অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আশরাফ পিন্টু -
অণুগল্পগুচ্ছ

ম্যাজিসিয়ান

একটি বড় চৌরাস্তার মোড়ে জনৈক ম্যাজিসিয়ান নানারকমের ম্যাজিক দেখাচ্ছে। বৃত্তাকার হয়ে বারোরকমের মানুষ সে ম্যাজিক উপভোগ করছে। ম্যাজিসিয়ান মুহূর্তেই রুমালকে টাকা কিংবা দড়িকে সাপ বানিয়ে ফেলছে। মুহুর্মুহু করতালিতে ভরে উঠছে চারিদিক। ম্যাজিসিয়ান এবার এগিয়ে আসে দর্শকের দিকে। একজন বয়োবৃদ্ধ ভিখারির হাত ধরে টান মেরে বৃত্তাকার জায়গার মাঝখানে নিয়ে যায়। ভিখারির পরনে তালিযুক্ত জামা ও লুঙ্গি।

ম্যাজিসিয়ান দর্শকের উদ্দেশ্যে উঁচু গলায় বলে— ভাইসব, এখন দেখবেন এই গরিব ফকিরকে কীভাবে বাদশা বানাই আমি।

ম্যাজিসিয়ান এবার ভিখারির পোশাকের পর কয়েকবার হাত ঘোরায়। কিছুক্ষণ সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অবাক নয়নে দেখতে থাকে ম্যাজিসিয়ানের ভেলকিবাজি।

—আরে! ওই তো, ফকির বাদশার পোশাকে সজ্জিত হয়ে পড়ছে। চোখের পলকে সব ঘটে গেল কিন্তু আমরা কেউ টেরই পেলাম না। এটা কীভাবে সম্ভব?

আবার মুহুর্মুহু হাততালির শব্দে কানে তালা লেগে যায়। সবাই ম্যাজিসিযানের ম্যাজিক দেখে যেমন মুখরিত তেমনি মুগ্ধ।

ম্যাজিসিয়ান দর্শকের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে জোর গলায় বলে, এখন দেখবেন বাদশাকে ফকির বানাই কেমন করে। ম্যাজিসিয়ান এবার একটু এগিয়ে এসে দর্শকসারি থেকে কেতাদুরস্ত এক ভদ্রলোককে হাত ধরে টেনে বৃত্তাকার জায়গার মাঝখানে নিয়ে যায়। লোকটির পরনে দামি স্যুট-টাই।

ম্যাজিসিয়ান এবার তার পোশাকের পর পূর্বের মতোই বার কয়েক হাত ঘোরায়। দেখতে দেখতে লোকটির পরনের কোট-প্যান্ট শতছিন্ন শার্ট আর লুঙ্গিতে পরিণত হয়ে যায়।

আবার কান ঝালাপালা করে হাততালি পড়তে থাকে। অনেকে কানাঘুষা করে, কীভাবে সম্ভব? কীভাবে সম্ভব? কী দারুণ মজার খেলাই না দেখাচ্ছে ম্যাজিসিয়ান! সকলেই ম্যাজিসিযানের পরিচয় জানতে উদ্গ্রীব হয়ে পড়ে। কোথায় থাকে লোকটি? কোথায়ইবা তার বাড়িঘর?

কেউ কেউ বলে, লোকটিকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আগে কোনো মঞ্চে হয়তোবা দেখেছিলাম।

কেউ একজন কৌতূহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করে নাম-ঠিকানা।

কিন্তু ম্যাজিসিয়ান চোখের পলকে দর্শকের ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়। কেউ আর তার পরিচয় নেওয়ার সুযোগ পায় না। ম্যাজিকের মতোই রহস্যঘন থেকে যায় সে পরিচয়।

 

অভূতপূর্ব

খবরটি সংবাদপত্রে প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে হৈ-চৈ পড়ে যায়। বাংলাদেশের এক তরুণ বিজ্ঞানী নাকি এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন যা দিয়ে অতীতের ঘটে যাওয়া সব ঘটনা সিনেমার দৃশ্যের মতো দেখা যায়। সত্যি এমন আবিষ্কার অভিনব! বিরল! যা বিশ্বের অন্য কোনো দেশের বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারেননি। সরকার খুশি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীকে পুরস্কৃত করেন। দেশের মুখ যিনি এমন উজ্জ্বল করেছেন তাকে পুরস্কৃত না করলে কি চলে?

বিজ্ঞানী যন্ত্রটির নাম দিয়েছেন ‘অভূত পূর্ব’। যন্ত্রটি প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এক মাসের মধ্যেই বাজারজাত করা হবে। যন্ত্রটির বাস্তব প্রমাণের জন্য রাস্তা থেকে এক বৃদ্ধ ভিখারিকে গবেষণাগারে নিয়ে আসেন বিজ্ঞানী। এরপূর্বে অবশ্য তিনি যন্ত্রটি নিজের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন। প্রমাণ দেখানোর জন্য উপস্থিত কিছু সূধী দর্শককেও দাওয়াত দেন তিনি।

প্রথমে যন্ত্রটি বৃদ্ধ ভিখারির মাথায় স্থাপন করা হয়। ধীরে ধীরে স্ক্রিনে ভেসে উঠতে থাকে অতীতের ঘটে যাওয়া সব দৃশ্য। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর চলতে থাকে ক্রমশ পেছনের দিকে—

ভিখারি শহরে এল…

বাড়িঘর সব যমুনায় গ্রাস করেছে…

গ্রামে তার প্রচুর জমি-জমা ছিল…

পরিশেষে বোঝা যায় ভিখারি গ্রামের মধ্যে একজন বিত্তশালী ব্যক্তি ছিল।

এরপর তার রক্ত নিয়ে যন্ত্রটির স্লাইডে রাখা হলো। এ থেকে জানা যাবে— ভিখারির স্বভাব-চরিত্র; সে সৎ না অসৎ। তার সুকর্ম-কুকর্মের সবকিছু পর্দায় ভেসে উঠবে এই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে।

দেখা গেল— ভিখারি যখন বিত্তশালী ছিল তখন সে অনেক খারাপ কাজ করেছে। গ্রামের অশান্তির মূলে ছিল সে। ভিলেজ পলেটিক্স নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকত। তার দাপটে গ্রামের কেউ টু-শব্দটি করতে পারত না। তবে সে নিয়মিত নামাজ-কালাম পড়ত, মাঝে-মধ্যে দান-খয়রাতও করত। যন্ত্রটির প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা সরকারি-বেসরকারি উভয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের কানে চলে যায়। যন্ত্রটির আবিষ্কারের কথা শুনে প্রথমে তারা যতটা খুশি হয়েছিলেন তার চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন। দরিদ্র ভিখারির অতীত ইতিহাস যন্ত্রটিতে যেভাবে ধরা পড়েছে তাতে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।…

যন্ত্রটি বাজারজাত হওয়ার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। হঠাৎ আবার সংবাদপত্রে খবর বেরুল— যন্ত্রটি এবং এর আবিষ্কারক বিজ্ঞানীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

 

আগন্তুক

কিছুক্ষণ আগে যে লোকটি অফিস কক্ষে ঢুকেছিল তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কী আর্শ্চয! কোথায় গেল লোকটি? দেখতে দেখতে হাওয়া হয়ে গেল! দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করা হলো আগন্তুক সম্পর্কে। দারোয়ান সঠিক জবাব দিতে পারল না। কত লোকই তো ঢুকছে অফিসে, মানুষ চিনব কী করে? বিড়াল কুকুর এদের চেনা যায় কিন্তু মানুষকে চেনা মুশকিল। দারোয়ান বলল, একটু আগে সে একটি কুকুরকে গেট দিয়ে বের হয়ে যেতে দেখেছে। কী! কুকুর? কুকুর অফিসে ঢুকে কী করে? বেকুব। আমি কুকুরের কথা জিজ্ঞেস করেছি? আমি জজ্ঞিসে করেছি একজন আগন্তুক অফিসে ঢুকেছিল, সে কোথায় গেল? কী তার উদ্দশ্যে তা জানা যায়নি। আচ্ছা, আপনাদের রুমে ঢুকেছিল না?

—কই , আমরা তো খেয়াল করিনি? আমরা শুধু একটি কালোবিড়ালকে রুম থেকে বের হয়ে যেতে দেখেছি।

কী অদ্ভুত! আমি কোনো প্রাণী বা জীবজন্তুর কথা জিজ্ঞেস করেছি? আমি বলছি কেউ একজন ঢুকেছিল, কী উদ্দেশ্য ওর— তা বোঝার আগইে লাপাত্তা হয়ে গেল! দেখুন তো, ও পাশের ভাঙা জানালা দিয়ে লোকটি পালিয়ে গেল কিনা? সবাই জানালার দিকে নজর দিতেই চোখে পড়ল একটি বানর মাটি থেকে লাফিয়ে গাছে উঠল। নাহ্! জীবজন্তুর কথা শুনতে শুনতে শেষে চোখে জন্তুই দৃশ্যমান হচ্ছে। কোথায় গেল লোকটি? ইতোমধ্যে একটি শিম্পাঞ্জি অফিস কক্ষে ঢুকে পড়ল। পেছনে সেই বানরটি রয়েছে। ওদের পেছনে দেখা গেল একটি কুকুর ও একটি কালোবিড়ালকে। ওরা কেউ কিছু না বলে অফিসের চেয়ারগুলোতে বসে পড়ল, যেখানটায় আমলাদের বসার জায়গা ছিল।

 

লাশ

লাশ নিয়েই সে ব্যস্ত থাকে সব সময়। প্রতিদিন লাশ আসে পাঁচ-সাতটা করে। কখনো বেশি; যখন অ্যাকসিডেন্ট হয়— ফাটা, থেতলে যাওয়া বহু লাশ আসে। কখনো বস্তাবন্দি গলিত দুর্গন্ধময় লাশ। সম্প্রতি করোনায় মারা যাওয়া দুই-একটা লাশও যোগ হচ্ছে।

বুদ্ধ ডোমের প্রতিদিন লাশ নিয়েই কারবার। ডোমগিরি তার পেশা। অন্যান্য পেশাদারের মতোই নিজ দায়িত্ব পালন করে সে। লাশ নিয়ে কোনো রূপ ভাবোদয় হয় না তার। মৃত্যু যেন তার কাছে এক বোতল বাংলা মদ; নেশায় চুর হলে এক রকম, আবার নেশা কেটে গেলে অন্যরকম।

সেদিন সন্ধ্যা অবধি কোনো লাশ আসেনি মর্গে। সারাটা দিন বাংলা খেয়েছে আর ঝিমিয়ে কাটিয়েছে বুদ্ধ ডোম। হঠাৎ রাত ন’টার দিকে একটা লাশ আসে। এক কিশোরীর লাশ। পরনের পাজামায় কেমন ছোপ ছোপ লাল রক্তের দাগ। লাশটির মুখ দেখেই সে চমকে ওঠে— এ যে তারই মেয়ে বেলারানি! কেমন করে এমন হলো?

মেডিকেল রিপোর্ট থেকে জানা যায়— বেলারানিকে কতিপয় যুবক ধর্ষণের পর হত্যা করেছে।

বুদ্ধ ডোম নিথর হয়ে যায়। নিজেকে লাশ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।

 

ঘুড়ি ও লাটাই

১.

ঘুড়িটি আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

ক্রমশ উপরে উঠছে

উঠছে

উঠছে…

হঠাৎ ঘুড়িটির কোমরে বাঁধা সুতোয় টান পড়ে। তখন তার চেতন হয় সে সুতোয় বাঁধা আছে। কয়েক টানেই দুর্বল ঘুড়িটি মুখ থুবড়ে পড়ে যায় কাদামাটিতে।

২.

ঘুড়িটি অনেক উপরে ওঠার পর অনুভব করল— তার কোমরে সুতোয় বাঁধা রয়েছে। বুঝতে পারল লাটাই তাকে নিচে নামানোর জন্য টানছে। কিন্তু ঘুড়িটির ইচ্ছে আরও উপরে ওরা— লাটাইয়ের হাতে বন্দি না থেকে স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ানো।

 

আশরাফ পিন্টুর মৃত্যুর এক দশক পর

—এই যে ভাই, আশরাফ পিন্টুকে চেনেন?

: কোন আশরাফ পিন্টু?

—ওই যে নব্বই দশকে ছড়া-টড়া লিখতেন।

: কই, চোখে পড়েনি তো?

—এ ছাড়া কবিতা গল্পও লিখেছেন।

: কই, কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না।

—কবিতা নয়, অণুগল্পে বেশ হাত ছিল তার।

: মনে করতে পারছি না যে।

—গবেষণায় এক সময় পুরস্কারও পেয়েছিলেন; বিশেষ করে স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় বেশ নাম ছিল তার।

: ও!

—(স্বগত) কী আশ্চর্য! তাহলে এই আশরাফ পিন্টুকে আমি চিনলাম কী করে?

 

বাঁশির কান্না

‘কে বা বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নই কুলে।

কে বা বাঁশী বাএ বড়ায়ি এ গোঠ গোকুলে।।

আকুল শরীর মোর বেআকুল মন।

বাঁশীর শবদে মোর আউলাইলো রান্ধন।।’

ওমন সুর করে কি পড়ছিস দাদু?

স্বনন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পড়ছিল এমন সময় দাদু ওর রুমে ঢুকে পড়ে। দাদু বেশ কয়েক বছর হলো অবসরে গিয়েছেন। দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। স্বনন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দাদুকে বসার জন্য আরেকটি চেয়ার এগিয়ে দেয়। দাদু বসার পর বলে, পাঠ্যবই-ই পড়ছিলাম দাদু, কিন্তু ভাষা বুঝতে পারছি না তেমন। ভাষার চেয়ে ভাব বোঝা বেশি প্রয়োজন।

যেমন…?

কৃষ্ণের বাঁশির সুরে রাধা আকুল হচ্ছে— এটা তো সরল কথা। কিন্ত এখানে আসলে কৃষ্ণ কে, আর রাধাইবা কে সেটা জানা দরকার। যুগ যুগ ধরে বাঁশি আর তার সুর নিয়ে কত কবিতা, গান, গল্প বা মিথের জন্ম হয়েছে…

কঠিন কঠিন কথা বাদ দিয়ে দাদু সহজ কথা বলুন। বাঁশি নিয়ে কোনো গল্প থাকলে বলুন। স্বনন দাদুর কথা শেষ না হতেই বলে।

গ্রিক পুরাণের অর্ফিয়ুস চমৎকার বাঁশি বাজাত। বাঁশির সুর শুনে শুধু মানুষ নয়, বনের পশু-পাখি মুগ্ধ হয়ে ছুটে আসত অর্ফিয়ুসের কাছে। মন্ত্র-মুগ্ধের মতো তারা শুনত ওর বাঁশির সুর। এছাড়া বাঁশির সুর শুনতে গতিশীল ঝরনা থেমে যেত, নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে ছুটে আসত অর্ফিয়ুসের কাছে।

দাদু একটু দম নিয়ে বলেন, জানিস দাদু, যে বাঁশির সুর এত সুন্দর, এত মোহনীয়, সে সুরের ভেতরে বেদনা লুকিয়ে আছে।

স্বনন অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, কীসের বেদনা দাদু?

জানিস তো দাদু, বাঁশ থেকে বাঁশি তৈরি হয়। যখন বাঁশ থেকে বাঁশি তৈরির অংশটুকু আলাদা করা হয়— তখন থেকেই কান্নার শুরু। বিচ্ছিন্ন হওয়া যে বড়ই বেদনাদায়ক; তা সে কখনোই ভুলতে পারে না। সে পুনরায় মিলিত হওয়ার জন্য কেঁদে চলে। আসলে ওটা বাঁশির সুর নয়, বাঁশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কান্না। একটু থেমে দাদু পুনরায় বলেন, কথাগুলো কিন্তু আমার নয় দাদু, কথাগুলো মাওলানা ও সুফি কবি জালালউদ্দিন রুমির।

দাদুর শেষের কথাটা কানে যায় না স্বননের। বাঁশির সাথে ও যেন মানুষের জীবনের মিল খুঁজে পায়।

 

উতল ফেন

ঘুম ভাঙতেই সন্ধান পাশ ফিরে কম্বলের নিচে হাতড়িয়ে কবিতাকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও খুঁজে পায় না। মেজাজটা বিগড়ে যায় সন্ধানের। কদিনমাত্র বিয়ে হয়েছে— ঠিকমতো বৌকে কাছে পাচ্ছে না। সন্ধ্যারাতে শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়ে কবিতা। লম্বা একটা ঘুম দেওয়ার পর শেষরাতে কাছে পায় ওকে। নব দাম্পত্যজীবনে শুধু একবার কাছে পেলে কি চলে?

সন্ধান বিছানা থেকে উঠে আলো জ্বালায়। ঘড়িতে দেখে দুটো চল্লিশ বাজে। কোথায় গেল কবিতা? বাথরুমের দিকে এগোয়। নাহ! নেই। বাথরুম সেরে সন্ধান আবার রুমে ফেরে। এমন সময় কিচেন থেকে থালা-বাসন নাড়াচাড়ার শব্দ কানে আসে।

সন্ধান কিচেনে ঢুকে দেখে কবিতা বেসিনে থালা-বাসন মাজছে। পাশে গ্যাসের চুলায় হাঁড়িতে ভাত চড়ানো। ওর খেয়ালই ছিল না রমজান মাস শুরু হয়েছে। সন্ধানের দিকে চোখ পড়তেই কবিতা মুচকি হেসে ভাতের হাড়ির ঢাকনা খুলে খুন্তি দিয়ে ভাতের ভিতরটা নাড়িয়ে দেয় ।

—আমি তোমাকে খুঁজছি আর তুমি এখানে?

—রোজা থাকবে নাকি আজ? কবিতা সন্ধানের কথা গায়ে না মেখে কাজ শেষে হাঁড়ির পর ঢাকনাটা বসিয়ে দেয়।

—না। চল।

—দেখছ না রান্না করছি। আজ হবে না ।

—কেন?

—রোজা থাকব। তুমিও থাকো।

—না। লক্ষ্মীটি, তুমি আমার কষ্টটা বুঝতে পারছ না…।

সন্ধান একটু নরম হয়। পেছন থেকে কবিতার দু বাহু জড়িয়ে ধরে।

—কী করছ? ছাড়ো।

—না। সন্ধান আরও নিবিড় হয়। ঠোঁটে ঠোঁট গুঁজে দেয়।

কবিতা বাধা দিতে গিয়েও হেরে যায়।

ওদিকে ভাতের ফেন উতলিয়ে অ্যালুমিনিযামের ঢাকনাটা প্রচণ্ড শব্দে পড়ে যায় মেঝেতে। হাঁড়ির চারিদিকে ফেন উতলিয়ে পড়তে থাকে। ধীরে ধীরে ফেনের উতলানো স্তিমিত হয়ে আসে। তবে তখনো হাঁড়ির কানা চুইয়ে গরম ফেনের ফোঁটা পড়তে থাকে—

টপ! টপ!! টস!!!

 

জায়গা

‘বাবা, এটা ড্রয়িং রুম, ওটা কিচেন রুম, এটা তোমার নাতি স্বননের পড়ার রুম আর এটা তোমার রুম।’ সদ্য সমাপ্তকৃত ফ্লাট বাড়িটির রুমগুলো বাবাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিল ছেলে জুবায়ের আহমেদ।

জুবায়ের আহমেদ একজন ইঞ্জিনিয়ার। নিজেই বাড়িটির নকশা করেছে। বাবা জামিল আহমেদ প্রায় দশ বছর আগে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। চাকরির শেষের দিকে অনেক কষ্টে-সৃষ্টে ঢাকা শহরে জায়গাটি কিনেছিলেন। কিন্তু টাকার অভাবে বাড়ি করতে পারেননি। ছেলেকে মানুষ করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। সে আশাও পূরণ হয়েছে। চাকরি জীবনের সততার পুরস্কারস্বরূপ তার ছেলের চাকরি হয়েছে নিজ অফিসে। নিজে ক্লার্কের চাকরি করায় সারাজীবন ভাড়া বাড়িতে থাকতে হয়েছে তাকে আর ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে চাকরির ১০ বছরের মধ্যেই এমন একটি বাড়ি করে ফেলল! গর্বে বুক ভরে ওঠে জামিল আহমেদের।

জামিল আহমেদ ছেলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে রুমগুলো দেখার পর ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ান। অনেক উঁচু থেকে নিচের দিকে তাকান। বলেন, বাগানের জন্য কোনো খালি জায়গা রাখিসনি, বাবা?

—না বাবা। ঢাকা শহরে কেউ ফাঁকা জায়গা রাখে নাকি? যা দাম! জুবায়ের জবাব দেয়।

—কিন্তু একটু ফাঁকা জায়গার প্রয়োজন ছিল রে!

—কেন বাবা?

—আমার কবরের জন্য। তোর মা মারা যাওয়ার পর গোরস্থানে কবর দেওয়া হয়েছিল। মাত্র এক বছর হয়েছে, কবরের চিহ্নমাত্র নেই; ভেঙে দিয়েছে ওরা। একজন মানুষ সারাজীবন গাধার মতো খেটে এত কিছু করে; মৃত্যুর পর নিজ বাড়িতে ঠাঁই তো হয়ই না, এমনকি আজকাল গোরস্থানও বেশিদিন রাখে না। সত্যি মৃতব্যক্তির জন্য জায়গার খুব অভাব। জামিল আহমেদ একটু থেমে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মৃত্যুর পর আমি আমার বাড়িতেই থাকতে চাই রে খোকা।

জুবায়ের আহমেদ কী জবাব দিবে ভেবে পায় না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বাবাকে অবাক করে দিয়ে বলে, এ বাড়ি তো তোমার নয়। আমারও নয়। এখানে জায়গা রাখব কীভাবে?

 

চিড়িয়াখানা

চিড়িয়াখানায় ঢুকেই স্বনন মাহমুদের ভালো মনটা খারাপ হয়ে গেল। কেমন নিষ্প্রাণ, বিবর্ণ পরিবেশ! দর্শকও অনেক কমে গেছে।

স্বনন বানরের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলেন— ওদের মধ্যে কোনো চঞ্চলতা নেই; শুধু খাচ্ছে আর ঘুমোচ্ছে। বাঘ ও সিংহের খাঁচার সামনে গিয়ে দেখেন— ওদেরও একই অবস্থা। ওরাও ঝিমুচ্ছে। খাদ্যাভাবে হাতিগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শুধু শেয়ালগুলোর মধ্যে প্রাণ-চাঞ্চল্যতা লক্ষ করা গেল। ওরা স্বননকে চিড়িয়াখানার কিউরেটর ভেবে লেজ নাড়তে লাগল।

স্বনন মাহমুদের মনটা একেবারে খারাপ হয়ে গেল। তিনি এতদিন দেশের বাইরে গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি একজন পরিবেশবিদ অথচ…

চিড়িয়াখানা থেকে স্বনন মাহমুদ বেরুতেই লোকজনের ভিড়ের মধ্য থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডাক দিল। স্বনন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন কিন্তু লোকটিকে চিনতে পারলেন না। লোকটি বলল, কোথায় গিয়েছিলেন?

স্বনন জবাব দিলেন, চিড়িয়াখানায়।

স্বননের কথায় লোকটি মৃদু হেসে ফেলল। বলল, কে বলল আপনাকে— এটি চিড়িয়াখানা? এটি তো একটি দ্বীপ; তবে কেউ কেউ একে দেশও বলে।

—কী বলছেন এসব! কিন্তু আপনি কে? স্বনন মাহমুদ একটু রেগে গেলেন।

—আমি এক সময় আপনার বন্ধু ছিলাম। এখন পশুরূপী একজন মানুষ। এতদিন বানরের খাঁচায় বন্দি ছিলাম। অনেক কষ্টে আজই বের হযেছি।

লোকটির কথা শুনে স্বনন মাহমুদ এতক্ষণ ঘোরের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখেন লোকটি নেই; ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেছে।

নদী শুকালে শব্দ হয় না

নদী হঠাৎ করেই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে— সে আর সাগরের সাথে মিশবে না। সে জানে— সাগর ছাড়া শুকিয়ে মরুভূমি হবে একদিন। তবুও…।

নদীর এমন সিদ্ধান্তে সাগর অবাক হয়ে যায়। নদী কেন এমন করল? কীইবা ভুল, কীইবা দোষ ছিল তার? সাগর তার দোষ খুঁজে পায় না।

নিজের দোষ কি কখনো টের পায় কেউ?

নদী ভরা যৌবন নিয়ে পথ চলতে থাকে। বুকে যতটুকু জল জমা আছে ততটুকুই সম্বল তার। অন্য কারও জলের প্রয়োজন নেই।

দিন গড়িয়ে যায়। একসময় নদীর যৌবনে ভাটা পড়ে, নদী শুকিয়ে যায়; তবুও কোনো উচ্চ-বাচ্য নেই।

কেননা নদী শুকালে কোনো শব্দ হয় না।

 

ভয়

রোগীর কথা শুনে ডাক্তার সাহেব চমকে ওঠেন— এক সময় তিনি নাকি ঠিকই দু’পায়ে হাঁটতে পারতেন কিন্তু এখন তিনি চারপায়ে অর্থাৎ হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটেন। কীভাবে এমন হলো জানতে চাইলে রোগী বলেন, ভয়ে।

—ভয়ে!

—ভয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি অনেক দিন। এরপর একদিন সকালে বিছানা ছেড়ে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়ে দেখি দু’পায়ে হাঁটতে পারছি না।

—তারপর?…

ডাক্তার কৌতূহলী হয়ে ওঠেন; এমন সময় চেম্বারে দুজন লোক ঢুকে পড়ে। এদের মধ্যে একজন পঙ্গু। পঙ্গু লোকটি অপরজনের কোলে শায়িত। অপর লোকটি পঙ্গু লোকটিকে পাশের বেডে শুইয়ে দেয়।

—এই কিয়াম! ডাক্তার সাহেব উচ্চস্বরে পিয়নকে ডাকতে থাকেন। কিয়াম দরজার পাশে থেকে দৌড়ে এসে ডাক্তারের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়।

লোকটি ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বিনীত স্বরে বলে— স্যার, ওর কোনো দোষ নেই। ইমারজেন্সি রোগী তাই… স্যার, যদি একটু দয়া করেন…।

লোকটির বিনীত কথায় ডাক্তার সাহেবের রাগ দমে যায়। তিনি চেয়ার থেকে উঠে রোগীর বেডের পাশে যান। রোগীর দিকে তাকাতেই দেখেন— হাত-পাগুলো শুকিয়ে কেমন ছোট হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেন, জন্ম থেকেই এমন নাকি?

—না স্যার।

—তাহলে?

—ভয়ে এমন হয়েছে।

কী অদ্ভুত! ডাক্তার চিন্তা করতে থাকেন, এ রোগের তিনি কী ট্রিটমেন্ট করবেন! ভয়ের কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে কিনা তার জানা নেই। শৈশবে দাদার মুখে শোনা একটি গল্প মনে পড়ে যায় তার : এক সময় সাপেরও পা ছিল। ডাইনোসরদের ভয়ে সাপরা গর্তে লুকিয়ে থাকতে থাকতে তারা পায়ের ব্যবহার ভুলে যায়। এরপর সাপদের পা বিলুপ্ত হয়ে যায়।…

কাজেই ভয়ের ওষুধ তিনি দেবেন কীভাবে?

ডলার চৌধুরির ডাকসাইটে ষাঁড়

হোক্কা!

বিকট চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় মন্ত্রী ডলার চৌধুরির। সারাদিন ঈদের ঝক্কি-ঝামেলার পর শেষরাতের দিকে বিছানায় শুতে যান তিনি। মাত্র ৩/৪ ঘণ্টা ঘুম হতে না হতেই ষাঁড়ের এমন সুতীব্র চিৎকার। অবশ্য ষাঁড়ের এমন চিৎকার তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই শুনছেন। সপ্তাহখানেক আগে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে একটি ডাকসাইটে ষাঁড় কিনেছেন। অত্র এলাকার মধ্যে সেরা ষাঁড় এটি। শুধু অত্র এলাকা কেন— বলা চলে পুরো জেলার মধ্যে তার ষাঁড়টি সবচেয়ে বেশি মূল্যের। মন্ত্রী বলে কথা! সবার চেয়ে সেরা না হলে সমাজে মান থাকে?

ভোর হতে না হতেই আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন ভিড় জমায় বাড়িতে। কেউবা কথা বলে, কেউবা গায়ে হাত বুলিয়ে ষাঁড়টিকে ঘিরে নানা মন্তব্য করতে থাকে। এতে দর্শকরা মজা পেলেও ষাঁড়টির ভালো লাগে না। বিরক্তির চরম পর্যায়ে যখন পৌঁছে তখন ষাঁড়টি ‘হাম্বা’ ডাক ভুলে গিয়ে ‘হোক্কা’ ডাকে চিৎকার শুরু করে।

কদিন ধরে ষাঁড়ের এমন চিৎকারে ঘুম ভাঙছিল মন্ত্রী সাহেবের। বিরক্ত না হয়ে বেশ ভালোই লাগছিল তার। ষাঁড় দেখার ছলে চলে জনমুখে মন্ত্রী-বন্দনা। আগামী নির্বাচনের বিজয়টা পাকাপোক্ত হওয়ার পথে। গত নির্বাচনে বিভিন্ন কারসাজি করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এমপি হয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত মন্ত্রীও হয়েছেন। তবে ষাঁড়টির জন্য হয়তো আগামী নির্বাচনে বেগ পেতে হবে না। ভোটের পথটা অনেক সহজ হবে মনে হচ্ছে। পাবলিক সেন্টিমেন্ট বুঝতে পেরেই এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি। এক ঢিলে দুই পাখি মারা আর কী— কোরবানির সঙ্গে ভোটের রাস্তাটাও ক্লিয়ার হচ্ছে।

কিন্তু আজকে ষাঁড়ের ডাক শোনা যাবে কেন? ষাঁড়টিকে তো কালকে কোরবানি দেওয়া হয়েছে। কানের কোনো ভুল নয় তো? মন্ত্রী সাহেব তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েন। দরজা খুলে বাইরে আসেন। গ্রামের বাড়ি। সামনে বিশাল উঠোন। উঠোনের শেষ মাথায় কাছারি ঘর। তার পাশে রয়েছে ছোট একটি গোয়াল ঘর। মন্ত্রী সাহেব উঠোনে পা রেখে আশপাশে তাকান। কিন্তু না, কোথাও ষাঁড় বা অন্য কোনো গরু চোখে পড়ে না। তাহলে এটা কী তার মনের ভুল?

হোক্কা!

এমন সময় আবার ষাঁড়ের ডাক কানে আসে। ডাকটি আসছে গোয়াল ঘর থেকে। মন্ত্রী সাহেব আস্তে আস্তে পা ফেলে আগাতে থাকেন গোয়াল ঘরের দিকে। ঘরের ভিতরে চোখ পড়তেই চমকে ওঠেন— আরে! ঐ তো মোটাতাজা তার সেই ষাঁড়টি; যে ষাঁড়টিকে তিনি কালকে কোরবানি দিয়েছিলেন।

 

হাত

‘দাদু, তোমার জন্যও একটি টকটকে লাল গোলাপ।’

আয়নাল সাহেবের ষোড়শী নাতনি একটি গোলাপ ফুল হাতে তুলে দিয়ে তড়িঘড়ি করে বন্ধুর সাথে গেটের বাইরে চলে যায়।

আয়নাল সাহেব গোলাপটি হাতে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতেই হাত ফসকে মাটিতে পড়ে যায়। ফুলটি কুড়াতে গিয়ে লক্ষ করেন হাতটি কেমন অবশ হয়ে আসছে— তেমন জোর পাচ্ছেন না। ভালো করে আঙুলগুলো টিপে দেখেন কোথাও ব্যথা নেই।

গোলাপটি মাটি থেকে তুলে নিয়ে নাকে ধরতেই তিনি অতীতে হারিয়ে যান। তার জীবনে প্রায় ৭৫টি ভালোবাসা দিবস পেরিয়ে গেছে কিন্তু এ পর্যন্ত কাউকে ভালোবেসে ফুল দেওয়া তো দূরের কথা দুটো ভালো কথাও বলেননি কোনোদিন। ছাত্রজীবনে একটি মেয়ে তাকে ফুল দিয়েছিল— ঠিক এমনি টকটকে লাল ফুল। বিনিময়ে তিনি তাকে দিয়েছিলেন লজ্জা। এই হাতের অস্ত্রের জোরে তিনি কেড়ে নিয়েছিলেন তার সম্ভ্রম। পরে মেয়েটি লজ্জায় আত্মহত্যা করেছিল।

কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ার পর সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয়েছে লোক-লস্কর নিয়ে। তার দল যখন ক্ষমতাসীন তখন তো নিঃশ্বাস ফেলানোর সময় ছিল না। কত কোন্দল-বিবাদ, কত রকমের সমস্যা মেটাতে হয়েছে তাকে। এর পর ছিল উঠতি নেতা আরিফের সাথে দ্বন্দ্ব। খুন-গুম, উপড়ি টাকার লেন-দেন কত কিছুই না করেছেন এই হাত দিয়ে।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে ঠিক এই দিনে মিষ্টি আর ফুলের তোড়া নিয়ে কোন্দল মেটাতে এসেছিল সাবেক ছাত্রনেতা আরিফ। মিষ্টি ফুল গ্রহণ করে সেদিন ওর সাথে বুকে বুক মিলিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু আরিফ চলে যেতেই ড্রয়ার খুলে তিনি পিস্তল তুলে দিলেন আজ্ঞাবহ গলাকাটা স্বপনের হাতে। স্বপন দলবল নিয়ে সে রাতেই আরিফসহ ওদের গ্রুপের ১০ জনকে ফেলে দেয়। এটা করে আগামী ভোটের বিজয় নিশ্চিত করেন আয়নাল হক।

এমন অমার্জনীয় অতীত স্মৃতি মনে হতেই মনটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। এই ৭৫ বছরের কোনো একদিন এমনটি হয়নি তার। তিনি বর্তমানে ধর্ম-কর্মে মন দিয়েও এসব দুঃস্মৃতি ভুলে যেতে পারেননি। তিনি অতীতের যত খারাপ স্মৃতি সব ভুলে যেতে চান। কিন্তু কয়লার ময়লা কি পরিষ্কার হয় কখনো?

আয়নাল সাহেব ফুলটি টেবিলের ’পর রেখে অজু করতে যান কলতলায়। হাত ধৌত করার সময় ভালো করে দৃষ্টিগোচর হয়— হাতের আঙুলগুলো কেমন ফোলা ফোলা দেখাচ্ছে। পানি-টানি লেগেছে নাকি? আয়নাল সাহেব দ্রুত অজু শেষ করে জায়নামাজের ’পর গিয়ে বসেন।

আয়নাল সাহেব নামাজ শেষ করে মোনাজাতের জন্য হাত তোলেন। দু’হাতের দশ আঙুল একত্রিত হয়। হাতের ফোলা আঙুলগুলোর দিকে চোখ পড়তেই মনে হয় ওগুলো যেন দশটি মানুষের মুখ; কেমন ভয়াল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, মনজুর কাদের মহিলা ডিগ্রি কলেজ, বেড়া, পাবনা

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

ঈর্ষা

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৬ষ্ঠ সংখ্যা (জুন-২০২৪)

One Comment

  • অণুগল্প গুলো বেশ মজার।ভালো লেগেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *