
একজন স্যার ও আমার জীবনের পরিবর্তন
সারাবান তহুরা মৌমিতা
ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠার পথে আমি এমন কিছু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, যা আজও আমার মনকে নাড়া দেয়। জীবনের শুরু থেকেই বুঝতে শিখেছি—সবাই সমানভাবে ভালোবাসা বা সম্মান পায় না। কিছু কিছু মানুষ অজান্তেই অন্যকে অবহেলা করে, আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেও করে। আমার জীবনেও তেমন কিছু মানুষের উপস্থিতি ছিল, যারা আমাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন না। তখন বুঝতাম না, কেন এই অবহেলা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো একটা কারণ নিজের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছি—আমার বাবা নেই। আমাদের সমাজে এখনো এমন একটি মানসিকতা কাজ করে, যেখানে বাবাহীন একটি সন্তানকে অনেকেই অজান্তেই দুর্বল বা কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করে। এই বিষয়টি আমি বহুবার অনুভব করেছি। কারো আচরণে, কারো কথায়, আবার কারো দৃষ্টিভঙ্গিতে এই অবহেলা স্পষ্ট হয়ে উঠত। তবে এই বিষয়টি আমাকে একদম ভেঙে দেয়নি। বরং মনে মনে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করেছি।
শৈশব থেকে আমি একটু চুপচাপ স্বভাবের ছিলাম। নিজের কাজ নিজে করতে ভালোবাসতাম। পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম এবং সবসময় চেষ্টা করতাম ভালো কিছু করার। তবুও হাই স্কুল জীবনে কিছু অভিজ্ঞতা আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আমার হাই স্কুলের দুই-একজন শিক্ষক আমার প্রতি কেমন যেন বিরূপ আচরণ করতেন। ঠিক কী কারণে তারা এমন করতেন, তা আমি কখনোই বুঝতে পারিনি। অনেক সময় মনে হতো, তারা যেন আমাকে সহ্যই করতে পারেন না।
যখন ক্লাসে অন্যরা প্রশংসা পেত, তখন আমি চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে থাকতাম। অথচ পড়াশোনায় আমি খারাপ ছিলাম না। বরং ভালোই করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সেই চেষ্টার যথাযথ মূল্যায়ন সবসময় পাইনি। এসব বিষয় আমাকে কষ্ট দিলেও আমি থেমে যাইনি। নিজের মতো করেই এগিয়ে যেতে থেকেছি।
এইভাবে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পার করে ফেলি আমার স্কুল জীবন। এরপর শুরু হয় কলেজ জীবন—একটি নতুন অধ্যায়। মনে মনে ভেবেছিলাম, হয়তো এখানে এসে সবকিছু বদলে যাবে। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—সবকিছুই নতুন করে শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা সবসময় প্রত্যাশার মতো হয় না।
কলেজে গিয়েও আমি এক শিক্ষকের কাছ থেকে অদ্ভুত এক আচরণের সম্মুখীন হই। একদিন অন্য একজন শিক্ষক আমার সম্পর্কে বলেছিলেন, “মেয়েটা ভালো ছাত্রী।” এই কথা শুনেই সেই শিক্ষক যেন আমাকে পরীক্ষা করার দায়িত্ব নিয়ে ফেললেন। তিনি ক্লাসে এসে আমাকে দাঁড় করিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করতে শুরু করেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারি, আবার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি।
তখন তিনি ব্যঙ্গ করে বললেন, “শুনলাম তুমি নাকি অনেক ভালো স্টুডেন্ট! এই তোমার নমুনা?” সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, মাটির সঙ্গে মিশে যাই। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কীভাবে নিজেকে সামলাব। আমার আত্মবিশ্বাস যেন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়েছিল। তবে সেদিনও আমি চুপ ছিলাম। কারণ আমি জানতাম, উত্তর না দিয়ে নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করাই সবচেয়ে বড় জবাব।
এইভাবে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আমার কলেজ জীবন। এরপর আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় আসে—বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা। আমার স্বপ্ন ছিল একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাইনি।
আমি অনেক আশা নিয়ে কারমাইকেল কলেজ-এ আবেদন করেছিলাম। মনে হয়েছিল, অন্তত এখানে তো সুযোগ পাব। কিন্তু সেখান থেকেও প্রত্যাখ্যাত হলাম। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, যেন সব দরজা আমার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। আমি ভীষণভাবে হতাশ হয়ে পড়ি। নিজের ওপর বিশ্বাসটাও নড়বড়ে হয়ে যায়।
ঠিক সেই সময়টাতেই জীবনে একটি নতুন সুযোগ আসে। রিলিজ স্লিপের মাধ্যমে আমি দিনাজপুর সরকারি কলেজ-এ ভর্তির সুযোগ পাই। এটি আমার জীবনের একটি নতুন সূচনা ছিল। আমি হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই এবং নতুন করে নিজের স্বপ্নগুলোকে সাজাতে শুরু করি।
আমি তখন নিজেকে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—“আমাকে কিছু না কিছু করতেই হবে।” আমার বন্ধুরা সবাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, আর আমি পিছিয়ে থাকব—এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। তাই শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত নিই, আমি কঠোর পরিশ্রম করব এবং নিজেকে প্রমাণ করব।
শুধু পড়াশোনার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখিনি। আমি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ শুরু করি। কলেজে গিয়ে খোঁজ নিই, কোন কোন সংগঠন ভালো কাজ করছে। সেই সময় আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য হই। এখান থেকেই আমার জীবনের একটি বড় পরিবর্তন শুরু হয়।
নিয়মিত বই পড়তে পড়তে আমার মধ্যে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। আমি বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করি। একদিন আমাদের কলেজের শিক্ষক বিশ্বজিৎ দাস স্যারের একটি বই নিয়ে লিখে একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। এটি ছিল আমার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা।
এই প্রতিযোগিতায় আমি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি। সেই মুহূর্তটি আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। সেখান থেকেই স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে এই পরিচয় একটি গভীর সম্পর্কের রূপ নেয়।
স্যার শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি একজন পথপ্রদর্শক। তিনি আমাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন, বিভিন্ন প্রতিযোগিতার খবর দিয়েছেন এবং নতুন নতুন কিছু শেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদের সকল শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতার লিংক শেয়ার করতেন। অনেকেই হয়তো সেগুলো গুরুত্ব দিত না, কিন্তু আমি চেষ্টা করতাম প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাতে।
আমি প্রতিটি প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিতাম, লিখতাম, চেষ্টা করতাম নিজের সেরাটা দিতে। স্যার আমার প্রতিটি কাজ মনোযোগ দিয়ে দেখতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। আমার জীবনে প্রথম যে বড় অর্জন আসে, তার পুরস্কার নিতে আমি দ্য ডেইলি স্টার-এ যাই। সেই মুহূর্তটি আমার জন্য ছিল গর্বের।
পরবর্তী সময়ে আমি জাতীয় গণগ্রন্থাগারে একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি এবং সেখানেও নির্বাচিত হই। এই খবরটিও স্যার নিজে আমাকে জানান। ঢাকায় যাওয়ার জন্য তিনি নিজেই কলেজ থেকে অর্থের ব্যবস্থা করে দেন। একজন শিক্ষক যে এতটা আন্তরিক হতে পারেন, তা আমি তার মাধ্যমে উপলব্ধি করেছি।
প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, স্যার হয়তো অনেক রাগী হবেন। কিন্তু কাছে থেকে দেখার পর বুঝলাম, তিনি একজন অত্যন্ত সহজ-সরল ও বন্ধুসুলভ মানুষ। তার সঙ্গে অনায়াসে যেকোনো বিষয় শেয়ার করা যায়। তিনি শুধু পড়াশোনার গাইডলাইন দেন না, জীবনের দিকনির্দেশনাও দেন।
তার উৎসাহ, দিকনির্দেশনা এবং আমার পরিশ্রম মিলেই আমি আজ লেখালেখির জগতে কিছুটা এগোতে পেরেছি। এমনকি বই প্রকাশের সুযোগও পেয়েছি। তিনি যদি আমাকে প্রতিযোগিতার লিংক সরবারহ না করতেন আমি হয়তো জানতামই না যে এমনও প্রতিযোগিতাও হয়। জীবনের এই অর্জনগুলোর পেছনে স্যারের অবদান অপরিসীম।
আমার জীবনে বাবা-মায়ের পর যদি কারো অবদান সবচেয়ে বেশি থাকে, তবে তিনি এই মানুষটি। তিনি আমাকে আত্মবিশ্বাসী হতে শিখিয়েছেন, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছেন এবং জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে শিখিয়েছেন।
আগে যেখানে আমি শুধু অবহেলা পেয়েছি, সেখানে অনার্স জীবনে এসে এমন একজন মানুষ পেয়েছি, যিনি আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছেন। তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি একজন অনুপ্রেরণা।
আমি আজও মনে করি, যদি তার মতো একজন মানুষের সংস্পর্শে না আসতাম, তাহলে হয়তো আমি আজকের আমি হতে পারতাম না। আমি তার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
