
বাংলা কবিতার বাঁক বদল : উৎস থেকে নিরন্তর
অনন্ত পৃথ্বীরাজ
বাংলা কবিতার ইতিহাস প্রায় দেড় হাজার বছরের। বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন চর্যাপদের রচনাকাল সপ্তম শতক। এ-সময় থেকে সামুদ্রিক ঝড়ো-হাওয়ায় ঘূর্ণিস্রোতের মতো বাংলা কবিতা বহু বক্রপথ অতিক্রম করে বর্তমান সময়ে এসে থিতু হয়েছে। এখনো কবিতা নিয়ে প্রতিনিয়ত চলছে নানাপ্রকার ভাঙাগড়ার খেলা। দ্রোহ ও বিদ্রোহের কথা বাদ দিয়ে যদি শুধু যদি কাব্য-সৌন্দর্যের কথা বলি তবে, এক অর্থে কবিতা দীক্ষিত হয়েছে প্রকৃতি ও মরমীধ্যানের সমীকৃত অনুপ্রেরণায়। সময়ের সাথে সমাজ-মানুষের মতো কবিতার শরীর, আঙ্গিক ও প্রকরণের ক্ষেত্রে নানাবিধ পরিবর্তন ঘটেছে। দেব-দেবী নির্ভর কাব্যকলার পরিবর্তে আধুনিক সময়ে সাহিত্যে স্থান পেয়েছে লোকায়ত ধারার অসাম্প্রদায়িক জীবনচেতনা। বৈষ্ণব পদাবলী, শ্রীচৈতন্য দেবকে নিয়ে রচিত জীবনী সাহিত্য, নাথ-সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য ধারা, রোমান্টিক প্রণায়োপাখ্যান, লোকসাহিত্য ও অনুবাদ সাহিত্য-র অত্যুজ্জ্বল পথ পাড়ি দিয়ে ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের (১৭১২-১৭৬০) মাধ্যমে শেষ হয় মধ্যযুগের কাব্যধারার গতি-প্রকৃতি। গুপ্ত কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে (১৮১২-১৮৫৯) বলা হয় আধুনিক যুগধারার প্রথম কবি ও জ্ঞানসাধক। আধুনিক যুগের লক্ষণাক্রান্ত ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায় মধ্যযুগের কাব্য-উপাদানের সংমিশ্রণ ছিল। তাই তিনি ‘যুগসন্ধিক্ষণের কবি’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ঈশ্বর গুপ্তের হাত ধরে আধুনিক বাংলা কাব্যধারার নয়া বাঁকবদল শুরু হয়। উনিশ শতকে ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্য-বিপ্লবের প্রভাবে বাংলা কবিতার নতুন গতিপথ বিনির্মাণের জন্য ইংরেজি জানা তরুণ কবিদের মধ্যে এক ধরনের রেনেসাঁসের অনুভূতির জন্ম হয়। ইংরেজ সিভিলিয়ানদের বাংলা শেখানোর জন্য কোলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত) স্থাপন; বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশের ধারায় একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এ-সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নবজাগরণের দ্বার উন্মোচিত হয়। ঠিক তখনই আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রবাদপুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩) আবির্ভাব।
দুই.
বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। মাইকেল মধুসূদন দত্তের তিলোত্তমাসম্ভব (১৮৫৯) ও মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা কবিতায় নবযুগের সূচনা হয়। প্রচলিত কাব্যধারার বাইরে গিয়ে তিনি বাংলা কবিতার বিষয় ও প্রকরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বাংলা কাব্যে আগমন ঘটে আধুনিক গীতিকবিতার ধারাস্রষ্টা ‘ভোরের পাখি’ খ্যাত বিহারীলাল চক্রবর্তীর (১৮৩৫-১৮৯৪)। বিহারীলাল চক্রবর্তী গীতিকবিতায় বাংলা লিরিকের উদ্গাতা হিসেবে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রক্ষা করেছেন। ‘বিহারীলাল যেমন করে যুগ ঝঞ্ঝার মাঝেখানে বসে যুগ-প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করেছিলেন, তাঁর ভেতর দিয়ে যেমন সেকালে নতুন করে বাংলা গীতিসুর অনুরণিত হয়েছিল, জসীমউদ্দীনও তাঁর যুগের যত কিছু উত্তাপ ও উত্তেজনা থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে সরে গিয়ে পূর্ব-বাংলার প্রাণকেন্দ্র গ্রামগুলোর নিঝুম অন্তপুরে আপনাকে স্থাপন করেতে পেরেছিলেন।’১ তবে বাংলা কবিতা সত্যিকারভাবে সাফল্যের চূড়ায় আরোহন করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) হাত ধরে। প্রেম ও প্রকৃতির উপাসক কবি রবীন্দ্রনাথ চেতনায় ও মননে ছিলেন গীতিময় ও নাগরিক। এ-সময় বরীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে অনেকে কবি হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ হন কবিদের গুরু। তাঁকে সম্মান করে ডাকা হতো ‘গুরুদেব’ বলে। বিশ শতকের শুরুতে রবীন্দ্র যুগের (১৯০০-১৯৪১) সূচনা হয়। নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিভার সাক্ষর রেখে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২), মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) প্রমুখ কবি হয়ে ওঠেন সমকালীন সময়প্রেক্ষিতে এক-একটি অনিবার্য নাম। বিশ শতকের প্রথম দিকে ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮)-এর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, জাতীয়তাবাদের উত্থান, স্বদেশী আন্দোলন ও সংগ্রাম বাংলা সাহিত্যে ভাবালুতার অবসান ঘটায়। কবিতায় রোমান্টিকতার মোড়কে বিদ্রোহ ও সাম্যবাদের পাশাপাশি বিপ্লবী চেতনা নিয়ে আসেন কাজী নজরুল ইসলাম। মহাযুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন ও ফ্যাসিবাদের উত্থানে এ-সময়ের সাহিত্যিকেরা স্থির থাকতে পারলেন না। তাঁরা নবতর ধারায় নিজেদের শাণিত করতে শুরু করেন। শোষিত-নির্যাতিত ও মজলুমের পক্ষে নিপীড়কের বিরুদ্ধে তখন অনেক কবি, লেখককে কলম চালনা করতে দেখা যায়। এঁদের সার্থক প্রতিনিধি ছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা কবিতায় তিনি তুলে ধরলেন পরাধীনতার গ্লানি আর স্বাধীনতার নতুন স্বপ্ন। দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা এবং শাসকপক্ষ কর্তৃক প্রজাসাধরণের ওপর অমানবিক আচরণ, অত্যাচার ও নিগ্রহের বিরুদ্ধে নজরুলের কলম ঝলসে উঠেছিল। সকল অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরায় নজরুল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে খেতাপ পেলেন। তার অগ্নিবীণা (১৯২২) কাব্যে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি (২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ, সাপ্তাহিক বিজলি পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত) বাংলার শোষিত-নির্যাতিত প্রজাসাধরণকে তুমুলভাবে আন্দোলিত করেছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন,
বল বীর-
বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর-
আমি চির-উন্নত শির!
[‘বিদ্রোহী’, অগ্নিবীণা]
তিন.
বিশ শতকের প্রথম দিকে নিজেদের স্বরূপ ও আত্মানুসন্ধান করতে গিয়ে একদল কবি গ্রামীণ প্রকৃতির কাছে ছুটে যান। তাঁরা গ্রামের মানুষের জীবনবোধ নিয়ে কবিতা রচনা করেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন যতীন্দ্রমোহন বাগচী (১৮৭৮-১৯৪৮), কুমুদরঞ্জন মল্লিক (১৮৮৩-১৯৭০), করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৫৫), কালিদাস রায় (১৮৮৯-১৯৭৫), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯), জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) প্রমুখ। এ-সকল কবিদের মধ্যে জসীমউদ্দীন ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি পল্লির নিভৃতকোণে বসে রাখালের বাঁশির সুরে বিমোহিত পথিকের মন নিয়ে রচনা করতে থাকেন একের পর এক লোকপ্রিয় গান—যা ‘পল্লিগীতি’ নামে পরিচিত। বাংলা কবিতায় জসীমউদ্দীনকে বলা হয় ঋতুবদলের কবি। ‘তিনিই আধুনিক কাব্যে উপেক্ষিত পল্লীকে নতুন আঙ্গিকে মহিমা দান করে বাংলার প্রাচীন ও নবীন ধারার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। সমকালীন কাব্যাদর্শের কাছে তা ব্যতিক্রমধর্মী ছিল।’২ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও পল্লিকবি জসীমউদ্দীন ছিলেন সমসাময়িক। একই কালপরিসরে বেড়ে ওঠা দুই কবির কবিতার ভাষা, বিষয়বস্তু, শিল্পপ্রকরণ ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ছিল ভিন্ন ধারার। এ সম্পর্কে সমালোচকের মন্তব্য :
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) এক্ষেত্রে রবীন্দ্রবলয়েই থেকে প্রকরণ ভিন্নতায় ও প্রবল সামাজিক দায়বদ্ধতায় নিজেকে লোকপ্রিয় করে তোলেন। নজরুলের জনপ্রিয়তা ছিল অত্যুঙ্গস্পর্শী। প্রবল মেধার দীপ্তি ও আবেগের অসংযত ঝংকারে ইমেজ সৃষ্টির বদলে কবিতাকে আনেন সাধারণ মানুষের কাতারে। শ্লোগানস্পর্ধী স্বর কিংবা সমাজ-রাষ্ট্রের শোষণ ও অসাম্যের প্রতি উচ্চনাদী আক্ষেপ তাঁর কবিতার শুদ্ধতার মাত্রাকে লঙ্ঘন করেছে। তবুও নজরুলের কাব্যমেধা বাংলা সাহিত্যে অতুল সম্পদ বলেই বিবেচ্য। এ-ছাড়া পল্লিকবিখ্যাত জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) ও লোকায়ত ধারাকে স্বদীক্ষিত ভাববৈচিত্র্যের বিপুলতায় প্রোথিত করেছেন। বাংলা কবিতায় কাহিনিকাব্য বা আখ্যানকাব্য ধারাকে ব্যতিক্রম করে পরিবেশন করেছেন জসীমউদ্দীন। আধুনিকতার রূপটি লোকায়ত ধারায় মূলত তিনিই সুচারুরূপে প্রবিষ্ট ও জনপ্রিয় করেছেন।৩
চার.
তিরিশের দশক বাংলা কবিতার বাঁক বদলের কাল। এ-সময় বাংলা কাব্য সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে এক ঝাঁক তরুণ কবির। তাঁরা কেবল কবিতার আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষাই করেননি; কবিতার প্রকরণের ক্ষেত্রের ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। সহস্র বছরব্যাপী চলে আসা বাংলা কবিতার ধারায় গীতল আনন্দবাদী চেতনাগত ধারার পরিবর্তে এ-সময় প্রকাশ পায় চৈত্রের খড়খড়ে রোদের মতো জীবনের রূঢ় বাস্তবতা। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাগ্রসর ছিলেন জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। এই ধারার অন্য কবিগণ হলেন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), অজিত দত্ত (১৯০৭-১৯৭৯), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২), সঞ্জয় ভট্টাচার্য (১৯০৯-১৯৬৯), সমর সেন (১৯১৬-১৯৮৭), আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫), সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯২০-২০০৩), সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ-সকল কবিগণ সচেতনভাবে কবিতার বিষয়, আঙ্গিক, উপমা, রূপকের ক্ষেত্রে নানা বৈচিত্র্য নিয়ে আসেন। ইউরোপীয় কবিতার স্বভাবপুষ্ট হয়ে কবিগণ আধুনিক বাংলা কবিতার নবতর ধারার সূচনা করেন বটে তবে এ-সকল কবির কবিতার বিষয়বস্তু ছিল নগরবাস্তবতা। কোনো কবিই গ্রামকে একেবারে বাদ রেখে কবিতা লিখতে পারেন না। তিরিশের কবিগণ ছিলেন ইংরেজি ভাষায় দীক্ষিত এক একটি অপরিমেয় প্রতিভাধর। তাঁদের কবিতায় গ্রাম এসেছে, তবে তা ইউরোপীয় ধাঁচে, রোমান্টিক প্রেক্ষণবিন্দু থেকে গ্রামকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এ-সময়ের কবিদের অন্যতম প্রবণতা। এ-ছাড়া ধনী-গরিবের ব্যবধান, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, প্রেম ও লিবিডোচেতনা কবিতার পরতে পরতে স্থান করে নিয়েছিল। ফলে কলাকৈলব্যবাদের পাশাপাশি মার্কসবাদ ও ফ্রয়েডিও চেতনার পাশাপাশি লিবিডো চেতনাও অনেক কবির কবিতায় সমান্তরালভাবে অবস্থান নেয়। তাঁদের কবিতায় পল্লিপ্রকৃতি ও জনজীবনের বয়ান থাকলেও তা রোমান্টিক আবহে প্রকাশিত হওয়ার ফলে পল্লিগ্রাম ও সংস্কৃতি তার নিজস্বতা হারিয়েছে। তবে কলকাতা কেন্দ্রীক সাহিত্যচর্চা ছেড়ে এ দশকে বেশ কয়েকজন কবি ঢাকায় চলে আসেন; এবং তাঁরা ঢাকা কেন্দ্রীক সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), আবুল হুসেন (১৯২২-২০১৪) প্রমুখ। তাঁদের সাহিত্যচর্চার মূলমন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’। তাঁরা সমাজের নানা কুসংস্কার, জড়তা, রক্ষণশীলতা দূর করার জন্য মুসলিম সাহিত্য সমাজ (১৯২৬)-এর ব্যানারে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি নতুন আন্দোলন শুরু করেন। তাদের মুখপত্র ছিল ‘শিখা’ (১৯২৭-১৯৩১) পত্রিকা। শিখা পত্রিকার স্লোগান ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ তিরিশের কবিদের মধ্যে সবচেয়ে নিরেট ছিলেন জীবনানন্দ দাশ অথচ বাংলা কাব্যকলায় তিনিই সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল পঠিত কবি হওয়ার খেতাপ লাভ করেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বাংলার প্রকৃতি এবং জনজীবন নিবিড়ভাবে উঠে এসেছে। বাংলার রূপবৈচিত্র্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য পুরাণ তাঁর কবিতায় বিশেষভাবে জায়গা করে নিয়েছে। ‘বনলতা সেন’ (১৩৪৯ বঙ্গাব্দ) কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতায় কবি লিখেছেন,
হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি ; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।
[‘বনলতা সেন’, বনলতা সেন]
বাংলা কবিতার মাইলফলক বলা হয় তিরিশের দশককে। তিরিশের দশকের কবিদের মুখপত্র ছিল কল্লোল (১৩৩০ বঙ্গাব্দ) পত্রিকা। এ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে নবতর কাব্য বিপ্লবের শুরু হয়। ‘কল্লোল’ পত্রিকায় সমকালীন প্রায় শতাধিক কবি কবিতা লিখেছেন। এদের মধ্যে সবাই নন, পাঁচ-ছয়জন তরুণকবি রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘কল্লোলযুগ’ (১৩৫৭) গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়। এ সময় ‘আধুনিক কবিতার সূচনা ও বিকাশে ‘কল্লোল’ ছাড়াও আরও একাধিক পত্রিকার ভূমিকা আছে।’৪ সুরেশ চক্রবর্তীর ‘উত্তরা’ (১৩৩২), মুরলীধর বসু’র ‘কালি ও কলম’ (১৯২৬), বুদ্ধদেব বসু’র ‘প্রগতি’ (১৯২৭), সুধীন্দ্রনাথ দত্তে’র ‘পরিচয়’ (১৯৩১), সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ‘পূর্বাশা’ (১৯৩২), বুদ্ধদেব বস’-র ‘কবিতা’ (১৯৩৫), বিষ্ণুদে’র ‘সাহিত্যপত্র’ (১৯৪৮) প্রভৃতি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে এক-রকম সাহিত্য-আন্দোলন গড়ে ওঠে। ‘কবিরা আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষাজনিত চিৎ-প্রকর্ষের ফলে সম্পূর্ণ নতুন জীবন-দৃষ্টি ও কাব্যবোধের অধিকারী হয়েছিলেন। একদিকে নতুনতর জীবন-জিজ্ঞাসা, যুগচেতনা ও বাস্তবদৃষ্টির পরিচয় দানে, অন্যদিকে কাব্যবস্তুর বৈচিত্র্য-সাধনে, নতুন বাকভঙ্গীর প্রবর্তনায়, অভিনব রূপ-প্রতীকের ব্যবহার নৈপুণ্যে ও কাব্যের দেহে মননের দীপ্তি সঞ্চারে অসাধারণ মৌলিকত্বের পরিচয় দিয়ে এঁরা রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক কাব্যধারার বিরুদ্ধে একটা সাহসিক চ্যালেঞ্জ উপস্থিত করেছিলেন।’৫ এ-সময়ে কবিগণ পল্লি-মানুষের জীবন ও সামাজিক অবস্থার নিবিড় সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। ‘তাই বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে জসীমউদ্দীনও বিহারীলালের মতোই যুগধারার ব্যতিক্রমী কবি হিসেবে অভিনন্দিত। তিনি যুগের কবি নন, কিন্তু জাতির কবি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের যথার্থই রূপায়ণে তাঁর মতো প্রতিনিধি কবি আর নেই। জসীমউদ্দীনের কাব্যে গ্রাম বাংলার সকল জাতির, সকল সম্প্রদায়ের মানুষই সমান মর্যাদায় স্থান লাভ করেছে। পল্লিজীবনকে তার সকল বৈশিষ্ট্যসহ কাব্যে প্রতিষ্ঠা করার মূল শক্তি কবির অকৃত্রিম পল্লিপ্রীতি।’৬ এই ধারার আরও দুইজন কবি হচ্ছেন—বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯) ও রওশন ইজদানী (১৯১৮-১৯৬৭)। এই কবিরা গ্রামীণ জীবনধারা-চালচিত্র, কৃষ্টি, সংস্কৃতি কবিতায় ধারণ করলেও তারা কেউই লোককবি ছিলেন না। তিরিশের কবিদের আর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কবিতায় লিরিকই প্রধান। বেগম সুফিয়া কামালের (১৯১১-১৯৯৯) কবিতায় কোমল মৃদু গুঞ্জিত নারীসত্তার আশ্চর্য প্রকাশ এক সময় রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকেও মুগ্ধ করেছিল। ফররুখ আহমেদ (১৯১৮-১৯৭৪), কাজী কাদের নেওয়াজ (১৯০৯-১৯৮৩)-এর কবিতায় ইসলামের অতীত ঐতিহ্য, ছন্দের ঝংকার, মূর্ছনা লিরিক কবিতার প্রাণ-বীজ বহন করে আনে। ফররুখ আহমেদ তাঁর কবিতায় লিখেছেন,
কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হ’ল জানি না তা’।
নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।
দুয়ারে তোমার সাত-সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।
তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?
সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে জাগে জাহাজ,
অচল ছবি সে তসবির যেন দাঁড়ায়ে রয়েছে আজ।
[‘সাত সাগরের মাঝি’, সাত সাগরের মাঝি]
পাঁচ.
বাংলাদেশের চল্লিশের কবিকুল প্রথম আধুনিকতার সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত করলেন। ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার ধারায় কবি আবুল হোসেন (১৯২২-২০১৪) ছিলেন অন্যতম কাব্যসারথি। তিনি ছিলেন বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রথম আধুনিক কবি। তাঁর মাধ্যমে সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫), সানাউল হক (১৯২৪-১৯৯৩) প্রমুখ কবি প্রবেশ করলেন বাংলা কবিতায়। আধুনিক কবিতার পিছনে শিক্ষা-সংস্কৃতি, মননের যে ভূমিকা কাজ করেছিল তা চল্লিশের কবিরা অর্জন করে নিয়েছিলেন। চল্লিশের দশকে সারা পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলাও ছিলো উত্তাল। এই দশকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনা শুধু ভারতবর্ষকে নয়, বরং সমগ্রবিশ্বকে আলোড়িত করেছিলো। সেগুলো হলো, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫), দুর্ভিক্ষ (১৯৪৩), উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (১৯৪৬-১৯৪৭), দেশবিভাগ (১৯৪৭) প্রভৃতি। এ-সবের ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়ছিল বাংলার জনগণের মননভূমে। এ-সব সমসাময়িক ঘটনা চল্লিশের কবিদের সমাজমুখী ও আত্মসচেতন করেছিল। বাংলায় সমাজতান্ত্রিক কবিতার ধারা এ-সময় গড়ে উঠতে থাকে। এই সমাজ সচেতন কবিদের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট ও সোচ্চার ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর (১৯০৯-১৯৭৫)। সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায় বেশ জোর ছিলো। স্লোগানধর্মী বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষ কবিতাগুলো পড়ে বেশ মজা পেতো। সিকান্দার আবু জাফরের কবিতা তখন হয়ে উঠেছিল একটি আন্দোলনের হাতিয়ার। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলা ছাড়ো’ ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ এবং ‘আশা’-এর মতো বেশকিছু বিখ্যাত কবিতা। ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতায় সিকান্দার আবু জাফর লিখেছেন,
রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয় কণ্ঠনালীর খুন পিয়াসী ছুরি
কাজ কী তবে আগলে রেখে বুকের কাছে কেউটে সাপের ঝাপি
আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি
তুমি আমার আকাশ থেকেও সরাও তোমার ছায়া
তুমি বাংলা ছাড়ো।
[ ‘বাংলা ছাড়ো’ বাঙলা ছাড়ো]
বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যচর্চার সবচেয়ে উজ্জ্বলতম দশক হলো পঞ্চাশের দশক। পঞ্চাশের দশকে সাহিত্যের অন্য শাখাগুলোতে তো বটেই সবচেয়ে বড় ঢলটি নেমেছিল সৃষ্টিশীল কবিতায়। তখন ঢাকায় বাংলা সাহিত্যের নতুন রাজধানী স্থাপিত হয়েছিল। তারপর ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষার জন্য যে তরুণেরা রক্তের অঞ্জলি দিয়েছিলেন, তা উত্তরকালে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের ধমণীতে নিত্য সক্রিয় হয়েছে। ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের রফিক (১৯২৬-১৯৫২), সালাম (১৯২৫-১৯৫২), জব্বার (১৯১৯-১৯৫২), বরকত (১৯২৭-১৯৫২), শফিউল (১৯১৮-১৯৫২), ওহিউল্লাহ (মৃত্যু ১৯৫২) প্রমুখ ছাত্র-জনতা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য নিজেরদের তাজা প্রাণ বিসর্জন দেন। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এ-সময় বাঙালি জাতিসত্তা দানা বাঁধতে শুরু করে। কবি হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩) ভাষা আন্দোলনকে অবিস্মরনীয় করে রাখার জন্য একুশের প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ (১৯৫৩) সম্পাদনা করেন। একুশের প্রথম সংকলনে যে-সকল কবি-সাহিত্যিকের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল-পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যকে মূলত তারাই নেতৃত্ব দেন। বিভাগোত্তর কালে কবিগণ নব-উদ্যমে কবিতাচর্চায় মনোনিবেশ করেন। এ-সময় পঞ্চাশের দশকের কবিদের কবিতাও নতুন করে যুক্ত হতে থাকে আবহমান বাংলার কবিতার সঙ্গে। পঞ্চাশের কবিকুলের মধ্যে যাঁরা দ্যুতি ছড়িয়েছেন তাদের মধ্যে শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬), শহীদ কাদরী (১৯৪২-২০১৬), সাইয়িদ আতীকুল্লাহ (১৯৩৩-১৯৯৮), দিলওয়ার (১৯৩৭-২০১৩), ওমর আলী (১৯৩৯-২০১৫), জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮) প্রমুখ।
স্বদেশ ও সমকাল সংলগ্নতায় পঞ্চাশের কবিরা ছিলেন অনেক বেশি রোমান্টিক ও আধুনিক। শামসুর রাহমানের কবিতা পুরোপুরি রোমান্টিক ধাঁচের। এসব কবিতা ‘নারী ও নিসর্গে নিবেদিত, শব্দ ও ছন্দে ঝংকৃত’। সমগ্রজীবন তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাব্যসাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি আজীবন ছিলেন গণতন্ত্রের পক্ষে, ছিলেন সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পক্ষে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ ও পরবর্তী সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন তাঁর কবিতাকে করেছে অনন্য ও নবচেতনায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় নগর জীবনের যন্ত্রণা, একাকিত্ব, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বন্দি শিবির থেকে’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। কাব্যে শামসুর রাহমান রোমান্টিকতার খোলস ছেড়ে দেশ-কাল ও সমাজের সমকালীন কালপুরুষের দিকে যাত্রা করেছেন। শামসুর রাহমান ছিলেন নাগরিক কবি। শামসুর রাহমান লিখেছেন,
আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে
কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিল কখনো-বা
একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়-ফুল নয় ওরা
শহিদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতি গন্ধে ভরপুর।
একুুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনার রং।
এ-রঙের বিপরীত আছে অন্য রঙ,
যে-রং লাগে না ভালো চোখে, যে-রঙ সন্ত্রাস আনে
প্রাত্যাহিকতায় আমাদের মনে সকাল-সন্ধ্যায়-
এখন সে রঙে ছেয়ে গেছে পথ-ঘাট, সারা দেশ
ঘাতকের অশুভ আস্তানা।
[‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’, নিজ বাসভূমে]
পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। আল মাহমুদের কবিতাতেও প্রথম অবধি নারী ও নিসর্গের সম্মোহন দেখা গেছে; তবে কবিতার প্রকরণে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। পারিপার্শ্বিক সমাজ বাস্তবতা ও গ্রামীণ জীবনের আবহে আল মাহমুদের কবিতা হয়ে উঠেছে সময়ের সমবায়ী স্বতন্ত্রস্বর। প্রথম জীবনে তিনি মাক্সবাদী সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় উজ্জীবিত হলেও পরে তা অস্বীকার করেন। ইসলামী জীবনদর্শন তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও অমিয় সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কবিতায় তার যথেষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। গ্রামীণ জীবন ও লোকজ ঐতিহ্য তাঁর কবিতায় ভিন্নমাত্রা এনে দিয়েছে। আঞ্চলিক শব্দকে তিনি মান্যতা দান করেছেন। আল মাহমুদের কবিতায় মিষ্টিসিজমের সার্থক ব্যবহার রয়েছে। তাঁর কবিতায় ‘নারী’ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আল মাহমুদের কবিতায় নারী’র বিচিত্র রূপের সন্ধান পাওয়া যায়। কবিতায় ‘নারী’ যেন তাঁর কাব্যলক্ষ্মী, প্রেরণাদাত্রী, প্রেম ও রতিক্রিয়ার-সুখসঙ্গী; আবার এই নারীই কবির মানসদেবী। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : লোক লোকান্তর (১৩৭০), কালের কলস (১৩৭৩), সোনালী কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৭৬), অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না (১৯৮০), বখতিয়ারের ঘোড়া (১৯৮৪) প্রভৃতি। এসব কাব্যগ্রন্থের বহুলপঠিত ও জনপ্রিয় কবিতাগুলোর মাধ্যমে আল মাহমুদ তাঁর প্রতিভার স্ফূরণ ও নিজের জাত চেনাতে সক্ষম হয়েছেন। কবি আল মাহমুদ লিখেছেন,
আমাকে দুঃখের চেয়ে নতুন কোনো দাহ কেউ
দিতে পার নি।
আমাকে শোকের চেয়ে সত্য কেউ
বোঝাতে পারল না। আর
কষ্টের চেয়ে কঠোর স্পর্শ কোনোদিন
ছোঁবে না আমাকে।
[‘পিপাসার মুখ’, লোক লোকান্তর]
আল মাহমুদের কবিতায় গ্রাম রোমান্টিক আবহ নিয়ে আসেনি। গ্রামের মানুষের দুঃখ, দারিদ্র্যতা, শোষণের চিত্র অঙ্কন করে কবি পাঠকদের রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করে দিয়েছেন। গ্রামের অতুলনীয় প্রাণশক্তি হচ্ছে তার প্রকৃতি। গাছপালা, পশুপাখি, নদীনালা, মানুষ প্রকৃতির অকৃত্রিম দান। নদী যেন নারীর অন্যরূপ। নদী কবির জন্য নিয়ে আসে নীরব তৃপ্তি। কবির ভাষায়,
কিছুই খুঁজি নি আমি, যতবার এসেছি এ তীরে
নীরব তৃপ্তির জন্য আনমনে বসে থেকে ঘাসে
নির্মল বাতাস টেনে বহুক্ষণ ভরেছি এ বুক।
একটি কাশের ফুল তারপর আঙুলে আমার
ছিঁড়ে নিয়ে এই পথে হেঁটে চলে গেছি। শহরের
শেষ প্রান্তে যেখানে আমার ঘর, নরম বিছানা,
[‘তিতাস’, লোক লোকান্তর]
প্রকৃত অর্থে নাগরিক মানসিকতা, দ্বন্দ্ব ও উল্লাস নিয়ে বাংলা কবিতায় আবির্ভূত হয়েছিলেন শহীদ কাদরী। আধুনিক শহর; তার যন্ত্রণা ও আনন্দ শহীদ কাদরীর রক্তে মিশে আছে। সৈয়দ শামসুল হক পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিরীক্ষাপ্রবণ। তিনি লিরিক থেকে কাব্য নাট্য, গদ্য কবিতা থেকে দীর্ঘ কবিতা- অনেক কিছুই লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে অন্য কবিরা হলেন : কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১), জামালুদ্দীন, ফজলে লোহানী প্রমুখ সাহিত্যিক। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩) সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫৩) নামক ঐতিহাসিক সাহিত্য সংকলনে। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তি ছিলো এ রকম :
সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায়
বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল।
তপ্তশ্বাস হাহুতাশ পাতাঝরা বিদীর্ণ বৈশাখীর জ্বালাকর দিনের দিগন্তে
আষাঢ়ের পুঞ্জীভূত কালো মেঘ আসবেই ঠিক।৭
ছয়.
ষাটের দশকের কবিতাকে দু’ভাগে ভাগ করা যায় : এক, নান্দনিক নিরীক্ষাধর্মী কবিতাÑযেটি ‘স্বাক্ষর’ গোষ্ঠী করেছেন; দুই, নান্দনিক কবিতা মিশ্রিত জাতীয়তাবাদী সামাজিক কবিতা- যেটি মধ্যষাটে আরম্ভ হয়েছে এবং যার পরিণতি পাওয়া যায় ’৬৭ থেকে ’৬৯-এ।৮ ষাটের দশকের কবিরা বাংলা কবিতায় আলাদা ভূগোল তৈরি করতে সক্ষম হন। তারা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গ যেমন : যৌনতা, নৈরাশ্য, বিবমিষা, অবিশ্বাস প্রভৃতি কবিতার ফর্মে আবদ্ধ করলেন। প্রকরণেও দেখা দিল বীজময় বিদ্রোহ। ‘স্বাক্ষর’ (১৯৬৩) ও ‘কণ্ঠস্বর’ (১৯৬৫) পত্রিকা এ সময় সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ (জন্ম : ১০৩৯)-র অন্তরঙ্গ দেশপ্রেম অনেক কবিতায় খচিত হয়েছে। ষাটের রক্তে আগুন ঝরা কবির নাম রফিক আজাদ (১৯৪১-২০১৬)। রফিক আজাদ প্রথমে ছিলেন যৌনতাপৃষ্ঠ, অসম্ভব সামাজিক। আসাদ চৌধুরী (১৯৪৩-২০২৩)-এর প্রথম দিককার কবিতায় দেশজতা রূপ পেয়েছিল ছড়ার আদলে, গজলের মোহনীয়তায়। নির্মলেন্দু গুণ প্রথম জীবনে বিপ্লবের বন্দনা করে ক্রমশ ঝুঁকেছেন লিরিকে- অনেক সময় স্বভাব কবির লিরিকে; রাজনীতি তাঁকে কখনো ছেড়ে যায়নি। মুহম্মদ নুরুল হুদা (জন্ম : ১৯৪৯) জাতিসত্তার উৎস খুঁজতে গিয়ে ব্যবহার করেছেন পৌরাণিক নানা অনুষঙ্গ। আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) কবিতা খুবই নিরীক্ষাপ্রবণ। তাঁর কবিতায় সুররিয়ালিজম ও পরাবাস্তববাদের সার্থক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সমসাময়িক কবি হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪)-এর কবিতা যেন স্বতন্ত্র সময়ে শিল্পভাস। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কবিতার ধারায় প্রথম ‘প্রথাবিরোধী কবি’। ষাটের দশকে অন্যান্য যে-সকল কবি কবিতা লিখে বাংলা কাব্যধারাকে ঋদ্ধ করেছেন তাঁরা হলেন- অসীম সাহা (১৯৪৯-২০২৪), কাজী রোজী (১৯৪৯-২০২২), বেলাল চৌধুরী (১৯৩৮-২০১৮), মহাদেব সাহা (জন্ম : ১৯৪৪), মাকিদ হায়দার (১৯৪৭-২০২৪), সমুদ্র গুপ্ত (১৯৪৬-২০০৮),সাযযাদ কাদির (জন্ম : ১৯৪৭), সিকদার আমিনুল হক (১৯৪২-২০০৩), হাবীবুল্লাহ সিরাজী (১৯৪৮-২০২১), হেলাল হাফিজ (১৯৪৮-২০২৪) প্রমুখ।
সাত.
১৯৪৭-১৯৭১ সাল পর্যন্ত মাত্র তেইশ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। দেশ বিভাগোত্তর কালে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট কিশোর সৈয়দ শামসুল হকের জীবনে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ, ‘বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রসূতি।’৯ এই সময় আরও উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল- ১৯৫৪ সালে শের-এ বাংলা এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে ‘যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন’, ১৯৫৬ সালে ‘বাংলা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা, ১৯৫৮ সালে ‘সামরিক শাসন’ জারি, ১৯৬২ সালে ‘শিক্ষা আন্দোলন’, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ‘ছয় দফা আন্দোলন’, ১৯৬৮ সালে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের, ১৯৬৯ সালে ‘গণআন্দোলন’, ১৯৭০ সালে বন্যাজনিত ‘দুর্ভিক্ষ’ ও ‘জাতীয় নির্বাচন’ এবং ১৯৭১ সালে বাঙালির ‘স্বাধীনতা আন্দোলন’ ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় (স্বাধীনতা) লাভ। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চের গণহত্যা, ২৬শে মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু, প্রতিরোধ সংগ্রাম, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধ, ত্রিশ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তি। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত নয় মাসের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মাহুতি এবং লাখো মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ- শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে রাষ্ট্রপতি পরে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর যদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁর বড় চ্যালেজ্ঞ। এ সময়ের সংঘঠিত ঘটনাগুলো হচ্ছে, ১৯৭৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠা, ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা প্রভৃতি ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের রাজনৈতিক কৃষ্টি ও সমাজ জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। এরপর থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে শুরু হয় কালো অধ্যায়। এ-সময় খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তবে তাঁর সরকারের স্থায়ীত্বকাল ছিল মাত্র ৮৩ দিন। স্বল্প সময়ে তিনি কুখ্যাত ‘ইনডেমিনিটি বিল-১৯৭৫’ পাশ করেন। তাঁর শাসন আমলে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানে খন্দকার মোশতাক আহমেদের পতন হয়। তিনি গ্রেফতার হন। সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের বড় কৃতিত্ব হলো তিনি ‘রাজনৈতিক দলবিধি-১৯৭৬’ প্রবর্তন করে ভিন্ন-মতের লোক ও দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। কিন্তু ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করেন।
১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম। মুক্তিযুদ্ধ সত্তরের দশককে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ঊনসত্তরের উত্তাল দিনগুলো ঘণীভূত হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। ৭১’এর পুরো বছরটাই কেটেছে মুক্তিযুদ্ধ, দেশ স্বাধীন করার মূলমন্ত্র বুকে নিয়ে। শিল্প সাহিত্য রচনা করার সময় তখন ছিল না। তবে স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার মতো কিছু কবিতা ও গান সে সময় রচিত হয়েছিল। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিমেষেই যেন মেঘ কেটে গেল। ১৯৭২ সাল থেকে ফোয়ারায় অজস্রধারার পানির মতো উদ্গীরিত হলো বাংলাদেশের কবিতা। সব দশকের জীবিত সকল কবিই তখন তুমুলভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন কবিতা রচনায়। বাঙালি এই প্রথম একটি নিজস্ব ভূ-খণ্ড পাওয়ার উত্তেজনা, আনন্দ, আবেগ আকাশ স্পর্শ করে। সংখ্যার এঁরা অজস্র; বড় পত্রিকা এবং অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিনে এঁরা আত্মপ্রকাশ করেছিল। আবিদ আজাদ (১৯৫২-২০০৫) ও শিহাব সরকার (জন্ম : ১৯৫২) এ সময়ের দুই দিকপাল। দুই জনই পুরোদস্তুর রোমান্টিক কবি। তবে প্রকরণের ক্ষেত্রে দু’জনেই স্বতন্ত্র। সত্তর দশকের উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে রয়েছেন- ময়ূখ চৌধুরী (জন্ম : ১৯৫০), আসাদ মান্নান (জন্ম : ১৯৫৭), রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১), কামাল চৌধুরী (জন্ম : ১৯৫৭), আবু হাসান শাহরিয়ার (জন্ম : ১৯৫৯), আরিফুল হক কুমার, আলম তালুকদার, আলমগীর রেজা চৌধুরী, এ. কে শেরাম, তিতাশ চৌধুরী, তুষার দাশ, দাউদ হায়দার, দিলারা হাফিজ, মিনার মনসুর, মোরশেদ শফিউল হাসান, রবীন্দ্র গোপ প্রমুখ।
আট.
আশির দশকে মুক্তিযুদ্ধের ছায়া বাংলাদেশের কাব্য সাহিত্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়কালে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে যুদ্ধের প্রভাব, মোহভঙ্গ, হতাশা, কালোবাজারীর মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার প্রবণতা কেবল মানুষের মুখে মুখেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং এ সময়কালে তা কবিতার জমিনে এসে ঠাঁই করে নিয়েছে। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং একই বছর ৪ঠা নভেম্বর ঢাকা জেলে জাতীয় চার নেতাকে গুলি করে হত্যা, সামরিক শাসনের উত্থান এ দশককে উত্তাল করে রাখে। আশির দশকে সরকার মাসুদ, আহমেদ মুজিব, আসলাম সানী প্রমুখ কবির উত্থান হয়। নারী, প্রেম শরীরীসুখ প্রভৃতি রোমান্টিক আবহে কবিতা লিখেছেন খালেদ হোসাইন, রেজাউদ্দিন স্টালিন, সাজ্জাদ শরিফ প্রমুখ কবি। এছাড়া সমকালীন অন্যন্য কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- আমিনুর রহমান সুলতান, কাজল শাহনেওয়াজ, গোলাম কিবরিয়া পিনু, দীলতাজ রহমান, ফকির ইলিয়াস, মজিদ মাহমুদ, মহীবুল আজিজ, মারুফ রায়হান, মাসুদ খান, হারিসুল হক প্রমুখ।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে সংঘটিত সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো হলো, ১৯৮১ সালের ৩০শে মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে নির্মমভাবে শহিদ হন। এই পরিস্থিতিতে সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯৮১ সালের ১৫ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ৬৬% ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ আব্দুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন আরেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ-সময় স্বৈরাশাসন বিরোধী আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে। নূর হোসেন নামের এক সাধারণ জনতা বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাতন্ত্র নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে মিছিলে শ্লোগান দিতে গেলে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। বিরোধী দলগুলোর অবিরাম আন্দোলন ও প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ৬ই ডিসেম্বর, ১৯৯০ সালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিযুক্ত হন। তাঁর নির্বাচনকালীন সরকারে আরও ১৭ জন উপদেষ্টা ছিলেন। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিরলসভাবে কাজ করে। দেশে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১৪০ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তবে এককভাবে ক্ষমতায় যেতে পারে না। তারা বাংলাদেশ জামায়েতে ইসলামীকে (আসন ১৮) সাথে নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ ৮৮ আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল ও জাতীয় পার্টি ৩৫ আসন পেয়ে অন্যতম বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় সংসদে ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশের কবিতার পথপরিক্রমায় নব্বইয়ের দশক অত্যন্ত তাৎপর্যময়। শতাব্দী-সংক্রান্তির অস্থিরতায়, বিশ্বপুঁজিবাদ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আধিপত্যবাদী বহির্চাপ এবং দেশিও সামাজিক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অন্তর্চাপে এ-সময়ের তরুণ কবি তাদের কবি-মানস সংগত কারণেই অন্তর্মুখী হয়ে উঠেছে। এই অন্তর্মুখীতার স্বভাব ধর্ম যে-কোনো সময়ের চেয়ে স্বতন্ত্র। এর ফলে এ-সময়ের কবিতায় দেখা যায়, নতুন কাব্যভাষা, শিল্পশৈলী, প্রতীক ও চিত্রকল্পের প্রচলিত পরিকল্পের প্রতি নিদারুন অনাস্থা। নতুন কাব্যচারিত্র্য সন্ধানের লক্ষ্যে অনুষঙ্গের রূপবদল এবং বর্তমান সচেতনতা, দর্শন ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রশ্নে পূর্বানুগামিতা আর অতিমাত্রায় আত্মমুখী ও আত্মকেন্দ্রীক। নব্বইয়ের দশকের কবিতা সম্পর্কে নিচের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য,
“নব্বইয়ের কবিতা’ একটি দশকের আলেখ্য নির্মিতি- গড় মানচিত্রের শৈলী সন্ধান সূচিত উদ্বোধন, আলোকিত বিস্ফোরণ, অজস্র অনুকণা, সম্ভবনাজাগ্রত মনোযোগ ও সাগ্রহ যাচিত ইতিহাসের অন্তঃকরণ, কর্ণ, দিদৃক্ষা, গতিরেখের ঝকমকে শতবর্ণিল সম্মিলন উপস্থাপনার চিত্রায়ণ। সংকুল, বন্ধুর- কালীন যাত্রাপথে বোধ ও মনীষার প্রাজ্ঞ খোলা জানালা-এক মহাজাগতিক ব্যাপ্তি নব্বইয়ের কবিতা। অনুভব ও উপলব্ধির অন্তহীন আবিষ্কার উন্মুখ জীবন কাতরতা নয়- আছে সৃজনের বিনম্র পরিশীলন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ক্রমধারার মহাকালের ছোঁয়া।
‘প্রকরণই কবিতার একমাত্র ইতিহাস’ নয়, সংযুক্তিতে তাই অনিবার্য আন্দোলিত হৃদয়ের ঘূর্ণাবর্ত। যেখানে নিরন্তর উদ্ভাসিত- দর্শন, নৃতত্ত্ব, পুরাণ, ধর্মীয় উপাখ্যান, পুরাকীর্তি, কাহিনি-কিংবদন্তী, সময়, অস্তিত্বের-শিষ্টাচার, অনস্তিত্ত্বের ব্যঞ্জনা, বাস্তব-পরাবাস্তব, ঐন্দ্রজালিক বিনির্মাণ, অন্তর্গত পরিব্রাজক, অস্তিত্বের ভূগোল, জীবন-আকুতি, দ্রোহ, নির্মাণ, জয়-পরাজয় আর সভ্যতার নির্যাস, জ্ঞান-গরিমা। আছে আবহমান পূর্বানুসৃতির ঝর্নার উৎসব মুখ। রূপকল্পের নান্দনিকতাই শুধু নয়, আছে চাঁছাছোলা কর্কশ-বাস্তবতা। প্রতীকী যোগসূত্র, আছে কাল-মহাকাল, বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিকলনের রেশ তাপিত বিট, এ্যাংরি, হাংরি, স্যাড, স্পার্ক, না প্রজন্ম। আদি শিকড়ের অন্তর্লীন টান যেন উন্মুল বিশ্ববীক্ষণ তৃষ্ণাও। আছে ক্ষয় ঠেকানো ভয় তাড়ানো জয় জাগানো প্রতিবাদী মন্ত্র। আছে প্রকৃতির বহুবর্ণিল ছন্দের অন্তঃসলিলা প্রাণস্পন্দ।”১০
নব্বইয়ে যে সকল কবি নিজেদের মেলে ধরেছেন- তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, অদিতি ফাল্গুনী, মজিদ মাহমুদ, আয়শা ঝর্ণা, আলফ্রেড খোকন, ওবায়েদ আকাশ, টোকন ঠাকুর, তপন বাগচী, বায়তুল্লাহ কাদেরী, মাহবুব কবির, মিহির মুসাকী, মুজিব ইরম, রনজু রাইম, রহমান হেনরী, রাসেল আশেকী, রায়হান রাইন, রিষিল পরিমল, শিবলী সাদিক, শোয়াইব জিররান, সরকার আমিন, সাইমন জাকারিয়া, হেনরী স্বপন প্রমুখ।
নয়.
আসলে শূন্য দশক বলতে কোনো দশক নেই। প্রথম দশককেই অনেকে শূন্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ দশকের কবিদের প্রধান প্রবণতা হলো দেশাত্মবোধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের দুঃখ দুর্দশা প্রভৃতি। উত্তর ঔপনিবেশিক চেতনা ও বিশ্বায়নের সুর, দেশি ঐতিহ্য, মিথ, স্বাদেশিকতার সাথে যুক্ত হয়েছে মানুষের অসহায়তা, ক্ষণিক আনন্দে বিভ্রম, মানবিক প্রেম, বিরহ, মনোবৈকল্য, স্নেহপ্রবণতা, কাম ও কামশীলতা, প্রকৃতির খেয়ালিপনা, নিষ্ঠুরতা—প্রভৃতি এই দশকের কবিতার মৌলিক বিষয়। উপমার প্রাতিস্বিকতা ও চিত্রকল্পের নৈপুণ্য কবিতাকে ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ করেছে। শব্দ ও চিত্রকল্পের আবহ বিনির্মাণেও এ সময়ের কবিরা অনেক সফল। এ সময়ের কবিদের মধ্যে রয়েছেন— অচিন্ত্য চয়ন, অতনু তিয়াস, অনন্ত সুজন, আরিফ ওবায়দুল্লাহ, অরবিন্দ চক্রবর্তী, আফরোজা সোমা, আরিফ নজরুল, জাকির জাফরান, জাহিদ সোহাগ, জুননু রাইন, ইসলাম রফিক, খৈয়াম কাদের, মাহবুবে খোদা টুটুল, তুষার কবির, পিয়াস মজিদ, মাসুদ পথিক, রনি অধিকারী, রাহেল রাজিব, নূরে মোস্তফা বাবু, লতিফ জোয়ার্দার, রাকিবুল হাসান, অভী চৌধুরী, শাফিক আফতাব, কামরুল ইসলাম বাহার, শফিক লিটন, সোহেল হাসান গালিব, তৈমুর মোহাম্মদ সালাউদ্দিন,শফিক হাসান, আরিফ নজরুল, শ.ম শামসুল কিবরিয়া, খালেদ উদ-দীন, জাকির সাঈদ, শফিক আজিজ প্রমুখ।
একুশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এক ঝাঁক তরুণ কবি কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। তাদের চিন্তাচেতনার কাঠামো অনেক গভীর। এঁদের কবিতায় লিরিকের বদলে স্থান পায় কাঠফাঁটা রোদে কৃষকের নাভিঃশ্বাস। দেশ; দেশের মানুষ, প্রকৃতি, নদী, ফসলের মাঠ, নারীর শরীরী সৌন্দর্য, প্রেম, কামনা-সম্ভোগ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি, আদালতের রায় কার্যকরের আহ্বান, হরতাল-অবরোধ, পেট্রোল বোমার আঘাতে পোড়া শরীরের গন্ধ প্রভৃতি। এসব বিষয় ও অনুষঙ্গ এ-সময়ের কবিদের কবিতার প্রধান উপাদান। অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক নানা বৈষম্য, কোটা সংস্কার আন্দোলন, করোনা মহামারি (২০২০-২০২২), সরকারের ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠা, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, চবি¦শের জুলাই আন্দোলন, ২৪-র গণঅভ্যুত্থান, মব সন্ত্রাস, অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সংস্কার কার্যক্রম, জুলাই শহিদদের স্বীকৃতি, জুলাই সনদ, গণভোট, ২০২৬-র জাতীয় সংসদ নির্বাচন, বিএনপি-জোটের সরকার গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালানার ক্ষেত্রে অসংগতি সংক্রান্ত নানা সমকালীন বিষয় ও অনুষঙ্গ নিয়ে যারা বর্তমানে কবিতা লিখছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- মাজুল হাসান, ইমরান মাহফুজ, পলাশ মাহবুব, জব্বার আল নাঈম, রাসেল রায়হান, সালাউদ্দিন মাহমুদ, অনিরুদ্ধ দিলওয়ার, অনু ইসলাম, আজিজ কাজল, খালেদ রাহী, মামুন সুলতান, গিরিশ গৈরিক, হানিফ রাশেদীন, অনন্ত পৃথ্বীরাজ, রহিমা আক্তার মৌ, নুসরাত নুসিন, রনি বর্মন, ইয়ার খান, রিমঝিম আহমদ, দিপংকর মারডুক, আসমা অধরা, যাহিদ সুবহান, মেহেদী হাসান, সুজন আরিফ, বঙ্গ রাখাল, হাসনাইন হীরা, আদিত্য আনাম, শৈবাল নূর, সাকিব শাকিল, হারুন পাশা, নিলয় রফিক, সুমন-রাজ সরকার, অলোক আচার্য, নুরুল ইসলাম বাবুল, দ্বীপ সরকার, আতিক আলতাফ, মোস্তফা কামাল রুদ্র, শরিফুল ইসলাম শরিফ, মোহাম্মদ মিজানুর, ফারহানা রহমান মিষ্টি, রহিম ইবনে বাহাজ, রওশন রুবি, আলী আকবর বাবুল, রত্না মাহমুদা, নাজমুল হাসান, আইরিন সুলতানা লিমা, রফিকুজ্জামান রণি, আরফান হোসাইন রাফি, আরফান হাবীব, জাকির মোহাম্মদ, আরফান হাবীব, আশরাফ খান, হিমঋতুবত, রিপন আহসান রিতু, এস.এম.এ হাফিজ, নুরুন-নবী খান জুয়েল, কামরুল ইসলাম ঝড়ো, হাজেরা সম্পা, সুশান্ত কুমার সাহা, এস মুকুল আহমেদ, মোল্লা সালেহ্, মীর সাব্বির, জাহিদ হাসান, জাহাঙ্গীর মাসুদ, রাশেদ রেহমান, জুয়েল আলভী, নীলকণ্ঠ পদাতিক, সোহাগ আলমগীর, আইনাল হক, হুমায়ুন কবীর আফ্রিদী, হাদিউল হক হৃদয়, সাফওয়ান আমীন প্রমুখ। বাংলা কবিতার হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পথ পরিক্রমায় আমরা এখন কবিতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে গেছি। আশা করা যায়, উত্তররাধিকার সূত্রে পাওয়া আগামীর কবিগণ এই ধারা অব্যহত রাখবেন।
তথ্যসূত্র :
১। সুনীল মুখোপাধ্যায়, জসীম উদ্দীন, ঢাকা : সিটি লাইব্রেরি, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৮৮, পৃ. ১৭।
২। আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পীর রূপান্তর, ঢাকা, ১৯৭৫, পৃ. ১২৯।
৩। শহীদ ইকবাল, বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, ২০১৪; পৃ. ১৪।
৪। সৈকত আসগর, বাংলা কবিতার শিল্পরূপ চল্লিশের দশক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩; পৃ. ১০।
৫। সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন, ঢাকা : সিটি লাইব্রেরি, ১৯৭৩, পৃ. ১।
৬। তসিকুল ইসলাম, রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে গ্রামীণ জীবন, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৫, পৃ. ১৬৮।
৭। হাসান হাফিজুর রহমান, একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন, হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, ঢাকা : পুঁথিপত্র প্রকাশনী, ৫ম সংস্করণ : ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৫, পৃ. ৩৫।
৮। অনু হোসেন, বাংলাদেশের কবিতা প্রসঙ্গে, বাংলা একাডেমি, জুন ১৯৯৬, পৃ. ৫।
৯। অনিক মাহমুদ, ‘শওকত ওসমানের কথাসাহিত্যে জাতীয় আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ’, ঢাকা : বাংলা একাডেমি, উত্তরাধিকার, সম্পাদক : হারুন-উর-রশিদ, ১৯শ বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর, ১৯৯১, পৃ. ১০
১০। মাহবুব কবির (সম্পাদিত), নব্বইয়ের কবিতা (১৯৯৯), পৃ. ১ম ফ্ল্যাপ।
লেখক পরিচিতি :
অনন্ত পৃথ্বীরাজ
এমফিল গবেষক, বাংলা বিভাগ,
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
ইমেল : anontoprithviraj@gmail.com
