অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আবু আফজাল সালেহ-এর গুচ্ছ কবিতা

আবু আফজাল সালেহ-এর গুচ্ছ কবিতা

আফ্রিকার কল্পিত সুখী আসন থেকে ছিনতাই হয়েছি

একসময় তোমার মতো হাসতাম, হাসাতাম
যখন ছোটো ছিলাম, অবুঝ ছিলাম
এখন তো হাসতেই পারি না
হাসলেও শুকনো হাসি—কৃত্রিম হাসি।

আফ্রিকার কল্পিত সুখী আসন থেকে ছিনতাই হয়েছি
কবে থেকে মনে নেই, অজান্তেই
টের পাইনি।

স্বাধীনতা, তোমার জন্য বাঁধনহারা

স্বাধীনতা, তোমার জন্য রক্তগঙ্গা—
পদ্মা-আত্রাই-যমুনা-মেঘনা
কর্ণফুলী-করতোয়া-রূপসা-কীর্তনখোলা
নোনাজলের প্রবাহ
রক্ত, লাশ, যুবতীর বস্ত্র, ছোপ-ছোপ রক্ত।

স্বাধীনতা, তোমার জন্য নীল আকাশে সাত কোটি চাতক
স্বপ্ন বুনে বুনে ক্লান্ত
নিদ্রাহীন নয় মাস, বারুদের আগুন
ত্রি-নট-থ্রি কিংবা বিমানের পাখার বিরুদ্ধে
বজ্রমুষ্ঠির প্রতিরোধ—কী তেঁতুলিয়া, কী টেকনাফ!

স্বাধীনতা, তোমার জন্য আপোসহীন দুর্নিবার
বর্ণিল পোস্টার
প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-সংগ্রাম
যশোর-ঢাকা-গাজীপুর-চট্টগ্রাম-খুলনা
সিকান্দারের, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’
নজরুলের, ‘চির উন্নত মম শির’।

স্বাধীনতা, তোমার জন্য মুমুক্ষু
রক্তে বারুদ নিশানা, দারুণ তৃষ্ণা নয় মাস
না না, সাতচল্লিশ থেকেই বাঁধনহারা
ধ্রুবতারার অনুসরণ।

কেন একটি বন্যফুলকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাব

আমি কেন একটি বন্যফুলকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাব?
সে তো জল-প্রতিরোধী
সে তো বৃষ্টির জ্যাকেট—আনন্দদায়ী এবং আশ্রয়কারী
বরং তাকে জাঁকিয়ে দেই
সে তো তিমির-বিনাশী জোনাকির আলো
সারা বাগানের আলো
সে তো উচ্ছ্বাস, সে তো সৃষ্টিকারী
সে তো বন্যফুল—সরু টানেলের মুখের আলো
সে তো ক্রমশ আকাশচুম্বী—
অযথা, আমি কেন ওই বন্যফুলকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাব!

মূক আর বধির মধ্যে বসবাস

আমি এক কালো মেয়েকে দেখেছি
পথের পাশে বসে—দুঃখী এবং একাকী
আমার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল সে, সে নয় একাকী
কিন্তু বাস করছে মূক আর বধির মধ্যে
কোথাও নেই সবুজ, সবই বিরাণভূমি
তার ফুসফুস উত্তপ্ত করছে কার্বনডাই-অক্সাইড কিংবা কার্বন
তার আলোকিত হৃদয় অন্ধকার করে রেখেছে প্রায় সব অগ্রজ।

টানেলের ওপরারের আলো ধূসর করছে কুয়াশাগুলি
নীল আকাশে হঠাৎ-হঠাৎ অন্ধকার ধূমকেতুর মতো আসে
আমি এক কালো মেয়েকে দেখেছি
পথের পাশে বসে—দুঃখী এবং একাকী
কথাগুলি বলেছিল সে—
বসবাস করছে সে মূক আর বধিদের মধ্যে।

মল্লিকাদের পিঠে অক্ষত দুর্ভাগ্যের নদী

আজ মনে হচ্ছে, আমি কখনোই এত সুন্দর ফুল দেখিনি
এই রূপসী এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে
বসন্তের চাঁদের নিচে দুলছে
দুলছে আর বসন্ত বাতাসের মধুর ধ্বনি
আমি কখনোই এত সুমধুর সংগীত শুনিনি
বসন্ত চাঁদে মল্লিকার ঘ্রাণে মিষ্টি সুর—
যতটা মিষ্টি একটি কণ্ঠস্বর তার সবটুকু
মল্লিকা আমাকে মোহগ্রস্ত করেছে
আমি কখনোই এতো পবিত্র অনুভূতি অনুভব করিনি…

অথচ, এই মল্লিকাদের পিঠে অক্ষত দুর্ভাগ্যের নদী বয়ে যায়
মল্লিকারা এক-একটি মায়া অ্যাঞ্জোলা, সিলভিয়া প্লাথ, বেগম রোকেয়া…

একটু মাটি হই, একটু কাদা হই

চলো না প্রিয়তমা একটু মাটি হই, একটু কাদা হই
জানি, আগাছায় তোমার পায়ের আলতার ছাপ নিচ্ছে চুষে
কী আর করা বলো!
আমরা তো কয়েকজনই
এ-পথে পা বাড়িয়েছি
স্রোতের বিপরীতে কয়জনই-বা যেতে চায়, বলো?

পথ তো মসৃণ নয়—অগোছালো
মেঘে মেঘে ঢাকা—বহুস্তরের রকমফের
তাই তো আকাশও বর্ণিল—ছেঁড়াফাটা
কী আর করা বলো!
তবুও রয়েছে বিস্তর সাধ, সীমাহীন স্বপ্ন।

মাথায় কাজ করে কিছু বোধ
বিস্তীর্ণ জলরাশি—ওপারেই সোনালি চাবি
কী কণ্টকময় লোভ! সঙ্গে নিতে চাই তোমাকেও
চলো না প্রিয়তমা একটু মাটি হই, একটু কাদা হই।

ওই জানোয়ারগুলিকে চলে যেতে বলো এখনই

ওই জানোয়ারগুলিকে চলে যেতে বলো এখনই
আমি ফুল-পাখি নিয়ে বেঁচে থাকব।

ফাগুন আকাশে কৃষ্ণচূড়া পলাশ-শিমুল বনে
রক্তে আগুন শিহরনে
আমি ফুল-পাখি নিয়েই থেকে যেতে চাই
দয়া করে, ওই হিংসুটে জানোয়াগুলিকে তাড়িয়ে দাও—
এই বনে এই নীল আকাশের নিচে
আমি ফুল-পাতা নিয়েই থাকতে চাই।

ইছামতীর তীরের কেউড়াবনে, ইনানীর নীলস্রোতে
গ্রামের দিকের রাস্তার মোড়ের বটবৃক্ষের
মরে যাওয়া মাথাভাঙ্গার তীরেই আমার বসতি
দয়া করে মিথ্যাকে বলো, চলে যেতে
মিথ্যার জানোয়ারগুলিকে যেতে বলো এখনই—
দূরের সমুদ্রে কিংবা গভীর আমাজনে
আমি ফুল-পাখি নিয়েই বেঁচে থাকব।

প্রতিহিংসার নেকড়েগুলিকে এখনই চলে যেতে বলো
দূর আটলান্টিক পেরিয়ে আরও দূরে
লোভাতুর সারমেয়দেরকেও এখনই যেতে বলো
ফিলিস্তিনের কাছাকাছি—বর্বরদের ঘেরাটোপে
আমি ফুল পাখি নিয়ে এখানেই থেকে যেতে চাই
যেখানে নেই ক্ষমতার মাখামাখি, নেই বারুদ
যেখানে আলো দেয় তারা আর জোনাকি।

কবি পরিচিতি
আবু আফজাল সালেহ
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
চুয়াডাঙ্গা

সম্পাদক, বাংলাবাঁক
www.banglabuk.com
(কবি, কবিতা ও সাহিত্যের অন্তর্জাল)
ইমেইল : abuafzalsaleh@gmail.com

Read Previous

এমরান কবির-এর গুচ্ছ কবিতা

Read Next

অনন্ত পৃথ্বীরাজ-এর গুচ্ছ কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *