অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেলিনা শেলী -
‘পূর্বসূরি ও উত্তরসাধক’ আনোয়ার হোসেন পিন্টু : আমাদের অহংকার

‘পূর্বসূরি ও উত্তরসাধক’ আনোয়ার হোসেন পিন্টু : আমাদের অহংকার

সেলিনা শেলী

 

১৯৫৯-এর জাতক আনোয়ার হোসেন পিন্টু যে সময়টিতে তার শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্য পার করেন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সেই সময়টি ছিল শিল্পসাহিত্যের উন্মাদনা আর বিস্ফোরণোন্মুখ স্বপ্নের এক নতুন সময়। চট্টগ্রামে সে সময়টি বিশেষত আশির দশক ছিল শিল্পসাহিত্যের এক বহুরৈখিক উর্বর ভূমি। নাট্যআন্দোলন, লিটলম্যাগ, কবিতা উৎসব, পথনাটক, কথাসাহিত্যের নিরীক্ষা, গবেষণা, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন—সব মিলে এটা ছিল একটা ভীষণ ঋদ্ধ, রাজনীতিসচেতন, মানবিক ও বৈশ্বিক চিন্তাসময়; যা শেকড়েও ফেরায়। এই তারুণ্য তখন সংক্ষুব্ধ। বঙ্গবন্ধু ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরের সামরিক শাসন, কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, অবর্ণনীয় অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা, মধ্যরাতের কারফিউ, শুভবাদের কণ্ঠরোধ ও কিছু বুদ্ধিজীবী লেখকের সুবিধাভোগী আচরণে এই তারুণ্য মুক্তি খুঁজে নিলো শিল্পসাহিত্যে।
সে সময় ইতিহাস-ঐতিহ্য আমাদেরও ডেকেছিল। আমরা দিনের পর দিন শিল্পসাহিত্য-রাজনীতির পাঠ নিয়েছি। কেউ কেউ অবশ্য নীরব থেকেছেন, কেউ প্রতিবাদ করছেন, কেউ ব্যর্থতায় অথবা ভয়ে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু একদল তরুণ নানাদিকে কাজ করে গেছেন। যে সময় কবি শাহিদ আনোয়ারের ‘আটচল্লিশ ঘণ্টা একটানা হরতালের পর’ কবিতা লেখা মৃত্যুসম তুল্য, সে সময়ে আমরা নতুন একটি দেশের স্বপ্নে, তার শিরায় শিরায় মানবিক সুসংস্কৃত বীজ বুনে দেবার সংকল্পে কী তৎপর ছিলাম, আজ আনোয়ার হোসেন পিন্টুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তা নতুনভাবে উপলন্ধি করে বিস্মিত হচ্ছি! এই বিরুদ্ধ স্রোতে দাঁড়িয়ে কাজ করা কতটা জটিল ছিল আজকের প্রজন্ম তা উপলব্ধিও করতে পারবে না।
সত্যজিৎ গবেষক, চলচ্চিত্রকার, গল্পকার, ছড়াকার আনোয়ার হোসেন পিন্টু জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৯ সালের ৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শহরে। তিনি মিতবাক, কিছুটা আড়ালচারিও বটে। তাঁর পরিবারটি চট্টগ্রামের রাউজানের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এক বনেদী বংশ। ছোটবেলা থেকে তিনি পৈতৃকসূত্রে লেখাপড়া, বইপত্রের জগতের অংশী হতে পেরেছিলেন। তাঁর পিতৃব্য, পিতার তুতো ভাইয়েরা অবিভক্ত ভারত থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত শিক্ষায়, জ্ঞানসাধনায়, জনমানসের মুক্তিতে যে অবদান রেখে চলেছেন, তার ফল এখনো লাভ করছে মানুষ। তাঁর পিতার তুতোভাই শিক্ষক মৌলভী আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রামে বহু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, শিক্ষকতা করেন। তাঁর পিতার আরেক তুতোভাই—ইউসুফ চৌধুরী, তিনিও চট্টগ্রামে ব্যাপক শিক্ষার প্রসার ঘটান, ভেটেনারি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁরই প্রতিষ্ঠিত। চট্টগ্রামে প্রথম অফসেট প্রেস এনে বিখ্যাত সাংবাদিক কে. জি মোস্তফার নেতৃত্বে ১৯৮৬ সালে ‘দৈনিক পূর্বকোণ’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে এক ঝাঁক মেধাবী সাংবাদিক নিয়োগ দেন ইউসুফ চৌধুরী। পত্রিকায় যোগ দেন কবি আবুল মোমেন, আনোয়ার হোসেন পিন্টু, স্বপন দত্ত, শাহিদ আনোয়ার, ওমর কায়সার, আবসার হাবীব, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, শিশির দত্ত, জ্যোতির্ময় নন্দী, ডেইজি মওদুদ—এরকম আরো কেউ কেউ। এই অফসেট পত্রিকাটি বদলে দেয় চট্টগ্রামের প্রকাশনা জগৎ। আনোয়ার হোসেন পিন্টুর এই চাচা ইউসুফ চৌধুরী ‘নিউজ ফ্রন্ট’ ও ‘সিগনেট প্রেসে’রও মালিক ছিলেন। বাংলাদেশে ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’ পত্রিকার প্রথম পরিবেশক ছিল নিউজ ফ্রন্ট।
চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালীন ১৯৭৭ সালে আনোয়ার হোসেন পিন্টু, অনীল বন্দোপাধ্যায় অপু ও কয়েকজন বন্ধু মিলে গঠন করেন ‘উদয়ন নাট্যগোষ্ঠী’। এখানে মঞ্চস্থ করার জন্যে তিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাসটির নাট্যরূপ দেন। ওই বয়সে এটি একটি কঠিন এবং অভাবনীয় কাজ হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি যেকোনো গল্পকে নাট্যরূপ দেয়ার চেষ্টা করতেন। এর কয়েক বছর আগে বরেণ্য অধ্যাপক নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদ থিয়েটার ’৭৩ নাট্যদল প্রতিষ্ঠা করেন। চট্টগ্রামের নাট্য আন্দোলন ও শহরকেন্দ্রিক গ্রুপ থিয়েটারের পথিকৃৎ, এই দলের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে নাটককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেয় দলটি। এই দলটিতে পিন্টুও যোগ দেন। তবে এখানে তিনি বেশিদিন থাকলেন না। যোগ দিলেন ঢাকার ‘রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি’র চট্টগ্রাম শাখায়। এরপর থেকে যেন তিনি তাঁর পথটি চিনে ফেলেন। শুরু হয়ে যায়—চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর পড়াশোনা ও লেখালেখি। এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন—আনোয়ার হোসেন পিন্টুর বহু ছড়া, কিশোর কবিতা, এমনকি ‘বিজিত জ্যোৎস্নার দাহ’ নামে গল্পের বইও রয়েছে। কিন্তু তাঁর সত্যজিৎ গবেষণার যে বিপুল আয়োজন—যা সেই সময়ে ভাবাই যায় না, বর্তমানে সেটি বই, পোস্টার, দলিল, ছবি, অডিও-ভিডিও, সাক্ষাৎকার, শিল্পকর্ম মিলে হয়ে উঠেছে সত্যজিতের বিস্ময়কর আকর-আর্কাইভ, সেই বিস্ময়ের নিচে চাপা পড়ে গেছে বহুরৈখিক আনোয়ার হোসেন পিন্টুর অন্যান্য কৃতি। আশির দশকের সে সময়টিতে সিনেমা, পত্রপত্রিকা খুব দুষ্প্রাপ্য ছিল। চট্টগ্রামে কারেন্ট বুক সেন্টার, বইঘর, নিউজফ্রন্ট (এটি তাঁদের পৈতৃক মালিকানার), কথাকলি, কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি এরকম কিছু বইবিপনি থাকলেও পিন্টুর প্রয়োজনীয় বইটি পেতে তাঁকে অহরহ ঢাকা-কলকাতা ছুটতে হয়েছে।
শিক্ষাজীবন শেষে ‘দৈনিক পূর্বকোণ’-এ আনোয়ার হোসেন পিন্টুর প্রথম চাকরি জীবনে প্রবেশ ঘটে। তাঁর বড় ভাই প্রয়াত বখতেয়ার হোসেন ছিলেন বিখ্যাত ছড়াকার। ফলে কৈশোর থেকে এই পারিবারিক আবহে আনোয়ার হোসেন পিন্টুর দুটো চোখের পাশাপাশি আরও কয়েকটি চোখের জন্ম হবে—এ আর এমন কী! তিনি ‘দৈনিক পূর্বকোণ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে বহু বছর নাট্য-চলচ্চিত্র পাতাটির সম্পাদনা এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেছিলেন। চারুকলায় পড়ার সময়েই পিন্টু নানারকম সৃজনশীল কাজে, সংগঠনে নিজেকে জড়িত করেন। তাঁর আরেকটা প্রবণতা ছিল—যেকোনো গল্প ভালো লেগে গেলে সেটিকে নাট্যরূপ দেয়ার চেষ্টায় স্ক্রিপ্ট লেখা। তিনি দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার যে পাতাটি সম্পাদনা করতেন, সেখানে তাঁর অগাধ জ্ঞান, চিন্তা ও দূরদর্শিতা দেখা যেত। ছড়া, কবিতা, গল্প, চারুশিল্প সব ছাপিয়ে জীবনের এই গোধূলিলগ্নে বলা চলে তিনি আপাদমস্তক একজন চলচ্চিত্রপ্রেমী। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি চলচ্চিত্রের মিউজিক, দৃশ্যচিত্রায়ন, টোন, কাহিনির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে কী তলদর্শী চিন্তাভাবনা করেন তিনি! আমার মনে হয়েছে এক্ষেত্রে চারুকলার পাঠ তাঁকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। আবার এও মনে হতো—ব্যাপারটি ঠিক তেমনও নয়। আসলে ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রকে এভাবে দেখার একটি দিব্য চোখ ও দিব্য কান তার তৈরি হয়েই গিয়েছিল।
তিনি আমূল একজন সত্যজিৎসাধক। দুই বাংলায় তাঁর মতো এককভাবে সত্যজিৎপ্রেমী গবেষক আর আছেন কিনা আমার জানা নেই। সত্যজিৎ রায়কে আবিষ্কারের নেশায় ১৯৯২-এ তাঁর মৃত্যুর পরে পিন্টু চট্টগ্রামে ‘সত্যজিৎ চর্চা কেন্দ্র’ (১৯৯৩ সাল) প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজকে রীতিমতো একটি জাদুঘরে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি তিনি সেই সত্যজিৎ চর্চা কেন্দ্রটিকে দর্শক-গবেষকের সুবিধার্থে চট্টগ্রামের খুলশীতে বিশাল পরিসরে স্থানান্তর করেন। ‘সত্যজিৎ চর্চা’ নামেও পত্রিকা করেন আনোয়ার হোসেন পিন্টু। সত্যজিৎকে নিয়ে তাঁর অসংখ্য প্রকাশনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক প্রকাশনার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সেগুলো অনূদিত হয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্র গবেষকদের নজরে আসা আজ সময়ের দাবি। চলচ্চিত্র বিষয়ে যে সময়ে তিনি প্রবন্ধ রচনা করা শুরু করেন, সে সময়ে বাংলাদেশে বিষয়টি এতটা জোরালো তো ছিলই না, বরং অগোচর ছিল। সুস্থধারার শিল্পিত চলচ্চিত্রের যে আন্দোলন শুরু হয় স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে—সেই আন্দোলনের পথিকৃৎদের একজন তিনি। চলচ্চিত্র বিষয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধ সংকলন ‘চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ’ ( ১৯৮৫) শিল্প সংশ্লিষ্টদের ব্যাপকভাবে নজর কেড়েছে। তাঁর সম্পাদিত চলচ্চিত্র বিষক পত্রিকা ইন্টার কাট, লুক থ্রু ও চলচ্চিত্র-চিন্তা—ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছিল। তথ্যে, নান্দনিকতায়, বিষয়ে, সেগুলো আজও পাঠকের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আদরণীয়। আনোয়ার হোসেন পিন্টুর সম্পাদনায় ‘সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ’ বইটি দুই বাংলায় ভীষণ সাড়া ফেলেছিল।
প্রায় ৯ বছর ধরে নিরলস গবেষণার পরে ২০০২ সালে দুর্লভ সব তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত পাঁচশ পৃষ্ঠার গ্রন্থ ‘সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ’। মূল্যবান এই বইটির কোনো কপি এখন আর বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। পিন্টু জানালেন, অচিরেই এটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হবে।
২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর গ্রন্থ ‘সত্যজিৎচর্চা। ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় আনোয়ার হোসেন পিন্টুর ‘বিজিত জ্যোৎস্নার দাহ’ নামে মোট ৮টি গল্পের একটি গ্রন্থ। ২০০২ সালে ‘সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ’র প্রকাশনা অনুষ্ঠান এবং স্যুভেনিয়রের জন্য পিন্টু দেশের বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের গ্রন্থটির সৌজন্য কপি পাঠান, এবং তাঁদের লেখা/ মতামত জানতে চান। কবি শামসুর রাহমানকেও পাঠিয়েছিলেন। এই প্রেক্ষিতে শামসুর রাহমান স্যুভেনিয়রের জন্যে ‘পূর্বসূরি ও উত্তরসাধক’ নামে একটি কবিতা লেখেন, যেখানে পিন্টুর এই কাজকে তিনি খুব গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করেন। এই কবিতাটিই লেখক গবেষক আনোয়ার হোসেন পিন্টুর জীবনের বড় পুরস্কার বলে মনে করি। কবিতাটির বিষয়ে খুবই মজার একটি ঘটনা আছে। ঘটনাটি আমি গবেষক পিন্টুর মুখেই শুনেছিলাম। সেসময় কবি শামসুর রাহমান কিছুটা অসুস্থ। এর কবছর পরই ২০০৬-এ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন মোবাইলে ছবি তোলার দিন আসেনি। ইন্টারনেট, ফেসবুক তো নয়ই। কবি শামসুর রাহমান ল্যান্ড ফোনে পিন্টুকে জানালেন—‘সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ’ পাঠান্তে তাঁর বেশ ভালো লেগেছে। আরও ভালো লেগেছে পিন্টুর গভীর অনুসন্ধানী অভিনিবেশ-প্রজ্ঞা। এবিষয়ে তিনি একটি কবিতা লিখেছেন। ফোনে পিন্টুকে কবি কাগজ-কলম নিতে বললেন। তারপর ল্যান্ড ফোনের ওপাশ থেকে শামসুর রাহমান কবিতাটি বলে গেলেন, আর এদিক থেকে আনোয়ার হোসেন পিন্টু লিখে নিলেন! কী অপূর্ব ঘটনা! এর কিছুদিন পর পিন্টুর মনে হলো—‘কবিতা তো পেলাম। কিন্তু কবির হাতে লেখা খসড়াটি যদি না পাই, তাহলে তো এর বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না!’ এই দুশ্চিন্তা থেকে একদিন তিনি লিটলম্যাগ ‘নির্মাণ’ সম্পাদক, অনুবাদক রেজাউল করিম সুমনকে বিষয়টি জানালেন। সুমন তখন ঢাকায় থাকে। কবির শ্যামলীর বাসায় সুমনের যাতায়াত ছিল। সুমন জানালো—সে যে করেই হোক কবিতাটি উদ্ধার করে দেবে। এইসব কাজে আবার সুমনের উৎসাহের কোনো ঘাটতি নেই। দুদিনের মাথায়ই সুমন ফোন দিয়ে আনোয়ার হোসেন পিন্টুকে জানালো—কবিতার খসড়াটি সে কবি শামসুর রাহমান থেকে সংগ্রহ করেছে এবং কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এভাবে আনোয়ার হোসেন পিন্টু সাম্প্রতিক সময়ের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবির হস্তাক্ষর সম্বলিত কবিতার পাতাটি পেলেন। পরে তিনি কবিতাটি লেমিনেটিং করে রাখেন, যা আজও তাঁর সংরক্ষণে রয়েছে।
কবিতার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করলাম—
‘…
এখনও তরুণ তুমি, সেলুলয়েডের নীরবতা
যিনি করেছেন ঢের চিত্রল, বাঙ্ময়, খ্যাতি যাঁর জ্বলজ্বলে,
বিশ্বজুড়ে তাঁর উদ্দেশ্যেই
আপন অঞ্জলি ভরে নানা পুষ্প করেছো অর্পণ।

জেনেছি অনেক আগে, বলছি তোমাকে আজ গোধূলিবেলায়
পৌঁছে, জেনো, আনোয়ার, যিনি নিজে গুণী
তিনিই পারেন ছুঁতে প্রকৃত জ্ঞানীর পদযুগ, তাঁর বাণী
এবং সৃষ্টির বার্তা পৌঁছে দিতে দিগ্বিদিক কল্যাণের টানে।
ধন্য তুমি আনোয়ার, সেই ঢের স্বেদক্ষয়ী ব্রত
এ কৃপণ কালে স্বার্থহীনতায় করেছ গ্রহণ।

…’
-শামসুর রাহমান।

পিন্টু ছোটবেলায় শামসুর রাহমানকে দৈনিক বাংলায় একবার কবিতাও পাঠিয়েছিলেন। তখন তিনি ক্লাস সেভেনে পড়েন। হয়তো তাঁর বড়ভাই ছড়া পাঠান, সেই সূত্রে ঠিকানা জেনে রাজশাহীর নীহারবানু হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ক্ষোভের একটি কবিতা লিখে পাঠান তিনি। দীর্ঘদিন পরে সিগনেট প্রেসের ঠিকানায় জবাব আসে। বিস্মিত বালক পিন্টু দেখেন, সম্পাদক শামসুর রাহমান তাঁর বিষয়বস্তুর নির্বাচনে সাধুবাদ জানিয়ে চিঠি লিখেছেন, চিঠির সারসংক্ষেপ হলো—কবিতা লিখতে হলে আরো অনেক বিষয়ে পড়াশোনা করতে হবে, জানতে হবে। তবে পিন্টুর এই মানবিক বোধটি তাঁর (কবির) খুব ভালো লেগেছে। একদিন নিশ্চয়ই পিন্টু ভালো লিখতে পারবেন। সেই চিঠিটিও আনোয়ার হোসেন পিন্টু সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন।
আশার কথা এই উন্নাসিক তৈলাক্রান্ত যুগে আড়ালচারি পিন্টু কিছুটা হলেও মূল্যায়িত হয়েছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আনোয়ার হোসেন পিন্টু ২০১৪ সালে চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা পদক প্রাপ্ত হন। একই সাথে ‘সত্যজিৎ গবেষক’ রূপে ২০১৭ সালে মোবাইল কোম্পানি ‘রবি’ তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৯ সালে আনোয়ার হোসেন পিন্টুর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ রাজস্থান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরষ্কার লাভ করে। ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন’ (চসিক) কর্তৃক সত্যজিৎ গবেষক হিসেবে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।
আনোয়ার হোসেন পিন্টুর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’, মাত্র বিশ মিনিটের এই ছবিটি চট্টগ্রাম শিল্পকলার দোতলায় আমি, কবি শাহিদ আনোয়ার আর বাচিকশিল্পী শিক্ষক রঞ্জিত রক্ষিত পাশাপাশি বসে দেখেছিলাম। আজ তাঁরা দুজনই প্রয়াত। এই ছবির লোকেশন ঠিক করতে গিয়ে ময়লার ভাগাড় দেখে পিন্টুর চিন্তা সম্পূর্ণ বদলে যায়। লোকেশন থেকে ফিরে এসে তিনি আবারো নতুন করে স্ক্রিপ্ট লেখেন। বিষয়টি জেনে হঠাৎ-ই আমার মাথায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘পথের পাঁচালী’র দুর্গা চরিত্রটির কথা মনে পড়ে যায়। আবার কাকতালীয়ভাবে আনোয়ার হোসেন পিন্টুও কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দেখেই দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন সত্যজিতের প্রতি। কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ নিজেই জানিয়েছিলেন তাঁর প্রথম পাণ্ডুলিপিতে দুর্গা চরিত্রটি ছিল না। হঠাৎ ভাগলপুরে এক দেহাতি কিশোরীকে দেখেন তিনি। উসকো খুসকো চুলের সেই কিশোরীর অদ্ভুত সুন্দর উজ্জ্বল দুটো চোখ বিভূতিভূষণ দেখতে পেয়েছিলেন। তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরে গিয়ে তিনি পুরো পাণ্ডুলিপি বদলে দুর্গা চরিত্রটি বসিয়ে নতুন করে আবার উপন্যাসটি লিখেছিলেন। ময়লার ভাগাড় দেখে পিন্টুর স্ক্রিপ্ট বদলে ফেলার এই বিষয়টির সাথে হঠাৎ-ই কাকতালীয়ভাবে আমি ‘পথের পাঁচালী’র সেই পাণ্ডুলিপি বদলে লেখার বিষয়টির মিল খুঁজে পাই।
ছবির শুরুতেই দেখি—তাঁর দুইজন শিক্ষক সত্যজিৎ রায় আর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ খসরুকে ছবিটি উৎসর্গীত করা হয়েছে। আর পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর একটি অণুগল্প অবলম্বনে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে বলে ছবিটির শুরুতে জানানো হয়েছে। কিন্তু গল্পটির চিত্রায়ণে যেন এক নতুন গল্পের পুণর্জন্ম হয়েছে। পিন্টু যদিও বলেন তিনি রাজনীতি বোঝেন না, করেন না, কখনও কোনো রাজনৈতিক মিছিলেও যাননি—কিন্তু আমরা জানি, কোনো মানুষই রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়। রাজনীতির আরেক নাম যদি হয় ‘অধিকার’ তাহলে আলীর অবস্থান, বাস্তবতা আর মনোজাগতিক চিন্তার ভেতর দিয়েই তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিটি ধরা যায়। আলী এমন এক শ্রেণির—যে টাকা দিয়েও একটা সাধারণ মানের হোটেলে নাশতা খাওয়ার অধিকার রাখে না। যে সড়কে তৃতীয় বিশ্বের তাচ্ছিল্যপ্রাপ্ত কুকুরের পাশে ঘুমায়, ফজরের আজানের সাথে উঠে পড়ে জীবিকার তাগিদে—যখন প্রার্থনার আজান ও জীবনসংকটের অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন একই সাথে বেজে চলে। অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে আলো ফুটে ওঠা দিনের অসাধারণ শর্ট দিয়ে শুরু হয় বিশ মিনিটের ছবিটি। আবদুল্লাহ জাফর সমীরভাই ছবিটিতে আনোয়ার হোসেন পিন্টুর সহপরিচালক, ছবি তো ভালো হতেই হবে।
চালচুলোহীন বস্তা কাঁধের আলীর কাজ ময়লার ডিপো থেকে নানান ফেলে দেয়া বর্জ্য, জিনিসপাতি সংগ্রহ করা। ছোট্ট একটা শর্টে কাজী অফিসের সাইনবোর্ড আর মার্কেটের শো রুমের শাড়ি পরা নারী পুতুলগুলোর দিকে মুগ্ধ সতৃষ্ণ চোখে আলীর তাকানো, মৃদুভাবে একটা অন্তর্গত হাহাকারের আঙুল বাড়িয়ে দেয়া আর পরক্ষণে দোকানির ধমকে সরে যাওয়ার চিত্রে—মুহূর্তে একজীবনের অপ্রাপ্তির সিম্ফনি যেন বেজে ওঠে! আমরা বুঝে ফেলি—আলীদের মতো শ্রেণিচরিত্রের স্বপ্ন-সংসার থাকে না, থাকতে নেই! কারো কারো জন্যে এই সমাজে জীবন এমনই পরিহাসের! এরকম দারিদ্র্যক্লীষ্ট এক দেশে সহসা ঢুকে পড়ে মিয়ানমারের জান্তাতাড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষ—সেই চিত্র আমাদের পাশ্চাত্য শিক্ষিত মনে নয়—আলীর মতো একজনের চোখেও ভীষণই উৎকণ্ঠা নিয়ে ধরা পড়ে—সিনেমার শেষে। একটা সাধারণ প্লাস্টিকের চোঙ যেন হয়ে ওঠে জাদুবাস্তব অথবা অতিবাস্তব চোখ! এত এত যে শিক্ষিত হচ্ছি আমরা—এই শিক্ষা কি কাজে লাগে তবে? দারিদ্র্য বিমোচন করতে পারে কি? এমন প্রশ্ন আমার সামনে এসে দাঁড়ায়—যখন আলী চোঙের ভেতর দিয়ে দেখতে পায়—একটা শিশু তার চেয়ে দ্বিগুণ ওজনের বইয়ের ব্যাগ পিঠে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, আর পর মুহূর্তেই দেখে—পণ্যসামগ্রীর মতো মাথায় করে বিক্রি হচ্ছে বই! যে ক্রেতা, সে ওজন দরেই কেনে—বিদ্যার ওজনে তার মূল্য নির্ধারিত হয় না, কলেবরের ওজনে হয়, —আমি শক্ত হয়ে উঠি! কী ভয়ংকর পাশাপাশি দুটো কম্পোজিশন! তাহলে কী শিক্ষা বাণিজ্যমাত্র! এরপর চোঙের ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের হতাহতের ছবি, মিয়ানমার থেকে আসা পলাতক শরণার্থীদের জোয়ারের মতো আগমন—একটি বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পর প্রাপ্ত বাংলাদেশের পাওয়া না হিসেব, প্রথম বিশ্বের বর্জ্যে ভরা একটি দেশকে চার্লি চ্যাপলিনের মতো ব্যঙ্গকৌতুকে ধরা দিতে থাকে আমাদের ভেতর। আমাদেরই শ্রমে মেধায় কাঁচামালে চলে যে প্রথম বিশ্ব—তার এক মহারাজনীতিক শিকার হয়ে বর্জ্যের বিশাল ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে আমাদের দেশটি। একটা সাধারণ প্লাস্টিক চোঙের ভেতর দিয়ে একে একে দেখানো বিষয়গুলো যে ক্যামোফ্লাজ তৈরি করেছে প্রতীকে, রূপকে, মাত্র বিশ মিনিটে ছয় সাতটি আঞ্চলিক সংলাপে—তা আসলেই ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’। এই জাদুবাস্তবতা সেই প্রশ্নটিই ছুঁড়ে দেয়—তৃতীয় বিশ্বের মানুষ হিসেবে আসলেই আমাদের করণীয় কী? স্বপ্নময় চক্রবর্তীর অনুগল্পটি পুনর্নির্মাণে নিজস্ব চিন্তায়, কৌশলে আনোয়ার হোসেন পিন্টুর সিনেমাটি অনেকটাই মৌলিকত্বের দাবিদার। তাঁকে সাধুবাদ জানাই।
ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি আর নানা সাংস্কৃতিক কাজে তাঁর সাথে আমার দেখা হতো, কথা হতো। সে সময়ে চট্টগ্রামের কবি, নাট্যকর্মী ও সাংস্কৃতিক বলয়ে আমার নানামুখী কাজের জন্যে তাঁর সাথে আড্ডার সুযোগ হয়। সেসব আড্ডায় বেরিয়ে আসতো তাঁর চলচ্চিত্র দেখার অন্তঃশীল গভীর দৃষ্টিভঙ্গি। এসময় আমিও শর্টফিল্ম আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। পিন্টু আমার চেয়ে বয়সে ৭/৮ বছর বড়। পরবর্তী সময়ে কবি শাহিদ আনোয়ারের সাথে আমার বিয়ে হলে যোগাযোগটি আরও ঘনিষ্ঠ হয় কেননা পিন্টু ছিলেন আমার জীবনসঙ্গী প্রয়াত কবি শাহিদ আনোয়ারের বন্ধু। শাহিদ এবং পিন্টু একই পত্রিকায় সাংবাদিকতার করতেন বলেই নয়, পারিবারিকভাবেও তিনি আমাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পিন্টুকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে ছাত্রজীবন থেকে আমি ‘মামা’বলে ডাকি। বিয়ের আগে তাঁদের প্রেম যখন উত্তুঙ্গ, সে সময়ও তাঁর আসন্ন জীবনসঙ্গীকে ‘রোজিমামি’ বলে ডাকতাম, আজও ডাকি। সে এক অন্য ইতিবৃত্ত। আজ আর সেদিকে যাব না। পিন্টুমামা আমার বিয়েতেও এসেছিলেন।

একটা ঘটনা এখনও আমাকে আপ্লুত করে।
২০০৫/৬-এর দিকে এদেশের বিখ্যাত সার্জারি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. খন্দকার এ.কে. আজাদ—যাঁর জটিল অপারেশন ও ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারে অনন্য দক্ষতা, -তিনি ঠিক করলেন ব্রেস্ট ক্যান্সার বিষয়ে বিশেষত গ্রামের অশিক্ষিত পিছিয়ে থাকা নারীদের সচেতনতার জন্যে একটি ডকুমেন্টারি বানাবেন। ‘ক্যান্সাপ’ নামে চট্টগ্রামের ‘সিএসসিআর’-এ একটি গবেষণা সংগঠনও রয়েছে ডাক্তার আজাদের। আমি স্কুল জীবনে ‘নক্সি কাঁথার মাঠ’, ‘মেজো দিদি’—নাটকে অভিনয় করেছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিশ্বখ্যাত নাট্যনির্দেশক কামালুদ্দিন নীলু স্যারের নির্দেশনায় রাশান নাটক ‘বিপ্লব গাথা’ ও রবীন্দ্রনাথের ‘চিরকুমার সভা’ করে বেশ প্রশংসিত হই। এই দুটো নাটক ঢাকা শিল্পকলা, মহিলা সমিতি, টিএসসি, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে প্রদর্শন করেছি আমরা। ডাক্তার আজাদ—আনোয়ার হোসেন পিন্টু আর ডাক্তার মিরাজুল ইসলাম (লেখক)-এর সাথে যোগাযোগ করেন। পিন্টু আমার অভিনয় দেখেছিলেন। তিনি আমাকে খবর পাঠালেন। সেসময়ে আমি কলেজে অধ্যাপনা করছি। আমরা সম্ভবত পাঁচলাইশের কোনো একটি স্টুডিওতে মিটিংয়ে বসি। এই ডক্যুমেন্টারিটি ব্যাপকভাবে টিভি চ্যানেলগুলোয় প্রচারের জন্য কীভাবে তৈরি করা উচিত—সে বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। স্ক্রিপ্ট বলতে কিছু নেই। আছে বেশ কিছু নারীর ক্যান্সারের ছবি—যা দেখতে খুবই অস্বস্তিকর ও ভীতিকর। এরপরে প্রশ্ন এলো—এই ছবিগুলোও কী একটি রক্ষণশীল দেশের টিভি চ্যানেল প্রচার করতে দেবে? তাহলে কীভাবে ডক্যুমেন্টারি বানানো যায়? শেষে সিদ্ধান্ত হলো—বেশিরভাগ বিষয়ই স্কেচ এঁকে দেখানো হবে, আর মুখে ধারাবর্ণনা থাকবে। সম্ভবত স্ক্রিপ্টটি ডাক্তার মিরাজ লিখেছিল। সেখানে আমি একজন কলেজ শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করি। আমার স্যুটিং কাস্ট করা হয় মিরাজের অধ্যাপক বাবার পাহাড়তলি কলেজে। আনোয়ার হোসেন পিন্টু সেই ডক্যুমেন্টারির নির্দেশনায় ছিলেন। সুঅভিনেত্রী আফরোজা বানু, ডাক্তার মিরাজের স্ত্রী, ডাক্তার আজাদের স্ত্রী এভাবে অনেকে এখানে অংশ নেন। দীর্ঘদিন ‘নবজীবন’ নামের এই ডক্যুমেন্টারিটি CSCR-এ প্রদর্শিত হয়েছিল। তখনই আমি আনোয়ার হোসেন পিন্টুর অসাধারণ নির্দেশনা, ক্যামেরার কাজ বিষয়ে চিন্তাভাবনার আরও পরিচয় পাই।
এই প্রসঙ্গে একটি অপ্রাসঙ্গিক কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। এই জনহিতকর কাজটির জন্যে আমি কোনো সম্মানী বা পারিশ্রমিক নিইনি। বেশ কবছর পর ২০১২ সালে দুজন ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা শেষে ফিস্টুলা অপারেশনের জন্য আমি ডাক্তার একে খন্দকার আজাদের কাছে যাই। উনি অত্যন্ত যত্ন করে আমার অপারেশন করেন এবং বিল পরিশোধের সময় অবাক বিস্ময়ে দেখি, উনি নিজের কোনো বিল নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। বিল হয়েছে শুধু অ্যানেস্থেটিস্ট আর কেবিন ভাড়ার। এর পরে দুবার উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট দেখেছেন, তখনও কোনো বিল দিতে হয়নি। সামান্য একটি সেবামূলক কাজের বিনিময়ে তিনি আমাকে যে সম্মান দিয়েছিলেন—সেটি সারাজীবন কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রাখবো।
কবি শাহিদ আনোয়ারের ‘প্রতিবেশিনীর জন্য এলিজি’ আশির দশকের তুমুল জনপ্রিয় বিখ্যাত কবিতা। বহুল আলোচিত এই কবিতাটিকে কথাসাহিত্যিক, কবি মহীবুল আজিজ বলেছেন—তাঁর বিবেচনায় এই কবিতাটি বিশ্বের ১০০টি গণ্য কবিতার একটি। কবিতাটি নিজেই একটি শর্টফিল্ম। তাকে আর নতুন করে কিছু করার দরকার নেই। অনেকদিন ধরে আনোয়ার হোসেন পিন্টু বলে যাচ্ছিলেন, কবিতাটি নিয়ে শর্টফিল্ম বানাবেন। আমি আর শাহিদ দুজনই আশায় আপ্লুত ছিলাম। কিন্তু পিন্টু আজও সেই ছবিটি বানাতে পারেননি, কবিও স্বপ্ন দেখে দেখে প্রয়াত হয়েছে। অবশ্য পিন্টুর এই ছবিটি বানাবার ইচ্ছে এখনও অক্ষুণ্ন রয়েছে। আমি অপেক্ষায় রইলাম। আনোয়ার হোসেন পিন্টু—কাজে বাঁচুন, অভিবাদন আপনাকে।

Read Previous

আকাশের বিন্দু তারার মতো জ্বলছেন কবি আকন্দ লতিফ

Read Next

শেষ নিঃশ্বাসের হিসেব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *