অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এলিজা খাতুন -
আমিনুল ইসলামের কবিতা : দিগন্তের মতো বিস্তৃত

আমিনুল ইসলামের কবিতা : দিগন্তের মতো বিস্তৃত

এলিজা খাতুন

 

আজ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির একচেটিয়া যুগে বাস করেও একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মানবসভ্যতার মতোই কবিতা বহমান। অনেকটা সভ্যতার ন্যায় কবিতারও নিজস্ব গতিপথ ও গতিবৈচিত্র্য আছে। গতিময়তার কারণে তা আবার পরিবর্তনশীল। সময় ও প্রেক্ষাপটের কারণে বাঁক নেয় কবিতা। ধরা পড়ে কবির কাব্যভাবনার বৈশিষ্ট্য, ভিন্ন ভিন্ন কবির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশভঙ্গি। ব্যক্তির স্বাধিকারবোধ বিকাশের শর্ত মেনে নিয়ে যেকোনো সমাজের কবিতা যদি সেই সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে সাধারণত সেই কবিতার আবেদন দীর্ঘস্থায়ী হয়।

বিজ্ঞানী-সমাজবিজ্ঞানী-রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ তাদের আলোচনায় উল্লেখ করুন বা না করুন, এটা সত্য যে, কোনো জাতির আত্মবিকাশের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দানে ভূমিকা রাখা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম; আমরা তা জানতে পারি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কবিতার ইতিহাস থেকে। মানুষের জীবনের, মনের, মননের, সমাজের, রাষ্ট্রের, পৃথিবীর রূপ ও রূপান্তরের ইতিহাস মানোত্তীর্ণ কবিতার শিল্পশরীরে ধরা পড়ে; এ কথা কবিতাঙ্গনে চিরন্তন একটি সত্য। একটি আয়ুর ভেতর সময়ের ভাঁজে ভাঁজে শরীর ও মনের অজস্র পরিবর্তন ঘটে; তেমনই বোধের রকমফের ও বিবর্তনের সাথে সাথে কবিতার প্রকৃতি বিচিত্র রূপ লাভ করে। একথা মনে রেখে বলা যায়, পৃথিবীর বিস্তৃত ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট স্থান করে নিয়েছে আমিনুল ইসলামের কবিতায়। তাঁর দূরকে নিকট করে তোলার ভাষাসমূহ স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাভাবিক ও প্রাঞ্জল। স্বদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, স্বদেশের নদ-নদী, মাঠঘাট, গ্রামীণ জীবন ইত্যাদি প্রাচুর্য নিয়ে যুক্ত আছে তাঁর বহু কবিতার পরতে ও প্রাণে। স্বজাতির শেকড়-অন্বেষা তাঁর কবিতায় ফুটে ওঠে অনেকসময়। বিষয়টি আমিনুল ইসলামের কবিতার বিভিন্ন আলোচক ইতোমধ্যে তাঁদের আলোচনায় উল্লেখ করেছেন। আপাতত তাঁর একটি কবিতা থেকে একটা উদ্ধৃতি দেওয়া যায়:

সত্তার গভীরে বারুদের গন্ধে টের পাই
আমার শেকড়-সংশ্লিষ্টতায় যে মাটিজল,
তা কোনো এক উত্তাল অতীতে পুড়েছিল
পোড়ামাটি-নীতির লোভী বর্বর অনলে
(‘শেকড় ছুঁয়ে’, বাছাই কবিতা)

আমিনুল ইসলামের এযাবৎ ২০/২৫টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তিনি কত বিষয় নিয়ে এবং কত রকমের কবিতা লিখেছেন, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বৈচিত্র্য তাঁর কবিতার প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর কবিতার বিষয় ও প্রকরণের অনন্যতা নিয়ে এখন পর্যন্ত অনেক গুণী কাব্যসমালোচক আলোচনা করেছেন। সে সম্পর্কে নতুন করে না বললেও চলে। তবু সংক্ষেপে বলা যায়- তাঁর কবিতায় সংমিশ্রিত হয়ে উঠে এসেছে সীমারেখাহীন ভূগোল, মিথ ও ইতিহাস। বিষয়ভাবনার প্রতীকীকরণে, চিত্রকল্প নির্মাণের অভিনবত্বে, উপস্থাপনার কৌশলে, বাস্তবকে আড়াল করতে কল্পচিত্র অঙ্কনে আমিনুল ইসলাম মিশিয়ে দিয়েছেন কবিতার অজস্র নতুন উপাদান ও উপকরণ। তিনি মহাজাগতিক পাঠশালার একজন উৎসাহী শিক্ষার্থী। তাঁর কবিতায় প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক, পৌরাণিক, সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত নানা অনুষঙ্গ আছে। অসংখ্য কবিতায় চেনাজানা ভাষাকে এবং চেনাজানা বিষয়কে নতুন রূপ ও ভাষা দিয়ে জমিয়ে তুলেছেন তিনি। ভাবনা ও ভাষা উভয় বিচারেই আমিনুল ইসলামের কবিতা সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত। কষ্টকল্পনার জোরজবরদস্তি নয়, কঠিন শব্দের অয়োময়তা নয়, তাঁর কবিতায় বোঝা আর না বোঝার মাঝামিাঝি একটা ভালো লাগার আবেদন সৃষ্টি করে, সেটিই তাঁর কবিতার অনন্য ঐশ্বর্য। তাঁর কবিতায় শানিত মেধা ও গভীর হৃদয়াবেগের চমৎকার সংশ্লেষ লক্ষ করা যায়।

সাঁঝের আকাশে এখনো কি ওঠে তারা?
রাতের নদীতে এখনো কি জাগে ঢেউ?
খোলা বাতায়ন এখনো কি চায় সাড়া?
আমাকে পোড়াতে এখনো কি পোড়ে কেউ?
(‘একাকী, অবরণ্যে’, বাছাই কবিতা)

আমিনুল ইসলামের ‘একাকী, অবরণ্যে’ নামক কবিতাটি উৎকৃষ্ট কবিতার আরো একটি দিগন্তকে উন্মোচিত করেছে। কবিতাটি একইসঙ্গে প্রেম ও বিপ্লবের, হতাশা ও সংগ্রামের, আধুনিকতা ও উত্তর আধুনিকতার এবং ধারণা ও প্রতিধারণার। ‘গণতন্ত্র আজ জঙ্গলের অনুসারী / যত বড়ো সে যে তত বড়ো থাবা তার।’- এই কবিতা এক অপ্রিয় নতুন সত্যের উদঘাটন। বর্তমান বিশ্বে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্রগুলো মূলত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত। গণতন্ত্রকে সর্বোত্তম শাসনব্যবস্থা ধরা হয়। অথচ এসব গণতান্ত্রিক দেশের কোনো কানোটি নিজদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নিশ্চিহ্নকরণমুখী নিপীড়ন চালাচ্ছে, কোনো কোনোটি পাশের দেশকে গ্রাস করছে এবং কোনো কোনোটি অন্যান্য দেশের সম্পদ লুট করছে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। ফলে আব্রাহাম লিংকনের সেই প্রশংসিত গণতন্ত্র আজ ‘জংলী শাসনব্যবস্থা’ হয়ে উঠেছে। এমন অবজারভেশন আর কারো কবিতায় কবিতায় দেখা যায় না। এই কবিতায় দেখা যায় প্রথমদিকে কবি ‘উত্তর আধুনিক কাব্যতত্ত্ব’র অনুসারী ছিলেন যা দেরিদা, ফুকো, প্রভাত চৌধুরী, অঞ্জন সেন প্রভৃতি নামগুলোর উল্লেখ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু কবিতার শেষে তিনি সেই উত্তরআধুনিক তত্ত্ব থেকে সরে এসে প্রতিবাদী ও প্রতিরোধী কবি হয়ে উঠেছেন : ‘শপথের কথা বেবাক উঠায়ে লাটে / লাল কালি দিয়ে লিখি দিই প্রতিবাদ।’ কবিতায় উত্তর আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশিত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বিশিষ্ট সমাজচিন্তক চিত্তরঞ্জন চক্রবর্তীর ‘পোস্টমর্ডানিজম : ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের মতাদর্শগত হাতিয়ার’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে পাঠ করা যেতে পারে : ‘মরণোন্মুখ পুঁজিবাদের অন্তর্গত অস্থিরতা, নৈরাজ্য, এককথায় সর্বাত্মক সংকটের অর্থনৈতিক উপরকাঠামো হিসেবে পোস্টমর্ডানিজম গড়ে উঠেছে এবং লালিত হচ্ছে। বিপরীতে মুমূর্ষু পুঁজিবাদ পোস্টমর্ডানিজমকে হাতিয়ার করে বাঁচতে চাইছে। পোস্টমর্ডানিজম হলো একটি নির্ভেজাল নৈরাজ্যবাদী মতাদর্শ- যা মানুষের চিন্তা ও ক্রিয়াকে খণ্ডিত, বিছিন্ন ও লক্ষ্যহীন করে তোলে। এর প্রবক্তারা জানেন, মানুষ যদি যুক্তির নিরিখে বিচার করে তবে সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের লুণ্ঠনের চেহারাটা ধরা পড়ে যাবে। আর যদি শিক্ষিত চিন্তাশীল মানুষ শ্রমিক-চাষির লড়াইয়ের পাশে দাঁড়ায় তবে পুঁজিবাদের জীর্ণ কাঠামোটি ভেঙে পড়বে। ফলে ব্যক্তির সচেতন ক্রিয়া সমষ্টির আন্দোলনে যাতে পরিণত না হতে না পারে সেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থেকেই পোস্ট মর্ডানিজমের ইনটেলেকচুয়াল বাকচাতুর্যের আড়ালে বহু শত বছরের সংগ্রামে গড়ে ওঠা মানুষের যুক্তিভিত্তিক বিচারক্ষমতাকে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। নৈরাজ্যবাদ মানুষের ক্ষোভকে বের করে দিতে পারে কিন্তু ভেঙে গড়তে পারে না। পোস্টমর্ডানিজম তাই সৃজনক্ষমতাহীন এক বন্ধ্যা দর্শন।’(সূত্র : জাকির তালুকদার সম্পাদিত ‘প্রতিপাঠ উত্তর আধুনিকতা’, পৃষ্ঠা ১০৭-১০৮) পোস্টমর্ডানিজমের জোয়ারের যুগে আমিনুল ইসলাম অসম সাহসে কবিতাভাবনায় উজানমুখী হয়েছেন।

কবিতা কি এবং কবিতার ধরন কেমন হওয়া সমীচীন- এই  নিয়ে নানাধরনের মতবাদও অভিমত আছে। তবে এটা প্রায় সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত যে, কবিতা হয়ে ওঠার ন্যূনতম যতগুলো কারণ থাকতে হয়, সেসবের মধ্যে একটি হচ্ছে কাব্যভাষার ও শব্দের স্বতঃস্ফূর্ততা। আমিনুল ইসলামের কাব্যভাবনার মধ্যে আছে নানা অনুষঙ্গ; আছে অজস্র অভিনব উপমা এবং বিশ্বপ্রকৃতির নানাবিধ নতুন দিগন্ত। বিশ্বপ্রকৃতিকে তিনি অনেকখানি নতুন চোখে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে অবলোকন করেছেন। ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য, নদ-নদী, অরণ্য, পাহাড়, সমুদ্র, পৌরাণিক চরিত্র, ঐতিহাসিক স্থান ও চরিত্র, আকাশের চন্দ্র, তারা, দিগন্ত, নীলিমা প্রভৃতি নতুন অর্থব্যঞ্জনায় ও অভিনব শিল্পসৌন্দর্যে অনায়াসে উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। কবিতায় শব্দ ব্যবহারে, ছন্দ ব্যবহারে, জটিল ও সহজবোধ্যতার সংমিশ্রণে, চিত্রকল্প-উপমা-অলংকারের সুসজ্জায় আমিনুল ইসলাম স্বাধীন থাকেন, এটা তাঁর অধিকাংশ কবিতায় পরিলক্ষিত হয়। যদিও কখনো কখনো কিছু অযথা শব্দের ভিড় ধরা দিয়েছে তাঁর কতিপয় কবিতায়, মনে হয়- কিছু কিছু শব্দ বাদ দিলেই সেসব কবিতার স্মার্টনেস নিশ্চিত হতো, তবে সেসবও উপেক্ষণীয় হয়ে পড়ে কবিতার স্বরের সৌগন্ধ্যে। তিনি জনপদে ও পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা প্রেমের রূপ ও প্রকৃতিকে তুলে এনেছেন কবিতায়- বহুমাত্রিক সমাবেশে, সেখানে প্রেম ও প্রকৃতি একাকার হয়ে উঠেছে। সবকিছু মিলিয়ে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে একধরনের নতুন সৃষ্টি। এই অভিনবত্ব তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান ঐশ্বর্য।

হতাশ শ্যামার চোখে ফিলিস্তিনের মতো স্বপ্ন পুড়ে যায়;
অথচ আষাঢ় আনে অঙ্কুর উৎসব!
বিস্মিত রাখাল ভাবে মুগ্ধ-দোটানায় : বীজ না মাটি?

উন্মুক্ত বাজারঘাট, নগরের তপ্ত কোলাহলে
ছায়াকামী চোখ গেলে আপন অন্তরে-
প্রশ্ন জাগে সদৃশ বিস্ময়ে:
আড়ালে তোমার বাঁচা কোন গূঢ় জলে?’
(‘বীজ না মাটি’, বাছাই কবিতা)

বিচিত্র ধরনের শতশত কবিতা রচনার কারিগর আমিনুল ইসলামের কবিতার শিল্পরূপ কেমন? শীতলপাটির গাঁথনির মতো সুসজ্জিত সুনির্মিত কবি আমিনুল ইসলামের কবিতার বুনট। তাঁর কবিতায় অভিনব চিত্রকল্পের শৈল্পিক উপস্থিতি কবিতাকে পাঠকের মনে স্মরণীয় করে রাখার ঐশ্বর্য দান করে। ভাবনায়, আশায় ও বিশ্বাসে মানুষের দ্বৈত সত্তার মনস্তাত্ত্বিক অনুষঙ্গ সুচারুরূপে প্রস্ফুটিত তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতায় একদিকে ভাষার শিল্পমণ্ডিত সজীবতা- যেখানে প্রেম ও ঐতিহ্যসন্ধান নিহিত, অন্যদিকে শুদ্ধ মননের সময়োপযোগী তাড়নায় সমাজ-রাষ্ট্রের না-বোধক অনুষঙ্গসমূহের শৈল্পিক উপস্থাপন। প্রকৃতি ও যান্ত্রিকতা, প্রেম ও প্রতিবাদ সমবেত সৌন্দর্যে রোপিত হয়েছে তাঁর কবিতার জমিতে। আবার তাঁর কবিতায় শোভনীয় রোমান্টিকতা এবং রূঢ় বাস্তবতার বিস্ময়কর সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। আমিনুল ইসলামের কবিতা দুর্বোধ্য নয়, ব্যঞ্জনাময়- পাঠান্তে পাঠকের কাব্যতৃষ্ণাকে গভীরভাবে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। জোছনার মতো মুগ্ধতাময় আলো-আঁধারি ছেয়ে তাকে তাঁর কবিতার ভূগোল।

তবুও তো প্রতিদিন প্রভাতের সূর্য এসে
চুমু খায়-
দূষণের ছোঁয়া লাগা বৃক্ষের অধরে;

মাঝরাতে চুমু দিয়ে ছদ্মবেশী ডেভিডের গালে
অভিচারে হেসে ওঠে
জাতিসংঘের চূড়ায় আসীন আণবিক লোভ’
(‘নিষেধাজ্ঞার মুখে’, বাছাই কবিতা)

নদীস্রোতের মতো সময় ও সভ্যতা নিত্যপরিবর্তনশীল। কবিদেরকেও পরিবর্তনের রথের ডাক শুনতে হয় এবং তার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। সময়ের সাথে পরিবর্তনকে ও পরিস্থিতিকে মননে বেঁধে লেখকগণ মানবিক পৃথিবীর পক্ষাবলম্বন করবেন, এটাই প্রত্যাশিত। সামাজিক বিশ্লেষণে আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্ম-আবিষ্কারের মাধ্যমে অনেক কবি জীবনের নতুন সত্য অনুধাবনে সমর্থ হয়েছেন। একজন শক্তিমান কবির হাতে সাম্যবোধ, প্রেম, ধর্মনিরপেক্ষতা, উন্নত জীবনদৃষ্টি, বিজ্ঞানমনস্কতা, অধিকার অর্জনের প্রশ্নে আত্মপ্রকাশ, রাজনৈতিক মতভেদ, গণতন্ত্র মনস্কতা প্রভৃতি কবিতার গন্তব্যে ও বক্তব্যে শিল্পিত অভিব্যক্তি পায়। কবির বোধ-ব্যক্তিত্ব ও মানসগঠনকে পরিপুষ্ট করে তোলে রাজনীতি-সচেতনতা, যার পরিবর্তনশীল-প্রতিফলন ঘটে সময়ের সমান্তরালে কবিতার বাঁকে বাঁকে। তিনি পরিহাস, প্রতীক, রূপকধর্মিতা ও দূরাশ্রয়ী ভাষাকে নিপুণভাবে ব্যবহার করেন। আমিনুলের কবিতাতেও এসব চোখে পড়ে। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক ভাষ্য রচনা করেন না, তিনি দলান্ধতাকে এড়িয়ে চলেন তবে রাজনৈতিক চেতনা তাঁর কবিতার অন্তরালদেশে ফল্গুধারার মতো প্রবহমান থাকে। সেটা কখনো প্রবলস্রোতা, কখনো-বা মৃদু।

এখানে রক্তের দাগ- ওখানে টাটকা খুলি
বামে বাঘের থাবা- ডানে কুমিরের দাঁত
…  … … …

এ এক অদ্ভুত জঙ্গল- বাঘ ভালুক হরিণ
হায়েনা- আদিম বন্যতার সবকিছু আছে
কিন্তু নেই কোনো নদী, নেই কোনো ছায়া
(‘অদ্ভুত জঙ্গল’, বাছাই কবিতা)

মূলধারায় কবিতা একটি সর্বজনীন ও সর্বভূগোলীয় শিল্প। তবু কোনো কোনো ক্ষেত্রে অঞ্চল বিশেষে ভিন্ন ভাষাভঙ্গির কবিতার অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপারটি নিরর্থক নয়। উপকূলীয় দুর্গম ভূমি বা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ, পাখি, অন্যান্য প্রাণীর জীবনযাপন এবং সমতলের শহরের মানুষ, পাখি ও জীবজন্তুর জীবনযাপনে তারতম্য আছে। অনুরূপভাবে পরিবেশ-পরিস্থিতি, জীবনযাপনের প্রকৃতি, ভাষা-সংস্কৃতি এসবকিছুই স্বাভাবিক প্রভাব রাখে কবিতার সৃষ্টিশৈলীতে, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আনে কবিতার ভাবে ও চরিত্রে। আসলে প্রত্যেক কবির যাপন-ব্যবস্থার পটভূমিতে তাঁর জীবনবোধ ও লিখনশৈলী হয়ে ওঠে ভিন্ন আঙ্গিকের, ভিন্ন ভিন্ন স্বরের। আমিনুল ইসলামের কবিতার অনুষঙ্গ যেমন বৈচিত্র্যের দ্যুতিবেষ্টিত, তেমনি তাঁর কবিতায় এক পরম্পরার আস্বাদ নিহিত। তিনি কোনো অলৌকিক সুরাহার ফুলঝুরিতে আস্থা রাখেননি। রক্তমাংস ভেদ করে হাড়ের কাঠামো পর্যন্ত আলো ফেলে দেখতেই স্বস্তি তাঁর। তিনি বিচিত্র জগৎসংসারের বিদগ্ধ জীবনযাপনে যুক্তি-সংযোগে বিরহকে মধুর করে তুলেছেন। সেই দৃষ্টান্ত মেলে তাঁর ‘প্রণয়ী নদীর কাছে’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিজয়সেনের রাজধানী এবং ভালোবাসার রাজকন্যা’ শীর্ষক দীর্ঘাকৃতির কবিতায়। সে কবিতা থেকে প্রেম ও প্রকৃতির, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের, অতীত ও বর্তমানের— বৈচিত্র্যময় সংশ্লেষের এক অভিনব শৈল্পিক স্বাদ নিতে পারি:

শরতের রোগা সকালটা মাতোয়ারা ঘ্রাণে—কাঁচাধানের সবুজ গন্ধ;
তার সঙ্গে দ্রবীভূত তোমার উষ্ণতার নিকোটিন; দুপাশে সারিবদ্ধ
গাছ, ধানখেত, ওপরে সাদা-কালো আকাশ—‘মোগলে আজম’—
এর দর্শক সবাই, সবার চোখে সেলিমের চোখ, আনারকলি অধর;
গম্রাট আকবর পরাজিত সবখানি পথ—সারাটা সময়। গাড়ির
জানালা ফুঁড়ে তোমার আমার নিঃশ্বাস পদ্মা-যমুনার সম্মিলিত
স্রোত হয়ে মিশে যায় ইলামিত্রের এমবোস স্কেচ আঁকা ভূগোলে।
অথচ আমি জড়িয়ে ধরিনি বাহু, চুমু দিইনি ইচ্ছুক অধরে! আমাকে
টানছিল মঞ্চ; আমাকে টানছিল সংবর্ধনা; আমাকে টানছিল সময়!’
(‘বিজয়সেনের রাজধানী এবং ভালোবাসার রাজকন্যা’)

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কবিতা একটি পরিবর্তনশীল শিল্প। কবিতার ভুবনে যুগে যুগে তত্ত্ব, নান্দনিকতা, দর্শন, আঙ্গিক ইত্যাদি বদলেছে। কবিতার আলোচনায় মনের দরজায় এসে যায় বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য, আদর্শগত তত্ত্ব, শব্দ, ভাষা, চিন্তা, সৌন্দর্য, প্রকাশরীতি ইত্যাদি। আমিনুল ইসলামের কবিতা এইসব অনুষঙ্গকে তাড়িত করে। তাঁর কবিতার বিষয় ও শৈলী উভয়ই পাঠকের ভাবনাকে নাড়িয়ে দেবার ক্ষমতা নিয়ে হাজির হয়। কখনো স্যাটায়ার, কখনো নাটকীয়তা, কখনো-বা প্রতীকায়িত চিত্রকল্প, আবার কখনো প্রচলিত মিথের বিপরীত ব্যবহার তাঁর কবিতাকে ভরে তোলে নতুন স্বাদে। স্যাটায়ার ও পরিহাস তাঁর কবিতাকে একইসঙ্গে অর্থসমৃদ্ধ ও উপভোগ্য করে তোলে। তাঁর বক্তব্যপ্রধান কবিতা যেমন শিল্পসৌকর্যে দরিদ্র নয় তেমনি তাঁর সৌন্দর্যভাবনার কবিতাগুলোও বক্তব্যরিক্ত নয়। বিষয় ও প্রকরণকৌশল এই দুয়ের মধ্যে সুসমন্বয় নিশ্চিত করা তাঁর কবিত্বশক্তির একটি অনন্য দিক।

আহা কী সুখ, দার্শনিক অনিদ্রায় রাত জেগে কষ্টকল্পনার
কষ্ট থাকছে না আর! এ সুযোগে শামুকের কাছে প্রাইভেট
পড়ে শিখে নিচ্ছি—গুটিয়ে নেওয়ার পাঠ;
কেননা, যেমন খাপটি—তেমনটি তলোয়ার!’
(‘কুয়ায়ন’, বাছাই কবিতা)

বুঝে কিংবা না বুঝে অর্থসম্পদ, ক্ষমতা, সম্মান, ভোগবিলাস প্রভৃতির পিছু পিছু নিরন্তর ছুটে চলা মানুষ মাত্রেই প্রশান্তির আশ্রয় চায়। তাই চায় প্রেম, চায় গভীর বন্ধুত্ব। হৃদয়ের প্রশান্তি অনুসন্ধানের মধ্য দিয়েই কবিতায় কাব্যিকতা ও আধুনিকতা সুসজ্জিত রেখে পুনর্জাগরণের কথামালা আমিনুল ইসলামের কবিতায়। সেখানে প্রেম ও মনস্তাত্ত্বিক উজ্জ্বলতা বৃষ্টিধারার মতো শীতল করে দেয় তপ্ত অনুভূতিকে—সুস্থির করে তোলে বিপন্ন ধুলো ওড়া মুহূর্তকে। বৈচিত্র্যময়তার অনায়াস উপস্থিতি আমিনুল ইসলামের কবিতায়। আমিনুল ইসলাম হৃদয়ের প্রশান্তি খুঁজেছেন নর-নারীর আবেগতপ্ত প্রেমে, আলোকিত মানবপ্রেমে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানময় পৃথিবী গঠনের স্বপ্নে। কবি এক জায়গায় বলছেন—

উৎসাহিত আমি,— মুগ্ধডানা মৌমাছি হই—
হাতের কাছেই নন্দনকানন—গন্ধমফলের ঘ্রাণ…
(‘অনুরাগের জানালা’, বাছাই কবিতা)

আমিনুল ইসলাম নগরবাসী হয়েও প্রকৃতিঘনিষ্ঠ কবি। তাঁর কাব্যভাবনায় প্রকৃতি ও জীবনের মেলবন্ধনের ছবি বিস্তৃত, যেখানে সমৃদ্ধ পটভূমি অকৃপণ উদারতায় পাঠকের চিন্তার খোরাক জোগায়, পাঠককে নিয়ে যায় সেই সমস্ত স্থানে, সেই সময়ের তীরে। তিনি মনের গভীরে পুষে রেখেছেন জীবনের নানা রং ছুঁয়ে দেখবার আকাঙ্ক্ষা। এবং সেইসাথে নিজের দেখাটুকুও পাইয়ে দিতে চেয়েছেন বা গেঁথে দিতে চেয়েছেন সমাজের-সংসারের-জীবনের দেওয়ালে—যেখানে প্রেম ও প্রতিবাদ, প্রার্থনা ও পরিহাস, অফিস ও আঙিনা, অঞ্চল ও আন্তর্জাতিকতা সংশ্লেষিত হয়ে যায় এযাবৎ অদেখা একাকারে।

‘আর নক্ষত্রের বর্ণমালায় রচিত পাণ্ডুলিপিখানি
যার শুরুর ও শেষের পাতাগুলো ছেঁড়া, সংরক্ষিত
নীল আর্কাইভে যেখানে পৌঁছাতে পারে না, এমনকি
থোক বরাদ্দে কিংবা ইউনেস্কোর যৌথ অথায়নে গৃহীত
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প।
(‘প্রেম অথবা চাপা-পড়া উপন্যাস’, বাছাই কবিতা)

কবিতায় শব্দ হচ্ছে কবির হাতের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র। সেজন্য বলা হয়, কবিতার ক্ষেত্রে শব্দই ব্রহ্মা। একই শব্দ বিভিন্ন কবি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে থাকেন। আমিনুল ইসলাম শব্দের অভিনব ব্যবহারে এক সুদক্ষ শিল্পী। তিনি অনায়াস সাবলীলতায় ব্যবহার করেন নতুন ও পুরাতন শব্দ, অফিসিয়াল পরিভাষা ও প্রযুক্তিগত নতুন টার্মিনলজি, দেশি ও বিদেশি শব্দ। শব্দ সংযোজনায় যেমন তাঁর স্বকীয়তা, কবিতার গভীরে তেমনি শিল্পবোধের সোনালি স্মারক। তাঁর কবিতায় প্রবাহিত ভালোবাসার ফল্গুধারা এবং প্রজ্জ্বলিত জীবনবোধের গভীর দীপ্তি।

‘আজ কোথাও কোনো আদালত নেই;
নিরুপায় আমি বিকল্প হাওয়ায় আমার তপ্ত অশ্রুকে জলীয়
বাষ্পের বর্ণমালা বানিয়ে লিখে দিই
ঘোলাটে আকাশের খাতায়
তারা সময়ে অসময়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে তোমার
পূর্ণতার আঙিনায়, আবাদি ভূগোলে;’
(‘আমার যত উজ্জ্বল ব্যর্থতা’, বাছাই কবিতা)

আমিনুল ইসলাম জীবনঘনিষ্ঠ কবি। বাস্তবতার মাটি থেকেই তিনি কল্পনার আকাশে উড়াল দেন এবং উড়াল শেষে পুনরায় ফিরে আসেন মাটিতে। তাঁর  কোনো কোনো কবিতায় মানবিক আবেদনে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের প্রতি অপার সহানুভূতি। তিনি কোনো স্বার্থসর্বস্ব আত্মকেন্দ্রিক কবি নন। শিল্পের ধর্ম অক্ষুণ্ন রেখেই তিনি বৃহত্তর সমাজ ও মানবজাতির প্রতি দায়বোধ পোষণ করেন। সমাজে, রাষ্ট্রে ও পৃথিবীতে মানবসৃষ্ট ব্যাধি দেখে উৎকণ্ঠিত হন তিনি এবং একইসঙ্গে সোচ্চার হয়ে ওঠেন প্রতিবাদে।

‘দ্যাখো দূরে—মধ্যপ্রাচ্যে—আফ্রিকায়
দ্যাখো কাছে—দুপাশের পড়শি ভূগোলে
ভেসে যায় প্রেম!
ভেসে যায় অহিংসা!
ভেসে যায় শান্তি!
ভেসে যায় ন্যায়বিচার!
বানে ভেসে যাওয়া শস্যের উপমা এর চেয়ে ভালো
আর কোথায় পাবে?’
(‘প্রাচ্যের অসুখ’, বাছাই কবিতা)

গভীরভাবে ইতিহাস-সচেতন এবং ঐতিহ্যপ্রেমিক আমিনুল ইসলামের অসংখ্য কবিতার গায়ে ইতিহাস ও পৌরাণিক চিত্র লেগে আছে নদীর কিনারে ঢেউয়ের দাগ লেগে থাকার মতোন। তিনি ইতিহাস, ঐতিহ্য, মিথ ইত্যাদির ব্যবহার করেন অতীতের সাথে বর্তমানের যোগসূত্র স্থাপনে এবং ভেদাভেদহীন পৃথিবী রচনার স্বপ্নে মানবজাতির অভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সূত্রটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

‘আমি কিন্তু মোটেও নতুন কোনো আগন্তুক নই,
আমি আসছি সেই তখন থেকেই,
যখন চাঁদসওদাগরের সপ্তডিঙা মধুকর এসে ভিড়ত
ভেনাসের ঘাটে আর রোমান জাহাজগুলো
করতোয়ার ঘাটে গিয়ে
বোঝাই করতো অগ্রগামী প্রভাতের আলো
এবং শরৎ-শিশিরে ঈর্ষা জাগানো—আব-ই রওয়ান।’
(‘অভিবাসী চিরদিন’, বাছাই কবিতা)

আমিনুল ইসলামের কবিতা প্রাণবন্ত ও গতিময়। নিজস্ব জীবনবোধ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গতিশীল ভুবনের পরম সত্যকে উপলব্ধি ও প্রকাশ করেন তিনি। সামাজিক পরিবর্তন ও সভ্যতার বিবর্তনের দিকে তাঁর কবিতার দৃষ্টি জাগ্রত। আবার শব্দের অভিনব, কুশলী ও কৌশলী ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত তিনি। তিনি অনায়াসেই প্রেম ও প্রতিবাদ, সামাজিক ভাঙন ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়কে অভিনব উপমা ও অভূতপূর্ব চিত্রকল্প সহযোগে সমৃদ্ধ কবিতা করে তুলতে পারেন। ইচ্ছা ও অধ্যাবসায় বলে এই ক্ষমতার অধিকার লাভ করেছেন বলেই আমিনুল ইসলামের কলমে এমন বাক্যস্ফুরণ ঘটেছে। তিনি জাগলারের দক্ষতায় শব্দকে নিয়ে নানা রঙে-ঢঙে খেলেছেন এবং শব্দরাও তাকে সহযোগিতা করেছে। দুটি উদাহরণ :

ক.
‘অথচ অনড় তুমি—লেলিয়ে রেখেছ
রাতের জানালা আর দিনের দুয়ারে
আঁধারের রংমাখা একগুঁয়ে কতিপয় নিষেধের র‌্যাব!’
(‘নিষেধাজ্ঞার মুখে’, বাছাই কবিতা)

খ.
‘শপথে কবুল হও—ভেঙে ফেলো আগের শপথ
মিডিয়ায় চোখ রেখে শিখে নাও বিজ্ঞাপনি কলা
প্রয়োজনে পায়ে ধরো—প্রয়োজনে টিপে ধরো গলা
তোমার ভোগের রাতে তুচ্ছ করো আলোর পর্বত।’
(‘সভ্যতার সংঘর্ষ’, বাছাই কবিতা)

আমিনুল ইসলাম গভীরভাবে বিজ্ঞানসচেতন কবি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি আধুনিক। তাঁর কবিতায় ‘মহাবশ্বি’, ‘মহাকর্ষ’, অভিকর্ষ’, ইস্কেপ লেলোসিটি’, ‘ভার’, ‘আয়োনোস্ফিয়ার’, ‘ত্বরণ’, ‘ভারকেন্দ্র’, ‘কক্ষপথ’, ‘আলোকবর্ষ’, ‘আহ্নিকগতি’, ‘কালোবামন’, ‘সাদাবামন’, ‘ব্ল্যাকহোল’, ‘নিউটনের গতিসূত্র’, ‘ডারউইনের বিবর্তনবাদ’, ‘মহাকাশ যান’, ‘অ্যাটমে বন্দি গতি’, ‘সালোক-সংশ্লেষণ’, ‘বিবর্তনবাদ’, এবং এমন আরও অনেক বৈজ্ঞানিক প্রপঞ্চ ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর কবিতার নাম ‘নিউটনের সূত্র’, ‘মহাবিশ্ব’, ‘প্রতিসরণের দিন’, ‘টেপ রেকর্ডার’, ‘অক্সিজেনের বাগান’, ইত্যাদি এবং সেগুলোর মধ্যে উচ্চতর বিজ্ঞানের ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে। তারপরও কবি হিসেবে তিনি সাহিত্যের অবারিত ভুবনে কল্পনার ডানার বিস্তার ঘটানো অব্যাহত রেখেছেন। তিনি বিজ্ঞানের সত্যকে অস্বীকার না করেও কবিতার সীমাহীন সত্যকে শিল্পের অবাধ বিশ্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিজ্ঞান আর কবিতার কল্পনা তাঁর কবিতায় নতুন সৌন্দর্য হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান সমর্থন করে না এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রং তাঁর কবিতাকে উপভোগ্যতার সৌন্দর্যে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছে। এ বিষয়ে তাঁর নিজস্ব কাব্যিক যুক্তিও লক্ষ করা যায়।

‘মেনে তো নিয়েছি, নেই নীলাকাশ, মহাশূন্যে নেই কোনো নীল
তবু মাখি রং বসে বাতায়নে দুই হাতে খুলে দিয়ে খিল;
মন বলে কিছু নেই, নীল নেই, তবু ওড়ে নীলে নীলে মন
যা নেই তা এত বড়ো! এত দামি! দ্যাখো দ্যাখো আকাশ ভ্রমণ!
এও মানি সূর্য সত্য, চিরজ্যোতি—সে কখনো সাগরে ডোবে না
তবু যাই সিন্ধুপাড়ে, সাঁতরাই অসত্যের রঙিন মোহনা।
সত্যের পাথরগুলো তুমি নাও হে বিজ্ঞানী, গড়ো অট্টালিকা
আমি চাই তারো বেশি, পুরাতন দুই হাতে মন ও মৃত্তিকা।
অতএব প্রেম বলে কিছু নেই? না থাকুক! তবু ভালোবাসি
বিজ্ঞানে স্যালুট দিয়ে হে প্রেয়সী, আদিজ্ঞানে আমি ফিরে আসি।’
(‘অসত্যের অনুরাগী’, লীলাবতীর ঘাট)

আমিনুল ইসলাম বিজ্ঞান থেকে উপকরণের মণিমুক্তা নিয়ে সূক্ষ্ম শিল্পীর মতো নিপুণহাতে কবিতার শরীরে জড়িয়েছেন। ‘গৌড়কন্যার ইস্কেপ ভেলোসিটি মাখা কথার বেগ আমাদের / উড়িয়ে নিয়ে যায় নীল জংশনের আগের স্টেশনে।’, ‘তোকে ছুঁবো তোর বইপড়ার মাঝপথে যখন তুই / আইনস্টাইনের মন নিয়ে মেপে দেখিস কোনো তামাটে বিশ্বাসের ভিত্তি’, ‘আমার হাতে আহ্নিকগতির ট্রেনের টিকিট / তোমার ওড়নায় সেলিব্রেটি দুপুর’, ‘মাত্র একটি সূর্য রোদের হাতে সরবরাহ করে চলেছে প্রাণের উপকরণ / আর জলেস্থলে নিবিড় আনন্দে মাতোয়ারা জীববৈচিত্র্যের উৎসব’, ‘পারমাণবিক কলমে / রচনা করো বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘আমাদের প্রণয়ী ডানার নকল বানিয়েছে / বারুদের ডানা / আমাদের অভিসারী উন্নয়নে খুঁজে নিয়েছে / ইস্কেপ ভেলোসিটির উপমা’, ‘ফাইনালে বিবর্তনবাদ হয়ে উঠেছে নতুন পূজার মন্ত্র’, ‘আর দুই জোড়া শিশুচোখ ক্রমাগত ভরে ওঠে / অপার বিস্ময়ে—/ তারাভরা রাতে যেমনটি ঘটে থাকে / নাসার টেলিস্কোপ লাগানো চোখে!’, ‘কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণের শব্দ বেজে উঠবে না / ব্যাঙের ছাতার রূপ ধরে অগ্নি ও ধোঁয়ায়।’, ‘প্রযুক্তিহৃদয় মানুষ রচেছে ব্যবধানের কাঁটাতার’, ‘হাওয়ার গুনগুনানি আর ইথারের ঢেউ / অক্সিজেন হাইড্রোজেনের মতো মিলে নতুন সুরধ্বনির দল হয়ে / নাচছে ধীর লয়ে ছাই-নীল নীল-ছাই সমুদ্রে;’, ‘রোদের দেশে বাস করেও / জয়েন্ট কার্টিলেজে কমে এসেছে ভিটামিন ডি / যাকে তুলনা করা যায় ফারাক্কা বাঁধ-উত্তর পদ্মার কোমরের সাথে।’, ‘ভাতিজা নাহিদ কি জানে সেলুলয়েডের কোনো ফিতা ছাড়াই / ওই টেপ-রেকর্ডার ধারণ করে আছে তরুণ এক অফিসারের / অজস্র প্রেমময় অনুভব’, ‘কাঁটাগুলো/ ঘুরছে নিজ নিজ কক্ষপথে প্রাণে নিয়ে মহাকর্ষের টান’, ‘মলে মলে সিসি টিভি—বর্ডারেও ওয়াচ টাওয়ার / শূন্যে ঝোলে উপগ্রহ—আকাশে পাতালে তার চোখ’, ‘ভালোবাসাই টেকনোলজি—পুঁজিও ভালোবাসা।’, ‘মাহফুজা ম্যাডামের চোখে হেসে ওঠে মহাকর্ষ’ প্রভৃতি পঙক্তিতে বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট প্রপঞ্চ-সূত্র-মতবাদের জুতসই ব্যবহার আমিনুল ইসলামের কবিতাকে কাব্যভাষার প্রাতিস্বিকতায় সমৃদ্ধ করেছে এবং তাঁর কাব্যভাবনাকে প্রসারিত দিগন্ত ছোঁয়া ঐশ্বর্য দান করেছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কবিতায় মূলত কল্পনার ব্যবহার ঘটে থাকে যা বিজ্ঞান চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। এই একবিংশ শতকে যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের শয়নকক্ষও দখল করে নিয়েছে, সেখানে কবিতায় কল্পনানির্ভরতা এসময়ের কবিদের কতখানি কাজে লাগতে পারে? এব্যাপারে প্রখ্যাত রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ আবু সয়ীদ আইয়ুবের অভিমত প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তিনি বলেছেন : ‘কবিতায় অবশ্য কল্পনার স্থান খুবই প্রশস্ত, তবে সে-কল্পনা আপনাতে আপনি সমাপ্ত নয়। কল্পনার তুলি দিয়ে আঁকা চিত্রের সঙ্গে চিত্র যোগ করে যে-চিত্রকল্প রচনা করেন কবি তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য অবশ্য কবির হৃদয়ভাব ও ভাবনারই প্রকাশ। কিন্তু সে-ভাব ও ভাবনা নিরালম্ব নয়। আলম্বন তার মানবিক, প্রাকৃতিক বা সর্বজাগতিক বিশ্ববোধ। অর্থাৎ যত আভাসে-ইঙ্গিতে হোক, যত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হোক, শেষ পর্যন্ত কবি প্রকাশ করতে চান তাঁর বিশিষ্ট হৃদয় তথা সমগ্র ব্যক্তিস্বরূপ দিয়ে দেখা মানুষের রূপ, প্রকৃতির রূপ এবং মানুষ ও প্রকৃতিকে নিয়ে যে-ভূমা তারই রহস্যময় রূপরেখা। সে-রহস্য আমাদের মনের দরজায় সর্বদায় অত্যন্ত মৃদু করাঘাত করে কিন্তু দরজা খুললেই দেখা যায়—নেই, কোথাও নেই, কিছু নেই। যে-সব কবিতা, গান, নাটক ও উপন্যাস আমাদের জীবন-মরণের সঙ্গী হয়ে ওঠে তা রিচার্ডসের ফর্মুলা-অনুযায়ী রচিত নয়। তাতে এমন-কিছু থাকে যার স্পর্শে জগৎ ও জীবনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, আমাদের ভাবনা ও বেদনা, আমাদের আশা-নৈরাশ্য অল্পবিস্তর রূপান্তরিত হয়ে ওঠে, সত্যতর হয়ে ওঠে। সত্যের উপর বিজ্ঞানের একচেটিয়া দখলদারি আমি মানি না। সত্য বহুরূপী, জৈন দার্শনিকদের পরিভাষায় সত্য অনেককান্ত। সাংবাদিক সত্য, ঐতিহাসিক সত্য, বৈজ্ঞানিক সত্য, সত্যের এক-একটি অন্ত (aspect); সাহিত্য আর একটি অন্ত। অনেকান্ত মহাসত্যকে ধরবার জন্য, ধারণ করবার জন্য, আমাদের বহুভাষী হতে হয়। কবিতার সত্য সাংবাদিক, ঐতিহাসিক কিংবা বৈজ্ঞানিকের ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাই বলে তাকে মেকি সত্য বা সত্য নিয়ে খেলা বলার মতো একগুঁয়েমি যেন আমাদের না-হয়।’(পান্থজনের সখা, পৃষ্ঠা : ১২৫-১২৬)
আমিনুল ইসলামের কবিতা কবিতার সত্যে উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ। তাঁর কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, কিংবদন্তি, বিজ্ঞান, প্রকৃতি এসবকিছুই সাহিত্যের সত্য হয়ে উঠেছে। তাঁর বিজ্ঞানচেতনার মধ্যেও আবু সয়ীদ আইয়ুব কথিত ‘মানবিক, প্রাকৃতিক বা সর্বজাগতিক বিশ্ববোধ’-এর পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপরে উল্লেখিত পঙক্তিগুলো সেই স্বাক্ষর বহন করে। মহাবিশ্ব ও নর-নারীর প্রেমকে একাকার করে রচিত তাঁর ‘মহাবিশ্ব’ নামক কবিতাটিতে উক্ত বোধের উদ্ভাসন অনেক বেশি উজ্জ্বল—অনেক বেশি শৈল্পিক। কবিতাটির একটা অংশ:

‘আমি তো গ্রহ-নক্ষত্রের ভিড়ের মধ্যেই থাকি যে ভিড়ে অংশ রয়েছে
আমারও; এমনিতেই ঝালাপালা কান; তো কীসের আবার নতুন ডাক!
অথচ তোমার কণ্ঠ শোনামাত্র কানদুটো ভারকেন্দ্র হয়ে ওঠে! মনে হয়—
মেঘলাকণ্ঠের সিক্তমাধুরী বাড়িয়ে দেয় তোমার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের পরিধি—
যা ছুঁয়ে ফেলে আমার অন্তরঙ্গ অস্তিত্বের আঙিনা,—বাকি সারাটা সময়
যা রাষ্ট্রীয় ভূগোলের মতো স্থির থাকে বেড়াহীন সীমান্তে ও সীমানায়!’
(‘মহাবিশ্ব’, বাছাই কবিতা)

জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকীরণ তাদের সাহায্য করছে। সাহায্য করছে; কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।’ (‘কবিতার কথা’, পৃষ্ঠা : ৫) আমিনুল ইসলাম হচ্ছেন সেই ‘কেউ কেউ’-দের দলের একজন এবং গুরুত্বপূর্ণ একজন। তিনি একইসঙ্গে বৈশ্বিক পর্যায়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্য, অতীত ও বর্তমান, বিজ্ঞান ও কবিতা, কল্পনা ও বাস্তবতা, জীব ও জড় , প্রেম ও প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তিনি অতীতকে বর্তমানে রূপদানে দক্ষ ও উৎসাহী। তাঁর কবিদৃষ্টি স্বদেশের উঠোন থেকে আন্তর্জাতিক ভূগোল এবং বাস্তবতার মৃত্তিকা থেকে কল্পনার আকাশ—সর্বত্রগামী এবং বিচরণশীল। তিনি একদিকে রচেছেন ‘গৌড়ের পথে-প্রান্তরে’, ‘ভোরের কুয়াকাটায়’, ‘বিজয় সেনের রাজধানী এবং ভালোবাসার রাজকন্যা’, ‘বেহুলার মেয়ে’, ‘ঢাকার মেয়ে চন্দনাকে’ শীর্ষক কবিতা,— অন্যদিকে লিখেছেন ‘ইস্তাম্বুলের ই-মেইল’, ‘ব্লু মাউন্টেনে দাঁড়িয়ে’, ‘ভালোবাসা আসহাবে কাহফের কুকুর’, ‘সক্রেটিসের পৃথিবী’, ‘কিউপিডের মিউজিয়াম’, ‘তুর্কি মেয়ের জন্য’, ‘নেফারতিতির সঙ্গে’, ‘অভিবাসীর গান’, ‘সভ্যতার সংঘর্ষ’, ‘জল থেকে জাতিসংঘ’, ‘নেফারতিতির সঙ্গে’, ‘আরব বসন্ত’, ‘সুয়েজ খালের ওপর তোমার মুখোমুখি’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক ভূগোলের ঘ্রাণমাখা কবিতা। যেকোনো বিবেচনাতেই তাঁর কবিতার ভুবন দিগন্তের মতো বিস্তারিত এবং সৌন্দর্যনিবিড় বৈচিত্র্যময়তার ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ। প্রাচীন যুগের বিশ্বসুন্দরী—মিশরের শাসনকর্ত্রী রানি নেফারতিতি নানা কারণে বিখ্যাত। তিনি তার রূপের জৌলুস ও সুগন্ধীর জন্য বিখ্যাত; তেমনি বিখ্যাত নিজ শাসনামলে সম্রাজ্ঞী হিসেবে সাংস্কৃতিক জাগরণ আনয়নের জন্য। আমিনুল ইসলাম নিবিড় মানসিক ভ্রমণ করেছেন সেই নেফারতিতির সঙ্গে তার সাম্রাজ্যের আনাচেকানাচে এবং একসময় বাঙালি নারীর মাঝে তাকে নতুন রূপে আবিস্কার করেছেন। অতীত হয়ে উঠেছে বর্তমান—ইতিহাস রূপান্তরিত হয়েছে চাক্ষুষ বাস্তবতায়। দীর্ঘ আকৃতির কবিতাটির শেষাংশে বাস্তবতা ও কল্পনা, ইতিহাস ও কিংবদন্তী, অতীত ও বর্তমান, দেশীয় মৃত্তিকা ও আন্তর্জাতিক ভূগোল শিল্পের পাত্রে একাকার হয়ে গেছে।

‘নেফারতিতি, হে মিসট্রেস অব হ্যাপিনেস, তুমি কি তবে বহু জনমের
অধিকার লাভ করেছো, ঘুমুতে যাওয়ার আগে যার স্বপ্ন নিয়ে
পাথরের বুকে প্রাসাদ রচতেন দি ভ্যালি অব কিং-এ ঘুমুতে যাওয়া
তুথমোসিস-রামেসেসের দল? অবয়বহীন চার হাজার বছর
নীলনদে ভেসে ভেসে তুমি কি পুনর্জন্মের মাটি খুঁজে পেয়েছো
রূপবান-মধুবালার গাঙেয় অববাহিকায়?’
(‘নেফারতিতির সঙ্গে’, বাছাই কবিতা)

কাব্যভাষার জাদুতে পাঁচ হাজার বছর আগের নেফারতিতি এবং তাঁর শাসনামল চোখের সমানের বর্তমান হয়ে উঠেছে। কবি তাকে কেবল কল্পনার চোখেই দেখেননি, বাস্তবেও তাঁর শারীরিক সান্নিধ্যের সম্মোহনে আত্মহারা হওয়ার রোমাঞ্চকর অনুভব লাভ করেছেন এবং সেই অনন্য অনুভবকে ছড়িয়ে দিয়েছেন কৌতূহলী পাঠকের কল্পনায় ও অনুভবে। বর্তমানের উঠোনে দাঁড়িয়ে পাঠক তার কল্পনার ডানায় নতুন টান আনুভব করেন এবং সম্মোহিত হয়ে মুহূর্তে চলে যান অদেখা প্রাচীনতম সভ্যতার শহরে ও সংস্কৃতিতে। ‘কবি আমিনুল ইসলামের ‘নেফারতিতির সঙ্গে’ কবিতাটি খুব সুন্দর এবং আধুনিক, রোমান্টিক ও ব্যক্তিগত উপাখ্যানমূলক গদ্যকবিতা। কবি প্রাচীন মিশরের রানি নেফারতিতিকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে খুঁজতে মিশর ভ্রমণ করেছেন। ‘নেফারতিতির সঙ্গে’ কবিতাটি শুধু একটি ভ্রমণকাহিনি নয়; —সময়, ইতিহাস, সৌন্দর্য ও প্রেমের এক অতীন্দ্রিয় কাহিনি। কবি প্রাচীন মিশরের এক রানিকে নিজের আধুনিক চেতনায় ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। তার ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব সাফল্যে পরিণত হয়েছে, যখন তিনি বুঝতে পারেন যে তার খোঁজার বস্তু আসলে তার মনেরই অংশ। নেফারতিতি এখানে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব থেকে উন্নীত হয়েছেন এক চিরন্তন কাব্যিক প্রেমিকা ও অনুপ্রেরণা।’(মতিন বৈরাগী : ‘কাঠামাবাদী তত্ত্বে আমিনুল ইসলামের কবিতা’, পৃষ্ঠা : ২০৩)

আমিনুল ইসলাম কবি-সমাজচিন্তক-রাষ্ট্রচিন্তক-সভ্যতার গতিবিধি পর্যবেক্ষক। পৃথিবী জুড়ে সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী-সাম্প্রদায়িক সম্প্রসারণবাদীদের আগ্রাসন, বোমাবাজি, লুণ্ঠন, গণহত্যা, ইথনিক ক্লিনজিং ইত্যাদি কোনোটাই তাঁর বিস্তারিত দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। তাঁর কবিতাতেও সেসবের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী উচ্চারণ স্থান করে নিয়েছে। বহুবিধ নেতিবাচক ঘটনাবলির ধারাবাহিকতা বিশ্বব্যাপী শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে গভীর হতাশার ক্ষত সৃষ্টি করে চলেছে। কবির মনেও। সেই ক্ষুব্ধ অসহায়ত্বও তাঁকে কবিতা নতুন দিগন্ত উপহার দিয়েছে।

‘কাশিমপুর কারাগারের নির্জন সেল নয় কিন্তু সেলের মেজাজ
নিয়েই আমার এই নিঃসঙ্গ বাড়ি;
ঘরের ভেতরে ঘর হয়ে একচিলতে রান্নাঘর;
আমিই পাচক, খাদকও আমি। কত কি রান্না করি!
প্রাণে ঘাম আসে, ধোঁয়া উসকানি দেয় চোখের পাতায়;
রান্নায় মিশে যায় রুবাইয়াতের জাফরানী খোশবু,
মসনবীর অলৌকিক ঘ্রাণ, কখনো-বা গীতাঞ্জলির গভীর গন্ধ : আহ!
বসন্ত যায়—গ্রীষ্ম যায়—
বজ্র্রের নকীব নিয়ে আসে বর্ষা; নজরুলে বেজে ওঠে
তানসেনের মেঘমল্লার : ‘শ্যাম-তন্বী আমি মেঘ-বরণা…।’
অলখে অলখে কেটে যায় কোলাহল ঘেরা নৈঃসঙ্গ্যের তাজমহলে
সমাহিত যাবতীয় সকাল দুপুর সাঁঝ।’
(‘ভবেশকাকার মিষ্টির দোকান অথবা নিঃসঙ্গতার রান্নাঘর’, কাশবনে কুড়িয়ে পাওয়া কবিতা)

মানুষ মাত্রই প্রশান্তির আশ্রয় চায়। পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই প্রশান্তির আশ্রয় রচনার দায়িত্ব ও ক্ষমতা রাষ্ট্র ও সম্মিলিত জনমানুষের। কবির একার পক্ষে সেখানে কোনো সফল ভূমিকা পালনের সুযোগ নেই, সেই সামর্থ্যও নেই। কিন্তু তাই বলে থেমে থাকেন না কোনো সত্যিকারের কবি। যান্ত্রিক জগৎ, বিকারগ্রস্ত মন, হীন-হৃদয়ের চালচিত্র দেখে ক্ষুব্ধ ও বিদগ্ধ কবি একা একা খুঁজে বেড়ান শান্তি ও স্বস্তির ছায়াঘন সুনিবিড় আশ্রয়ের ঠিকানা। তাঁর ভাবনার জগৎ ও কবিতার জগৎ সমান্তরালে সম্প্রসারিত হয়। কোনো ক্ষদ্রত্ব কিংবা অমহৎ সীমানা তাঁর চিন্ময় সত্তাকে বৃত্তাবদ্ধ করে রাখতে পারে না। তিনি মহাবিশ্বের বিচিত্র উঠোনে হৃদয়ের প্রশান্তি অনুসন্ধানের মধ্য দিয়েই কবিতায় শুভবোধ ও আধুনিকতাকে সুসজ্জিত করেন অনন্য শব্দচিত্রে। কবি বিশেষে সেই সৃষ্টি প্রাতিস্বিকতায় আলাদা ও অনন্য হয়ে ওঠে। আমিনুল ইসলাম তেমনি এক কবি যিনি নিজস্বতায় অনন্য।

লেখক পরিচিতি :
এলিজা খাতুন
কবি-কথাসিাহিত্যক-প্রাবন্ধিক
সাতক্ষীরা

Read Previous

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র : ১৯৭১-২০২৫

Read Next

বাংলা কবিতার বাঁক বদল : উৎস থেকে নিরন্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *