অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভাষান্তর : শামীম আহমেদ -
পলা হারমন’র তিনটি ফ্লাশ ফিকশন

তীরন্দাজ

আকাশ হালকা মেরে এলেও সূর্য ওঠেনি।

সারারাত আমার নিদ্রাহীন গেছে, সমলয়ে, সমভাবে। তাই, যেহেতু এখনও আলো হয়নি; আমি আমার বাড়ি এমনকি শহরের বাইরে বেরিয়ে পাহাড়ি এক দুর্গে হেঁটে যাই। সম্ভবত, সেটি এমন প্রাচীন জায়গা যেখানে সূর্য উদিত হলে আমার পৃথিবী আবার বোধগম্য হবে উঠবে।

চূড়ার কাছে একজন লোক আমার নজরে এল, আমিও তার নজর এড়াইনি।

লোকটি নগ্ন, পাথরের পেছনে কুঁকড়ে ঘাপটি মেরে আছে। আমি আরোহণ করার সাথে সাথে তাকে পাথুরে প্রকৃতির অংশ মনে করেছি। সে আমার মতো চমকালেও নিশ্চুপ রইল।

আমি অনিশ্চিতভাবে থেমে গেলাম। আমার হৃদয় দুরুদুরু, মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেল। জনালয় থেকে আমি অনেক দূরে, একা।

বুঝতে পারছি সে আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে। বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম কতক্ষণ ধরে আমাকে নজরবন্দি করে রেখেছে। সে যখন আমাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করছিল, তখন একটি ছোট ভ্রুকুটি ছাড়া— তার মুখমণ্ডলে দ্বিতীয় কোনো অভিব্যক্তি ছিল না। তারপরে পূর্ব দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল; মনে হয় তার আগ্রহের তলিকা থেকে আমাকে বাতিল করে দিল।

স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে ছিল সে।

ভাবছিলাম : নিঃসঙ্গ চূড়া পর্যন্ত যাব, নাকি খাঁজযুক্ত পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচের দিকে ঘুরব? সে যেকোনো পথেই আমাকে টপকিয়ে যেতে পারে। আমি অফিস ফেরত বেচারি; আমার পা ক্লান্ত আর পেশী ব্যথা করছিল। আমি আমার হাত-পা আর ত্বকের কোমলতা সম্পর্কে সবসময় সচেতন।

ধূসর-ম্লান আলোয় চোখ মিটমিট করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভেবেছিলাম সে নগ্ন, এখন বুঝতে পারলাম সে একধরনের চামড়ার ট্রাউজার পরে আছে। তার বুকের সামনে একটি ধনুক বাঁকা করে আটকানো। তার মুখমণ্ডল, বুক, বাহু পেটানো ও ধূলি-ধূসরিত।

একটি পাখি আমার পেছনে ডাকতেই সে পাখিটির দিকে তাকিয়ে ধনুকের দিকে হাত বাড়াল। তীর ছুড়ে মারার সাথে সাথে আমাদের চোখ দু’জোড়া চোখাচোখি হয়ে যায়। দূর পূবে ছুটে যাওয়া ভেড়ার ভ্যাঁ ভ্যাঁ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো পাখির ডাক শুনতে পেলাম না। তীরটা কি সে পাখির দিকে তাক করেছিল?

আমি নট নড়নচড়ন। লোকটি তীর আমার দিকে তাক করল, তবুও আমি নড়তে পারলাম না। লোকটির বাহু ছিলা থেকে সরে গেলে সূর্য উঠল। সূর্য উঠল, ভেড়াগুলো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে থাকল, পাখিরা গান গাইল; আর, সেখানে কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই। সূর্য উঠে আকাশ আলোকিত হয়েছে। আমি একটি পাথরের দিকে তাকিয়ে আছি।… না, দুটি পাথর… একটি বাঁকা… একটি কোণাকার…

…আর আমি এক…।

অনুপ্রবেশকারী

পুরোনো যুদ্ধনৌকাটি কয়েক বছর ধরে বেন ও জো’কে প্রলুব্ধ করলেও তারা তাতে ওঠার ক্ষেত্রে খুব কম বয়সী ছিল।

এখন তাদের যথেষ্ট বয়স, এখন ব্যাপারটি ভিন্ন। পুরোনো নৌকাটিতে হয়তো একটি দুর্দান্ত গুহা থাকবে, আর তারা হয়তো সেখানে ঘুমাতে পারবে, যদি তারা রাতে লুকিয়ে যেতে পারে। কেউ মনে হয় এটাকে তেমন পাত্তা দেয়নি, যত্ন নেয়নি। নদীর ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, পচে যাওয়া অনেক প্রিয় নৌকাগুলোর মধ্যে এটি ছিল একটি। এটা অন্য বাচ্চাদের সাথে গালগল্পের একটা বিষয় হবে। ‘আমরা সারা রাত নদীর ধারে ছিলাম। আমরা ওই নৌকায় ছিলাম।’

এখন হেমন্তকাল। অন্ধকার হয়ে আসছিল। বিরুদ্ধ ও অপ্রীতিকর একটা দিন ছিল এটা। এমনকি সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ নাবিকদের জন্যও দিনটি তাদের নৌকাগুলো সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিকূল ছিল। বেন ও জো’কে কাদাজুড়ে দাপাদাপি আর নৌকায় চড়ে ঝাঁপাঝাঁপিতে বাগড়া দিতে অন্য কেউ কাছাকাছি ছিল না। তারা তাদের জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখতে পারে এবং সবাই ঘুমিয়ে পড়লে পরে ফিরে আসতে পারে।

চারিদিকে বাতাসের হাহাকার। পর্দা’র মধ্যে ঝনঝন শব্দ হচ্ছে; হয়তো তাদের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর হতে পারে যারা এতে অভ্যস্ত নয় আর তাদের মতো নদীর ধারে বসবাস করে না।

তারা অন্য নৌকা থেকে একটি মই টেনে এনে উপরে উঠিয়ে দিল। নৌকায় পুরোনো তেল আর পচা কাঠের গন্ধ। তারা উপরে উঠার সাথে সাথে রঙের খোসা তাদের শরীরে আঁচড় দেয়।

‘এখন কী?’ বলল বেন।

তারা এই ডেকের উপর দাঁড়িয়ে স্ন্যাকস খেত। পালাক্রমে স্টিয়ারিং ঘোরানোর ভান করত। ডেকের আগায় দাঁড়িয়ে থাকত হুইলহাউসে চড়ার জন্য।

বৃষ্টি পড়ছে।

‘মনে হয় আমাদের জিনিসগুলো নিচে লুকিয়ে রাখা ভালো হবে।’ জো বলল।

পচা কাঠের মাঝখান দিয়ে উঁকি দিল। জংধরা পেরেক বেরিয়ে আছে। নামার সাথে সাথে তাদের ঘায়েল করতে প্রস্তুত।

‘আগে তুমি।’

‘না, তুমি।’

‘তুমি একটা মুরগি।’

‘না, তুমি।’

দু’জনে একসাথে নিচে নেমে ভেতরে গেল। একটা গন্ধ ভেতরে। পুরোনো ভূতের গন্ধের মতন গন্ধ। জো ছাদ থেকে একটা ভাঙা হাতল টেনে নিয়ে অন্ধকার রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দীর্ঘদিনের পচনশীল খাদ্য থেকে গুঁড়ো ঝরে পড়েছে। পোকা-মাকড় ঘুড়ে বেড়াচ্ছে।

‘এখানে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত নই।’ জো বলল। মেঝেতে বৃষ্টির পানি জমে আছে।

‘পেছনে কেবিনের কী হবে?’ বেন বলল।

এটা আঁটো করে বন্ধ করা। একটি পুরোনো নোঙর এটির গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা। ফ্রেমের নিচে পেরেক দিয়ে আটকানো। ছেলেরা ঝাঁকুনি দেয়, টানা-হেঁচড়া করে। তাদের হাত মরিচায় পিছলে যাচ্ছে, ক্ষয়াটে গন্ধ ওঠে।

জোরাল একটি মোচড় দিলে, নোঙরটি কাঠকে ভেঙ্গেচুরে দিয়ে দরজাটি মেলে ধরে।

আর, একটি কঙ্কালের হাত বেমক্কা জো’র পায়ের উপর এসে পড়ে।

উষ্ণজল

‘আর এটি,’ ডেসমন্ড বলে, উঁচু দেয়ালের মধ্যে একটি গেট খুলে তার নতুন বন্ধু জেরাল্ডকে নিয়ে আসছে, ‘লন্ড্রি এলাকা। লন্ড্রিতে সবকিছু এক জায়গায় থাকে। মূল বাড়ি থেকে খুব দূরে, যাতে আমাদের সিদ্ধ জলে চোবানো চাদর বা সাবানের গন্ধের দিকে মনোযোগ দিতে না হয়। বার্থা এটা পছন্দ করে, তুমি করো না বার্থা?’

একজন চাকরানি জামার হাতা পেশীযুক্ত বাহুতে গুটিয়ে নেয়, ঘামে ভেজা মুখে আটকে আছে একগাছি চুল। হাতা গোটাতে গোটাতে এমনভাবে মুখ কোঁচকালো যেন সে জামার হাতা নয়; উঠোনে তামার কড়াইগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।

‘আমি বেসি…. স্যার,’ সে উত্তর দিল।

তার পেছনে, ধূসর রুক্ষ আকাশের নিচে লন্ড্রি রুম এবং শুকানোর ঘরের মধ্যে অন্যান্য গৃহকর্মী পাথর বাঁধানো রাস্তাজুড়ে ছোটাছুটি করছে। সকালের নাস্তার পর থেকে যে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল, তাতে বেসির টুপি ও বুটগুলো ভিজে কালো হয়ে গেছে।

ডেসমন্ড জেরাল্ডকে একপাশে এনে বলল, ‘আমি সব গৃহকর্মীকে বার্থা বলে ডাকি। ওরা কিছু মনে করে না, তুমি কি বার্থা?’ সে তার মুখে তীক্ষ্নভাবে তাকিয়ে বলল।

নীরবে, বেসি একটা বড় কাঠের টুকরো দিয়ে ফুটন্ত কড়াই নাড়তে থাকে, তার চোখ সরু হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে, বাদামি-গোলাপি রঙের বুদবুদের ভেতর থেকে সাদা লিনেনের একটি ভাঁজ উঠে আসে। নরম সাবানের গন্ধ ডেসমন্ডের মনে রাখার চেয়ে কম আনন্দদায়ক। তার মনের কিছু অংশে বিস্ময় জেগেছিল কেন সে বিল্ডিংয়ের ভেতরে না থেকে উঠোনে লন্ড্রির কাপড় সেদ্ধ করছে, কিন্তু তখন তার মনে পড়ে ছয় বছর বয়স থেকে লন্ড্রিতে আগ্রহী না থাকলেও সে তার খেলনা পাইপের জন্য বুদবুদ চাইত।

‘টেবিলক্লথ নিয়ে কারও সাথে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তাই কি?’ জেরাল্ড আশঙ্কা জানায়।

‘তেমনই কিছু… স্যার।’ বেসি বলল।

‘যাই হোক, বার্থা,’ ডেসমন্ড বিস্ময়ের ভান নিয়ে বলল। ‘তুমি কি আজ সকালে লর্ড চার্লসকে দেখেছ? তিনি একজন সুন্দর তরুণী চাকরানিকে কখনোই পাত্তা না দিয়ে পারবেন না,’ সে জেরাল্ডের দিকে তাকিয়ে যোগ করল। ‘তিনি এইরকম কোনো দিনে গরম জলের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত দেখতে চাইতে পারেন। হা! হা!’

ডেসমন্ড বেসির লজ্জা রক্তিম গালে চিমটি মেরে তার পিঠে চাপ দিল। কাঠের টুকরোর উপর বেসির হাত শক্ত হয়ে আসে, কিন্তু তবুও সে কিছুই বলে না। সে কেবল তামার কড়াইগুলোর দিকে তাকায়। ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে আরও একটি বাদামি-গোলাপি বুদবুদের বিশ্রী ‘পপ’ শব্দে বিস্ফোরিত হতে দেখে।

শামীম আহমেদ

ঊর্ধ্বতন শিল্পনির্দেশক

বাংলাদেশ টেলিভিশন

 

Print Friendly, PDF & Email
শামীম আহমেদ

Read Previous

নিঃশব্দ আহমেদ – গুচ্ছকবিতা

Read Next

অণুগল্পগুচ্ছ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *