকে খসে পড়ার যন্ত্রণাটা।
দুর্ভাগ্যবশত পালকগুলো কালবৈশাখী ঝড়ে পড়েনি, দেখেনি আগুনের সাইক্লোন।
আবেগের কবি অথবা বিনয়ের বিনিময়ে বিনিয়োগ হয় বাংলাদেশের জলধারা;
সে জলধারায় ভাসতে ভাসতে ভেঙেচুরে ভেসে গেছে
কতো কতো বিপ্লব!
অথচ খরাবন্যার নির্যাতন, নির্বিঘ্নে নীরবে রয়ে গেছে কৃষক শ্রমিক মেহনতী মানুষের দুয়ারে দুয়ার।

চলে যাবে, যাও

চলে যেতেই তো এসেছিলে, নইলে অবেলায় আসবে কেন!
চলে যাবে, যাও;
দুঃখ নেই কষ্ট নেই,
আছে শুধু পুলকিত হওয়ার সময়
আছে শুধু একটিবার দেখার চন্দ্রময় শিহরণ ,
আছে শুধু দূর্বাঘাসের  শিশির বিন্দু, যা ঝরে যায় নিমিষেই।
চলে যাবে, যাও;
পথ চেয়ে থাকবো না
প্রকাশ্য কিছু বলবো না
মনে মনে, মনের ভিতরে যে পথ রয়েছে,
রয়েছে যে কোঠরিতে চাঁদমুখ, সেখানে জ্যোৎস্না আছে,
যে পথ হারায় না, যে জ্যোৎস্না ডোবে না  থাকবে সেখানেই।
চলে যাবে, যাও;
চলে যেতে চাইলেই যাওয়া যায় না,
ভুলে যেতে চাইলেই ভোলা যায় না,
স্মৃতিচিহ্ন থেকে যায়, থেকে যায় কতো কথা!
কী কথা কও কাজল কালো চোখে
সব কথা রয়ে গেছে, রয়ে যাবে শূন্য বুকে।

নির্জনদ্বীপে

চোখের পলকে পিওপিও পাখিটা পুলকিত,
পুঞ্জীভূত পাথর রেখে উড়াল দিলো।
চাহনির চাঁদে, চিহ্নগুলো চেয়ে চেয়ে দেখলাম;
রাখিটা রেখে রঙিন হাওয়ায় হারিয়ে গেল,
নির্জলা নির্জনতায় নিঃশব্দে নীল নীলিমায়
মিলিয়ে গেল, রয়ে গেছে নির্মম গৃহস্থালী;
যা নিয়ে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে খেলা খেলি
শব্দের বুননে, পর্যবেক্ষণ করি মননে।
যাপিত জীবনের জ্বলন্ত জল, জ্বলে জ্বলে
শুকিয়ে লবণাক্ত হয়ে পুড়ন্ত কড়াইয়ে চটপট
শব্দ হয়, ঝরঝর ঝরে ঝর্ণা পাহাড়ের গোঁড়ায়
হৃদয়ের কুঠুরিতে একগুচ্ছ শব্দ ধরে ধরে পুড়ায়
সাজায়, পিও পিও পাখিটা পলকে পলকে আসে, হারায়।
কোনো এক দ্বীপে নির্ভরতার সাথে আঁতাত
করে কাক অথবা কোকিল কুহুকুহু ডাকে,
বর্ষা, শরৎ বা হেমন্তের গাঙচিল হয়ে
ছোঁ মেরে, পিও পিও পাখিটা বুকেই লুকিয়ে থাকে।

নিঃশব্দে নীরবে

বহুযুগের বৃক্ষ বৃষ্টি বুকে ধারণ করে এগিয়ে এসেছি
পাকান ভাঁজা ঘ্রাণের গোধূলির আলোমাখা আকাশে;
চোখের চাওয়া চিত্র চিত্রায়ণ করে
রোজ রোদেলা রঙিন সকালে স্নিগ্ধতায়
নিজেকে এলিয়ে দিয়ে চেয়ে থাকি ঘোরে,
নীরবতার নিঃসঙ্গতা ভেঙে ভেঙে  চুরমার করি বাতাসে।
তারপর বৃষ্টি ঝরায় দুচোখে, ঝাপসা—ঝাপসায় ঝরে ঝরে ঝর্ণা হয়ে যায়  হৃদয়ের গভীরে
কতো ক্ষত, কতো দুঃখ, কতো কষ্ট, কতো স্মৃতি রেখে
চলে গেলে নিঃশব্দে নীল শরীরে।
শুধুই সাক্ষী হয়ে রয়ে গেলাম এ জীবনে
চিটিধানের খই হয়ে রয়ে গেলাম জানালার কিনারে।

চড়ই পাখির আগমনে কিঞ্চিত শিহরিত হইনি
হইনি আন্দোলিত, জাগেনি কোনো যৌনতা
নীল বুকে কালো মেঘ, ঘোলা মেঘ শুধুই সাদা হয়েছে,
সুখ সুর বাজেনি বাসরে, ভাঁজাঘ্রাণ এ মনে সয়নি;
আলোমাখা দিনগুলো প্রদর্শিত হয় আকাশে
পিঠা ভাজার ঘ্রাণ ছড়ায় নীরবে বাতাসে
গোধূলির রং বদলানো গিরগিটি পরিবেশে
এগিয়ে চলেছি, চলতে হয় তাই চলি হেসে হেসে।

হার মানা, না মানা সময়

জীবনের ভঙ্গুর সময়
হৃদয়ের পাঁজর ভাঙে
ভেঙে ভেঙে ভেসে যায় স্মৃতিময় অতীত,
মানুষ রেখে যেতে চায় আঁধার নামা কাব্য,
রেখে যেতে চায় পদচিহ্ন।

ঘুরে ঘুরে ঘরে আসি,
ফিরে ফিরে আসে
নির্মল আকাশ
বৃষ্টি চোখে রাত নামে
ফাগুনের আশায় চলার পথে শ্রাবণ করে ভীড়।
আঁধার ভেজা কষ্ট মাখা
অমানিশার ঘোর
চারদিকে প্রতিদিন গভীর হয় ধারালো তীর।
গুমসো গুমোট গুমরে ওঠে
বাসি অথচ কৈশোরকান্না
অবেলায় স্মৃতির কাছে হার মানি, নত করি শির।

উঠোন

হেমন্তে গোধূলির রং বদলানো সন্ধ্যায়—
উঠোনের মাচার নিচে, চুলায় সরিষাতেলে ভাঁজা পাকানের ঘ্রাণ,
ঘ্রাণ মায়ের আঁচলের  মৃদু দুগ্ধশৈশব।
হাঁসগুলোর বাড়ি ফেরার হৈচৈ শব্দ—
ভাত আর গুড়ো মাখা বাটি,
ছিটিয়ে পড়া উচ্ছিষ্ট খাবারের খবরে মুরগিদের ছুটাছুটি,
ঘরে উঠার সময়।
গোলাভরা ধানের পাশে লঙ্কাকাণ্ড—
বিড়াল আর কুকুরের তাণ্ডব দুজনেরই গর্জন
আধিপত্য বিস্তারের, কৃষকের উঠো যেন ত্রিভুজ ভুমি,
ভূমি আধিপত্যের।

মায়ের ভাষা অবরুদ্ধ সাংস্কৃতির বিনিময়ে
মা এখন ম্যাম, বাবা হয় ড্যাডি;
কী এক অদ্ভুত ঘাসপাতা,
সবুজ ছাড়িয়ে খয়েরি লালে ভরা—
পুঁইমাচা আর লাউমাচায় দখল উঠোন—
গাছে গাছে শিমুলের ফুল, শালিকের ক্যাচরম্যাচর।
ছায়া পড়ে না দিনে, চাঁদ দেখা যায় না শীতের শেষ ফাগুনে—
ধুমধাড়াক্কা ব্যান্ডে, নাচে পপসংগীতে;
স্যাঁতসেঁতে জীবনের গল্প এখন  খোলামেলা বায়ান্নর  বাংলাদেশে।

 

 

Read Previous

শানু মজুমদার-এর যুগল কবিতা

Read Next

সংস্কৃতির অনিঃশেষ প্রেরণা : সনজীদা খাতুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *