অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মৃতিতে উজ্জ্বল প্রিয় আতা ভাই -
মঞ্চসারথি, প্রখ্যাত নাট্য নির্দেশক আতাউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি 

মঞ্চসারথি, প্রখ্যাত নাট্য নির্দেশক আতাউর রহমানের স্মৃতির  প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি 

স্মৃতিতে উজ্জ্বল প্রিয় আতা ভাই

ক্ষমা মাহমুদ

চলে গেলেন আমাদের প্রিয়, অনেক অনেক মানুষের প্রিয় মানুষ আতা ভাই- আমাদের দেশের মঞ্চ ও টিভি নাটকের অন্যতম এক মহীরুহ, অভিনেতা ও নাট্য নির্দেশক মঞ্চসারথী আতাউর রহমান।

আমরা ডাকতাম আতা ভাই, বয়সে আমাদের চেয়ে যথেষ্ট বড় হলেও তিনি আমাদের ভাই, স্যার নয়। অনায়াসে যেকোনো বিষয় নিয়ে খোলামনে গল্প করা যেত তার সাথে, প্রশ্ন করা যেত, সম্পর্কগুলো তখন এমনই সহজ ছিল! বছর দুয়েক আগেও মনে হয় নিয়মিত তিনি ফেসবুকে সরব ছিলেন, কিন্তু তারপরে আর কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। বুঝতাম, বয়স হয়েছে, হয়তো যেকোনো দিন আসবে এই সংবাদটা! নাটকের পুরানো বন্ধু আমরা কয়েকজন, কয়েকবারই ভেবেছি একবার গিয়ে দেখা করে আসব। জীবনের নানান দৌঁড়ে সকলের সময় মেলানো হয়ে ওঠেনি ।তাই শেষ দেখা আর হলো না! আতা ভাইকে যারা চেনেন তারা সবাই জানেন, তিনি ছিলেন থিয়েটার ও রবীন্দ্রনাথ অন্তপ্রাণ, যখন-তখন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কথা বলতেন। ছিলেন শেকসপিয়ার অনুরক্ত, মঞ্চে তার নির্দেশনায়  অসাধারণ সব নাটকের মঞ্চায়ন দেখার অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। মঞ্চসারথি, নাট্যজন, সর্বোপরি ভীষণ জীবনমুখী একজন মানুষ চলে গেলেন অনন্তলোকে, বর্নাঢ্য এক জীবনকে পেছনে ফেলে। আমরা দিন দিন যেন প্রাগৈতিহাসিক হয়ে উঠছি- ইদানীং স্মৃতির ঝাঁপি খুলতে গেলেই দেখি সেসব তিন দশক আগের ঘটনা! আতা ভাইয়ের সাথে নাটক নিয়ে কাজ করার দিনগুলো মনে করতে গিয়েও সেই ৯০ দশকেই ফিরতে হলো।

ভেনিস সওদাগর নাটকের রিহার্সেল।

সময়টা ১৯৯২ সাল, মাত্র ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ব বলে। সেই সাথে আছে আমার সাবসিডিয়ারী দুটো বিষয়- নাটক ও নাট্যতত্ত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। সবই আমার প্রিয় বিষয়, লেখাপড়াটা করছি তখন মনের আনন্দেই, কিন্তু নাটক বিভাগে আমাদের ক্যারিশম্যাটিক জামিল স্যারের (সৈয়দ জামিল আহমেদ) কারণে নাটকই যেন হয়ে উঠল আমার ধ্যানজ্ঞান। প্রতিদিন জামিল স্যারের ক্লাস যেন চুম্বকের মতো টানে, জাপানি কাবুকি আর গ্রিক ও রোমান প্রসেনিয়ামের স্লাইডের ভেতর বিমুগ্ধ চিত্তে মগ্ন হয়ে থাকি। সাহিত্যের ক্লাস যদিও-বা কিছু বাদ পড়ে, জামিল স্যারের ক্লাস একটাও নয়। সেই সাথে আছেন আর একজন মাত্র শিক্ষক ওয়াহিদা মল্লিক জলি আপা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগ আজকে ‌অনেক বড় হয়ে গেছে কিন্তু তখন মাত্রই শুরু হয়েছে আর আমরা মনে হয় দ্বিতীয় ব্যাচ ছিলাম, শিক্ষক হিসেবেও এই দুজনই মাত্র ছিলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে মোটামুটি প্রতিদিন আমাদের ক্লাস চলতো। দীর্ঘসময় পেয়েছি তাদেরকে শিক্ষক হিসেবে। জামিল স্যার এরপর আর কোনো ব্যাচকে আমাদের মতো এত সময় দিতে পেরেছেন কিনা জানা নেই। তার নির্দেশনায় আমরা নাট্যকলা ও ইংরেজি বিভাগ মিলে ক্রিস্টোফার মার্লোর দুশতম জন্মদিন উপলক্ষ্যে ব্রিটিশ কাউন্সিলে মঞ্চায়ন করেছিলাম ডক্টর ফস্টাস; সমসাময়িক সময়ের সাথে বিষয়বস্তুকে মিলিয়ে সে নাটকের উপস্থাপন ছিল মনে রাখার মতো।

‘ভেনিস সওদাগর’ নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন শেষে দর্শকদের উদ্দেশ্য বক্তব্য রাখছেন নাট্য নির্দেশক আতাউর রহমান।

নাট্যকলা বিভাগেই সহপাঠী হিসেবে পরিচয় হয় তখনকার তুখোড় মঞ্চকর্মী বন্ধু আহমেদ আবিদ রুমির সাথে, বর্তমানে যে ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টসের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত আছে। মঞ্চে অভিনয় নয়, আমি খুব আগ্রহী ছিলাম মঞ্চের নেপথ্যের নানান কাজকর্মের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করব বলে। রুমি তখন ঢাকা লিটল থিয়েটারের সক্রিয় সদস্য। কথা প্রসঙ্গে এসব আলাপ হতেই সে আমাকে বলল, ‘আমাদের গ্রুপে চলো একদিন- দেখো কেমন লাগে।’ কথামতো চলে গেলাম একদিন ধানমন্ডী দুইয়ের তখনকার জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। ঢাকার মঞ্চ নাটকের দলগুলোর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের এক অবারিত দ্বার ছিল এই জায়গা। বিশেষ করে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের নিয়মিত মহড়া হতো এখানে। তখনকার সুনসান সবুজ ধানমন্ডীর অন্যান্য বাড়ির মতোই এই বাড়িটির সামনেও ছিল বেশ খোলা জায়গা এবং নানান ধরনের গাছপালাসহ সেই দোতলা বা তিনতলা বাড়িটা ছিল খুবই নান্দনিক। বেশ পরে জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চলে আসে কলাবাগান মাঠের পাশে।

এক সন্ধ্যায় সেই বাড়ির নিচের রিসেপশনে কথা বলে জানলাম দোতালায় রিহার্সেল চলছে। কিছুদিন আগে এখনকার দূর্গসম জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে গিয়ে নিরাপত্তার বহর দেখে সেদিনের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। কি অনায়াসে সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় উঠে দরজা খুলে ঢুকে পড়েছিলাম নাটকের রিহার্সালে! এমনই ছিল অবারিত দ্বার। নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি তো দূরের কথা লেশ মাত্র চোখে পড়েনি কোথাও! এখনকার মানুষ সেটা আর কল্পনাতেও মনে হয় ভাবতে পারবে না। যাই হোক, দোতালার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো ‌অন্য কোনো জগতে প্রবেশ করলাম! দেখলাম, বেশ বড় এক রুমে একগুচ্ছ ‌আমারই বয়সি নবীন ছেলেমেয়ে নাটকের সংলাপ নিয়ে মুখর, সংলাপ যা কানে এলো মনে হলো, শেক্সপিয়ারের সময়ের ইতালির কোনো শহরে ঢুকে পড়েছি যেখানে কথা বলছে পোর্সিয়া, নারিসা, শাইলক অ্যান্টোনিও, ব্যাসানিও আর লরেনজোরা। তাদের মধ্যে লম্বা একজন মানুষ মধ্যমণি হয়ে নিবিড় মনোযোগে খেয়াল করছেন চরিত্রগুলোর সংলাপ। আমি আমার আরো তিন বন্ধুসহ চুপচাপ একপাশে রাখা সোফায় বসে দেখতে থাকলাম তাদের মহড়া। মহড়া চলছিল ঢাকা লিটল থিয়েটারের পরবর্তী নাটকের, যার বাংলা নাম ছিল ‘ভেনিস সওদাগর’। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের মার্চেন্ট অফ ভেনিসের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন অধ্যাপক আব্দুস সেলিম। নিয়মিত বিরতিতে তিনিও এসে দেখতেন নাটকের মহড়া কেমন চলছে।

প্রথমদিন বেশ কিছুক্ষণ বসে দেখলাম আতা ভাই চরিত্রগুলোর সাথে নানান আলাপে মেতে আছেন। মহড়া শেষ হলে বন্ধু রুমি আতা ভাই এবং অন্য সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর থেকে শুরু হলো আমার সেখানে যাওয়া-আসা। আতা ভাইকে বললাম, আমার ব্যাকস্টেজে কাজ করার খুব শখ। উনি বললেন, আমরা একটা মেয়ে চরিত্র খুঁজছি, তোমার সাথে খুব যাবে, তুমি আগে সেটা করো, ব্যাকস্টেজের কাজ পরে করো। ব্যাস, মঞ্চের নেপথ্যে আমার কাজ করার শখের সেখানেই সলিল সমাধি, এরপর শুধু অভিনয়ই চলতে লাগল, আমি হয়ে গেলাম ভেনিস সওদাগর নাটকের ইহুদি শাইলকের (এই চরিত্রে রুমী অভিনয় করে মঞ্চ কাঁপিয়েছিল) মেয়ে জেসিকা। দিনের পর দিন, রাত-দিন এক করে চলত মহড়া, তৈরি হলো কত কত সব স্মৃতি! লেখাপড়ার পাশাপাশি তখন সেটা অনেক সময়সাপেক্ষ এবং পরিশ্রমের ব্যাপার হলেও এখন সেসব নিখাঁদ সুখস্মৃতি! নিজের গাটের পয়সা ও সময় ব্যয় করে তখনকার থিয়েটার করা মানুষজন এভাবেই শিল্পের সাথে তাদের ভালোবাসার বন্ধনকে লালন করতেন শুধু আত্মার খোরাকের জন্যে।

চলছে স্টেজ রিহার্সেল।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং তার স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরীর হাত ধরে ঢাকা লিটল থিয়েটারের যাত্রা শুরু হয়েছিল আশির দশকে। তাদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় একসময় এই দল তাসের দেশসহ অনেক ভালো ভালো প্রযোজনা উপহার দিয়েছে। শুনেছি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের বাসাতেই হতো তখন নাটকের যত রিহার্সেল। নাজমা জেসমিন চৌধুরীর মৃত্যুর পরও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ  আরও অনেক বিখ্যাত জন এই দলের উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন। সময়ের সাথে সাথে অনেকেই এই দলের হাল ধরেছেন। আমি যখন এখানে ঢুকি তখন দলের অভিভাবক হিসেবে চলচ্চিত্র নির্মাতা মোর্শেদুল ইসলাম দলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন কারণ তারাও একেবারে তরুণ বয়স থেকে এই দলের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন এবং প্রয়োজনের সময় দলের হাল ধরেছিলেন দলকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যে। এরমধ্যে তিনি বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে যুক্ত হয় স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আগামী’ ‘চাকা’র মতো ছবি বানিয়ে দেশেবিদেশে নাম করেছেন। চলচ্চিত্র নিয়ে তার এই ব্যস্ততা সত্ত্বেও নাটকের দলের সাথে যোগাযোগ কমেনি।  বরং তার শক্ত হাতে হাল ধরাতেই লিটল থিয়েটার আবার এগিয়ে যাচ্ছিল। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সার্বিক কারিগরী সহযোগিতায় এই নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল এবং মহিলা সমিতি, গাইড হাউস এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলা মঞ্চে অনেকগুলো শো হয়েছিল। এখনও চোখে ভাসছে জাহাঙ্গীরনগরের ওপেন প্রসেনিয়ামে শীতের রাতে আমরা নাটকের ডায়লগ বলছি আর আরও অনেক দর্শকের সাথে আতা ভাই ও সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক নাটক দেখছেন এবং গল্প করছেন মঞ্চের নিচে বসে। আতা ভাইয়ের সাথে ঐদিন তিনি চলে এসেছিলেন আমাদের নাটক দেখতে। সকলেই জানেন তারা ছিলেন  ভালো বন্ধু।

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় তখন ঢাকার মঞ্চে ‌অসাধারণ সব নাটক উপহার দেয় যার অধিকাংশেরই নির্দেশনায় থাকেন আতা ভাই। আমরা দলেবলে সেসব নাটক দেখে বেড়াই, অভিজ্ঞতা নিই।  লিটল থিয়েটারের ‌অনুরোধে ‘ভেনিস সওদাগর’ নাটকটি আতা ভাই নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই কারণেই বলা যায় নাগরিকের প্রায় পুরো দল এসে আতা ভাইয়ের পাশে থেকে এই নাটকের সমস্ত কারিগরী কাজে সাহায্য করেছিল। ‘ভেনিস সওদাগর’-এর দারুণ সুন্দর মঞ্চসজ্জা করেছিলেন শিল্পী মনসুর আহমেদ, আলোক সজ্জায় ছিলেন নাসিরুল হক খোকন ভাই, বিশেষ অংশে কোরিওগ্রাফি করেছিলেন মণিপুরী নৃত্যের প্রথিতযশা নৃত্যশিল্পী তামান্না রহমান।

এই নাটক মঞ্চায়নের আগে ছেলেমেয়েদের ভালোভাবে প্রস্তুত করার অংশ হিসেবে একটা কর্মশালা করা হয়েছিল যেখানে যুবদা খালেদ খানসহ, আসাদুজ্জামান নূর, সারা যাকের, তারিক আনাম, ফেরদৌসী মজুমদার, রূপা চক্রবর্তী, গোলাম সারওয়ারসহ ‌অনেকে নাটকের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নিয়মিত আমাদের তালিম দিয়েছিলেন। তারা তখন দেশের স্বনামধন্য শিল্পী, সেই ব্যস্ত সময়ের মধ্যে দিয়ে একদম নবীন একদল ছেলেমেয়েকে এমন সময় দিয়ে তৈরি করার নমুনা তখনকার দিনের শিল্পীদের শিল্পের প্রতি, একটা সুস্থ সংস্কৃতির সমাজ গঠনের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে। নাটকের মহড়ায় অনেক সময় রাত হয়ে গেলে আতা ভাই, সেলিম ভাই নিজে গাড়ি চালিয়ে কতদিন বিশেষ করে মেয়েদেরকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন, এখন এসব ভাবলে সত্যিই অসম্ভব অবাক লাগে!

কর্মশালা প্রযোজনা হিসেবে আতা ভাইয়ের নির্দেশনাতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিদায় অভিশাপ’ মঞ্চস্থ হয়েছিল ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে, যেখানে দেবযানীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম ‘ভেনিস সওদাগর’ নাটকেরই আমরা তিনটি মেয়ে আর আমার নিজের কাছেই অনন্য সুন্দর এক স্মৃতি হয়ে আছে এই কাজটা। ‘ভেনিস সওদাগর’ নাটকের খুবই জমজমাট ও সফল মঞ্চায়ন হয়েছিল। উদ্বোধনী শোতে ঢাকার সংস্কৃতি অঙ্গনের বিখ্যাত মানুষদের ঢল নেমেছিল, যার পেছনের অন্যতম মূল কারণ অবশ্যই ছিল আতা ভাইয়ের এই নাটকের সাথে সম্পৃক্ততা এবং তার নির্দেশনার প্রতি সকলের আগ্রহ। নাটক মঞ্চায়নের পর সমস্ত জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত খবর, আলোচনা, সমালোচনা বের হতো। নাটক মঞ্চায়নের পর নিজেদের কাজ নিয়ে পত্রিকায় আলোচনা, ছবি দেখে আমাদের আনন্দ-উত্তেজনার সীমা থাকত না।

পরবর্তী সময়ে আরও কিছু নাটকে অভিনয় করা হয়েছিল পরপর, ছিলাম বিটিভির তালিকাভুক্ত অভিনয় শিল্পী কিন্তু নানান কারণে অভিনয়ের যাত্রাপথ ওখানেই শেষ হয়ে গেল। জীবনে আরও এমন সব পথে যাত্রা শুরু হলো যে, ঐ পথটা আস্তে আস্তে ভুলেই গেলাম, শুধু স্মৃতিতে মুক্তোর মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকলে তরুণ বয়সের সেই পাঁচ-ছয়টা বছরের থিয়েটার জীবন, যার ভেতরে আতা ভাই ছিলেন এক উজ্জ্বল মানুষ হয়ে, যার সদা হাসিমুখ এবং আন্তরিকতা কখনোই ভোলার নয়।

অনন্তলোকে ‌অনন্ত আনন্দে থাকুন মঞ্চসারথি আতাউর রহমান, আমাদের প্রিয় আতা ভাই ।

 

পরিচিতি :
বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব, মঞ্চসারথি আতাউর রহমান ২০২৬ সালের ১২ মে ৮৪ বছর বয়সে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী মঞ্চনাটক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, সুবচন নির্দেশক এবং ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (ITI) বাংলাদেশ শাখার সভাপতি ছিলেন।

তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো :
    • জন্ম : ১৮ জুন ১৯৪১, নোয়াখালীতে।
    • শিক্ষা : তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।
    • আন্দোলন : মঞ্চনাটকে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘মঞ্চসারথি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

কর্মজীবন :
  • তিনি ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
  • ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকের নির্দেশনার মাধ্যমে তাঁর মঞ্চ নির্দেশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে।
  • তাঁর নির্দেশিত ও অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘গ্যালিলিও’, ‘রক্তকরবী’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ এবং ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’।
  • নাটক পরিচালনার পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
সম্মাননা :
বাংলা সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননাসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত হন :
  • একুশে পদক : ২০০১
  • স্বাধীনতা পুরস্কার : ২০২১

Read Previous

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন : ৮ম সংখ্যা (মে ২০২৬ : বিশেষ ঈদ সংখ্যা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *