অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রামেশ্বর দত্ত -
অনিতার উড়ান ও আমার পিসিমা

দুর্গাপুজোর দিনগুলোতে কলকাতা শহরের মুখ বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে ঢেকে যায়। কী না থাকে সেই বিজ্ঞাপন আর বিলবোর্ডগুলোতে? সাবান, তেল, বিস্কুট, গুড়োমশলা, সাজ-সরঞ্জামের বস্তু, জামাকাপড়, অলঙ্কার, লাইট, টিভি, কত কিছুর বিজ্ঞাপন। আলো ঝলমলে সেইসব বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

অন্যান্য বছরের মতো এবারেও ফ্লেক্স আর বোর্ডগুলো লাইন দিয়ে কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। আগমনীর আগমন বার্তা জাহির করছে সেগুলো। দিনের আলোয় বিজ্ঞাপনগুলো যেমন তেমন; কিন্তু রাতের ঝলমলে আলোয় সেগুলো আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

আমার কাজ এক পত্রিকা অফিসে। রাতের দিকেই ডিউটি থাকে বেশির ভাগ দিন। বাড়ি থেকে বেরোতে হয় দুপুর দুপুর। ফিরতে রাত গড়িয়ে যায় এক প্রহর। যাতায়াতের পথে বিজ্ঞাপনগুলো আমি গিলতে থাকি।

ক’দিন যাবৎ একটা বিজ্ঞাপন ভীষণভাবে আমার নজর কাড়ছে। আমি কাজে আসি দক্ষিণ থেকে মধ্য কলকাতায়। কার্যকারণে প্রায়ই উত্তর এবং পূর্ব কলকাতায় ঢুঁ মারতে হয়। উত্তর-দক্ষিণ-মধ্য যেখানেই গেছি সেখানেই একটা বিশেষ বিজ্ঞাপন আমার নজরে কেড়েছে। বিলবোর্ডটা একটা গয়নার দোকানের, বিজ্ঞাপনটাতে অদ্ভুত মাদকতা মেশানো একটি মেয়ের ছবি জ্বলজ্বল করছে। শুধু ছবি বললে ভুল করা হবে। ওটা সত্যিই যেন একটা সালংকারা পরীর উড্ডীয়মান অবস্থা। পায়ে দূর্বার ছন্দ। হাত দুখানা শরীরের আগে পিছে করে উড়ছে। দেহে স্পোর্টস গার্লের উপযুক্ত পোশাক। চেহারায় তন্বী। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। মেয়েটির করজোড়, কুন্তল, নাসিকা কর্ণলতি, গলদেশ, কটিতট, নাভিকমল, সর্বত্র ঝকঝকে অলংকারে মোড়া। কী অপরূপ এক দৃশ্য! যতবার বিজ্ঞাপনটা দেখেছি মনে সুখ অনুভব করেছি।

এসব তো গেল হাজারটা বিজ্ঞাপনের মধ্যে থেকে একটাকে চিহ্নিত করে নেওয়া। কিন্তু আমার যে মেয়েটির প্রতি বারবার চোখ টেনে দেখতে হচ্ছে, তার কারণ হলো, আমি যেন আগে কোথাও তাকে দেখেছি। কিন্তু কবে, কখন, কোথায়, তা আর স্মরণে আসছে না।

একরাতে বাড়িতে স্ত্রীর কাছে কথাটা পেড়ে মুশকিলে পড়ে গেলাম। এমন কোনো মেয়েকে স্ত্রীরও মনে পড়ছে না। স্ত্রী তো উল্টে বলেই বসল, এখনও মেয়েদের ছবি দেখে এত উতলা হও?

উতলা নয়, উতলা নয়, মিনু। চেনার জালটা না খুলতে পারলে আমার স্বস্তি হচ্ছে না।

এর মধ্যে কী রহস্যও আছে?… পারো বাবা তোমরা। খবরের কাগজের অফিসে কাজ করতে করতে তোমাদের মধ্যে যে কী হয়, সবেতেই রহস্য খোঁজ। আর তাই নিয়ে চটকদার গল্প, উপন্যাস লিখে ফেল…।

মিনুর কথায় মনে মনে হাসলাম। প্রসঙ্গ তখনকার মতো থেমে গেলেও পরের দিন অফিস যাওয়ার পথে আমার মাথাটা হঠাৎ কেমন খেলে গেল। মনে পড়ল, বছর দেড়েক আগে এই মেয়েকেই কনের সাজে দেখেছিলাম। সেটা ঘটেছিল আমার মেজপিসির ছোট ননদের ছেলের বিয়েতে।

অফিস পৌঁছিয়ে মেজপিসিকে চট করে ফোন করে বসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁ গো পিসি, তোমার ছোট ননদের তো সোনার গয়নার দোকান আছে, তাই না?

তা তো আছে। কী ব্যাপার রে সুবু? হঠাৎ এ সময়ে এরকম উটকো খবর নিতে ফোন করে বসলি যে? কেন, কোনো গয়নাগাটি বানাবি নাকি মিনুর জন্যে? নাকি, রেডিমেড কিনবি?

আমি কী জিনিসের খোঁজ করছি, আর পিসি কীসব ভেবে বসেছে? তা হোক, আমার এখন সত্যিটা জানতে হবে। পিসির প্রশ্নের একটাও যে ঠিক নয়, তা জানিয়ে আসল কথাটা পাড়লাম।

তোমার ননদের ছেলে কোনো এক মহারাষ্ট্রীয়ান মেয়েকে বিয়ে করেছিল না?

হ্যাঁ। কিন্তু হঠাৎ এই নিয়ে পড়লি? কেন ওর কেসটেস আবার নতুন করে চাগাড় দিল নাকি?

অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীসের কেস? কেস কেন?’

ও বাবা…, বলে, পিসি ফোনের মধ্যেই লম্বা সুর টেনে বলতে শুরু করল, কত কাণ্ডই না হয়েছিল ওই মেয়েকে নিয়ে। থানা, পুলিশ… বাকি ছিল শুধু কোর্ট কাছারি। তাও হতো, শুধু তোর পিসেমশাইয়ের জন্যে কেস অতদূর গড়াল না। তা না হলে রমুকে এখনও জেলের ভাত খেতে হতো,… রমু, রমুকে চিনতে পারলি তো? সে হচ্ছে আমার ননদের কোলপোঁছা ছেলে। তুই দেখেছিসও তাকে। ওর বিয়ের সময়…।

মনে পড়েছে, এবার মনে পড়েছে পিসি। ওই মেয়েকে সেই বিয়েতেই কনে হিসেবে দেখেছিলাম।

তা এখন কী হয়েছে, বল।

সেরকম কিছু নয় পিসি। মেয়েটাকে একটা বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে দেখলাম কিনা…। চেনা চেনা লাগছিল। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না, কোথায় দেখেছি। তবে, তুমি কী যেন বলছিলে পুলিশ কেসটেসের কথা? সেসবও হয়েছিল নাকি!

তবে আর কী বলছি। একদিন আয় না। সব বলব। তোরা তো আবার গপ্পোটপ্পো লিখিস। এই নিয়ে মুচমুচে একটা গপ্পো বানিয়ে ফেলতে পারবি।

আচ্ছা পিসি। আমি আসছি। শিগগির একদিন তোমার বাড়িতে আসছি। পারলে রমুকেও একটা খবর দিয়ে ডেকে নাও না কেন…। ঘোড়ার মুখে খবর শোনা হয়ে যাবে। জমিয়ে গপ্পো করব।

মিনু আর তোর ছেলে মেয়েকেও নিয়ে আসবি। কতদিন দেখিনি ওদের।

আচ্ছা, দেখব খন। পুজোর মধ্যেই একদিন না হয় বেড়াতে আসব। অসুবিধা হবে না তো?

কী যে বলিস সুবু। তোরা আসবি, আর আমাদের অসুবিধা হবে!

না পিসি। আজকাল হয়েছে কিনা…। বাড়িতে লোক এলে বাড়ির মানুষ বিরক্ত হয়। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পরীক্ষা থাকলে সেসময়েও বাড়িতে বাইরের কারও পা রাখার অলিখিত নোটিস থাকে। এ তো পিসি আজকাল ঘরে-ঘরে। আমার বাড়িও তা থেকে বাদ নয়…

থাক। ঢেঁপোমি করিস না তো। আমি যেন জানি না এসব? তুই আসবি, সবাইকে নিয়ে আসবি।

হাসতে হাসতে পিসির সঙ্গে বাক্যালাপ শেষ হতে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠল।

দুই

পুজোর নবমীতে বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে হাজির হয়ে গেলাম মেজ পিসির বাড়ি। সল্টলেকের বি সি ব্লকে পিসিদের নিজস্ব দোতলা বাড়ি। বাড়ির নিচে পিসিদেরও জুয়েলারি দোকান। পুজোয় বাড়িটা আলোয় আলোয় সেজে উঠেছে। সঙ্গে দোকানটাও। পিসিরা বেশ বড়লোক। সারা বাড়ির মেঝেতে দুধসাদা মারবেল বিছানো। তাতে পা ফেলে চলতে গিয়ে আমার তিন বছরের ছেলে একবার স্লিপই খেয়ে গেল। ভাগ্যিস মিনু ধরে ফেলেছিল, না হলে, পড়ে-টড়ে গিয়ে একটা কাণ্ডই হতো। সন্ধের মুখে গিয়েছিলাম। বাড়িতে তখন সকলে উপস্থিত। ভাইপো, ভাইপোবৌ, কচিকাঁচা দুটোকে দেখে পিসি-পিসেমশাই, তাঁদের ছেলেমেয়েদের কী আনন্দ! প্রাণখোলা আপ্যায়ন আর খাতিরযত্ন পেয়ে মিনুর কানে ফিসফিস করে বললাম, দেখেছ, এই হচ্ছে, আপ্যায়ন। বনেদি বাড়ির রীতি।

আমার কথা শুনে মিনু মুখ বাঁকাল।

ছেলে মেয়ে খেলতে চলে গেল তাদের সমবয়সী ভাই বোনদের সঙ্গে। মিনুকে নিয়ে গেল পিসির বড় ছেলের বউ। আমি বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম রমুর আগমনের জন্যে। পিসি আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, রমুও বউকে নিয়ে আসছে।

বা, বিজ্ঞাপনের মেয়েটাকে তাহলে আবার একবার দেখতে পাব? মনে মনে উৎফুল্ল হলাম।

মিনিট কুড়ির মধ্যে রমু বউ নিয়ে এসে হাজির। পিসি এসে গাল ভরা হাসিতে রমু আর রমুর বউ, আনিতার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেল, দুজনের দিকে তাকিয়ে আমি তো একেবারে হাঁ! কী মানানসই চেহারা দুজনের ! যেমন লম্বা, তেমনই বলিষ্ঠ! অনিতা প্রায় রমুর মাথায়–মাথায়। রমুর হাইট আন্দাজ করলাম। ছয় দুইয়ের কম নয়। বয়সে আমি ওদের থেকে বড়। ওরা দুজনে আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। অনিতার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেও রমুকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। একেবারে উষ্ণ আলিঙ্গন। রমু খুব খুশি। অনিতা চলে গেল ভেতরে। আমি রমুকে নিয়ে বসলাম। রমু বোধহয় জানত, আজ সেখানে ওদের ডাকবার কারণ। তাই কোনো রকম ভণিতার মধ্যে না গিয়েই বলল— দাদা, শুনেছি আপনি গল্প লেখেন। মামি বলছিল, আপনি নাকি আমার আর অনিতার বিষয় নিয়ে গল্প লেখার ছক কষছেন?

রমুকে বাধা দিয়ে বললাম, আরে না, না। সেরকম কিছু নয়। তোমার স্ত্রীর অত সুন্দর একটা বিজ্ঞাপন কলকাতা শহরটাকে মাতিয়ে ফেলেছে দেখে পিসিকে বলেছিলাম তোমার সঙ্গে দেখা করব।

দাদা, দেখা যখন আমাদের হলোই আর আমিও যখন আপনার কাছে কিছু লুকাব না, তখন না হয়, সত্যি ঘটনার মতো করেই লিখুন না আমাদের কথাটা। অনিতাকে পাওয়া, ওকে নিয়ে নাগপুর থেকে পালিয়ে আসা, আমার কালেক্টর শ্বশুরের হুমকি-ধমকি, পুলিশ-থানা করা, এসব নিয়ে লেখা বেশ জমে যাবে। তায় এখন আবার সেই মেয়ের পারিবারিক ব্যবসার মূলধন ওঠা; সব নিয়ে জমজমাট ছবি করবার মতো স্টোরি হবে…

হঠাৎ কথা থামিয়ে রমু আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, জানেন তো, ওকে আমি পরী বলি… হা হা হা।

রমু যে এত দিলখোলা ছেলে তা দেখে নিজেকে সেঁধিয়ে দিলাম ওর গল্পের মধ্যে। ও বলা শুরু করল। আমি তা গোগ্রাসে গিলতে থাকলাম।

ঘটনাটা দাদা, দু’হাজার সাত সালের। তখন আমি নাগপুরে। ফায়ার সার্ভিসিং কলেজে পড়তে গেছি। জানেন বোধহয়, নাগপুরেই একমাত্র ফায়ার সার্ভিসিংয়ে ডিগ্রি কোর্স পড়ানো হয়। সেখানে আমার নাম, কৃষ্ণ। মানে আমি কৃষ্ণ দত্ত। ওটাই আমার আসল নাম। রমু হচ্ছে আমার নিক নেম।

আমরা দুই ভাই, দুই বোন। কমল, কৃষ্ণ, লক্ষ্মী, আর সরস্বতী, এই হচ্ছে আমাদের ভাই বোনেদের নাম। ঠাকুর দেবতার নামে নাম রাখা জুয়েলারি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত দত্ত পরিবারের একটা রীতি। এই নিয়ে ছেলে মেয়েদের মনে খুঁতখুঁতুনি থাকায় বাবা আমাদের সোজাসুজি বলে দিয়েছিল, ‘তোমাদের মায়ের নাম দুর্গা। তাঁর ছেলে মেয়েদের নাম কি তন্বী, তনয়া, সৃজন, এসব হবে? দুর্গা নাম জপতে জপতে আমার ব্যবসা এত বড় হয়েছে; তোমাদেরও ঠাকুর দেবতার নামে নাম রাখা হয়েছে সেকারণে। বড় হয়ে তোমরাও আমারই মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হয়ে সুখে স্বচ্ছন্দে থাকবে…

দাদা, তা আর হলো কোথায়? আমি একজন ভালো স্পোর্টসম্যান। স্টেট লেভেলের এ্যাথলেট। তাতেই আমার চাকরি। এবার সেই কৃষ্ণ দত্তের নাগপুরে থেকে প্রেমও হয়ে গেল। প্রেমিকা, অনিতা খোটে। অনিতারা মহারাষ্ট্রীয়ান। ওর বাবা নাগপুরের কালেক্টর। সম্মানীয় ব্যক্তি। অনিতারা এক ভাই এক বোন। অনিতা বড় ওর ভাইয়ের থেকে।

গল্পটা জমে উঠছিল। ভাবলাম, ওই বয়েসে দুটো ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রেম হতেই পারে। ভিন্ন ভাষাভাষীর হলেও কোনো কথা নয়। তবে কৃষ্ণ আর অনিতার গল্প তো শুধু প্রেম নিয়েই নয়; শোনাই যাক না, কোথায় তা দানা বাঁধে।

রমু বলে চলেছে—

অনিতাকে আমি আগের থেকে দেখে থাকলেও ও কিন্তু আমায় প্রথম দেখল ফায়ার সার্ভিস কলেজের বাৎসরিক ফাংশানে। দুজনের পরিচয়টা হলো সেদিনই। তখনই জানলাম, ওর নাম অনিতা। এ অনেকটা, লাভ-এ্যাট-ফার্স্ট-সাইটের মতো; সিনেমায় দেখা গল্পের নিয়মে তা ঘটল।

বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান হচ্ছে কলেজের নিজস্ব মাঠে। অতিথি অভ্যাগতরা সকলে যে যার আসন নিয়ে বসে পড়েছে। প্রথম অনুষ্ঠান মার্চপাস্ট। কলেজের শ’দেড়েক ছাত্র সাদা টাইট স্ল্যাক্স পোশাকে সজ্জিত হয়ে সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়াল। ব্যান্ড বেজে উঠল। বাজনার তালে তালে শিক্ষার্থীদের মার্চপাস্ট শুরু হলো। সেখানে এই কৃষ্ণ দত্ত দলের লিডার।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিবাদন গ্রহণ করছেন প্রধান অতিথি। অনিতার বাবা, অজিত খোটে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছেন। অনিতা এসেছে বাবার সঙ্গে অনুষ্ঠান দেখতে।

মার্চপাস্ট শুরু হতেই মিনিস্কার্ট পরা খোলা লম্বা চুল বাতাসে উড়িয়ে স্টেডিয়ামের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নিচে নেমে এল অনিতা। হাতে মুভি ক্যামেরা। ক্যামেরার লেন্স আমার দিকে তাক করে সে সারাটা মার্চপাস্টের ছবি তুলে গেল।

অনিতা কলেজ ছাত্রী। নাগপুরের সোয়া শ’ বছরের পুরনো ঐতিহ্যপূর্ণ কলেজ, বিশপ কটনে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। একজন বাস্কেটবল খেলোয়াড়ও বটে। স্পোর্টসে তার নাম আছে। স্পোর্টসওম্যানচিত চেহারা। ছিপছিপে গড়ন। মাথায় পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি। গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। তবে ভীষণ স্টাইলবাজ, নজর কাড়ার মতো।

এক এক করে অনুষ্ঠান হয়েই চলেছে। প্রথম, শারীরিক কর্ম কুশলতার খেলা। সবকটা অনুষ্ঠানে আমার দক্ষতা দেখালাম। দর্শকের উল্লাসের মধ্যে আমিই তখন মধ্যমণি।

পরের অনুষ্ঠান চলন্ত মোটরবাইকের ওপর কুচকাওয়াজ। আমরা শিক্ষার্থীরা তখন কী না করে চলেছি বাইকগুলো নিয়ে। বিভিন্ন ফরমেশন বানিয়ে তুলছিলাম একটা মোটরবাইককে কেন্দ্র করে। সবকটা খেলা ছিল যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনই লোমহর্ষক। আর সবেতেই হিরো, কৃষ্ণ দত্তর করা সমস্ত অনুষ্ঠান অনিতা লেন্সবন্দি করতে করতে একসময় আমাকেও বন্দি করে ফেলল ওর নজরে।

এবার প্রাইজ গিভিং সেরিমনি। একটার পর একটা ইভেন্টে কৃষ্ণ দত্ত তার চরম উৎকর্ষের নিদর্শন দেখিয়ে ছ ছ’টা শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট তুলে নিল নিজের মাথায়। সরকারি অনুষ্ঠান; কিন্তু তাতেও বিশিষ্টতার গুণে আমার হাতে গণ্ডাকয়েক প্রাইজের পরেও দর্শকের তরফ থেকে যা পেলাম, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ে, অনিতা হাত বাড়িয়ে আমার সঙ্গে করমর্দন সারল। তারপরেই আমার হাতে তুলে দিল নিজের মূল্যবান মুভি ক্যামেরাখানা। দর্শক জানল, শ্রেষ্ঠ হিসেবে সমস্ত দর্শকের প্রতিনিধি হয়ে অনিতা খোটে বিশেষ পুরস্কার দিল কৃষ্ণ দত্ত নামের এক শিক্ষার্থীকে। কিন্তু সেটা যে আরও অনেক কিছুর স্বীকৃতি, তা কেউ বুঝতেও পারল না।

আমার কাছে অনিতার মুখ একেবারে অচেনা ছিল না। এর আগে আমি তাকে বিশপ কটন কলেজের মাঠে অনেকদিন বাস্কেটবল খেলতে দেখেছি। তখন ওর নাম জানতাম না।

কথা বলতে বলতে রমু বোধ হয়, হাঁপিয়ে উঠেছিল। একটু থেমে দম নিল। তারপর— দাদা, বিশ্বাস করো, ভালোলাগার সঙ্গে ভালোবাসার ব্যাপারটা তখন— তখন হলেও দুজনের প্রকৃত প্রেম শুরু হলো কিছুদিন পরে। এবং দ্বিতীয় দফার দেখাটা হলো আন্তঃরাজ্য সুইমিং মিটের আসরে। সেটাও ভাগ্যক্রমে নাগপুরেই অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সেখানে যে অনিতাও আসবে জানতাম না। তবে যখন আবার দেখা হলো, দুজনে দুজনের একেবারে কাছাকাছি এসে পড়লাম। আমরা দুজনেই প্রতিযোগী ছিলাম। অনিতা রিপ্রেজেন্ট করছিল মহারাষ্ট্ররাজ্যকে, আমি আমার বাংলাকে।

সুইমিংপুলের এরিনাতে আমাদের মধ্যে খুল্লাখুল্লম প্রেম শুরু হয়ে গেল। দিনের ইভেন্টের পরে কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতাম না। রাতে যে যার জায়গায় ফিরে যেতাম। অনিতা যেহেতু লোকাল পার্টিসিপেন্ট ও বাড়ি চলে যেত। আমি ফিরতাম হোস্টেলে। ব্যাপারটা সকলের চোখে পড়েছিল। কিন্তু এমন ঘটনা তো অলিম্পিক আসরেও হয়। তাই কারও কারও চোখ টাটালেও কিছু করার ছিল না।

মিটের তৃতীয়দিনে দুপুরের পরে আমাদের দুজনের সব প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যেতে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য, নিভৃতে কোনো রেস্টুরেন্টে বসে আমাদের অদূর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলব।

কথাটা শেষ হতে রমু কেমন যেন আমার গায়ে টোকা দিয়ে উদ্দেশ্যটার মর্ম বোঝাতে চাইল বেশি করে। আমি হাসলাম, ও বলে চলল, খুব কাছেই নাগপুরের অভিজাত অঞ্চল, সদর। সেখানে ‘অশোকা’ নামের রেস্টুরেন্ট। শহরের নাম করা অভিজাত খাওয়ার রেস্টুরেন্ট। ঢুকে পড়লাম দুজনে। গরম সিজলারে কামড় দিতে দিতে দুজনের পরিকল্পনা হয়ে গেল। আমরা শিগগির বিয়ে নামের নিয়ম রক্ষার সামাজিক অনুষ্ঠান সেরে নাগপুর শহর ছেড়ে পালাব।

পরের দিন। নির্দিষ্ট সময় মেনে বেলা দশটায় দুজনে গিয়ে পৌঁছলাম কালীবাড়িতে। ধানতুলির বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশ জাগ্রত কালী। মা কালীকে সাক্ষী রেখে অনিতার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিলাম। ব্যস, আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। অটোওয়ালাকে বলে গাড়ি ছোটালাম নাগপুর স্টেশনের দিকে। এগারোটা দশে হাওড়া-মুম্বাই মেল। চালু কামরার দুটো টিকিট কেটে নিলাম। দৌড়তে দৌড়তে শেষ মুহূর্তে ট্রেনে চেপে বসলাম। হাতে কোনো লাগেজ ছিল না। এক বস্ত্রে আমরা নাগপুর ছাড়লাম। কাক-পক্ষীতেও টের পেল না, অনিতা খোটে নামের এক মারাঠি মেয়ে চরম গোঁড়া বাঙালি পরিবারের ছেলে কৃষ্ণ দত্ত নামের এক ছেলেকে বিয়ে করে শহর, বাড়ি, আত্মীয়পরিজন ছেড়ে শ্বশুরালয়ে চলে যাচ্ছে। আমার বাড়িতেও আগে থাকতে কোনো খবর দিলাম না। জানতাম, আমি যে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে হঠাৎ এক ভিন ভাষাভাষীর মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ি ফিরছি, এ খবর বাবার কানে পৌঁছলে, বাবা আমায় ত্যাজ্যপুত্র করতে এক মিনিটও সময় নেবে না।

প্রায় কুড়ি ঘণ্টার ট্রেন সফরে কোনো বিঘ্নের মোকাবেলা না করেই পরেরদিন সকালে হাওড়ায় পৌঁছলাম। সেই মুহূর্তে নিজেদের আমহারস্ট্রিটের বাড়িতে ওঠা প্রচণ্ড রিস্ক হয়ে যাবে বুঝে অনিতাকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম বরাহনগরে, মানে আমার বড়দি, লক্ষ্মীদির বাসায়। বড়দির শ্বশুরকুলে নিজের স্বামী ছাড়া আর কেউ ছিল না। একটাই মেয়ে বড়দির। নাম বর্ণা। বর্ণাকে ডেকে বাড়িতে ঢুকলাম। বড়দি আমায় দেখে ভূত দেখার মতো চেঁচিয়ে উঠল, কী রে তুই! তারপর আমার পাশে অনিতাকে দেখে আরও চমকে গিয়ে বলল, তুই কাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস!

বড়দি, চুপ চুপ। ওর নাম অনিতা। আমার বিয়ে করা বউ। বাংলা বোঝে না। কটা দিনের মতো আমাদের দুজনকে এখানে থাকার ঠাঁই দে। পরে সব ম্যানেজ করছি।

বাবা-মা জানলে?’

লক্ষ্মীটি দিদি, অনিতা জানে আমরা বাবা-মা’র কাছেই এসে উঠেছি। দিদি, তুই সেইরকম নাটক কর দুটো দিন। না হলে, অনিতার মন ভেঙে যাবে।

হতভাগা। আমি মা হব? নাটক করব? বলে, বড়দি আমার কান মলে দিল। আমি অনিতার দিকে তাকিয়ে একটা বোকা হাসি দিলাম। জানান দিলাম, দেখছ, মা আমায় কত ভালোবাসে…।

ততক্ষণে জামাইবাবু বাজার থেকে থলি হাতে ফিরে এসেছে। অনিতাকে ইশারায় বললাম— বাবা, নমস্কার করো। অনিতা দুজনের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে দাঁড়াল। মনে মনে বললাম, ও বাবা, এ মেয়ে যে আমার থেকেও বেশি নাটকবাজ! না হলে, আজকের দিনে কোন মেয়ে গুরুজনের পায়ে মাথা ঠেকায়?

বেশ মজা লাগছিল রমুর কথা শুনতে। ছেলেটা যে এত রসিক তা দেখে আরও মজা পাচ্ছিলাম। সদ্য বিয়ে করা বউকে মানাতে দিদিকে কিনা মা, আর জামাইবাবুকে বাবা সাজিয়ে ফেলল!

আর ভাগ্নিকে কী সাজালে রমু? জানতে চাইলাম।

দাদা, ভাগ্নিও কম বড় খেলোয়াড় নয়! সে বনে গেল আমার ছোট বোন। আমাদেরকে সোজা উপরের ঘরে নিয়ে গিয়ে তুলল। বছর ষোলর ভাগ্নি যে মামাকে কেমন করে উদ্ধার করেছিল সেদিন, সে আর এক গল্প। তবে, একটুখানি শুনিয়ে রাখি, ওরই জন্যে আমার আর অনিতার কালরাত্রি পাল্টে গিয়ে ফুলশয্যার রাত ঘটেছিল সেদিন… হা‌ হা হা…।

রমুর ওরকম দিলখোলা হাসির শব্দেই কিনা, অনিতা ছুটে এল অন্য ঘর থেকে। তারপর আমার উদ্দেশ্যে বলল, দাদা। রমুনে উসকা বুলশিটকা গপ শোনাচ্ছে, তাই না?

ভাঙা বাংলায় অনিতার কথাগুলো মিষ্টি লাগল বেশ। নবমীর সন্ধেটা ভালোই জমে উঠেছিল। মিনুও এসে হাজির হলো। কী গো, কী গো, করতে করতে একে-তাকে ঠেলেঠুলে আমার গা ঘেঁসে বসে পড়ল।

চারমাথা এক করে গল্প শুরু হলো। এবার কথা শুরু করে অনিতা রমুকে দেখিয়ে বলল, দাদা, ইহ এক মস্ত চিজ হ্যায়। মেরে পাপাকো ভী ক্যায়সে ম্যানেজ কিয়া, ইহ তো শুনো… বলে খিলখিল করে হেসে উঠল। হঠাৎ যেন বিজ্ঞাপনের ছবিটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

তবে এবারও রমুই কথা বলল, জানো তো দাদা, প্রথম রাতেই আমি অনিতাতে ফিদা হয়ে গেলাম। উ, কী প্যাশন!… স্যরি, স্যরি বউদি…, মিনুর হাত টিপে ফাজিল রমু মাফ চেয়ে নিল।

মিনু আবার কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ও, সব লজ্জা বুঝি বউদির কাছে…?

আরে না, না। যতই হোক, মেয়েমানুষ। পাছে তুমি তোমার এই দেওরটাকে ভালগার ভেবে বস! তাই এসব ফরম্যালিটি।

হো হো করে হাসল খানিকটা। ফের বলা শুরু করল, তাহলে শোনো, আমাদের সেই প্রথম মিলন হতে যাচ্ছিল শূন্য হাতে। বড়দি শেষকালে নিজের আঙুলের আংটিটা আমায় দিয়ে বলল, হাঁদারাম। প্রথম রাতে বউকে এটা পরিয়ে দিবি।

পাশ থেকে বর্ণা ফোড়ন কাটল, দেখো, যুধিষ্ঠির বনে সত্যিটা না বলে দাও…।

এর পরেও ভাগ্নির রোল শুনলে তোমরা হেসে মরবে। ও ছিল আমাদের শয্যাকক্ষের পাহারদার…। সত্যিই বর্ণা না থাকলে অনিতার পক্ষে প্রাথমিক অবস্থা কাটানো বেশ মুশকিল ছিল, বউদি।

ইস, কী ভালো গো মেয়েটা। একবার দেখিও তো ওকে। কথাটা মিনুই যোগ করল।

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, করে রমু পরের কাহিনীতে চলে গেল।

দুদিন তো কাটল। এরপর অনিতার কাছে অসত্যটা যেদিন প্রকাশ হয়ে পড়ল, মেয়ের সে কী রাগ। বলে কিনা, তুম মুঝকো ধোঁকা দিয়া কিষান? কিছুতেই ওকে সামলাতে পারছি না। রেগেমেগে বাড়ি চলে যাবে বলছে। শেষে বর্ণার হাতে অনিতার ভার তুলে দিয়ে আমি গা ঢাকা দিলাম। আধবেলার জন্যে। বর্ণা বুদ্ধি করে অনিতাকে আমার অন্তরধ্যান সম্বন্ধে ভীতি দেখিয়ে বলেছে, না জানে মামু মেরা ক্যায়া না কর বৈঠে, হো সকতা সুইস্যাইড কর লেগা। বউয়ের তখন কান্না কে দ্যাখে। শেষে বিকেলে ভাগনি ফোন করে বলছে, কৃষ্ণমামা, তোমার রাধা কেঁদে আকুল হচ্ছে। যেখানে থাকো ফিরে এসো। জানো তো, এসব কথা পরে বর্ণাই আমাকে জানিয়েছিল, দাদা।

রমুর কথায় আমি আর মিনু হেসে মরি। ওর নিজের সম্বন্ধে কথা শুনতে শুনতে অনিতাও তখন আমাদের হাসিতে যোগ দিয়েছে। মিনু মাঝ থেকে বলে উঠল, তা, হে কৃষ্ণ দেওর, তোমার রাধাকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরবার কাহিনীটা কেমন, তা শোনাও…

বউদি, ঘাটে যখন জল এসেই গিয়েছে, তাকে তো পাড় ছুঁতেই হবে। যতই কিনা আমার কালেক্টর শ্বশুর আমায় হাজতে ঢোকাবার ব্যবস্থা করে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে পগারপার দেওয়ার ভাবনা নিয়ে আসুন, সরকার বাহাদুরের চাকরি করেও উনি ভুলে গিয়েছিলন, আমরা দুজনেই সাবালক। …আরে বউদি, মিয়াবিবি রাজি তো ক্যায়া করেগা কাজী?

তা তো বুঝলাম, রমু। এবার বলো কেমন করে দিদি-জামাইবাবুর নকল মা-বাবার ভেক সরিয়ে আসল বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছালে?

ততক্ষণে ফিরবার সময় এগিয়ে আসছিল আমাদের। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা আমি করলাম।

এবার তাই বলব, দাদা। …সে আর এক কাণ্ড! আমাদের আমহারস্ট্রিটের বাড়িতে পুলিশ দেখে বাবা জানতে পারল, তাঁর গুণধর ছোট ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে বড় দিদির বাড়িতে ঘাপটি মেরে রয়েছে। তাঁর কাছে সারেন্ডার করবার সময় গুনছে।

কালেক্টর সাহেব বাবার ওপর হম্বিতম্বি খাটাচ্ছে জেনে দিদিকে বললাম, দিদি, এবার রাম-সীতার অজ্ঞাতবাসে অবসান হওয়া উচিত। না হলে, বাবাকে পুলিশ আর বেশি হেনস্থা করলে, বাবা কিন্তু আমাদের দুজনের সাথে সাথে তোকেও ত্যাজ্যপুত্রী করতে বাদ রাখবে না।

দিদিও বেশ ভয় পেয়ে গেল। আসলে এর আগে বাবা দিদিকে ফোন করে আমার খবর কিছু জানে কিনা, জিজ্ঞেস করেছিল। ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে দিদি তখন না বলেছিল বাবাকে। বেচারি দিদির কথা ভেবে মনে হয়েছিল, তাঁকে দেখবার জন্যে জামাইবাবু, মানে বীরেনদা রয়েছে; কিন্তু আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করলে, নতুন বউ নিয়ে ফুটপাতবাসী হতে হবে। তাই একদিন সুড়সুড় করে বাড়ি গিয়ে বাবার কাছে সটান সারেন্ডার করলাম। সঙ্গে বীরেনদাও ছিল। তাকেও আমার জন্যে কী গালমন্দটাই না শুনতে হলো। তাতেও বাবা কিন্তু আমার কোনো কথাই শুনল না। আমায় বলে দিল, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার মুখ দর্শন করতে চাই না।

বাবা ভুল হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার আর এরকম হবে না…।

রমুর কথা শুনে আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম। ওর মাথায় এক চাঁটি বসিয়ে মিনু বলল, বাবার সাথেও ফাজলামি? দ্বিতীয়বার হবে না, মানে?

বউদি, বিশ্বাস করো, তখন আমার মাথারই ঠিক ছিল না। ঠিক তোমারই মতো তখন আমার পাশে দাঁড়ানো মা-ও বাবার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ছেলেটা না হয় ভুল করেছে, তা বলে, নতুন বউটার মুখের দিকে তাকাও। তুমি না পারো, আমি বউয়ের বাবাকে বুঝিয়ে বলছি…।

বা এবার পিকচার থেকে আউট। চার্জ নিল মা। কালেক্টার শ্বশুরকে কী সব বোঝাল-টোঝাল। ফিরে এসে আমায় বলল, বউমাকে ওর বাবা কয়েকদিনের জন্যে নিয়ে যাবে বলছেন। কী করবি?

কী বলব দাদা, সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ে গেল, সদ্য কলকাতায় ঘটে যাওয়া রিজোয়ানের কেসের কথা। এককথায় আমি ওনাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিলাম। অনিতাও আমার পাশে দাঁড়াল। শ্বশুর পিছু হটলেন। বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তাই পুলিশ কেস-টেসের দিকে গেলেন না। মা আমার দশভুজার মতো দশ বুদ্ধি খাটিয়ে সবদিক ম্যনেজ করে শ্বশুর-পুলিশ-উকিল, সবাইকে ভরপেট খাইয়ে-দাইয়ে সসম্মানে বিদায় করলেন। উহ, কী সে দিন গেছে গো বউদি…।

গল্পে মজে মিনু একেবারে অনিতাকে জড়িয়ে ধরল। রমুকে দেখিয়ে বলল, একটা চিজ পেয়েছিস বটে…

ভাবি, রমু আমচি ঘর মাঝা সম্পূর্ণ আলগ হোত। মালা জীবন হো ওহ…

কী বললে তুমি? এই প্রথম অনিতার মুখে ওর মাতৃভাষা শুনে আমিই প্রশ্ন করলাম। রমু হাসতে হাসতে কথাটার মানে করে বলল, আমি ওদের বাড়ির মধ্যে সব থেকে আলাদা… আমিই নাকি ওর জীবন…। আচ্ছা বল তো দাদা, এ মেয়েকে আমি যদি ‘পরী’ নামে ডাকি, ওর ক্ষেপে যাওয়া উচিত?

ভালো তো। আমি এবং মিনু দুজনেই রমুর কথায় সায় দিলাম। অনিতা অদ্ভুত এক মুখভঙ্গিমায় রমুর প্রতি কপট রাগ দেখাল। রমুর উদ্দেশ্যে আমি বললাম, বিজ্ঞাপনটার সম্বন্ধে কিছু বলো। কেমন করে তোমার পরী বিজ্ঞাপনের পরী হয়ে উঠল?

দাদা, আমি জানি, তুমি এই বিষয়টায় বেশি ইন্টারেস্টেড। তবে শোনো, এখন তো দেখছ, ভিনভাষী ওই মেয়ে কতখানি বাঙালি হয়েছে। অল্পদিনেই অনিতা বাবার মনও জয় করে ফেলেছিল। তখন বাবাই ‘অনিতা, অনিতা,’ ডাকতে অজ্ঞান। আমি ততদিনে পারিবারিক ব্যবসায় হাত পাকাচ্ছি। এমন সময়ে কথা উঠল, পুজোয় দোকানের গয়নার বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। বাবা চেয়েছিল, কমার্শিয়াল আর্টিস্ট দিয়ে বিজ্ঞাপন করাতে। আমি বাবাকে বললাম, সব জুয়েলারির দোকান-ই তো আর্টিস্টদের গয়না পরিয়ে ফটো সাজায়। সুন্দরকে সুন্দর করে দেখানোয় কোন বাহাদুরিটা রয়েছে? বরং একজন মধ্য সুন্দরীর স্পোর্টস ফিগারে, গয়নার ঝলমলানিটা কতখানি লোক টানে, তাই দেখা যাক না।

কার কথা বলছ, রমু? বাবা প্রশ্ন করলেন।

আমি বললাম, কেন, তোমার বউমা?

বাবা শুনে প্রথমটায় গররাজি, মানে বাড়ির বউকে দিয়ে বিজ্ঞাপন! মানতে পারছিল না বাবা। শেষে মায়ের উৎসাহ আর অনিতার সম্মতি দেখে রাজি হলো। নিজেই অনিতাকে নিয়ে তিনদিন স্টুডিওতে গেল। তারপর যে প্রডাক্ট বের হলো, তার এফেক্ট তো দেখছ দাদা। দোকানে ক্রেতা তিনগুণ বেড়ে গেছে। সেল বেড়েছে হু হু করে। বাড়িময় খুশির মহল। অনিতা এখন আমাদের ব্যবসার লক্ষ্মী… বলতে নেই, অনেকেরই চোখ টাটাচ্ছে।

এই তো কদিন আগেই নাগপুর থেকে অনিতাদের পুরো ফ্যামিলি বলেছিল, কলকাতার পুজো দেখতে আসছে। ধুর, নাগপুরে কি কম বড় বড় পুজো হয়। আসলে, এসে মেয়ের সৌভাগ্যের নিদর্শন দেখে গেল।

তাই নাকি! বাহ… বলতে বলতে মিনু অনিতাকে ধরে ওর চিবুকে চুমু খেয়ে বলল, প্রেমে দেখালি বটে মেয়ে, তুই…

গল্পগাছি শেষ করে ফিরে এলাম আমরা। রমুদের গাড়িতেই আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল।

দুর্গাপূজো কেটে গেছে। কালীপূজোও শেষ। উৎসবের মরশুমের অবসান হয়েছে। কলকাতা আবার তার পুরোনো ছন্দে ফিরে গেছে। আলোকজ্জ্বল সাইনবোর্ড বিলবোর্ডগুলো কোথায় উধাও হয়ে গেছে। ঠিক তারপরেই পত্রিকার জন্যে একটা প্রতিবেদন লিখলাম। বিষয় বিজ্ঞাপন। শিরোনাম দিলাম ‘বিজ্ঞাপনে নারীর ভূমিকা’।

রমু-অনিতার সঙ্গে শেষ দেখা হবার পরে প্রায় তিন মাস কেটে গিয়েছিল। ওদের কথা সেরকমভাবে ভাববার আর অবকাশ হয়নি। তবে মাঝে মাঝে মনে পড়ে ওদের কথা। বিশেষ করে অনিতা নামের সৌভাগ্যবতী মেয়েটার কথা।

তিন

সেইদিন অফিসে পৌঁছেছি। কাজ করছিলাম। মেজপিসির ফোন। রিসিভার তুলে সবে হ্যালো করেছি, তখনই ফোনের ওপারে পিসির গলার আওয়াজ। স্বরে একরাশ উদ্বেগ। কেঁদে ফেলল।

বললাম, কী হলো পিসি! কাঁদছ কেন?

কাঁদব না… ওরে, আমাদের অনিতা রে…, হাউমাউ কান্না এবার।

কান্নার মাঝেই পিসি অভিযোগ জানাচ্ছে— সুবু, ব্যবসায় এত প্রতিযোগিতা, তার কোনো টেরই কি তোরা পাসনি? তোরা তো কাগজের অফিসে কাজ করিস, বুঝলি না কিছু?

আহ। পিসি, কী হয়েছে, বলবে তো?

অনিতা, অনিতা…

অনিতার কী হয়েছে?

মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গেছে…

তুলে নিয়ে গেছে! কে তুলল? অনিতা এখন কোথায়?

জানি না বাবা। রমুর শ্বশুর-শালা এসে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গেছে। সঙ্গে রমুটাকে…

কী আবোলতাবোল বকছ। তুলে নিয়ে যাবে কেন?

মেয়েটাকে দিয়ে নাগপুরে নাকি ওরা ব্যবসার বিজ্ঞাপন বানাবে…। এ বাপু ঠিক হলো না।

বাড়ির বউ…

ও হরি, তাই বলো। পিসি, তুমি না এখনও পুরোনো দিনেই রয়ে গেলে… হো হো, করে হাসতে হাসতে বললাম, অনিতা পরী জানো তো পিসি? পরীরা সৌভাগ্যবতী হয়… অনিতা…

ধুস…। তোরা সব আজকের ছেলেপুলে… কী যে বলিস…।

হো হো করে হেসে উঠলাম। বেশ তৃপ্তির হাসি হাসলাম। ভাবলাম, যাক একটা ভিন ভাষাভাষীর মেয়ে কলকাতার বুকে এসে কলকাতাকে মাতিয়ে দিয়ে নাগপুরে গেল। এবার না জানি, অনিতার সৌভাগ্য ওকে আর কোথায় না কোথায় নিয়ে যায়। এ তো শুধু ওর নিজের ভাগ্য খোলা নয়। এ হচ্ছে আর এক জনের, মানে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় স্বর্ণমুকুট পরিয়ে দেওয়া।

ছ মাস পরে।

আবার পিসির ফোন। ফোনের ভেতরে আবার সেই কান্না। তবে এবারের কান্নাটা আমার কানে অন্যরকম লাগল। কথা জিজ্ঞেস করায় পিসি যেন কিছুই বলতে পারছে না। বারবার প্রশ্ন করায় প্রথমে জানলাম, অনিতা পা ভেঙে দিল্লির এক হাসপাতালে পড়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, গর্ভপাত হয়ে গেছে। চার মাস চলছিল।

কী করে হলো!

পিসি কান্না থামিয়ে বলল, হতভাগা মেয়েটা এই সময়েও বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে হিল্লিদিল্লি করত। এবার দিল্লিতে কোন এক বিজ্ঞাপনের শুটিং চলছিল, হাওয়াও ওড়বার। সেটাই হয়ে গেল কাল। চার ফুট ওপর থেকে নিচে পড়ে গিয়ে এই কাণ্ড। মেয়েটা অজ্ঞান অবস্থায় রয়েছে। আজ দুদিন হলো…।

মনটা ভেঙে গেল। ভীষণ কষ্ট পেলাম। পিসিকে কিছু আর বলতে পারলাম না। মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকলাম, ঈশ্বর অনিতার জ্ঞান ফিরিয়ে এনে দাও।

বাড়ি ফিরে মিনুকে জানালাম। ও আমাকে বলল, কালকেই দিল্লি চলো। আমার মনটা মানছে না।

পরের দিন প্লেনের টিকিট কাটতে ছুটলাম।

 

রামেশ্বর দত্ত

স্থায়ী নিবাস, দমদম, কলকাতা-৭০০০৭৪, জন্মকাল : ২৬ জুন, ১৯৪৬, জন্মস্থান : কলকাতা-৭০০০১৪, পড়াশোনা : কলকাতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা : ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রাজুয়েট।

বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক। লেখাই নেশা। সৃষ্টির আনন্দে লেখেন। দীর্ঘদিন লেখালিখির জগতে রয়েছেন। মাঝের সময়ে (১৯৭৫ থেকে ১৯৯০) চাকরি সূত্রে ভিন রাজ্যে থাকার কারণে তাতে ছেদ পড়েছিল।

বিভিন্ন সময়ে দশটা উপন্যাস ও একটি ছোটগল্প সংকলন প্রকাশিত হয়ে বাজারজাত হয়েছে; যার মধ্যে দুটি ইংরেজি উপন্যাস (একটি ই-বুক)। বহু ছোটগল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে থাকে। যার মধ্যে এবিপি গ্রুপের পত্রিকাও (সানন্দা) রয়েছে। ২০২১ সালে সানন্দা পত্রিকায় একটি ধারাবাহিক উপন্যাস (অন্য বৃত্ত) প্রকাশিত হয়েছিল।

rameswardutta2000@gmail.com

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

ঈর্ষা

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৬ষ্ঠ সংখ্যা (জুন-২০২৪)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *