
ঠিক ভরদুপুরে একদিন
সাইয়িদ রফিকুল হক
হাতেম শেখ প্রায়ই মাছ ধরতে আসে মল্লিকবাড়ির পুকুরে।
আজও ভরদুপুরে এলো। অবশ্য আজ তার এখানে আসার তেমন কোনো ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু নিতান্ত বাধ্য হয়ে আজ এইসময় তাকে এখানে আসতে হয়েছে। এর পিছনে একটা বেদনাদায়ক কারণও আছে।
দুপুরে গোসলের পর সে ভাত খাওয়ার জন্য রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল। প্রতিদিন এখানে একটা মাদুর পেতে তার ওপরে খুব আয়েশ করে বসে সে ধীরেসুস্থে ভাত খায়। এটা তার বহুদিনের পুরানো অভ্যাস। সে এটা কিছুতেই ছাড়তে পারছে না।
তার বাড়ির আসবাবপত্রের চেহারাসুরত বদলেছে অনেক আগে। ডাইনিং-রুমে চেয়ার-টেবিল এসেছে। কিন্তু তাতে বসে ভাত খেয়ে মনে প্রশান্তিলাভ করতে পারে না হাতেম শেখ। সবসময় এখানেই তার মন টানে। একদা তার বাপ-দাদাও এভাবে মাদুর পেতে ভাত খেয়েছে। সেও ভাত খাওয়ার সময় পূর্বপুরুষদের মতো পদ্মাসনে বসতে-বসতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সে সবেমাত্র রান্নাঘরের চৌকাঠে পা দিয়েছে এমন সময় তার স্ত্রী আলেকজান বিবি ওরফে মায়া বলে উঠল, ‘সারাদিন শুধু রাজনীতি আর গল্পগুজব নিয়ে মেতে থাকো। কোনোরকমে দোকানটা চালাও। আর সময় পেলে করো আড্ডাবাজি। এসব না-করে এইসময়টা একটু সংসারের কথা ভাবলে আমাগরে আয়উন্নতি আরও বেশি হইত। আর দেখতে-দেখতে আমাগরে একতলা দালানটা দুইতলা হয়ে যাইত!’
আচমকা স্ত্রীর এমন একটা আক্রমণাত্মক কথা শুনে হাতেম শেখ সহসা কিছু বলল না। আর সে যে কিছু বলবে তার কোনো লক্ষণও দেখা গেল না।
সারাটা সকাল হাতেম শেখ ভারেঙ্গার নতুন বাজারে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছে ঠিকই—সঙ্গে সে নিজের দোকানটাও সামলেছে ভালোভাবে। নইলে তার সংসার চলবে কীভাবে। সে আড্ডাবাজ মানুষ। কিন্তু দায়দায়িত্ব এড়িয়ে কখনো এইসব করে না। তবু তার স্ত্রী খুঁতখুঁত করে সারাক্ষণ। আর সবসময় তার দোষ ধরার চেষ্টা করে থাকে। এসব তাকে খুব ব্যথিত করে। তবু সে একটা অদৃশ্য কারণে সব সয়ে যায়।
সে মানুষের সঙ্গে নিয়মিত গল্পগুজব করে, আড্ডা দেয় আবার দোকানও চালায়। কিন্তু তার স্ত্রী তার এই আড্ডাবাজি আর গল্পগুজব একেবারে সহ্য করতে পারে না। তাই, সে একটু সুযোগ পেলেই এসবের বিরুদ্ধে ফোঁড়ন কাটতে কোনোরকম দ্বিধা করে না। এটা এখন তার প্রায় নিত্যদিনের স্বভাবে দাঁড়িয়েছে।
অনেকসময় এসব মুখ বুঁজে সয়ে যায় হাতেম শেখ। এমনিতে সে নির্বিবাদী মানুষ। অহেতুক ঝগড়াঝাঁটি পছন্দ করে না। কিন্তু আজ স্ত্রীর এমন একটা চাঁছা-ছোলা কথা শুনে তার মনে ভীষণ রাগের উদয় হলো। নিজের রাগ দমন করার জন্য তাইতে ভাত না-খেয়ে মাছ ধরার গোটা চারেক ছিপ হাতে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল মল্লিকবাড়ির পুকুরের উদ্দেশে।
জব্বার মল্লিকের এই পুষ্করিণীতে মাছ ধরতে তার খুব ভালো লাগে। এখানে প্রচুর মাছ আছে। লোকজন এসব জানে। কিন্তু কেউ এর আশপাশে ঘেঁষে না। কখনো এর কাছে ঘেঁষতে সাহসও পায় না। এই পুকুরে অন্য কোনো লোকজন কিংবা এর মালিকপক্ষ কখনো এখানে মাছ চাষ করে না। তবু সারাবছর এই পুকুরটা মাছে ভরে থাকে! এটাও একটা ভারী আশ্চর্যরকমের ঘটনা! এখানকার লোকেরা এই পুকুরটাকে ঘিরে আরও অনেককিছু জানে। এজন্য লোকে এই পুকুরটাকে একটা ভৌতিক পুকুরও মনে করে থাকে। তবে হাতেম শেখ এসবে কোনো কান দেয় না। এসব কথাবার্তাকে মোটেই পাত্তা দেয় না সে।
এই পুকুরের প্রায় চার-পাশে উঁচু-চওড়া বাঁধ দেওয়া আছে। আর এই বাঁধের সঙ্গে আছে আরও বিস্তৃত ও সুউচ্চ সমতলভূমি। শুধু এর একপাশ দিয়ে একটুখানি কাটা আছে—যেটা পাশের মেঠো জমির সঙ্গে সংযুক্ত। এই মেঠো জমি আবার সরাসরি বিলের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। এটা বিরাট বড়ো একটা দীঘি। বলতে গেলে এই এলাকার সবচেয়ে বড়ো দীঘি এটা। এর ডানদিক দিয়ে বহু বছরের চওড়া সমতলভূমিতে পায়ে হাঁটা একটা রাস্তাও আছে। কিন্তু লোকজন বর্তমানে এইখান দিয়ে তেমন-একটা চলাফেরা করে না বলে এখানেও এখন ঘন জঙ্গল গড়ে উঠছে। আর বলতে গেলে এই রাস্তাটা এখন বন্ধ। একেবারে পরিত্যক্ত যেন! এখান দিয়ে কেউ চলাফেরা করার সাহস পায় না।
এখানে এত মাছ থাকা সত্ত্বেও কেউ মাছ ধরতে আসে না। ঘটনাটা শুনলে কারও কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। নানাবিধ ভয়ের কারণে এটাই এখানকার বাস্তব-সত্য ঘটনা। শুধু যে একটা ভৌতিক ব্যাপারস্যাপার আছে—তা নয়। আরও অনেক কারণ আছে। তবে সবকিছু উপেক্ষা করে মনে চাইলেই এখানে মাছ ধরতে আসে একমাত্র হাতেম শেখ।
বয়স তার চল্লিশের ওপরে। তবে অনেকে বলে, তার বয়স নাকি পঞ্চাশের প্রায় কাছাকাছি কিংবা পঞ্চাশের ওপরে। তবে এই বয়সে মনে তার পুরো সাহস আছে এখনও। কোনোকিছুতে ভয় ধরে না তার ডাকাবুকা বুকে। সে শুধু এখানে মাছ ধরতেই আসে না। মাঝে-মাঝে যেন সময় কাটাতেও আসে। জায়গাটার প্রতি ইদানীং খুব মায়াও জন্মেছে তার।
এই পুকুরের চারপাশটা খুব ঘন গাছপালায় আচ্ছাদিত। এর উত্তর-দক্ষিণ পাশটা একেবারে অন্ধাকারাচ্ছন্ন প্রায়। আফ্রিকার জঙ্গল যেন! লোকজন ভয়ে তাই দিনের বেলায়ও এদিকটা মাড়ায় না। আরও একটা ভয় আছে। কারা যেন এখান দিয়ে চলাফেরা করে! শুধু রাতের বেলায় নয়, দিনের বেলায়ও নাকি ভরদুপুরে তাদের দেখা যায়! খুব ভয়ানক পিশাচ নাকি এরা! এসব নিয়ে গ্রামের লোকজন প্রায়ই এখন বলাবলি করে। কেমন যেন একটা কানাঘুষাও করে থাকে। গ্রামের লোকেরা এমন একটা মিথ এখানে চালু করে দিয়েছে। যার ফলে লোকজন সহজে এদিকটায় আসে না। আগে তবু গাঁয়ের রাখালরা গোরুকে পানি খাওয়াতে এদিকে দিনে দুই-একবার আসত। এখন ভয়ে তারাও এদিকে আসে না। আর ভয়টা শীতের চেয়ে মারাত্মককভাবে পুরো গ্রামে যেন জেঁকে বসেছে!
এসব রোজই শোনে হাতেম শেখ। কিন্তু কোনোকিছু সে গায়ে মাখে না। পরোয়া করে না। এই পুকুরের মাছ তার কাছে খুবই সুস্বাদু মনে হয়। এই মাছের লোভেই সে মাঝে-মাঝে এখানে আসে। তবে বেশিরভাগ সময়ই সে সকালে কিংবা বিকালে আসত। আর সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফিরে যেতে। আজই প্রথম সে এই ভরদুপুরে এসেছে। এইসময় গ্রামের লোকজনের বলা কথাগুলো আজও তার মনে পড়ল।
কিন্তু হাতেম শেখের মনে কোনো ভয় নেই! ভয় যে একেবারে নেই—তা নয়। কিন্তু রাগের সময় সে কাউকে পাত্তা দেয় না। তাই, সে এই ভরদুপুরে চারখানা ছিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে মাছ ধরতে। আসলে, রাগলে মানুষের কোনো ভয়ডর থাকে না।
সে কিছুক্ষণ আগে এসে দক্ষিণদিকের একটা ঘনঝোপের কাছে জুতসইমতো একটা জায়গায় বসেছে। এখানে কী প্রশান্তিদায়ক ছায়া! বসতে-না-বসতে যেন তার চোখে আরামদায়ক একটা ঘুম চলে এলো! এরকম তার আগে কখনো হয়নি। সে তো আগেও এখানে কত মাছ ধরতে এসেছে। সে যেন ঘুমিয়ে পড়বে এখনই! কিন্তু ঘুম এলে তো তার চলবে না। তাকে যে আজ সারাটা বিকেল আর সন্ধ্যা মাছ ধরতে হবে। কারণ, মাছ ধরার নেশায় থাকলে তার পেটের খিদেটা আর মাথাচাড়া দিতে পারবে না।
সে দুচোখের ঘুম তাড়াবার জন্য পুকুরের পানি চোখে দিলো কয়েকবার। এতে তার ঘুম চলে গেল। আপাতত সে স্বস্তি পেল। তারপর সে চিংড়ি মাছের আধার দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন করতে শুরু করল। সবকিছু ঠিকঠাক করে একসময় সে পুকুরে ফেলল চারটে বড়শি।
অনেকক্ষণ হয়ে গেল! একটা বড়শিতেও আজ কেউ কোনো টিপ দিচ্ছে না! কইমাছ, শিংমাছ, কিংবা বড়োজাতের টেংরাগুলোও আসছে না! এমনকি রুইমাছও তো আসছে না! এখানে আজ কারও কোনো সাড়াশব্দ নেই! সে আপনমনে বসে থাকে। তবে মাছ না-ধরায় ভেতরে-ভেতরে খুব উসখুসও করতে থাকে। এখানে ছোটো ও মাঝারি মাছ ছাড়াও রয়েছে বড়ো জাতের রুই, কালবাউস, মৃগেল প্রভৃতি। এসবের লোভে হাতেম শেখ বসে থাকে বিরাট আশায়।
আজ সে এখানে শুধু মাছ ধরতে আসেনি—সময় কাটাতেও এসেছে। হঠাৎ স্ত্রীর এমন একটা কথায় তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে, শেষ বিকেলের আগে তার মন কিছুতেই ভালো হবে না। আর এই ভাঙা মন নিয়ে তাকে হয়তো আরও কয়েক ঘণ্টা এখানে থাকতে হবে। সে আরও ভাবছে, একটু পরে তার ক্ষুধা লাগবে। সঙ্গে চিড়া-মুড়ি কিংবা বিস্কুট-জাতীয় কিছু-একটা আনলে খুব ভালো হতো।
দুই
দুপুরে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরল হাতেম শেখের একমাত্র ছেলে মবিন শেখ। সে বাপকে বন্ধুর মতো ভালোবাসে। বাপের প্রতি তার দয়ামায়াও অনেক বেশি।
সে কাঁধের ব্যাগটা প্রথমে নিজের রুমে রাখল। তারপর মায়ের কাছে আলগোছে জানতে চাইল, ‘বাবা কখন বাড়ি ফিরবে?’
আলেকজান বিবি নিজের দোষ চেপে রেখে বলল, ‘তোর বাপের কামকাইজের কোনো ঠিক আছে! এই ভরদুপুরবেলা গেছে মল্লিকবাড়ির পুকুরে মাছ ধরতে। বেআক্কেল মানুষ একটা! যখন যা মনে চায়—তা-ই করে।’
কথাটা শোনামাত্র মবিন চমকে উঠে বলে, ‘কী কইলে! তুমি বাজানকে এই ভরদুপুরবেলা সেখানে যাইতে বাধা দিলে না কেন? সেখানে নানারকম ভয়ভীতি আছে। এসব কি তুমি জানো না, মা? আজ এই ভরদুপুরবেলা বাজান একা গেছে মাছ ধরতে! এখন কী-না-কী ঘটে!’
আলেকজান বিবি আগের মতো উষ্মা প্রকাশ করে বেশ জোরেশোরে বলে উঠল, ‘আমি তারে কী বলব? তোর বাপ তো কারও কোনো কথা শোনে না।’
ভিতরে-বাইরে হঠাৎ মবিন শেখ বড়ো চঞ্চল হয়ে উঠল। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে গায়ের জামাটা আবার কোনোরকমে গায়ে চাপিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। সে খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে—তার হাতে এখন সময় বেশি নেই!
তা দেখে আলেকজান পিছন থেকে রাগতস্বরে বলল, ‘কিরে, ভাত খাবি না! এই তো আসলি! এমুন ভরদুপুরে আবার কোনখানে চললি?’
মবিন শেখ কথাটা শুনল। কিন্তু মায়ের এ-কথার জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন মনে করল না।
সে শুধু দ্রুতপায়ে যেতে-যেতে বলল, ‘বাজান আসলিপরে একসঙ্গে খাবো নে। তুমি চিন্তা কইরো না।’
মবিন এবার কোনোদিকে না-তাকিয়ে একেবারে হনহন করে সোজাসুজি মল্লিকবাড়ির পুকুরের উদ্দেশে হাঁটতে থাকে। তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তার শরীরটা যেন কাঁপছে!
পথ চলতে-চলতে সে একটার-পর-একটা দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকে। তার বাপটা এখনও সেখানে অক্ষত আছে কিনা—কে জানে! সে এসবও ভাবতে লাগল বারবার।
মল্লিকবাড়ির পুকুরটা নিয়ে আজও তাদের কলেজে ক্লাসের ফাঁকে-ফাঁকে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে নানারকম ভৌতিক কথাবার্তা হয়েছে। আর এসবের অধিকাংশই সত্য। এমনকি কথাপ্রসঙ্গে তাদের ইতিহাসের স্যার জালালউদ্দিন সাহেবও নানান ভয়ের কথা বলেছেন। একবার তার বাবা আফসারউদ্দিন দুপুরবেলা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য এই সংক্ষিপ্ত রাস্তাটা ধরেছিলেন। আর সেদিন তিনি ভয়ংকর একটা বিপদে পড়ে কোনোমতে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, নির্জন দুপুরে, প্রকাশ্য দিবালোকে এখান দিয়ে গেলে কী-আর এমন হবে? তিনি আপনমনে হাঁটছিলেন। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন তার মাথার পিছনদিকে একটা ধাক্কা মারে! প্রথমবারে তিনি ঘাবড়ে যাননি। পরেরবার আবার একইরকম ধাক্কা! এবার তিনি চমকে উঠলেন! সঙ্গে-সঙ্গে পিছনফিরে দেখেন কেউ নেই সেখানে! তিনি আর বিলম্ব করেননি। অমনি ছুটতে শুরু করেছিলেন! তিনি পিছনদিকে আর তাকাননি। দৌড়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। আর ওই রাস্তা দিয়ে কখনো চলাফেরা করেননি। জালাল সাহেবও তা-ই করেন। পিতার মতোন তিনিও খুব সাবধানী হয়েছেন।
আর সেই ভয়ংকর পুকুরে এই ভরদুপুরবেলা তার বাপ গিয়েছে একাকী মাছ ধরতে! কথাটা ভাবতে-ভাবতে মবিন আরও জোরে পা চালাতে লাগল। সে বাপকে খুব ভালোবাসে। বাপটা তার একটুখানি আড্ডাবাজ হলেও মানুষ বড়ো ভালো।
তিন
হাতেম কেমন যেন একটা নেশার ঘোরে আবার ঘুমে তলিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ আগের মতো তার দুচোখ ভরে ঘুম আসছে! সে কিছুতেই এখন ঘুমাতে চাচ্ছে না। কিন্তু ঘুম যে তাকে কিছুতেই ছাড়ছে না! ঘুমের যন্ত্রণায় সে দিশেহারা হয়ে পড়ল।
সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে না-ঘুমাতে। আর ভাবছে, এক্ষুনি হয়তো তার বড়শিতে মাছেরা টিপ দিবে। এমন একটা ভাবনায় সে প্রচণ্ড ঘুম তাড়াবার নানান উপায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোনোকিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। তার সকল উপায় ব্যর্থ হচ্ছে। একসময় সে নিজের আসন ছেড়ে একটু খাদে নেমে পুনরায় পুকুরের জল চোখে দিতে লাগল। কিন্তু এতে কাজের কাজ কিছুই হলো না। কিছুতেই এই ভয়াবহ ঘুম তাড়ানো যাচ্ছে না!
সে আরও কতক্ষণ পুকুরের খাদে নেমে দু-চোখে অনবরত জল দিতে লাগল। এখন তার মনে জিদ চেপে গেছে। সে এবার ঘুম তাড়াবেই।
এখন ঠিক মধ্যদুপুর। পুকুরের আশেপাশে প্রচুর পরিমাণে আলো-বাতাস থাকার কথা। কিন্তু হাতেম শেখের মনে হলো, হঠাৎ যেন এই জায়গাটায় কেমন একটা অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে! আর খুব বড়োসড়ো কোনোকিছুর একটা ছায়া যেন পড়েছে পুকুরের জলের ওপরে! সে ভাবতে লাগল, কী আছে পুকুরের গভীর জলে!
হাতেম শেখ কয়েকবার চারিদিকে তাকিয়ে ছায়াটা যে কীসের—তা বুঝতে পারল না। তবু সে অবাকদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সেদিকে। আর দেখতে থাকে—এটা কীসের ছায়া!
তার যেন ঘোর লেগে গেছে। সে একটা নেশাখোরের মতো একদৃষ্টিতে ছায়াটার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে হলো, ছায়াটা যেন একটুখানি নড়েচড়ে উঠল! তখন সে দেখতে পেল একটা বিরাট-আকৃতির ছায়ামূর্তি পুকুরের উত্তরদিকের বিশাল জামগাছটায় এক পা ছড়িয়ে দিয়ে আর দক্ষিণদিকের বিশাল তালবনের পাশে আরেকটা বড়ো জামগাছে আরেকটা পা ফেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে! জীবনে সে এতবড়ো ছায়ামূর্তি কখনো দেখেনি! আচমকা এমন একটা ব্যাপার দেখে সে ভয়ে ঘাবড়ে না-গেলেও দারুণভাবে বিস্মিত হয়েছে! আর মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ দুটো যেন ছানাবড়া হয়ে গেছে!
ছায়ামূর্তিটাকে আরও ভালোভাবে দেখার জন্য সে উঠে দাঁড়াতে যাবে অমনি দেখে ছায়ামূর্তিটি যেন চোখের পলকে কোথায় একেবারে উধাও হয়ে গেল! হঠাৎ ঘুমঘোরে ভুল দেখেছে মনে করে, সে নিজের চোখ দুটোকে বারবার রগড়াতে লাগল। কিন্তু ছায়ামূর্তিটাকে আর-কোথাও দেখতে পেল না! তবে সে ভুল দেখেনি। একটা সময় এ-বিশ্বাস তার মনে হতে লাগল। আর তখন সে একেবারে জাগ্রত-অবস্থায় ছিল।
চোখের পলকে ঘটে গেছে ঘটনাটা। নিজেকে স্থির রাখার জন্য সে আপন-মনকে নানারকম প্রবোধ দিতে লাগল। আর নিজেকে খুব সাহসীও ভাবছিল। এইসময় তার চারটে বড়শিই টিপ দিতে লাগল। একটা বড়শি খুব জোরে টিপ দিয়ে তা ধরে রাখল। আর বড়শির ফাতনাটা একদম খাড়া হয়ে ডুবে গেল জলে।
তা দেখে হাতেম শেখ ছিপটা উঁচু করতে লাগল। কিন্তু সে ছিপ উঁচু করতে পারল না। তার মনে হলো, বড়োসড়ো কোনো একটা মাছ বড়শিতে আটকিয়েছে। তার চোখেমুখে বিরাট আনন্দ দেখা গেল। আর তো বসে থাকা যায় না! সে এবার উঠে দাঁড়াল। আর গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছিপটাকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু পারল না।
ওদিকে বড়শির ফাতনাটা তখনও জলে ডুবে রয়েছে। তার মানে, মাছ ধরে আছে। সে আবার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু বড়শির ছিপটাকে কোনোভাবেই উঁচু করতে পারল না। সে বুঝতে পারল, ভারী কোনো মাছ হবে হয়তো। মাছটা এখনও আটকিয়ে আছে। বারবার তার তা-ই মনে হতে লাগল। একবার ভাবল, গলাজলে নেমে বড়োসড়ো মাছটা সে হাত দিয়ে ধরে ডাঙায় নিয়ে আসবে। এমন সময় তার বাকি তিনটে বড়শিতেও মাছেরা জোরেশোরে টিপ দিতে শুরু করল। আর সেই তিনটে বড়শির ফাতনাগুলো যেন একেবারে গভীর জলে তলিয়ে যেতে লাগল। তা দেখে দিশেহারা হাতেম শেখ কোনোরকমে আগের বড়শির ছিপটাকে এক হাতে ধরে রেখে বাকি বড়শিগুলোর ছিপও টেনে তুলতে লাগল। কিন্তু পারল না। আগের বড়শির ছিপটার মতো এটাও যেন শক্তকঠিন পাথরে বাঁধা পড়েছে! তবু সে ধীরে ধীরে টানতে লাগল। কোনোভাবেই সে টেনে তুলতে পারছে না। তার বিস্ময়ের সীমা নেই! এমন ঘটনা তার জীবনে আর কখনো ঘটেনি। সে ভাবতে লাগল, এই পুকুরে তাহলে এতবড়ো মাছও ছিল! এতদিন সে এদের নাগাল পায়নি। সে চারটে ছিপকে দুই ভাগে দুটো করে দুই হাতে সজোরে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। তবু এগুলো যেন তার হাত থেকে ছুটে যেতে চাচ্ছে! প্রবল চেষ্টায় সে কোনোরকমে এগুলো ধরে রেখেছে এখনও। কিন্তু সুতায় বারবার যেভাবে টান পড়ছে তাতে মনে হয়, যেকোনো সময় সুতাগুলো ছিঁড়ে যেতে পারে!
হঠাৎ ওর মনে হলো, সুতোর টানে সে যেন পানির কাছে চলে যাচ্ছে! সে ধীরে ধীরে পুকুরের আরও খাদে নেমে যেতে লাগল। নিজেকে সে কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারল না। আর মাছের লোভে সে ছিপগুলোকে ছাড়তেও পারল না। সে ছিপগুলোকে আগলে চারটে মাছই ডাঙায় টেনে তুলতে চাচ্ছে। আর জলের মাছ তাকে যেন একটু-একটু করে টেনে জলে নিয়ে যাচ্ছে! তবু সে ছাড়ছে না। ছাড়বে না। আজ সে চারটে বড়ো মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরবে।
চোখের পলকে হঠাৎ সে একটা প্রচণ্ড হেঁচকা টান অনুভব করল। কোনোভাবেই নিজেকে ডাঙায় আটকিয়ে রাখতে পারল না। আর সে তীব্র টানে একেবারে জলের ভিতরে আছড়ে পড়ল!
সে এবার ছিপ চারটে ছেড়ে দিয়ে প্রথমে নিজে বাঁচার চেষ্টা করছে। তারপর সুবিধা করতে পারলে মাছগুলোকে আবার ডাঙায় তোলার চেষ্টা করবে।
সে এখন সাঁতার জলে বড়শি চারটের সঙ্গে ক্রমাগত ধস্তাধস্তি করতে লাগল। কুলোতে না-পেরে একসয় ছিপগুলো ছেড়ে দিতে লাগল। তাতেও তার শেষরক্ষা হলো না। সে জলে সাঁতার কাটতে পারছিল না। অথচ, সে খুব ভালো সাঁতার জানে। হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন তার পা দুটোকে জাপটে ধরে রয়েছে! এবার চমকে উঠল হাতেম শেখ! আর তখনই তার মনে হলো, সে আর ডাঙায় উঠতে পারবে না কোনোকালে! এতে সে এবার ঘাবড়ে গেল। আর গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে ডাঙার দিকে এগুতে লাগল। কিন্তু পারল না কিছুতেই। সে তার পা দুটোকে এক চুলও নড়াচড়া করতে পারছিল না।
তার পা দুটোকে কেউ এমন শক্তভাবে জাপটে ধরেছে যে, সেখান থেকে ছুটে আসার কোনো কায়দা নেই। জীবনে এই প্রথমবার হাতেম শেখ একটুখানি ভয় পেয়ে গেল। তবু সে পা-দুটোকে নড়াচড়া করে ছাড়াবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু তার পা-দুটো যেন জমাটবদ্ধ সিমেন্টের বস্তার মতো একেবারে ভারী হয়ে রয়েছে! পা দুটো তার কোনো কথাই শুনছে না!
হাতেম শেখ একটুখানি পরে সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়ে পুকুরের গভীর জলে ডুবে যাচ্ছিল!
চার
যুবক মবিন শেখ পুকুরের কাছাকাছি এসে বাপকে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাকতে আরম্ভ করল। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পেল না। তবু সে আবেগমাখাস্বরে বাপকে অনবরত ডেকে চলল। এ ব্যাপারে তার কোনো থামাথামি নেই।
ডাকতে-ডাকতে সে এবার হন্তদন্ত হয়ে পুকুরপাড়ে নেমে এলো। এমন সময় সে দেখল, পুকুরের দক্ষিণদিকে কিছু একটা ডুবে যাচ্ছে! একজন মানুষের মাথার মতোই তো মনে হচ্ছে! সে দৌড়ে সেদিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আর মুখে সমানে বাজান-বাজান রবে ডাকতে-ডাকতে পাগল হয়ে উঠল যেন!
সে আরও কাছাকাছি এসে বলতে লাগল, ‘আমি আইসে পড়েছি, বাজান। আমি আইসে পড়েছি। তোমার কী হইছে, বাজান? তুমি উঠে আইসো, বাজান!’
কথাগুলো বলে সে তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল। তারপর কালবিলম্ব না-করে নেমে পড়ল পুকুরের জলে।
তার চিৎকার শুনে হাতেম শেখের যেন সংবিৎ ফিরে এলো। সে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে তার পা-দুটোকে এবার সমানে নাড়াতে লাগল। আর তখনই তার পা-দুটো যেন আলগা হয়ে এলো! সে ভুস করে ভেসে উঠল জলের ওপরে। তার দম ফিরে এলো এবার।
ততক্ষণে মবিনও এসে পড়েছে তার কাছে। সে বাপকে সজোরে জাপটে ধরে টেনে তুলতে লাগল গলাপানি থেকে।
হাতেম শেখ ছেলের সাহায্যে আস্তে-আস্তে পানি থেকে উঠতে লাগল। তাকে আগের মতো সজোরে জাপটে ধরে পানি থেকে উঠতে সাহায্য করছিল নওজোয়ান মবিন। সে বাপকে কোনোভাবেই ছাড়বে না।
হাতেম শেখকে হাঁটুপানিতে টেনে তোলার পর মবিন বলল, ‘বাজান, তুমি এই ভরদুপুরে পুকুরের পানিতে নামছিলে কেন?’
হাতেম শেখ তখনও ভালোভাবে কোনো কথা বলতে পারছিল না।
মবিন তা দেখে বাপের উত্তরের আশায় না-থেকে আবার বলল, ‘চলো। তাড়াতাড়ি পানি থেকে উঠি।’
সে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে বাপের হাত ধরে বলল, ‘উঠে আসো শিগগির!’
হাতেম শেখ তখনও কোনো কথা বলতে পারছিল না। তার বোধশক্তি কাজ করছিল না। কোনোরকমে হাঁপাতে-হাঁপাতে ডাঙায় উঠে আসতে লাগল। তাকে সাহায্য করল মবিন।
তারপর সে পুকুরপাড়ে শুয়ে খানিকটা জিরোতে লাগল। এইসময় মবিন বাপকে প্রথমে চিৎ ও পরে উপুড় করে পেটে একটু চাপ দিলো। অমনি হড়হড় করে অনেক পানি বেরিয়ে এলো তার পেট ও ফুসফুস থেকে।
এখন হাতেম শেখের বড়ো ভালো লাগছে। সে আরও কিছুটা সময় সেখানে শুয়ে রইলে। এখন তার বিশ্রামের বড়ো প্রয়োজন।
তার পাশে সতর্কদৃষ্টিতে বসে রইল মবিন।
সে পিতার স্বাভাবিক অবস্থা কামনা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে মবিনের সহযোগিতায় উঠে বসল হাতেম শেখ। তার চোখে-মুখে এইবার যেন ভয়ার্তভাব ফুটে উঠল। সে কয়েকবার চারিদিকে তাকাল। আর ঘন-ঘন খুব জোরে-জোরে শ্বাস নিতে লাগল। এর এক ফাঁকে সে ছেলের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, ‘একটা ভয়ানক পিশাচ আছে এই জঙ্গলে! বিশাল আকৃতির! কালো কুচকুচে! সেইটাই মনে হয় মাছের রূপ ধইরে আমারে পানির মধ্যে টাইনে ধরছিল!’
মবিন সব বুঝতে পেরেছে। ভয়ের কথা সব। এসব কথা যেন তার বাপ এখানে আর বলাবলি না-করে সেইজন্য সে বাপের দিকে চেয়ে বলে, ‘এসব কথা বাদ দেও, বাজান। আল্লাহর নাম নেও। তুমি ইট্টু উঠে খাড়াইতে পারলেই আমরা বাড়ি চইলে যাব। পরে না-হয় সব কইয়ো।’
হাতেম শেখ এবার থামে। আবার একটু হাঁপাতে লাগল।
পাঁচ
মবিন ঘন জঙ্গলবেষ্টিত পুকুরের চারিদিকে বেশ কয়েকবার তাকাল। এখানে একেবারে থমথমে পরিবেশ যেন! ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাসের মতো একটা অবস্থা বিরাজ করছে! এখানে আজ এত অন্ধকার কেন! অথচ, সে এখানে আসবার সময় চারিদিকে আলো-ঝলমলে রোদ দেখে এসেছে! সে ভয় না-পেলেও একটা শঙ্কায় পড়ে গেল! আর কেমন যেন একটা খটকা লাগে তার মনে! জীবনে সে কখনো এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। হঠাৎ সে আপনমনে দারুণ একটা অস্বস্তিভাব অনুভব করতে লাগল।
এখানে আর একমুহূর্তও দাঁড়াতে ইচ্ছে করছিল না তার। কিন্তু তার বাপের অবস্থা এখনও ভালো নয়। মাঝে-মাঝে হাঁপাচ্ছে সে! বেশ কাহিল অবস্থা তার।
এমনিতে হাতেম শেখ স্বাস্থ্যবান মানুষ। তাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি নেওয়াটা মবিনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সেইজন্য সে তার বাপের আরেকটু সুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু এই দিনের বেলা এখানকার গা-ছমছমে পরিবেশে থাকতেও তার ইচ্ছে করছিল না। খুব একটা অস্বস্তিতে পড়েছে সে।
সে বাপের মুখের দিকে তাকাল কয়েকবার। কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। তবু এতে দারুণ কাজ হলো।
হাতেম শেখ যেন লাফিয়ে উঠার ভঙ্গিতে বলল, ‘বাজান, ছিপ চারটে হাতে নে। এইখানে আর না। চল, এখনই বাড়ি ফিরে যাই। শয়তানটার চোখ মনে অয় ঘুরতিছে আমাগরে আশেপাশে!’
মবিন আর দাঁড়ায় না। সে সর্বশক্তি দিয়ে তার বাপকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল। তারপর সে মাছধরার ছিপ চারটে একহাতে নিয়ে আরেক হাতে বাপকে ধরে দ্রুতবেগে হাঁটতে লাগল। সে বুঝতে পেরেছে, যত তাড়াতাড়ি এই পুকুরের সীমানা পেরিয়ে যাবে ততই তাদের জন্য মঙ্গল। হয়তো এখানে আরও কোনো আপদবিপদ তাদের জন্য ওঁত পেতে থাকতে পারে। তাই, তাড়াতাড়ি এখান থেকে সটকে পড়াই ভালো।
ওরা খুব সাবধানে মনোযোগ দিয়ে দ্রুত হাঁটছিল। পুকুরের এদিকে নানান জাতের গাছপালাপরিবেষ্টিত ঘন জঙ্গলে ঢাকা বিরান সমতলভূমি। তবু ওরা ঠিকভাবে হাঁটতে পারছিল না। এর কারণ, এদিকের সীমানা অনেক বড়ো। সহজে যেন পথ শেষ হবে না!
ওরা সবেমাত্র ত্রিশ-চল্লিশ গজ সামনে এগিয়েছে—অমনি চারপাশের পরিবেশ বদলাতে শুরু করল। হঠাৎ করে এখানকার তালবনে বিশাল একটা আন্দোলন শুরু হয়েছে যেন! মনে হলো, ভারী কোনোকিছু একটা বসেছে সেখানে!
মবিন আর সেদিকে তাকায় না। আর একটিবারের জন্যও তাকাতে চেষ্টা করল না। সে তার বাপকে নিয়ে পড়িমরি করে সামনের দিকে সমানে ছুটতে লাগল। এসব ব্যাপারে বাপের মতো সেও খুব একটা ভয় পায় না। কিন্তু এখন কেমন যেন একটা অস্থিরতা আর অস্বস্তিভাব বিরাজ করছে তার মনের মধ্যে। হঠাৎ তার কেন এমন হলো—তা মবিন কিছুতেই বুঝতে পারছে না। সে ভয় না-পেলেও এই ফাল্গুন মাসের শেষদিকের ভরদুপুরে খুব ঘামছে! তার গায়ের সমস্ত কাপড়চোপড় এখনও কিছুটা ভেজা অবস্থায় রয়েছে। এতেও তার সামান্যতম শীত লাগছে না! তার কপাল ঘামছে বারবার!
সে আবার গায়ের সমস্ত শক্তি খরচ করে বাপকে জাপটে ধরে হাঁটতে লাগল আগের চেয়ে বেশি গতিতে। তালবনে ভয়ংকর একটাকিছু যে বসেছে—তা সে বেশ ভালোভাবেই টের পেয়েছে। সে ভয় না-পেলেও বেশ আতঙ্কিত!
সে এবার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছে—জীবনে আর কখনো মল্লিকবাড়ির এই পুকুরের ত্রিসীমানায় আসবে না। তার বাপকেও এখানে আসতে দিবে না কখনো! এখানে ভয় আছে! খুব ভয়! দিনদুপুরে, মধ্যদুপুরে, ভরসন্ধ্যায় আর বিজন-রাতে! যারা জানে না—তারা এর কিছুই বুঝতে পারবে না।
ছয়
কিন্তু চাইলেই মানুষের সব আশা পূর্ণ হয় না। এখানে ক্ষণকাল দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছে না-থাকলেও নিয়তি হয়তো লাগাম টেনে ধরেছে তাদের গতিপথে!
মবিন তার বাপকে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিল। একটিবারের জন্যও এখানে আর থামতে চাইছিল না সে। কিন্তু বিধি বাম। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর বাধ্য হয়ে ওদের থামতে হলো।
হাতেম শেখ খুব জোরে পথ চলতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে গেল মাটিতে। মবিন তাকে ধরে রাখতে গিয়েও পারল না। তার দুহাতের মাঝখান থেকে তার বাপের শরীরটা ফসকে গেল! সে বুঝতে পেরেছে, তার বাপের শরীরটা যেন ধীরে ধীরে আরও ভারী হয়ে উঠছে! তার একার পক্ষে তাকে কোনোভাবেই যেন টেনে নেওয়া আর সম্ভব নয়!
মবিন দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে তাড়াতাড়ি তার বাপকে আবার শক্তভাবে জাপটে ধরল। আর তাকে প্রাণপণ সাহায্য করল উঠে দাঁড়াতে। এই পথটুকু তাদের দ্রুত পার হতে হবে। নইলে ঘোরতর বিপদ হতে পারে। সে ভয় না-পেলেও একটা অজানা আশঙ্কায় ভুগতে লাগল।
ইতোমধ্যে তালবনে কী ভয়ানক এক আন্দোলন শুরু হয়েছে যেন! আর তা শুধু তালবন নয়—আশেপাশের সব গাছপালাকেও ক্রমশ ভয়ানকভাবে আন্দোলিত করতে শুরু করে দিয়েছে। খুব অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেদিকে কয়েকবার তাকিয়ে মবিন তা দেখেছেও। ওদিকটা এখন অন্ধকারে যেন ঢেকে গেছে! এই দিনদুপুরে কী এক ভয়ংকর আর অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটছে তাদের চোখের সামনে!
শক্ত মাটিতে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ায় হাতেম শেখ এখনই আবার হাঁটতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এখনও যে তারা তালবনের ভয়ংকর সীমানা পেরিয়ে আসতে পারেনি! তার কী হবে!
মবিন তার বাপকে অনেক অনুনয়বিনয় করে বলে, ‘বাজান, ইট্টু উঠে খাড়াইতে পারবে? তাইলে আমরা বিপদ কাটায়ে উঠতে পারবোনে।’
হাতেম শেখ কিছুটা হাঁপাতে-হাঁপাতে বলে, ‘মনে অয় না রে। পায়ে খুব ব্যথা পাইছি। আর শরীলেও শক্তি তেমন পাইতেছি না। আমার গায়ের সমস্ত শক্তি বুঝি ওই শয়তানটা শুইষে নিতিছে রে!’
বাপের মুখে আচমকা এমন একটা কথা শুনে মবিন এবার একটুখানি ভয় পেলেও ঘাবড়ে যায় না। সে বাপকে অভয় দিয়ে বলে, ‘তবু একটু খাড়াইতে চেষ্টা করো, বাজান। নইলে আমাগরে বড়ো বিপদ হইতে পারে।’
হাতেম শেখ ছেলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসবার চেষ্টা করতে গিয়ে মুখটা কেমন যেন বিকৃত করে ফেলল! আর তা মবিনেরও দৃষ্টি এড়াল না। সে তার বাপকে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ানোর জন্য আর পীড়াপীড়ি করল না।
হাতেম শেখ একটা বড়োসড়ো ও পুরাতন আমগাছের নিচে বসে পড়েছে। এখান থেকে পুকুরের তালবনসহ সবকিছু বেশ দেখা যাচ্ছে।
মবিন তার বাপের পিছনে দাঁড়িয়ে তাকে আড়াল করে রাখে। আর ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়তে থাকে বারবার।
হাতেম শেখ শুধু হাঁপাচ্ছিল। সেই পুকুর থেকে ওঠার পর সে যেমন করছিল এখনও ঠিক তেমনটাই করতে লাগল।
মবিন আগের মতো তার পাশে দাঁড়িয়ে বারবার অভয় দিয়ে যাচ্ছে। আর তার বুকে-মাথায় হাতবুলিয়ে কিছুটা সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করছিল।
ওরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত—ঠিক তখন এই মধ্যদুপুরে তালবনের পাশে বিশাল একটা জামগাছের বড়োসড়ো ডাল মড়মড় আর কড়কড় করে আচমকা ভেঙে পড়ল ওদের চোখের সামনে!
হঠাৎ এমন একটা কাণ্ড ঘটে যাওয়ায় মবিন এবার হকচকিয়ে গেল। তার সাহসটা বুঝি আর টিকবে না! তবুও সে শান্ত থাকার চেষ্টা করে। সে নিজের চোখে দেখেছে এমন কাণ্ড! তার মুখটি যেন এখনও হাঁ হয়ে রয়েছে! সে এ ব্যাপারে কিছু বলে না। সবকিছু চেপে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।
হাতেম শেখও এটা দেখেছে। ক্ষণকাল পরে সে মবিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোনো ঝড়বৃষ্টি-বাদলা নাই! দমকা বাতাসও নাই! আর এখন আশ্বিন মাসও না। তবু এতবড়ো গাছের এতবড়ো একখান ডাল ভাঙবি কেমনে! এসবই ওই পিচাশ-শয়তানের কাজ। শয়তানটা বুঝি এহনও আমার পিছ ছাড়ে নাই! আমারে ওই পুকুরের মদ্যিখানে আবার নিয়ে যাইতে চায়। আর আগের মতো চুবায়ে-চুবায়ে আমারে মাইরে ফেলতে চায়। তাই তো মনে হতিছে রে, বাজান। আমারে বুঝি আর বাঁচাইতে পারবি না!’
মবিন তাকে অভয় দিয়ে বলল, ‘চুপ করো, বাজান। ওসব ভাবার দরকার নাই। আমার কাছ থেইকে তোমারে কেউ কাইড়ে নিতে পারবি নানে। তুমি মনে সাহস রাখো, বাজান। আর তুমি খালি ইট্টু উঠে খাড়ানোর চেষ্টা করো। কোনো শয়তানরে আমরা ভয় পাই না।’
কিন্তু হাতেম শেখ ছেলের এমন কথায় সায় দেয় না। বলে, ‘তুই তো দেহিস নাই—ওই শয়তানের বিরাট মূর্তি! পুকুরের দুই পাড়ে দুইখান বিরাট ঠ্যাং ছড়ায়ে খাড়ায়ে ছিল! আর কী ভয়ংকর দেখতে শয়তানটা!’
ওদের কথা বন্ধ হয়ে যায়। তালবনে আবার বিশাল আন্দোলন শুরু হয়েছে। এবার যেন পিশাচটা তার দুটি বিশাল ডানা মেলে ধরেছে উত্তর-দক্ষিণ দিকে। ঠিক এই মধ্যদুপুরে এরই অপচ্ছায়ায় চারদিকটা ছেয়ে গেছে গাঢ় অন্ধকারে!
মবিন আর দেরি করে না। এবার সে তার বাপকে জাপটে ধরে আগের মতো কোনোরকমে পড়িমরি করে পাগলের মতো ছুটতে লাগল। এবার সে থামবে না। কোনো পিশাচকে ভয় পাবে না।
সে দৌড়ের বেগে সমানতালে ছুটতে থাকে। আর তার সঙ্গে প্রায় খোঁড়াতে-খোঁড়াতে ছুটছে মাঝবয়সী হাতেম শেখ।
কোনো পিশাচ-শয়তানের কাছে ওরা হার মানবে না। ওরা পিশাচ-শয়তানকে কোনো ভয় পায় না।
