
সংস্কৃতির অনিঃশেষ প্রেরণা : সনজীদা খাতুন
জান্নাতুল তাসনিম শোভা
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে যে কজন মানুষ তাঁদের কর্ম, চিন্তা ও সাহসিকতার মাধ্যমে জাতির আত্মপরিচয় গঠনে অসামান্য অবদান রেখেছেন, সনজীদা খাতুন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করা এই গুণী ব্যক্তিত্ব সারাজীবন ধরে সংগীত, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে গেছেন। তাঁর জীবন যেন এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা—যেখানে সুর, মানবতা ও দেশপ্রেম একসূত্রে গাঁথা।
তিনি ছিলেন ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যা আজ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চর্চার এক শক্তিশালী ভিত্তি। তাঁর নেতৃত্বে এই প্রতিষ্ঠান কেবল সংগীত শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও স্বাধীন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে যখন বাঙালির সংস্কৃতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, তখন তিনি নির্ভীকভাবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন ও সংগীত তাঁর জীবনের মূল প্রেরণা ছিল। রবীন্দ্র সংগীতের মাধ্যমে তিনি মানুষের অন্তরে জাগিয়ে তুলেছেন মানবিকতা, সৌন্দর্যবোধ ও মুক্তচিন্তার শক্তি। তাঁর প্রচেষ্টায় রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন আজ জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে, যা বাঙালির ঐক্য ও নবজাগরণের প্রতীক।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একুশে পদক লাভ করেন এবং ১৯৯৮ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর কৃতিত্ব স্বীকৃতি পেয়েছে—২০২১ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী-তে ভূষিত করে।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তিনি ঢাকায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবনের শেষ অধ্যায়েও তিনি রেখে গেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত—নিজের দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য দান করেছেন। এই মহৎ সিদ্ধান্ত তাঁর মানবিকতা, উদারতা এবং সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
সনজীদা খাতুনের জীবন আমাদের শেখায়—সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মার প্রতিফলন। তাঁর নিরলস সাধনা, সাহসিকতা ও সৃজনশীলতা আমাদের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি যেন এক দীপশিখা, যার আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে, আলোকিত করবে আমাদের চেতনা ও মানবিকতার পথ।
লেখক পরিচিতি :
জান্নাতুল তাসনিম শোভা
প্রাক্তন শিক্ষক ও কর্পোরেট পেশাজীবী;
বর্তমানে ছায়ানটের শিক্ষার্থী।
