
আকাশের বিন্দু তারার মতো জ্বলছেন কবি আকন্দ লতিফ
আরাফাত রিলকে
আকন্দ লতিফ কবি। না, বড়ো কোনো কবি হয়তো তিনি নন। বাংলা সাহিত্যে ধ্রুবতারার মতো কেউ হয়তো নন। পেশায় শিক্ষক, কখনো করেছেন সাংবাদিকতাও। তিনি জীবনের সাথে শিল্পকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। আবার হতে পারে, প্রচারবিমুখতার কারণে তার সেরা কোনো লেখা আমাদের চোখে পড়েনি। যাই হোক, জীবনকে তিনি শিল্প থেকে আলাদা কিছু ভাবতেন না। জীবনকে উপভোগ করতেন। জনসমুদ্রে ঋষির মতো চলতেন। তিনি হয়তো ভাবতেন, সাহিত্যে অমর হওয়ার মতো কিছু করে যাননি। এনিয়ে তেমন কোনো আক্ষেপও ছিলো না লতিফ ভাইয়ের। লতিফ ভাই, রিনা আন্টি ময়মনসিংহের লেখক জুটি। একজন কবি, একজন কথাসাহিত্যিক। দুজনেই আবার পেশাগত জীবনে শিক্ষক। তারা একসাথে সর্বত্র ঘুরে বেড়াতেন। তারা স্বামী-স্ত্রী, সাহিত্যের যেকোনো অনুষ্ঠানে তারা অংশগ্রহণ করতেন। তেমন কোনো নামকরা কবিতা না থাকলেও কবি আকন্দ লতিফ বললে বৃহত্তর ময়মনসিংহের সবাই তাকে একনামে চেনেন। লতিফ ভাইয়ের কবিতা থেকে পড়লাম, বসন্ত আসে- বসন্ত যায় মিলন ও বিরহ বেদনায়!
কেউ থাকে চিরবসন্ত সাধনায়। লতিফ ভাই চিরবসন্ত সাধনায় থেকেই চলে গেছেন অনেকদিন হলো। মুক্তাগাছার স্বনামধন্য রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা লতিফ ভাইকে কবিই মনে হতো। জানামতে, তিনি নিজেও একটি কলেজের ভিপি ছিলেন একসময়। তবে কখনো তিনি রাজনৈতিক পরিচয় দিতেন না। তার মুখে কখনো রাজনৈতিক আলোচনা শুনিনি। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনকে হৃদয়ে লালন করতেন। তার সাথে সবসময় যত কথা হয়েছে, তা শিল্পসাহিত্য নিয়েই। শিল্প-সাহিত্য নিয়ে অগাধ চিন্তাভাবনা ছিলো তার। মধ্য বয়সেও ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের নিয়মিত আসর ‘বীক্ষণ’র আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন তরুণের মতো। চলাফেরায় কিংবা জীবনযাপনে তারুণ্যকে ধরে রাখতে চাইতেন। বয়সে নবীনদের সাথে তার ছিলো অপরিসীম সখ্য। কাচারিঘাটে, জয়নুল আবেদীন পার্কে, স্টেশনে, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কখনো যুগল, কখনো একাই চলে যেতেন। অংশগ্রহণ করতেন শিল্প-সাহিত্যের যেকোনো অনুষ্ঠানে। লেখক-কবিদের সাথে সাহিত্যের আলাপে, কবিতা পাঠে মশগুল হয়ে উঠতেন। কখনো হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ, লালনের গান গেয়ে উঠতেন। তিনি কখনো সময় মেপে চলতেন না। একমাত্র ব্যক্তি, যিনি যাপনকে সময়ের উর্ধ্বে রাখতেন। আকন্দ লতিফের সাথে হঠাৎ একদিন গাঙ্গিনারপাড় মোড়ে দেখা। দেখলাম তিনি, কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছেন। জানালেন তিনি এখন ফটোগ্রাফিতে মনোযোগ দিয়েছেন। সাংবাদিক, কবি অনিন্দ্য মিন্টু ও কবি আকন্দ লতিফ একসাথে ছবি তোলার কাজে প্রকৃতির সান্নিধ্যে, গ্রাম থেকে গ্রামে, নদী পাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। হঠাৎ একদিন কাচারিঘাটে লতিফ ভাইয়ের সাথে দেখা। তিনি খুব উদ্বিগ্ন। রিলকে, তুমি কি নোটপ্যাডে লেখো? না। জানো, আমি মোবাইল ফোন হারিয়ে নোট প্যাডে লেখা অনেক লেখা হারিয়ে ফেলেছি। তিনি এতটা উদ্বিগ্ন, যেন ভয়াবহ কোনো শোক সংবাদ। আমিও চরম উদ্বিগ্ন হয়ে কোনো উত্তর অথবা সমাধান বলতে পারিনি। তবে এত বছর পরেও সেই স্মৃতি আমাকে অনেকটা ভারাক্রান্ত করে তোলে। কবি আকন্দ লতিফের সাথে পশুপাখির নিবিড় সম্পর্ক ছিলো। তিনি বিড়াল পুষতেন। পোষা বেড়াল নিয়ে মুক্তাগাছা ও ময়মনসিংহ শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। লতিফ ভাইকে পেঁচা পালতে দেখেছি। দেখেছি শালিকসহ বিভিন্ন পাখি পালতেও। শুনেছি তিনি বাদুড়ও পালন করেছেন কিছুদিন। আমার শ্বশুরবাড়ি দাপুনিয়া শুনে বলেছেন, তিনি দাপুনিয়া যাবেন। দাপুনিয়া কার সাথে নাকি তার কথা হয়েছে, সেখানে লক্ষ্মীপেঁচা পাওয়া যাবে। লতিফ ভাই কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু তার যাপনে একজন কবিই ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্র, নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ, তারাশঙ্কর, বঙ্কিমচন্দ্র, মানিক, আবুল মনসুর আহমদসহ সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে প্রবল আগ্রহ ছিলো তার। কবি আকন্দ লতিফের সাহিত্যচর্চার আরও একটি বিষয় লক্ষ করা যায়, তিনি প্রকাশে ততটা আগ্রহী ছিলেন না। আমার জানামতে কবির কোনো গ্রন্থও প্রকাশিত হয়নি। তিনি যেন নিখাঁদ আনন্দের জন্যেই কবিতা লিখতেন। কবি আকন্দ লতিফ মানুষ হিসেবেও খুব দরদী ছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম কবি ও প্রাবন্ধিক কবি আওলাদ হোসেনের মৃত্যুর পর তার পরিবারের খোঁজ নেয়ার জন্য তিনি, তার স্ত্রী গল্পকার শাহিদা হোসেন রিনা, কবি আশিক আকবর, আমি তার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সূত্রাপুরে গিয়েছিলাম। কবি আওলাদ হোসেনের চলে যাওয়া নিয়ে লতিফ ভাই খুব দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। কবি আওলাদ পত্নী, তার এক কন্যার সাথে আমাদের কথাবার্তা হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই যে কবি আকন্দ লতিফও আমাদের মাঝে থাকবেন না, কে জানত।
আমি যখন প্রথম প্রথম ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের ‘বীক্ষণে’ যাই, কবি আকন্দ লতিফকে অল্প অল্প চিনি। মনে আছে, কবি আকন্দ লতিফ একদিন আমাকে বলছেন, তুমি নাকি কবিতার কর্মশালায় প্রথম পুরষ্কার পেয়েছ। তোমার তো কবিতায় তেমন বিশেষ অবদান নেই। তারপর ধীরে ধীরে কবি আকন্দ লতিফ আমার কবিতার অনুরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সবসময় আমার কবিতার প্রশংসা করেছেন। উঠতি বয়সে কবিতা পাঠের আগ্রহ তৈরি করে, কবিতা পাঠরত অবস্থায় ছবি তুলে কবিতার প্রতি আমার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছেন। লতিফ ভাইয়ের কথা মনে পড়ে, রিলকে তুমি কিন্তু কবিতা পড়বে, তোমাকে পড়তেই হবে, তরুণদের মধ্যে তুমি ভালো লেখো, তোমার কবিতা আমার ভালো লাগে। যে বয়সে আমি নিজেই নিজের লেখার প্রতি তেমন আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না, সে বয়সে কবি আকন্দ লতিফের অনুপ্রেরণা আমাকে কবিতার পথে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে কবি আকন্দ লতিফের সাথে একটি কাব্যময় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। লতিফ ভাইয়ের সাথে কবিদের সখ্য ছিলো, তরুণদের সাথে একটু বেশি। কবি আকন্দ লতিফ রাজনীতিসচেতন মানুষ ছিলেন। আওয়ামী পরিবারের একজন হয়েও তিনি আঠারোর এক তরফা নির্বাচন নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তার সাথে এক আড্ডায় তিনি বলেছিলেন, সংসদে শক্তিশালী বিরোধীদল না থাকলে সংসদের সৌন্দর্য থাকে না। আকন্দ লতিফের বোহেমিয়ান চলাফেরা এখনো মনে পড়ে।
ময়মনসিংহের কবি শামীম আশরাফ গ্রাফিতির বোর্ডে কবিতা প্রদর্শন করতেন। একটি বোর্ডের ওপর লেখা থাকতো এ সপ্তাহের কবিতা, সেখানে লতিফ ভাইয়ের একটি কবিতা প্রদর্শিত হয়েছিলো, কবিতার নাম ‘হলুদাভ ধূসর আভা’।
কবিতাটি পড়া যাক-
হলুদাভ ধূসর আভা
আকন্দ লতিফ
সময়ের আগে আসে নাই কিছু
সময়কে তাই ভালোবাসা, ছুটি পিছু -পিছু
তবুও সময় কখনওবা বাসে না ভালো
আঁধার যতটাই হোক না কালো
আঁধারের অন্তরালে থাকে উজ্জ্বল-ধোঁয়াটে আলো
যেমন থাকে রাত্রিদিন, অসময়ে বাজায় ওঝা সর্পিল বীণ!
সজিব সবুজে বাঁধা যে সুর
সে সুর আড়াল করে, বাজায় ওঝা বেহাগ বেদনাবিধুর!
হলুদাভ ধূসর আভা চির বিপরীত
তবুও ভালোবাসা-বাসি চিরহরিৎ!
কবিতা পাঠে কবির জীবন ও চিন্তা সম্পর্কে অনেকটা অনুধাবন করা যায়। সবকিছুর পরও কবি ভালোবাসাকেই চিরহরিৎ বলেছেন। যা-কিছু হোক শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাকেই জীবনের গন্তব্য বলে মেনে নিয়েছেন। লতিফ ভাই শিল্পকে চিরহরিৎ ভেবেছেন। তার জীবন খেয়াল করলে দেখা যায়, তার প্রাণীপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, শিল্পপ্রেম তার মধ্যে দিয়েছে অপরিসীম সন্তুষ্টি। এই হলো না, সেই হলো না- এমন কোনো মনোভাব তার মধ্যে দেখিনি কখনো। শিল্প-সাহিত্যকে ভালোবেসে কবি নিজেকে ধন্য মনে করেছেন। লতিফ ভাই আচরণে যেমন সহজ ছিলেন, পোশাকেও ছিলেন সহজ। ফতুয়া অথবা পাতলা ঢিলেঢালা শার্ট পড়তেন। তবে কখনো কখনো হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠতেন কথা বলতে বলতে। তারপর আবার শিশুর মতো সরল হয়ে ঝরে পড়তেন। আকন্দ লতিফের মতো কবিরা অমর কোনো সৃষ্টি না করলেও তারা ব্রীজ নির্মাণ করতেন। সেই ব্রীজের ওপর দিয়ে হেঁটে যেত আগামীর সম্ভাবনা। যেই ব্রীজের ওপর দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের সেতুবন্ধ তৈরি হয়। আকন্দ লতিফের মতো কবিকে চলমান সাহিত্য আড্ডাও বলা যায়। যেখানে যেতেন শিল্প ও সাহিত্য নিয়েই কথা বলতেন। মুক্তাগাছা কবির বাড়িটিও প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যমণ্ডিত। তবে কবি বেশিরভাগ থাকতেন শাহিদা হোসেন রীনাকে নিয়ে সূচনা সেন্টার পয়েন্টের ফ্ল্যাটে। ছোটো সেই ফ্ল্যাটের পাশেই রেল স্টেশন। সেই স্টেশনে মন চাইলেই ছুটে যেতেন। লতিফ ভাই কেওয়াটখালীর একটা নার্সারীতেও একান্তে সময় কাটাতেন। কখনো সেই নার্সারিতে বসে একাকী হুকায় টান দিয়ে ডুবে যেতেন ভাবনার অতল গহিনে। এভাবেই বোহেমিয়ান জীবন কাটাতে কাটাতে ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর কবি আকন্দ লতিফ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমাদের ছেড়ে চলে যান ৬১ বছর বয়সে। শ্রদ্ধেয় কবি আওলাদ হোসেনের চলে যাওয়ার বছর খানেক পরেই লতিফ ভাইও যে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, তা ছিলো অকল্পনীয়। এখনো হঠাৎ কবি আকন্দ লতিফকে মনে পড়ে যায়। মনে হয়, এই বুঝি কবি আকন্দ লতিফের সাথে হঠাৎ করেই দেখা হয়ে যাবে। তিনি যেন আমাদের হৃদয়আকাশে বিন্দু তারার মতো এখনো জ্বলছেন।
কবি আকন্দ লতিফের কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি এখন পর্যন্ত। তার সঙ্গীনী গল্পকার শাহিদা হোসেন রিনা বলেছিলেন, তার একটি বই প্রকাশ করা হবে। আশা করি আমরা খুব শীঘ্রই কবি আকন্দ লতিফের কবিতার বই হাতে পাবো। জীবনব্যাপী বোহেমিয়ান মানুষটি ভেতরে ভেতরে কি চিন্তা লালন করতেন, তা জানা জরুরি বলে মনে করি। কবি আকন্দ লতিফের কবর জিয়ারত করে এসেছিলাম কবি সরকার আজিজ আবুল কালাম আজাদ ও আমি। মুক্তাগাছার তারাটি নিজ বাড়ির সামনে প্রকৃতির নয়নাভিরাম পরিবেশে ঘুমিয়ে আছেন।কবি আকন্দ লতিফ তার কবিতায় বলেছিলেন,
‘ম্লানমুখে পাতা ঝরা জীবনে আজ
নতুন পাতার সতেজ উত্থান-উদ্বোধন! এ-ই তো জীবন!’
কবিতাটি কবি ফাহিম ফারুককে উৎসর্গ করে কবি আকন্দ লতিফ লিখেছিলেন। কবি ফাহিম ফারুক তখন তরুণ। একজন তরুণ কবি তার কবিতায় হতাশা প্রকাশ করলে কবি আকন্দ লতিফ জীবনের প্রতি আশাবাদ উচ্চারণ করেছেন। অনেক পাওয়া না পাওয়ার মধ্যেও জীবন সুন্দর সবুজ। কবি আকন্দ লতিফকে মনে পড়ে। কবি আকন্দ লতিফের প্রতি ভালোবাসা। শ্রদ্ধা।

One Comment
[…] […]