
জীবন নদীর বাঁকে
রাসেল রবি
সারা রাত অস্থিরতায় ঘুমাতে পারলো না মনোয়ারা। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে মধ্য রাত পেরিয়ে গেল। শেষ রাতে যখন দুচোঁখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। তখন কানে ভেসে আসে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ফাটল ধরেছে। মসজিদের মাইক থেকে প্রচার করা হচ্ছে। মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছে।
প্রথম দফার বন্যার পানি বাড়ি থেকে নামতে না নামতেই দ্বিতীয় দফায় আবার বন্যা দেখা দিয়েছে। প্রথম দফার বন্যার পানি কমতে থাকলে, এবারের মতো বড় বানের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। এই আশায় বুক বাঁধে মনোয়ারা। সাতবার প্রমত্তা যমুনার ভাঙাগড়ার খেলার সাথে সংগ্রামী জীবন তার। গত পাঁচ বছর আগে সর্বশেষ স্থায়ীভাবে ঠাঁই পেয়েছে পারতিতপরল গ্রামে। এবারও বুঝি রক্ষা করা গেল না। কথাগুলো ভাবতেই, মনোয়ারার অস্থিরতায় আরও বেড়ে গেলো। আর তখনি মনোয়ারা ভয়ার্ত গলায় ডাকে, ও মনির; মনির। কোনো জবাব এলো না। মনির গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
মুষল ধারে বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে দুকানে কিছু শোনা যাচ্ছে না। মনোয়ারা হাত উঁচিয়ে বেড সুইচ চাপলেন। বিদ্যুৎ নেই। কাছে গিয়ে মনিরকে জাগিয়ে দেয়ার শক্তিও মনোয়ারার নেই।
আশি ঊর্ধ্ব বৃদ্ধা মনোয়ারা। গত নয় বছর ধরে প্যারালাইসিস-এ আক্রান্ত। কোমরের নিচে থেকে প্যারালাইসিস হয়েছে। আসুস্থ মনোয়ারার দেখা-শোনার দায়িত্ব পড়েছে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া মুমুর ওপর। যেন মনোয়ারার সেবা করার জন্যই আভাগী পৃথিবীতে এসেছে। সুরমা তেমন দেখা-শুনা করে না শ্বাশুড়ির।
বৃষ্টির মাত্রা অনেক কমেছে। কলকল শব্দ করে পানি ঘরে ঢুকছে। সে শব্দ শুনতে পাচ্ছে মনোয়ারা। মনোয়ারা এবার ডাকে সুরমাকে, ও বউ মা; বউ মা। পাশের ঘর থেকে সুরমা বিরক্তিকর স্বরে বলে, চুপ থাকেন। রাত-বিরাতেও চিল্লানী।
– বউ মা পানি আসে।
– আসুক।
ইতোমধ্যে সুরমা ঘুম থেকে জাগা পেয়েছে। হারিকেন জ্বালাতে হাত কাঁপছে। দমকা বাতাসে লাইটার বারবার নিভে যাচ্ছে। পানি দেখে ভয়ে আতঙ্কে মুমুর লাবণ্যে ভরা শ্যামবর্ণের মুখটা নিরস পাথর হয়ে গেছে।
উঠোনে হাটুর ওপরে পানি। পানি বেড়েই চলছে। মনির উত্তোজিত হয়ে বলে, ভাবি মরণের ঘুম দিছো। পানিতে সব ডুবে গেল।
মুয়াজ্জিনরে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। দূরে নদী পারের বাড়িগুলোতে আলো হাতে মানুষের ব্যস্ত চলাফেরা দেখা যাচ্ছে। একজন অন্যজনকে চিল্লানী দিয়ে ডাকাছে।
ইলশেগুড়ির হিম বাতাসে নিষ্প্রাণ মন নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে নিথর হয়ে পানির গতিবিধি লক্ষ করছে সুরমা। এখন কি করা উচিত বুঝতে পারছে না। দমকা হাওয়ায় হারিকেনের আলো নিভে গেল। আপরদিকে বৃদ্ধা মনোয়ারা ঘরের ভেতরে শিশুদের মতো কান্না করছে। আশি ঊর্ধ্ব মানুষ এইভাবে কাঁদতে পারে তা আমার জানা ছিল না।
প্রতিদিনের ন্যায় আজও মাছের নেশায় যারা মধ্য রাতে মাছ ধরতে গিয়েছিলো ভরা নদীতে, তারা এক হাতে জাল অন্য হাতে আলোর মশাল নিয়ে পানির ভেতরে লম্বা লম্বা পা ফেলিয়ে এগিয়ে আসছে। পানির থপাশ থপাশ শব্দ হচ্ছে। তাদের মুখে শুনা যাচ্ছে বড় বাড়ির আম, কাঁঠালের গাছ, বড় দুই ঘর সবই নদীর পেটে। খালি হাত আর পা নিয়ে আছে।
উঠোনে পানি মাজা পর্যন্ত হয়েছে। মনির ছাগল ও এক বস্তা চাল কলা গাছের তৈরি ভেলায় নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে বেড়ীবাঁধের দিকে। ঘরের মেঝেতে রাখা চৌকি পানিতে ডুবে য়াওয়ায় অসুস্থ মনোয়ারাকে স্থানান্তর করা হয়েছে কাঠের বাক্সের ওপর। শুয়ে শুয়ে প্রলাপ বকছে।
বারান্দায় চৌকিতে বসে মনিরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে সুরমা ও মুমু। মনির কখন ফিরবে তাদেরকেও বাঁধে নিয়ে যাবে। আর এর মধ্যে মনোয়ারার হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে মুমুকে।
দরিয়া দানবের রূপ নেয়ায় প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা পওয়া মানুষগুলো শেষ সম্বল সঙ্গী করে তারা ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ে। বানভাসি মানুষরা বেড়ীবাঁধে ঘর উঠানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। এক পরিবারের হয়তো দুই জন ঘর তৈরি করছে। অপর দিকে ঐ পরিবারের অন্য সদস্যরা পানিতে তলিয়ে যাওয়া আসবাবপত্র নৌকাতে উঠানোর কাজে ব্যাস্ত। রাস্তা সংলগ্ন যাদের নিজস্ব জমি সরকারিভাবে অধিগ্রহণ হয়েছে। তারা সে জায়গায় ঘর তৈরি করছে। অন্যদিকে বাঁধে যাদের কোনো জায়গা নেই। তাদের ঘর তৈরিতে অনেক কাঁঠ-খড় পুড়াতে হচ্ছে। অনেকে জমির মালিককে অর্থের বিনিময়ে সরকারি জায়গায় আস্থায়ীভাবে ঘর ওঠানোর অনুমতি নিচ্ছে। আবার কেউ কেউ ছুটছে মেম্বারের পিছু পিছু।
‘মেম্বার সাব এনা ছাপরা তুলার জাগা দেও। তিনডে ছোল নিয়ে কুটি থাকমু। বানে সবি নিয়ে গেছে।”
বাঁধে মানুষ থাকার ঘরগুলো তৈরি হচ্ছে টিনের চালবেষ্টিত। ঘরের চারপাশে টিনের শেড। আবার কেউ কেউ পাঠকাঠি, পলিথিন, ত্রিপল, জিও ট্যাক্স ব্যাগ দিয়ে শেড তৈরি করছে। বয়ষ্করা ভেলায় চড়ে গবাদি পশুর জন্য কচি পাতা সংগ্রহ করছে।
ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভটভট শব্দ করে বাঁধের কিনারে ভিড়ছে। নৌকাগুলো মালামালে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। যুবকরা খাট, চৌকি, আলমারীসহ ভারী আসবাবপত্র, মহিলারা ছাগলগুলো কোলে নিয়ে নিরাপদে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ঘর তৈরির কাজে সহয়োগিতা করছে।
হাত গুটিয়ে বসে নেই কোমলমতি শিশুরাও। তারা কেউ স্বল্প ভারী তৈজসপত্র, কেউবা মিষ্টি কুমড়া, মুড়ির টিন মাথায় নিয়ে দৌড়িয়ে নিরাপদে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে তারা অতি উৎসাহের সাথে ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছে। বাঁধে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই আবার ঠাঁই নিয়েছে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে। বানভাসি মানুষরা কেউ একবেলা, কেউ অর্ধবেলা, কেউবা অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। এছাড়াও পানি বাড়ার সাথে সাথে যমুনার প্রবল স্রোতে চরাঞ্চালে ব্যাপক ভাঙ্ন শুরু হয়েছে। সরকারি ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে বরাদ্দকৃত চাল বানভাসি মানুষদের মাঝে বন্টন করছে স্থানীয় মেম্বার। গত দুদিনে কারও কারও চুলায় জ্বলেনি আগুন। তিন বেলা শুধু চিড়া আর গুড় খেয়ে আছে। আর পুবের যমুনার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পশ্চিমের বাঙালি নদীর পানিও। পশ্চিমের সবুজ ধানের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। দুএকটা অধিক উঁচু বাড়ি ছাড়া গ্রামের সবগুলো বাড়িই পানিতে ভাসছে।
পানি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আশপাশের বিশ গ্রাম পানিতে ডুবে গেছে। চারদিকে মানুষের মাঝে হাহাকার পড়েছে। মনির তার মা, ভাবি ও মুমুকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাঁধের পাশে তৈরি আট টিনের ছোট এক খুপরি ঘরে।
ঘরের চারপাশে পাটকাঠির বেড়া। মনির গ্রামের কলেজ থেকে বিএ পাশ করে একটি এনজিও সংস্থার মাঠ সংগঠক হিসাবে র্কমরত।
বন্যার পানিতে ভিজে যাওয়া বই-খাতাগুলো রোদে শুকাতে দিয়েছে মুমু। মনোয়ারার অসুখ বেড়ে গেছে। গত দুই দিন হলে তরল পানীয় ছাড়া কিছুই মুখে দেয়নি। কথাও বলছে না। চোঁখ দুটো স্থির করে শুধু তাকিয়ে আছে।
শ্রাবণের মেঘমুক্ত আকাশ। মুমু ও মনোয়ারা ঘুমাচ্ছে। মনির ও সুরমা খুপরি ঘরের মেঝেতে বসে এফএম রেডিও’র খবর শুনছে। ‘উজান নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।’ বন্যার পানি কমায় তাদের মনে ঘরে ফেরার আশা জেগেছে। বাইরে উথালি-পাথাল চাঁদের আলো। খুপরি ঘরের দরজা ভেদ করে চাঁদের আলো ঘরে ঢুকেছে। পড়েছে তাদের গায়ে। মনে হচ্ছে আলোর ফুল ফুটেছে। এই রকম চাঁদনী রাতে সুরমার মন খারাপ হয়ে যায়। চাঁদের সাথে মিশিয়ে দিতে হয় অক্ষিগোলকে জমানো অজস্র আলোর ব্যথা। উষ্ণ চোখের জল। সুরমা বলল, আজ পূর্ণিমার রাত। তাই না মনির ?
-না ভাবি। গত রোববার ছিল পূর্ণিমার রাত।
– কী ভোলামন আমার। (দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে)
– ভাবি গান শুনতে যাবে দেবু কাকার বাড়িতে?
– না।
– কেন?
– মুমু যদি জেগে ওঠে।
– বেশিক্ষণ থাকবা না।
– দেবু কাকার মেয়েকে না দেখলে মন জুড়ায় না দেবর?
– কী যে বলো ভাবি।
– চলো।
আভাগী সুরমা কি জন্য যে মাটি কামড় দিয়ে এই বাড়িতে পড়ে আছে। আর থাকবেই না কেন? ওর তো আর কেউ নেই। বিয়ের আগেই মা-বাবা মারা গিয়েছে। বড় দুই ভাই তেমন কোনো খোঁজখবরও রাখে না। বোনকে বিয়ে দিয়েই বোধ হয় তাদের দায়িত্ব শেষ হয়েছে। বাবা-মায়ের কবরের জায়গা যখন নদীতে ভেঙে যাচ্ছিল, তখনই গিয়েছিল ভাইয়ের বাড়িতে। তারপর আরও দুবছর পেরিয়ে গেল।
সুরমার স্বামী বিদেশে থাকে। আভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতেই তার বিদেশে পাড়ি জমানো। পাঁচ বছর হয়ে গেল দেশে আসার কোনো খবর নেই। লোকমুখে শোনা যায় বিদেশে নাকি আবার বিয়ে করেছে। প্রতি মাসে শুধু মায়ের চিকিৎসা জন্য সামান্য টাকা পাঠায়। মনির এনজিও’র একটি চাকরি যোগাড় করে দিয়েছিল সুরমাকে। কিন্তু মনোয়ারার তীব্র প্রতিবাদে মুখে আর এগানো যায়নি। বাড়ির মেয়ে নাকি পরপুরুষের সাথে কাজ করতে নেই।
ঘড়ির কাটা রাত দশটা ছুঁইছুঁই করছে। মনির ও সুরমা হাঁটছে গানের আসরের পথ ধরে। বর্ষার বৃষ্টিতে রাস্তার বেহাল আবস্থা হলেও, চাঁদের আলোয় হাঁটতে মন্দ লাগছে না। গাছে গাছে বর্ষার কদম যেন বন্যার শোভা বাড়িয়েছে। বাঁধের পুবে যতদুর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। চাঁদের আলোয় পানি রুপালি রং ধারণ করেছে। রাস্তার দুপাশে ছড়িয়ে থাকা পাটকাঠিগুলো মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আবার কোথাও কোথাও বাঁশের তৈরি আড়ে ঝুলিয়ে রাখা পাটের সোনালী আঁশগুলো ঝিরিঝিরি বাতাসে ললনার চুলের মতো উড়ছে। বাঁধের পাশে ডেরা তুলে কয়েক জন ঝিটকি দিয়ে মাছ ধরছে। কমতি পানি তাই জালে বেশি মাছ ধরা পড়ছে। এক জন চিল্লানী দিয়ে বলছে, উঠছে রে। অন্য জন সুর মিলিয়ে বলছে, আজ তুর কপাল খুলছে। কেউ আনন্দে গান ধরেছে। কেউ বিড়ি ফুঁকছে। আবার একজন অন্য জনকে হাত এগিয়ে বিড়ি দিচ্ছে। ‘ধর খা, গাডা গরম কর।’ বাঙালির চিরাচরিত নিয়মে গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর মাঝে আতিথেয়তা কোনো ঘাটতি নেই।
দেবন্দ্রেনাথ দত্তের বাড়িতে প্রতি মঙ্গলবার গানের আসর বসে। কবে থেকে এই রেওয়াজ চালু হয়েছে। তা কারো জানা নেই। দেবন্দ্রে দত্ত দেখেছে তার বাবাকে, তার বাবা দেখেছে তার বাবাকে। এভাবেই চলে আসছে।
বাঁধের আদূরেই চুন সুড়কির তৈরি দুই তলাবিশিষ্ট বিশাল উঁচু বাড়িটাই দেবন্দ্রেনাথ দত্তের। আশপাশের দশ গ্রামের মানুষের কাছে দেবন্দ্রেনাথ দত্ত সংক্ষেপে দেবু দত্ত বলে সর্বাধিক পরিচিত। বাড়ির চারপাশ বর্ষার পানিতে টুইটম্বর। দেবন্দ্রেনাথ দত্তে বাড়ির প্রবেশ পথেই বড়সড় একটি বট গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছটির ছায়া পরেছে মাটিতে। দত্তের মতো দেখাচ্ছে। কোথায় থেকে যেন ভেসে আসছে পাকা কদম ফুলের মিষ্টি গন্ধ। পচা পাটের নেশাজড়ানো মদকতা।
রাতের আঁধারে গাছের ডালে বাদুরগুলোর ওড়াউড়ি শব্দে সুরমার গা ছমছম করে উঠল। তা একটু পরেই ঠিক হয়ে গেল। দেবু কাকার পুরাতন শূন্য বাড়িটা বন্যায় প্রাণোবন্ত হয়ে উঠেছে। উঠোনের পৃর্ব দিকে বড় বড় কয়েকটি টিনের ঘর দেখা যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে চার্জার লাইট জ্বলছে। পুরানো টিনের হাজারো ছিদ্র ভেদ করে আলোর প্রতিফলন বাহিরে আসছে। বড় বাড়ির বানভাসিরাই এখানে আশ্রয় নিয়েছে। উত্তরের ছোট ছোট খুপরি ঘরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে জেলে পাড়ার গুটি কয়েক বানভাসি পরিবার। তাদের ঘরগুলোতে পিদিমের আলো মিটমিট করে জ্বলছে। শিশুরা কান্না করছে।
গানের আসর বসেছে উঠোনের দক্ষিণের মঞ্চে। মঞ্চের সামানে বসে আছে দুই শতাধিক নারী-পুরুষ। সুরমা ও মনির বসেছে বাতাবি লেবুর গাছের গা ঘেষে। গান গাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে দেবন্দ্রেনাথ দত্তের মেজো মেয়ে অঞ্চিতা দত্ত। ভারি মিষ্টি গলা তার। গান ধরেছে- ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে/ ও বন্ধু আমার / না পেয়ে তোমার দেখা/ একা একা দিন যে আমার কাটে না রে…
প্রতিদিনের ন্যায় আজও সন্ধ্যায় চায়ের দোকানের টেলিভিশনে বন্যার র্সবশেষ পরিস্থিতি জানতে ভিড় জমিয়েছে বানভাসি মানুষ। অধীর আগ্রহ নিয়ে তীর্থের কাকের মতো বসে আছে গ্রামের সরলমনা মানুষগুলো। কখন তাদের এলাকার বন্যা পরিস্থিতির খবর জানতে পারবে।
‘এদিকে প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বন্যা পরিস্থিতির একটু উন্নতি হয়েছে। আজ বুধবার পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী সত্তর হাজার মানুষ পানিবন্দি। গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় উপজেলায় যমুনার ভাঙ্নে পাঁচটি গ্রাম নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। বুধবার সারিয়াকান্দি পয়েন্টে বিপদ সীমার সাতান্ন সেন্টিমিটার থেকে নেমে সাতচল্লিশ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহ রের্কড করা হয়েছে। অপর দিকে ত্রাণের চাল চুড়ির ঘটনায় তদন্ত কমিটি সারিয়াকান্দি উপজেলার চন্দনবাইশা ইউনিয়নের বন্যাদুগর্ত মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা ত্রাণের চাল কম দেওয়ার ঘটনায় তদারক কর্মকতাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
খবরের ফাঁকে কেউ একজন আক্ষেপের সুরে বলে ওঠে, শালারা গরিবের চাউল মারে খায়। তুর ওপর আল্লার গজব পরবি।
টানা বারো দিন হলো বিপদ সীমার ওপর দিয়ে বইছে যমুনা নদীর পানি। এতে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেয়া শতশত উদ্বাস্তু মানুষ মানবেতরে জীবনযাপন করছে। দেখা দিয়েছে তীব্র বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্য সংকট। সরকারেরে বরাদ্দকৃত ত্রাণ সহায়তাও পযার্প্ত না। বন্যয় কারও কারো ভাগ্যে পাঁচ-সাত কেজি চাল জুটলেও,
আনেকের ভাগ্যে তাও জোটেনি। বানভাসি পল্লিতে নেমে এসেছে সন্ধ্যা। কেউ ঘরের পাশে বাঁধের উপরে আবার কেউ ঘরের সামানে ভাসমান ভেলার উপর চুলা বসিয়ে রান্নার আয়োজন করছে।
অন্য দিকে স্কুলে পানি ওঠায় মার্বেল খেলায় মেতে উঠেছে পাড়ার শিশুরা। দিনে-রাতেও সমান তালে চলছে তাদের দুরন্তপনা। অনেকের বই-খাতা পানিতে ভেসে যাওয়ায় বড়দের সাথে চায়ের দোকানে টিভি দেখে অলস সময় পার করছে।
মনোয়ারা খুব অসুস্থ। শক্ত কাঠের চৌকিতে শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর জন্য প্রহর গুণছে। দুচোখ স্থির করে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুমুর দিকে। মা হারানো মমু নানিকেই মা বলে ডাকে। একবার বড় বন্যার সময় মুমুর জন্ম হয় নৌকাতেই। অসুস্থ মাকে যখন জামথল থেকে নৌকা দিয়ে সারিয়াকান্দি সদর হাসপাতালে আনা হচ্ছিল, তখনই তার মা পথের মধ্যেই মুমুকে পৃথিবীর আলো দেখিয়ে নিজে না ফেরার দেশে পাড়ি জমায়। হাঁটি হাঁটি পা পা করে মুমু কৈশোরে পা রাখছে…
মুমু মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সুরমা পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনির। ওর চোখ ছলছল করছে। প্রতিবেশী মহিলা ও কন্যা শিশুরা ভিড় জমাচ্ছে দরজায়। কেউ সূরা ইয়াসীন পড়ছে। আরার কেউ শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে।
গত তিন দিন আগে ভোর রাতে মনির স্বপ্ন দেখেছিল তাদের পুরাতন বাড়ির ওপর দিয়ে কলা গাছের ভেলায় সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটি লাশ ভেসে যাচ্ছে। বড় বন্যা হওয়ায় লাশটি কবর দেয়া সম্ভব হয়নি। তাই ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে…
