
সাহিত্যপাড়ার গপ্পো
সাইদ হাসান দারা
ঢেঁকিছাঁট সাহিত্যের প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হিসেবে পশুডাক্তার আব্দুর রহমান নিজেও তখন শহরের অন্যান্যদের মতো একই ধরনের তুখোড় সব দিন অতিবাহিত করছিল। এজন্য সে নিজ-বাড়িতে না থেকে, সুযোগ পেতেই পশু-হাসপাতালের আঙিনায় ডিরেক্টর সাহেবের যে বিশাল প্রাসাদ প্রমাণ ফাঁকা বাড়িটা ছিল, সেটায় গিয়ে ওঠে।
তারপর সেখানে অবস্থান নিয়ে চারদিকে পরিবেশ-পরিস্থিতি বেশ করে পর্যবেক্ষণ করে একটা সুব্যবস্থা করতে : যেহেতু সে হাসপাতালের একমাত্র উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সেজন্য নিজেরসহ সমগ্র হাসপাতালটাকে প্রথমেই বিশেষ একটা রুটিনের আওতায় বেঁধে ফেলে।
এই মর্মে সে প্রতিষ্ঠানের কার্যদিবস সকাল আটটার পরিবর্তে, ভোর ছয়টা থেকে শুরু করে। এসময় থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত সে ভর্তি রোগীদের দেখার জন্য হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে-ঘুরে তাদের দেখবে। অপারেশনের কেস থাকলে তার ব্যবস্থা করবে। অর্থাৎ মেষশাবক, ছাগশাবক ও গোশাবকদের অণ্ডকোষ অকার্যকর করা। মোরগদের মুরগিতে রুপান্তর করা।
এরপর দেখবে আউটডোরের টিকিটকাটা রোগী। এটা চলবে সকাল নয়টা থেকে বেলা বারোটা পর্যন্ত। তারপর নাওয়া-খাওয়া সেরে বিশ্রাম নেবে। কিন্তু এই মুহূর্তে যদি কোনো পেশেন্ট তার কাছে আসে, তাহলে তার জন্য তাকে ভিজিট দিতে হবে। তবে যত ভিজিটই তাকে দেয়া হোক : সে হাসপাতালের বাইরে গিয়ে কোনো রোগী দেখতে পারবে না। কারণ সাহিত্যচর্চার বিষণ্নবোধটা তাকে সবসময়ই খুঁচিয়ে চলে। এজন্য সময়-সুযোগ পেলেই সে যেখানে-সেখানে খাতাকলম নিয়ে লিখতে শুরু করে। কিন্তু সেই কাজটায় ইদানীং প্রায়ই যেন বাঁধা পড়ছে!
কারণ কখনো-বা বাইরের রোগী এসে হাজির হচ্ছে অথবা হাসপাতালে যারা ভর্তি ছিল, তাদের একজনের অবস্থা হঠাৎ করে খারাপ হবার খবর এসেছে। কিংবা কোনো রোগীর অকস্মাৎ মৃত্যুর খবর। তখন তাকে খাতাকলম ছেড়ে দ্রুত উঠে যেতে হচ্ছে।
এসব তার নিজের তৈরি রুটিন ধরে আসত না। তারা আসত অসময়ে এবং হুট করে। এছাড়া হাসপাতালটায় একইসঙ্গে মস্তিষ্ক বিকৃতির একটা বিভাগ ছিল। আর বলতে গেলে তার কর্মক্ষেত্রে ওই বিকৃত মস্তিষ্কের প্রাণীগুলোয় তার লেখালেখির প্রধান সমস্যা!
কারণ সাধারণ রোগবালাইয়ে আক্রান্ত জীব-জানোয়ারদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের যেমন অগ্রগতি হয়েছে, মস্তিষ্ক বিকৃতির ক্ষেত্রে ততটা আগায়নি। এমনকি তাদের জন্য বিশেষ ঔষধও তৈরি হয়নি। শুধু কড়া ডোজের ঘুমের ঔষধের সঙ্গে কিছু থেরাপি। আবার এই থেরাপি সম্বন্ধে বিশদ ব্যাখ্যা করে কিছুই লেখা নেই। বরং সামান্য দুচারটে মেন্টালকেসের উদাহরণ দিয়ে জার্নালগুলো পাশ কাটিয়েছে এই বলে যে, রোগীর আচরণ গভীরভাবে লক্ষ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী ও তার স্বভাবের সঙ্গে সংগতি রেখে তাকে নতুন নতুন থেরাপি দিতে হবে। ব্যাস এটুকুই।
শেষে ফুটনোটে লিখা আছে, ‘তিনিই একজন তত উত্তম চিকিৎসক যিনি নিত্যনতুন থেরাপি আবিষ্কার করতে পারেন এবং তার সফল প্রয়োগ জানেন।’ অর্থাৎ যেমন কুকুর তেমন মুগুর। কিন্তু তার রোগীরা কুকুর হলেও আব্দুর রহমান নিজে তো মুগুর নয়। এজন্য সে বেশ চিন্তিত!
প্রথম দিনেই সে হাসপাতালে রাউন্ড দিতে গিয়ে এসব পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারে, অন্যান্য সব কিছু তো বটেই। সেইসঙ্গে তাকে নিয়মিত পাগলা ওয়ার্ডও ভিজিট করতে হবে। তাদের সুস্থ করে তুলতে হবে। আর সেটাই যখন তার দায়িত্ব : সেটা পালন করতে সে পাগলা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখে, সেই ‘গছা’ (গরু এবং ছাগলের জেনেটিং ইঞ্জিনিয়ারিং) নামক জন্তুটা আগের মতোই ঝুলন্ত অবস্থায় আছে। তবে গতদিনের ন্যায় তার মুখে কোনো ফেনা নেই। আর সেখানে গতকালের সেই কাউবয়ের পরিবর্তে অন্য একজন কাউবয়।
তার কাছ থেকে ভর্তি রোগীদের কেসহিস্ট্রির খাতাটি চেয়ে নিয়ে সে এক এক করে দেখতে দেখতে, শেষে যখন সেই ঝুলন্ত গছার কেসহিস্ট্রির পাতাটা পেল। তারপর পড়ে বুঝতে পারল, জন্তুটার অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। সে শুধু যখন রাত্রে ঘুমাতে যায় কিংবা কোনো কারণে কোথাও শোবার ইচ্ছা করে, তখন সে শুয়েই ঘোড়ার মতো গড়াগড়ি দেয় এবং প্রচণ্ডভাবে হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে। সেসময়ে তার আশপাশে যারা থাকে তারা মারাত্মকভাবে আহত হয়।
সেজন্য তাকে আলাদা করে রাখে তার মালিক। কিন্তু তার গড়াগড়ি দেয়া আর ভয়ংকর রকমের হাতপা ছোঁড়াছুড়ি কিছুতেই থামে না। বরং ক্রমেই বেড়ে চলে। সেইসঙ্গে সে ভয়ানক চিৎকার করে পাড়া অতিষ্ঠ করে তোলে। কিন্তু এই অবস্থায় প্রাণীটাকে জবাই করে খেয়ে ফেলাও সম্ভব নয়। কারণ ওটাকে মানৎ করা হয়েছে কোরবানির জন্য!
আব্দুর রহমান সেদিন ভর্তি রোগীদের সবগুলি কেসহিস্ট্রিই পড়ে নেয়। তারা পূর্বে থেকে কী কী ঔষধ পাচ্ছে তাও খুঁটিয়ে দেখে। কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারে না। বলা চলে সবার ক্ষেত্রেই শুধু কড়া ডোজের ঘুমের ঔষধ এবং হিংস্রতা অনুযায়ী মাত্রার কমবেশি ছাড়া বিকল্প কেনো পথ্য নেই।
এ-মুহূর্তে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউবয়কে ডেকে নির্দেশ দেয়, এখন থেকে গছাটা আর কোনো ঔষধ পাবে না এবং তাকে অমন করে ঝুলিয়েও রাখা দরকার নেই। বরং এমনভাবে বেঁধে রাখো, যাতে খুব বেশি ছুটোছুটি করতে না পারে। কিন্তু মেঝেতে যেন আরাম করে শুতে পারে। তবে তার আগে তার শোবার জায়গাটায় পরিমাণ মতো বোমকাঁটা বিছিয়ে দাও। এই থেরাপি কোনো ক্রমেই বন্ধ করা যাবে না। এরসঙ্গে তার ডায়েট কমিয়ে দিতেও সে লিখে দেয়।
তার এই অদ্ভুত চিকিৎসাপদ্ধতিতে মাত্র দুই দিনের মাথায় গছাটি তার রোগদশা থেকে মুক্তি পায়। অর্থাৎ তার উল্লিখিত থেরাপি দেয়া মাত্র সে ভালো হয়ে যায়। কারণ যেই সে দড়িতে ঢিল পেয়ে পুরানো অভ্যাসে হাতপা ছোঁড়াছুঁড়ির নিমিত্তে মেঝেতে শুয়েছে; অমনি মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা বোমকাঁটাগুলো ভচ্ করে তার গায়ে হীনে পড়েছে। ফলে সে তখন যত তাড়াতাড়ি শুয়েছিল তার চেয়ে অনেক দ্রুত প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে!
তাকে এভাবে কয়েকদিন রাখার পর তার উন্নতি হয়েছে ভেবে, তার জন্য থেরাপি পরিবর্তন করতে একটু সদয় হয় আব্দুর রহমান। কিন্তু সেটা টের পেয়ে যায় গছাটি। অর্থাৎ সে আর আগের মতো যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়বে না ভেবে, তার মেঝের বিছিয়ে দেয়া কাঁটাগুলো যখন ঝাঁট দিয়ে সরিয়ে নেয়া হয়। তখন সে আলগোছে মেঝেতে শোয় বটে। কিন্তু আগের মতো হাতপা ছোঁড়াছুড়ি করে না।
তখন আব্দুর রহমান ভাবল, সে হয়তো ভালো হয়ে উঠছে। কিন্তু একদিন পরে দেখা গেল, সে শুধু শুয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করছে না। তখন বুদ্ধি করে সে তার বিরুদ্ধে যেমন কুকুর তেমন মুগুর সিস্টেমে তার জন্যে এমন একটা পরিধেয় পোশাক নির্মাণ করতে নির্দেশ দিলো; যার সাথে খুব ভালোভাবে বোমকাঁটা গেঁথে দেয়া যায়। তাহলে সে যেখানেই শোবে, সেখানে তার জামার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বোমকাঁটাগুলো তাকে খুঁচিয়ে তুলে দেবে।
তার এই পদ্ধতি বেশ চমৎকার কাজ দিয়েছিল। ফলত গছাটির সেই রোগমুক্তির ব্যাপারটি তার পসার ঘটাতে প্রবল সাহায্য করে। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। দূরদূরান্ত থেকে তার কাছে প্রতিদিনই শতশত রোগী আসতে শুরু করে। তবে এর ভেতরে সে একটা বিশেষ ব্যাপার লক্ষ করে বেশ অবাক হয়ে যায়!
কারণ রোগীর মালিকরা তাদের পশুদের বিনে-পয়সায় হাসপাতালে দেখানোর বদলে তার কোয়ার্টারে গিয়ে ভিজিট দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করত বেশি। যেন তার কারবারটাও মানুষের ডাক্তারি? তারা বিশ্বাস করত, হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তাররা রোগীর প্রতি বিশেষ নজর দেয় না। যেহেতু তারা তখন ভিজিট নিতে পারে না! এই ব্যাপারটার নিয়ে ভেতরে ভেতরে খুব পুড়ে যেত আব্দুর রহমান। বিশেষ করে সে মহান এবং সবচেয়ে মহৎ একটি ইচ্ছা লালন করে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ। অর্থাৎ তার সাহিত্যচর্চার বিষয়টি।
এ-সময়ে এক সরকারি ছুটির দিনে, যদিও তার হাসপাতাল ডিউটি ছিল না। কিন্তু আবাসিক চিকিৎসক হিসাবে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে থাকে। তাই ওয়ার্ডের জরুরি কেসের কল এলে তাকে যখন-তখন বাসা থেকে দৌড়াতে হয়। তথাপিও সে বেশ একটা আশায় খাতাকলম নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসেছিল।
অবশ্য পাশে রোগীদেখার আয়োজনও ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে তার সাহিত্যসাধনার কথা বলতে গেলে সেটা এমন যে, সে হয় লিখতে লিখতে রোগী দেখে : নয়তো রোগী দেখতে দেখতে লিখে চলে। এছাড়া তার আর লেখার কোনো উপায় নেই।
যাই হোক, ছুটির সেই সকালে সে একটি অসাধারণ প্রেমের গল্প লিখবে ভেবে, বেশ আয়োজন করে বসেছিল। এই লক্ষে সে সারারাত ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে এত নরম এবং এত মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ের স্বপ্ন দেখেছে যে, জেগে উঠে পুনরায় স্মৃতিতে তার ফর্সা গোলগাল অপরূপা রূপটি দেখে বিমুগ্ধ হয়ে নাম দিয়েছে, বনলতা।
নরম ঝিলমিলে বড় বড় চুল তার। মুখের এক পাশে নিটোল রেখা। হাসলে গালে টোল পড়ে। তার বাছুরের মতো বড় আর কালো কালো চোখে হরিণীর ভীরু-চঞ্চলতা। স্বপ্নের সেই মেয়েটিকে নিয়ে সে একটা সুপ্রেমের গল্প রচনা করবেই করবে, এমন একটা বিশ্বাস নিয়ে সে লেখার টেবিলে বসেছিল। কিন্তু তা যেন আর হয়ে ওঠে না। কারণ কাহিনিটা সে ঠিক কোথা থেকে শুরু করবে, এটা সে ঘণ্টাখানিক ধরেও বুঝতে পারে না। এজন্যে সে সম্মুখের খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
এসময় সে হঠাৎ করে দেখতে পায় দূরে, জলকুমারী নদীর কিনারে ধরে ঘিক্কুল বনের ছায়ায়-ছায়ায় হেঁটে আসছে একজন তরুণী। তার কাঁধে একটা কাব্যিক চটের ব্যাগও রয়েছে।
সে আরেকটু এগিয়ে আসতে আব্দুর রহমান বুঝতে পারল, নারীটি তরুণীদের ন্যায় সাজপোশাক করলেও সে আদতে একজন পরিণত বয়সের রমণী। অতঃপর তাকে সে চিনতেও পারল। বহু আগে আষাঢ়ি কবিতা অনুষ্ঠানে তাকে সে বেশ কয়েকবার দেখেছে। কিন্তু তার সাথে কখনো কথাটথা হয়নি। সে হয়তো একজন লেখিকা!
ঠিক তক্ষুনি তার মনে পড়ল, গত কয়েকদিন আগে সে যখন শহরে গিয়েছিল এবং হঠাৎ করে তুমুল মাহমুদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তখন কথা প্রসঙ্গে তুমুল মাহমুদ তাকে একজন নবীন লেখিকার কথা বলেছিল। সে নাকি পশুসংক্রান্ত কি একটা মারাত্মক নিবন্ধ লিখেছে। গদ্যকার হিসাবে সে যেন তার সেই লেখাটা একটু পড়ে দেখে!
অতঃপর রমণীটি তার বাসার সামনে এগিয়ে আসতেই আব্দুর রহমান তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
তাকে দেখে আগন্তুক তরুণী-সাজের রমণীটি তার ডানহাত কপালে ঠেকিয়ে সালাম দিয়ে, ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা চিঠি বার করে দেয়।
সেটা হাতে নিয়ে খোলা মাত্র আব্দুর রহমান বুঝে যায়, সে আগাম যে-ধারণা করেছিল, ঠিক সেটাই। কাজেই সে রমণীটির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে তাকে ভেতরে আসার আহ্বান জানায়।
তার আমন্ত্রণে রমণীটি তাকে অনুসরণ করে ভেতরে প্রবেশ করে একটা চেয়ারে বসে, তার দিকে সকাতর নয়নে তাকায়। সে তুমুল মাহমুদের থেকে আগেই জানতে পেরেছে, পশুডাক্তার আব্দুর রহমান খুবই সম্ভাবনাময় একজন লেখক। এছাড়া তার সম্বন্ধে ভালোমন্দ সে আরো অনেক কিছুই বলেছে। কাজেই তার বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, তার মধ্যে যে-দোষগুলি আছে; তার অনেক কিছু তার মধ্যেও থাকা খুবই স্বাভাবিক। এজন্যে তারা উভয়ই পরস্পরের জন্য আন্তরিক ও লাভজনক।
আব্দুর রহমান নিজের আসনে বসে ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে মুখ খোলে, ভালো আছেন নিশ্চয়ই!
বর্তমান সময়ে খারাপ থাকার সুযোগ-সময় কোনোটাই নেই! বলেই রমণীটি খিকখিকে এক বন্য আওয়াজে হাসতে লাগল, ডাক্তার সাহেব তো নিজেও একজন লেখক?
তার হাসির ধরনে ও বলার ভঙ্গিমায় আব্দুর রহমান বুঝতে পারে, তুমুল মাহমুদ নিশ্চয়ই তার সম্বন্ধে আজেবাজে কথা বলেছে। কাজেই সে গম্ভীর মুখে উচ্চারণ করল, হুম!
গত কয়েকদিন আগে আপনার একটা লেখা পড়লাম। রমণীটি তাকে খুশি করতে বলে, বেশ চমৎকার লেগেছে লেখাটা! সে জানে তুমুল মাহমুদের মতো তাকেও তার লেখা নিয়ে কথা বলতে হবে এবং উচ্চ-প্রশংসা করতে হবে।
আব্দুর রহমান তার গম্ভীরতা ঝেড়ে ফেলতে নিজের আসনে একটু নড়েচড়ে বসে, কোন লেখাটার কথা বলছেন?
আরে ঐ যে… রামছাগলের সুমতি! রমণীটি মুখ গম্ভীর করে বলে।
ওহ!
আব্দুর রহমান তেমন খুশি হতে পারে না। সে ভেবেছিল, তার সম্প্রতি প্রকাশিত, ‘পাঁঠাপুরাণ’ নামক গল্পটার কথাটা বলবে। সে জিজ্ঞেস করে, কী নাম, আপনার?
বনলতা! রমণীটি মুচকি একটু হেসে বসার ভঙ্গি বদলায়, সংক্ষেপে বনো!
আব্দুর রহমান ভেতরে ভেতরে বেশ খানিকটা চমকে যায়। গতকাল সারারাত ধরে সে যে মেয়েটির স্বপ্ন দেখেছিল তার নামও বনলতা। আর শুধু কি তাই? তার সেই বড় বড় কালোকালো চোখের সঙ্গে যেন এই রমণীর চোখেরও হুবহু মিল! সে নিজের বিস্ময় লুকিয়ে তার বাসায় কাজের মহিলাটির উদ্দেশ্যে হাঁক দেয়, প্রিয়াংকার মা!
তার ডাক পেয়ে প্রিয়াংকার মা-নামক এক ঢলঢল শরীরের শ্যামলা রমণী আসতেই, আব্দুর রহমান অতিথির জন্যে নাশতা দেবার কথা বলে। তারপর বনলতার দিকে তাকিয়ে সকৌতূকে জিজ্ঞেস করে, বনো, কী লিখছেন আপনি?
তার উত্তর দেবার আগেই সেখানে হঠাৎ করে উপস্থিত হয় নোংরা পোশাকের একজন লোক। সে হাসপাতালের কর্মচারী। ভোররাতেও সে একবার তার কাছে এসেছিল। তার ওয়ার্ডে একটা রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। গরুটা ঢিঁসাঢিসি করতে গিয়ে শিং ভেঙে ফেলেছিল।
মারাত্মক রক্তক্ষরণসহ অজ্ঞান অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ট্রিটমেন্টের কারণে যদিও তার জ্ঞান ফেরে। কিন্তু গত কুড়ি ঘণ্টার মধ্যে সে একবারও জাবর কাটেনি। এজন্য মনে হচ্ছে তার হেডইন্জুরি হয়েছে। সেটা সত্যি হলে তাকে মৃত্যুর র্নির্দিষ্ট সময়ের আগ মুহূর্তে জবেহ করতে হবে। যাতে তার মাংস হালালভাবে ভক্ষণ করা যায়। কিন্তু তাই বলে তাকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা ডাক্তারের করে যেতে হবে। অন্যথায় জেল জরিমানাসহ তাকে পশুচোখে হেয় প্রতিপন্ন হতে হবে। কাজেই আব্দুর রহমান মুখ গম্ভীর করে তাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।
ছার, ওই রোগীডা মনে হয় এইবার গেলো গা!
আব্দুর রহমান বিরক্তস্বরে বলে, তুমি প্রতিবারই বলেছ গেল গা। কিন্তু আমি তো গিয়ে দেখতে পেয়েছি, সে ঠিকই আছে!
না ছার! লোকটি জানায়, যেমন পাতলা পায়খানা শুরু হইছে তাতে মনে হয় এইবার ব্যাডা সত্যিই মরবো!
তো ঠিক আছে, যাও! আব্দুর রহমান তার আসন্ন মৃত্যুর কথা বিবেচনা করতে তাকে জবেহ করার সম্মতি দিয়ে বিদায় করতে বলে, কিন্তু মনে রেখো, কোনো ব্যাপারে কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেবে না। তাহলে তোমার নিয়তিও সেই মিথ্যাবাদী রাখালের পথ ধরে বসবে!
সে বিদায় হলে বনলতা মুখ খুলল, একটা বিষয়ে অবাক না-হয়ে পারছি না!
কোনটা?
এই যে একটু আগে আপনি বললেন, মিথ্যবাদী রাখালের নিয়তি। সেটা তো ঈশপের লেখা একটা গল্প, তাই না?
হুম!
কিন্তু বিষয়টা কি ভেবে দেখেছেন, ঈশপ কি নিষ্ঠুরভাবে রাখাল বালককে মিথ্যবাদী বানিয়ে তার মৃত্যুর দায় থেকে সেই সময়ের সুশীল সমাজকে মুক্তি দিয়েছিল? অর্থাৎ তাকে রক্ষার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত ছিল, সেই তাদেরকে।
বলেন কি? আব্দুর রহমান ঘোলা চোখে তাকায়!
টেক ইট ইজি অ্যান্ড কোয়াইট!
বনলতা খুব স্বাভাবিকভাবে বলতে থাকে, সেই ঘটনাটাকে নিয়েই আমি সকল প্রমাণাদি যোগাড় করে একটা প্রবন্ধ লিখেছি। সেটাই আপনাকে দেখাতে এসেছি।
সেজন্যে ব্যাপারটার স্বচ্ছতার জন্যে আমাদেরকে খুব বড় দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। কারণ ঈশপ নামে এই লোকটি যে খুবই বড় মাপের একটা গল্পকার, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ সে এক সত্যবাদী ও দায়িত্বশীল রাখালকে স্রেফ তার কল্পনার জোরে তাকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে দেয় এবং তার মৃত্যু কিংবা হত্যা যাই বলা হোক সেটাকে জায়েজ করে। কিন্তু বড় বড় মনীষীরাও ভুল করে থাকে। ফাঁক থেকে যায় তাদের তাত্ত্বিকতায়। যেটাকে একসময় কালের চাকা হঠাৎ করে উত্থাপন করে সকলকে হকচকিয়ে দেয়!
আমি আপনার কথা একদমই বুঝতে পারছি না?
না বুঝতে পারারই কথা। কারণ বেশিভাগ মানুষ সাধারণত একপেশে চিন্তা করতে অভ্যস্ত।
আপনি কী বলতে চাচ্ছেন, তা কি সংক্ষেপে গুছিয়ে বলবেন?
বলছি, শুনুন! বনলতা পুনরায় তার বসার ভঙ্গি বদলে বলতে লাগল, কিন্তু এই নিয়ে তর্ক করতে পারবেন না, ঠিক আছে?
ঠিক আছে!
বিষয়টা হচ্ছে—ঈশপ লিখেছেন, এক দুষ্ট রাখাল বালক মাঠে গরু চরাতে গিয়ে সে মজা করার জন্যে বাঘ-বাঘ বলে চিৎকার করত। তার সেই চিৎকারে আশপাশের লোকজন যখন লাঠিসোটা নিয়ে তার সাহায্যে এগিয়ে আসত এবং বাঘটিকে দেখতে পেত না, তখন তারা মনে করল সে তাদের সাথে মজা করছে। তাই যেদিন সত্যি সত্যি বাঘ আসে সেদিন তার চিৎকারে কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যায় না। ফলে বাঘটি তাকে হত্যা করে!
বনলতা একটু থেমে দম দিয়ে পুনরায় বলতে শুরু করল, কিন্তু আপনি এই গল্প বিশ্বাস করলেও আমি এখন আর এটা বিশ্বাস করি না। কারণ প্রকৃতই কী ঘটেছিল, তা আমি এখন নিশ্চিত!
প্রকৃত কী হয়ে হয়েছিল? উত্তেজনায় সবকিছু ভুলে আব্দুর রহমান নিজের আসন থেকে উঠে তার সন্তের মতো মোড়ানো মাথায় হাত বোলায়।
বলছি, বসুন!
বনলতা একটু মুচকি হেসে বলতে থাকে, আসলে রাখাল বালকটি মিথ্যেবাদী কিংবা দুষ্ট কোনোটাই ছিল না। বরং সে যেসব প্রাণীদের মাঠে চরাতে নিয়ে যেত তাদের জন্য সে-ছিল বিষম চিন্তিত। কারণ গো-মহিষের বিচরণভূমির চর্তুপার্শ্বেই ছিল গহিন অরণ্য। সেই অরণ্যে বাঘ, ভাল্লুকসহ অনেক মাংসাসী প্রাণী বসবাস করত। এজন্যে সে নিজের ও তার প্রাণীদেও রক্ষার্থে সব সময়ই শঙ্কিত ছিল এবং সে গ্রামবাসীর কাছে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবহিত করে আগেই সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু মুর্খ ও অলস গ্রামবাসী তার কথা বিশ্বাস করেনি। ফলে তার মৃত্যু হয়!
কিন্তু গল্প অনুযায়ী তো স্পষ্ট বোঝা যায় তাকে সাহায্য করতে গ্রামবাসীরা বেশ কয়েকবার এগিয়ে গিয়েছিল! আব্দুর রহমান অনেকদিন আগের পড়া সেই গল্পটির কথা পুনরায় ভেবে নিয়ে বলে।
এটা গ্রামবাসীদের পক্ষে ঈশপের পক্ষপাতিত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে একথা সত্যি যে, প্রথমে এক-আধবার গ্রামবাসী নিজেদের পশুর কথা বিবেচনা করে কেউ কেউ সেখানে গিয়েছিল। তাদের উপস্থিতে বাঘটি পালিয়ে যায়। সেটা ছিল সবচেয়ে যুক্তিসংগত ও স্বাভাবিক। ফলে তারা সেখানে বাঘটিকে দেখতে না পেয়ে দায়িত্বশীল রাখালকে ভর্ৎসনা করে ফিরে আসে।
অতঃপর পুনরায় যখন বাঘের আগমন ঘটে তখন সেই দায়িত্বশীল রাখাল বালক, বাঘ-বাঘ বলে চিৎকার করে। কিন্তু তখন লোকজন তার সাহায্যে না এগিয়ে বরং মশগুল হয়ে ঈশপের গল্প শুনতে থাকে। ফলে বাঘটি অন্য পশুদের হত্যা না করে সেই রাখাল বালটিকে সর্বাগ্রে হত্যা করে। কারণ তার চিৎকার-চেঁচামেচির জন্যে সে গো-মহিষ মেরে ক্ষুধা মেটাতে পারত না!
আপনার এই প্রবন্ধ-প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্য কী? তার বলায় আব্দুর রহমান হতবাক হয়ে গেছে।
উদ্দেশ্যে কিছু নেই। স্রেফ সত্য উদঘাটন…
সকালের সেই ঘটনার পর, ছুটির দিন বলে আব্দুর রহমান বিকেলবেলায় কিছু কেনাকাটার উদ্দেশ্যে নিজের কর্মস্থল থেকে ছুটে এসেছিল শহরের মাঝখানে। কিন্তু হঠাৎ করে স্থানীয় একটা হরতালে শহরটা টেঁসে যাওয়ায় সে বিফল হয়। এ-অবস্থায় কী করবে ভেবে না পেয়ে সে শহরের আভিজাত্যের প্রতীক বলে খ্যাত লেকের ধারে অবস্থিত ‘হোটেল গুড়বালি রেস্তোরাঁ’-টায় যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। শত প্রতিকূলতার মধ্যে রেস্তেরাঁটি খুবই নিরাপদ বলে সন্ধ্যার পর তুমুল মাহমুদ প্রায়ই সেখানে যায়। মোটকথা শহরের সমর্থবানরা, অভিজাতরা প্রায় সকলেই সেখানে যায়।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সে যখন বন্ধ দোকানপাটগুলোর সামনে থেকে সন্ধ্যাকালীন মাস্তান ট্যাক্স দিয়ে হোটেল গুড়বালির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। তখন সন্ধ্যা হব হব অবস্থা। কিন্তু শরতের আকাশটা ছিল মানানসই ঝকঝকে। এজন্যে তখনো চারপাশে অনেক আলো।
সেই ম্রিয়মাণ সাঁঝের আলোর ভেতরে আব্দুর রহমান টুকটুক করে পা ফেলছিল আর সন্ধ্যার নীরব বিষণ্নতা উপভোগ করছিল। এই নিমগ্নতায় সে যখন প্রায় রেস্তঁরাটার কাছে পৌঁছে গেছে তখন সে একজনকে দেখার আগেই যেন তার উপস্থিতি অনুভব করে। কারণ সেই মেয়েটির ওই দৃষ্টিপাত ছিল তাকে যেন আঙুল দিয়ে স্পর্শ করার মতো বাস্তব।
সে চলার মধ্যে চোখ তুলে তাকিয়ে তাকে দেখে, মেয়েটি একটু দূরে রেস্তোরাঁটার প্রবেশ মুখে দাঁড়িয়ে আছে অন্য বেশ্যাদের চাইতে সুস্পষ্ট আলাদা হয়ে।
আব্দুর রহমান তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। কারণ দেখতে বেজায় অল্পবয়সি ওই সুন্দরী তরুণীটি নিঃসন্দেহে একজন বেশ্যা। কিন্তু সে ব্যক্তিগতভাবে ভালোবাসার ক্ষেত্রে পয়সা দেয়াটাকে সব চাইতে ঘৃণা করে। এটা সে কল্পনাও করতে পারে না এবং জীবনেও সে এটা করেনি।
সেজন্য সে রেস্তোরাঁটায় দ্রুত প্রবেশ করতে সেখানকার ছোট্ট ভিড়টার গোলকধাঁধার মধ্যে দিয়ে ডাঙায় তোলা কই মাছের মতো দ্রুত সটকে সটকে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু ওভাবে সে বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে গিয়ে যখন রেস্তোরাঁটার ভেতরের বিশাল খোলা চত্বরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু ইঁট বাঁধানো রাস্তা ধরে চলছে। তখনো সে তার পেছনে সেই অসৎ মেয়েটার জুতোর খটখট শুনতে পায়।
ব্যাপারটা যে এরকম হবে এটা সে আগেও একটু একটু আঁন্দাজ করেছিল। তবুও নিশ্চিত হতে সেই সন্ধ্যার নিঝুমতায় সে পিছনে ফিরে তাকে দেখে। খদ্দের ধরার জন্যে ওরা যে-রকম সেজেগুঁজে থাকে, যেমন উত্তেজক পোশাক-আশাক পরে, ও সেরকম পোশাকই পরে আছে।
এবং রাস্তায় জমে থাকা কাদাজলের ছোট ছোট ডোবানালা পার হবার জন্য মেয়েরা যেমন শাড়ির কুঁচিগুলো তুলে ধরে খানিকটা উঁচু করে হাঁটে দ্রুততার জন্যে; তেমনি ও-ও হেঁটে আসছিল। এদের সে শহরের নানা জায়গায় বেশ দেখেছে।
তবুও সে মেয়েটির সম্বন্ধে চুড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে তার গতিপথ পরিবর্তন করে একটু নিরিবিলির দিকে এগুতে থাকে এবং অল্পতেই বুঝতে পারে, মেয়েটি তাকে অনুসরণ করছে। তখন সে সিদ্ধান্ত নিয়ে আর সম্মুখে না গিয়ে পথের মাঝে আচমকা ঘুরে দাঁড়ায়।
অতঃপর মেয়েটি এগিয়ে এলে সে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যবশত একটু মিষ্টি করে হেসে বলে, তুমি খামাখা আমার পিছু নিয়েছ সুন্দরী। আমি ওসব করি না!
আলবৎ করেন। আপনার মুখ দেখলেই ওটা স্পষ্ট বোঝা যায়!
মিস ডোনা তার করুণ নিয়তিটাকে মেনে নিয়ে তার মুখের ওপর কথাটা বলে তাকে একটা টেবিলের দিকে টেনে নিয়ে যায়। সেইসঙ্গে বলতে থাকে, আমার মতে কাজটা আপনি প্রায় করেন। পক্ষান্তরে এমনই মুখ বুঁজে থাকেন যেন সেটাই আপনার বাঁচামরা। কারণ আপনারা বিশ্বাস করেন যে, এই সতর্কতা ও সুবিবেচেনার ওপরেই আপনাদের সামাজিক অবস্থান নির্ভর করছে, বলুন ঠিক কিনা?
মেয়েটির কথায় অবাক হয় না আব্দুর রহমান। তবে তাকে সে একটা মনের মতো উত্তর দিতে চাইল। কিন্তু পারল না। কারণ মানুষের মন যেমন মাঝেমাঝে বেশ্যাসুলভ আচরণ করে বসে, চালাকি করে, ওই মুহূর্তে তার হৃদয়ও তার নিজের সঙ্গে ওই একই আচরণ করে বোলতার মতো মেয়েটিতে মজে গিয়ে।
অতঃপর সেই সন্ধ্যায় আচ্ছন্নতায় তার কাছে থেকে একটু একটু করে জানতে পারে, তার নাম, মিস ডোনা। সে শহরের নামকরা মাল্টিপ্যাথ প্যাথলজি ও ডায়গনস্টিক সেন্টারের একজন স্টাফ। সে আগ বাড়িয়ে নিজের থেকে খাবারের অর্ডার দিয়ে তার পেছন নেবার উদ্দেশ্যগুলো এক এক করে বলতে শুরু করে।
তার কেনা খাবার খেতে খেতে ও তার কথা শুনে আব্দুর রহমান এতই অবাক হয়ে যায় যে, সে ‘হুম’ বলতেও ভুলে যায়। কারণ তার ভাষ্য অনুযায়ী বর্তমানে শহরে মানুষের মতো পশু-পাখিদের চিকিৎসা সুবিধার জন্য আলাদা প্যাথলজি সেন্টার খোলা হয়েছে।
এই তথ্য জানাতে গিয়ে মিস ডোনা তাকে আরো জানায়, এজন্য এখন থেকে পা-ভাঙা ঘোড়াদের আর আগের মতো মেরে ফেলা হয় না। বরং তার পায়ের এক্সরে করে, তার ভাঙা হাড়ে স্টিলের পাত দিয়ে জুৎসইভাবে স্ক্রু দিয়ে লাগিয়ে দেয়া হয়। তারপর কঠিন করে প্লাস্টার করে দেয়া হয়। এতে সে মাস দুয়েকের মধ্যে ভালো হয়ে পুনরায় কর্মজীবনের ফিরে যায়।
পাশাপাশি গরু-ছাগল টিবি রোগে আক্রান্ত কিনা সেটাও আজকাল মানুষের মতো এক্সরে করে দেখা হয়। এছাড়া ভালো জাতের গাভীর পেটে ঠিক কয়টা বাচ্চা ধরেছে, প্রসবের আগ পর্যন্ত তারা ভালোভাবে থাকছে কি থাকছে না; এই ব্যাপারটাও আধুনিক কাউট্রাসনোগ্রাম দ্বারা দেখার বিশেষ সুব্যবস্থা আছে।
কারণ খাঁটি দুধের কারণে এবং আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে শহরের অনেক সৌখিন লোকজনই এখন গাভি পুষতে শুরু করেছে, যা নিয়ে তারা আহ্লাদে আটখানা!
তার লাগামছাড়া কথায় আর বারবনিতা সুলভ আচরণে আব্দুর রহমানের সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে যায়। এজন্যে সে কিছুতেই ঠাওর করতে পারে না, মিস ডোনার জ্ঞানের পরিধিটা আসলে কী অথবা কত দূর? কারণ সে একদিকে যেমন পশুপাখিদের রোগবালাই : এমনকি তাদের পথ্য সম্বন্ধে যতটা জানে, তেমনি সে জ্ঞান রাখে মনুষ্য চিকিৎসার জটিল বিষয়াদি।
যাই হোক, সে-বিষয়ে কোনো কথা জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পায় না আব্দুর রহমান। কারণ মিস ডোনা তখন তাকে আরেকটি বিষয়ে অর্থাৎ তার আসল বিষয়টা পারে। অর্থাৎ সে তার রোগীদেরকে কেনো তাদের প্যাথলজি সেন্টারে পাঠাবে? বিশেষ করে এই শহরে যেহেতু আরো অসংখ্য প্যাথলজি বা ল্যাব আছে?
তার বলার আগে আব্দুর রহমান খুশি গলায় বলে, যেহেতু তোমাদের ল্যাব খুবই অত্যাধুনিক, কম্পিউটারাইজড। সঠিক রির্পোট দাও!
উঁহু, হলো না!
মিস ডোনা তার অ্যালকোহলমিশ্রিত কোকাকোলার বোতলে চোবানো স্ট্র-টা চুষতে চুষতে মাথা ঝাঁকায়, বরং আমাদের থেকে ডাক্তাররা তাদের প্রেরিত রোগীর পারসেন্টটেন্স বা কমিশনটা খুব দ্রুত পেয়ে যায়। এই দেবার ক্ষেত্রে আমরা সবসময়ই আশাতীত রকমের দেই। এর কোনো হেরফের এবং ব্যক্তির ব্যবসায়িক গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করি না। এছাড়া আমরা মানুষের ডাক্তারদের বেলায় যেমন তাদের পাঠানো রোগীর থেকে ফিফটি পারসেন্টটেন্স কমিশন দেই। তেমনি পশুডাক্তাদের বেলাতেও কার্পণ্য করি না। অর্থাৎ তাদেরকেও দেই ফিফটি পারসেন্টটেন্স মানে ৫০ শতাংশ, বুঝতে পেরেছেন?
বলেই সে আব্দুর রহমানের চোখে চোখে স্থির কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে তার জখমি অবস্থাটা বুঝে নিয়ে বলে, এছাড়া আপনি চাইলে আপনার পশু-হাসপাতালের কোয়ার্টারে আমি নিজেই গিয়ে আপনার কমিশনটা দিয়ে আসব। তবে ক্ষেত্রে আপনাকে লক্ষ রাখতে হবে, আপনার তরফ থেকে আমরা যেন প্রতিদিন ত্রিশ/চল্লিশটা রোগী পাই। তারা অন্য কোথাও গেলে হবে না। আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্যাডে টিক দিয়ে তাদের এমনভাবে বুঝিয়ে দেবেন, যেন তারা কোনোভাবেও মাল্টিপ্যাথ ব্যতীত অন্য কোনো ল্যাবে না যায়। আর কেউ যদি যায়, তাহলে তার র্রিপোট আপনি দেখবেন না। ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পুনরায় করে আনতে বলবেন। এতে ভালো ফল পাবেন!
মিস বোলতা? আব্দুর রহমান মেয়েটির নাম মনে করতে পারে না।
মিস বোলতা নয়, মিস ডোনা! খেমটা মেরে শুধরে দেয় মিস ডোনা।
ওই আর কি মানে আমি আপনার কথা কিচ্ছু বুঝতে পারছি না, একদম না! আব্দুর রহমান অন্ধের মতো তাকিয়ে যেন নিজের ভারে তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
আপনি যে কী করে পশুডাক্তার হয়েছিলেন, এটা আমি বুঝতে পারি না। নাকি পুরুষ মানুষগুলোই এমন হাঁদা?
মিস ডোনা বেশ একটা অধিকার নিয়ে বলতে থাকে, সোজা কথা হলো এখন থেকে আপনার কাছে যেসব পশুপাখি ট্রিটমেন্টের জন্য আসবে, তাদেরকে এখন থেকে আপনি আর সন্দেহ অনুযায়ী ঔষধপত্র দিবেন না। একটু দেখেশুনে সরাসরি আমাদের প্রতিষ্ঠানের রিকুইজিশন প্যাডে… বলেই সে টেবিলের ওপর রাখা তারা বাহারী হাতব্যাগটার চেইন টেনে ফাঁক করে, তার ভেতর থেকে একটা ইনভেস্টিগেশন প্যাড বের করে। তারপর সেটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে পুনরায় বলতে লাগল, এখানে সব দেয়া আছে। এখানে যা-যা লেখা আছে তার সব টেস্টই আমাদের এখানে হয়। যেগুলো হয় না, আমরা সেগুলো বাইরে থেকে করিয়ে এনে দিই। আমাদের নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক!
কিন্তু পশুপাখি নিয়ে কি এত মাথাব্যথা…?
আহ! মিস ডোনা বেশ বিরক্ত প্রকাশ করে আব্দুর রহমানকে থামিয়ে দেয়, আসল ব্যাপার হচ্ছে, একজন সরকারি চিকিৎসক হয়ে পাবলিকের মাথাব্যথার সেই যুৎসই কারণটাই আপনাকে সৃষ্টি করতে হবে। অর্থাৎ সন্দেহমূলক একটা গাভিকে হয়তো আপনার কাছে এনে তার মালিক বলছে, আমার গাইটা এত খায় সেই তুলনায় মোটা হয় না দুধও দেয় না!
সেক্ষেত্রে আপনি এখন থেকে তাকে শুধু কৃমির ঔষধ না দিয়ে, তার গোবর ও মুত্রের অর্থাৎ স্টুল অ্যান্ড ইউরিনের সেরোলজিক্যাল টেস্ট করার কথা বলবেন। সেই সঙ্গে তার ব্লাডের একটা রুটিন। অর্থাৎ প্রায় মানুষের মতো, টিসি, ডিসি, ইএসআর এবং হেমোগ্লোবিন। আর এক্ষেত্রে লক্ষ রাখবেন রোগী বা তার গার্ডিয়ান তার রোগ সম্পর্কে কিছু বলছে কিনা? কিংবা কোনো সন্দেহ করছে কিনা?
যদি তারা মুখ ফুটে একটু বলে, আপনি সঙ্গে সঙ্গে তার সমর্থনে ভীতকর আশঙ্কাগুলোর কথা একে একে বলে যাবেন। সেই বলার সময় খেয়াল রাখবেন, আপনার বলাটা যেন অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য হয়!
আব্দুর রহমান তবুও বুঝতে পারে না, কিন্তু যাদের কৃমি হয়নি। জ্বর বা অন্য কিছু রোগ হয়েছে? তাদেরও কি গোবরের আর মূত্রের সেরোলজিক্যাল…?
আমার ধারণা, আপনার চাঁদিটা অমন চকচকে হয়েছে একটা মাত্র কারণে। সেই কারণটা হচ্ছে, আপনি সহজ বিষয়টা সহজ করে বোঝার চেষ্টা করেন না। আমি বলছি, আপনার কাছে যে রোগীই আসুক আপনি একটু দেখেশুনে মানে শুনলেন, জন্তুটার জ্বর এসেছে। কিন্তু জ্বরটা কী জ্বর? এটা তো আর আপনি নিশ্চিত নন। কারণ মানুষের মতো জীবজন্তুদেরও এখন হাজারটা জ্বর হয়। সুতরাং সেই জ্বরো রোগীকে অন্ততপক্ষে ছয় থেকে সাতটা জ্বরের পরীক্ষা করে আনার জন্য আমাদের প্যাডে টিক দিয়ে দেবেন। সেই সঙ্গে একটা রুটিন কালচার। অর্থাৎ ইউরিন, স্টুল, রক্তের শর্করা দেখতে র্যান্ডাম ব্লাড সুগার। তাকে বহুমূত্র রোগে ধরেছে কিনা?
এছাড়া পাটি বড় হলে এবং রোগী স্ত্রী-জাতের হলে অবশ্যই তার বোমাটাসি ডি ভাইরাস পরীক্ষা করে নিতে বলবেন। এতে তার জন্তু হলুদজ্বরাক্রান্ত রোগের মর্মান্তিক শিকার হতে হবে না। এছাড়া তারা ম্যাডকাউের শিকার কিনা, সেটাও টেস্ট করার জন্য উপদেশ দেবেন। এনথ্রাক্স রোগ সম্পর্কে সচেতন করে তুলবেন।
আচ্ছা আচ্ছা! আব্দুর রহমান কোনোক্রমে কথাটা বলে, আমি কাল থেকে আমার রোগীদের পাঠাব। কিন্তু এখন আমাকে একটু বাঁচাবে কি?
কী হয়েছে আপনার? মিস ডোনার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ে।
তুমি, বুঝতে পারোনি?
সেক্ষেত্রে আপনাকে আরো একমাস অপেক্ষা করতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে আপনি, সমগ্র মাসে কমপক্ষে একলক্ষ টাকার রোগী পাঠিয়েছেন। তাহলে আগামী মাসের এক তারিখ সন্ধ্যা নাগাদ আমি আপনার কমিশন পঞ্চাশ হাজার টাকাসহ হাজির হব। তারপর বিশেষ করে আমরা জানতে পেরেছি, আপনি একাই থাকেন ব্যাচেলার মানুষ!
প্রায় যেন ইকতিয়ার খলিলের মতো একই হাঁপানীতে প্রায় অসাঢ় হয়ে পড়ে আব্দুর রহমান। তার মনে হয় এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজনে সে এই মেয়েটিকে বিয়ে করবে। সে আকুলি-বিকুলি করে বলে, এর কি কোনোই বিকল্প নেই?
আছে! মিস ডোনা বেশ একটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে, সেক্ষেত্রে আপনাকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে এবং আমার পারিশ্রমিক দিতে হবে। যেহেতু আপনারা আমাকে স্রেফ একজন যৌনকর্মী ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেন না!
ঠিক আছে, ঠিক আছে! বলেই মনে মনে আব্দুর রহমান এক ফুৎকারে তার ব্যক্তিগত নীতিমালার শিখাটাকে নিভিয়ে দিয়ে সে, মিস ডোনাকে বগলদাবা করে উঠে পড়ে। আর ওভাবেই সে যখন তাকে তার নিজের আস্তানায় এনে সৌখিন খাটের পর শোয়ায়, ততক্ষণে মিস ডোনার পরনে শুধু সিল্কের অন্তর্বাস জাতীয় দুখণ্ড পোশাক।
আব্দুর রহমান অভিভূত হয়ে যায় তার সৌন্দর্যের যেন সত্যিই কোনো সীমা পরিসীমা নেই। তার যেন সব কিছুই বড়সড়ো ও তীব্র-তীক্ষ্ম। অপূর্ব তার মোহিনী উরুযুগল। তার ত্বক যেন আগুন ধরানো এক ত্বক : তেমনি বিস্ময়কর স্তনযুগল। নিখুঁত দন্তপাটি।
মোটকথা তার সমগ্র দেহ থেকে যেন সুস্বাস্থ্য আর প্রখর যৌনতার একটা ভাপ বিকীর্ণ হচ্ছে। সে বিস্ময়ে বিড়বিড়ি করে সব কিছু ভুলেও সহসা জিজ্ঞেস করে বসে, বনো, তোমার এইচআইভি পজেটিভ নয়তো…
