অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৮, ২০২৬
৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ১৮, ২০২৬
৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমিনুল ইসলাম -
মাঘের চিঠি

মাঘের চিঠি

আমিনুল ইসলাম

 

ক্যালেন্ডারে চোখ রেখেই বলছি:
সাকুল্যে বিশ দিন হয়;
সেটা অবশ্য আহ্নিকগতির হিসাব;
আর আমার হিসাবটা স্বপ্নঘণ্টার।
স্বপ্নঘণ্টা বোঝো না! হায় আল্লাহ!
আমাদের পেছনে স্বপ্নের ছায়া
আমাদের সামনে ঐ স্বপ্নের পাহাড়
আমাদের দুপায়ের নিচে স্বপ্নের মাটি
এই যে দ্যাখো—সরে যায় পা!
আর তুমি স্বপ্নঘণ্টা বোঝো নাকো!

তবে কী আর বলি তোমাকে!
অফিস ফুরোলে
সাংবাদিক হয়ে ঘিরে ধরে কষ্ট,
যানজট বাঁধায় সময়;
রাস্তায়, ব্যালকনিতে, পড়শির ছাদে
ক্লাবে, জনতার রায়ে, সবখানে—
শুধু লালবাতি
শুধু ফালতু রিল্যাক্স
শুধু অধৈর্য আঙুল চোষা অপেক্ষার।
বলি—ও সবুরের গাছ,
তুমি আর কত কচু খাওয়াবে ভাই!

ছুটির দিনের কথা বলছো তো? দায়শূন্য।
বাগানে পানি দিই। আর তারা?
তারা দেয় মোনালিসার হাসি,
মর্মরকণ্ঠে শোনাতে চায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বার্তা;
ফলে তো নাভিশ্বাস! ফলে তো ঝরে যাওয়া!
হায় রে আশ্বাসবার্তা! হায় বেদনার পাঠশালা!
সময় কাটে না দেখে একটু লিখতে বসি;
কিন্তু সে জোর পাই না। জোর আসবে কোত্থেকে?
মাথার ওপর, দরজার ওই পাশে
রি রি করে ওঠে কায়েমি কণ্ঠেরা:
‘সব শালা কবি হবে!’
তার ওপর মৎস্যগন্ধা দিন, পরাশর মুনি রাত;
আর যোজনজোড়া দুর্গন্ধ। ওয়াক্ থু!
এই তো সেদিন জাকিরের ‘যোজনগন্ধা’ পড়ে
নাকে রুমাল দিলে তুমিও। ভুলে গ্যাছো?
উপরন্তু তসলিমার ‘ক’!

তুমিতো জানোই- প্রবল বিরোধিতার মুখে
এবং কোনো মৈত্রীচুক্তি ছাড়াই,
টানা বিশ বছর আছি আসক্তির আঙিনায়:
‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই
দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই
তৃতীয়ত আমি তোমকে চাই
শেষ পর্যন্ত…’
না! শেষ পর্যন্ত আর নয়।
তোমাকে হরতালের ডাক দিতে হবে নাকো,
ধর্মঘটও নয়!
আধকাপড়ে ছুটতেও হবে না ধবল মাতবরের কাছে।
শালা ধবল মাতবর! শুধু গায়ের জোরের মোড়ল!

পুষ্পমালায় ইদানীং ভীষণ ভয় তোমার, জানি।
হায় গোলাপ! শেষপর্যন্ত তুমিও কালো তালিকায়!
তাই তো বসে রয়েছি হাতে নিয়ে
মৌরসি ভিটায় কুড়িয়ে পাওয়া প্রত্নহৃদয়, যদি-বা আসো!

আর যদি না আসো! কমপক্ষে অবস্থান ধর্মঘট,
আসবাবপত্রসমূহের কপালে দুর্ভোগ;
যৌবনবৈরী যাবতীয় দালান আর
আমলাগলির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার;
এবং আবদুলের পিঠে কিল—
সে তো অমন হয়েই থাকে।
যত দোষ নন্দঘোষ! যত ভুল আবদুল!

মিছেই ভেবো না তো আর! হয়তো ও তোমার মনের রোগ;
প্রতিবেশিনীর সাথে কোনো গোপন সমঝোতা নয়,
তোমার গুপ্ত লকার নিয়ে চোরাচুক্তিও নয়
কোনো শ্বেতাঙ্গীনির দূতিকার সাথে।
হয়তো তুমি লক্ষ করোনি—
এখানে এখন উলংগ শিবিরে ইচ্ছাপূরণ
তার সাথে প্রবাদের গলা;
দিনের শেষে সমান শরীক বামহাতও।
আর তাই দেখে রিকশাওয়ালা টাঙ্গাওয়ালার খিস্তিখেউড়:
হালারাই আবার সাম্যের কথা কয়!

আচ্ছন্ন আলোয় লাইন ধরেছে যুবকেরা,
মেয়েরাও যায়; রান খসিয়ে ভেসে বেড়ায়:
‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা!’
কিন্তু পাশ মাড়ায় না কেবল কাঙ্খিত পদগুলো;
সেই সুজন নেই; সুমনারা আসবেই-বা কোন বাহানায়?
তাই তো এত যে লাশের মিছিল
অথচ প্রেমের মরা নেই একটিও;
আর এই যে বুড়িগঙ্গার জল!
হায়! সে তো রুচবে না কোনো মড়ারও!
তাই হয়তো বুড়িগঙ্গার বুকজুড়ে আজ ডাঙার উৎসব,
লেঠেল উল্লাস!
পানি নয়—পৌরপিতার দুচোখে এক পর্দা ছানি!

যত্নের কথা বলছো? সে তো আমি নিতেই চাই;
এমনকি তোমার ভয়কেও হালকাভাবে নিচ্ছি না;
কিন্তু তুমি বলো, মাগনা পরামর্শের এই দেশে—
এতো যে চিকাদিবস,
এত যে চিকারজনী,
এবং এত যে নৈশজ্ঞান—
তবু কে পড়ে কবে কার দেওয়াল লিখন?

সে এখন যুবরাজ সেলিম—গোসসা ঘরের গোঁয়ার;
যত্ন নয়, অপেক্ষাও নয়,
‘আমার সোনার হরিণ চাই
আমার সোনার হরিণ চাই
তোরা যে যা বলিস্ ভাই
আমার সোনার হরিণ চাই!’
না! অমন সীতাসসুলভ আবদারও নয়;
তার দাবি একটাই এবং নগদ…
থাক্ সেকথা।
ধাতানি তো বটেই! গোসসা ঘরটাই ডেকে আনতে পারে
কুঁজোবুড়ির কুলোয় চূড়ান্ত হতাশার বাদশাহী ঘোষণা:
যাও বাছা! রাজার বাঁধন নয়, এবার বিশ্বনিখিলে খেটেখুটে খাও!

থাক্ নাহয় ওসব কথা!
নতুন শতাব্দীর অদ্ভুত মাঘ।
শিহরিত সবুজের গোড়ায়
উত্তরের হাওয়ায় ভেসে আসে
কুড়াল ও করাতের সম্মত-উচ্চারণের প্রতিধ্বনি:
আকাশে মাটিতে স্বপ্নে শুধু—
নিষেধাজ্ঞা
নিষেধাজ্ঞা
নিষেধাজ্ঞা!
নিখোঁজ বসন্তদূত,
বায়সের অতন্দ্র চোখ সারাক্ষণ নিজ বাসার ওপর;
ঘরে ফিরে বয়নশিল্পের উদ্ভট সিলেবাস দেখে
হতভম্ব তালগাছের বাবুই যুগল
আর বিচিত্র সব বনসাইয়ে ভরে ওঠে ষড়ঋতুর জনপদ।
তৃষ্ণার অধিক তরাস চাতকীর বুকে:
একটু ছায়া! একটু ছায়া! একটু ছায়া!

কুড়িয়ে পাওয়া আধুলি নিয়ে মহাবিপাকে ব্যাঙ।
চারপাশে বগল বাজায় লম্বোদর সম্প্রদায়।
ফলে ক্ষুধা নিয়ে ঘরে থাকাটাই দায়!
ওদিকে জল ভেঙে কর্ণফুলীমুখী ধেয়ে আসে
মহাসিন্ধুর হা-খোলা নক্ররাজ!
আর মিনার বেয়ে উঠে যায় উল্লসিত ডারউইনের পূর্বপুরুষ
কোনো হরিণ আসে নাকো নজরে।
মৃগেন্দ্রও রুদ্ধজন্ম এখানে অর্ধশতাব্দীকাল।
শুধু হৃতবীর্য কয়টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার—
আঁটকুড়ে আড়ালে বসে চেটে যায় নিজনিজ গতর:
আমাদের পৈকদাদা না সাতবনের রাজা ছিল!
ওপাশে শেয়ালের দাওয়াত পৌঁছে গেছে
বনে ও বনান্তরে
ঝোপাড়ালে ফিসফাস। খাড়াকান।
কণ্ঠরুদ্ধ ভোরডাকা লাল টোপরের বাঁক।
অবশ্য প্রমাণসাইজ পোস্টার
‘আমরা নিরামিষাশী শতভাগ’ ঝুলে আছে
আমন্ত্রিত আস্তানায়, পিকনিক ক্যাম্পে।
তাই নিয়ে কত গুঞ্জন! কত অনুসিদ্ধান্ত!
লালসার কত লালা! অমূলক কত ভয়!
আর আমাদের মহান প্রাণবাদীরা?
তাহারা এখন স্বপ্নগর্ভ শীতঘুমে।
স্বপদুষ্ট শিহরে নষ্টঘামে মুচড়িয়ে ধরে আত্মরতির অলস শরীর
তাদের নাসিকা গর্জনে উৎসাহিত ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস
ফলে তো কুম্ভকর্ণের গালে হাত: পরদেশী বধু, ঘুম ভাঙায়ো চুমি’ আঁখি!

বুঝতেই পারছো—নিজঘরে বিপন্নরাত
প্রভাত মানেই নব হতাশার আবরণ উন্মোচন;
বিভ্রান্ত যত বুদ্ধিজীবী নষ্ট আগুনে বুক পেতে
জাবর কাটে গোষ্ঠীশালায়।
এরা খায়, জাবর কাটে
আর তারকাখচিত শিং দিয়ে দুই বেলা স্বজাতিকেই গুঁতোয়!

দ্যাখো, নগরীর প্রতিটি চূড়ায় জেঁকে বসেছে
অদ্ভুত জ্যাকেটে আবৃত ফানুস প্রজন্ম: তাই রে নাই রে না…
রাজধানীর কুটিল দালান হতে ছড়িয়ে পড়ে প্রবাদের ঘুঘু
যত প্রাচীন জনপদে।
বর্ণহীন তাদের উভয় ডানায় উৎকীর্ণ বেয়াড়া চারটি অক্ষর;
ডানাপ্রক্ষিপ্ত ধুলো উড়ে এসে ‘না’ ‘না’ শব্দের আকারে
সেঁটে যায়
গফুর বয়াতির চুলে,
আবদুল আলীমের গানে,
জায়নামাজের নকশায়।
আর বেড়েই চলেছে উত্তুরে হাওয়ার দাঁতাল দাপট।
বেতসলতার মতো নেতিয়ে পড়ে
এ মন
এ মাটি
ভালোবাসার ভিত
ধুলোয় তাজমহলের স্বপ্ন!

আমাদের অসময়োচিত বিরহ নিয়ে ফোড়ন কাটে
লম্পটের দালাল
আর বুঝি সয় না কোঁচা হাতে বসে থাকা
প্রবাদের বৃক্ষের তলায়!
ওই মেওয়াকে এবার হাতের মুঠোয় চাই আমাদের!
আমাদের যৌথঘামে উৎপন্ন শিশু নেমে এসে
শিখবে প্রথম
জননী-জন্মভূমি-একতা
আর বিস্তর মন দেবে আল বাঁধার সমূহ প্রসঙ্গে।

অতএব আর নয় শূন্যতার ভাগাভাগি
আর নয় পথকাটা বৈরী হাওয়ার
তাই বিড়ম্বিত কোরামও নয় আর;
চলে এসো প্লিজ, দুঃখের মতন—আসন্ন সান্ধ্য অধিবেশনে।

Read Previous

বৈশাখ 

Read Next

চড়ুইনি ও বানর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *