অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাধব চন্দ্র মন্ডল -
বাস্তবনিষ্ঠ যাপিত জীবনের রঙছটা আর মানবিক অনুভূতির আখ্যান ‘হিমশীতল মুখ’

বাস্তবনিষ্ঠ যাপিত জীবনের রঙছটা আর মানবিক অনুভূতির আখ্যান ‘হিমশীতল মুখ’
মাধব চন্দ্র মন্ডল

সেই প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের আদিম স্বভাব ছিল গল্প বলা ও শোনা। তবে বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের স্থান বোধ হয় বেশিদিন আগের নয়। উনিশ শতকের সবচেয়ে ছোট ও নবীন সাহিত্যের শাখা হিসেবে ছোট গল্পের আবির্ভাব। সাহিত্যের যে সমস্ত শাখা বা সাহিত্যের রূপ রয়েছে এর মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ শাখা এই ছোটগল্প। বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের স্বার্থক ও সফল রূপকার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে সাহিত্যের আসরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্, সৈয়দ শামসুল হক, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, আনিসুল হক, শাহাদুজ্জামান প্রমুখ সাহিত্যিকগণ ছোটগল্প রচনায় বিশেষ অবদান রেখেছেন। বাংলা ছোটগল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেও ছোটগল্পের সংজ্ঞা সম্পর্কে বিজ্ঞজনেরা একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। তবে ছোটগল্পের যে একমুখীনতা আছে, তা নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। সম্প্রতি আমার পড়া তরুণ কবি ও গল্পকার জিয়াউল হক সরকারের লেখা ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ছোটগল্পের একমুখীনতা লক্ষ করেছি। ছোটগল্পে অনেক বিশাল ও ব্যাপ্ত জীবনের শুধু একটি স্থান বা অংশ আলোকিত করে, তা জিয়াউল হক সরকারের গল্পের বইয়ের বিভিন্ন গল্পে পরিলক্ষিত হয়েছে।
গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘নীলতিমি’ গল্পে আমরা লক্ষ করি, গল্পকার ও ঐশীর মধ্যে সম্পর্ক এবং লেখক হাসান নামের এক ব্যক্তির সাথে রুম শেয়ার করার পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার পরিক্রমা দিয়ে গল্পের শুরু আর শেষ। ওই বাসাতেই বছর ছ-মাসের কিছু ঘটনা উঠে এসেছে গল্পটিতে। ‘ছুঁয়ে দেখি তারে’ গল্পটি একজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার গল্প। যেখানে মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে তিনি শহিদ হন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অন্য আরেকটি গল্প রয়েছে সেটা হলো বইটির নামগল্প ‘হিমশীতল মুখ’। ‘ছুঁয়ে দেখি তারে’ গল্পটিতে আজহার উদ্দীন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি যুদ্ধরত অবস্থায় শহিদ হন। তাঁর সমাধি ভারতের মাটিতে আর সে কবর স্বাধীন বাংলার মাটিতে আনার জন্য তাঁর ছেলে ও সহযোদ্ধা প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনতে পারে কিনা জানা হয় না। জীবনের পূর্ণ অবয়ব ফুটে ওঠেনি গল্পটিতে। ‘অতলে’ গল্পে আমরা দেখতে পাই যে, মাহিন সাহেব নামে এক ব্যক্তির জীবন কাহিনি, যিনি একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। বছরের শেষে ক্লোজিংয়ের জন্য রাত অবধি অফিস করতে হচ্ছে। এদিকে তার স্ত্রী অহনা বাড়িতে একমাত্র কন্যা আদ্রিতার জন্মদিন উপলক্ষ্যে অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু কোনো বছরই ঠিক মতো বাড়ি ফিরতে পারেন না। এবছর বহু কষ্টে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত জন্মদিন পালনে ব্যর্থ হয়। এখানেও বিশাল ও ব্যাপ্ত জীবনের একটি স্থানকেই প্রকাশ করেছেন। এভাবেই গল্পকার তাঁর প্রতিটা গল্পে একমুখীনতা রক্ষা করে চলেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়।
স্বার্থক ও সফল ছোটগল্পের আর একটি বিষয় থাকা আবশ্যক বলে অনেকেই মনে করেন তা হলো- ‘ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন’। কেননা ছোটগল্প মূলত অনুভূতিমূলক। একজন লেখক তাঁরব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো ছোটগল্প হিসেবে সম্প্রসারিত করেন- তাঁর গল্পের নায়ক-নায়িকা বা পার্শ্ব চরিত্রের মধ্যে। লেখক তাঁর নিজ ব্যক্তিত্ব ও নিজের বিশ্বাসকেই গল্পে প্রতিফলিত করেন। আর এটাই হলো ‘ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন’। ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থটিতেও অনেক গল্প আছে, যেগুলোর কাহিনি উত্তম পুরুষে বলার চেষ্টা করেছেন লেখক। অনেক ক্ষেত্রে আমি, আমরা সর্বনাম ব্যবহার করে নিজস্ব ধ্যান, ধারণা, চিন্তা, ভাবনার প্রতিফলন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তার দুয়েকটি গল্প হতে যদি উদাহরণ টানা যায়, তবে দেখা যাবে ‘প্রথম দেখা’ গল্পে এভাবে লেখক বলেছেন যে, ‘বেশিদিন আগের কথা না। হয়তো ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হবে। সোম কিংবা মঙ্গলবার অফিস শেষে দুই কপি বই কুরিয়ারে পাঠাবো বলে হন্তদন্ত হয়ে কুরিয়ার অফিসে গিয়ে হাজির হলাম।’ ‘ক্যাসিনোর পরের গল্প’টিতে এভাবে লেখক বলেছেন যে, ‘রাজি যখন হয়েছি, কী আর করা ! পরদিন দুপুরে রওনা দিলাম। মানুষজন কি দুপুরের খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম ভুলে গেছে! ভরদুপুরেও বাসে বাদুর ঝুলা। সাড়ে তিনটায় ঢাকা মেডিকেলের গেটে পৌঁছালাম। আমি ফোন না করে সরাসরি গাইনি বিভাগে ঢুকে পড়লাম। ১১নং বেডে গিয়ে দেখি রোগী ঘুমাচ্ছে।’ গল্পকার এমনভাবে গল্প উপস্থাপন করেছেন যে, তাঁর বাস্তব জীবনের যে সমস্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তাই তাঁর ছোটগল্প রচনার অন্যতম প্রেরণা। একইভাবেগ ল্পগ্রন্থটিতে ‘নীলতিমি’, ‘ছুঁয়ে দেখি তারে’, ‘প্রথম দেখা’, ‘ক্যাসিনোর পরের গল্প’, ‘ভাঙা কাঁচের টুকরো’, ‘স্বপ্ন নিরন্তর’ এমনকি নামগল্প ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পেও চমৎকার প্রতিফলন ঘটেছে।
ছোটগল্পের বিষয় নিয়ে বহুজনের বহু মতামত। ছোটগল্পের বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ছোট প্রাণের ছোট খাটো দুঃখ কথা, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা নিয়েই লেখা হবে ছোটগল্প।’ মোট কথা ছোটগল্প গল্পসর্বস্ব হবে না। গল্পে লেখকের অনুভূতি এবং গল্পের বিশেষ প্রতীতি ধরা পড়তে হবে। ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থটি যদি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ি তবে এ বিষয়টা স্পষ্ট হতে বাধ্য। যদি আমরা লেখকের ‘নিঃশব্দে’ গল্পটি পড়ি দেখতে পাবো একজন গার্মেন্টসকর্মী রোজিনার জীবনের করুণ কাহিনি। রোজিনার স্বামী নাই, এক ছোট মেয়ে ও মা আছে। মা অসুস্থতার কারণে গ্রামের বাড়িতে থাকে। রোজিনা জীবিকার তাগিদ ও ছোট মেয়ের লেখাপড়ার জন্য শহরের একটি গার্মেন্টসে কাজ নেয়। রোজিনার একমাত্র কন্যা মিতুকে নিয়েই গল্পের ভিত রচিত। মিতুকে নিয়েই গার্মেন্টস্কর্মী মা রোজিনা অন্ধকারের মধ্যে ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে সাহস করে। কন্যা মেয়ের ইচ্ছা বড় হয়ে ডাক্তার হবে আর মা রোজিনার কোমরের ব্যাথা সারাবে। শেষ পর্যন্ত পরিণতি এমন না হয়ে হয় ব্যতিক্রম যেটাকে বলা চলে অতৃপ্ত মধুর সমাপ্তি।
ছোটগল্পে সাধারণ মানুষের সাধারণ ঘটনা থাকবে, আর তবেই সেটা হবে সার্থক ছোটগল্প। এমনটা যদি সত্যি হয় তবে ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থটি অনেকাংশে সফল। কারণ, এতে প্রতিটি গল্পই অতি সাধারণ মানুষের সাধারণ ঘটনা যেমন- গার্মেন্টসকর্মী, মধ্যবিত্ত, বেসরকারি চাকুরে, মুক্তিযোদ্ধা, যাত্রার অভিনয় শিল্পী, যৌনকমী, সিঙ্গেল মাদার- এরকম জীবনের গল্প গল্পের কাহিনি হয়ে উঠেছে। ছোটগল্পের যেমন কোনো আরম্ভ নেই, তেমনি কোনো স্পষ্ট শেষও নেই। ছোটগল্পের সমাপ্তি প্রকৃত সমাপ্তি নয় বলেই ছোটগল্প পাঠ করার পর এক ধরনের অতৃপ্তিও মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। যেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’- এই মধুর অতৃপ্তিতেই ছোটগল্পের সমাপ্তি হওয়া উচিত বলেই ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থটির ছোটগল্পগুলো গল্প হয়ে উঠেছে।
তবে ছোটগল্প রচনার ক্ষেত্রে যেসব নিয়ম-রীতি রয়েছে লেখককিছু গল্পে খানিকটা ব্যতিক্রমও ঘটিয়েছেন। যার কারণে হয়তো গল্পগ্রন্থের কিছু গল্পের মাধুর্য একটু ম্লান হয়েছে বা গুরুত্ব হারিয়েছে। কিছু গল্প যেখানে শেষ হলেও চলতো, সেখানে শেষ না হয়ে কাহিনি অগ্রসর হয়ে শেষ হওযার ফলে সমাপ্তি অতোটা ‘মধুর অতৃপ্তি’ পায়নি। আমি যদি কয়েকটি গল্প ধরে ধরে আলোচনা করি তবে বুঝতে সহজ হবে। যেমন- বইয়ের ‘অতলে’ গল্পটির সমাপ্তিতে আমরা লক্ষ করি, ‘মাহিন সাহেবের মাথা ধরে আসছে। কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছেন না। যেন হারিয়ে  যাচ্ছেন কোন অতলে তার দিশা নাই।’ গল্পের ঘটনা এমন যে, একজন চাকুরিজীবী বছরের শেষ সময়ে মেয়ের জন্মদিনে উপস্থিত থাকতে পারেন না অফিসের কাজের জন্য। তারপরেও অনেক চেষ্টায় কেক অর্ডার করে বাড়ি ফেরেন। বাড়ি ফিরে দেখেন বাড়িতে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে পুলিশ ঘেরাও করে রেখেছেন। মাহিন সাহেব আসার সাথে সাথে পুলিশ তাকে ভ্যানে তুলে নেন, তখন তার মোবাইলে ফোন আসে। ‘উপয়ান্তর না দেখে যখন পুলিশ ভ্যানে উঠবেন তখন ফোন বেজে উঠল। দেখলেন আননোন নম্বর। কল রিসিভ করার পর শুনতে পেলেন অপর প্রান্ত থেকে বলছে, ‘স্যার, স্লামালাইকুম। আমি টেস্টি ট্রিটের ডেলিভারি ম্যান বলছি।’ লেখকএখানেই গল্পটি শেষ করে মাহিন সাহেবকে একটা ঘোরের মধ্যে রাখতে পারতেন। ভ্যানে চেপে ফোন কানে হয়তো মাহিন সাহেব কেক, জন্মদিনের বাতি, হাততালি এসব দৃশ্য কল্পনায় ভেসে যেতে যেতে গাড়ি ছেড়ে দিতো- এমনও হতে পারতো গল্পের সমাপ্তি। কিন্তু গল্পকার এখানে শেষ না করে ডেলিভারিম্যান জন্মদিনের কেক পুলিশ ভ্যানে তুলে দিয়েছেন আর মাহিন সাহেব যেন থানায় গিয়ে জন্মদিন পালন করবেন এমন ইঙ্গিত দিয়ে শেষ করেছেন। আমার মতে এতে ‘মধুর সমাপ্তি’ না হয়ে গল্পটি প্রলম্বিত হয়েছে। একইভাবে ‘প্রথম দেখা’ গল্পটিও ‘মধুর সমাপ্তি’ না পেয়ে প্রলম্বিত হয়েছে। লেখক গল্পের শেষাংশে এমন লিখেছেন যে, ‘অপেক্ষারা সুন্দর হয়- যেমন জীবন সুন্দর। ভালো থাকুন। শুভ নববর্ষ।’ এখানেই সমাপ্তির ইঙ্গিত থাকার পরেও গল্পটির জের টেনে লম্বা করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। তারপর ‘সকালের শোক’ গল্পে‘তবুও শোক শোক লাগে। তাহলে কি সুখ কেটে গেলে পড়ে থাকে শোক। আমরা হয়তো এমন অনেক সুখের নির্যাসকে শোক নামে ডাকি। তাই হয়তো প্রেমের দামে জড়িয়ে নিই সকালের শোক।’- এখানেও শেষ হতে পারতো।‘বিশেষ করে নীলাদ্রি আর আমার মধ্যে যা ঘটে গেল। বললে তো আপনারা বিশ্বাস করবেনই না, বলবেন- এইসব গাঁজাখুরি গল্প।’- এই অংশের আর প্রয়োজন পড়ে কি?। আবার ‘কাঠের পুতুল’ গল্পের শেষে গল্পের নায়কের মধ্যে যে পরিবর্তনটা এসেছে, সেটা গল্পের নায়িকার তথা মূল চরিত্রের মধ্যে আনলে হয়তো গল্পটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। অন্যদিকে, ছোটগল্প তখনই স্বার্থক হবে, যখন পাঠক পড়ে বলবে- শেষের অংশ তো এখন আমিই লিখতে পারবো, শেষেরটা যদি এভাবে না হতো। কেন শেষে গিয়ে নায়ক-নায়িকার মিলন হলো না। মিলন হলেই হয়তো ভালো হতো- এই যে অনুভূতির বা অতৃপ্তির যে আবির্ভার এটাই ছোটগল্পের স্বার্থকতা। যেমনটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘মমতাদি’ গল্পে তা করে দেখিয়েছেন। ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থের কিছু গল্পে যেটার কিছুটা অভাব ছিল বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।
গল্প লেখার প্রয়োজন ছিল আর সে তাগিদে লিখে গেছেন- এমনটা হলে হাততালি বা বাহবা হয়তো মিলবে, তবে সফল হওয়া যাবে না। তাই গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক সব শাখাতেই যদি সমাজ পরিবর্তনের কোন দিক নির্দেশনা না থাকে তবে তা শতাধিক বছর ধরে বিপুল আলোচনা ও নানামুখী ব্যাখ্যায় নতুন নতুন তাৎপর্যে অভিষিক্ত হবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কাব্যের মতো হতে হবে অথবা নবারুণ ভট্টাচার্য, জহির রায়হান, মুনির চৌধুরীর লেখা গল্পের মতো গল্প হতে হবে। গল্প হবে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। এমন অনেক কথা আছে যে, কথাটা শাসক শ্রেণীর শোষণের বিরুদ্ধে সরাসরি বলতে গেলে নিপিড়নের খড়গ নেমে আসবে তখন কলমকে হাতিয়ার করে এগিয়ে যেতে হবে। লেখা হবে সমাজের সকল কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, অপসংস্কৃতি, অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, জাত-পাত, ধনী-দরিদ্র্যের ব্যবধান সবকিছুর বিরুদ্ধে। তখন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল প্রমুখ ছোটগল্পাকারের ন্যায় প্রতিটা লেখা যুগযুগান্তর ছাপিয়ে ইতিহাসের পাতায় আশ্চর্যসুন্দর এক চিরায়ত আবেদনবাহী গল্পে পরিণত হবে।
এক্ষেত্রে জিয়াউল হক সরকার তাঁর গল্পগুলোতে ছোটগল্পের গঠন-শৈলী অনেকক্ষেত্রেই অনুসরণ করেছেন। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে দেখে, উপস্থাপন করে ঘটনা, চরিত্রায়ন ও পরিচর্যা করেছেন। যেটা বর্তমানের অনেক ছোটগল্পকারের মধ্যেই অনুপস্থিত। উপস্থাপন, চরিত্রায়ন, ভাব-বিষয়বস্তু, উপমা, নাটকীয় শুরু ও শেষ সব মিলিয়ে ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো চমৎকার। উপমার ক্ষেত্রে গল্পকারের ‘আমি শুধু ভাঙতে থাকি সামনের দৃশ্য-অদৃশ্য ভাঙা কাচের টুকরোয় পা কাটে।’, ‘সকালের শোক’ গল্পে ‘হিমশীতল বৃষ্টির ফোঁটা সঙ্গে। ছিপছিপে মিষ্টি গড়নের মুখমণ্ডলে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি। কুচি কুচি করে মাখানো কাঁচা আমের ফালির মতো তার ঠোঁট।’ ‘আশ্চর্য এক অনুভূতি হচ্ছে-এটাই মনে হচ্ছে শুঁয়োপোকা থেকে একটু একটু করে প্রজাপতি হওয়ার ক্ষণ। এ মধুর ক্ষণ বয়ে আনতে পারে শুধু প্রীতি-প্রেমের স্বর্গীয় অনুরণন। প্রেমই দিতে পারে মানুষকে এমন প্রজাপতির মতো বর্ণিল আনন্দধারা।’- এমনই আরও উদাহরণ রয়েছে গ্রন্থের বিভিন্ন গল্পের আনাচে-কানাচে। এছাড়াও সমাজ পরিবর্তন করার হাতিয়ার যে সাহিত্য সেই বিষয়টাও কয়েকটি গল্পে কিছু ভাব-ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে। তবুও তা পর্যাপ্ত নয়।
বাংলা সাহিত্যে পনেরো ধরনের ছোটগল্প রয়েছে, যার মধ্য হতে হয়তো কয়েকটিতে বিচরণ করেছেন ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থের লেখক। গল্পগ্রন্থটিতে তেরোটির মতো গল্প রয়েছে। গল্পগুলো বিশ্লেষণ করলে এর মধ্যে রোমান্টিক বা প্রেম-বিষয়ক, সামাজিক, অতিপ্রাকৃত, বাস্তবনিষ্ঠ ছোটগল্প বলেই মনে হবে। তবে তাঁর ছোটগল্পে রয়েছে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, দুরন্ত শৈশবও। আর এমনি দুরন্ত শৈশব নিয়ে একটি গল্প হলো ‘ভাঙা কাচের টুকরো’। যেটি আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। গল্পটি পড়লে যে কেউ দুরন্ত শৈশবের অনুভূতি অনুভব করবেন। এছাড়াও ‘ক্যাসিনোর পরের গল্প’ নামক গল্পে সুইটিকে না বলা প্রেম পাঠক হৃদয়ে অন্যরকম এক অনুভূতি জাগাবে। গল্পটিতে গল্পকার নিজের পরিচয় গোপন করে রক্ত দান করে চলে আসাটাই হয়তো গল্পকে স্বার্থক করেছে। এছাড়া ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন চিত্রশিল্পী আইয়ুব আল-আমিন। প্রচ্ছদটি দারুণ ও গল্পগ্রন্থের বিষয়বস্তুর সঙ্গেও সাদৃশ্যপূর্ণ। সর্বোপরি আমি মনে করি, জিয়াউল হক সরকার একজন নবীন গল্পকার হিসেবে বাংলা সাহিত্যের জগতে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে ‘হিমশীতল মুখ’ গল্পগ্রন্থটি পাঠক হৃদয়ে সাড়া জাগাতে সক্ষম হবে।

লেখক পরিচিতি :
মাধব চন্দ্র মন্ডল, কবি ও শিক্ষক, প্রতিষ্ঠাতা, বইপোকা পাঠাগার, গাজীপুর।

Read Previous

‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’ : অভিমান, প্রত্যাখ্যান ও আধ্যাত্মিক অন্বেষণের সমন্বয়

Read Next

আব্দুল্লাহ্ আল বাকীর পিওর মসগ্রীন : সাম্প্রতিকের আত্মসংশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *