অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
মার্চ ১, ২০২৪
১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
মার্চ ১, ২০২৪
১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আশ্রাফ বাবু -
দু’টি বইয়ের আলোচনা

১) কবি সালাম তাসিরের আত্মদর্শনে ঋদ্ধ গ্রন্থ- ‘ছায়াবৃত্তে অশনিসংকেত’

‘যাদের ভালোবাসায় সিক্ত হই

গড়ে তুলি কবিতার প্রাসাদ।’

এই উৎসর্গনামা পড়ে দু’কলম লিখতে খুব আগ্রহী হলাম। কবি সালাম তাসিরের সপ্তম কাব্যগ্রন্থ ‘ছায়াবৃত্তে অশনিসংকেত’ প্রকাশিত হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ খ্রিস্টাব্দে। মনে হয় বিশ একুশ সালের জন্য এই কাব্যগ্রন্থটির জন্ম হয়েছে। বর্তমান সময়ের প্রতিভাবান কবিদের মধ্যে অন্যতম কবি সালাম তাসির। একজন কবিতাকর্মীর কাছে পাঠক হিসেবে আমি যা প্রত্যাশা করি শুরুতেই আমি স্বীকার করে নিতে চাই তার চেয়ে কিছুটা বেশিই পেয়েছি এই কাব্যগ্রন্থে। ভালোবাসা ও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই আমার প্রিয়জন কবি সালাম তাসিরকে।

দৃষ্টিনন্দন আর মনোমুগ্ধকর প্রচ্ছদ এঁকেছেন কাব্য কারিম। চিন্তাটা বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য অসাধারণ অঙ্কন করেছে শিল্পী। অনুভূতির রঙিন স্বপ্নপাত করেছেন প্রচ্ছদ আঁকায়।

অনুভব আর অভিজ্ঞতার অর্জনে ‘এবং মানুষ’-এর কর্ণধার সুযোগ্য প্রকাশক আনোয়ার কামাল ভালোভাবেই সবকিছুর সমন্বয় ঘটিয়েছেন বলে আমার মত প্রকাশ করে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা জানাই।

সমসাময়িক প্রেম-ভালোবাসা, বাস্তবতা, ক্ষোভ-আক্ষেপ, সুখ-দুঃখ এসব নিয়ে গভীর ভাবায়। আমাদের জীবনাবিজ্ঞতার বাইরের আঘাতকেও প্রচ্ছন্নভাবে ধরার একটা আকাঙ্ক্ষা। একজন কবির আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি চিন্তাকে সংক্ষেপে এবং উপমা-উপেক্ষা চিত্রকল্পের সাহায্যে উদ্ভাসিত করে আর তা শব্দে শব্দের ছন্দায়িত ব্যবহারে সুমধুর শ্রুতিযোগ্যতা সংযুক্ত করে সকল তৃষ্ণার্ত হৃদয়কে।

কবি সালাম তাসিরের ‘ছায়াবৃত্তে অশনিসংকেত’ গ্রন্থে অনুভবে ঘন হয়ে ওঠে নিজস্ব বোধ-চেতনা, পরিপার্শ্ব, দৃশ্যপট, সমকালীন ভাবনা রয়েছে বহুমাত্রিক দ্যোতনা। সবমিলে কবিতার যে জগৎ তৈরি হয়েছে নেপথ্যে সেই জাগতিক মুখ বন্দী আমরা পাঠক। চেনা শব্দের বুননে অজানা-অচেনা হৃদস্পন্দনময় স্বপ্নের মতো বাস্তবতা চোখের সামনে তুলে এনেছে। যথার্থ শব্দের খোঁজে কবি সালাম তাসির নিয়মিতই শুদ্ধতার দিকেই এগিয়ে গেছেন। এটি কবির সপ্তম কাব্যগ্রন্থ। এই কবিতা গ্রন্থে উচ্চারিত হয়েছে কবির নবতর কাব্যভাষা, শব্দের অভিনব প্রাণস্পর্শী সুষম অনুভব। ঝলসে ওঠা হীরক চুম্বন, জানালায় লেপ্টে থাকা নরম আলো আমাকে আবারও এভাবে জাগিয়ে তোলে। সবুজ গাছ, দীর্ঘশ্বাসের মতো কয়েকটি পাখি এখানে এসে বসুক। এভাবে কল্পনা ও অনুভবের স্বাধীনতা থাকায় তার কবিতা হয়ে ওঠে সবধরনের মানুষের অভিজ্ঞতার আঁধার। সঙ্গত কারণেই স্পষ্ট কিছু না বুঝিয়ে জীবনে আলাদা সৃষ্টির মাধ্যম আমাদেরকে ভাবতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়।

‘টেবিলে পূর্ণিমা চাঁদ

রাজপথে মৌন মিছিল

ক্ষুধার্ত পুঁজিবাদ ডান দিকে হাঁটে

বামে দিনমজুর গতরে পলিমাটির দুঃখ।’

কবি মানুষকে বড় ভালোবাসেন, মানুষই বড় নান্দনিক ভাষায় তাঁর কবিতার মুখ্য উপজীব্য হয়ে ওঠে।

মনের মিছিল পার হয়ে চলে যায় দূরে কতদূর জানা নাই। ফিরে আসবে, দাঁডিয়ে ভেজাচোখে অভিযোগ করবে। জীবনের অর্থহীন হয়ে ওঠা ভাবনার সময়টুকু মনে পড়বে কিংবা বোধ জেগে ওঠে। সত্যিকার অর্থে জীবনে ভালোবাসার গল্পগুলো দিশেহারা হয়। একদিন শোনা যায়-

‘যদি ভালোবাসা দাও

আমি পরের বর্ষায় নদী হবো;

ভালোবেসে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসবো দু’জন

তারপর তোমাতেই হবো অন্তর্নীল।’

একজন কবি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন তার হৃদয়ের ভালোবাসা দ্বারা। বিচিত্র মানবিক ক্ষরণে গড়ে ওঠে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি আবেগী মায়াজালে নির্মিত হয় শিল্পবোধ। ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া গল্প নয়, মাঝে মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় স্বপ্ন, অভিলাষ, আকাঙ্ক্ষা। কবি সালাম তাসিরের দৃষ্টিভঙ্গি উদার ও প্রাণবন্ত সচেতন গ্রহণযোগ্য বন্ধুবৎসল হৃদয়ের মানুষ। সত্যের সাথে জ্ঞানের যোগ হয়েই উন্মোচিত হয় প্রত্যাশার কবিতা। আমি বরং কবি সালাম তাসিরের কবিতার পঙক্তি তুলে দেই-

‘মানুষ জন্মের অধিকারে

একটা নিজস্ব ভুবন তৈরি করে

যেখানে নিজেকে চেনার কৌতূহল ঘুমিয়ে থাকে

ছেঁউড়িয়া থেকে ভেসে আসা গীতসন্ধ্যার আলো- একতারার সুর সাধ;

লালনে অমরত্ব পায় বাউল মনে।’

জীবন যে কেবল জীবন নয়, স্থবির অনড় প্রাণ বস্তুত নয়, জীবন অস্তিত্বমান সমাজ-জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘপথ, কারণ সত্যের তিক্ততা আছে। জন্মের আনন্দ আছে। সময় পার হয়ে তৈরি হয় নিজস্ব ভুবন। জীবনের মহত্ত্ব সেইখানে; বেঁচে থাকা লাগাতার নয়। বহু সময়ভর নিজেকে চেনার কৌতূহল ঘুমিয়ে থাকে। বোধের আনন্দ-চেতনা জাগৃতির ভেসে আসা গীতসন্ধ্যার আরো একতারায় সুর সাধে। স্বল্প পথ পাড়ি দিতেই মনে হয়েছে দীর্ঘসময় লালনে অমরত্ব পায় জীবন কবিতার বাউল মনে।

কবিতা লিখতে গুরুগ্রহে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাগ্রহণ করার প্রয়োজন হয় না। নিজের একটা কণ্ঠস্বর ঘটাতে হয়। অগ্রজদের রচনার ব্যাপক পঠন-পাঠন অবশ্যম্ভাবী ভূমিকা পালন করে; থাকে নিজের শ্রীচরণ। রোদের রঙ আকাশে ছড়িয়ে থাকে, রহস্যের মধ্যে ডুবে থাকে চোখ আর মন। আনন্দ লাগে, শুঁকে দেখা যায় না। একটা গায়েবি সময় কতদিন হবে সুন্দর আর আমার জীবনভর। তাইতো কবি সালাম তাসিরের উপলব্ধি থেকে পাওয়া-

‘যদিও জীবন

সমুদ্রে ভাসমান এক অগ্নিবলয়।’

কত কিছুই হয়েছে জীবনে-হিম হয়ে যাওয়া শরীর, লজ্জা, জ্বর, ইঙ্গিত, কথার পাল্টা জবাব, স্মৃতি, সংশয়, ভালোবাসা, প্রাপ্তির ছোঁয়াছুঁয়ি যদিও কোনো সনদ নাই এই হলো জীবন।

‘জীবন-মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময় ও কাল

বহু বর্ণিল আনন্দ-বেদনার কাব্যে রচিত অথচ

আগমন ও প্রস্থান শুধুই একা।’

তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের একটাই আকুতি কখন পড়বো ‘কাক’ কবিতাটি। বলছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী ও আবৃত্তিকার ইসরাত জাহান তনুর কথা। তার প্রিয় পাখি কাকের গল্প শুনেই আদা-চা খেতে খেতেই কবি আবিষ্কার করেন ‘কাক’ কবিতাটি। প্রথমেই আমার কাছে খুব একটা আগ্রহ হয়নি। যখন কবিতাটির আবৃত্তি শুনলাম, তখন আমার ভাবনার জগৎ আরও উন্মুক্ত হলো এবং আগ্রহ বেড়ে গেল। বিনম্র ভালোবাসা কবিতাটিতে মূলত প্রবল চিত্তে ভালোবাসার আক্ষেপ। কখনও কখনও বিষয়টি স্রোতের বিপরীতে হাঁটা মনে হবে। অসম্ভব ব্যাপারটাকে ভালোবেসে সম্ভব করার ইচ্ছাটাকেই প্রকাশ করেছেন এইভাবে-

‘একটি কাক একাকী

রাতের আঁধারে নিজেকে আড়াল করে

স্বপ্নের মায়াজালে বেঁধে রাখে লোকালয়ে।’

কাক ভালোবাসতে শেখায় সঙ্গী হারালে নতুন সঙ্গী গড়ে না। ভালোবাসে নোংরা পৃথিবীকে সুন্দর করার বাসনায়। সম্পূর্ণ কবিতা পড়ার আগ্রহ নিশ্চয়ই আপনারও জাগবে। যেভাবে সমাপ্তি হয়েছে কবিতাটি-

‘অনুভবের আয়নায় তোমাকে দেখবো আবার

অতঃপর অন্তর বৃক্ষেই হবে তোমার দীর্ঘ পরবাস।’

কবিতা মূলত কবির কল্পনা, যা প্রজ্ঞায় জারিত হয়ে রূপে ন্যস্ত হয়। কল্পনায় যা আছে বাস্তবেও থাকতে পারে। তৈরি হয় নতুন অস্তিত্ব, নিজ প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। চিত্রকল্পসমূহের মধ্যে শক্ত গাথুনি নিয়েই পূর্ণাঙ্গ রূপমাধুর্য দিয়ে যথার্থ বিকাশ ঘটেছে ‘ছায়াবৃত্তে অশনিসংকেত’ কবিতার মধ্যে। অনুভূতির স্পর্শ দিয়ে যদি পাঠক পঠনে  স্থাপিত হয় কবিতার যথাযথ সংযোগ পাবে আমার আশা-

‘শিমুল বন।

হঠাৎ ঝলসে ওঠা দুঃখবোধ তীব্র হলো

লাল পলাশের বনে দাউ দাউ আগুন।

ইট পোড়া গন্ধে বড় হওয়া শিশুটি নিরুদ্দেশ হলে

বিষণ্ন বালিকা হাতে রেশমী চুড়ির অবুঝ কান্না

সাদা-কালো বিকেলের চোখে নিঃসঙ্গ জলপ্রপাত।’

কবি সালাম তাসিরের প্রায় সব কবিতাতেই পাওয়া যায় ধ্বনিগত অনুপ্রাসের ব্যবহার, যা তার কবিতায় ধ্বনি মাধুর্যে এক অনুনাদ সৃষ্টি করে। প্রচ্ছন্ন ভাবের পাশাপাশি রোমান্টিকতার প্রকাশ্য ইঙ্গিত পাওয়া যায় একাধিক কবিতায়।

অনেক কবিতায় পাঠককে সহজ রাস্তায় কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে তাকে নিয়ে কানামাছি খেলার পরিবর্তে শুরুতেই বেঁধে ফেলে একধরনের রহস্যের ভেতর। আবার কিছু কিছু কবিতার ভেতর পাঠকের পক্ষে প্রবেশ ক্ষমতা দেখানো কঠিন। কবিতার ভেতর ঢুকে হয়তো আবার গাঢ় রস নেওয়া সম্ভব হবে। মুগ্ধতায় ভরপুর অসংখ্য কবিতা আছে পঠনে পাঠক নিশ্চয়ই প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত হবে বলে আমার অনুপ্রাস-

একদিন সূর্যোদয়ে, গাঙচিল সন্ধ্যার মেঘ দীপান্বিতা, নীলখামে প্রথম প্রেম, ভালোবাসার মানচিত্র, মৃত্যুর কাছে পরাজিত সুখ, নীল বনলতা এরূপ অসংখ্য পদাবলি বিরাজমান এই গ্রন্থে।

কবির হৃদয় ছুঁয়েছে প্রকৃতি প্রেম মধুমাছির, চইচই হাঁস, ভিতের থালায় সূর্যের হাসি প্রেম- বিরহ, আড়াল ভাবনা কবিতার প্রিয় অনুষঙ্গ হলেও প্রকৃতি থেকে সরে যাননি একবারও। এই প্রকৃতি/প্রাকৃতিক বিষয় নিয়েও লিখেছেন অসংখ্য কবিতা-নদী, পাখি, বৃক্ষ, ফুলতলা, হলুদ বরণ পাখি, গাঙচিল সূর্য, কাক, বাঁশি, চোখ। প্রকৃতিতে জ্বালিয়েছে ধৈর্যের রঙ। বাজেনি বার্ধ্যের বিউগল, লুকিয়ে রাখে কবিতার প্রতীকী উপাদান দিয়ে।

সাহিত্য মানের বিচার পাঠক করবেন। আমি মাত্র পাঠকের সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি কবি সালাম তাসির আলাদা করে কারো জন্য লিখেছেন না। লিখছেন সকল পাঠকের কথা বিবেচনা করে। যাবতীয় সম্মোহন ও সম্ভ্রমের জন্য যেসব উপকরণ থাকা দরকার, কবি সালাম তাসির জড়ো করার চেষ্টা করেছেন ‘ছায়াবৃত্তে অশনিসংকেত’ কাব্যগ্রন্থে। আমি পাঠক হিসেবে বলবো সক্ষম হয়েছেন দারুণভাবে। আমার বিশ্বাস বাঙালি পাঠকের নিকট গ্রন্থটি বেঁচে থাকবে বহুকাল।

২) পিরিত আঘাতের সাথে জীবন-  ‘ভালো থেকো ভালোবাসা’

গ্রন্থ পরিচিতি

বই: ভালো থেকো ভালোবাসা

কবি: রুকসানা রহমান

প্রকাশনী: অনুপ্রাণন প্রকাশন

সমাজের প্রচলিত অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত জীবনকে বহুমুখী প্রতিভার বিচ্ছুরণে আলোকিত করার ঘটনা বিরল। সংসার সামলে বহুবিচিত্র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অসম্ভব সাহসিকতায় জীবনকে সামনের সারিতে আনা নারীর জন্য চ্যালেঞ্জ। আলো নিভে আসা এই সমাজে একা প্রদীপ হাতে এগিয়ে চলা এমনই বহুমুখী প্রতিভার অসীম সাহসী নারী কবি রুকসানা রহমান। সংসারের ঝড়ের স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়ার বেদনা প্রশমিত করতে আজও লড়াই করছেন। নারীর ব্রাকেটবন্দি স্বাধীনতার মধ্য থেকে সে লড়াইটা তাকে মাঝে মাঝেই রক্তাক্ত করে। তবে দমে যাননি এক মুহূর্তের জন্যও। শৈশবে তার ভেতরে এই উদ্যমের বীজ বপন করে দিয়ে গেছেন তার বাবা। সংসারের স্বর্ণগর্ভা জননীর মতোই তিনি তিন ছেলেকে বড় করেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। বাল্যবিয়ের শিকার কবি রুকসানা  রহমান মনে করেন কোনো পুরুষের পায়ে ভর না করে সবার আগে দরকার নারীর পায়ের তলার ভিতটা শক্ত করা। তবেই সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। এমন সুরই ধ্বনিত  হয়েছে তার ‘মগ্নতায় স্পর্শ করি’ কাব্যগ্রন্থটিতে। তাঁর আরও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে- স্বপ্নপুরুষ, বাবার কাছে ঠিকানাবিহীন চিঠি আরো অনেক গ্রন্থ।

জীবনের অভিজ্ঞতা প্রাপ্তি সঞ্চয় করতে করতে বুঝে গেছি মানুষের সব থেকে বড়প্রাপ্তি হতে পারে তার ভালোবাসা। নিজের মতো করে কথা প্রকাশ করা, জীবন গড়া ভালোবাসা মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া। যতো কিছুই করি না কেন পুরোপুরি অনুভব করতে পারাই ভালোবাসা। নতুবা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকাটা যন্ত্রণা। বেশিরভাগ নীতিকথা, নীতিবোধ একসময় হয়ে যায় বিরক্তিকর, যদি ভালোবাসা না থাকে। জীবনের অনেক কষ্টের সময় পেরিয়েও মমতা দিয়ে ভালোবাসার কাছে লেখক আকুতি করেছে ‘ভালো থেকো ভালোবাস’।

কবি ও কথাসাহিত্যিক রুকসানা রহমান তার উপন্যাস সম্পর্কে বলেন, আমি আমার জীবন দিয়ে বইটি লেখার চেষ্টা করেছি। এই উপন্যাসটি আড়ালে থাকা নারীকে চিনিয়ে দেবে। সেই সাথে একজন নারী কীভাবে পুরুষের যন্ত্রণা মুখ বুঝে সহ্য করে এবং নারীর মূল্য কোথায় এসব আমি চিঠির মাধ্যমে বলার চেষ্টা করেছি। আশা করি পাঠক মহলে বইটি ভালোবাসা পাবে।

প্রচ্ছদ বর্ণনা: সৌন্দর্য আর যথাযথ বিষয়সমূহ একদম মিলেমিশে তৈরি হয়েছে ‘ভালো থেকো ভালোবাসা’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ। রহস্যের মধ্যে নয়, পুরোপুরি স্পর্শের আনন্দের প্রচ্ছন্নভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপমাধুর্য পাঠকের মনের সমগ্র বইটি ভালোভাবে মুগ্ধ করবে স্বাধীনতার সাথে। বইয়ের নামের সঙ্গে প্রচ্ছদের ঘনিষ্ঠতা মিলে যায়, যা একজন পাঠকের স্পষ্ট করার ইঙ্গিত দিতে সক্রিয়তা বহন করে।

 রুকসানা রহমানের ‘ভালো থেকো ভালোবাসা’ একটি অন্যরকম পত্র-উপন্যাস। প্রসঙ্গত, বাস্তবতা ও প্রকরণ অত্যন্ত সচেতনভাবে তুলে ধরেছে। চিঠির বিষয়বস্তু গভীর আশা বীজ রোপিত হয়েছে। আছে আকুতি শুভবোধ লালন, মনের প্রলেতারীয় ঘ্রাণের গল্প বিপুলভাবে পাঠকনন্দিত একটি পত্র-উপন্যাস। বাস্তব আঘাতপ্রাপ্ত অনেক অজানা ঘটনা সুনিপুণভাবে অভিজ্ঞতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জাগিয়ে তুলেছে। বাংলা উপন্যাসের প্রচলিত ভাবরীতি থেকে আলাদাভাবে বর্ণনার মাধ্যমে উপন্যাসের জন্য পাঠকের হৃদয় সঙ্গমকারী একটি হাতিয়ার

প্রায় একশ পৃষ্ঠার পত্র-উপন্যাসের এক আখ্যানের উপাদান তুলে ধরার চেষ্টা মাত্র। দুর্বিষহ নারীর জীবন সমাজের অন্য চোখে দেখা নিতান্তই মানুষের ভিতরে আলো খুঁজে পাওয়ার বিস্মিত এক দাম্ভিক দার্শনিকতার পরিচয় বহন করে এই পত্র-উপন্যাসখানা। রামিশা বিয়ের পরে মাহীকে কেবল ভালোবাসিনি, মাহীও রামিশাকে ভালবেসে ছিল। ডাক্তার মাহী হঠাৎ দু’বছর পর স্কলারশিপ পেয়ে রাশিয়ায় পিএইচডি করার জন্য চলে যায়।

তখন রামিশা দু’মাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রতিদিনই কথা হতো ইন্টারনেটে। কথা না হলে যেন দু’জনের কারো ঘুম হতো না। হঠাৎ করে দু’বছর যেতে না যেতেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। মানুষের জীবনের বিশ্বাস ভালোবাসার গল্পগুলো কখনো কখনো বড় অদ্ভুত। গৎবাঁধা জীবনে কষ্টের ভিন্নতার গল্প কখনও মনে হয় একইরকম।

কখন যে হারিয়ে যায় জীবনের সুখের গানগুলো তা কেউ বলতে পারে না।

‘পিরিত আঘাতের সাথে জীবন

মনের ভিতর হয়েছে দশার দাসত্ব।’

এভাবে অনুভবে স্বাধীনতা ঘোরলাগা রহস্যে দুর্বোধ্যতার সৃষ্টি রামিশার অন্তরে। এত ভালোবাসার সম্পর্কের ভেতর একটি নারীর একাকীত্বের সাথী ছিল এই চিঠি, আর কল্পনায় ঘেরা তার আর্তনাদের ভেতর স্বপ্ন সে বুনে যেতো অবিরাম। আর অনুভব তুলে উপমায় দর্শনে প্রকাশ ঘটায় মায়াবী মানুষ/কবি/উপন্যাসিক/মনের কর্মকার রুকসানা রহমান। বাক্যের শব্দ ব্যবহারে বেশকিছু নতুনত্ব দেখা যায়, অনুমান করা যায় না পরের অংশে কোন স্বাদ চিত্রকর্মে রঙিন করে তুলবে।

গল্পের ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটে; গল্পের মুখোশ তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময় মুখশ্রীর ঢাকা পড়ে যায়। জীবনের সুখ ও সুষমা অভিঘাত চমৎকার করে বুনন করেছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক রুকসানা রহমান তাঁর কাব্য উপন্যাস ‘ভালো থেকো ভালোবাসায়’। তিনি এই উপন্যাসের মাধ্যমে চলমান জীবনধারাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন। আছে জীবন সম্বন্ধে গভীর অভিজ্ঞতা ও দরদ। মায়া ভঙ্গিতে মানুষের জন্য যে হাসি-বেদনার অনুপম ছবি আঁকায় তার শিল্প শৈল্পিক অপরূপ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সরাসরি তীব্র কষাঘাত তিনি গল্পের জমিনে প্রকাশ করেছেন।

হাতের ছাপায় জীবনের বাস্তব রকম প্রতিফলন ঘটেছে এই পত্র-উপন্যাসে। যা যে কেউ পড়তে পড়তে তার চিরচেনা বাস্তব যাপিত-জীবন ভেসে উঠতে পারে। কখনো কখনো তৃষ্ণাবোধ ও বিচিত্র হৃদয়ে ছাপ পড়তে পারে। পাঠক হিসেবে এই উপন্যাসের কাছে আমার দাবি সামান্য নয়, বিস্তর ও গাঢ়তর। কোথায় দাঁড়িয়ে কবি ও কথাসাহিত্যিক চিঠির মাধ্যমে জীবনবোধ ও সংগ্রামের পথচলা নেড়েচেড়ে আনছে তা আমার বুঝতে খুব বেশি সময় নিশ্চয় দরকার হয় নাই। উপন্যাসের হাল শুরুর দিকে ধীর, কিন্তু শেষের আগে গভীর বর্ণনায় মন ও দৃষ্টি জমিয়ে নিবে প্রতিটি শব্দে প্রতিটি লাইনে তা আমি অনুভব করেছি। কবির দৃষ্টিকোণ শক্তিমতি কারখানা শান্ত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে টলটল জন্মদাতা। এই উপন্যাসের আকুতি, শব্দের প্রয়োগ, গল্পের গতি, বাস্তব চিত্র সুউচ্চ আশা বীজ রোপিত আছে।

বইটির ভালো দিক: একজন পাঠক মানসম্মত বইয়ের যে তালিকা তৈরি করে, সেই স্থানে ‘ভালো থেকো ভালোবাসা’ বইটি স্থান পাবে বলে আমি আমার পাঠের আস্থার জায়গা থেকে অভিমত ব্যক্ত করলাম। যে রূপক ব্যবহার করে জীবনের ক্রাইসিস এত সুন্দরভাবে তুলে ধরা যায়, এই বইটি না পড়লে বুঝবেন না। মূলত মানবিকতা-বর্জিত একটি জীবনপ্রলাপ, মানুষের প্রতি পৈশাচিক আচরণ এই বইটি পড়লে কিছুটা বুঝতে পারবেন। কিছু বই আছে যা একবার পড়লে আর পড়তে ইচ্ছা হয় না, কিন্তু ‘ভালো থেকো ভালোবাসা’ গ্রন্থটি পড়লে পাঠকের হৃদয় বারবার আকৃষ্ট করবে মমতার জায়গা থেকে।

Read Previous

স্খলনকালের গল্প: শব্দের আলপনায় আঁকা জীবনের প্রতিচিত্র

Read Next

জলদস্যুদের উপাখ্যান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *