
‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’ : অভিমান, প্রত্যাখ্যান ও আধ্যাত্মিক অন্বেষণের সমন্বয়
পান্থজন জাহাঙ্গীর
আধুনিক নাগরিক অনুভব, ব্যক্তিগত প্রেম-বোধ এবং অন্তর্মুখী আত্মবিশ্লেষণের সংমিশ্রণে নির্মিত কাব্যগ্রন্থ ‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’- কবি ও উপন্যাসিক আরমান উজ্জামানের একটি সংবেদনশীল কাব্যপ্রয়াস। তাঁর কবিতায় প্রেম কখনও সরল আরাধনা নয়; বরং তা সময়, দূরত্ব, অভিমান ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জটিল মানসিক ভূগোল। রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার তাঁর কাব্যভাষাকে করেছে ইঙ্গিতবহ, আবার কোথাও কোথাও দার্শনিক। এই গ্রন্থের রোমান্টিক কবিতাগুলোয় প্রেম যেমন ব্যক্তিগত, তেমনি তা অস্তিত্বগত প্রশ্নের দিকেও প্রসারিত।
‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’র তিনটি রোমান্টিক কবিতার সংক্ষিপ্ত ব্যবচ্ছেদ এই রচনার উদ্দেশ্য। আর এ আলোচনা থেকে কবির ‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’ কাব্যের একটি নির্যাস পাওয়া যাবে, যা ক্ষণে ক্ষণে পাঠকের নাসারন্ধ্রে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ধাক্কা মারবে। পাঠক এ ঘ্রাণ থেকেই বুঝে যাবে নিষিদ্ধ বাতায়ন আসলেই নাগরিক প্রেম-যন্ত্রণা-বিচ্ছেদ ও প্রত্যাখানের নিখুঁত বয়ান।
‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’ ২৫
এই কবিতায় প্রেমের প্রত্যাবর্তন আছে, কিন্তু পুনর্মিলন নেই। শুরুতেই-
‘অবশেষে তুমি চতুর চোরের মতো নিঃশব্দে ফিরে এলে…’
এখানে ‘চতুর চোর’ উপমা প্রেমিক/প্রেমিকার গোপন ও অপরাধবোধময় উপস্থিতিকে ইঙ্গিত করে। ভালোবাসা এখানে আর উন্মুক্ত নয়; তা লুকোনো, সংকোচপূর্ণ। কবিতার একটি শক্তিশালী চিত্রকল্প- ‘তোমার নীরব পায়ের শব্দ এ শহরের ইট-পাথরের দেয়ালে বিমূর্ত এক প্রতিধ্বনি হয়ে বেজে উঠল’
নীরবতারও প্রতিধ্বনি আছে- এই ধারণা সম্পর্কের গভীর ক্ষতকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে। শহর এখানে মানসিক পরিসর; ইট-পাথরের দেয়াল মানে কঠিন হয়ে ওঠা হৃদয়। শেষে-
‘সেই খুশবু কোনোদিন তোমার নিষিদ্ধ বাতায়নের কড়া নাড়বে না’।
‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’ হৃদয়ের সেই জানালা, যা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ। প্রেমের ঘ্রাণ থাকলেও প্রবেশাধিকার নেই। এই প্রত্যাখ্যানেই কবিতার মর্যাদাবোধ ও ট্র্যাজিক সৌন্দর্য নিহিত।
‘প্রেম ও পরাগায়ণ’ ৩১
এই কবিতায় প্রেমকে উদ্ভিদতত্ত্বের ‘পরাগায়ণ’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শুরুতেই-
‘রক্তজবা ভালোবেসে একদিন প্রজাপতি হয়েছিলাম’
এখানে আত্মরূপান্তর প্রেমের পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। প্রজাপতি হয়ে ওঠা মানে নিজের পরিচয় বদলে ফেলা।
কিন্তু মোড় আসে-
‘আকাশের নীল ছিঁড়ে দেখলাম, তোমার গোপন দুপুর…’
এখানে প্রতারণার উন্মোচন ঘটে। ‘গোপন দুপুর’- আলোয় আচ্ছাদিত অথচ গোপন এক সত্য। প্রেমের একান্ততা ভেঙে যায় যখন-
‘তোমার মধুর গভীরতা বন্য মৌমাছির শিরা বেয়ে পরাগরেণুর মতো ঝরে পড়ে…’
কবি প্রশ্ন তোলেন-
‘ফুল কখনো কারও একার নয়!’
এই পঙক্তি প্রেমের মালিকানা ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। প্রকৃতি বহুগামী; মানুষ একান্ততা চায়। এই দ্বন্দ্ব থেকেই কবিতার ট্র্যাজেডি। শেষে-
‘আমি আজ আর প্রজাপতি নই…’
প্রথম পঙক্তির বিপরীতে এসে আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণ ঘটে। প্রেমের মৃত্যু মানে সরল বিশ্বাসের মৃত্যু।
‘প্রতীক্ষার ট্রেন’- ৬৭
এ কবিতায় প্রেম প্রত্যক্ষ নয়, কিন্তু প্রতীক্ষা-নির্ভর রোমান্টিক অনুভব স্পষ্ট।
‘প্রতীক্ষার ট্রেন যখন চোখের সামনে দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে ছুটে যায়…’
ট্রেন এখানে সুযোগ বা সময়ের প্রতীক। বক্তা দর্শক, অংশগ্রহণকারী নন।
‘আমি এক ক্ষণস্থায়ী পথিক…”- এই স্বীকারোক্তি প্রেমকে অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত করে। প্ল্যাটফর্ম এক অন্তর্বর্তী অবস্থা- না পাওয়া আর পাওয়ার মাঝামাঝি।
কবিতার আশাবাদী মুহূর্ত-
‘হয়তো কোনো একদিন প্রতীক্ষার ট্রেন শুধু আমার জন্য থামবে…’
এটি প্রেমের সম্ভাবনার ইঙ্গিত। কিন্তু শেষ পঙক্তিতে-
‘বিধাতার কাছে ফিরে যাওয়া’
-প্রতীক্ষা এক আধ্যাত্মিক মাত্রা পায়। প্রেম, জীবন ও চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন এক সূত্রে গাঁথা হয়।
আসলে ‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’ গ্রন্থে প্রেম একমাত্র আবেগ নয়; এটি আত্মসমালোচনা, অভিমান, প্রত্যাখ্যান ও আধ্যাত্মিক অন্বেষণের সমন্বয়। কবি আরমান উজ্জামানের রোমান্টিক কবিতাগুলোয় চিত্রকল্প নির্মাণ শক্তিশালী, প্রতীকবোধ সুসংহত। কোথাও কোথাও প্রচলিত রোমান্টিক উপমা থাকলেও সামগ্রিকভাবে তাঁর কাব্যভাষা সংযত ও অনুভবনির্ভর। এই কাব্যগ্রন্থে প্রেম শেষ পর্যন্ত প্রাপ্তির নয়- বরং উপলব্ধির। কবি আরমান উজ্জামানের ‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’ কাব্যটি প্রকাশ করছে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য প্রিন্টপুকুর প্রকাশন। বইটি পাওয়া যাচ্ছে রকমারি ও অভিজাত বই বিপনীতে।
