অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রোখসানা ইয়াসমিন মণি -
মিথস্ক্রিয়ার বন্দনা

দরজায় দুমদাম শব্দ হচ্ছে। কতক্ষণ ধরে কে জানে? কয়টা বাজে এখন? মুনিয়া বালিশের পাশ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে বাটন অন করে টাইম দেখল। রাত সাড়ে বারোটা। এই রাতে কে দরজায় নক করল? কে করতে পারে? পাশের বাসার কেউ?

মুনিয়া বিছানা ছেড়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে আইহোলে চোখ রাখে। নাহ, কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। তাহলে কে এল? কেউ না কেউ তো এসেছে। মুনিয়াকে না পেয়ে চলে গেছে। মুনিয়া কিছুক্ষণ দরজার সামনে থেকে বিছানায় চলে এল। শুতে যাবে— আবার সেই দুমদাম শব্দ। মুনিয়া বিছানা ছাড়ল। এবার পাশের রুমে কাজের মেয়েটাকে জাগাতে গেল।

মেয়েটার কোনো নড়াচড়া নেই। অগত্যা মুনিয়া নিজেই দরজার কাছে এল। আইহোলে চোখ রেখে দেখে কেউ নেই। এবার ওর কেমন যেন করতে লাগল৷

ভয় না, আবার কিছুটা ভয়ও। কে হতে পারে? এত রাতে কে আসবে? বৃষ্টির রাত। বাইরের কেউ হওয়ার কথা নয়।

কারণ, এই অ্যাপার্টমেন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে।

পুরো সাততলা সিসিটিভির নিয়ন্ত্রণে। দারোয়ান এবং মজবুত গেট টপকে ডাকাত আসবে এটা হওয়ার কথা নয়।

তাহলে কে হবে? পাশের বাসার কেউ হলে এমন হেঁয়ালি করবে না। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এইরাতে তার সাথে ঠাট্টা করবে এমন কে হবে? এইসব ভেবে মুনিয়া আবার আইহোলে চোখ রাখল। নাহ, কেউ নেই। এবার আর কিছু না ভেবে সে দরজা খুলল।

দরজার ভেতরে শরীর রেখে আর বাইরে মাথা টেনে মুনিয়া চারপাশটা দেখল। নাহ, কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না।

কাউকে না দেখে দরজা দিতে যাবে এমন সময় সিঁড়ির ওপাশ থেকে একটি ছায়া দেখে মুনিয়া স্থির হয়ে যায়। তারপর ছায়াটা ক্রমশ তার সামনে আসতেই মুনিয়া রীতিমতো অবাক হয়ে গেল। তারপর বলল, দেবা আপনি? এই বৃষ্টিরাতে কোথা থেকে এলেন? তার ওপর আমাদের গেট রাত এগারটায় বন্ধ হয়ে যায়। কীভাবে ভেতরে ঢুকলেন?

মুনিয়ার অনর্গল প্রশ্নে দেবা নিরুত্তর। সে কোনো কথার জবাব না দিয়ে শুধু ধীর পায়ে মুনিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল।

সম্পূর্ণ ভেজা, টুপটুপ জল গড়িয়ে পড়ছে ওর শরীর থেকে। দেবার কাঁধ অবধি চুল। খুব ঘন আর লম্বা। বৃষ্টিতে ভিজে চুলগুলো তার প্রশস্ত কপাল ঢেকে দিয়েছে। চোখ ছুঁয়ে জল নেমে যাচ্ছে বুকে লেপ্টে থাকা সার্টের পাশ কেটে আরও নিচে। যেন জলচূড়ার ওপর কোন মাধবকুণ্ড মেঘের বাসা তৈরি করেছে। বৃষ্টিতে মাখামাখি দেবাকে দেখে মুনিয়ার কিছুটা ভ্রম হলো। ওর বিশ্বাস হচ্ছে না এই বৃষ্টিভেজা রাতে সে সমস্ত পেছনে ফেলে মুনিরার বাসার সামনে এভাবে দাঁড়াবে।

দেবা মুনিয়ার সামনে ঝুঁকে এসে বলল, কী ম্যাম, এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকব? কিছু বলুন? অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে?

মুনিয়ার ভ্রম কাটতেই সে দেবার চোখের ওপর হাই ভোল্টেজের দৃষ্টি রেখে বলল, দেবা, এই রাতে কোথা থেকে এলেন, বলুন তো? গেট পেরুলেন কী করে?

দেবা মৃদু হাসল। মুনিয়ার চোখের ওপর রহস্য রেখে বলল, চলুন মহামান্যা দেবী। আপনাকে নিতে এসেছি। কোথা থেকে এসেছি সেটা না হয় নিজ চোখে দেখবেন। আর কীভাবে সেটাও।

মুনিয়া বলল, মানে?

মানে নেই। অত বকবক কোরো না মুনিয়া। আগে ভেতরে যেতে দাও। তারপর না হয় জেরা করো।

 

মুনিয়া কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। কী করবে সে! এদিকে ওর শরীরের জলে বাইরের অংশটা ভিজে গেছে। কিছু জলের ফোঁটা পাপোস গড়িয়ে ফ্লোর ভিজিয়ে দিচ্ছে।

দেবা আবার বলল— মুনিয়া, যেতে দেবে না?

মুনিয়া মাথা ঝাঁকাল। তারপর বলল— ওহ, চলুন।

দেবা ভেতরে ঢুকেই বলল, কিচেনে চল।

মুনিয়া চোখ কপালে তুলে বলল, মানে?

—সবকিছুতে অত মানে খোঁজো কেন মুনিয়া? চলো আগে। ওখানে কথা বলি। এই বলে সে মুনিয়ার পিছু পিছু কিচেনে চলে গেল।

মুনিয়া বলল, আপনার শরীর ভেজা।

তো কী হয়েছে? দেবার উত্তর। বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করেছি। ভিজতে হবেই। না ভিজলে বুঝবে কী করে ভেজার আনন্দ? কথা বোলো না বেশি মেয়ে। চা করব। আমাকে দেখাও কোথায় কী আছে? শরীরটাকে একটু উষ্ণ করে নিতে চাই। আর এই ফাঁকে তুমি কালো জর্জেটে এসো। একদম মিহি হতে হবে। কাজল আঁকবে চোখে, কপাল খালি রাখবে। কোনো টিপ পরবে না। দেখাব তোমাকে মসৃণ কপালে বৃষ্টি নামানোর আনন্দ।

মুনিয়া বলল, কেন এতসব করব?

কেন? আজ একটি ভ্রমণ হবে। এবং এটিই সত্যি। যাও, কুইক। এসেই যখন পড়েছি তোমাকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে যাব। অপহৃত হবে তুমি। একদম আগাম পূর্বাভাস দিয়ে। বলে কয়ে লুট করব তোমাকে, বুঝলে? চা বানানো পর্যন্ত তোমার সময়। এরপর আমাকে বাধ্য কোরো না তোমাকে শাড়ি পরিয়ে দিতে। এটাও আমি ভালো পারি। সো, চা বানাতে বানাতে আমি এদিকে ব্যস্ত থাকি। তাহলে তোমার ড্রেসিংরুমে যাওয়ার আমার সুযোগ হবে না। তুমি কি চাও, তোমার ড্রেসিংরুমে আমি যাই? আর হ্যাঁ, যাওয়ার আগে একটি টাওয়েল রেখে যেও। চুল শুকাব।

মুনিয়া বলল, আপনি আসলেই একটা পাগল!

দেবা হেসেই দিল এটা শুনে। বলল, এটা তো পুরোনো কথা। তোমাকে একদিন বলেছিলাম না! আমি পাগলাটে, ক্ষ্যাপাটে! যখন সমস্ত পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে তখন আমি জেগে উঠি। জেগে উঠলে আমার ভেতরটা আমাকে আর ঘুমাতে দেয় না। যাও, আর গড়িমসি কোরো না। একটার মতো বেজে গেছে। বেরুতে হবে।

দেবা চা বানাচ্ছে। মুনিয়া ভেতরে চলে গেল। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টিচ্ছটায় সাদা হয়ে গেছে জানালার কাচ।

জলের বেগ আছড়ে পড়ছে শার্সিতে। বাইরে শোঁ-শোঁ বৃষ্টির তুমুল শব্দ। যেন জলের ধ্বনি হু-হু করে আসছে নতুন বাজনা-বাদ্য নিয়ে। আকাশের হৃৎপিণ্ড ছুঁয়ে ওরা যেন মুনিয়ার শার্সিতে বসে সুর তুলছে। জলতরঙ্গের সুর। মুনিয়া আর দেবের মতো যারা এখন জেগে আছে শুধু তারাই শুনতে পাচ্ছে এই গানের সুর।

মুনিয়া বিপাকে পড়ে গেল। সে দেবা সম্পর্কে জানে। মারাত্মক ক্ষ্যাপাটে একটা ছেলে। যেটা বলবে সেটা করেই ছাড়বে। এই যে ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে এল; সে খামোকা আসেনি। তার আসার কারণ আছে। সে তার কথা রেখেছে। বেশ কিছুদিন আগে শিল্পকলা একডেমি তরুণ চিত্রশিল্পীদের নিয়ে একটি চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করে। আয়োজন ছিল উন্মুক্ত। মুনিয়া ছবি আঁকে। তবে তার ছবি কখনো কোথাও প্রদর্শিত হয়নি। সে ছবি এঁকে ফেসবুকে আপলোড করে দিত। সাথে ক্যাপশন হিসেবে থাকতো নিজের লেখা কবিতা। মাঝে মাঝে ছবি ছাড়াও কবিতা পোস্ট করত সে। ফেসবুকে তার স্বরচিত কবিতার পাঠক আছে অজস্র। একদিকে ছবি আঁকা অন্যদিকে কবিতা লিখতে পারা মুনিয়ার ফেসবুকে বেশ জনপ্রিয়তা আছে। মোটামুটি ধরনের ফেসবুক সেলিব্রেটি সে। অনলাইনে যতটুকু পরিচিত সে অফলাইনে ততটুকু অপরিচিত। তাকে এনালগ পৃথিবীর কেউ একটা চেনে না। ফেসবুক জগৎটায় সে যেভাবে দাপিয়ে বেড়ায় অফলাইন জগৎে সে ততটাই ঘরকুনো। কুমিল্লা কালচারাল একটিভিটিতে তার কোনো পদচারণা নেই বললেই চলে। তবে সে হাসিখুশি প্রাণবন্ত একটি মেয়ে আর ভীষণ লাজুক প্রকৃতির। তার বন্ধুবলয়ও তেমন একটা নেই। দু’চারজনের সাথে পরিচয় যতটুকু হাই হ্যালো পর্যন্ত। লজ্জার জন্য সিরিয়াস কোন বন্ধু বা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেনি কারও সাথে। তবে কখনো যদি কোন আড্ডায় সে থাকে সেই আড্ডা ওর জন্য অসাধারণ হয়ে ওঠে। মুনিয়ার কথা বলার ঢং, স্টাইল, প্রাণবন্ত হাসিচ্ছটায় নক্ষত্রের আদিম রাত্রিরাও যেন জেগে ওঠে।

মুনিয়া একটি মায়াবী চাঁদের নাম। দূর থেকে দেখে যাকে অনুভব করা যায়। কিন্তু ছোঁয়া যায় না। তার সৌন্দর্যে স্তুতি চলে কিন্তু স্পর্শ করা যায় না। সে এমনই সুন্দর। সোজা কথা ওই চাঁদ, নক্ষত্র, মুনিয়া একই প্রকৃতির। একই ঘরানার সৌন্দর্যের। ওদের দূরেই মানায়। কাছে থাকলে এরকম সৌন্দর্যের তেজস্ক্রিয়তায় অনেককিছু পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারও কারও কাছে মুনিয়া প্রত্যাশার ধন। তবে তাকে না পাওয়ার হা-পিত্যেসে অনেকে তাকে রহস্যময়ী বলে ডাকে। কেউ কেউ তাকে ইনবক্সেও নক করে। একদিন পানাসিক দেবন্ত দেব যাকে মুনিয়া এখন দেবা ডাকে সেও তাকে ভয়েস মেসেজে একটি কবিতার কিছু অংশ আবৃত্তি করে পাঠিয়েছিল —

ওহে সুন্দর প্রতিমা! নাবালক মুখ,

রহস্য রেখেছ মনে

কী গভীর যতনে,

হে ফুলের কোরক, ছোঁবো তোমাকে,

নিজস্ব নির্মাণে।

মুনিয়া এসব দেখে পড়ে হাসত। তার চারিদিকে এত রোমিওর ঢল! একেকজনের একেক আকুতি। বন্ধুহীন মুনিয়া এসব উপভোগ করত।

কবিতা, ছবি আঁকার পাশাপাশি সে গানও গাইতে পারে। দারুণ কণ্ঠ তার। অসাধারণ সুন্দরী আর মায়াবী মুনিয়া অনেকের কাছে কবিতার মেয়ে। হৃদয়ে ছবি হয়ে থাকার মতো মেয়ে। তার চোখ কতজনকে যে বিদ্ধ করেছে সে হিসাব নেই। কত ছেলে হাবুডুবু খেয়ে মরে ওর রূপে আর কবিতায়, পোর্ট্রেট দেখে আর ফেসবুকে ওর আপলোড করা ছবি দেখে। সেগুলোর হিসেব কে রাখে? যেদিন সে নিজের ছবি লোড করবে তখন ফেসবুক বন্ধুদের হৃদয়ের ভেতর ঝড় বইতে থাকে। মেসেজের ঝড়ে ইনবক্স, মেসেঞ্জার তখন বাজার হয়ে যায়। সিডর, আইলার মতো প্রেম নিবেদন, তাকে একনজর দেখার আকুতি, তার রূপের প্রশংসা, তার জন্য কবিদের মহাকবি হয়ে ওঠা, কত নিরীহ যুবকের বুকের ক্ষরণে তার ইনবক্স ভেসে যায়! তার জন্য ছেলেদের উন্মাদ হয়ে যাওয়া, পাগল হয়ে যাওয়া এবং জান খানখান করে মরে যাওয়ার আকুতি দেখে খুব হাসত। রোমিওদের ভিড়ে পানাসিক দেবন্ত দেবও তাকে টুইট করত। কথা বেশি ছিল না। শুধু বলত, কেমন আছেন? তারপর কদিন উধাও। আর তার খোঁজ ছিল না। আবার ক’দিন পরপর হাজির। আচমকা যখন মুনিয়া ঘুমাতে যাবে ঠিক তার আগেই টুইট, ভালো আছেন? আবার লাপাত্তা। আবার কদিন পর সন্ধ্যাবেলায়, মুনিয়া, আজ পূর্ণিমা কিন্তু। ব্যস, এরকম করেই তার মেসেজ আসত। মুনিয়া কখনো সিন করত। কখনো করত না। রিপ্লাই করা তো দূরের কথা, কোথাকার কোন পানাসিক দেবন্ত দেব এসব দেখার টাইম আছে? আর সব রোমিওর মতো তাকেও সে এড়িয়ে যেত। মাঝে মাঝে দেবন্ত লিখত— মুনিয়া, আমি কুমিল্লায় থাকি। আপনি কুমিল্লার কোথায় থাকেন? মুনিয়া মনে মনে পাগল বলে উপহাস করত।

দেবন্ত কবিতা লিখত। দারুণ হতো কবিতাগুলো। মুনিয়ার টাইমলাইনে যখন ওর কবিতা আসত তখন সময় পেলে সে পড়ত। মাঝে মাঝে তার কবিতায় মুনিয়ার চোখ আটকে যেত। এত অসাধারণ হতো যে মুনিয়া লাইক দিত। দেবন্তর সাথে মুনিয়ার ফেসবুকে এতটুকুই যোগাযোগ।

মুনিয়ার প্রায় ছবি, কবিতায় দেবন্ত লাভ রিয়্যাক্ট করত। সেই সাথে ছোট্ট সুন্দর একটি মন্তব্য জুড়ে দিত। দেবন্তের মন্তব্য পড়ে মুনিয়ার ভালো লাগত এবং সেও প্রতিমন্তব্যও সুন্দর করে দিত। এভাবেই ফেসবুকে পানাসিক দেবন্ত দেবের সাথে মুনিয়ার পরিচয়।

একদিন শিল্পকলা একাডেমির ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট এল। তরুণ চিত্রশিল্পীদের নিয়ে এক্সিবিশন করতে যাচ্ছে ওরা। আগ্রহীরা যেন শিল্পকলা একাডেমিতে যোগাযোগ করে। মুনিয়ার বান্ধবী শেলী এই পোস্ট পেয়ে ছুটে এল। সে যেন এই এক্সিবিশনে অংশগ্রহণ করে। মুনিয়া শুনে আপত্তি জানাল। সে বলল— না, না! আমি ওখানে অংশগ্রহণ করতে পারব না। ওখানে আমার চেয়েও অনেক ভালো ভালো চিত্রশিল্পী আছে। আমারটা ওদের ভিড়ে হারিয়ে যাবে। শেষে মানইজ্জত নিয়ে টানাটানি হবে। আমাকে নিয়ে টানাটানি করিস না শেলী। বাদ দে।

মুনিয়ার কথা শুনে শেলী বলল, তোর এই একটি দোষ, বিচারের আগে রায় দিয়ে দিস। এটা কোনো কথা হলো?

ওরা এক্সিবিশনের আয়োজন করেছে। এখানে নানান জায়গা থেকে নানান চিত্রশিল্পীরা আসবে। ওরা ওদের সেরা ছবিগুলো এখানে শো করবে। আর তোর ছবি কি খারাপ? তুই কত সুন্দর ছবি আঁকিস। সেটা তো আমরা জানি। তোর ছবি যদি খারাপ হতো তাহলে ফেসবুকে কি তোর ফ্যান ফলোয়ার হতো? তোর ছবি পোস্ট করার সাথে সাথেই মুহূর্তে লাইক কমেন্টের বন্যায় ভেসে যাস তুই, সে কেন রে? বুঝিস কিছু? তোর ছবি যদি ভালো না হতো তাহলে কি এত লাইক কমেন্ট পড়ত বল? তোর ছবি অনেক সুন্দর। ফেসবুকে তোর এত জনপ্রিয়তার মূল কারণ হচ্ছে তোর আঁকা ছবি। বুঝিস না কেন, যার ফেসবুকে জনপ্রিয়তা ছবির জন্য, তার ছবি এক্সিবিশনে গেলে কেউ পছন্দ করবে না এটা কি বিশ্বাস করা যায়? নিজের উপর এত আস্থা কম কেন তোর? কেন বিশ্বাস করিস না তুই সুন্দর ছবি আঁকিস? নিজের ছবি সম্পর্কে তুই কোনো ধারণাই রাখিস না! ছবিগুলো বের কর, আমি এখনই ওখান থেকে বেছে ভালো ছবিগুলো নিয়ে শিল্পকলায় দিয়ে আসব। আমি জানি, তোর দ্বারা কিছুই হবে না। তোর যত কাজগুলো সব আমাকেই করতে হবে। বলদকে ঠেললে তো বসা থেকে ওঠে, তোকে ক্রেন দিয়ে গুঁতোলেও টেনে তোলা যাবে না। কী সাংঘাতিক মেয়ে রে বাবা, তুই! এই বলে শেলী গজগজ করতে লাগল।

 

শেষে একরকম জোর করেই শেলী কয়েকটি ছবি বেছে শিল্পকলায় দিয়ে আসে। বিশ অক্টোবর। মুনিয়াদের ছবির এক্সিবিশন শুরু হবে। সেই নোটিস দিয়ে শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক রমেশ সেন ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলেন। পোস্টটি শেয়ার করার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিযোগিতায় উপস্থিত থাকার জন্য সবাইকে আহ্বান জানালেন। আর যারা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে তাদের বললেন, তারা যেন তাদের আইডি থেকে তাদের বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের ওইদিন এক্সিবিশনে থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়ে একটি পোস্ট দেয়। রমেশ সেনের এই পোস্ট পেয়ে মুনিয়া এটি তার ওয়ালে শেয়ার করে এবং ক্যাপশনে লিখে দেয়— আসছে ২০ অক্টোবর, আমি শিল্পকলায় থাকছি, আপনি থাকছেন তো? ব্যস এটুকুই। তারপর অন্য এক কাহিনীতে বাঁক পেরোল সময়ের শাখা-প্রশাখা।

২০ অক্টোবর। ঝকঝকে দিন। রোদের বর্ণিল উচ্ছ্বাসে সকালের যাত্রা শুরু হলো। দিনের শরীরে অগ্রহায়ণের ঘ্রাণ। নবান্নের শেকড় শহরের ভেতর বাঁক নিয়েছে। আধখানা সকাল হাই তুলে জীবনের দিকে ছুটে চলছে। বিছানার ঘনিষ্ঠতা ছেড়ে অনেকেই পেছনে ছায়া ফেলে ঘাম-জলে ভিজে একাকার হওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছে। শুরু বিস্ফোরণের দিন। শুয়ে বসে থাকার উপায় নেই।

শেলী আর মুনিয়া শিল্পকলায় এল। বর্ণিল বেলুন আর ফুলে ফুলে শিল্পকলা একাডেমির চত্বর সাজানো হলো। পাশে সারিসারি কৃষ্ণচূড়া। চিরল পাতার ভেতর সবুজ প্রলোভন। সিঁড়ি লাগোয়া টবে চন্দ্রমল্লিকা ফুটে আছে। একটু দূরে জয়নুল আর কামরুলের ভাস্কর্য। তার সাথে মাঝারি রেইনট্রির ডালে ঝুলে আছে হরেক রকম অঘ্রাণ টাইমফুলের সৌন্দর্য। খুব সুন্দর। ফুলগুলোতে বাঁধ ভেঙ্গে ভেসে আসছে শিল্পকলার নান্দনিক বিকেল।

বাইরে পুব দিকে উঁচু মঞ্চ করা হয়েছে। তার লাগোয়া প্যান্ডেল। প্যান্ডেলের ভেতর কত হরেক রকম ছবি। মুনিয়া ওদিকেই দৌড় দিল। আজন্ম ছবিপিপাসু মুনিয়া বিভিন্ন চিত্রকরদের আঁকা ছবি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছে। কী অসাধারণ, কী সুন্দর! এত শিল্পীদের পাশে সে তার ছবি দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। থ্যাংকস শেলি, বলে সে কণ্ঠে কৃতজ্ঞতার ঢেউ তুলে শেলিকে জড়িয়ে ধরল। শেলি বলল, কী রে— কেমন লাগছে?

—বলিস না আর! অসাধারণ লাগছে। তুই সত্যি গ্রেট রে! রিয়েলি, ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। না হলে কে কার জন্য এরকম করে, বল!

—ওহ, ওভাবে বলিস না তো, মুনিয়া? এভাবে বলতে নেই, তুই কী ভেবেছিস! আমি ওসব তোর জন্য করেছি? মোটেও না, আমি করেছি ছবিগুলোর জন্য। তুই মুনিয়া কে রে? জাস্ট মাই ফ্রেন্ড। এর বেশি কিছু তো না, তোর মতো এরকম অনেক বন্ধু আমার আছে। কিন্তু শিল্পী মুনিয়াকে আমি ভালোবাসি। ভীষণ রকম ভালোবাসি। শিল্পী মুনিয়ার ছবিগুলোর জন্য আমি এত কিছু করেছি। আমার অবাক লাগে, তুই এত সুন্দর ছবি আঁকিস, কিন্তু কখনো তোর ছবিগুলোকে বাইরে নিয়ে আসিসনি। কেন রে! জীবনে একটি দুর্ঘটনার জন্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিস? কেন মুনিয়া? মানুষের জীবনে কত কিছুই ঘটে। তাই বলে মানুষ থেমে থাকে? ঘরকুনো হয়ে পড়ে? কেন নিজ থেকে বের হয়ে আসিস না! নিজেকে প্রকাশ করিস না! তোর এত প্রতিভা থাকার পরেও কেন তুই নিজেকে চুপচাপ ফেলে রাখিস? কীসের জন্য? কার ওপর তোর এত অভিমান? আমার খুব কষ্ট লাগে জানিস! আমার এমন প্রতিভা থাকলে আমি কবেই নিজেকে বিকশিত করে ফেলতাম। তোর মতো এরকম নিজেকে নিজের থেকে আড়াল করতাম না। তুই নিজেকে চিনতে পারিসনি। তোর এসব শিল্পকর্ম দেখলে আমার ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। এত সুন্দর! এত সুন্দর কবিতা লিখে যে মেয়ে, এত সুন্দর গান গায়, ছবি আঁকে যে মেয়ে, এত রূপ যে মেয়ের সে কেন হীনম্মন্যতায় ভুগবে? তোর ভেতর কী নেই বল? একটা মেয়ে এত প্রতিভা নিজের ভেতর চুপচাপ লুকিয়ে রেখেছে একটি ঘরের কোণে, তা আমি তোর বন্ধু হয়ে আর মানতে পারছি না। যে ঘটনা তোর জীবনে ঘটে গেছে তা ভুলে যা মুনিয়া। এটা নিয়ে আর পড়ে থাকিস না। নিজেকে বিকশিত কর। ভাব, নিজেকে নিয়ে। নিজেকে টুকরো টুকরো করে অনেক ভেঙেছিস। এবার তোর দাঁড়ানোর সময় এসেছে। ওখান থেকে নিজেকে প্রস্তুত করে নে। নিজেকে কখনো একা ভাবিস না আর। আমিও একা দৌড়াচ্ছি, ছুটছি, ঘুরছি, ফিরছি আনন্দ করছি, তো কী হয়েছে? জীবন আমার জন্য কি থেমে আছে, নাকি থাকবে বল? জীবন তোকে কোনোদিন বলবে না তার কাছে যেতে। বরং তোকেই তার ভেতর প্রবেশ করতে হবে। তোর জীবনের চাকা তোকে ঘোরাতে হবে। প্লিজ, গেট আপ মুনিয়া। গেট আপ।

শেলির এত লম্বা লেকচারে মুনিয়া বিব্রত হয়ে গেল। সে একটু মৃদুবাচ্য করে বলল, ওহহ শেলি! থামবি? কী শুরু করেছিস বল তো? মানুষ শুনতে পাচ্ছে তো! এটা কি ইউনিভার্সিটি পেয়েছিস? তুই দেখছি টিচারদের মতো শুরু করলি? তোর কথা রাখলাম তো। এলাম তো এখানে। এসেই তো আনন্দ পাচ্ছি। কৃতজ্ঞ তোর কাছে। কিন্তু আমার কষ্টগুলো তো সত্যি। এটা আমাকে এমনভাবে অক্টোপাসের মতো ধরেছে যে, এটা থেকে আমি আর বের হতে পারছি না।

শেলি বলল— না, এবার বের করে দে এসব। তুই কখনো নিজেকে একা ভাবিস না। ভাববি, তোর একজন ভালো বন্ধু আছে। জানিস, তোর বন্ধু হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়। আমার ভীষণ ভালো লাগে ভাবতে তুই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। মুনিয়া শেলির কথা শুনে হেসে দিল। হাসি তো নয় যেন মুখে চাঁদের ঝিলিক। শেলি ওকে টেনে বলল, তোর এই হাসির জন্যও তোকে খুব ভালোবাসি রে!

প্রদর্শনী শুরু হলো। অনেক লোকজন আসছে চিত্রমেলা ও কবিতা আড্ডায়। সবাই ঘুরে ঘুরে ছবি দেখছে। মঞ্চে কবিতা হচ্ছে, গান হচ্ছে। কবিদের পদচারণায় মুখর শিল্পকলা একাডেমি। কত রঙবেরঙের পোশাক আর বাহারি সাজে সেজেছে কবি ও আগন্তুকরা। কিছু নাচের মেয়ে পাশে ঘুরঘুর করছে। কী সুন্দর প্রজাপতির মতো। রঙিন, বর্ণিল আর চঞ্চলতায় ওরা মুখর রেখেছে চারপাশ।

অপূর্ব আয়োজন। কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, গায়িকা, চিত্রশিল্পী, দর্শকে মুখরিত শিল্পকলা ভবন। ফুচকাওয়ালা, বাদামওয়ালা, চাওয়ালাদেরও ভিড় কম না। দূরে একটি নেসক্যাফের কফিশপ দেখে মুনিয়া শেলিকে বলল, চল, কফি খেয়ে আসি। তারপর এখানে বসে কবিতা শুনব।

শেলি বলল, চল।

ওরা কফি খাচ্ছে। মুনিয়া বলল, শেলি, থ্যাংকস তোকে আবারও। আমার খুব ভালো লাগছে। তুই আমাকে টেনে না আনলে এত মজা পেতাম না। বহুদিন পর সত্যি নিজেকে দেখতে পেয়েছি। ওরা কফি খেয়ে মঞ্চের কাছে চলে এল। দুজন দুটি চেয়ার টেনে বসল। বরাবরের মতো মুনিয়ার নজর প্যান্ডেলের ভেতরে যেখানে ওদের ছবি রাখা। হঠাৎ মুনিয়া চেঁচিয়ে বলল, শেলি, আমার ছবিগুলো কই? দেখতে পাচ্ছি না তো!

আসলেই তো! চল দেখি, বলে শেলি মুনিয়াকে টেনে নিয়ে গেল। ওখানে যারা বিপণনে আছে তাদের জিজ্ঞেস করতেই ওরা বলল, একজন এসে সব নিয়ে গেছে।

মুনিয়া বলল, কী!

জি, ম্যাম। তিনি একজন পুরুষ এবং বললেন, তিনি আপনার পরিচিত। তিনি আরও বলেছেন, আপনার ছবি আরও থাকলে তিনি কিনে নেবেন।

শেলি তো মুনিয়ার পিঠ চাপড়ে বলল, দেখলি মুনিয়া! প্রথম দিনেই তুই বাজিমাত। এবার বল, আমাকে কী খাওয়াবি?

বিপণন কেন্দ্রের মহিলা বলল— ম্যাম, আপনার আরও ছবি থাকলে এখনই নিয়ে আসুন। আমাদের এক্সিবিশন পরিচালক আপনার সাথে পরিচিত হবেন। তাছাড়া আপনার সব চিত্রকর্ম বিক্রয় হওয়ায় শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক আপনাকে মঞ্চে এনে নাম ঘোষণা করবেন। তিনি আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন সবার সাথে। এক কাজ করুন, আপনার পরিচিত কেউ থাকলে দ্রুত বাসায় পাঠিয়ে যথাসম্ভব আরও কিছু ছবি নিয়ে আসুন। আমাদের পরিচালক আপনার চিত্রকর্ম রাখার জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ করে গেছেন। ছবি নিয়ে এলে এই সামনের অংশটিতেই আপনার সব ছবি রাখা হবে। অনেকে এসে আপনার ছবি চেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। প্লিজ, যত দ্রুত পারুন নিয়ে আসুন।

শেলি হুর রে বলে দিল একলাফ। তারপর মুনিয়ার দুই গালে জোরসে চুমু খেয়ে বলল— মুনিয়া, তুই থাক। আমি আসছি। আমিই তোর ছবি নিয়ে আসব। এই বলে মুনিয়ার গাল টিপে বলল, সুন্দরী মাইয়া, দেখ, এবার কী হয়? শেলি দিল দৌড়। শেলি চলে গেলে মুনিয়া ওখান থেকে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে গিয়ে বসল। তার পাশের চেয়ারটা খালি।

হ্যালো, এক্সকিউজ মি, কেন আই সিট নেক্সট টু য়্যু? ইজ দেয়ার এনিওয়ান উইথ য়্যু?

মুনিয়া পাশ ফিরে চাইলো। দেখল একটি ছেলে তাকে নোটিস করছে। মুনিয়া একটু সঙ্কোচ নিয়ে বলল, অফকোর্স, বসতে পারেন। আমার সাথে কেউ নেই। ছেলেটি বসল। কোনো কথা নেই কিছুক্ষণ। তারপর ছেলেটি বলল— ম্যাম, কথা বলতে পারি?

ইয়েস, বলতে পারেন।

আপনার নাম?

মুনিয়া। মুনিয়া চুপ করে রইল। ছেলেটি ভাবছিল মুনিয়া তার নাম জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু তা নয়। মুনিয়া মঞ্চের দিকে তাকিয়ে কবিতা শুনছে।

এবার ছেলেটি বলল, আপনার ছবি অনেক সুন্দর।

মুনিয়া অবাক হয়ে বলল, আমার ছবি? কোথায় দেখেছেন?

কেন? এই প্রদর্শনীতে।

তাই? কিন্তু ওগুলো তো এখন নেই।

জি, একজনই সব কিনে নিয়ে গেছে। আমি কিনতে যাব ভেবেই গিয়ে দেখি একটিও নেই।

ওহহ, আপনি কিনবেন? সমস্যা নেই। আমার বান্ধবী আরও নিয়ে আসছে। একটু পরেই সে চলে আসবে।

জানি।

জানেন?

হুম।

কীভাবে?

ওই যে ওরা বলল। আপনার বান্ধবী নাকি ছবি আনতে গিয়েছে।

ও, আচ্ছা।

এমন সময় শিবু নামে একটি ছেলে দেবা দেবা বলে ডাকতে লাগল।

দেবা, তুই এখানে? আমি তোকে খুঁজছি। তোর ছবিগুলো পাঠিয়ে দিয়েছি। ওহ, এতগুলো ছবি! বাপ রে বাপ! কী খাটুনিই না দিলি।

কী করতে হবে এর জন্য?

কফি খাওয়াবি?

খাবি? তাহলে চল!

সে মুনিয়াকে অফার করল, চলুন, আপনিও। একসাথে কফি খাব।

মুনিয়া বলল, না না, আপনারা খেয়ে আসুন। আমার বান্ধবী এসে আমাকে না পেলে খুঁজবে।

টেনশন করেন কেন? চলুন! আপনার বান্ধবী রাস্তা চেনে। আর আপনাকে না পেলে নিশ্চয়ই ফোন করবে।

হুম, তা করবে। তবে আমাকে না পেলে রেগে যাবে।

তাই? তাহলে তার রাগের বিনিময়ে আমি কী করতে পারি?

মুনিয়া এবার হেসে দিল। বলল, না আপনার কিছু করতে হবে না। ধন্যবাদ।

আপনি এত সুন্দর করে হাসেন? অবশ্য আপনি এমনিতে অনেক সুন্দর। ছবির চেয়েও বাস্তবে আপনি অনেক বেশি সুন্দর।

আপনি আমাকে আগে দেখেছেন?

না।

তবে?

তবে’র ও জবাব পাবেন না মিস মুনিয়া। পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যাদের খুব চেনা চেনা লাগে। আপনি তাদের মতো। আপনি দেখছি আমার নাম জানেন, ইন্টারেস্টিং।

আপনার অনেককিছু জানি আমি।

তাই? আর কি জানেন বলুন তো?

বলব, তার আগে চলুন, কফি খেয়ে আসি। কফি খেতে খেতে না হয় বলব।

আপনি খেয়ে আসুন। আমার বান্ধবী আমাকে না পেলে রেগে যাবে।

না, রাগবে না। কথা দিলাম, আপনার সব ছবি আমি কিনে নেব। আর কোনো কথা আছে?

আপনি সব কিনে নেবেন? কেন?

নেব এই জন্য যে, একজন কবি, চিত্রশিল্পী সবশেষে প্রিয় মানুষ আপনি। আমার প্রিয়জনের ছবি নিয়ে যদি আমার ওয়ালে রাখি সেটা কি খুব অপরাধ হবে?

না, তা নয়, এত ছবি কেউ কিনে?

শিবু ওদের কথা শুনছে। দেবার কথার রিপিট করে বলল, কী রে আর কত ছবি কিনবি? একটু আগে তোর পাঁচটি ছবি বাসায় পৌঁছে দিয়ে এলাম। বিশ মিনিটও হলো না। এখন আরও নিবি?

হুম নেব। আজ বিশেষ কেউ আছে। তার সব ছবি দিয়ে আমি আমার ঘর ভরিয়ে তুলব।

এরপর দেবা বলল, মুনিয়া চলুন, প্লিজ! আর না করবেন না। এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন আমি আপনাকে বিষ খাওয়াব না বা আমি মেয়েধরা নই। দেবার কথা শুনে মুনিয়া মুচকি হেসে বলল, কিন্তু আমার বন্ধু! সে আমাকে পাবে না।

ঠিক আছে তাকে ফোন করুন এবং বলে দিন, আপনাকে না পেলে ছবিগুলো এক্সিবিশনে পাঠিয়ে দিতে। আমি ওখানে পেমেন্ট করে আসছি। সব ছবি আমার। আমি নিয়ে নিচ্ছি। একথা বলেই দেবা বলল, মুনিয়া ওয়েট, আমি ওখানে বলে আসছি। দেবা চলে যেতেই মুনিয়া দেবার পিছু নিল। দেবা ওদের সাথে কথা বলছে। মুনিয়া ওখানে গিয়েই বলল, দেবা, থামুন! আমার কথা শুনুন। আমার একটি বিষয় জানার আছে। আপনি এত ছবি দিয়ে কী করবেন?

দেবা কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুনিয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। দেবার ওইরকম তাকিয়ে থাকায় মুনিয়া দেবার চোখ থেকে ওর চোখ সরিয়ে নেয়। এই প্রথম মুনিয়া দেবাকে দেখল। তার চোখে চোখ রাখতেই মুনিয়ার আচমকা কী যেন হয়ে যায়। ছেলেদের চোখ এত সুন্দর হয়? দেবার চোখের মণি হলুদ, হলুদ? হ্যাঁ, হলুদই তো! মুনিয়া এমনই তো দেখতে পেল। নাকি সন্ধ্যার আলো ওর চোখে পড়ে চোখের রঙ হলুদ হয়ে গেছে? নাহ, এমন হওয়ার কথা নয়। যদি সুযোগ হয় তাহলে মুনিয়া আবার দেবার চোখে চোখ রাখবে। উজ্জ্বল, ফর্সা, দীঘলদেহী দেবাকে ভেবে ওর ভেতরটা কেমন করে উঠল। পুলক অনুভব করছে সে। মুনিয়া কিছুই বলতে পারল না। বিস্ময়লাগা চোখে সে দেবাকে দেখছে। মাথা ঝাঁকিয়ে দেবা বিক্রয়কর্মীর সাথে কথা বলছে। তার পিছন দিকটাও সুন্দর। গোলাপি হাওয়াই শার্টের ওপর ঘাড় থেকে চুলগুলো নেমে পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। পেছনে কিছুটা চুল ঝুঁটিবাঁধা। তার মাথাটা চুলে গিজগিজ করছে। সেখান থেকে উন্মুক্ত, অবাধ্য কিছু চুল ওর কানের দিকটা ঢেকে রেখেছে।

দেবা ওদের সাথে কথা বলছে। মুনিয়া আর কথাই বলতে পারল না। একটা ঘোর পেয়ে বসল তাকে। দেবা যখন কথা বলছে মুনিয়ার মনে হলো ওই ঠোঁট থেকে যত কথা বের হচ্ছে সব কথার ধ্বনিগুলো ওর ঠোঁটের মতো চওড়া। যেন আশপাশ কাঁপিয়ে ভেতর থেকে কথাগুলো ভুট্টার মতো ফুটে বের হয়ে আসছে। সবগুলো কথাই খুব স্পষ্ট প্রাণবন্ত। মুনিয়ার মনে হলো দেবার ওপরের ঠোঁট আর নিচের ঠোঁটের পুরুত্ব সমান। একটু মোটা মতো, তবে খুব গোলাপি। ছেলেদের ঠোঁট গোলাপি? কেমন যেন বেমানান!

ছেলেরা এত সুন্দর হয়? মুনিয়া দেবাকে আবারও দেখল। গোলাপি শার্টের সাথে কটকটে নীল ঘষা জিন্স পরে এসেছে সে। পায়ে কটকি জুতো। ওর রুচি আছে খুব। হাতে চওড়া ব্রেসলেট, গলায় রুপালি চেইনের কিছু অংশ কণ্ঠার নিচে শার্টের ভেতর আটকে আছে। মুনিয়া নিজে নিজে বলে, দেবা এত সুন্দর কেন? ছেলেদের এত সুন্দর হতে নেই। সুন্দর হবে মেয়েরা। ছেলেরা সুন্দর হলে রূপের কীর্তন করবে কে? ছেলেদের রূপের বর্ণনা বেমানান। ওরা মুগ্ধ থাকবে রূপসী মেয়েদের জন্য। ওরা মেয়েদের রূপবর্ণনা করতে করতে পিপাসার্ত হয়ে উঠবে। তৃষ্ণায় খাচ্ছি খাবি করতে করতে হৃদয়ে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলবে অনির্দিষ্টকালের যন্ত্রণা। কিন্তু এই ছেলের জন্য যে কোনো মেয়ের হৃদয়জনিত বিপরীত ক্রিয়া শুরু হবে। মেয়েরা এই ছেলের জন্য মারা পড়বে নির্ঘাত। না জানি কত মেয়ে এই ছেলের জন্য পাগল হয়েছে! হঠাৎ মুনিয়ার বোধোদয় হলো, ওহ গড! আমি কাকে নিয়ে ভাবছি! দেবা, একটি অপরিচিত ছেলের জন্য ওর এত ভাবনা কেন?

দেবা কথা শেষ করে মুনিয়ার দিকে তাকাল। তারপর বলল— মুনিয়া, চলুন। এমনভাবে বলল যেন সে মুনিয়াকে বহু বছর চেনে।

মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে দেবা মুচকি হেসে বলল, আরে বাবা! এত সঙ্কোচ করছেন কেন? আমি বাঘ বা ভাল্লুক নই। তবে এটা ঠিক আমি আপনার ভক্ত। একজন ভক্তকে গুরুর সেবায় নিয়োজিত থাকার একটু সুযোগ দিন। কৃতার্থ হই। দেবার পীড়াপীড়িতে অগত্যা মুনিয়া রাজি হলো। ওরা দুজন হাঁটছে। সাথে শিবু। শিবু বলল, দেবা, একটু আগে তুই এতগুলো ছবি নিলি। আবারও?

দেবা বলল, হুম নিয়েছি। তো কী হয়েছে? আরও নেব।

মুনিয়া বলল— বাহ, দেবা! আপনি এত পোট্রের্ট নিয়ে কী করবেন?

দেখব।

তা তো বুঝলাম, দেখবেন। কিন্তু, মানুষ একসাথে এতগুলো পোর্ট্রেট কেনে না। আপনি কিনলেন।

শিবু ফোঁড়ন কাটল, সে মানুষ না। আস্ত পাগল একটা।

ওরা শিল্পকলার গেটের বাইরে চলে এল। পাশেই রোডের এককোণে কফিওয়ালা কফি বানাচ্ছে। তাকে ঘিরে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলি গরম কেটলির নল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে। তারপর শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে ধোঁয়া। শিল্পকলা একাডেমির চত্বর থেকে চারটি রাস্তা চারদিকে চলে গিয়েছে। মূল রাস্তার সামনে কুমিল্লা সার্কিট হাউস। এই রাস্তাটার ওপর দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে সার্কিট হাউসের সবুজ ফুল আর লতাপাতায় ঘেরা সুশোভিত বাগান। দারুণ, দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। তার ডান দিক থেকে একটু পশ্চিম ঘেঁষে আরেকটি রাস্তা চলে গেছে সোজা নজরুল ইনস্টিটিউটের দিকে। নজরুল ইনস্টিটিউটের পাশ ঘেঁষেই ধর্মসাগর। জায়গাটি এত সুন্দর আর নয়নাভিরাম যে না দেখলে এর সৌন্দর্য বোঝা যায় না। এরপর উত্তরে যে রাস্তাটা গিয়েছে সেটা হচ্ছে আদালতপাড়া আর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। এই জায়গাগুলো কুমিল্লার প্রাণ। খুব ছিমছাম আর শান্ত এসব জায়গা। রিকশায় চড়ে এ মাথা থেকে ওই মাথায় চক্বর দিলে একটুও ক্লান্তি আসে না। যে কারওরই ভালো লাগে এই জায়গাগুলোয় এলে। পূর্ব দিকের রাস্তাটি চকবাজার হয়ে সোজা পুরোনো গোমতি নদীর দিকে চলে গেছে। তারপর বিবির বাজারের দিকে বাঁক নিয়ে ভারতের বর্ডারে শেষ হয়েছে। এপারে বাংলা ওপারে ইন্ডিয়া। এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের মানুষ দেখা যায়। শুধু এক কদম বাড়িয়ে সামনে এগোনো যায় না। কী অদ্ভুত! একই গাছ, মাটি, পানি এপার ওপারে মিলেমিশে এক হয়ে আছে। শুধু মানুষ পারেনি তাদের মতো একসাথে গলাগলি করে থাকতে। পারেনি বলে কাঁটাতারের বর্ডার দিয়ে মানুষেরা পাঁচিল তুলে একে অপর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। মানুষ কখনই প্রকৃতির মতো উদার হতে পারেনি। অথচ প্রকৃতিই তাকে এতকিছু দিল। শিল্পকলা থেকে দক্ষিণের রাস্তাটি জেলা স্কুলের বিশাল ঈদগাহ ঘেঁষে শহরের ব্যস্ততম এলাকা কান্দিরপাড়ের দিকে চলে গিয়েছে। ওখান থেকে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় আসা যাওয়া করে। কান্দিরপাড় হচ্ছে শহরের টার্নিং পয়েন্ট। এখানেই শহরের নগরভবন অবস্থিত। এই যে এত রাস্তা, রাস্তার ওপর এত মানুষ, মানুষগুলো কোথায় যায়? কোথা থেকে আসে এরা? উত্তরের মানুষ দক্ষিণে যায়, দক্ষিণের মানুষ উত্তরে, পুবের মানুষ পশ্চিমে, পশ্চিমের মানুষ পুবে। শুধু যায় আর আসে। মানুষের এরকম আসা-যাওয়া দেখে মুনিয়া ভাবে মানুষগুলো ঠিক কফির ধোঁয়ার কুণ্ডলির মতো। এই এদের দেখা যাচ্ছে এই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিটি মানুষ যেন একটি সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে আসা ধোঁয়ার কুণ্ডলি। পাক খেতে খেতে আরেক সুরঙ্গের দিকে চলে যাচ্ছে। তারপর কোথায় মিলিয়ে যায় এই ঘূর্ণমান জীবনে। কে তার খবর রাখে?

শিবু কফির মগে চুমুক দিল। কফিটা ভালো লাগেনি তার কাছে। সে দেবাকে বলল— দেবা, ভালো হয়নি এটা। কি খাওয়ালি? দেবার কাছেও কফিটা ভালো লাগেনি। যতটুকু ফ্লেভার ছিল কফিটাতে তারচেয়ে স্বাদ কম হওয়ায় দেবা বলল— নাহ, আজ সন্ধ্যাটা উপভোগ্য হয়নি। মিস মুনিয়া, আপনার নিশ্চয়ই কফি ভালো লাগেনি?

না, ঠিক আছে। আমার চলবে।

চলার কথা নয়। চলুন, সামনে। একটি কফিহাউজ আছে। ওখানে কফিসন্ধ্যা হবে।

এই বলে দেবা শিবুকে বলল, চল, কান্দিরপাড় কফিশপে। ওখানে কফি উইথ সিগারেট খেয়ে আসি। ওরা এগোল সামনে। শিবু বলল, কীভাবে যাবি, দেবা?

মুনিয়া, আপনার যদি আপত্তি না থাকে আপনি আমার বাইকে লিফট নিতে পারেন। আর শিবা, তুই একটি অটো ধরে চলে আয়।

মুনিয়া বলল, না, থাক। আপনারা যান। শেলি এসে আমাকে না পেলে রাগ করবে।

—না, রাগ করবে না। সে আপনাকে না পেলে ফোন করবে। আপনি জানিয়ে দেবেন, কোথায় কী করতে হবে। ব্যস, ঝামেলা শেষ।

এই বলে দেবা তার বাইকে উঠে বসল। মুনিয়ার দিকে তার সবুজাভ চোখের তীর্যক ফলা রেখে বলল, প্লিজ বিউটি লেডি, কাম অন। আই’ম প্রেয়িং ফর য়্যু। স্টে উইথ মি দিস মোমেন্ট। আই হোপ, য়্যু ডোন্ট ডিজাএ্যাপয়েন্টেড মি। অগত্যা মুনিয়া দেবার বাইকে বসলো। দেবা, ইয়াহু বলে চিয়ার্স করল। তারপর বাইকে স্টার্ট দিয়ে পিছনে তাকিয়ে বলল, থ্যাংকস সুইটি। দিস মোমেন্ট ইজ ডেডিকেটেড টু য়্যু।

মুনিয়া আস্তে আস্তে বলল, আপনি আসলেই পাগল।

বাইক দক্ষিণ দিকে যাওয়ার কথা। ওদিকেই কান্দিরপাড়। যেখানে গিয়ে ওরা কফি খাবে। শিল্পকলা চত্বর থেকে চারটি রাস্তা চারদিকে মোড় নিয়েছে। দক্ষিণ দিকে দেবার গাড়ি ঢুকতেই হঠাৎ কী যে হলো ওর, সে গাড়ি সেদিকে না নিয়ে সোজা উত্তরে টার্ন করাল। গাড়ি হাওয়ার চেয়েও দ্রুত বেগে ছুটছে। ছুটছে তো ছুটছেই। দেবা ইয়াহু হু-হু করে চিয়ার্স করতে লাগল। আর বলল, ইয়াং লেডি, টুডে আই উইল বি লস্ট উইথ য়্যু ! দারুণ চার্মিং হবে আজকের এই সন্ধ্যা। ওহ, অসাধারণ। বাতাসের দুরন্ত দাপটে মুনিয়া তার চুল আর ওড়না সামলাতে পারছে না। চুলগুলো সব দেবার মাথার কাছে আছড়ে পড়ছে। দেবার চোখে মুখে মুনিয়ার চুলের ঝাপটা। ওর ওড়না চাকার সাথে পেঁচিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। প্রচণ্ড দাপটে মুনিয়ার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। সে হায় হায় করতে লাগল— ওহ, দেবা, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কোথায় যাচ্ছেন বলুন তো?

দেবা বলল, ইয়াং লেডি, ওয়েট এন্ড সি। কোথায় নিয়ে যাচ্ছি, দেখবেন। কফি খাওয়ানোর কথা ছিল না, আমার? কফি খাব। কফি হাউসে যাচ্ছি। তবে সেটা ওয়ান্ডারফুল প্যারাডাইজ। কান্দিরপাড়ে খাব না। ওখানে লোকারণ্য। লোকারণ্যে দেবীর পুজো হয় না। নদীর জলের পাশে বসে বসে কফি খাব। আপনাকে স্বর্গে নিয়ে যাচ্ছি। স্বর্গ দেখবেন না? স্বর্গকন্যাকে নিয়ে চা খাব নরকে বসে? তা কি হয়? উত্তাল জলরাশির নিচে বসে বসে কফি পান করব। আপনি কফি পান করবেন। আর দুরন্ত মাছেরা এসে জলের ওপর আপনাকে ছুঁতে চাইবে। ওরা আপনাকে ধরতে পারবে না বলে আপনি আপনার সুন্দর পা জলে ফেলে দেবেন। আর অমনি দুষ্টু মাছেরা আলতো স্পর্শ করে ছুঁয়ে দেবে আপনার পা। হয়তো ওরা ওদের ছোট চোয়াল দিয়ে আপনাকে চুকচুক করে কামড় দেবে। একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো দৃশ্যকল্পটি? কী, কেমন লাগছে বলুন? কখনো স্বর্গে গিয়েছেন? না যান তো দুঃখ নেই। এই পানাসিক দেবন্ত দেব আজ আপনার জন্য ইন্দ্র থেকে স্বর্গের চাবি চেয়ে এনেছে। সে আপনাকে আজ স্বর্গের রাজধানী অমরাবতীতে নিয়ে যাবে। অধম এই খাদেমকে আপনাকে সেই স্বর্গের দরজায় পৌঁছানোর সুযোগ দিন। আমার সাথে ঐরাবত নেই। তবে ঐরাবত হিসেবে এই নাগমল্লই যথেষ্ট বলে সে তার বাজাজ পালসার ১৫০ মডেলের হোন্ডাটি মুনিয়াকে দেখালো। আসলেই হোন্ডাটি রাজসিক। কটকটে কালো রেঞ্জের ওপর লাল টকটকে সিটকাভার তার পেছনে চৌকোণো লেজের মতো একটি ঝুঁটি। মোটরসাইকেলটি দেখলেই আর দশটি মোটরসাইকেল থেকে আলাদা করে চেনা যায়। একদম দেবার মতো খুব সুন্দর, সুদর্শন আর কান্তিময় পুরুষের জন্য নন্দিত পঙ্ক্ষিরাজ।

মুনিয়া অবাক হয়ে গেল। বলল, আপনি পানাসিক দেবন্ত দেব? কোন পানাসিক? দেবা, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। তারপর গিয়ারে স্ট্রং টার্ন দিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিল। মুনিয়া বলল, কী হয়েছে? দেবা বাইক থেকে নেমে মুনিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাতে গড়াচ্ছে। অন্ধকার নেমে এসেছে চারদিকে। দিগন্তের ওপারে এখনও কিছুটা আলো জেগে আছে। সেই আলো আঁধারির ভেতর পৃথিবীটা স্থিরচিত্রের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওপরে আকাশ। একটি দুটি তিনটি করে তারাদের প্রসব করছে। ফুটফুটে ওই আকাশের সন্তানেরা ঝিলিমিলি হাত বাড়িয়ে দিয়েছে দেবার চোখে। দেবার ওই চোখের দিকে মুনিয়া বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করা ওই দুটি চোখে মুনিয়ার কি মনের পতন হচ্ছে? এসব কী ভাবছে মুনিয়া? নাহ, তার মাথায় এসব আসতে পারে না। মুনিয়া দেবার চোখ থেকে ওর চোখ সরিয়ে আবার প্রশ্ন করল, আপনি কোন দেবার কথা বলছেন?

দেবা বলল, আমি আপনার ফেসবুক বন্ধু পানাসিক দেবন্ত দেবের কথা বলছি। যে আপনাকে প্রায় সময় নক করত। মুনিয়া, আমি সেই দেবন্ত। আপনি কখনই আমাকে পাত্তা দিতেন না। ওরে বাবা! আপনি যা মুডি! আজকে আপনি শিল্পকলায় আসছেন। আপনার চিত্রপ্রদর্শনী নিয়ে। ফেসবুকে আপনার এই পোস্ট পেয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। ছুটেছি পাগলের মতো। আপনাকে দেখার এই সুযোগ আমি হারাতে চাইনি। তাই সমস্ত কাজ ফেলে ছুটে এসেছি শিল্পকলায়।

মুনিয়া মুচকি হাসে। তারপর বলে, তো দেখলেন আমাকে?

দেখেছি নারী তোমাকে দেখারও অধিক

যতটুকু ভেবেছি তুমি তারও ততোধিক…।

এই বলে দেবা অট্টহাস্যে চারদিক ভাসিয়ে হাসে। আর বলে, মুনিয়া, আপনি খুব সুন্দর। খুব সুন্দর আপনি।

আমি চিত্রকর হলে এখনই এই সন্ধ্যার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই রমণীর ছবি এঁকে ফেলতাম। আপনাকে যদি না পাই সেই ভয়েই আমি প্রথমে এক্সিবিশনে গিয়ে আপনার প্রথম পাঁচটি ছবি কিনে ফেলি। যেন পরপর ছবিগুলো সাজিয়ে পোস্ট করে আপনাকে চমকে দিতে পারি। আপনি যেন বুঝতে পারেন এক অধম ফ্যান আপনাকে কী রকম ভালেবাসে! সামনাসামনি না হোক ফেসবুকে তো তখন এই অজুহাতে কথা বলা যাবে। আপনাকে দেখা, আপনার সাথে কথা বলা— আমার বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল। একই শহরে থেকেও এমন মোহনীয় নারীকে না দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করি কী করে? তাই ছবিগুলোই আমার ভরসা ছিল।

মুনিয়া দেবার কথা কেড়ে নিয়ে বলল, কিন্তু আপনি তার আগেই আমাকে চমকে দিয়েছেন। প্রথমে ছবি পাঁচটি নিলেন। এরপর বাকিগুলো অর্ডার করলেন। কেন দেবা? এত ছবি দিয়ে কী করবেন?

—কী করব? হুমমমমমমমম, আমি ছবি আঁকতে জানি না, প্রথমে ছবিগুলো আমার লিভিং রুম আর বেডরুমে সাজিয়ে নিতাম। তারপর ওই ছবিগুলোয় আপনাকে খুঁজতাম। নিজেকে ওই ছবিগুলোর ক্যানভাস ভাবতাম। সে যাক। একদিন আপনার ছবিঘরে হানা দেব বলে দেবা আবার হো হো করে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হেসে উঠল।

তারপর বলল, শ্রীমতি, নাইট ইজ কামিং। দেন আই’ভ টু বি গিলটি ওফ বিং লেট। লেটস গো, ইন দ্য ওয়াটারস অফ অমরাবতী। দি টাইম ফর ড্রিংকিং। কফি ইজ ওভার। এই বলে দেবা মুনিয়ার হাত ধরে বলল, মেনকা উঠুন। এই নাগমল্ল প্রস্তুত আপনার জন্যে। আপনাকে নিয়ে সে চঞ্চল হাওয়ার পিঠে সওয়ার করবে।

মুনিয়া দেবার পেছনে বসে। বাজাজ পালসার ১৫০-এর গতি মনে হয় ১৬০-এ চলছে। হাওয়ার চেয়েও দ্রুতগতিতে রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে শোঁ-শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। সাঁইসাঁই করে দু’পাশের গাড়ি ফুড়ুৎ করে সরে যাচ্ছে। সামনে হেডলাইটের আলো। এই আলোর ভেতর দূরের পোকার কুণ্ডলি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। দেবা থেকে থেকে ঝংকার তোলে। বাতাসের গর্জনে কোনকিছু শোনার উপায় নেই। মুনিয়ার চুল দেবাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। মুনিয়া বলছে— দেবা, আস্তে চালান। আমি চুলগুলো বাঁধি। ওগুলোর জন্য আপনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। দেবা বলল, নোহ লেডি, বাতাসকে আজ বাধা দেবেন না। চুলগুলো ছড়িয়ে দিন। ওরা আলিঙ্গন করুক আজ আমায়। আপনার চুলের ঘ্রাণ হাজার মৃত্যুর জীবন থেকে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসছে। ওহ উমাবতী, বাতাস আজ বখাটে হয়ে উঠুক। কিছু বখাটেরা ভিড় করুক আপনার চারপাশ। আজ মানুষের পৃথিবীতে এই বাতাসই থাকুক।

গাড়ি চলছে দুর্বার গতিতে। সড়ক পেরিয়ে এবার কাঁচাপথে উঠে এল নাগমল্ল। এবার দেবা বলল, জলের আকাশ দেখবেন?

মুনিয়া বলল, হু।

—আপনার ডানে তাকান। দেখুন।

ওয়াও! মুনিয়া বলল, এ আমি কী দেখছি!

অন্ধকার রাত। মুনিয়ারা গোমতী নদীর বাঁধের ওপর এসে পড়েছে। পাশে নদী। রাস্তার ওপর কিছু কিছু ল্যাম্পপোস্ট আছে। ওগুলোর আলো জলের ওপর পড়ছে। রাতে গোমতীর জলে ল্যাম্পপোস্টের ছায়া এক মারাত্মক ঘোর তৈরি করেছে। এর ওপর তারা ভরা আকাশ। ফুটন্ত তারার আকাশ জলের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে। এই দৃশ্যটি যে কী ভয়ঙ্কর সুন্দর তা মুনিয়া না দেখলে বিশ্বাসই করত না।

মুনিয়া বলল, ওহ দেবা থামুন, আমি এই ঘোর দেখতে চাই। এখানে আজ আমি রাতকে খুলে নেব। রাতের আঁধারে পরিয়ে যাব এক কিশোরী জীবন।

দেবা থামে। তারপর বলে, মুনিয়া, এই পুনর্নির্মাণ অসাধারণ হবে। সত্যি, আপনার দুদিকে দুটি ছায়া। তার ভেতর থেকে সেই কিশোরীকে বের করতে পারবেন? আচ্ছা থাক, না পারলে আমি আছি।

তারপর দেবা বলে— মুনিয়া, বলুন তো, কোন হাত দিয়ে ছবি আঁকেন?

মুনিয়া ডানহাত দেখিয়ে বলে, এটি। দেবা সামনে এগিয়ে আসে। তারপর ওর মুখোমুখি তাকায়। এরপর ফুঁ দিয়ে মুনিয়ার চোখের ওপর ঝুলতে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেয়। দেবা মুনিয়ার গা ঘেঁষে প্রায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই। বাঁধের ঈষৎ সরু রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটছে। গাড়ি চলার জন্য রাস্তা কিছুটা ফাঁকা রেখেছে ওরা। না রাখলে যে গাড়ি ওদের ডলে চলে যাবে। তখন কেউ টের পাবে না যে কফি খেতে এসে দুটি মানব মানবী কী নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে।

দেবার শ্বাস পড়ছে মুনিয়ার মাথার ওপর। মুনিয়ার মাথা প্রায় দেবার বুকে ঠেসে আছে। দেবা বলছে, মুনিয়া, নড়বেন না। চোখটি বন্ধ করুন প্লিজ!

মুনিয়ার মুখ থেকে কোন কথা বেরোয় না। রাতের এই রূপের সাথে অপরিচিত মুনিয়া দ্বিধাগ্রস্ত। কিছুটা মোহগ্রস্তও। পাগলাটে এক যুবক তাকে চন্দ্রশহরে ভ্রমণ করাচ্ছে। চারিদিকে এত আঁধার! অথচ ছেলেটির চন্দ্রবদন আর উল্লাস মুনিয়ার ভেতরের কঠিন দুর্দমনীয় শিলাস্তরী মনটিকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। কী ভয়ংকর জাদু জানে এই ছেলে। মুনিয়া চোখ বন্ধ করে। দেবা তার ডানহাতটি ধরে ওর দুই হাতে তুলে নেয়। তারপর বলে, কী সুন্দর এই হাতগুলো।

তারপর দেবা মুনিয়াকে বলে, একটি কথা বলতে চাই।

মুনিয়া বলে, বলুন।

আমি এখন থেকে আপনি শব্দটি উইথড্র করলাম। এই পুঁচকে মেয়েকে আপনি সম্বোধন বেমানান। এমন অপ্সরী রাতে একজন সুদর্শনাকে নিয়ে একটি সুদর্শন ছেলে জলবিহারে নেমে আপনি আপনি করবে— তা কী করে হয়? এখন থেকে মুনিয়া তুমি হয়ে গেলে। তুমিময় আজ এই দেবার কফি পার্টি। বুঝলে ডিয়ার! চোখ খুলবে না মেয়ে। তোমার আঁকিয়ে হাতগুলো একটু ছুঁয়ে থাকতে দাও। কেমন করে ছবি আঁকো কন্যা? জীবন আঁকবে? এই নরম তুলতুলে হাত দিয়ে আমার একটি গোটা জীবন এঁকে দেবে? এঁকে এঁকে উড়িয়ে দেবে কি বুভুক্ষু আমাকে? চাই কেউ আমাকে এঁকে দিক! স্পেশাল কেউ, আমাকে ছিঁড়ে আমারই শুশ্রূষা করুক!

তারপর সে মুনিয়ার হাতে দুটি গোলাপ ফুল গুঁজে দিল। সাদা ধবধবে দুটি গোলাপ। তারপর মুনিয়ার দু’হাত তুলে গোলাপের ভেতর চুমু খেলো সে। এরপর বলল, তোমার জন্য এই দুটি সাদা গোলাপ কম হয়ে গেছে। আসলে তোমার জন্য পৃথিবীতে এখনও কোনো ফুলই ফোটেনি। কী আর করা। আমার বাগানের সেরা গোলাপগুলোই বেছে রেখেছি তোমার জন্য। এরচে, এই অধমের আর কোনো ফুলের গল্প নেই। বলো মুনিয়া, তোমাকে কী দিয়ে আজ অভিনন্দন জানাব? এই রাত তুমি আমাকে দিলে। একটি সন্ধ্যা, মাতণ্ড বাতাস, তারাভরা আকাশ, ওই জলের স্থির হয়ে বসে থাকা, একটি পূর্ণ প্রকৃতি, কী দাওনি তুমি আমাকে আজ? এত পেলাম যার কাছে, তাকে কি দুটি সাদা গোলাপে মানায়? ওহ কী বোকা আমি! আমি ভেবেছি শিল্পকলা একাডেমিতে যদি সুযোগ মেলে, যদি কোনোরকম তোমাকে দুটি ফুল দিতে পারি হয়তো ওটা আমার জন্য অনেক কিছু হবে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু যে আমার জন্য অপেক্ষা করছে সে কি আমি জানি?

মুনিয়া চোখ বন্ধ করে থাকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কথাগুলো শুনছে সে। কত দীর্ঘকাল সে এমন কথা শোনেনি। যেন পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে কেউ তাড়িয়ে তাড়িয়ে কথাগুলো টেনে আনছে। সেইসাথে তাকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে যেন কেউ উড়িয়ে উড়িয়ে তার সমস্ত নিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই মুনিয়া ভাবছে, জীবন কি এমন? বৃত্তে বন্দি হয়ে থাকা? নিজের সাথে একাকী লুকোচুরি খেলা? কানামাছি ভোঁ-ভোঁ খেলার নাম জীবন? যদি তাই হয় তাহলে সে কেন যাকে পায় তাকে ছুঁতে পারল না? তবে আজ কেন এই গোমতীর জলাধারে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে এসে তার ডানায় পালক গুঁজে দিল? মুনিয়াকে পাখি বানাল? কেন আজ মুনিয়া উড়তে চাইছে? সমস্ত আকাশকে তার আবাস ভেবে সে উড়তে চাইছে! মনে মনে ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে সে বলছে, দেবা, আমাকে নিয়ে চলো, তোমার যেখানে খুশি। মুনিয়ার ভেতর বাঁধভাঙা প্লাবন।

মুনিয়া চোখ খোলো।

দেবার ডাকে মুনিয়ার হুঁশ এল।

এতক্ষণ মুনিয়া কোথায় ছিল? ছেলেটা মারাত্মক জাদু জানে। মুনিয়া নিজেকে সংযত করল। ওহ, ছেলেটা যে কী! একেবারে হৃদপিণ্ড ছুঁয়ে দিতে জানে। ছেলেটা একটা নদী। এই উষ্ণ আবহাওয়ার দিনেও কেমন করে সে তাকে শীতল করে দিল। দেবা মুনিয়ার দু হাত ধরে বলল, এ কী? তোমার হাত বরফ হয়ে গেছে।

শীত লাগছে? বাতাসে খুব দৌড়িয়েছি তাই না? চলো, আমার অক্টোবরের ঋতু, নাহ, বরং বসন্তই ডাকি তোমাকে। এসো বসন্ত, অমরাবতীতে যাওয়া যাক। এই বলে দেবা মুনিয়াকে পালসারে তুলে নেয়।

চলে আমার পালসার হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া

দেখব স্বর্গ দুজন এখন ঘুইরা ঘুইরা…

কী অদ্ভুত গান গেয়ে আর সিটি বাজিয়ে দেবা মুনিয়াকে নিয়ে অমরাবতীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল।

হঠাৎ গাড়ি স্লো করল দেবা। ওরা থামল। বাঁধের ওপর সড়ক থেকে একটি রাস্তা ঢালু হয়ে একদম নিচে নেমে গেছে। খাড়া রাস্তা থেকে ওর বাজাজ পালসার ঢালু হয়ে নিচে নামবে। জায়গাটা রিস্কি। একটু এদিক ওদিক হলে সব শেষ। গাড়িসহ সোজা নদীতে। দেবা বলল, ওহে আমার কৃষ্ণচূড়াপুর! আপনি এখন আমাকে আপনার সিটবেল্ট ভাবতে পারেন। এটা তো আর বিমান নয় যে, বিমানবালা এসে আপনাকে সিটবেল্ট পরিয়ে দেবে। আপাতত পানাসিক দেবন্ত দেবকে সিটবেল্ট ভেবে আপনার দুইহাত দিয়ে তার কোমর পেঁচিয়ে ধরুন। তা না হলে মহামান্যা, আমরা দুজনেই এই উড্ডয়নে এসে গোমতীর থিরজলে সমাহিত হব। আপাতত এই সুন্দর লগ্ন আমি নষ্ট হতে দিতে পারি না। আপনি যদি চান তো ডুবতে রাজি আছি। মুনিয়া দেখল, সত্যিই বাঁধ থেকে রাস্তাটি অনেক নিচে নেমে গেছে। পাশ দিয়েই গোমতীর ছলাৎ ছলাৎ জল। জলে টইটম্বুর নদী। অগত্যা মুনিয়া পালসারে দুইপা দু’দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার কোমর পেঁচিয়ে ধরল। দেবা গাড়িতে স্টার্ট দিতেই গাড়ি অটোমেটিক ঢালু পথ বেয়ে তরতরিয়ে নিচের দিকে চলে যাচ্ছে। আর দেবা ওয়াও, হি হি হি হিন্দি সিনেমার নায়কদের মতো পাগলামি করতে করতে সামনে ছুটছে। মুনিয়া ওর কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে এই আহ্লাদে আটখানা হয়ে সে চিৎকার করে বলছে, হে গোমতী সুন্দরী! ফুলেদের আর কাছে ডাকবো না, তোমার হৃদয় আজ আমার পাঁজরের সাথে লেগে আছে। আজ পাঁজর আর হৃদয় একসাথে কথা বলছে, বিশ্বাস করো মন, তোমার হৃদয়ের চেয়ে এত নরম বিছানা কোথায় আছে?

মুনিয়া ওর পাগলামি দেখেই চলেছে। একেকবার একেক নামে ডাকছে তাকে। সে ঘোর আর ধন্দে পড়ে যায়। এতদিন মুনিয়াকে যন্ত্রণা আর অবিশ্বাসের ক্লেদ জড়িয়ে রেখোছিল, আজ ছেলেটার মাতলামিতে তার শরীরের নিভৃত কপাট খুলে কে যেন তাকে মুক্তি দিতে চাইছে। কে যেন বলছে, লাইফ ইজ বিউটিফুল। লাইফ ইজ লাভলি ডিয়ার, এনজয় দা চার্মিং লাইফ। আসলে কথাগুলো দেবাই তার মনে বলে চলেছে। মুনিয়া ভাবতে ভাবতে তার কল্পজগতে চলে গিয়েছিল। অলক্ষে সে শুনতে পেল তার মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটা মানুষ তাকে যেন এসব বলছে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে এলে মুনিয়া দেখে কথাগুলো দেবা বলছে। আশ্চর্য! দেবা কীভাবে মুনিয়ার মনে ঢুকে অন্য কারও স্বরে কথাগুলো বলছে? যে কথাগুলো বহু বছর গোপন ছিল তার বুকের ভেতর! যেন আজ পিছুটান ছেড়ে আসা কোন স্বপ্নাহত হরিয়াল মেয়ের ঘুম ভাঙিয়ে এসব কথাগুলো বলার জন্য গোমতির স্বচ্ছ জল তার জন্য তিরতির করে কাঁপছিল। যেন বহু বছর বুকের ভেতর ঘুমিয়ে ছিল এই কথাগুলোই। আজ তারা টোকা পেয়ে, ছোঁয়া পেয়ে জলের ভেতর থেকে কলকল করে বের হয়ে আসছে, গোমতীর স্বচ্ছ জলের অতল থেকে। মুনিয়া ভাবে, কে নদী— গোমতী নাকি দেবা?

মুনিয়ার ভেতর অশান্ত ঢেউ। তার প্রাণ দুইদিকে চলে গেছে। একটি দেবার পিছুপিছু ছুটছে। আরেকটি কিছুক্ষণ আগের বিষাদিত স্মৃতি। দুটোই কল্পনা করে সে। দেখে বিষাদিত স্মৃতিরা তাকে ছেড়ে চলে যেতে প্রস্তুত। বাকি রইল দেবা। তার মনপ্রাণ সবকিছু ভেঙে ওইদিকেই ছুটছে। মনের এই বেখেয়ালি রূপের সে কোন আকার দেখতে পায় না। নিরাকার এই মনে সাকার দেবার ছায়া ছাড়া এখন আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই। মুনিয়া ঘোরে ডুবে গেল। যেমন করে সে অস্তমিত সূর্যকে গোমতীর জলে ডুবে যেতে দেখেছে ঠিক সেরকম করে সে দেবার নদীতে টুপ করে ডুবে গেল।

সত্যিই, ওরা প্যারাডাইজ হাউজে এসেছে। দেবার অমরাবতী। এককাপ কফি ওকে কোথায় নিয়ে এল!

চারদিকে সবুজ আর সবুজ। নানান রকম ফুল আর লোকালয়হীন এক জলজ আবাস। অপূর্ব! সত্যিই অপূর্ব! জলের ওপর সবুজ দ্বীপ। ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ যেন গম্ভীর রাত্রির বুকে কথাহীন গান। এই গানগুলোর কোনো সুরকার, গীতিকার নেই। একমাত্র প্রকৃতির নির্মল ছন্দই রচনা করে এসব গান আর আপন মলয়রাগে চিত্রিত করে এসব অবিনাশী সুর। আজ এই রাত্রিতে মুনিয়া এখানে না এলে জানতেই পেতো না জলও কথাছাড়া নিজস্ব ভাষায় এত সুন্দর গান গাইতে পারে।

দেবা মুনিয়াকে নিয়ে ওপরে না বসে সোজা ঘাটলায় চলে গেল। বড় ঘাটলা। দূরে সবুজ বনে হালকা নীল বাতি জ্বলছে। অনেক দূর থেকে আসা নীল রঙের অস্পষ্ট আলোয় জলের ওপর অসাধারণ এক ছায়া ফেলেছে। জল কলকল করে বয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছে তো যাচ্ছে। আর পেছনে ফিরে আসছে না। আবার জলের দল, দল বেঁধে সামনে চলে যাচ্ছে। মুনিয়া আর দেবা ঘাটলার একদম নিচের একটি সিঁড়িতে বসেছে।

দেবা বলল, মুনিয়া, কেমন লাগছে?

হুমমম।

তোমার ভালো লাগছে?

হুমমমম।

আমি যে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি রাগ করেছ?

উমমমমম না।

মুনিয়া…?

হুমমম।

তুমি খুব সুন্দর। তুমি এই রাতের চেয়েও বেশি সুন্দর। তুমি পৃথিবীর সেরা সুন্দর। তুমি একটি অবাক… জানো?

না, জানি না।

থাক, তোমার জানতে হবে না। আজ এখানে থাকবে?

হুমমমমম।

সত্যি বলছ?

হুমমমম।

মুনিয়া, তুমি খু-উ-ব সুন্দর। তোমার হাত ধরি?

হুমমমম।

মুনিয়া, পা ভেজাবে?

হুমমম।

দেখি, পাগুলো আমাকে দাও

এই যে!

দেবা নিচের আরেকটি সিঁড়িতে নেমে আসে। তারপর মুনিয়ার দুটি পা তার দুই হাতের ভেতর ধরে বসে থাকে। এরপর মুনিয়ার পা থেকে ক্রসবেল্ট জোড়া জুতো খুলে ফেলে। তারপর একটু ঝুঁকে নদী থেকে এক আঁজলা জল নিয়ে আসে। সেই জল দিয়ে সে মুনিয়ার পা ধুয়ে দেয়। পাগুলো ধুয়ে দেওয়ার পর সে অপূর্ব চোখে ওগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। আর বলে বাহ! দেবালয় থেকে নেমে আসা দেবীর পা ধুয়ে দিচ্ছে অধম এক সেবক। আমার কী ভাগ্য যে আজ আমি দেবীর চরণ ছুঁতে পেরেছি। ওহ, দেবী! তোমার চরণের আশীর্বাদ দাও আমাকে! আমি কৃতার্থ হই।

তারপর দেবা বলে, মাছেদের চুমু খেতে দেবে না? আজ কথা ছিল ওই পা যুগল নদীর জলে ডুবে যাবে। আর মাছেরা তাদের নরম চষ্ণু দিয়ে তোমাকে ছুঁয়ে দেবে। পা দাও দেবী। গোমতী ধন্য হোক। এই বলে দেবা মুনিয়ার খোলা পা দুটি জলে নামিয়ে দিল।মুনিয়ার ধবধবে ফর্সা পা জোড়া গোমতী লুফে নিল।

মুনিয়ার পা গোমতীর জলে ভেসে যায়। ওপরে তারাভরা আকাশ, নিচে দেববৃক্ষের ডালে মুনিয়া নামক প্রজাপতির ফুরুৎ ফুরুৎ ওড়াউড়ি। মুনিয়ার হৃদয় পাললিক ভূমির মতো ভেজা। উৎকর্ষ জমিন একজন কৃষকের আজন্ম চাওয়া। নরম থকথকে ভূমি না হলে কৃষক জমিতে চাষ দেবে কেন? মুনিয়া আজ গোমতীর জল পেয়ে সমতটের উর্বর কন্যা। সে তার বুকে চেপে থাকা সমস্ত পাথর এই জলে ছুড়ে নিজেকে ফিরিয়ে নেবে জীবনের কাছে পুনর্বার। এই ভাবছে সে এখানে বসে।

দেবা কফি নিয়ে এল। সোনালি রাত জলের গান বাজিয়ে চলেছে। দেবা বলল, আজ অমৃত খাচ্ছি।

মুনিয়া বলে, সেই অমৃত আপনি। দেবা, আপনি অসাধারণ। খাঁ-খাঁ দুঃখে নিহত হওয়া এই আমাকে আপনি সত্যিই আপনার অমরাবতীর রাজধানীতে নিয়ে এলেন। দেবা, আপনার অমরাবতী অপূর্ব।

যা হোক, মর্ত্যের দেবীকে তুষ্ট করতে পেরে এই অধম মহাখুশি। দেবীর সাক্ষাৎ আর কবে পাব? দেবীকে রেসপন্স করলে কোনো জবাব পাই না। এই অধম সেবক দেবীর খুব কাছাকাছি থাকতে চায়। দয়া করে দেবী কি তার কন্টাক্ট নাম্বারটা দেবে?

মুনিয়া এবার হো হো করে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে দেবা অবাক হয়ে বলল— মুনিয়া, তুমি হাসতে জানো? মুচকি হেসে মুনিয়া বলল, না, কাঁদতে জানি। তবে আজকে হাসছি। এখন তো মনে হয় আমি আসলে হাসতে জানি।

রাত নটার ঘরে ছুঁই ছুঁই করছে। প্যারাডাইজ হাউস একটু পর বন্ধ হয়ে যাবে। ওদের লোক এসে বলল— স্যার, আমরা ক্লোজ করব। দয়া করে আপনাদের উঠতে হয় যে! আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে আজকের দিনের চেয়েও আগামী প্রতিটি দিন আপনাদের আরও ভালো সেবা দিতে আমরা প্রস্তুত। আশা করছি, আপনারা আবার আমাদের সেবা নিতে আসবেন, এবং এই প্যারাডাইজ হাউজের সেবা আপনাদের আরও স্বর্গীয় অনুভূতি দেবে। আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।

দেবা বলল, ঠিক আছে আমরা উঠছি। আবার আসব এই সুন্দর স্বর্গে। দেবা আরও কয়েকটি সিঁড়ি নিচে নেমে সর্বশেষ সিঁড়িতে দাঁড়ায়। ওখানে হাঁটুর ওপর জল। বর্ষা এখনও যায়নি। অক্টোবরের শেষ সময়। আকাশজুড়ে এখনও মেঘের আনাগোনা। প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে গত সপ্তাহেও। গোমতী যৌবনা। জলে টইটম্বুর।

ওই জলে দাঁড়িয়ে আছে দেবা। জলের স্রোত তার পায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। সে নিচু হয়ে জল স্পর্শ করে। কিছু জল হাতের তালুর ওপর নিয়ে কপালে ঠেকায়। তারপর বলে, হে গোমতী, আমি তোমাকে প্রণাম করছি। জীবনের বিভীষিকা ভুলে আমি তোমার কাছে এসেছি। তুমি আমাকে উজাড় করে দিয়েছ। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাওনি। হে স্রোতস্বিনী! আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করো। জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি সময় তুমি আজ আমাকে উপহার দিলে। তোমাকে কোনোদিন ভুলব না। হে আমার প্রিয় নদী! তুমি মুনিয়ার মতো মহান। এই বলে সে আঁজলার জল দিয়ে তার মুখ ধুয়ে নিল।

মুনিয়া দেবাকে দেখছে। সে এগিয়ে এসে দেবাকে বলছে, একি দেবা, আপনি কাঁদছেন?

না, তেমন কিছু না। ওসব দেখতে নেই মুনিয়া।

জলের ওপর আছি। সে দিয়েছে আজ আমাকে অনেক। তাই নিজের একটু উষ্ণীষ এখানে রেখে গেলাম। এরপর দেবা মুনিয়াকে বলল, চলো এবার ওঠা যাক। এই বলে সে মুনিয়ার হাতটা ধরে ওপরে উঠতে লাগল।

হাওয়ার তীব্রগতিকে পাশ কাটিয়ে বাজাজ পালসার চলছে। বাতাসও যেন এই বাইকের গতিকে ধরতে পারছে না। তীব্র গতিতে এগিয়ে চলছে পালসার। পেছনে গোমতী নদী, মিষ্টি রাতের স্মৃতি, তারা ভরা আকাশ, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, দূরে সবুজ বনের নীলাভ আলো, কফির ঘ্রাণ সবশেষে প্যারাডাইজ হাউজের সুখময় ভালোবাসা সবকিছু ওরা বুকে নিয়ে দেবার স্বর্গীয় বাহন নাগমল্ল ছুটছে। ছুটতে ছুটতে একেবারে মুনিয়ার বাসার দোরগোড়ায়। মুনিয়া দেবাকে বিদায় জানিয়ে যখন বাসায় ঢুকল তখন রাত দশটা। এক অসাধারণ সুখস্মৃতিতে আচ্ছন্ন মুনিয়া দেবাতে ডুবে রইল।

সেই দেবা আজ ঝড়বৃষ্টি রাতে মুনিয়ার বাসায় উপস্থিত।

মুনিয়া বের হয়ে এল। পরনে কালো জর্জেট শাড়ি। সাথে সাদা ব্লাউজ। রেডি হয়েই কিচেনে দাঁড়াল। দেবা চায়ের কাপে চা ঢালছে। মুনিয়াকে দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। শরীরজুড়ে উপচেপড়া রূপ এই পুঁচকি মেয়ে ধারণ করে কী করে?

দেবা চা নিয়ে এগিয়ে এল। তারপর মুনিয়াকে বলল, আমি কেবল তোমার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। আমি কেবলই জেগে উঠলাম। জেগে উঠেই এমন পরিপূর্ণ ভোর দেখব, আহা! জীবন এত সার্থক হবে ভাবিনি।

দেবা অবাক চোখে বলে— মুনিয়া, কেন তুমি এত সুন্দর? এই দেখ, এখন আর চা খেতে ইচ্ছে করছে না। চোখের সামনে এমন রূপবতী থাকলে পৃথিবীর সকল পিপাসা মিটে যায়। ক্ষুধা মরে যায়। আচ্ছা, প্রভু কেন সকল নারীকে তোমার মতো রূপবতী করে দেয় না? তাহলে তো এই পৃথিবীতে কোনো অভাব থাকে না। ক্ষিধেয় মানুষ মরে না।

মুনিয়া বলে ওঠে, হুম, ঠিক বলেছেন। পৃথিবীর সকল নারী আমার মতো হোক। আর সকল পুরুষ আপনার মতো। যাতে মাঝরাতে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ওই পুরুষেরা রূপবতীদের ঘরে এসে হানা দিতে পারে।

তা যা বলেছ মুনিয়া। এটা খারাপ হতো না। পৃথিবীর সকল পুরুষ প্রেমিক হয়ে উঠত, ভাবো তো একবার?

সারা পৃথিবী স্বর্গ হয়ে উঠেছে। প্রেমিক-প্রেমিকার মন তখন সুখে বিভোর। কীসের খাবার কীসের কী! প্রেম চাই তখন, শুধু প্রেম।

তাহলে আর কী! সারা পৃথিবী পাগলে ভরে উঠবে।

হুম, দেবা হেসে বলে। পৃথিবী যদি সুখময় হয়ে ওঠে প্রেমের জন্য, তাহলে পাগলই ভালো।

দেবা কীরকম পাগল ছেলে মুনিয়া সেদিনই টের পেয়েছে। যেদিন কফি খাওয়াকে কেন্দ্র করে সে যেভাবে অমরাবতীতে তাকে ঘুরিয়ে এনেছে সে যে এক নতুন জন্মের সমান। দেবা তাকে নবজন্ম দিয়েছে। জীবন যে কত সুন্দর, অলক্ষে নিভৃতে এসে সে নির্মাণ করে গেছে। সে যে কত অবাক ছেলে তার সাথে পরিচয়ের পর মুনিয়া বুঝতে পেরেছে। যখন দেবার সাথে সে কথা বলত সেখানে প্রেমের কোনো প্রস্তাব থাকত না। কিন্তু প্রতিটি কথা ছিল প্রেমময়। ভিডিও কলে যখন কথা বলতো দেবার চোখে মুখে দেখেছে সে বর্ণময় রঙিন উচ্ছ্বাস। ছেলেটা আদতেই রঙিন। কত দিকজুড়ে যে সে রঙিন তা বলে শেষ করা যাবে না। এই যে আজ রাতে মুনিয়ার বাসায় হানা দেওয়া সে আচমকা করেনি। বলে-কয়েই এসেছে। অমরাবতী থেকে ফেরার পর মুনিয়াকে সে একদিনের জন্যও কল করার সুযোগ দেয়নি। সুযোগ পেলেই সে কল করে বসবে। মুনিয়াকে নেটে পেলে আর কথা নেই। অডিওতে ভিডিওতে কল করে এমন পাগলামি জুড়ে দেবে যে মুনিয়ার হৃদয়টা মুহূর্তেই বোগেনভিলিয়া হয়ে ওঠে। এত রঙিন! ছেলেটা তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অদৃশ্য ঘ্রাণে মুনিয়াকে রঙিন করে দিচ্ছে। কিছুতেই মুনিয়া তাকে এড়িয়ে যেতে পারছে না। সে ভাবে ওর এতদিনের সংস্কার, রীতি, আভিজাত্য এগুলো আজ কোথায়? নিজেকে যে কঠিন আবরণে সে ঢেকে রেখেছে সেগুলো কোন ফুল্ল পৃথিবীতে চলে যাচ্ছে? কোন মেঘমল্লার ঝংকারে আজ রুমঝুম রুমঝুম করে বাজছে মুনিয়ার পাঁজর?

দেবার সাথে কথার মধ্যেই অঝোরে বৃষ্টি নামে। দেবা নিজেই বৃষ্টি। যে আকাশ খটখটে সেখানে সে বৃষ্টি নামাবেই। অক্টোবরের সময়গুলো যখন বৃষ্টিকাতর, পথঘাট জলময় তখন দেবা মুনিয়াকে বলত, একদিন খুব ঘন করে জল কুমিল্লাকে গিলে নেবে। কান পেতে রেখো মুনিয়া, সেদিন আমি আসব। তোমার কাছে। ভেজা শরীর নিয়ে আমি দাঁড়াব তোমার সম্মুখে। তোমাকে নিয়ে শব্দের জলাশয়ে হারিয়ে যাব। সেদিন আমার সমস্ত অস্থিমজ্জায় তোমার জন্য উল্লাস নিয়ে আসব। আচমকা এসে তোমাকে চমকে দেব। সেদিন থেকে একটু জলবৃষ্টি বেড়ে গেলেই মুনিয়ার উৎকণ্ঠার আর অন্ত থাকত না। কখন দেবা এসে পড়ে। ওর ঠিক নেই। একদম পাগলাটে। যা বলবে তাই করে বসবে।

রাত এলে দেবা অস্থির হয়ে পড়ে। কতবার মুনিয়াকে বলেছে— জানো মুনিয়া, রাত আমাকে নিজের ভেতর থাকতে দেয় না। যখন তখন আমাকে আমার ভেতরটাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়। শরীর যদি এতদিকে ছড়িয়ে পড়ে তবে কতখানি নিজের ভেতর থাকা যায় মুনিয়া? একদিন আমি আসব। আমার টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া শরীরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়া শরীরটা তোমাকে দেখাব। এই অক্টোবরে কোনো এক ঝুমঝুম বৃষ্টিরাতে তোমাকে নিয়ে উধাও হব। দেখো মুনিয়া, সেদিন তোমাকে নিয়ে পাগল এই দেবা, হলুদ পাখির মতো তোমার ভেতর ডানা ঝাপটাবে।

অবশেষে দেবা এল। জানালার শার্সি ভেঙে বৃষ্টি যখন তার চিত্রকলা দেখাচ্ছে, বিপুল বিনাশী রাত যখন টইটম্বুর জলে কেঁপে কেঁপে কল্লোল তুলছে সেই বৃষ্টিময় রাতেই দেবা এল একেবারে মুনিয়ার অন্দরমহলে।

দেবা মুনিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে বৃষ্টির আঁচ কিছুটা কমে এসেছে। দেবা সেই আগের মতো হৈ হৈ করে উঠলো, আজ বৃষ্টি নয় মুনিয়া আজ হৃদয়ে ভালোবাসা প্রবেশ করেছে। আজ ভেতরে প্রেম জমেছে। আজ মেঘের মতো প্রেম জমেছে। এই মেঘগুলোকে ঝরাব বলেই তো রাতের ডানা কাটতে এসেছি। আচ্ছা মুনিয়া, রাতকে কাটবে বলে তুমি কী নিয়ে এসেছ?

মুনিয়া খলখলিয়ে হেসে ওঠে, কিছুই বলে না। শুধু পাগল একটা বলে হাসতে থাকে।

হাসো মুনিয়া, তুমি হাসলে পৃথিবীর সব দূষিতরা ভালোবাসার মায়াবী মৌসুমে পরিণত হবে। এই বলে সে তার নতুন এক্সব্লেডের ডাবল ডিস্কের ১৬০ সিসির স্ট্রিট অলরাউন্ডার মোটরসাইকেলটির ওপর মুনিয়াকে বসিয়ে দেয়। মোটরসাইকেলটি নতুন। আজ সে বাজাজ পালসার আনেনি। বৃষ্টিজল কেটে এটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মোটরসাইকেলে বসে ওরা দুজনে ভিজছে। হঠাৎ দেবা বাইকটির সিঙ্গেল চ্যানেল অ্যান্টি-লক ব্রেকিং সিস্টেমে তাপ ছড়িয়ে দেয়। আর অমনি বাইকটি পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণে এসে থেমে যায়। তারপর সে বাইকটিতে রোবো ফেসড হেডল্যাম্প জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তেই পুরো রোডজুড়ে চাঁদের আবছায়ার মতো আলো তৈরী হলো। এরকম চাঁদের আলো তৈরীর জন্যই দেবা বাইকটি নতুন কিনেছে।

বাহ, কী সুন্দর! বলে মুনিয়া জুতোগুলি ফেলে দিল। বাইক থেকে নেমে দিল দৌড়। বাইকের এই মায়াবী আলোয় মুনিয়া রোডের এমাথা থেকে ওমাথা দৌড়াচ্ছে। অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। মুনিয়া ভিজে একাকার। শরীরে যেন শাড়ি নেই আর। পাতলা শিফন, রসুনের চামড়ার মতো কোনোরকম শরীরে টিকে আছে। সাদা ব্লাউজ। দেখা যাচ্ছে না। ওটাও ভিজে ওর ফর্সা শরীরে মিশে গেছে। মুনিয়ার সেদিকে খেয়াল নেই। দেবা এগিয়ে আসছে একটু একটু করে। মেঘের রাত। আঁধার রাত। নকল চাঁদ-আলোর রাত। মুনিয়া এতক্ষণ পর টের পেল ওরা নতুন গোমতীর পাড়ে এসেছে। চারদিকে বৃষ্টি। নিচে নদী। পাশে বাঁধ। বাঁধের সাথেই পিচঢালা কালো পথ। মুনিয়ার শাড়ি ওকে পেঁচিয়ে ধরেছে। ওর লিকলিকে শরীরটা শাড়ির সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। দেবা দেখছে মুনিয়াকে। এই রাতে তার ফিনফিনে শরীর থেকে ভেজা ঘ্রাণ পাচ্ছে দেবা। সে বিহ্বল হয়ে পড়ছে। দেবা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে বলল, মুনিয়া স্নান করবে?

মুনিয়া বলল, জলের সাথেই তো আছি, দেবা?

দেবা বলল, হুম, ওহে কস্তুরী রমণী! এই গভীর নিরিবিলি পথে যে বৃষ্টি আমাদের ভিজিয়েছে আজ আমাদের উচিত তাকেও ভিজিয়ে দেওয়া।

এই বলে দেবা মুনিয়ার হাত ধরতেই মুনিয়ার পা দুটি শাড়ির সাথে প্যাঁচ লেগে যায়। অমনি সে সামনে পা বাড়াতে না পেরে তাল হারিয়ে বাঁধের পেছনে পড়ে যায়। ওদিকটায় বৃষ্টির গড়াগড়ি। জল চুঁইয়ে বাঁধের দিকে ছুটছে। মুনিয়া সেখানেই পড়ে রইল। যেন বৃষ্টির বিছানায় শুয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক কোনো নারী। দেবা অস্থির হয়ে ওঠে। সে নিজেকে সামলাতে পারছে না। সেও উপুড় হয়ে মুনিয়ার ওপর পড়ে। জলজ মাটিতে নারীর ঘ্রাণ, তার নিবিড় ঠোঁটের ওপর বৃষ্টিকণারা হল্লা করছে। নিঃশ্বাসের ভেতর ডাক, আরও কি বর্ষা হবে? কে জানে? বৃষ্টির এই শাখা প্রশাখা দেবার পা দুটোকে শিকড় বানিয়ে মুনিয়ার পদতলে গেঁথে দিল।

মুনিয়া উঠে বসে। একদম দেবার বুকের ভেতর তার বুক গেঁথে যায়। যেমন করে বৃষ্টি এসে গেঁথে থাকে মাটির বুকে। দেবা আর মুনিয়ার শ্বাস এক হয়ে আসে। মুনিয়া বলে, দেবা, কতখানি বর্ষা এখানে? আমি আরও বর্ষা দেখতে চাই। এই বলে মুনিয়া দেবার ভেতর ঢুকে পড়ে। দেবার সাদা পাতলা মসলিনের শার্টটির আর অস্তিত্ব নেই। ওটা জলে ভিজে দেবার শরীরে এমনভাবে মিশেছে যে তার ধবধবে ফর্সা বুক ভেদ করে স্তনযুগল দেখা যাচ্ছে। মুনিয়া তার শার্ট খুলে ফেলে। দেবার ঘাড় থেকে অনেক নিচে নেমে আসা চুলগুলো পিঠে লেপ্টে থাকে। যেন গ্রীক থেকে উঠে এসেছে গোমতীর বাঁধভাঙা নদীতে নতুন বীর হারকিউলিস। ওর ভ্রু বেয়ে বেয়ে জল নিচে গড়াচ্ছে। মুনিয়া মুখ ওপরে তুলতেই ওর দুই ভ্রু থেকে দুই ফোঁটা জল মুনিয়ার মুখের ভেতর টুপ করে পড়ে যায়। মুনিয়ারও যেন ব্যাপক তৃষ্ণায় পেয়েছে। সে জলগুলো খেয়ে নেয়। দেবার আরও কাছে ঘেঁষতেই দেবা ওকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। ওর দুই হাতের ওপর যেন মনুষ্য আকৃতির ঘুড়ি। ইচ্ছে করলেই দেবা তাকে আকাশে ছেড়ে দিতে পারে। আবার আকাশ থেকে টেনে বুকের অতলে রেখে ঢেকে দিতে পারে মুনিয়া নামক ঘুড়িকে। দেবা তাকে কোলে রেখেই ওর ঠোঁটের ওপর ঝুঁকে এল। তারপর ওর ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রেখে দেবা বলল, মুনিয়া বৃষ্টি কোথায় হচ্ছে?

ঠোঁটের ভেতর। মুনিয়া বলল।

জলোচ্ছ্বাস চাও? বৃষ্টি আরও নাচুক চাও?

হুম।

কিন্তু তাহলে তোমাকে যে নাচতে হবে? নাচবে?

হুমম, মুনিয়া বলল।

দেবা তার ঠোঁটের ভেতর মুনিয়াকে লুকিয়ে ফেলল। মুনিয়া কোনো হা করতে পারছে না। মুগ্ধ বকুল যেমন ফুটবার আগে তার সমস্ত সুবাস নিয়ে নিজেকে তৈরি করে তেমনি মুনিয়াও যেন এই বৃষ্টিতে ভিজে কলি থেকে ফুল হয়ে যাচ্ছে। সে দুই হাতে দেবার ঘাড় জড়িয়ে ধরে। তার দীঘল চুলের ভেতর ওর দুইহাত ডুবিয়ে দেয়। দেবা চুমু খেয়ে চলেছে পাগলের মতো। মুনিয়ার ঠোঁটে উড়ছে চুম্বনের দেবাপাখি। চুম্বনের নদীতে সাঁতরাতে সাঁতরাতে দেবা আরও গভীরে ডুবে যায়, সে কোল থেকে মুনিয়াকে নামিয়ে তার হাঁটুর ওপর মাথা রাখে। তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়ায়। এরপর সে মুনিয়ার শরীর থেকে ভেজা শাড়ি খুলে ফেলে দেয়।

এক্সব্লেডের রোবো ফেসড হ্যাডল্যাম্পটি হঠাৎ অলৌকিক হয়ে ওঠে। ওর আলোয় মুনিয়ার শরীরের প্রতিটি বাঁকের দেখা পেয়ে পথ হারিয়ে ফেলছে দেবা। সেই সাথে বৃষ্টির জন্য স্পেশাল ক্রয় করা তার রাস্তার রাজা নিউ এক্সব্লেডরেরও যেন দিশা নেই। দেবা রাস্তার ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে। তারপর সে ক্যালেন্ডারের পুরনো পাতা খুলে নতুন পাতা উল্টে দেওয়ার মতো মুনিয়ার পেটিকোট খুলে নেয়, ইলাস্টিকের কুচিওয়ালা পেটিকোটের বন্ধন ছেড়ে ওর ঋজু কোমর দেবার করতলে বন্দি হলো। দেবা মুনিয়ার জঙ্ঘার দিকে নুয়ে পড়ে চিৎকার করে ওঠে, ওহ, অচেনা আমি ভালোই ছিলাম, মুনিয়া কী চেনালে আমাকে তুমি? সে মুনিয়ার জঙ্ঘার ভেতর স্কেচ আঁকার মতো মাথা ঘষে বলতে লাগল এ অসহ্য সুন্দর! এত সুন্দর আমি আমি নিতে পারছি না। আমার সেই ক্ষমতা নেই। এই কথা বলে সে হঠাৎ মুনিয়াকে প্রণাম করে বসে।

মুনিয়া তখন তিরতির করে কাঁপছে। সমস্ত শরীর তার অবশ বিবশ। তার শরীরজুড়ে তখন দেবার নিঁখুত তুলির ছোঁয়া। দেবা তাকে একের পর এক এঁকে চলেছে। আকস্মিক দেবার প্রণাম দেখে সে একটু পেছনে সরে এসে বলল, দেবা, কী করছেন? এ কী, এ কী!

দেবা বলল, তুমি দেবী। দেবীকে প্রণাম করতে দাও। প্রণাম শেষে তার প্রসাদে ধন্য হই।

দেবার এই কথা থাকতেই মুনিয়া দেবাকে টেনে ওপরে তোলে। বৃষ্টিতে ভেজা মুনিয়ার গন্ধমযুগলও যেন জলের দাগ মুছে দেবাকে দেখছে। কী অপূর্ব! বৃষ্টির শাখায় বসে ওরা দূর গ্রহ ছেড়ে দেবার দিকে প্রজাপতির মতো উড়ছে। দেবা টিকতে না পেরে মুনিয়ার ব্লাউজ খুলে ফেলে। ছাতিম ফেটে যাওয়ার মতো ওর ব্লাউজ ফেটে বের হয়ে আসে পৃথিবীর আদিমতম গোলাপি সৌন্দর্য।

ওহ ঈভ! তুমি এখানে? পৃথিবীতে সৃষ্টি হওয়া প্রথম নারী দেবার সামনে দাঁড়িয়ে? পোশাকহীন, আবরণহীন! বৃষ্টির ঝাপটায় জলের ফোঁটাগুলো মুনিয়ার স্তনবৃন্ত বেয়ে গোমতীর গোপন যৌবনে যেন পারমাণবিক বাঁশি বাজাচ্ছে। যেন এখনই বাঁশির সুর বেজে উঠবে আর ইশ্রাফিলের প্রলয়শিঙ্গার মতো পৃথিবীকে ধ্বংস করবে। আজ কে ধ্বংস হবে? মুনিয়া? দেবা? নাকি পৃথিবী? দেবা মুনিয়ার বুকে গজানো আঙুরফুলে তাকিয়ে থাকে। কী মোহময় স্বর্গের উদ্যান! নারীশরীর এত মোহনীয়? দেবার অন্তরজুড়ে ঈশ্বরবন্দনা জেগে ওঠে। এত কান্তিময় নারী আজ সর্বস্ব খুলে আরেক নদীময় জলউদ্যানে দাঁড়িয়ে আছে। যে নদীউদ্যান তার যোনিমুখ খুলে আকাশের জল গোগ্রাসে গিলে নিচ্ছে। আরেকদিকে নারীর যোনিসর্বস্ব সৌন্দর্যে অসহায় এক পুরুষ ছটফট করে মরছে। সে বৃষ্টি হতে চায়। ওই গিরিখাতে ঝরঝর ঝরে বইয়ে দিতে চায় পতনে মৃত্যুর ফল্গুধারা। সে পারে না। এত সৌন্দর্যের কাছে পৌঁছাতে পারে না। এত দীর্ঘ সুন্দর আর আলোকিত লহমার তেজে মুহূর্তেই সে অন্ধ হয়ে যায়। দেবা মুনিয়ার এমন সম্মুখ সৌন্দর্যে বিহ্বল হয়ে পড়ে। যাকে কাছে পাওয়ার এত তীব্র ছটফটানি আজ তাকে কাছে পেয়েও ভয়। তারপর মুনিয়ার জঙ্ঘায় নতজানু হয়ে সে যাবতীয় প্রাক-পুরাণের নারী মনে মনে কল্পনা করল। কিন্তু কোথাও সে মুনিয়ার মতো কাউকে খুঁজে পেল না। অবশেষে সে মুনিয়ার নগ্ন বাহুতে মাথা রেখে দাবি জানাল, দেবী, আমাকে তোমার বুকের কবোষ্ণ ওমে বাঁচিয়ে রাখো… আমার সকল সুখ ও অসুখ তোমার নামে উৎসর্গ করে দিলাম।

মুনিয়া তখন আর নিজেতে নেই।

তার একাকী বিষাদগুলো বৃষ্টি ধুয়ে নিয়ে গেছে। আর বিনিময়ে ঝলোমলো দেবাকে তার বুকে দিয়ে গেছে। সে দেবাকে নিজের কাছে টানতেই দেবা একটু দূরে সরে গেল। মুনিয়া অবাক হলো। দেবা সরে যাচ্ছে কেন? এই বৃষ্টি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দেবা তাকে তার প্রাসাদ থেকে মেঘমল্লার মেদুরে এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন সে কেন দূরে সরে যাচ্ছে? আরেক ব্রহ্মলোকে পাড়ি দিতে চাইছে কেন সে? মুনিয়া এবার শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। তারপর বলে, দেবী ডেকেছ না? আজ মহিষাসুর বধ হবে। এই বলে সে দেবাকে একটানে নিজের ভেতর তুলে আনে। দেবার খোলা আর উদ্দাম বুকের তলে মুনিয়ার মাথা রেখে সে দেবার কোমর পেঁচিয়ে ধরে। দেবার পাঁজরজুড়ে মুনিয়ার সুডৌল স্তনের ছোঁয়া। দেবা কাঁপছে। মুনিয়া টের পাচ্ছে দেবার শরীর টলছে। দেবা বলছে, এ সুন্দর! এ ভয়ংকর সুন্দর! এমন সুন্দর নেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। দেবী, আমি তোমার এই সোনা-প্রান্তরে এক নগণ্য কৃষক। মুনিয়া দেবার ঠোঁট ছুঁয়ে আছে। দেবা অনেক টল বলে সে তার ঠোঁট এগিয়ে নিতে পারছে না। তবুও সে দেবাকে ফলবতী শাখা যেমন করে টেনে আনে তেমন করে দেবার মাথা টেনে এনে তার ঠোঁটের ওপর মুনিয়ার ঠোঁট রেখে দিল। চারঠোঁটের ভেতর তীব্র ছুটোছুটি। ওরা দুজন হৃদয়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। খুব চেনা এই শব্দ। আজীবন চিরন্তন নরনারীরা যেসব শব্দ প্রেমেজলে জন্ম দেয় তেমন শব্দে ওরা হারিয়ে যাচ্ছে।

ওরা ঠোঁটে ঠোঁটে ভালোবাসা পরখ করে। দেবা আরও নিচে নেমে আসে, যেমন জল দৌড়ায় ঢালুপারে। দেবা সেদিকে গড়িয়ে মুনিয়ার মনিকাঞ্চনে তীব্র চুম্বন এঁকে তাকে কোলে তুলে নেয়। তারপর বাঁধের উঁচু ঢিবির ওপর যে জায়গাটি পাঁচিলের মতো সেখানে তাকে বসিয়ে দেয়। বসিয়ে দিয়ে মুনিয়াকে সে দেখছে। অপার বিস্ময় নিয়ে দেখছে।

অক্টোবরের বৃষ্টির মাঝেও দেবার চোখে চাঁদ উঠেছে।

তার চোখ জোড়ায় যুগল চাঁদের জ্যোৎস্না। এমন অপরূপা মুনিয়াকে কুড়িয়ে পাবার আনন্দে সে মুনিয়াকে বলল, মুনিয়া তোমাকে দেখতে দাও। তোমাকে ছুঁয়ে দেখার চেয়ে দেখে ছুঁতে চাই। মুনিয়া পাপড়ির মতো মেলে ধরে নিজেকে। তারপর বলে, দেবা! দেবা! দেবা! আপনি আমার মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। চলুন টস ধরি। আপনি আমাকে ছোঁবেন নাকি আমি আপনাকে ছোঁব? কিন্তু ধরব কী দিয়ে? দুপাশেই আপনি, তারচেয়ে বরং আমি… এই বলে মুনিয়া দেবাকে তার বুকের ওপর টেনে আনে। আপনি আমাকে দেখে ছুঁতে চান এই তো? তা তো হচ্ছে না, যথেষ্ট দেখেছেন। আসুন এইদিকে…

এই বলে মুনিয়া দেবার লম্বা চুলোর মুঠিতে হাত বুলাতে থাকে। ওর চওড়া দু-ঠোঁটের ফাঁকে তার ঠোঁটগুলোকে ভিজিয়ে বলে, এই ঠোঁটগুলো এতদিন খুঁজছিলেন না?

আকাশের জলে যদি মাটি ভিজে যায়, দেবার ঠোঁটগুলো কেন আমাকে পায় না? দেবার কানে মুখ রেখে মুনিয়া ফিসফিস করে বলে, দেবা! তোমাকে ভালোবাসতে চাই… খুব করে চাই তোমাকে আজ! তোমার কানে কানে এই কথাটি বলার জন্য এতদিন অপেক্ষা করে ছিলাম। কবে তোমার সাথে দেখা হবে আর বলতে পারব, দেবা তোমাকে আমি ভালোবাসি।

মুনিয়া আরও বলে, দেবা! নগ্ন নারীর সম্মুখে পোশাক বেমানান। কেন তুমি তোমাকে সভ্য করে রেখেছ? আদিম পরম্পরায় ফিরে গেছি আমি কবেই। তবে কেন তুমি এখনো তোমার করাল চাবুকে জলধর দ্বিখণ্ডিত করছ না? শুধু আকাশ কত ভেজাবে বলো? আকাশ মাটিকেই ভেজাতে পারে, নারীকে নয়। নারীর জন্য গুহামুখো নরের প্রয়োজন। এসো আদিম, এসো, বৃষ্টি অনেক কথা বলে গেছে। বাকি রইলে তুমি। তোমার সমস্ত কথা আমাকে শোনাও। আমি জল, অরণ্যে, স্থলে আমার বিভিন্নতা দেখাই, এসো পুরুষ, আমাকে গ্রহণ করবে এসো।

এই বলে মুনিয়া দেবার ব্লু ডেনিম জিন্স প্যান্টকে ভর্ৎসনা করে। এটাকে এই পৃথিবীর ফালতু ভারবাহী বস্তুর সাথে তুলনা করে সে বলে, এগুলো পৃথিবীর আবর্জনা। এগুলো বর্জ্যের ভাগাড় বলে মুনিয়া দেবাকে তিরস্কার করতে থাকে। দেবা উঠে দাঁড়ায়। তারপর, একটানে খুলে ফেলে তার পরনে থাকা ডেনিমের জিন্স জিপার। সম্পূর্ণ নগ্ন পোশাকহীন দেবা মুনিয়ার চোখের ওপর দাঁড়িয়ে। নিচে শুয়ে আছে অলীক নারী। দ্রাক্ষাময়ী, ভেজা গাত্রে সাজাচ্ছে উষ্ণতার মখমল চূড়ো। দেবা উপুড় হয়ে পড়ে ছাতার মতো মুনিয়ার তীব্র খরতর শরীরে। তারপর তার বুক দিয়ে ঢেকে দেয় মুনিয়াকে। ওর কানের কাছে মুখ টেনে ফিসফিস করে বলে, মুনিয়া শীত লাগছে?

হুম।

বৃষ্টি পড়ছে?

এতক্ষণ পড়েছিল। এখন আর পড়ছে না।

দেবা বলল, এই দেখো আমার শরীর এখন তোমার পোশাক। ঢেকে দিচ্ছি আমাকে দিয়ে তোমাকে। উষ্ণতাও পাবে এখান থেকে। আমার শরীর এখন ছাতার মতো। ঢেকে দিলাম তোমার চুল থেকে নখ পর্যন্ত। আর বৃষ্টি ছোঁবে না তোমাকে।

এরপর দেবা বলে— মুনিয়া, তোমাকে ছুঁতে দেবে?

হুমমমম, আমার এখন শীতার্ত সময়। আমাকে উষ্ণতা দাও। দেবা তার সমস্ত শরীর ঢেলে দেয় মুনিয়ার ওপর। মুনিয়া টেনে নেয় দেবাকে। দুটি শরীর অপূর্ণতার উৎস খুঁজে কখন যে নিজেদের একে অপরের সাথে গেঁথে নিল টেরই পেল না। দেবা পাগলের মতো মুনিয়াকে কাঠঠোকরার মতো ঠোকরাচ্ছে। মুনিয়ার শরীর তখন ফুলের মতো ফুটছে, পাখির মতো কিচিরমিচির করছে, প্রজাপতির মতো দেবার ওষ্ঠের ভেতর ওর বাদামি আঙুর গুঁজে দিচ্ছে। আর দেবা! দেবা! দেবা! বলে সে মরিয়া হয়ে তাকে খুঁজছে।

দেবা তুমি কোথায়?

এই তো এইখানে।

আরও কাছে এসো।

আমি তোমার খুব কাছে আছি, সোনা!

না, আমি তোমাকে পাচ্ছি না কেন?

আমরা মিশে গেছি বলে পাচ্ছ না।

দেবা মুনিয়ার গলা কোমল হাতে চেপে ধরে বলে, সোনা, তুমি পানে বিভোর! আমাকে পান করছ তুমি।

এই দেখ, কেমন করে দুজন দুজনের ঘর খুঁজে নিয়েছি। ওখানে থাকছি। এই শীতার্ত রাতে আমার উষ্ণতা না পেলে তুমি ঠাণ্ডায় জমে যেতে। এই দেখ আবারো ভিজে যাচ্ছি আমরা। তবে এই বৃষ্টি অন্যরকম। আমি বলেছিলাম না, স্বর্গে নিয়ে যাব তোমাকে? ও বাবুই, কোথায় আছ, বলো? এখানে ঘর বুনেছি যে!

মুনিয়া আনন্দের শোর তুলে বলে, আমি দেবার ভেতর আছি। সত্যিকার পৃথিবীতে নেমেছি। যা দেবা ছাড়া ওই পৃথিবীতে যাওয়া অসম্ভব।

দেবা, পরম তৃপ্তি নিয়ে মুনিয়ার কানে কান রেখে বলল, মুনিয়া তুমি খুব সুন্দর! আমার আফ্রো। এসো এই রাত্রির বুকে আবারো শুয়ে পড়ি। এই রাত্রির কোলে মাথা রেখে আমাকে আরও পান করো। এমন পানের দিন কদাচিতই মিলবে। তুমি এই সময় নষ্ট করো না মুনিয়া! আমি বহন করতে চাই অনন্ত তোমাকে। এই বলে দেবা মুনিয়ার কোমল বুকে আবার পানকৌড়ির মতো ডুবে গেল।

মেঘ কবেই সরে গিয়েছে। বৃষ্টি নেই। অক্টোবরের এই সময়ে আকাশে কখন যে চাঁদ উঠেছে ওরা বুঝতে পারেনি। বেড়িবাঁধের দেয়ালের ওপর যখন আস্ত চাঁদটি উঁকি দিল অমনি মুনিয়া বলল— বাহ, কী সুন্দর!

দেবা তার ঠোঁট দিয়ে মুনিয়ার ঠোঁট চেপে ধরে বলল— না! তোমার চেয়ে আর কিছু সুন্দর নেই মুনিয়া।

তুমি অভিনব সুন্দর। সুখে বিভোর মুনিয়া তখন দেবার গলায় দু-হাত রেখে বাদুরঝোলার মতো ঝুলে রইল।

 

Read Previous

জীবনের মর্মকথা

Read Next

দাঁড়ানো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *