
বিজড়িত
শান্তা ফারজানা
ঠুস…
হাতে বসা মশাটাকে জোরে শব্দ করে মারলো নুরুল কবির। বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ দুটো বুজে গিয়েছিল টের পায়নি। এই সুযোগে মশাটাও হাতের উপর বসে মনের সুখে নুরুল কবিরের রক্ত দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নিচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর রক্ষা পেল না। আধ পেটা হয়েই নুরুলের হাতের উপর মরে চ্যাপ্টা হয়ে গেল। হাতের ফুলে উঠা জায়গাটা চুলকাতে চুলকাতে আবারো ডেস্কের দিকে এগিয়ে যায় নুরুল। আগের বয়স্ক লোকটা নেই; পঁচিশ কি ছাব্বিশ বছর বয়সী একজন যুবতী বসে মোবাইল দেখছে। মিস বলবে, না মিসেস বলবে, না ম্যাডাম বলবে সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতে সামনে যায় নুরুল কবির।
– ইয়ে আপা, আগের ঐ হুজুর ভাই কনে গেলে? নুরুল কবিরের অনুরোধ বিজড়িত কণ্ঠ শুনে মোবাইল থেকে মাথা তোলে যুবতী।
– কার কথা বলছেন? মাজিদ আঙ্কেল?
– নাম তো কতি পারবো না, তয় দাড়ি আছে। মাথায় গোল টুপি। এইহানেই বইসে ছিলেন। উনার কাছে আমার কিছু কাগজ দেয়া ছিল তো…
– আচ্ছা আচ্ছা। উনার নাম মাজিদ আঙ্কেল। উনি যোহরের নামাজ পড়তে গেছেন। নামাজ শেষে খাবেন। একটু সময় রেস্ট নিয়ে তারপর আবার আসবেন।
– ও।
নিরাশ হয়ে মাথা নিচু করে আবার কোণের বেঞ্চে এসে বসে নুরুল কবির। মাজিদ সাহেব না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তাকে। কিছু করার নেই। এই নিয়ে বছরে দুই থেকে তিনবার ব্যানবেইস দপ্তরে আসে নুরুল কবির।
প্রতিবারই ১ জহির রায়হান রোড, পলাশী-নীলক্ষেতের নিচতলায় ৫ কক্ষের এই কক্ষে কোনার এই বেঞ্চে এসে বসে থাকে। দীর্ঘ ৩৫ বছর যশোরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একটি এমপিওভুক্ত দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছেন নুরুল। এরপর অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু অবসরের পরের জীবন পতিত হয় চরম সংকটের মধ্যে। অসুস্থ স্ত্রী, অসুস্থ কন্যা, তিনি নিজেও অসুস্থ। শুরু হয় নিদারুণ অর্থাভাব আর অস্থির সময়চক্র। ৬৫ বছর বয়সী নুরুল কবির মানসিকভাবে বিপর্যয়ের মুখোমুখি পড়লেও মনে মনে সান্ত্বনার রেখা কাটে পেনশনের টাকাগুলো। অবসরে যাওয়ার পর কল্যাণ ট্রাস্টের ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। নানান সমস্যার সুঁই-সুতোয় জোড়াতালি দেয়া জীবনে এই টাকাগুলোকে সম্বল করে ভাসতে শুরু করেন নুরুল। পাশাপাশি চেষ্টা করতে থাকেন অবসর সুবিধার টাকা কয়টার জন্য। ঘরের অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয়ে এই টাকাগুলোই বাঁচাতে পারবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একজন স্বামীকে। তাই আশায় বুক বেধে আজও ব্যানবেইস অফিসে ছুটে আসেন বয়োজ্যেষ্ঠ এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। কিন্তু চার বছর ধরে নিজের অর্থ থেকে সঞ্চিত ‘সুবিধা’ টুকুই পাচ্ছে না শিক্ষক নুরুল কবির। তিনি স্কুল-মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য কোনো ব্যবসায়ও করেননি। নেই কোনো গচ্ছিত ব্যাংক-ব্যালেন্সও। তিনি তো আর দেশের কোনো আইজিপি পদে চাকরি করেননি যে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি কিনবেন! অসুস্থ জোহরার মুখটা ভেসে ওঠে নুরুলের চোখের উঠোনে। পঞ্চান্ন বছরের জোহরার সারাটা জীবনেও কোনো চাহিদা ছিল না। ছিল না উচ্চাভিলাস, ছিল না রুই-কাতলা বা গরুর কালা ভুনা দিয়ে উদরপূর্তির বাসনা। নুরুল কবির যা নিয়ে আসতো তাই যত্ন করে রান্না করতো যোহরা। মাছ-মাংস হলে হলো, না হলে নাই। শাক পাতা, সবজি, ডাল যা আছে তাই সই। শুধু গুনগুনিয়ে গান গাইতো আর কপোতাক্ষের পাড়ে বসে বসে পা দোলাতো। নদের বাতাসে জোহরার শাড়ির আঁচল উড়ে যেত আর কাজলমাখা মায়াবী চোখের কোণে কবিতা ভেসে বেড়াতো। নুরুল কবির বুঝেও না বোঝার ভান করতো। কালেভদ্রে কাচের চুড়ি আর ফুলতোলা শাড়ি-কাপড় ছাড়া তেমন কিছুই দিতে পারেনি জীবনসঙ্গীকে। সেই জোহরা আজ বিছানায় শুয়ে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে। স্ত্রীর ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখটার কথা মনে পড়তেই চোখে পানি চলে আসে নুরুলের। সে আবারো তাকায় সামনের রিসিপশনের ডেস্কের দিকে। মাজিদ নামের ভদ্রলোকটার আসার সময় হয়নি এখনো। দুপুর দুইটা বেজে বাইশ মিনিট হয়ে গেছে। সরকারি অফিস, সরকারি ব্যাংক থেকে শুরু করে যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিদারুন অনিয়ম দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু বলার কেউ নেই, দেখারও কেউ নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে এসে দাঁড়ান নুরুল কবির। কী করবেন এখন? যশোরেই ফিরে যাবেন? নাকি বসে অপেক্ষা করবেন? গত চার বছর ধরে তার জমা দেয়া ফাইলটা ফেরত দিয়ে দিচ্ছে এখান থেকে। বলে কিনা, কাগজপত্র অস্পষ্ট। কাগজের কোন জায়গাটায় অস্পষ্ট? কোন বিষয়টা অস্পষ্ট? কিছুই স্পষ্ট করে বলে না। কী করবে বুঝতে পারে না নুরুল। ১৯৮২ সাল থেকে শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৪ সালের বাঘারপাড়ার এমপিওভুক্ত খানপুর দাখিল মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখান থেকে ২০২০ সালের ২১ জুন অবসর গ্রহণ করেন শিক্ষক নুরুল কবির। কিন্তু দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি অবসর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অর্থের অভাবে অসুস্থ স্ত্রী এবং মেয়ের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের প্রতি মাসে চিকিৎসা সেবার জন্য ১০-১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। নিরুপায় নুরুল কবির বাঘারপাড়ার একটি এনজিওতে তেরো হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেছেন। এই বেতনটুকু দিয়েই কোনোরকম ডালভাত খেয়ে বেঁচে আছে তিনটা মুখ। ব্যানবেইস অফিসের সামনে দাঁড়ানো নুরুলের বুক ফেটে কান্না আসছে। কিন্তু তিনি কাঁদতে পারছেন না। ব্যস্ততম নগরীর ব্যস্ততম মানুষেরা আসছে আর যাচ্ছে। ডায়াবেটিসের রোগী নুরুল কবির হঠাৎ শূন্যতা অনুভব করেন। ভোরে ঢাকায় পৌঁছে একটা হোটেলে চা দিয়ে তন্দুর রুটি ভিজিয়ে খেয়েছেন। মনে অনেক আশা ছিল, আজ বোধহয় পেনশনের টাকার একটা ব্যবস্থা হবেই হবে। কিন্তু তিনটা প্রায় ছুঁই ছুঁই। আশার আলো সঞ্চারণের কোনো সম্ভাবনাই নেই। মাথা ঘুরছে। একদিকে টেনশন অন্যদিকে ডায়াবেটিস। পাশের গলিতে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে ধপাস করে বসে পড়ে নুরুল।
– ভাই, চিনি ছাড়া একটা চা দ্যাও দেখি।
দোকানি টুংটাং কাচের কাপে চামচ নেড়ে চা বানাতে লাগে। কী মনে করে, নুরুল আবার বলে ওঠে, ভাই, হালকা চিনি দিও। সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি তো, মিষ্টি জাতীয় কিছু খেলে পরে সুগার লেভেল ঠিক হয়্যা যাবে। সাথে একটা মিষ্টি বিস্কুটও দিও। চায়ের মধ্যে বিস্কুট ডুবিয়ে ডুবিয়ে খেতে থাকেন শিক্ষক নুরুল কবির। হঠাৎ তার নজরে পড়ে অদূরে কয়েকজন কলেজ ছাত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধুমপান করছে। তারা পালা করে করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে আর হাসাহাসি করছে। শিক্ষকমন অশান্ত হয়ে পড়ে। ওদের বয়সী কত ছাত্র উনার হাত ধরে আলোর পথযাত্রী আজ। কত কত ছাত্রদের সাথে হেসে হেসে খেলে খেলে কেটেছে সোনালি সময়। কিছু চিন্তা না করে নুরুল কবির এগিয়ে যায় ছেলেগুলোর দিকে।
বাবারা, তোমরা এই বয়সে ধূমপান কইরতেছো! তোমাদের বাবা-মা জানতে পারলি কত কষ্ট পাবে ভাবো দিকি একবার! নুরুল কবিরের এমন আকস্মিক প্রশ্নে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে কিশোরদল। দুএকজন রেগে গেলেও বাকিরা নিশ্চুপ থাকে। হাতের তালুতে লুকিয়ে ফেলে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ। বাবাগো, তোমাদের সামনে বিশাল সমুদ্র; সুন্দর ভবিষ্যৎ গইড়তে সেই সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। ছেলেগুলোর কোনো বোধদয় হয়েছে বলে মনে হলো না। বরং তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠলো বিরক্তির স্পষ্ট রেখা। ওরা নুরুল কবিরের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রাস্তা পার হয়ে গেলো।
চা-টা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ঠাণ্ডা কাপেই চুমুক দিতে দিতে নুরুল কবির ভাবেন। তিনি নিজে কোনোদিন ধুমপান করেননি, ছিল না অন্য কোনো নেশাও। ছাত্রদেরও পাঠদানের পাশাপাশি সততা ও আদর্শের শিক্ষা দিয়েছেন। সময় পেলেই সফল মানুষের জীবনের গল্প শুনিয়েছেন। ওদেরকে বুঝিয়েছেন টাকাই জীবনের সব নয়। কিন্তু সেই শিক্ষকই আজ টাকার কাছে পরাজিত হয়ে যাচ্ছেন! ভাবতে ভাবতে চোখে পানি চলে এলো তার। কিন্তু কাঁদতে পারলেন না নুরুল কবির। ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে একবার হাঁটুর ছাল উঠে গিয়েছিল। টপাটপ রক্তও বেরিয়েছিল। সে কি জ্বলাটাই না জ্বলছিল বাবারে বাবা! তখন তিনি পঞ্চম কি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এলেন। উঠানে বসে বসে বড় দাদা গায়ে সরষের তেল মালিশ করছিলেন। নুরুলকে কাঁদতে দেখে ভারী গলায় জানতে চাইলেন, কী হইলো? উত্তরে মুখে কিছুই না বলে ছিলে যাওয়া হাঁটুটা দাদার দিকে বাড়িয়ে ধরেছিলো নুরুল।
হুম, তো সমিস্যা কুন জাগায় কতি পারো?
দাদার দ্বিতীয় দফা ভারী গলা শুনে ভয় পেয়ে গেল নুরুল। এবার স্বর চিকন করে কাঁদতে লাগলো আর আড় চোখে দাদাকে দেখতে লাগলো। যদি মেরে বসে, তখন দাদা তাকে সামনে বসিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন; একটা কতা শুইনে রাখো নাতি, পুরুষ মানিষের কুন ব্যতা থাকতি নেই। এখন যাতি পারো। দোকানের বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায় নুরুল। চা বিস্কুটের দাম পরিশোধ করে সামনে পা বাড়ায়। রাস্তার মোড়ে দুইজন রিকশাওয়ালা ঝগড়া করছে। ব্যানবেইসের দিকে যেতে যেতেও হঠাৎ থেমে গেলেন নুরুল কবির। চার বছর ধরে ব্যানবেইসের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনোভাবেই পেলেন না অবসর সুবিধাটুকু। নুরুল কবির আর ফিরলেন না ব্যানবেইসে। বুঝতে পেরেছেন, কিছুই পাবেন না আজও।
জোহরা খুবই অসুস্থ। তাকে বিছানায় শুইয়ে রেখে তিনি ছুটে এসেছেন ঢাকায়। বাসের কাউন্টারে এসে দাঁড়ান কবির। হঠাৎ বেজে উঠলো পকেটের ফোনটা। বিদেশি নাম্বার।
– আসসালামু আলাইকুম স্যার।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। কে বাবা?
– স্যার আমি মন্টি। মন্টি রাঢ়ী। আপনার ছাত্র স্যার। আমি এখন মালয়েশিয়ায় থাকি।
– ও আচ্ছা, আচ্ছা। অনেক বছর আগের কথা- রাঢ়ী নামের এক ছাত্র ছিল তাঁর। রোগা-হ্যাংলা টাইপের। ঝাপসা হয়ে গেছে স্মৃতিপট।
– স্যার, আপনার ব্যাংক একাউন্ট নাম্বারটা দিয়ে রাখেন। আমি সুযোগ করে আপনাকে কিছু সহযোগিতা করবো ইনশাআল্লাহ। আসলে কি নানান সমস্যায় থাকি তো; তাই অনেক ইচ্ছে থাকলে সেভাবে পারা যায় না স্যার।
নুরুল কবিরের চোখে পানি চলে আসে। তাঁর অনেক ছাত্র দেশ-বিদেশে চাকরি করছে। সম্প্রতি তিনি ফেসবুকে লাইভে এসে কথা বলেছেন। না পারতে সহযোগিতা চেয়েছেন। অনেকে যোগাযোগ করেছে, সহোযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কারো সহযোগিতা এসে পৌঁছায়নি। আজ মন্টি রাঢ়ীর ফোন পেয়েও কান্না চলে এলো নুরুলের চোখে। তিনি জানেন না, আদৌ কারো সাহায্য তিনি পাবেন কিনা? কেননা, মানুষের জীবনযাত্রা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে দিন দিন। জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি নানা সংকটে যাপিত জীবন। ইচ্ছা করলেই কেউ পারছে না হাত বাড়াতে। নুরুল কবির যখন তাঁর আপন নিবাসে এসে পৌঁছালো তখন গভীর রাত। চাঁদটা লুকিয়ে আছে ফ্যাকাশে মেঘের অন্তরালে। গুটিকতক ঝিঁঝি পোকার ঝিম ধরা ডাক চিরে যাচ্ছে অন্ধকারের বুক। নুরুল কবির দরজায় টোকা দেন। খুব আস্তে। জোহরা ধীর পায়ে এসে দরজা খুলে দেয়। হাঁটতে পারছে না। নুরুল বুঝতে পারে, খুব কষ্ট হচ্ছে প্রিয় স্ত্রীর।
– কিছু খাইয়েছো? নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে জোহরা।
– হ্যাঁ হ্যাঁ। ব্যানবেইসে অনেক খাবার খাইয়েছি। পেনশনের টাকাটাও দিয়ে দিবে বইললো। তুমি এইসব নিয়ে চিন্তা কইরো না তো। তোমাক কালকি পরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবানি। তুমি ঠিক হয়া যাবা জোহরা।
– হু। স্বামীর কথা শুনে শুকনো হাসি হাসলো জোহরা। যাও হাত-মুক ধুইয়ে আসো। ভাত খাবানি। নুরুল স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রচণ্ড অসুস্থ একজন মানুষ; অথচ কত নির্মল হাসিমুখ। এই সরলতাটুকুই ভালো লাগে নুরুলের। স্ত্রীকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে খুব খারাপ লাগছে তার। কিন্তু উপায় নেই। চারটা বছর ঘুরে ঘুরে ক্ষয় করে ফেললো কত জুতোর শুকতলা; অথচ প্রাপ্য টাকাটা পেলো না। চাপা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে খেতে বসলো। উনার খুব প্রিয় একটা তরকারি রান্না হয়েছে। ঘেট কচু ভাজি আর শুটকি মাছের চচ্চড়ি। জোহরা স্বামীর প্লেটে ভাত তরকারি বেড়ে দিলো। নিজেও নিলো খুব সামান্য। সারাদিন না খাওয়া নুরুল ভাত তরকারি পেয়ে গ্রোগাসে গিলল। উনার খাওয়ার দিকে মমতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জোহরা। জানালায় গভীর অন্ধকার। সেদিকে তাকিয়েই গুনগুনিয়ে গান গেয়ে ওঠে। গানের কথা বোঝা যাচ্ছে না; জড়িয়ে জড়িয়ে আসছে। হারানো দিনের মন ভালো করে দেওয়া কোনো গান হবে। কিন্তু মন খারাপ হয়ে যায় নুরুলের। ভাতের প্লেটে ডাল টলমল করছে। খাবার রেখে তাকায় স্ত্রীর দিকে। দীর্ঘ আঠাশ বছরের সম্পর্ক। অথচ কখনোই তাকানোই হয়নি সুন্দরতম দৃষ্টিতে।
চাঁদটা ধীরে ধীরে লুকিয়ে যায় ঘন মেঘের আড়ালে। খাওয়া-দাওয়া শেষে দুজনেই শুয়ে পেরেছিল। কিন্তু হঠাৎই হাসফাস করতে শুরু করে জোহরা। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাতরাতে থাকে যন্ত্রণায়। উপায় না দেখে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায় নুরুল কবির। ভেতরে চিকিৎসা চলছে। বাহিরে দাঁড়িয়ে অস্থির পায়চারি করতে থাকে নুরুল কবির। এককালীন অবসর সুবিধার টাকাটা পেলে হয়তো সুস্থ হয়ে উঠতো জোহরা। নিরুপায় কবির মাস্টার কেবল পায়চারি করে। একটু পরে কর্তব্যরত ডাক্তার জোহরাকে মৃত ঘোষণা করে। নিদারুণ কষ্টে হাসপাতালের মেঝেতেই বসে পড়েন নুরুল। জীবনের কাছে পরাজিত হয়ে গেছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
