অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীবেন রায় -
একটি ভ্রমণ কাহিনি

একটি ভ্রমণ কাহিনি

জীবেন রায়

 

অনেক দিন পর আমরা কলম্বাস, মিসিসিপির (Mississippi State) বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা মাল্টি ষ্টেট ভ্রমণ। আমাদের ফাইনাল গন্তব্য ছিল হনলুলু (Hawaii State), যেখানে চল্লিশ বছর আগে আমি হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ করেছিলাম। আমার এক বন্ধু তখন সেখানে থাকত। এবং এখনও আছে।
আমাদের ছোট মেয়ে পুরো পরিকল্পনাটা করেছিল। সেই অনুযায়ী, আমরা টেনেসি (Tennessee State) হয়ে আরকানসাসের (Arkansas State) হট স্প্রিংয়ের দিকে গাড়ি চালিয়ে গেলাম। কাছের জঙ্গলে একটা ইগলু বাড়িতে আমরা দুরাত কাটালাম।

আমাদের তিনজনের জন্য একটা উষ্ণ ইগলু-আকৃতির বাড়িতে থাকাটা ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, যেখানে রাতে শেয়াল, কুকুর, পেঁচার ডাক শোনা যায়।
পরদিন সকালে আমরা হট স্প্রিংসের একটি বিখ্যাত প্যানকেকের (সেলেব্রেটিদের ছবি দেয়াল জুড়ে) দোকানে ব্রাঞ্চ খেলাম। এই শহরের বিভিন্ন স্থানে গরম পানি হঠাৎ হঠাৎ ফোয়ার মতো বেরিয়ে আসে। এই জন্যই এই শহরটার নাম হটস্প্রিং। তবে কাছাকাছি পাহাড়ের ভ্যালিতে অনবরত গরম পানি বেরুচ্ছে।
পরদিন আমরা গাড়ি চালিয়ে আমাদের বড় মেয়ের বাড়ি ডালাসে (Texas State) গেলাম।
সেখান থেকে দুদিন পর আমরা আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সাড়ে আট ঘণ্টার একটি সরাসরি ফ্লাইটে হনলুলু (Hawaii State) বিমানবন্দরে পৌঁছালাম, তারপর উবার করে আমার বন্ধুর বাড়িতে গেলাম।
সত্যিই, চল্লিশ বছর পর আমাদের এক দারুণ পুনর্মিলন হয়েছিল। হনলুলুতে সাত দিনের অবস্থানে আমরা প্রতিটি পর্যটন স্থান একচেটিয়াভাবে ঘুরে দেখলাম। আমরা মূলত বাস ব্যবহার করেছি, এবং মাঝে মাঝে উবার ডেকেছি। আমরা কুয়ালোয়া চিত্রগ্রহণ এলাকাসহ অনেক জায়গায় ঘুরেছি, সেখানে কয়েক ডজন সিনেমার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে একসময়। আমরা দ্বীপের চারপাশে বাস ভ্রমণ করেছি এবং পলিনেশীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ডোল আনারসের ক্ষেত, এবং পর্যটকদের জন্য বিশ্বের সেরা সৈকত ওয়াইকিকিসহ  বিভিন্ন সৈকত দেখেছি। এছাড়াও, বিভিন্ন দ্বীপের উপস্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বিনামূল্যে উপভোগ করা যায়।

 

আপনি যদি ফলপ্রেমী হন, তবে হাওয়াইতে সব ধরনের সেরা সুস্বাদু ফল পাবেন। আপনার খাবারে টুনা এবং স্যামন প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানকার মানুষজন খুব ভালো। উবার চালকরা অমায়িক। হনলুলু শহরটি অত্যন্ত পরিষ্কার।
হনলুলু থেকে ফেরার পথে, আমরা দুই দিনের জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসে (California State) যাত্রাবিরতি করেছিলাম। আমরা হলিউড সাইন এলাকা এবং সেলিব্রিটিদের স্বাক্ষর এলাকায় গিয়েছিলাম।

 

তারপর গেলাম একটি অত্যাশ্চার্য্য বুকস্টোর, যার নাম ‘দি লাস্ট বুকস্টোর।
আমি ‘দ্য লাস্ট বুকস্টোর’ পরিদর্শন করে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি।

                                             

                                                                                                                            

সৃজনশীলতার এক বাস্তব উদাহরণ। সমস্ত শিল্পকর্ম, নকশা, এমনকি ভাস্কর্যও তৈরি করা হয়েছিল বই ব্যবহার করে, যা ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার নতুন ও পুরোনো বইয়ের বৃহত্তম বইয়ের দোকান। ২২,০০০ বর্গফুট আয়তনের এই দোতলা ভবনটিতে ২,৫০,০০০ বই সংরক্ষিত ছিল। এছাড়া, সেখানে সব ধরনের রেকর্ডেরও সংগ্রহ রয়েছে।
এরপর বড়দিনের দিন আমরা বিমানে করে ডালাসে পাড়ি জমালাম। একদিন আমার মেয়ে আমাকে বন্দুক চালনার অনুশীলনে নিয়ে যেতে চাইল। আমি সাফ জানিয়ে দিলাম—কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বন্দুক নিয়ন্ত্রণ-বিষয়ক ডজনখানেক নিবন্ধ আমি নিজেই লিখেছি; তাছাড়া, আমার নিজেরও বেশ ভয় করে। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা হয়ে রইল। শেষমেশ আমি গেলাম এবং জীবনে প্রথমবারের মতো হাতে বন্দুক তুলে নিলাম। সব বয়সের মানুষ যে বিভিন্ন ধরনের বন্দুক নিয়ে অনুশীলন করছে—তা দেখে আমি রীতিমতো অভিভূত হয়ে গেলাম।

শারীরিকভাবে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়লেও, পুরো ভ্রমণটি আমরা মন ভরে উপভোগ করেছি।

সংক্ষেপে জীবেন রায়
ড. জীবেন রায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিসিসিপি ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’-এর বিজ্ঞান ও গণিত বিভাগের রসায়ন শাস্ত্রের একজন অধ্যাপক এমেরিটাস । তিনি ১৯৮৩ সালে কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাসকাচেয়ান’ থেকে জৈব রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ‘ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই’ হনুলুলুতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ সম্পন্ন করেন।
ড. রায় বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের একজন প্রভাষক হিসেবে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। এছাড়া তিনি ঢাকার সাভারে অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত ‘সালেম ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’-তেও শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতা ও গবেষণার ওষুধ শিল্পে প্রায় ৫ দশক কাজ করেছেন। সাভারে অবস্থিত ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’-এ কর্মরত থাকাকালীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনের সূচনা করেছিলেন। এছাড়া তিনি ‘স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড’-এও কাজ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাবলির মধ্যে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘জৈব রসায়ন’ (Organic Chemistry) বইটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য রচিত ‘A Self-Study Guide to the Principles of Organic Chemistry: Key Concepts, Reaction Mechanism, and Practice Questions’ (২০১৩), ‘An Introduction to Pharmaceutical Sciences: Production, Chemistry, Techniques & Technology’ (২০১১) এবং তার দুটি উপন্যাস বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি ইংরেজি (যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির কলাম্বাস থেকে প্রকাশিত ‘Dispatch’ পত্রিকায়) এবং বাংলা (বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’, ‘জনকণ্ঠ’, ‘প্রথম আলো’ ইত্যাদি সংবাদপত্রে)—উভয় মাধ্যমেই নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। ড. রায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের কলাম্বাস শহরে বসবাস করছেন। তিনি বিবাহিত এবং তিন কন্যার জনক।

 

 

Read Previous

শেষ নিঃশ্বাসের হিসেব

Read Next

ফেরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *