অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রণিত ভৌমিক -
শেষ নিঃশ্বাসের হিসেব

শেষ নিঃশ্বাসের হিসেব

রণিত ভৌমিক

 

কলকাতার রাত কখনোই পুরোপুরি ঘুমোয় না, বিশেষত হাসপাতালগুলোর ভেতরে। মধ্যরাত থেকে সময়টা হাসপাতালগুলোতে বড়ই অদ্ভুত। এখানে না কেউ পুরো জাগে, না পুরো ঘুমায়। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো নিঃশব্দে ওঠানামা করে, কেউ যেন খুব ধীরে দম নেয় অথবা দম নিচ্ছে বলে ভান করে।

১.
বেড নম্বর ১৭-এর মানুষটা তখনো বেঁচে ছিল। চোখ বন্ধ, মুখে অক্সিজেন মাস্ক এবং দরজার বাইরে নার্সিং স্টেশনটা ফাঁকা। রাতের ডিউটিতে থাকা ছেলেটা বাথরুমে গেছে আর ঠিক তখনই একজন অপরিচিত ভেতরে ঢোকে।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো দৌড়ঝাঁপ নেই। তার হাতে আগে থেকে গ্লাভস পরা ছিল। সে আগে থেকেই জানে যে কোন ভালভে হাত দিলে অ্যালার্ম বাজবে না, কতক্ষণ থামালে মৃত্যু হবে অথচ দাগ থাকবে না। সে মনিটরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, মানুষটার হার্ট তখনো চলছে। তবে, মানুষের শরীর জানে যে নিশ্বাস না থাকলে মৃত্যু হতে খুব বেশি সময় লাগে না। ফলে, নিজের কাজটি সে মাত্র সাত মিনিটে সম্পন্ন করে ঘর থেকে চুপচাপ বেরিয়ে গেল, ঠিক যেমন ভাবে সে ঢুকেছিল।
পরদিন সকালে ডাক্তার ওই রোগীর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লিখলেন, রেসপিরেটরি ফেইলিওর। আর কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না যে এই মৃত্যুটা ঠিক কোন সাত মিনিটে ঘটেছিল।
হ্যাঁ, এভাবেই গত ছয় মাসে ধরে শহরের চারটে নামী হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে মোট চারজন রোগীর একইরকম ভাবে মৃত্যু ঘটেছে। কাগজে-কলমে সব মৃত্যুই স্বাভাবিক, কোথাও হার্ট ফেলিওর, কোথাও আবার রেসপিরেটরি ফেইলিওর। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এই চারজনের কেউই মৃত্যুর ঠিক আগের দিন পর্যন্ত মৃত্যুপথযাত্রী ছিলেন না।
প্রথমদিকে যখন এই ধরণের ঘটনা ঘটছিল, লালবাজার তেমন গুরুত্ব দেয়নি। হাসপাতালের মৃত্যু নতুন কিছু নয় ধরে নিয়েই তারা বিষয়টাকে লঘু করে দেখছিল। কিন্তু সর্বশেষ ঘটনার পর, কোথাও গিয়ে বড় পুলিশকর্তাদের মাথার ভিতর একটা অস্বস্তি জমতে শুরু করে।
ধীরে ধীরে উঠে আসে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সব কটি কেসে মিল দেখা যায় যে মৃত্যু ঘটেছে রাত দুটো থেকে চারটের মধ্যে। রোগী একা, কোনো আত্মীয় নেই এবং ডিউটিতে থাকা নির্দিষ্ট নার্সিং স্টাফ তখন ঘরে নেই। সেই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজগুলো ‘কারিগরি ত্রুটি’ দেখিয়ে অনুপস্থিত। সুতরাং ধরে নেওয়া যায়, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
সেদিন ডিসিপি সাহেব তাই আমাদের স্পেশাল ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের সকল অফিসারদের নিয়ে মিটিংয়ে বসেছিলেন। কেসের ব্রিফিং দেওয়ার পর, লক্ষ্য করলাম ডিসিপি সাহেব সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– মেডিক্যাল ফিল্ডে এমন ঘটনা প্রত্যাশা করা যায় না, ধর। মন্ত্রণালয় থেকে চাপ আসার আগে, আমি চাই কেসটা ক্লোজ করতে। অতএব তোমাকে এই কেসের তদন্তভার দিচ্ছি।
কথাটা কানে যেতেই আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। পাশ থেকে সিনিয়র অফিসার কিংশুক দেবনাথ ব্যঙ্গভরা গলায় বলে উঠলেন,
– স্যার, সব গুরুত্বপূর্ণ কেস যদি ওকেই দেন, তাহলে আমরা এখানে কী করতে বসে আছি? আর তাছাড়া ধরকে দিচ্ছেন মানে তো সেই বকলমে রিটায়ার্ড সুমনবাবুকেই টেনে আনা!

ঘরটা মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই যেন কিংশুকবাবুর কথার পর ডিসিপি সাহেবের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়। ডিসিপি সাহেব ধীরে গম্ভীর গলায় বললেন,
– অফিসার দেবনাথ, এটা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়। কেসটা স্পর্শকাতর আর মিডিয়া ইতোমধ্যেই গন্ধ পেয়ে গেছে। ফলে, আমি এমন কাউকে চাই যে চাপ সামলে কাজ করতে পারে।
কিংশুকবাবু হালকা হেসে বললেন,
– তাহলে কি আমরা চাপ সামলাতে পারি না, স্যার?
ডিসিপি সাহেবের চোখে তখন কঠোরতা স্পষ্ট।
– আমি কারোর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। তবে, এই কেসে ধরের মতো অফিসারকেই প্রয়োজন। কারণ সে এর আগেও এমন পরিস্থিতি সামলেছে।
অবশেষে আমি বলার সুযোগ পেলাম,
– স্যার, টিম সাপোর্ট পেলে কাজটা দ্রুত এগোবে। আর একা করলে সময় লাগতে পারে।
ডিসিপি সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
– ঠিক আছে। ধর লিড নেবে কিন্তু তোমরা সবাই টিমের অংশ থাকবে। বিশেষ করে অফিসার দেবনাথ, আমি চাই তুমি কো-অর্ডিনেশন দেখো।
কিংশুকবাবুর মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। তিনি বলেলেন,
– ওকে, স্যার। আশা করি এবার অন্তত আমাদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পাব।
মিটিং শেষের ঘোষণা হতেই চেয়ার সরানোর শব্দে ঘর ভরে উঠল। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, এই কেসের চাপের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়াবে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন।

২.
কলকাতার মতো শহরে প্রতিদিন কত মানুষ মরে, তার হিসেব রাখাও কঠিন। তবে আমার কাজ মৃত্যু দেখা নয়, খুন দেখা। কারণ মৃত্যু কখনো কখনো অনিবার্য কিন্তু খুন সবসময়ই মানুষের তৈরি। আর মানুষের তৈরি অন্যায়কে থামানোর জন্যই আমাদের মতো পুলিশ অফিসাররা এখনো এই শহরের অন্ধকার দিকগুলোতে আলো জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
ফাইলটা টেবিলের এক পাশে পড়ে ছিল। নাম অমল ভট্টাচার্য, বাষট্টি বছর বয়স। মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা- ‘রেসপিরেটরি ফেইলিওর’। চোখ বন্ধ করে হাতে আসা প্রতিটা তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছিলাম। ঘটনার খুঁটিনাটি একে একে মিলিয়ে দেখতে গিয়েই হঠাৎ উপলব্ধি করলাম যে কোনো একটা ঘটনা যদি বারবার একইভাবে ঘটতে থাকে, তবে তাকে আর কাকতালীয় বলা যায় না। তার পেছনে নিশ্চয়ই লুকিয়ে থাকে সচেতন পরিকল্পনা।
আমি সঙ্গে সঙ্গে সিনিয়র অফিসার কিংশুক দেবনাথকে নিয়ে পৌঁছে গেলাম আমাদের ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টে। সেখানে গিয়ে আমরা আবার পোস্টমর্টেম রিপোর্টগুলো খুলে বসলাম এবং এক এক করে সব রিপোর্ট পড়তে লাগলাম। রিপোর্টগুলোতে খুব স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করা আছে যে কোনো প্রকার বিষ নেই, ওষুধের ওভারডোজ নেই এবং শরীরে কোনো আঘাতও নেই।
তবু সিনিয়র ফরেনসিক স্পেশালিষ্ট অমিত সিনহার হাতে লেখা ছোট্ট একটা নোট চোখে পড়ল, তাতে লেখা- ‘Unusual bronchial spasm observed’।
কিংশুকবাবু তৎক্ষণাৎ ওনাকে ফোন করলেন,
– ডাক্তার, এই স্পাজমটা কি স্বাভাবিক?
ওপাশ থেকে চাপা গলায় ভেসে এলো,
– না, অফিয়ার। কিন্তু প্রমাণ করার মতো কিছু নেই।
এই কিন্তুটাই আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ফলে, সেদিন সন্ধ্যায় আমি নিজে ওই চতুর্থ কেসটা যেখানে ঘটেছিল অর্থাৎ দক্ষিণ কলকাতার সেই হাসপাতালে টিম নিয়ে পৌঁছে গেলাম।
সেখানে দেখি আইসিইউ, অক্সিজেন লাইন, ব্যাকআপ সিলিন্ডার সবই ঠিকঠাক রয়েছে। নার্সিং স্টাফদের কয়েকটা বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করলাম কিন্তু সবার মুখে একই কথা,
– আমরা কিছুই দেখিনি, স্যার।

সিসিটিভির হার্ডডিস্ক চেক করানো হলো এবং রাত তিনটের সময়কার ফুটেজটা করাপ্ট বেরতেই আমার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
আমি ওই মুহূর্তে ধীরে শ্বাস নিলাম। পুলিশি অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে যেখানে প্রমাণ নেই, সেখানে সাধারণত কেউ খুব হিসেব করে, খুব সাবধানে কাজ সম্পন্ন করেছে।
লালবাজারে ফিরে এসে সোজা ডিসিপি সাহেবের ঘরে গিয়ে ঢুকলাম।
– স্যার, এটা অবহেলা নয়।
উনি প্রশ্ন করলেন,
– তাহলে?
উত্তরে বললাম,
– কেউ পরিকল্পনা করে নিশ্বাস বন্ধ করছে।
ডিসিপি সাহেব আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বলে উঠলেন,
– তুমি কি বলতে চাইছ, সিরিয়াল কিলিং?
আমি মাথা নাড়লাম,
– হ্যাঁ, স্যার। আমার তেমনই মনে হচ্ছে। আর এটা এমন কেউ করছে, যে জানে মানুষকে ঠিক কীভাবে মারা যায়, চিহ্ন না রেখে।
ডিসিপি সাহেব ভ্রু কুঁচকে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
– তোমার অনুমানটা খুবই গুরুতর, ধর। প্রমাণ কী বলছে?
আমি টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা এগিয়ে দিলাম। তারপর বললাম,
– তিনটে মৃত্যুই প্রথমে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, স্যার। কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে সূক্ষ্ম অসঙ্গতি আছে। মৃত্যুর পদ্ধতি আলাদা, অথচ কৌশল এক। শরীরে প্রায় কোনো স্পষ্ট চিহ্ন নেই।
ডিসিপি সাহেব গম্ভীর ভাবে বললেন,
– মানে খুনি চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী।
– সম্ভবত, স্যার। অন্তত মানবদেহের দুর্বল জায়গাগুলো সে নিখুঁতভাবে চেনে। ওষুধের মাত্রা, স্নায়ুর ওপর প্রভাব, এমনকি মৃত্যুর সময় নির্ধারণ, সবকিছুতেই হিসেবি ছাপ আছে।
ঘরে তখন নীরবতা নেমে এলো। কয়েক সেকেন্ড পর উনি জিজ্ঞেস করলেন,
– ভিক্টিমদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র?
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
– আপাতদৃষ্টিতে নেই। পেশা আলাদা, বয়স আলাদা, সামাজিক অবস্থানও ভিন্ন। কিন্তু প্রত্যেকের মৃত্যু ঘটে হাসপাতালে এবং সেটাও রাতের শেষ প্রহরের দিকে।
ডিসিপি সাহবের চোখে তখন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। উনি আমার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
– তুমি বলতে চাইছ, খুনি হাসপাতালের ভেতরেই আছে?
আমি ধীরে উত্তর দিলাম,
– নিশ্চিত নই, স্যার। তবে, খুনি হাসপাতালের সিস্টেম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং সে ভালো ভাবেই জানে কীভাবে নজর এড়াতে হয়।
ডিসিপি সাহেব ফাইল বন্ধ করে বললেন,
– ঠিক আছে। এই তত্ত্ব আপাতত আমাদের মধ্যেই থাকবে। মিডিয়ায় একবার ‘সিরিয়াল কিলার’ শব্দটা ছড়িয়ে পড়লে শহরে আতঙ্ক ছড়াবে। তুমি নীরবে তদন্ত চালাও আর যত দ্রুত সম্ভব, একটা শক্ত প্রমাণ নিয়ে আমার সামনে আসো।
ওনার কথা শুনে আমি সংক্ষিপ্তভাবে বললাম,
– ঠিক আছে, স্যার। আমি যথাযথ চেষ্টা করব। তবে, এবার হয়তো আমরা এমন একজনের পিছু নিয়েছি, যে আমাদের প্রত্যাশার থেকেও একধাপ এগিয়ে।
এরপর ডিসিপি সাহেবের কেবিন থেকে বেরিয়ে আবারও কাজে লেগে পড়লাম। তবে, একটা বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের শহরে বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরণ ও সংজ্ঞা। বিভিন্ন এলাকায় মাথাচাড়া দিচ্ছে নতুন ধরনের অপরাধচক্র। জেলার দাগী অপরাধীরাও নীরবে মিশে যাচ্ছে শহুরে ভিড়ে। তাদের পরিচয় বা গতিবিধি সম্পর্কে আমাদের হাতে থাকে না পর্যাপ্ত তথ্য। ফলে, হঠাৎ কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে প্রতিরোধ বা দ্রুত সমাধানের সুযোগ কমে যায়। আর তখনই প্রশ্ন উঠতে থাকে, এটা কি আমাদের ব্যর্থতা নয়?
তার জন্য সম্প্রতি লালবাজার থেকে একটা নির্দেশিকা দেওয়া হলো। এবার থেকে কলকাতা পুলিশের প্রত্যেকটা থানা এলাকায় সমস্ত অপরাধীর ট্র্যাক রেকর্ড যাতে যথাযথ ভাবে নথিভুক্ত করা হয়, বিশেষ করে যারা সদ্য অপরাধে হাত পাকিয়েছে, সেই সব আনকোরা অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করে বলা হয়েছে নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করতে। আসলে এই কেসের তদন্তে নেমে যে সব তথ্য সামনে উঠে আসছে, সেই সম্পর্কে লালবাজার একেবারেই অবগত নয়। আর এই বিষয়টা মিডিয়ায় প্রকাশ্যে আসতেই, পুলিশের ব্যর্থতা নিয়ে মুখ খুলেছিলেন স্বয়ং রাজ্যের এক মন্ত্রী।

মিডিয়ার সামনে বক্তব্য রাখার সময় সেই মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন,
– আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায় পুলিশের। যদি অপরাধীদের প্রাথমিক তথ্যই সংগ্রহে না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা পাবে কীভাবে?
মিডিয়ার ক্যামেরা তখন লালবাজারের দিকেই ঘুরে যায়। সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল আরও সরাসরি,
– পুলিশের গোয়েন্দা শাখা কি আগেভাগে কোনো ইনপুট পায়নি? নতুন অপরাধচক্রের হদিশ কি সম্পূর্ণ অজানাই ছিল?
পরদিন সকালেই লালবাজারে জরুরি মিটিং ডাকা হলো। ডিসিপি সাহেব আমাদের উদ্দেশ্যে বলেন,
– সঠিক তথ্য না থাকলে মাঠপর্যায়ের দক্ষতাও কাজে আসে না। অবিলম্বে প্রত্যেক থানাকে সক্রিয় হতে বলো। সন্দেহভাজনদের মুভমেন্ট, নতুন ভাড়াটে, হঠাৎ আর্থিক উত্থান সবকিছুকে নজরে রাখতে হবে।
সিনিয়র অফিসার কিংশুকবাবু তখন প্রশ্ন তোলেন,
– স্যার, জনবল আর প্রযুক্তিগত সহায়তা না বাড়ালে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
জবাবে ডিসিপি সাহেব গম্ভীর ভাবে বললেন,
– অজুহাতের সময় নেই, অফিসার দেবনাথ। পরিস্থিতি আমাদের উপরেই নজর রাখছে। ব্যর্থতার তকমা মুছতে হলে প্রমাণ করতে হবে, আমরা এক ধাপ এগিয়ে।
ঘরভর্তি নীরবতার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, এ লড়াই শুধু অপরাধীদের বিরুদ্ধে নয়, নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষারও। আর তাই সময় নষ্ট না করে, ডিসিপি সাহেব আমার দিকে চেয়ে সরাসরি বলেই ফেললেন,
– ধর, আজই তুমি সুমন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করো। তোমাদের টিমে ওই একটা মানুষের ভীষণ প্রয়োজন।
কথাটা শুনে আমি যতটা না খুশি হয়েছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন আমাদের সিনিয়র অফিসার কিংশুক দেবনাথ। তবু সেই মুহূর্তে প্রতিবাদ জানানোর মতো কোনো শব্দ যেন তার মুখে এলো না। সামনেই রাজ্যের নির্বাচন সুতরাং সরকার স্বাভাবিকভাবেই চাইবে নিজেদের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে। আর সেই প্রক্রিয়ায় যদি কয়েকজন পুলিশকে বলির পাঁঠা হতে হয়, তাতে শাসক মহলের বিশেষ ক্ষতি হবে না, এ কথা আমরা সবাই বুঝে গেছিলাম।
যাই হোক, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে আমি মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। করিডোর পেরিয়ে গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট করলাম। হ্যাঁ, অনেকদিন পর আবারও গন্তব্য সুমন স্যারের ফ্ল্যাট।

৩.
আচ্ছা, অবসর মানে কি সত্যিই মুক্তি? না, সুমন স্যারের মতো ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে অবসর কেবল দাপ্তরিক সীমারেখা টেনে দেয়। দায়িত্ববোধ, অভ্যাস আর অনুসন্ধিৎসু মনকে কিন্তু থামাতে পারে না। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে সরে দাঁড়ালেও, তাদের ভেতরের কর্তব্যনিষ্ঠ অফিসারটি যেন কখনো অবসর নেয় না।
সুমন স্যারের ফ্ল্যাটটা দেখলে প্রথমে কারোরই মনে হবে না যে কোনো এক সময় এখানে রাজ্যের সবচেয়ে কঠিন কেসগুলোর মীমাংসা হয়েছে। ডোরবেল টিপতেই ভেতর থেকে একটা গম্ভীর গলা ভেসে এলো,
– দরজা খোলা। পুলিশ হলে জুতো খুলে ঢুকো।
আমি হালকা হেসে দরজা ঠেলে ঢুকলাম। সুমন স্যার তখন খবরের কাগজ পড়ছেন, চোখ না নামিয়েই উনি বললেন,
– কী ধর, লালবাজারে আজকাল কি কেস কম পড়ে যাচ্ছে? নাকি অবসরপ্রাপ্ত লোকজনকে বিরক্ত করা এখন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে?
আমি সামনে রাখা চেয়ারটায় বসলাম এবং স্যারের দিকে চেয়ে বললাম,
– আপনি দাপ্তরিকভাবে অবসর নিয়েছেন ঠিকই, স্যার। কিন্তু সমাজে যে সব ঘটনা ঘটছে, তাতে মনে হয় কেসগুলো আপনাকে এখনো অবসর নিতে দেয়নি।
উনি কাগজ নামিয়ে তাকালেন।
– মানে?
– মানে, যতবার বিপদে পড়ি, ততবারই আপনার বাড়ির রাস্তা চিনে ফেলি।
আমার কথাটা শুনে সুমন স্যার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বললেন,
– সেই কারণেই তো অবসর নেওয়ার পর পাহাড়ে চলে গেছিলাম। ভেবেছিলাম, অন্তত খুনোখুনির গল্পগুলো থেকে দূরে থাকতে পারব। কিন্তু তা আর হলো কই? তুমি সেবার কেসের ফাইল হাতে হাজির হলে, তারপর থেকেই আবার জড়িয়ে পড়লাম। বলতে পারো, নিজের প্রয়োজনে আমাকে এই শহরের সঙ্গে বেঁধে রেখেছ।
স্যারের কথাটা শেষ হওয়ার পর, আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম। কিন্তু পরের কয়েক মুহূর্ত আমরা দুজনেই চুপ করে বসে রইলাম। আসলে এই চুপটাই ছিল ঝড়ের আগের শান্তি।
আমি ফাইলটা ব্যাগ থেকে বের করলাম। সুমন স্যারের চোখ তখন বদলে গেছে, সেই হাসিটা আর নেই। গলাটা এবার গম্ভীর করে উনি বললেন,
– বলো ধর, এবার কোন জটিল কেস নিয়ে এসেছ?
প্রশ্নটা শুনে আমি বলতে শুরু করলাম,
– স্যার, গত কয়েক মাসের মধ্যে শহরের চারটে নামী হাসপাতালে রাতের দিকে একটার পর একটা মৃত্যু ঘটেছে। সব কটাতেই শ্বাসজনিত সমস্যা অথচ কোনো স্পষ্ট কারণ নেই।
সুমন স্যার খুব মন দিয়ে আমার কথাগুলো শুনছিলেন। উনি একবারও আমাকে থামালেন না। আমি যখন সিসিটিভি ফুটেজের কথা বললাম অর্থাৎ রাত তিনটের সময় সব হার্ডডিস্ক করাপ্ট দেখাচ্ছে, তখন উনি প্রথমবার আমার দিকে তাকালেন।
আমি শেষ করলাম এই বলে যে,
– স্যার, এগুলো অবহেলা নয়। কেউ খুব সাবধানে কাজ করছে।
ঘরে তখন কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সুমন স্যার তারপর একেবারে ওনার নিজের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
– বুঝলে ধর। যে খুনি নিশ্বাস নিয়ে খেলে, সে ডাক্তারদের থেকেও চিকিৎসাবিদ্যা ভালো জানে।
এই একটা বাক্যেই আমি বুঝে গেছিলাম, মানুষটা অবসর নিয়েছে ঠিকই কিন্তু ওনার মস্তিষ্ক একদিনের জন্যও থামেনি।
উনি চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
– ধর, এই কেসটা নতুন করে সাজাতে হবে।
আমি কিছু বলার আগেই সুমন স্যার ফের বলতে লাগলেন,
– তিনটে প্রশ্ন। এক, কে মারা যাচ্ছে। দুই, কেন মারা যাচ্ছে। আর তিন, সবচেয়ে জরুরি, কে নিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
আমি মাথা নাড়লাম। এই প্রত্যেকটা কথাই যেন আমার মাথার ভেতর গেঁথে গেল।
– এই তিনটে জিনিস সামনে রেখে এগোলে, খুনি নিজেই আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে।
সুমন স্যারের এই কথাটা শোনার পর, আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম এবং ওনাকে প্রশ্ন করলাম,
– তাহলে আপনি এবারও আমাদের সাহায্য করছেন তো স্যার?
প্রশ্নটা শুনে উনি আমার দিকে তাকালেন এবং ওনার সেই পরিচিত ভঙ্গিতেই বললেন,
– আমি আর উর্দি পরি না ঠিকই কিন্তু এখনো মিথ্যে সহ্য করতে পারি না।
আমি তখনই বুঝে গেলাম, এই কেসটা আর শুধু আমার একার নয়, এখন এটা ওনারও। সুমন স্যারের ফ্ল্যাট থেকে বেরনোর সময় ওনাকে আমার উদ্দেশ্যে পেছন থেকে বলতে শুনলাম,
– ধর, এই কেসে সাবধানে হাঁটবে। কারণ নিশ্বাস নিয়ে যারা খেলে, তারা সাধারণ খুনি নয়।
– ওকে, স্যার।
আমি বাইরে এসে গভীর শ্বাস নিলাম। এখন আর বলতে দ্বিধা নেই, তদন্ত শুরু হয়ে গেছে আর এবার পিছু হটার কোনো পথ খোলা নেই।

৪.
সুমন স্যার যোগ দিতেই তদন্তের কাজে গতি এলো। স্যারের কথা মতো কেসটাকে নতুন করে সাজালাম। আগে আমরা আলাদা আলাদা মৃত্যু দেখছিলাম কিন্তু এখন আমরা একটা ছবি বানাতে শুরু করলাম। সুমন স্যারের বলা তিনটে প্রশ্ন আমার সামনে খোলা ফাইলের মতো পড়ে ছিল। কে মারা যাচ্ছে, কেন মারা যাচ্ছে আর কে নিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এই তিনটে প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে না পেলে যে তদন্ত একচুলও এগোবে না, সেটা আমি স্পষ্ট বুঝে গেছিলাম। তাই আবার ভিক্টিমদের জীবন খুঁটিয়ে পড়া শুরু করলাম। নাম, বয়স, ঠিকানা এসব তথ্য আপাতত সরিয়ে রেখে আমরা খুঁজতে লাগলাম তাদের অতীত, তাদের ছায়া।
প্রথম ভিক্টিম রঞ্জন পাল ছিলেন একটি হাসপাতালের সুপার। কর্মজীবনের এক পর্যায়ে অক্সিজেন সাপ্লাই সিস্টেমে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছিলেন এক হুইসেলব্লোয়ার। অল্পদিনের মধ্যেই আততায়ীর হাতে তার মৃত্যু হয়। অভিযোগের কেসটি পরে রহস্যজনকভাবে চাপা পড়ে যায়।
দ্বিতীয় ভিক্টিম হলেন শর্মিলা দেবী। এক নার্সের বিরুদ্ধে তিনি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইন্টারনাল ইনকোয়ারিতে নার্সটি চাকরি হারায়। ঘটনার পর থেকে তার জীবনেও নেমে আসে অস্বস্তির ছায়া।
তৃতীয় ভিক্টিম ড. সত্যব্রত মুখার্জি। ভুল চিকিৎসার অভিযোগে এক রোগীর পরিবার তার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমেও কিছুদিন চর্চায় ছিল, তারপর ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়।
চতুর্থ এবং সর্বশেষ ভিক্টিম বাষট্টি বছর বয়সী অমল ভট্টাচার্য। ছয় বছর আগে তিনি মেডিক্যাল বোর্ডের উচ্চপদস্থ সদস্য ছিলেন। এক বড় অবহেলার মামলায় তার বিরুদ্ধে এক কর্মী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই কর্মী প্রাণ হারায়। ঘটনাটি নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন উঠেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোও স্তব্ধ হয়ে যায়।
অতএব চারটে আলাদা জীবন, চারটে আলাদা মৃত্যু কিন্তু তাদের অতীতের ভাঁজে ভাঁজে যেন একই অদৃশ্য সুতো জড়িয়ে আছে যেখানে অভিযোগ আছে, অবহেলা আছে আর আছে হঠাৎ করে থেমে যাওয়া কিছু কণ্ঠস্বর।
আমি ধীরে ফাইলটা বন্ধ করে সুমন স্যারের দিকে তাকালাম। উনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে শান্ত গলায় বললেন,
– এরা সবাই একই কাজ করেছিল, ধর।
আমিও বুঝতে পারছিলাম যে এতক্ষণ যেটা আলাদা আলাদা ঘটনা বলে মনে হচ্ছিল, হঠাৎ করেই যেন এক সুতোয় গাঁথা বলে মনে হচ্ছে।
আমি নিচু গলায় ওনাকে বললাম,
– এরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় সত্যকে চাপা দিয়েছিল, স্যার। অভিযোগ উঠেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার হয়নি।
সুমন স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– ঠিক তাই। কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষে। কিন্তু ফল একটাই, সত্যকে আড়াল করা। আর যেখানেই সত্য চাপা পড়ে, সেখানেই জন্ম নেয় প্রতিশোধ।
ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা নেমে এলো। এখন প্রশ্ন একটাই, এই খুনি কি সেই চাপা পড়ে যাওয়া সত্যেরই প্রতিনিধিত্ব করছে? নাকি সে নিজেই সেই অতীতের কোনো হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর?
ওই মুহূর্তে আমার মনের মধ্যে যে প্রশ্নটা তখন জাগছিল, সেটাই আমাদের সিনিয়র অফিসার কিংশুকবাবুকে করতে দেখলাম সুমন স্যারের উদ্দেশ্যে,
– কিন্তু স্যার। এরা কেন মারা গেছে, এই প্রশ্নটাই আসল। কারণ এরা কেউই এখন কিছু করছিল না। সব ঘটনাই ছয় থেকে আট বছর আগের।
সুমন স্যার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন।
– সেই জন্যেই এটা সিরিয়াল কিলিং, অফিসার দেবনাথ।
উনি আরও বললেন,
– এই খুনি হঠাৎ রেগে ওঠেনি, সে অপেক্ষা করেছে।
আমি পাশে দাঁড়িয়ে খেয়াল করলাম, সব কটা পুরনো ঘটনাতেই একটা মিল আছে। হাসপাতাল বাঁচানো হয়েছিল এবং কর্তৃপক্ষ রেহাই পেয়েছিল।
সুমন স্যার ধীরে বললেন,
– এই খুনি বর্তমানের অপরাধ করছে না। সে অতীতের হিসেব চুকোচ্ছে।
এই কথাটা মাথার ভেতর ওই মুহূর্তে যেন গেঁথে গেল। এর অর্থ আসলেই অপরাধী যেটা করছে, তা কেবল রাগের খুন নয়, এটা পরিকল্পিত বিচার।
আমি প্রশ্ন করলাম,
– এই খুনগুলো তাহলে কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
হ্যাঁ, এটাই বোধহয় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। তবে কিংশুকবাবুকে এই বিষয় বলতে শুনলাম,
– কিন্তু ধর, হাসপাতালের অক্সিজেন সিস্টেম তো অটোমেটেড। অ্যালার্ম আছে, ব্যাকআপ আছে।
আমি কিছু বলার আগেই লক্ষ্য করলাম সুমন স্যার মাথা নেড়ে বললেন,
– অফিসার দেবনাথ, সিস্টেম আছে কিন্তু সিস্টেম চালায় মানুষ।
এরপর আমরা একটা দীর্ঘ তালিকা বানালাম অর্থাৎ কারা কারা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে পারে। কিংশুকবাবু তালিকাটা চোখ বুলিয়ে একে একে পড়তে লাগলেন,
– এক, রেসপিরেটরি টেকনিশিয়ান। দুই, আইসিইউ নার্স। তিন, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। চার, অক্সিজেন সাপ্লাই মেইনটেন্যান্স স্টাফ।
ঘরের ভেতর তখন চাপা উত্তেজনা। প্রত্যেকটা পেশাই সরাসরি জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। সুমন স্যার ধীরে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
– তালিকাটা ঠিকই আছে। তবে এর বাইরেও কেউ থাকতে পারে। আমরা পেশার নাম দেখছি কিন্তু খুনি হয়তো পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– মানে, স্যার?
উনি গম্ভীর গলায় বললেন,
– মানে খুব স্পষ্ট। খুনি এমন কেউ, যে জানে ঠিক কোথায় স্পর্শ করলে মেশিন থেমে যাবে, অথচ বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক দেখাবে। আর সেই কয়েক সেকেন্ডের থেমে যাওয়া একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কিংশুকবাবু নিচু স্বরে বললেন,
– তাহলে সে শুধু টেকনিক্যালি দক্ষ নয়, ভেতরের প্রোটোকলও জানে।সুমন স্যার মাথা নেড়ে বললেন,
– ঠিক তাই। সে জানে কখন ক্যামেরা ব্লাইন্ড স্পট তৈরি করে, কখন শিফট বদল হয়, কখন মনিটরের অ্যালার্ম সাময়িকভাবে উপেক্ষিত থাকে। এই খুনি আবেগে নয়, হিসেব কষে কাজ করছে।
কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার শরীর দিয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। আমরা ক্রমশ বুঝতে পারছিলাম যে আমাদের প্রতিপক্ষ কোনো সাধারণ অপরাধী নয়, সে সিস্টেমকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। সহজ ভাষায় যাকে বলে, ‘বিচার দেওয়ার চেষ্টা’।
সেদিনের মতো আমাদের আলোচনা শেষ হলো। কিংশুকবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর, আমি সুমন স্যারের দিকে তাকিয়ে ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– স্যার, আমাদের পরের ধাপ?
উনি কিছুক্ষণ চিন্তায় ডুবে থেকে বললেন,
– এবার আমরা খুনিকে খুঁজব না, খুঁজব তার অবস্থানটা।
ভ্রু কুঁচকে আমি তাকাতেই উনি যোগ করলেন,
– মানুষ লুকোতে পারে কিন্তু তার অবস্থান, তার প্রবেশাধিকার, তার ব্যবস্থার ভেতরে থাকা জায়গাটা লুকোনো কঠিন।
কথাগুলো শুনে বিষয়টা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো। এই কেসে খুনি অন্ধকারে পালিয়ে বেড়াচ্ছে না, সে একটা সিস্টেমের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে, সেই ব্যবস্থারই অংশ হয়ে। আর আমরা এবার সরাসরি সেই ব্যবস্থার দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তে চলেছি।

৫.
কিছু নাম থাকে, যেগুলো ফাইলে লেখা থাকলেও আসলে মুছে ফেলা হয় না, ওগুলো শুধু চাপা পড়ে। আমাদের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো। সুমন স্যারের কথা মতো আমরা এবার খুনি নয়, তার অবস্থান খুঁজছিলাম অর্থাৎ সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কী কী জায়গায় তার প্রবেশাধিকার আছে আর কোন ব্যবস্থার ভেতর থেকে সে কাজটা করছে।
এই সূত্র ধরেই আরও একবার সব কেস নতুন করে খুলে বসলাম। হাসপাতাল, আইসিইউ, অক্সিজেন লাইন ও রাতের শিফট। এই চারটে শব্দ বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল।
কিংশুকবাবু একদিন বললেন,
– ধর, আমরা বারবার ডাক্তার আর নার্সদের দিকেই তাকাচ্ছি। কিন্তু অক্সিজেন সিস্টেমটা কে সামলায়?
প্রশ্নটা সহজ হলেও, এর উত্তরটা কিন্তু আমরা এতদিন এড়িয়ে গেছি। সেদিনই প্রথম একটা পুরনো ফাইল টেবিলের ওপর তুলে আনা হলো। ফাইলের ওপর স্পষ্ট করে লেখা আছে রেসপিরেটরি টেকনিশিয়ান, নাম অরুণাভ সেন।
এক সময় তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও প্রতিভাবান রেসপিরেটরি টেকনিশিয়ান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শহরের এক নামী বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করতেন। অক্সিজেন সাপ্লাই সিস্টেম, ভেন্টিলেটর কিংবা বাইপাস লাইনের মতো জটিল যন্ত্রপাতি সবকিছুতেই ছিল তার নিখুঁত দখল।
কিন্তু সাত বছর আগে হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে যায়। একটি বড় মেডিক্যাল নেগলিজেন্স কেসে তার নাম জড়িয়ে পড়ে। সেই ঘটনার পর থেকেই তার জীবন যেন অন্ধকারে তলিয়ে যেতে শুরু করে। একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছিল অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যর্থ হওয়ার কারণে। তদন্তে সেই দায় এসে পড়ে অরুণাভের ঘাড়ে। হাসপাতাল বেঁচে যায়, ম্যানেজমেন্টও নিজেদের দায় এড়িয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ফাইলের শেষ লাইনে লেখা ছিল- ‘Accused committed suicide’।
আমি লাইনটা কয়েকবার পড়লাম।
– আত্মহত্যা!
সুমন স্যার তখনো কিছু বললেন না। চুপচাপ ফাইলের পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছিলেন। আমি একটু দ্বিধা নিয়েই বললাম,
– স্যার, রিপোর্ট অনুযায়ী তো কেস এখানেই শেষ।
সুমন স্যার ধীরে ফাইলটা বন্ধ করলেন। তারপর আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
– এই লোকটা মরেনি, ধর।
আমি বিস্ময়ে ওনার দিকে তাকালাম।
– স্যার!
উনি শান্ত গলায় বললেন,
– লোকটা হয়তো সত্যিই মারা যায়নি। যেটা ফাইলে দেখতে পাচ্ছি, ওটা স্রেফ আইনি তথ্য। আসলে যে মারা গেছিল, সে একজন মানুষ নয়, একটা সত্য। সিস্টেম ওকে মেরে ফেলেছিল। আর এখন সে সিস্টেমের নিশ্বাস বন্ধ করছে।
ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন বাতাসটা ভারী হয়ে উঠল। কিংশুকবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি একটু ইতস্তত করেই সুমন স্যারকে প্রশ্ন করলেন,
– কিন্তু স্যার, আত্মহত্যার বিষয়টা সরাসরি অফিসিয়াল রিপোর্টে রয়েছে।
সুমন স্যার ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
– দেখুন অফিসার দেবনাথ, রিপোর্ট এমনভাবেও লেখা যায় যেখানে সত্যিটা আড়াল হয়ে যায়। মৃত্যুকেও কাগজে-কলমে অন্যরকম ভাবে দেখানো সম্ভব। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো, কেন?
একটু থেমে উনি আবারও বললেন,
– অরুণাভ একা দোষী ছিল না। পুরো সিস্টেমেই গাফিলতি ছিল কিন্তু দায়টা চাপিয়ে দেওয়া হয় সবচেয়ে নিচুতলার মানুষটার ওপর। আর সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে ক্ষোভ, অভিমান, এমনকি প্রতিশোধের ইচ্ছেও।
সুমন স্যারের কথা শুনতে শুনতে আমি আবারও ফাইলগুলোর পাতায় চোখ বুলালাম। আর সেখানেই যেন ওনার কথার প্রমাণ মিলতে শুরু করল। যাদের মৃত্যু হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় নিজেদের কর্মজীবনে অসততার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। কারোর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল, কেউ ইচ্ছে করেই সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল, আবার কেউ ক্ষমতার জোরে অন্যের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল।
আর অরুণাভ? সে ছিল সেইসব মানুষের একজন, যাদের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়া হয়। হয়তো তখন লড়াই করার মতো শক্তি তার ছিল না কিন্তু আজ সময় বদলেছে, হয়তো আজ সে একে একে হিসেব চুকিয়ে নিচ্ছে তাদের সঙ্গে, যারা একসময় সত্যকে চাপা দিতে গিয়ে তার মতো মানুষদের নীরবে মুছে দিতে চেয়েছিল।
ওই মুহূর্তেই আমি সুমন স্যারকে প্রশ্ন করলাম,
– স্যার, তাহলে সে এত বছর চুপ করে ছিল কেন?
সুমন স্যার জানালার বাইরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
– কারণ কিছু মানুষ তাড়াহুড়ো করে খুন করে না, ধর। তারা অপেক্ষা করে নিজেদের মতো করে বিচার করার জন্য।
কথাটা শোনা মাত্র আমার ভেতরে যেন কিছু একটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। এই কেসটা আর শুধু সিরিয়াল কিলিংয়ের গল্প নয়, এটা অনেক দিনের জমে থাকা প্রতিশোধের হিসেব।
সুমন স্যার ওনার কথার সঙ্গে আরও যোগ করে বললেন,
– অরুণাভ জানে হাসপাতালের ঠিক কোন জায়গায় হাত দিলে মানুষ মারা যাবে, অথচ কাগজে সেটা স্বাভাবিক মৃত্যুই মনে হবে। এই কৌশল সে শিখেছে নিজের কাজ করতে করতেই।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। আমরা সবাই যেন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম, আমাদের সামনে যে ছায়াটা দাঁড়িয়ে আছে, সে একসময় এই সিস্টেমেরই অংশ ছিল।
আমি সুমন স্যারকে তখন জিজ্ঞেস করলাম,
– স্যার, তাহলে আমাদের পরবর্তী টার্গেট?
স্যার আমার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নেড়ে বললেন,
– টার্গেট নয়, ধর। পরের ভুলটা।
আর এই কথাটাই যেন সবকিছু পরিষ্কার করে দিল। খুনি এখনো থামেনি, যতক্ষণ মানুষের নিশ্বাসের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, ততক্ষণ এই শহরের হাসপাতালগুলো অপেক্ষায় থাকবে তার পরবর্তী শিকারের।

৬.
এই ধরণের তদন্তের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। শুরুতে যত বেশি অন্ধকার থাকে, একটা সময় পরে সেই অন্ধকারের মধ্যেই ছোট ছোট আলোর বিন্দু দেখা যেতে শুরু করে। আর সেই বিন্দুগুলো যদি ঠিক ভাবে জোড়া লাগানো যায়, তবেই সত্যিটা ধীরে ধীরে সামনে উঠে আসে।
অরুণাভ সেনের ফাইলটা সামনে আসার পর, আমাদের তদন্ত যেন হঠাৎ করেই নতুন একটা দিক পেল। এতদিন আমরা একটা অদৃশ্য ছায়ার পিছু নিচ্ছিলাম। এখন অন্তত সেই ছায়ার একটা নাম পাওয়া গেছে। তবু নাম থাকলেই যে সত্যি ধরা পড়ে যাবে, তা কিন্তু নয়।
সেদিন বিকেলে আমরা তিনজন আবার সুমন স্যারের ফ্ল্যাটে বসেছিলাম। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিল হাসপাতালের নকশা, অক্সিজেন লাইনের ডায়াগ্রাম আর কয়েকটা পুরনো কেস ফাইল।
কিংশুকবাবু চুপচাপ একটা কাগজে চোখ বুলিয়ে বললেন,
– খুনি প্রত্যেকবার জায়গা বদলেছে কিন্তু পদ্ধতি নয়।
সুমন স্যার তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে উনি ঘুরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– কারণ হাসপাতালে মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়। ফলে, একটা খুন খুব সহজেই স্বাভাবিক মৃত্যুর ভিড়ে মিশে যেতে পারে।
কিংশুকবাবু একটু ঝুঁকে সুমন স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন,
– তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত?
সুমন স্যার শান্ত গলায় বললেন,
– প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে অরুণাভ সত্যিই বেঁচে আছে কিনা। আর তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, সে কি এখনো এই সিস্টেমের ভেতরে ঢুকতে পারে?
কথাটা আমার কেমন যেন অদ্ভুত লাগল। তাই একটু ভেবে আমি বলে উঠলাম,
– কিন্তু স্যার, হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে তো আইডি লাগে।
আমার কথা শুনে সুমন স্যার মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন,
– ধর, তোমাকে নিয়ে আর সত্যিই পারলাম না! একটু বুদ্ধি খাটিয়ে ভাবো তো, তুমি এখনো পুলিশের চাকরি করো। কিন্তু কাল যদি অবসর নাও, তাহলে কি থানায় যাওয়ার রাস্তা ভুলে যাবে?
আমি চুপ করে রইলাম। কারণ স্যারের কথার ভেতরের ইঙ্গিতটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। অরুণাভ যদি সত্যিই বেঁচে থাকে, তাহলে হাসপাতালের সিস্টেম তার কাছে নতুন কিছু নয়। সে জানে কোথায় ব্লাইন্ড স্পট, কোথায় অক্সিজেন মেইন লাইন, কোথায় ব্যাকআপ সিলিন্ডার।
সুমন স্যার টেবিলের ওপর রাখা একটা হাসপাতালের নকশা খুলে বললেন,
– খুনগুলো কীভাবে হয়েছে, সেটা বুঝতে পারলে খুনিকেও বুঝতে পারব।
উনি একটা পয়েন্টে আঙুল রেখে বললেন,
– দেখো, আইসিইউতে সাধারণত অক্সিজেন আসে সেন্ট্রাল পাইপলাইন দিয়ে। সেই পাইপলাইন সরাসরি যায় রোগীর বেডের কাছে।
আমি বললাম,
– কিন্তু ওই লাইনে হাত দিলে তো অ্যালার্ম বাজবে।
স্যার মাথা নেড়ে বললেন,
– হ্যাঁ, যদি পুরো লাইন বন্ধ করো, তাহলে অবশ্যই বাজবে। কিন্তু যদি শুধু একটা বেডের ভালভ সামান্য ঘুরিয়ে দাও, তাহলে?
আমি চুপ করে গেলাম। অন্যদিকে, স্যার আবার বলতে শুরু করলেন,
– অনেক আইসিইউতে এমন একটা বাইপাস লাইন থাকে, যেটা জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়। সাধারণত টেকনিশিয়ান ছাড়া কেউ ওই লাইনে হাত দেয় না।
আমি তখন উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলাম,
– আর অরুণাভ ছিল রেসপিরেটরি টেকনিশিয়ান।
– ঠিক তাই।
এই বলে সুমন স্যার ব্যাখ্যা করতে লাগলেন,
– যদি কেউ ওই ভালভটা মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে জানো?
আমি উত্তর দিলাম,
– রোগীর অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাবে।
– হ্যাঁ। কিন্তু মনিটরে তখনো হার্টবিট দেখা যাবে, কারণ শরীর কিছু সময় পর্যন্ত লড়াই করে। তারপর ধীরে ধীরে ব্রঙ্কিয়াল স্পাজম শুরু হবে।
এই কথাটা শুনেই আমার মাথায় একটা ঝলক লাগল এবং সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম,
– ফরেনসিক রিপোর্টে ওই স্পাজমের কথাই লেখা ছিল!
স্যার শান্ত ভাবে মাথা নেড়ে বললেন,
– আর ঠিক সাত মিনিট পরে যদি আবার ভালভ খুলে দেওয়া হয়, তাহলে বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হবে।
কিংশুকবাবু এতক্ষণ চুপ করে সমস্ত কথা শুনলেও, এবার তিনি বলে উঠলেন,
– অবিশ্বাস্য!
স্যার তখন গম্ভীর গলায় বললেন,
– এটা খুব ঠাণ্ডা মাথার কাজ। খুনি জানে কতক্ষণ অক্সিজেন বন্ধ রাখতে হবে, কখন খুলতে হবে।
আমি বুঝতে পারছিলাম, ধীরে ধীরে আমরা খুনির মস্তিষ্কের ভেতরে ঢুকে পড়ছি। আর তাই সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম, চারটে হাসপাতালে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার আশেপাশের থানাগুলোর ওসিদের তদন্তে যুক্ত করা হবে। কারণ স্থানীয় পুলিশের কাছে অনেক তথ্য থাকে, যেগুলো আমাদের কাছে থাকে না।
আমি সুমন স্যারের দিকে তাকিয়ে বললাম,
– স্যার, আমি তাহলে চারটে থানার ওসিদের সঙ্গে নিয়ে একটা মিটিং সেট করছি।
ব্যাস! কথা মতোই কাজ। পরদিন দুপুরে লালবাজারের কনফারেন্স রুমে আমরা ফের বসলাম। সেখানে ওই চার থানার ওসি উপস্থিত ছিলেন। এখানে বলে রাখি চার থানা বলতে গরফা থানা, আনন্দপুর থানা, মানিকতলা থানা ও বউবাজার থানার কথা বলা হচ্ছে।
প্রত্যেকের সামনে হাসপাতালের কেস ফাইলের কপি রাখা। তাদের কাছে এই কেসগুলো প্রাথমিক স্তরে ছিল কেবল মাত্র সাধারণ মৃত্যু। কিন্তু এখন এর গভীরতা আগের চেয়ে বেড়েছে। ফলে, এখন তাদের কাছ থেকে কিরকম সাহায্য আমরা চাইছি, তার একটা বিবরণ দিলাম সংক্ষেপে।
তারপর দুদিনের মধ্যে তারা একে একে এসে নিজেদের রিপোর্ট দিতে শুরু করলেন। বউবাজার থানার ওসি গগনবাবু বললেন,
– স্যার, গত কয়েক মাসে হাসপাতালের আশেপাশে নতুন ভাড়াটে এসেছে কয়েকজন।
আরেকজন অর্থাৎ মানিকতলা থানার ওসি তাপস রায় বললেন,
– একটা পুরনো মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট দোকানে অচেনা একজন লোক মাঝেমাঝে আসে।
এইসব ছোট ছোট তথ্য শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল আমরা যেন একটা গোলকধাঁধার মধ্যে হাঁটছি। কিংশুকবাবু তখন বললেন,
– আচ্ছা, অরুণাভ সেনের কোনো সরকারি রেকর্ড আছে?
গড়ফা থানার ওসি প্রভাস ধীরে বলল,
– আত্মহত্যার রিপোর্ট আছে কিন্তু মৃতদেহের ফটোগ্রাফ পাওয়া যায়নি।
এই কথাটা শুনে সুমন স্যার গম্ভীর ভাবে বললেন,
– বুঝলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
– কী বুঝলেন স্যার?
উনি আবারও গম্ভীর ভাবে উত্তর দিলেন,
– কেউ যদি সত্যিই মারা যায়, তাহলে তার মৃত্যু লুকোনোর দরকার হয় না, ধর।
এই কথাটা ঘরের ভেতর যেন ঠাণ্ডা বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল। আমরা সবাই বুঝতে পারছিলাম, অরুণাভ হয়ত সত্যিই বেঁচে আছে।
বউবাজার থানার ওসি গগনবাবু কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই বলে উঠলেন,
– স্যার, অনেক বছর আগে এই অরুণাভ সেনের নামটা শুনেছিলাম। মনে আছে সেবার সরকারি হাসপাতালের একটা কেসে তখন বেশ হইচই হয়েছিল।
কথাটা শুনে আমরা একে ওপরের দিকে তাকাতে লাগলাম। সুমন স্যার ওই মুহূর্তে সবার উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বললেন,
– তবে, একটা বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এখনো আমরা নিশ্চিত নই যে অরুণাভই খুনি। কারণ আইনি নথি অনুযায়ী সে মৃত।
একটু থেমে স্যার আবার বললেন,
– তাই আমাদের প্রথম কাজ হবে এটা খুঁজে বের করা যে ফাইলে যা আছে, সেটাই কি সত্যি? নাকি এই গল্পের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে আসল সত্য।
মিটিং শেষ হওয়ার সময় ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকে একটাই নাম নিয়ে ভাবছিল। হ্যাঁ, অরুণাভ সেন। কিন্তু সমস্যা হলো, যদি সত্যিই অরুণাভ সেন সাত বছর আগে মারা গিয়ে থাকে, তাহলে এখন সে কীভাবে ফিরে এলো? আসলে এই প্রশ্নটার উত্তরই হয়ে উঠতে চলেছে আমাদের তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সেই সন্ধ্যেতেই খবর এলো, ডিসিপি সাহেব আমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। আমরা তিনজন সোজা ওনার কেবিনে গিয়ে হাজির হলাম। ভেতরে ঢুকতেই উনি কোনো ভূমিকা না করেই সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
– তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়েছে?
আমি সংক্ষেপে সবকিছু বললাম। অরুণাভ সেনের কথা, অক্সিজেন লাইনের তত্ত্ব আর আমাদের নতুন সন্দেহ। ডিসিপি সাহেব চুপ করে শুনলেন। তারপর গম্ভীর ভাবে বললেন,
– মানে তোমাদের ধারণা, এই মৃত লোকটা হাসপাতালের সিস্টেম ব্যবহার করে খুন করছে?
কিংশুকবাবু উত্তর দিলেন,
– আমরা এখনো সেটা নিশ্চিত নই, স্যার। কিন্তু যতগুলো সূত্র হাতে এসেছে, সবকটাই ওই দিকেই ইঙ্গিত করছে।
উনি একটু সামনে ঝুঁকে বললেন,
– আমার কাছে প্রমাণটাই আসল, অফিসার দেবনাথ।
কেবিনের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো। ডিসিপি সাহেব ফের গম্ভীর মুখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
– এই কেসটা এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। মিডিয়া ইতোমধ্যেই হাসপাতালের মৃত্যুগুলো নিয়ে খবর করতে শুরু করেছে।
– কিন্তু স্যার, খুনি যে এখনো থামেনি।
আমার এই কথাটা শুনে উনি বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকালেন।
– তুমি এত নিশ্চিত কীভাবে?
আমি কিছু বলার আগেই দেখলাম কিংশুকবাবু আমার হয়ে উত্তর দিলেন,
– কারণ স্যার, প্রতিশোধের একটা তালিকা থাকে। আর সেই তালিকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিশোধও শেষ হয় না।
ডিসিপি সাহেব ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
– তাহলে তোমার মতে পরের খুনও হবে?
কিংশুকবাবু আর কিছু বললেন না। তবে, তার সেই নীরবতাই যেন প্রশ্নটার উত্তর দিয়ে দিল। ডিসিপি সাহেব তখন টেবিলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বললেন,
– ঠিক আছে। আমি তোমাদের এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছি।
কথাটা শুনে আমি একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলাম,
– মাত্র এক সপ্তাহ?
– হ্যাঁ, ধর।
উনি দৃঢ় গলায় বললেন,
– তার মধ্যে তোমাদের প্রমাণ করতে হবে, এটা সত্যিই সিরিয়াল কিলিং কিনা। আর যদি প্রমাণ দিতে না পারো, তাহলে এই তত্ত্ব এখানেই বন্ধ করতে হবে।
ডিসিপি সাহেবের কথায় আমরা সবাই বুঝতে পারছিলাম যে এখন আর শুধু খুনিকে খুঁজে বের করার লড়াই নয়, সময়ের সঙ্গেও আমাদের পাল্লা দিতে হবে।
ডিসিপি সাহেব এবার সুমন স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– সুমন, এই কেসে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের খুব দরকার। দয়া করে যা করার একটু তাড়াতাড়ি করুন।
সুমন স্যার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বললেন,
– বেশ, আপনার কপালের ভাঁজটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুছিয়ে দিতে পারি, সেই চেষ্টা করছি।
আমার মনে হলো কথাটা শুনে ডিসিপি সাহেব কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হলেন। তবে, পরক্ষণেই উনি আবার সুমন স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– তাহলে একটা জিনিস বলুন।
ডিসিপি সাহেব সামান্য সামনে ঝুঁকে এলেন। তারপর আর দেরি না করে মনের ভেতর ঘুরতে থাকা প্রশ্নটা করে ফেললেন,
– এই খুনি পরের আঘাতটা কোথায় করবে?
কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘরের ভেতর সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এলো। আমি আর কিংশুকবাবু দুজনেই সুমন স্যারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি শান্ত ও ধীরস্থির ভঙ্গিতে বললেন,
– যেখানে সে মনে করবে বিচার এখনো বাকি।
কথাটা শোনার পর কেবিনের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। কারণ ততক্ষণে আমরা সবাই বুঝে গেছিলাম, যদি দ্রুত তাকে খুঁজে বের করা না যায় তাহলে শহরের কোনো এক হাসপাতালের অন্ধকার আইসিইউতে আবারও কেউ একজন নিঃশব্দে মারা যাবে, মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে।

৭.
কিছু ফাইল থাকে যেগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও আসলে কখনো শেষ হয় না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভেতরের ফাঁকগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অরুণাভ সেনের ফাইলটা ছিল ঠিক তেমনই একটা ফাইল।
লালবাজার থেকে বাড়ি ফিরে খেতে বসেছিলাম ঠিকই কিন্তু মনটা তখনো তদন্তের মধ্যেই আটকে ছিল। মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল গাড়িতে বসে সুমন স্যারের বলা কথাগুলো। উনি তখন বলছিলেন,
– বুঝলে ধর, এই কেসের আসল দরজা খুলতে হলে আমাদের সাত বছর আগের ঘটনাটার দিকেই ফিরে তাকাতে হবে। কারণ বর্তমানের খুনগুলো যতই নিখুঁত হোক না কেন, তাদের শিকড় লুকিয়ে আছে অতীতের মাটির নিচে।
পরদিন সকালে তাই আবারও আমরা তিনজন অর্থাৎ আমি, অফিসার কিংশুক দেবনাথ এবং সুমন স্যার লালবাজারে আলোচনায় বসেছিলাম। টেবিলের ওপর রাখা ছিল অরুণাভ সেনের পুরনো কেস ফাইল।
আমি সুমন স্যারের দিকে তাকিয়ে বললাম,
– স্যার, যদি সত্যিই অরুণাভ মারা না গিয়ে থাকে, তাহলে আমাদের প্রথম কাজ হবে আত্মহত্যার রিপোর্টটা খুঁটিয়ে দেখা।
কিংশুকবাবু ফাইলটা খুলে বললেন,
– রিপোর্ট অনুযায়ী ঘটনাটা ঘটেছিল সাত বছর আগে। দক্ষিণ কলকাতার একটা ভাড়া বাড়িতে।
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম,
– মৃতদেহ কোথায় পাওয়া গেছিল?
তিনি উত্তর দিলেন,
– ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায়।
কিংশুকবাবুর পুরো কথাটাই খুব সাধারণ আত্মহত্যার কেসের মতো শোনাচ্ছিল। কিন্তু সুমন স্যার তখনো চুপ করে ফাইল পড়ছিলেন। উনি কিছুক্ষণ পর বললেন,
– পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা আবার পড়ো।
সুমন স্যারের কথা মতো আমি দ্রুত ফাইলের ওই অংশটা খুললাম এবং লক্ষ্য করলাম রিপোর্টে লেখা রয়েছে- ‘Death due to asphyxia caused by hanging.’
লাইনটা প্রথমবার পড়ে সবই স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরে চোখ আটকে গেল একটি ছোট্ট লাইনে। আমি ধীরে ধীরে সেটাই বাকিদের পড়ে শোনালাম,
– Body partially decomposed.
কথাটা বলেই থেমে গেলাম। কারণ হঠাৎ করেই সেই লাইনটা আর সাধারণ মনে হচ্ছিল না। এর মধ্যে কিংশুকবাবু বলে উঠলেন,
– মানে লাশটা কিছুটা পচে গেছিল।
আমি মাথা নাড়লাম।
– কিন্তু রিপোর্ট অনুযায়ী আত্মহত্যা ঘটার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল।
এইবার ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। কিংশুকবাবু সোজা হয়ে বসে বললেন,
– কিন্তু এটা যে সময়ের সঙ্গে মিলছে না।
সুমন স্যার তখন ফাইলের আরেকটা পাতায় আঙুল রেখে বললেন,
– ঠিক সেটাই। তবে, আরও একটা জিনিস দেখো।
এই বলে উনি আমাদের পড়ে শোনালেন,
– Body was identified by landlord.
আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম,
– মানে পরিবারের কেউ নয়?
সুমন স্যার মাথা নেড়ে বললেন,
– না! আর এখানেই প্রশ্ন জাগছে। কারণ ভেবে দেখো, একটা মানুষ আত্মহত্যা করল অথচ তার দেহ শনাক্ত করল বাড়িওয়ালা, পরিবারের কেউ নয়। পোস্টমর্টেমের সময় দেহ আংশিক পচে গেছিল এবং কেসটাও বড্ড দ্রুত বন্ধ করা হয়েছিল।
আমি ধীরে বললাম,
– মানে কেউ চাইছিল এটা দ্রুত শেষ হয়ে যাক।
ওইদিন বিকেলেই আমরা পৌঁছে গেলাম সেই পুরনো বাড়িতে, যেখানে নথি অনুযায়ী অরুণাভ আত্মহত্যা করেছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার এক সরু গলির ভেতরে বাড়িটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। দরজায় কড়া নাড়তেই একজন বৃদ্ধ দরজা খুললেন।
আমি পরিচয় দিয়ে বললাম,
– আমি ইন্সপেক্টর লক্ষ্মীনারায়ণ ধর। সাত বছর আগে এখানে অরুণাভ সেন নামে একজন থাকতেন।
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,
– হ্যাঁ, মনে আছে।
আমরা ঘরে ঢুকলাম এবং সেই বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম,
– ওনার আত্মহত্যার দিনটা আপনি মনে করতে পারেন?
বৃদ্ধ একটু ভেবে বললেন,
– সেদিন সকালবেলা দরজা খুলছিল না। তখন পুলিশে খবর দিই।
কিংশুকবাবু জিজ্ঞেস করলেন,
– আপনি কি নিজে দেহটা চিনেছিলেন?
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
– হ্যাঁ!
সুমন স্যার ঘরের ভেতর চারদিকটা খুব মন দিয়ে দেখছিলাম এবং তার মাঝেই সেই বৃদ্ধর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
– আপনি কি অরুণাভকে খুব কাছ থেকে চিনতেন?
বৃদ্ধ একটু থেমে বললেন,
– ভাড়াটে ছিল। খুব বেশি কথা বলত না।
সুমন স্যার সঙ্গে সঙ্গে তাকে আরও একটা প্রশ্ন করলেন,
– আপনি কি নিশ্চিত ছিলেন যে দেহটা অরুণাভরই?
বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এবার যেন তিনি একটু অস্বস্তিতে পড়েছেন।
– না! মানে, পুলিশ তখন বলেছিল…।
কথাটা বলেই তিনি থেমে গেলেন, যেন বাকিটা আর বলতে চাইছেন না। আর ওদিকে আমরা তিনজন তার সেই অস্বস্তি লক্ষ্য করে একে অপরের দিকে তাকালাম। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় সুমন স্যার খুব শান্ত গলায় বললেন,
– দেখলে ধর, মানুষটা নিশ্চিত নয়।
আমি শুধু মাথা নেড়ে বললাম,
– হ্যাঁ, স্যার। সেটাই দেখলাম।
লালবাজারে ফিরে আমরা আবার ফাইল খুললাম। আমি এবার খুঁজতে লাগলাম অরুণাভের পরিবারের তথ্য। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে খুব কম তথ্য ফাইলে ছিল। তাই বাকি দুজনের উদ্দেশ্যে আমি বললাম,
– এতে তেমন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো রেকর্ড নেই।
কিংশুকবাবু বিস্মিত হয়ে বললেন,
– মানে আত্মহত্যার পরও পরিবার আসেনি?
আমি উত্তরে কিছু বলার আগেই সুমন স্যার বললেন,
– অফিসার দেবনাথ, এটাই সবচেয়ে বড় ফাঁক।
উনি একটু থেমে যোগ করলেন,
– একটা মানুষ মারা গেল কিন্তু তার পরিবার কোথায়?
কথাটা শুনে আমরা চুপ করে গেলাম। তখন এটা ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে উঠছিল যে এই গল্পটা আসলে এখনো সম্পূর্ণ নয়, এর কোথাও না কোথাও একটা বড় অংশ অনুপস্থিত।
সেদিন কেসের নানা কাজ সামলাতে সামলাতে আমরা এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে ঘড়ির কাঁটার দিকে আর নজর দেওয়ার সুযোগই হয়নি। রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা, আমি আর সুমন স্যার বাড়ি ফেরার জন্য গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই দেখলাম কিংশুকবাবু হাতে একটা লগবুকের মতো কিছু নিয়ে আমাদের দিকে দৌড়ে আসছেন এবং সামনে এসে তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
– আইসিইউ লগবুক।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
– কী হয়েছে?
তিনি বললেন,
– শেষ কেসের রাতের লগবুক পাওয়া গেছে।
আমি দ্রুত তার হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে পাতা ওলটাতে লাগলাম। সেখানে লেখা আছে- ’02:47AM – Oxygen line inspection’।
লেখাটা দেখে আমি বিস্ময়ে বললাম,
– এই এন্ট্রিটা কে করেছে?
কিংশুকবাবু বললেন,
– কেউ জানে না। কারণ সেই রাতের শিফটে থাকা টেকনিশিয়ান বলেছে সে ওই সময় আইসিইউতে যায়নি।
সুমন স্যার কয়েক মুহূর্ত চুপ করে পুরো বিষয়টা ভেবে দেখলেন। তারপর শান্ত ভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– এই প্রথম সে ভুল করেছে।
কথাটা শুনে আমি অবাক হয়ে ওনাকে প্রশ্ন করলাম,
– মানে?
সুমন স্যার বললেন,
– মানে এতদিন খুনি অত্যন্ত সতর্কভাবে কাজ করছিল। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল হিসেব করে নেওয়া। কিন্তু এবার সে নিজের উপস্থিতির একটা চিহ্ন রেখে গেছে। হতে পারে সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে, আবার হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবেও।
আমি আবার লগবুকের দিকে তাকালাম। লেখাটা খুব পরিষ্কার, একটা স্বাক্ষরও আছে কিন্তু নামটা পড়া যাচ্ছে না। শুধু একটা অক্ষর স্পষ্ট, ‘A’। আর এই ‘A’ অক্ষরটা দেখে আমার বুকের ভেতর হঠাৎ ধাক্কা লাগল।
কিংশুকবাবু তখন নিচু গলায় বললেন,
– অরুণাভ?
সুমন স্যার ধীরে মাথা নাড়লেন।
– হতে পারে।
তারপর উনি গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন,
– কিন্তু আরও একটা সম্ভাবনা আছে।
আমি ওনাকে কৌতূহলপূর্বক জিজ্ঞেস করলাম,
– কী স্যার?
সুমন স্যার উত্তর দিলেন,
– এই নামটা হয়তো ইচ্ছা করেই রেখে গেছে।
কথাটা শুনে আমি চুপ করে গেলাম। কারণ এর মানে দাঁড়ায়, খুনি শুধু হত্যা করছে না। সে আমাদের সঙ্গে খেলছে।
গাড়ির জানালার কাচ নামাতে নামাতে সুমন স্যার বললেন,
– ধর, খেলা এখন সত্যিই শুরু হয়েছে। তাই অতীত হোক বা বর্তমান, সবকিছু তোলপাড় করে হলেও অপরাধীকে টেনে বের করতে হবে।

৮.
তদন্তের একটা পর্যায়ে এসে বুঝলাম, সত্য কখনো একা আসে না। তাকে টেনে আনতে হয়, প্রশ্ন করতে হয়, কখনো কখনো একটু ধাক্কাও দিতে হয়। আর সেই ধাক্কা দেওয়ার কাজটাই আমরা শুরু করেছিলাম অরুণাভ সেনের অতীত ঘেঁটে।
এতদিনে আমাদের মনে যে সন্দেহটা দানা বাঁধছিল অর্থাৎ অরুণাভ সেন হয়তো সত্যিই মারা যায়নি, সেই ধারণাটাই এবার ধীরে ধীরে আরও শক্ত হয়ে উঠতে শুরু করল। সেদিন সকালে লালবাজারে পৌঁছেই আমি কিংশুকবাবুর দিকে তাকিয়ে বললাম,
– আমাদের আবার শুরুতে ফিরতে হবে।
কিংশুকবাবু চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
– একবার এগোচ্ছি, আবার পিছিয়ে গিয়ে শুরু করছি। এতে আদৌ কোনো লাভ হচ্ছে, ধর?
আমি শান্ত গলায় বললাম,
– অনেক সময় সামনে যাওয়ার একটাই উপায় থাকে, কিংশুকবাবু। একটু পিছিয়ে গিয়ে পথটা আবার নতুন করে দেখা, এই কেসটাও ঠিক সেরকমই।
কিন্তু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুমন স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– ধর, যেটা আমরা খুঁজছি, সেটা ফাইলের ভেতরে থাকবে না। সেটা লুকিয়ে আছে ফাইলের বাইরে।
আমি ওনার কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরেছিলাম, তাই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করলাম না। আমাদের আবার যেতে হবে সেই হাসপাতালেই, যেখানে সাত বছর আগে অরুণাভ সেন কাজ করত।
ব্যাস! কথা মতোই কাজ। আমরা পৌঁছে গেলাম দক্ষিণ কলকাতার সেই হাসপাতালে। বাইরে থেকে দেখলে কিছুই অস্বাভাবিক মনে হয় না। চকচকে কাচের দেওয়াল, ভেতরে ব্যস্ততা,
অ্যাম্বুলেন্সের আসা-যাওয়া, সবকিছুই যেন স্বাভাবিক ছন্দে চলছে।
কিন্তু আমরা জানতাম, এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে অতীতের কিছু অন্ধকার অধ্যায়। আর সেই অন্ধকারের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের খোঁজা উত্তর।
হাসপাতালের অ্যাডমিন অফিসে বসে আমরা পুরনো রেকর্ড চাইলে কর্তৃপক্ষ প্রথমে একটু ইতস্তত করছিলেন। অ্যাডমিন ম্যানেজার একটু দ্বিধার সুরে বললেন,
– এত পুরনো ফাইল খুঁজে বের করা সহজ নয়, স্যার।
কিংশুকবাবুকে লক্ষ্য করলাম দৃঢ় গলায় তাকে জবাব দিলেন,
– সহজ না হলেও অসম্ভব তো নয়। এই ফাইলটা আমাদের খুব দরকার।
শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হলেন। কিছুক্ষণ পর, আমাদের সামনে ধুলো জমা কয়েকটা পুরনো ফাইল এনে রাখা হলো। আমি পাতাগুলো উল্টাতে শুরু করলাম। অরুণাভ সেন, রেসপিরেটরি টেকনিশিয়ান। অক্সিজেন সাপ্লাই সিস্টেমের মেইনটেন্যান্স ইনচার্জ।
কাজের রিপোর্টগুলো পড়তে পড়তে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠল যে লোকটা তার কাজে ভীষণ দক্ষ ছিল। প্রায় সব রিপোর্টেই লেখা আছে ‘excellent technical handling’।
কিংশুকবাবু ফাইলটার দিকে তাকিয়ে যেন একটু অবাক হয়ে বললেন,
– তাহলে হঠাৎ করে সে দোষী হয়ে গেল কীভাবে?
আমি আর সুমন স্যার একে অপরের দিকে তাকালাম। সত্যি বলতে, সেই মুহূর্তে আমাদের কারোর কাছেই প্রশ্নটার স্পষ্ট উত্তর ছিল না।
সেই মুহূর্তে সুমন স্যার টেবিলের ওপর থেকে আরেকটা ফাইল তুলে নিয়ে বললেন,
– ধর, এটা একবার দেখো।
ফাইলের ভেতরে ছিল সেই কুখ্যাত ঘটনার রিপোর্ট। একজন রোগী অপারেশনের সময় অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যর্থ হওয়ার কারণে মারা যান। তদন্তে দোষ পড়ে অরুণাভ সেনের ওপর। আমি রিপোর্টটা পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেলাম। সুমন স্যারের উদ্দেশ্যে বললাম,
– স্যার, একটা জিনিস খেয়াল করেছেন?
সুমন স্যার শান্ত ভাবে বললেন,
– কি, বলো।
– এখানে লেখা আছে অক্সিজেন ভালভ ম্যানুয়ালি বন্ধ ছিল।
কথাটা শুনে কিংশুকবাবু তখন বলে উঠলেন,
– তার মানে কেউ সেটা বন্ধ করেছিল।
আমি মাথা নাড়লাম।
– কিন্তু রিপোর্টে লেখা হয়েছে অরুণাভের অবহেলা।
সুমন স্যার ধীরে বললেন,
– এর মানে এটাই দাঁড়ায় যে সিস্টেমের ভুলকে একজন মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সেদিন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসার সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আইসিইউর করিডোর দিয়ে হাঁটছিলাম আমরা, হঠাৎ দেখলাম একজন নার্স আমাদের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন। তার চোখে মুখে তখন স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ।
আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
– আপনি কি কিছু বলতে চান?
তিনি একটু ইতস্তত করে ধীরে বললেন,
– আপনারা কি অরুণাভ সেনের ব্যাপারে তদন্ত করছেন?
কথাটা শুনে আমরা তিনজনই একবার একে অপরের দিকে তাকালাম। তারপর আমি শান্ত গলায় উত্তর দিলাম,
– হ্যাঁ, করছি। কিন্তু আপনি এই বিষয় হঠাৎ জিজ্ঞেস করছেন?
নার্সটি চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বললেন,
– এখানে বলা যাবে না।
আমি বললাম,
– তাহলে কোথায়?
তিনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন,
– আজ সন্ধ্যায় হাসপাতালের পেছনের ক্যাফেটেরিয়ায়।
আমরা রাজি হয়ে গেলাম এবং সেদিন সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালের সেই ক্যাফেটেরিয়ায় বসে আমরা তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি এলেন এবং আমাদের সামনে এসে শান্ত ভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন,
– নমস্কার, আমি রিমা দত্ত। বহু বছর ধরে এই হাসপাতালেই নার্স হিসেবে কাজ করছি।
এরপর তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। তারপর ধীরে বলতে শুরু করলেন,
– সাত বছর আগে ওই সময় আমি আর অরুণাভ একই ওয়ার্ডে ডিউটি করছিলাম। সে খুব ভালো মানুষ ছিল।
কিংশুকবাবু কথার মাঝেই প্রশ্ন করলেন,
– তাহলে সবাই তাকে দোষী বলল কেন?
রিমা একবার নিচের দিকে তাকালেন এবং একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
– কারণ কেউ সত্যিটা জানতে চাইনি।
আমি একটু সামনে ঝুঁকে তাকে বললাম,
– সেদিন ঠিক কী হয়েছিল, আপনি কি বলতে পারবেন?
রিমা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন, যেন পুরনো স্মৃতিগুলোকে আবার মনে করার চেষ্টা করছেন। তারপর ধীরে বলতে শুরু করলেন,
– সেদিন রাতে একটা অপারেশন চলছিল এবং হঠাৎ করেই অক্সিজেন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। পুরো হাসপাতালে তখন বিশাল হইচই পড়ে যায়। পরবর্তী সময় তদন্ত শুরু হলে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অরুণাভকে দোষী ঘোষণা করা হয়।
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম,
– আপনি কি মনে করেন, সে দোষী ছিল না?
রিমা দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়লেন।
– না।
– কেন?
আমি আবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম। তবে, এবার তিনি একটু থেমে বললেন,
– কারণ সেদিন আমি তাকে অন্য জায়গায় দেখেছিলাম।
কথাটা শুনে আমরা তিনজনই একসঙ্গে চমকে উঠলাম। কিংশুকবাবু তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলেন,
– কোথায়?
রিমা উত্তর দিলেন,
– অক্সিজেন প্ল্যান্ট রুমে।
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
– মানে?
– সে তখন সিস্টেমটা ঠিক করার চেষ্টা করছিল।
আর এই কথাটা শুনে আমার শরীর দিয়ে যেন একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। সুমন স্যার যিনি এতক্ষণ চুপ করে সব কথা শুনছিলেন, এবার লক্ষ্য করলাম উনি শান্ত গলায় বললেন,
– অর্থাৎ যখন ভালভটা বন্ধ করা হয়েছিল, তখন সে সেখানে ছিল না।
রিমা আবার ধীরে মাথা নাড়লেন।
– ঠিক তাই, স্যার।
আমি ওই মুহূর্তে তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– তাহলে সে আত্মহত্যা করল কেন?
রিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন,
– কারণ তাকে বাঁচানোর মতো কেউ ছিল না। তদন্তের সময় হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট সব দায় তার ওপর চাপিয়ে দেয়। মিডিয়াও খুব দ্রুত তাকে অপরাধী বানিয়ে ফেলে। কয়েক দিনের মধ্যেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়। তারপর হঠাৎ খবর আসে, সে নাকি আত্মহত্যা করেছে।
কিংশুকবাবু প্রশ্ন করলেন,
– আপনি কি তার লাশ দেখেছিলেন?
রিমার ছোট্ট উত্তর,
– না।
এই কথাটা শুনে আমি আর সুমন স্যার একে অন্যের দিকে তাকালাম। সুমন স্যার ধীরে আমাকে বললেন,
– ধর, আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি।
ঠিক তখনই হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটল। ক্যাফেটেরিয়ার কাচের দরজার বাইরে একজন লোক দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। এক ঝলক দেখে মনে হলো, সে হাসপাতালের স্টাফদের মতোই ইউনিফর্ম পরেছে। কিন্তু তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক দৃষ্টি। সুমন স্যার হঠাৎ চুপ করে গেলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন,
– ধর। ওকে দেখছ?
আমি মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালাম। আর ওই মুহূর্তেই লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে করিডোরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আমার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। সেই মুখ যেন আমি আগেও কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছিল।
আমি চেয়ার থেকে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে বললাম,
– কিংশুকবাবু!
আমরা তিনজনই দ্রুত ক্যাফেটেরিয়া থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু ততক্ষণে লোকটা করিডোরের ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেছে। চারদিকে তাকিয়েও আর তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম,
– স্যার, আমি নিশ্চিত।
সুমন স্যারও বললেন,
– হ্যাঁ, আমিও।
কিন্তু কিংশুকবাবু কিছু বুঝতে না পেরে তিনি আমাদের দুজনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
– কে, ধর?
আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে উত্তর দিলাম,
– অরুণাভ সেন।
নামটা বাতাসে ভাসিয়ে দিতেই যেন মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল। সুমন স্যার নিজের গালের দু-পাশের পেশি শক্ত করে বললেন,
– তাহলে খেলা জমে উঠেছে।
আমি গভীর শ্বাস নিলাম। এতদিন আমরা শুধু তার ছায়ার পেছনে ছুটছিলাম। কিন্তু আজ প্রথমবার খুনি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে গেল। সুতরাং এখন এটা বলাই যায় যে এই মানুষটা আর শুধু প্রতিশোধ নিচ্ছে না, সে আমাদের দিকেও নজর রাখছে। ক্রমশ শিকার আর শিকারির মধ্যে যেন দূরত্ব কমে আসছে। আর তাই শেষ চালটা কে আগে দেবে, এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

৯.
কখনো কখনো তদন্ত এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে প্রমাণ আর অনুমানের মাঝখানের দূরত্বটা খুব কম হয়ে আসে।। আমরা ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। ক্যাফেটেরিয়ার বাইরে সেই মানুষটার উপস্থিতি আমাদের কাছে একটা স্পষ্ট সংকেত ছিল। অরুণাভ সেন জীবিত এবং সে জানে আমরা তার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। কিন্তু একটা বিষয় তখনো পরিষ্কার ছিল না। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। তার শেষ লক্ষ্য কে?
সুমন স্যার ওই মুহূর্তে একটা কথা বলেছিলেন,
– ধর, প্রতিশোধের গল্পে শেষ অধ্যায়টা সবসময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।
আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
– মানে?
উনি উত্তরে বলেছিলেন,
– এই তালিকায় নিশ্চয়ই একজন শেষ মানুষ আছে, যাকে ছাড়া এই গল্পটা কখনো সম্পূর্ণ হবে না।
এই কথাটাই আমাদের তদন্তের পরবর্তী ধাপ ঠিক করে দিল। ফলস্বরূপ আগামী দুদিন আমরা পুরনো ফাইল, আদালতের নথি এবং হাসপাতালের প্রশাসনিক কাগজপত্র খুঁজে দেখতে শুরু করলাম।
অরুণাভ সেনের বিরুদ্ধে যে কেসটা হয়েছিল, সেটা আসলে একটা বড় মেডিক্যাল নেগলিজেন্স কেলেঙ্কারির অংশ ছিল। তখন অনেক নাম সামনে এসেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব অভিযোগ ধীরে ধীরে মুছে যায়। আমি সেই পুরনো কেসের চার্জশিট পড়ছিলাম এবং হঠাৎ একটা নাম বারবার চোখে পড়তে লাগল। ফলে, সময় নষ্ট না করে সকাল হতেই বেরিয়ে পড়লাম সুমন স্যারের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে।
সেদিন সুমন স্যারের ফ্ল্যাটে পৌঁছতেই দেখি, উনি বারান্দায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজে চোখ রেখেছেন। আমাকে দেখেই উনি কাগজটা একটু নামিয়ে হালকা হেসে বললেন,
– কী ধর, এত সকালে? মনে হচ্ছে রাতে ঘুমটা ভালো হয়নি।
আমি বললাম,
– আসলে স্যার, একটা জরুরি কথা আছে।
উনি কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
– তোমার সব কথাই জরুরি। অবসর নেওয়ার পর বুঝলাম আমার সবচেয়ে বড় ভুল কী ছিল।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
– কী ভুল স্যার?
সুমন স্যার ওনার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হালকা হাসি টেনে বললেন,
– তোমার মতো পুলিশ অফিসারের পাল্লায় পড়েছি বলেই একবিন্দু শান্তিতে অবসর জীবন কাটানোর সৌভাগ্য হচ্ছে না।
আমি হেসে ফেললাম। ওনাকে বললাম,
– স্যার, সেটা তো আপনারই দোষ। আপনি যদি এত ভালো তদন্ত না করতেন, তাহলে আমি আপনার কাছে ছুটে আসতাম কেন?
স্যার মাথা নেড়ে বললেন,
– ভুল বলছ, ধর। তুমি আসো কারণ তুমি জানো আমি তোমাকে না বলতে পারি না।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তবে, এবার একটু গম্ভীর হয়ে স্যার বললেন,
– বলো, কী খবর?
আমি ব্যাগ থেকে ফাইলটা বের করে টেবিলের ওপর রেখে বললাম,
– স্যার, মনে হচ্ছে আমরা শেষ মানুষটার নাম পেয়ে গেছি।
উনি ফাইলটা খুলে প্রতিটা পাতা পড়তে শুরু করলেন এবং কয়েক সেকেন্ড পরেই ওনার চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফিরে এলো।
– হুম!
আমি বললাম,
– দেবব্রত লাহিড়ী।
সুমন স্যার ধীরে ফাইলটা বন্ধ করলেন। তারপর বললেন,
– তাহলে শেষ অঙ্ক শুরু হয়ে গেছে।
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,
– স্যার?
উনি শান্ত গলায় বললেন,
– যদি আমার ধারণা ঠিক হয়, তাহলে অরুণাভ এখানেই আসবে, ধর।
আমি ধীরে ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– মানে আমরা এখন অপেক্ষা করব?
কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে সুমন স্যার জবাব দিলেন,
– না, ধর। আমরা তাকে অপেক্ষা করাবো। এবার ফাঁদ পাতার সময় হয়ে গেছে।
আমরা দুজনে আর সময় নষ্ট করলাম না। লালবাজারে পৌঁছে কিংশুকবাবুকে সঙ্গে নিয়ে ডিসিপি সাহেবের কেবিনে আলোচনায় বসলাম। সবকিছু খুলে বলার পর দেখলাম উনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন,
– অরুণাভের কেসের সময় দেবব্রত লাহিড়ী ছিলেন সেই হাসপাতালের সুপার। আর এখন? এখন তিনি শহরের অন্যতম বড় হাসপাতাল চেইন মেডিলাইফ গ্রুপের মালিকদের মধ্যে একজন।
ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সুমন স্যার গম্ভীর ভাবে বললেন,
– ধর, ওই সময়কার তদন্ত রিপোর্টটা আবার পড়ো।
আমি দ্রুত পাতাগুলো উল্টাতে লাগলাম এবং একটা জায়গায় এসে থেমে গেলাম। স্যারকে বললাম,
– এখানে লেখা আছে তদন্তের আগে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ কমিটি একটা রিপোর্ট তৈরি করেছিল।
ডিসিপি সাহেব এর মাঝেই বলে উঠলেন,
– তারপর কি হয়েছিল, ধর?
– সেই রিপোর্টে অরুণাভকে দোষী বলা হয়।
সুমন স্যার আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
– আর সেই কমিটি কার অধীনে কাজ করত?
আমি উত্তর দিলাম,
– দেবব্রত লাহিড়ীর।
আমি আর সুমন স্যার বাদে বাকি দুজন অর্থাৎ ডিসিপি সাহেব এবং কিংশুকবাবু বুঝে গেলেন যে এই গল্পের শেষ মানুষটা সম্ভবত তিনিই। সুমন স্যার চুপচাপ বসে ছিলেন। তারপর ধীরে বললেন,
– খেয়াল করার মতো একটা বিষয় হচ্ছে, যাদের মারা হয়েছে তারা সবাই কোনো না কোনো ভাবে হাসপাতাল সম্পর্কিত দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
আমি দ্রুত তালিকাটা খুলে আরেকবার মিলিয়ে দেখলাম। রঞ্জন পাল, শর্মিলা দেবী, ড. সত্যব্রত এবং অমল ভট্টাচার্য এই চারজনই কোনো না কোনো অপরাধের অংশ।
কিংশুকবাবু তখন বললেন,
– তাহলে বাকি থাকলেন একজনই।
আমি নিচু গলায় বললাম,
– হ্যাঁ, দেবব্রত লাহিড়ী।
সুমন স্যার সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন,
– আর তাই অরুণাভের প্রতিশোধের গল্প শেষ করতে গেলে তাকে মরতে হবে।
কথাটা শুনে কেবিনে উপস্থিত আমরা প্রত্যেকেই চুপ করে ছিলাম। কারণ আমরা সবাই জানতাম, এই দেবব্রত লাহিড়ী শুধু একজন হাসপাতাল মালিক নন। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী মানুষ। রাজনীতি থেকে ব্যবসা, প্রায় সব ক্ষেত্রেই তার ভালো যোগাযোগ রয়েছে।
সেই সন্ধ্যেতেই আমরা দেবব্রত লাহিড়ীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তার অফিসটা শহরের মাঝখানে এক বিশাল বিল্ডিংয়ের উপরতলায়। তিনি আমাদের খুব ভদ্রভাবে বসালেন এবং হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
– পুলিশ অফিসাররা আমার অফিসে এলে সাধারণত ভালো খবর থাকে না।
আমি তাকে সরাসরি বললাম,
– মিঃ লাহিড়ী, আমরা একটা পুরনো কেস নিয়ে তদন্ত করছি।
তিনি ভ্রু তুলে বললেন,
– কোন কেস?
আমি বললাম,
– অরুণাভ সেনের কেস।
এই নামটা শুনেই তার চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য একটা ছায়া নেমে এলো। যদিও তিনি খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর বললেন,
– অনেক পুরনো ঘটনা।
সুমন স্যার শান্ত ভাবে তার উদ্দেশ্যে বললেন,
– কিন্তু তার প্রভাব এখনো শেষ হয়নি।
মিঃ লাহিড়ী ধীরস্থির ভাবে বললেন,
– আমি বুঝতে পারছি না।
আমি তখন তাকে বুঝিয়ে বললাম,
– গত কয়েক মাসে কয়েকজন মানুষ মারা গেছেন। যারা কোনো না কোনো ভাবে হাসপাতাল সম্পর্কিত দুর্নীতির কেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কথাটা শুনে তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর একটু গম্ভীর গলায় বললেন,
– আপনি কি বলতে চাইছেন, আমি কোনো দুর্নীতির কেসের সঙ্গে যুক্ত? আর কেউ আমাকে মারতে আসবে?
সেই মুহূর্তে সুমন স্যার তাকে বললেন,
– সম্ভাবনা আছে।
মিঃ লাহিড়ী প্রথমে বিষয়টা খুব গুরুত্ব দিতে চাইছিলেন না। কিন্তু আমরা যখন সব তথ্য সামনে রাখলাম, তখন তার মুখের ভাব বদলে গেল। শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন,
– আমি মানছি একটা ছোট ভুল করে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমি মরতে চাই না অফিসার, আপনারা আমাকে বাঁচান।
সুমন স্যার তার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন,
– মিঃ লাহিড়ী, আপনাকে বাঁচানোর জন্যই আমরা এখানে এসেছি। কিন্তু তার জন্য আপনাকে আগে সারেন্ডার করতে হবে।
মিঃ লাহিড়ী কিছুক্ষণ দ্বিধায় চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,
– বেশ, তা না হয় করব। কিন্তু আপনারা কী করবেন?
সুমন স্যার এক মুহূর্তও দেরি না করে বললেন,
– আমরা তাকে ধরব।
কিংশুকবাবু তার বরাবরের স্বভাব মতো কথার মাঝেই প্রশ্ন করে বসলেন,
– কীভাবে?
সুমন স্যার তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– সে নিজেই আসবে।
আসলে পরিকল্পনাটা ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আমাদের হাতে তখন আর কোনো উপায়ও ছিল না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম খুনিকে বের করে আনতে হলে তাকে প্রলুব্ধ করতেই হবে। সেইজন্য দেবব্রত লাহিড়ীকে আমরা তারই একটি হাসপাতালে ভর্তি করালাম। অফিসিয়ালি খবর ছড়িয়ে দেওয়া হলো যে তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয়েছে, তাই তাকে আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবটা ছিল অন্যরকম। আইসিইউর নিরাপত্তা ইচ্ছাকৃতভাবেই একটু ঢিলে করে দেওয়া হলো। কিছু ক্যামেরা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলো আর নাইট শিফটেও লোকসংখ্যা কম রাখা হলো। সবকিছু এমন ভাবে সাজানো হলো যাতে বাইরে থেকে মনে হয় যে টার্গেট প্রায় অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে। আসলে আমরা অপেক্ষা করছিলাম খুনি কখন নিজের শিকার নিতে আসে।
আমি সুমন স্যারকে নিজের মনে জাগা প্রশ্নটা করব কি করব না, এই দ্বিধায় কিছুক্ষণ ছিলাম। শেষে আর চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেললাম,
– আচ্ছা স্যার, যদি সে না আসে?
সুমন স্যার আমার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন,
– প্রতিশোধের গল্পে শেষ অধ্যায় কেউ মিস করে না, ধর।
সেই রাতটা ছিল অদ্ভুত রকম শান্ত। আমি, কিংশুকবাবু এবং সুমন স্যার হাসপাতালের এক ফাঁকা কন্ট্রোল রুমে বসেছিলাম। সেখান থেকে আইসিইউর কয়েকটা গোপন ক্যামেরার ফুটেজ দেখা যাচ্ছিল।
ঘড়ির কাঁটা তখন বলছে রাত দুটো পঁয়তাল্লিশ। কেউ কথা বলছিল না, হাসপাতালের করিডোর প্রায় ফাঁকা। মনিটরের আলোয় আইসিইউর ভেতরটা অদ্ভুত ঠাণ্ডা লাগছিল। দেবব্রত লাহিড়ী বেডে শুয়ে আছেন, তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক।
কিংশুকবাবু নিচু গলায় মনে জাগা কৌতূহল থেকেই জিজ্ঞেস করলেন,
– স্যার, যদি সে আমাদের ফাঁদটা বুঝে যায়?
সুমন স্যার চোখ না সরিয়েই বললেন,
– সে বুঝলেও আসবে।
– কিন্তু কেন?
– কারণ এই মানুষটা তার গল্পের শেষ পাতা।
যাই হোক, রাত ঠিক তিনটে নাগাদ করিডোরের এক ক্যামেরায় হঠাৎ নড়াচড়া ধরা পড়ল। আমি সঙ্গে সঙ্গে সামনে ঝুঁকে মনিটরের দিকে তাকালাম এবং দেখলাম, একটা ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। লোকটার মাথায় ক্যাপ, মুখটা প্রায় পুরোপুরি ছায়ার আড়ালে ঢাকা। হাঁটার ভঙ্গিটা অদ্ভুত রকম ধীরে, যেন সে জানে ঠিক কোথায় যেতে হবে এবং কোন দরজার সামনে থামতে হবে।
আমরা সবাই নিশ্বাস আটকে তাকিয়ে ছিলাম মনিটরের দিকে। কিংশুকবাবু খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বললেন,
– এসে গেছে।
আমার বুকের ভেতর তখন ধকধক করছে। মনিটরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, লোকটা আইসিইউর দরজার সামনে এসে থামল এবং চারপাশটা তাকিয়ে একবার দেখে নিল। তারপর একটুও তাড়াহুড়ো না করে, দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ঘরের আলো তখন খুবই কম। সে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে অক্সিজেন প্যানেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল সেখানে, যেন শেষবারের মতো সবকিছু যাচাই করছে। তারপর ধীরে হাত বাড়াল ভালভের দিকে।
ওই মুহূর্তে সুমন স্যার অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন,
– এখন।
নির্দেশ পাওয়া মাত্র আমি চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম এবং দরজার দিকে দৌড়ে গেলাম। ওদিকে, আইসিইউর ভেতরে সেই ছায়ামূর্তি তখনো অক্সিজেন প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাতটা মাত্র ভালভ ছুঁতে যাচ্ছে। আর ঠিক সেই সময় আমরা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

১০.
ঘরের ভেতর তখন শুধু মনিটরের সবুজ রেখা ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। বেডে শুয়ে আছেন দেবব্রত লাহিড়ী, মুখে তার অক্সিজেন মাস্ক। আর ঠিক অক্সিজেন প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষটা, যার হাত তখন ভালভের ওপর।
আমাদের ঢোকার শব্দে সে থেমে গেল। আমি আর দেরি না করে চিৎকার করে উঠলাম,
– হাত সরাও!
লোকটা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়াল। হ্যাঁ, এই মানুষটাকেই আমরা এতদিন ধরে খুঁজছিলাম।
কিংশুকবাবু পিস্তল তুলে বললেন,
– এক ইঞ্চি নড়বে না!
লোকটা ধীরে ধীরে হাতটা নামিয়ে ফেলল এবং খুব শান্ত ভাবে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে। আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে বললাম,
– অরুণাভ সেন?
সে হালকা হেসে বলল,
– এতদিন পরে কেউ আবার আমার নাম ধরে ডাকল।
ওই মুহূর্তে তার মুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ কিন্তু চোখ দুটো অদ্ভুত রকম শান্ত। আমি হাতকড়া বের করে তার উদ্দেশ্যে বললাম,
– তোমাকে গ্রেফতার করা হবে, অরুণাভ।
কথাটা শুনে সে আবার হালকা করে হাসল। তারপর খুব শান্ত ভাবে নিজের হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে দিল, কোনোরকম বাধা দিল না। আমি এগিয়ে গিয়ে তার কব্জিতে হাতকড়া পরিয়ে দিলাম।
এদিকে, সুমন স্যার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। ওনার চোখ তখন অরুণাভের মুখের দিকে স্থির হয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড উনি কিছু বললেন না, শুধু তাকিয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
– তুমি জানতে আমরা এখানে আছি?
অরুণাভ ধীরে মাথা নাড়ল।
– হুম, জানতাম।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
– তাহলে এসেছ কেন?
প্রশ্নটা শুনে অরুণাভ একবার দেবব্রত লাহিড়ীর দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত শীতলতা। সে বলে উঠল,
– কারণ আমার গল্প এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।
ঘরের ভেতর সঙ্গে সঙ্গে নীরবতা নেমে এলো। এরপর আমরা তাকে আইসিইউর মধ্যে থাকা একটি চেয়ারে বসালাম। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন কিংশুকবাবু আর সুমন স্যারের সঙ্গে আমি দাঁড়িয়ে রইলেন টেবিলের পাশে।
অরুণাভ চুপচাপ বসে আছে। তার মুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব। কয়েক সেকেন্ড কেউই কিছু বললাম না আমরা। শেষ পর্যন্ত সুমন স্যারই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। শান্ত গলায় বললেন,
– তুমি জানো, তোমার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?
অরুণাভ হালকা মাথা নাড়ল।
– হ্যাঁ, জানি। চারটে খুন আর একটা পরিকল্পনার।
স্যার বললেন,
– তাহলে তুমি স্বীকার করছ?
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল,
– আমি কাউকে খুন করতে চাইনি।
আমি অবাক হয়ে বলে উঠলাম,
– তাহলে?
সে উত্তর দিল,
– আমি শুধু তাদের সেই অনুভূতিটা দিতে চেয়েছিলাম।
– কোন অনুভূতি?
স্যার তাকে জিজ্ঞেস করতেই অরুণাভের স্পষ্ট উত্তর,
– যখন কেউ নিশ্বাস কেড়ে নেয়।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। সুমন স্যার স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
– শুরু থেকে বলো, অরুণাভ। আমরা সাত বছর আগের ঘটনাটা শুনতে চাই।
অরুণাভ একটু মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
– স্যার, সাত বছর আগে আমি দক্ষিণ কলকাতার ওই সরকারি হাসপাতালে রেসপিরেটরি টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করতাম। আমি জানতাম কীভাবে পুরো অক্সিজেন সিস্টেমটা কাজ করে, কোথায় কোন ভালভ, কোথায় ব্যাকআপ লাইন।
সে এক মুহূর্ত থামল, যেন স্মৃতির ভেতর ডুব দিয়েছে।
– এক রাতে একটা অপারেশন চলছিল এবং হঠাৎ করেই অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি মেইন লাইনের ভালভটা বন্ধ। ফলে, আমি সঙ্গে সঙ্গে সেটা খুলে দিই কিন্তু ততক্ষণে রোগী মারা গেছে।
অরুণাভ একটু থামতেই আমি আর নিজেকে সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম,
– তারপর?
সে ধীরে মাথা তুলল। ঠোঁটে একফোঁটা হাসি ফুটল কিন্তু সেই হাসির মধ্যে বিন্দুমাত্র আনন্দ নেই। সে বলল,
– তারপর খুব সহজ একটা কাজ হলো। সবাই একজন দোষী খুঁজে পেল।
একটু থেমে সে শান্ত গলায় বলল,
– আর সেই দোষী ছিলাম আমি।
কিংশুকবাবু কথাটা শুনে গম্ভীর গলায় দরজার সামনে থেকেই বললেন,
– খুব স্বাভাবিক। কারণ সিস্টেমের দায়িত্বে তো তুমিই ছিলে।
অরুণাভ ধীরে মাথা নাড়ল।
– হ্যাঁ। কিন্তু আমি জানতাম ভালভটা কে বন্ধ করেছিল।
ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। আমরা সবাই একে অপরের দিকে তাকালাম আর তার মাঝেই সুমন স্যার অরুণাভকে জিজ্ঞেস করলেন,
– কে?
অরুণাভের চোখে তখন যেন আগুনের মতো কিছু জ্বলছে। সে বলল,
– হাসপাতাল।
আমি ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালাম। কথাটার মানে ঠিক বুঝতে পারলাম না তাই জিজ্ঞেস করলাম,
– মানে?
অরুণাভ এবার একটু সামনে ঝুঁকে বসে বলল,
– সেদিন একটা বড় ভুল ঢাকতে গিয়ে ওরা ইচ্ছে করেই সিস্টেম বন্ধ করেছিল। অপারেশনের সময় রোগীকে ভুল ডোজ দেওয়া হয়েছিল। সেই ভুলেই রোগীটা মারা যেত কিন্তু যদি বলা যায় যে অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে, তাহলে দোষটা পড়বে মেশিনের ওপর। আর সেই মেশিনের দায়িত্বে ছিলাম আমি।
আমরা কথাটা খুব মন দিয়ে শুনছিলাম। অরুণাভ থামতেই আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম,
– আর সেই দোষ পড়ল তোমার ওপর।
অরুণাভ বলল,
– হ্যাঁ, স্যার। তারপর তদন্ত শুরু হলো এবং সবাই জানত সত্যি কী অথচ কেউ মুখে সেটা বলল না। ডাক্তার চুপ, প্রশাসন চুপ, বোর্ড চুপ। শেষে রিপোর্টে লেখা হলো যে রোগীর মৃত্যু হয়েছে টেকনিক্যাল নেগলিজেন্স-এ।
সুমন স্যার তাকে ফের প্রশ্ন করলেন,
– তারপর তুমি আত্মহত্যা করলে?
অরুণাভ হালকা হাসল।
– না।
– তাহলে?
– আমি পালিয়ে গেলাম। আসলে আমি বুঝে গেছিলাম যে সত্যি কেউ জানতে চায় না। কিন্তু আমি জানতাম কার জন্য সবাই মিথ্যে বলেছে।
ওই মুহূর্তে সুমন স্যার তার দিকে একটু এগিয়ে এসে বললেন,
– তাই তুমি এমন কয়েকজন মানুষের একটা তালিকা বানালে, যারা বিভিন্ন হাসপাতালে এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। আর সেই তালিকার শেষ নামটা রাখলে দেবব্রত লাহিড়ীর।
সে আবার মাথা নাড়ল।
– হ্যাঁ, ঠিক তাই। কারণ আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের সব সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত দেবব্রত লাহিড়ীরই ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
– কিন্তু বাকিদের তুমি ওই একইভাবে মেরেছ কেন?
সে বলল,
– কারণ মানুষের নিশ্বাস যখন টানা সাত মিনিট ধরে বন্ধ থাকে, তখন মৃত্যুর কোলে মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে, সেটা আমি তাদের অনুভব করাতে চেয়েছিলাম।
সুমন স্যার এবার গম্ভীর হয়ে বললেন,
– তুমি জানো, এটা কত বড় অপরাধ?
অরুণাভ মাথা নাড়ল।
– হ্যাঁ, জানি। কিন্তু তারাও যে অপরাধী সুতরাং আইন তাদের শাস্তি না দিলেও, আমি দিয়েছি।
কিছুক্ষণ পরে সুমন স্যার তাকে ফের জিজ্ঞাসা করলেন,
– কিন্তু অরুণাভ, তুমি আজ ধরা পড়তে চাইলে কেন?
সে দেবব্রত লাহিড়ীর দিকে তাকিয়ে বলল,
– কারণ সব গল্পের একটা সমাপ্তি থাকে। আর সেটা আজই হওয়ার ছিল।
এটাই ছিল অরুণাভের শেষ কথা। এরপর আর সে কিছু বলেনি। কিছুক্ষণ পর তাকে এবং দেবব্রত লাহিড়ীকে লালবাজারে নিয়ে আসা হলো।
কিংশুকবাবু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর সুমন স্যারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
– স্যার, আমরা কি ঠিক কাজ করলাম?
সুমন স্যার তখন দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বাইরের আলো ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে পড়ছিল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর স্যার বললেন,
– হ্যাঁ, আমরা আমাদের কাজ করেছি। একজন অপরাধীকে দিয়েই আরেকজন অপরাধীকে ধরেছি। আইনের চোখে আজ তারা দুজনেই অপরাধী।
কয়েক সপ্তাহ পরে কেসটা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো। অরুণাভ সেন এখন বিচারবিভাগীয় হেফাজতে এবং দেবব্রত লাহিড়ীর বিরুদ্ধে বহুদিনের পুরনো মামলাটাও আবার নতুন করে খোলা হয়েছে।
সেদিন পড়ন্ত বিকেলে আমি যখন সুমন স্যারের ফ্ল্যাটে গেলাম, উনি বারান্দায় বসে ছিলেন। সামনে শহরের আলোগুলো জ্বলতে শুরু করেছে।
আমি ঠোঁটে সামান্য হাসি নিয়ে বললাম,
– স্যার, ডিসিপি সাহেব আমাদের কাজে খুব খুশি হয়েছেন। কেসটা ভালো মতোই শেষ করা গেল তাহলে, কী বলেন?
সুমন স্যার আমার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন এবং একইসঙ্গে বললেন,
– যতক্ষণ না আদালত তার রায় দিচ্ছে, ততক্ষণ কোনো কেসই পুরোপুরি শেষ হয় না, ধর।
আমি একটু অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকালাম। উনি তখনো দূরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন,
– আর কখনো কখনো আদালত রায় দেওয়ার পরেও, গল্পটা শেষ হয় না। কারণ সত্যিটা অনেক সময় রায়ের থেকেও বড় হয়ে থাকে।
আমি আর কিছু বললাম না। কারণ সুমন স্যারের কথায় এটা স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারলাম যে এই শহরে সব গল্পের শেষটা আদালতের রায়ে লেখা হয় না। অনেক সত্যি কাগজে ওঠে না, অনেক অন্যায়ের পূর্ণ বিচারও হয় না। তবুও আমাদের আইনের পথেই হাঁটতে হবে। কারণ সেই পথ যদি আমরা ছেড়ে দিই, তাহলে একদিন ন্যায় আর প্রতিশোধের মাঝের সীমারেখাটা সম্পূর্ণ মুছে যাবে।
বারান্দার সামনে তখন রাস্তার আলোগুলো সম্পূর্ণভাবে জ্বলে উঠেছে, দূরে কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ভেসে আসছে। শহর যেন আবার নিজের মতো করে চলতে শুরু করেছে। কিন্তু আমরা দুজনেই জানি, এই শহরে এখনো অনেক গল্প লুকিয়ে আছে। এমন গল্প, যেগুলো একদিন আবার আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে।

লেখক পরিচিতি :
পশ্চিমবঙ্গের জেলা হাওড়ায় জন্ম, রণিত ভৌমিক পেশায় একটি বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত হলেও, হৃদয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় একজন লেখক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ই-ম্যাগাজিনে লেখালেখির পাশাপাশি, ইউটিউবের নানা অডিও স্টোরি চ্যানেলে তাঁর লেখা গল্প শ্রোতাদের কাছে প্রশংসিত। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর বেশ কিছু বই দুই বাংলার পাঠকমহলে সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়াও বড়দের জন্য লেখা একাধিক উপন্যাস ও গল্পসংকলন ভারত, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশিত তাঁর লেখা দুটি বই ‘সমুদার গোয়েন্দাগিরি’ ও ‘ক্রাইম ফাইলস: কেসেস অফ সিরিয়াল কিলিং’।

Read Previous

‘পূর্বসূরি ও উত্তরসাধক’ আনোয়ার হোসেন পিন্টু : আমাদের অহংকার

Read Next

একটি ভ্রমণ কাহিনি

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *