অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
মে ১৮, ২০২৪
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
মে ১৮, ২০২৪
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অনুবাদ- সোহরাব সুমন -
বোক্কাচ্চো’র বিখ্যাত নারীর ভূমিকা ও ক্লেওপাত্রার জীবনী
গাইডা র্আমস্ট্রং

জোভান্নি বোক্কাচ্চোর “অন ফেমাস ওমেন১ দে মুলিয়ারিবুস ক্লেরিস” মধ্যযুগের এমন একটি বিখ্যাত সৃষ্টিকর্ম যেখানে একাধারে মিথ ও জানা ইতিহাসের, ঈভ থেকে শুরু করে বোক্কাচ্চোর সমকালীন নেপলসের রানি প্রথম জোভান্নাসহ, ভালো ও মন্দ মিলিয়ে সর্বমোট একশত ছয়জন লব্ধপ্রতিষ্ঠ মহিলার জীবনী স্থান পেয়েছে। এ পর্যন্ত রচিত নারী জীবনীগ্রন্থসমূহের মাঝে এটিই সর্বপ্রথম। ইতালীর ফ্লোরেন্স রাজ্যের চিরতাল্দো নগরে বসবাসকালীন ১৩৬১-৬২ সাল পর্যন্ত সময়ে বোক্কাচ্চো অমূল্য এই নারী জীবনী সংগ্রহ গ্রন্থটির গ্রন্থনা করেন এবং ১৩৭৫ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে এর পুনর্লিখন অব্যাহত রাখেন।

এই গ্রন্থটি তিনি নেপলস রাজ্যের আলতাভিল্লা নগরের ধনাঢ্য অভিজাত ব্যক্তিত্ব ও রানি প্রথম জোভান্নার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক নিকোলো আচেউওয়ালীর বোন কাউন্টেস তথা কোন্তেস্সা আন্দ্রেয়া আচেইওয়ালীকে উৎসর্গ করেন। এই গ্রন্থের মুখবন্ধে লেখক উল্লেখ করেছেন যে বিখ্যাত সব ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে বাঘা বাঘা লেখকেরা বেশকিছু সংখ্যক জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন এবং উদাহরণসরূপ তার শিক্ষক পেত্রাক্কা রচিত “লাইভস অব ফেমাস ম্যান- দে ভিরিস ইল্যুসত্রিবুস”-এর কথা উদ্ধৃত করেন। তারপরও নিঃসন্দেহে একথা বলা যায় যে, নারীদের জন্য এ ধরনের কাজ তার আগে কেউই করেননি। ফলে পূর্বেকার কোনো জীবনী গ্রন্থে নারীদের অনুপস্থিতির কারণেই নৈতিক উদাহরণ ও বিনোদনপাঠ এই উভয় প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে বোক্কাচ্চোকে প্রাচীনকাল হতে শুরু করে তার সমকাল পর্যন্ত বিস্তৃত বৈচিত্র্যের নারী চরিত্রসমূহের জীবনী সংগ্রাহাকারে তার এই একক গ্রন্থে উপস্থাপনের বিশেষ প্রয়োজন দেখা দেয়। বিদগ্ধ পাঠক সমাজের কাছে সেরা লেখক হিসেবে পরিচিত “দেকামেরন”-এর রচয়িতা বোক্কাচ্চো, ইতোমধ্যে তার এই কালজয়ী সাহিত্যকর্মে আনন্দভিলাষী অভিজাত তরুণী “লিতা ব্রিগাতা” সমূহের মধ্য থেকে এবং তাদের গল্পের বিভিন্ন চরিত্রেম মাধ্যমে নারীদের চিত্রিত করে গেছেন।

কিন্তু তার এই জীবনীসমূহে- ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় জীবন; রাজনীতি ও ব্যক্তিগত জীবন; খ্যাতি, সুকৃতি ও পার্থিব ক্ষমতা; সুযোগ ও প্রতিকূলতা; নারীর চরিত্র, সদ্গুণ ও কদভ্যাস; তাদের সামাজিক ভূমিকা, স্বতন্ত্র প্রতিভা ও কৃতিত্ব; ইত্যাদি রেনেসাঁ মানসহ আরও অনেক গুরুতর বিষয়ের অবতারণার সন্ধান পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যে এটি নারী জীবনীগ্রন্থের আদিউৎস। এর রয়েছে সুদীর্ঘ ও অনন্য প্রকাশনাবৃত্তি এবং সাহিত্য প্রভাব। চৌসা’র “ক্যানাবেরি টেল”, খিস্টিন দে পিজা’র “লিভো দো লে সিতে দে দাম”, এবং স্পেন্সার, আলোনসো দে কার্তাঘেনা ও থমাস এলিয়ট প্রমুখের সাহিত্যকর্মে যার প্রভাব খুবই সুস্পষ্ট।

এ ধরনের একটি রচনা গ্রন্থের কারণ তিনি তার মুখবন্ধে তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থের মুখবন্ধসহ তার সংগৃহিত জীবনীসমূহের মাঝ থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত নারী চরিত্র ক্লেওপাত্রার জীবনী অংশটুকু নিচে পাঠকদের জন্য বাংলা অনুবাদ আকারে উপস্থাপন করা হলো-
মুখবন্ধ (উদ্ধৃতি)

বহুদিন আগে, কয়েকজন প্রাচীন লেখক বিখ্যাত অনেক ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে সঙ্কলন রচনা করেছিলেন; আমাদের সময়, প্রথিতযশা ব্যক্তি এবং বিশিষ্ট কবি, আমার শিক্ষক ফ্রঞ্চিস্কো প্রেত্রাক্কা, এর চেয়ে বিস্তৃত পরিসরে এবং অধিকতরো সতর্কতার সহিত একটি সৃষ্টিকর্ম রচনায় রত আছেন; এবং সঙ্গত কারণেই তাই: যারাই তাদের সমস্ত প্রেরণা, সম্পদ, শোণিত, ও আত্মা নিয়োজিত করে- যখন পরিস্থিতি দাবি করে- স্মরণীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে অন্যদের ছাপিয়ে যান তাদের নাম অবশ্যই চিরদিনের মতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের স্থায়ী স্মৃতিতে রেখে দেবার উপযুক্ত।

তারপরও আমি বিস্মিত, যে এই প্রকারের লেখকদের দ্বারা মহিলারা খুব কম উল্লেখ হওয়ায় আলাদা করে উৎসর্গীকৃত কোনো সৃষ্টিকর্মে তারা স্মরিত হননি, এমনকি, সুদীর্ঘ কালের ঐতিহাসিক রচনাসমূহ থেকে এটা স্পষ্ট হবার পরও যে সুনির্দিষ্ট নারীরা সাহসিকতা ও শক্তিপ্রয়োগ এই উভয় উপায় অবলম্বন করে কিছু কর্মযজ্ঞ সুসম্পন্ন করেছিলেন।

যে পরাক্রম পুরুষদের দেয়া হয়েছে তার সাহায্যে মহান সব কর্মযজ্ঞ সুসম্পন্নের জন্য যদি তাদের মর্যাদা দান করতে হয়, (যেহেতু, অন্তত নারীদের প্রায় সবারই প্রাকৃতিকভাবেই একটি সহজাত কোমলতা, একটি দুর্বল শরীর এবং ধীর বুদ্ধিমত্তা রয়েছে) যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা আর অসামান্য সহসিকতার সহিত এবং এমনকি পুরুষদের জন্য অর্জন ও স্পর্ধা দেখানো ভীষণ দুরূহ এই উভয় গুণসহ তারা এমন একটি পুরুষালি মন প্রদর্শন করেন, তাহলে সেই নারীদের কতটা অধিক প্রশংসা করা উচিত?

সুতরাং, অন্তত এইসব মহিলাদের যা কিছু প্রাপ্য ছিল তা থেকে তাদের ঠকানো হলেও, একক কাজের জন্য আজও স্মরণীয় তাদের সেসব অর্জনের প্রতি সম্মান জানাতে সেই নারীদের গল্পগুলো বলে বেড়াতে এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। এই অসংখ্য নারীদের মাঝ থেকে যারা তাদের দুঃসাহসিকতা, মানসিক সক্ষমতা, নিরলস প্রচেষ্টা, সহজাত গুণাবলির কারণে বিখ্যাত অথবা ভাগ্য যাদের প্রতি আনুকূল্য বা প্রতিকূলতা প্রদর্শন করেছে, তাদের মাঝ থেকেও আমি এই কজনকে যুক্ত করছি। নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য খ্যাতিমান হবার যোগ্য বলে বিবেচিত না হলেও, মহান সব কর্মযজ্ঞে প্রেরণা যুগিয়েছেন, এমন কজনকেও আমি যোগ করেছি।

আমি চাই না, মিদিয়া,২ ফ্লোরা,৩ সেপ্রোনিয়া,৪ এবং এ ধরনের যারা শক্তিশালী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হবার পরও ছিলেন ধ্বসংত্মক, এদের সঙ্গে এই একই সৃষ্টিকর্মে, পেনেলোপি,৫ লুক্রেসিয়া,৬ সুপিচা,৭ সবচেয়ে পবিত্র সব মাত্রিকাদের নাম উল্লেখ হবার পর পাঠকদের কাছে এই নামগুলো অপরিচিত বলে মনে না হোক। বিখ্যাত পদবাচ্যটিকে সর্বদা সুকৃতির ক্ষেত্রেই কেবল প্রয়োগ করা হয়নি কেননা এই শব্দটিকে যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করা আমার লক্ষ্য নয়, বরং আমার পাঠকদের সঙ্গে সংগতি রেখে একে আরও বৃহত্তর অর্থে গ্রহণ এবং বিশ্বব্যাপী যে কোন রকম কীর্তির কারণে আমি যাদের মুগ্ধতার বিষয় স্বরূপ স্বীকৃতি দিয়েছি তাদেরও বিখ্যাত বলে বিবেচনা করতে এর ব্যবহার হয়েছে।

পড়তে বসে প্রায়ই আমার, বিদ্রোহী গ্রাৎসি (Γκράτσι),৮ বিভ্রান্ত আন্নিবাস (Αννιβάς),৯ বিশ্বাসঘাতক উগুর্তা,১০ সুল্লা ও ম্যারিউস আর এদের সঙ্গে সমকালীন যে সকল নাগরিকদের রক্তে তাদের হাত রাঙানো ছিল,১১ ক্রাসুস যিনি ধনাঢ্য ও লোভী দুইই ছিলেন,১২ এবং লিওনিদাস (Λεωνίδας),১৩ স্কিপিয়ন (Σκιπίων),১৪ ক্যাতো (Κάτω),১৫ এবং ফাব্রিকিউসদের,১৬ মধ্য হতে অন্যান্য সকল অভিজাত ব্যক্তিদের কথা মনে পড়ে।

প্রকৃতপক্ষে, স্মরণযোগ্য প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ডসমূহের সঙ্গে তুলে ধরতে এবং কখনও কখনও অবর্ণনীয় সীমা লঙ্ঘনগুলোকে কতগুলো ভর্ৎসনার আড়ালে চাপা দিয়ে সম্মানিত লোকেদের কেবল গৌরব অর্জনেই উদ্ধুদ্ধ করবে না বরং,কিছুটা হলেও তা দুষ্ট লোকেদের লাগামগুলোকে আঁটসাঁট করবে এবং তাদেরকে তাদের মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখবে। উপরন্তু, এই কৌশল মহিলাদের কিছু লজ্জাজনক আচরণের বিনিময়ে হলেও আমার মন্ত্রমুগ্ধ করবার কর্মটিকে পুনরুদ্ধার করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে। সুতরাং, কোনো কোনো কাহিনিতে পুণ্য অর্জনের কিছু মার্জিত প্রলোভনের পাশাপাশি অপরাধ এড়াতে ও ঘৃণা পরিহারের কিছু তাড়না যুক্ত করতে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। আর তাই, এমনই হওয়া উচিত যাতে গল্পগুলোর ভেতরকার মজা সহকারে বিশুদ্ধ কল্যাণ চুপিসারে পাঠকের মনে প্রবেশ করতে পারে।

ক্লেওপাত্রা, মিশরের রাণী
ক্লেওপাত্রা ছিলেন বিশ্বব্যাপী পরিচিত একজন মিশরীয় নারী। যদিও লাগুস (Λάγους) পুত্র, ম্যাকিদোনীয় তলেমির থেকে শুরু করে রাজাদের এক দীর্ঘ সারি অতিক্রমের পর তিনি ক্ষমতায় আসেন এবং তিনি ছিলেন তলেমাওস নেওস দিওনিসোসের১৭ অথবা কেউ কেউ বলে, রাজা মিনোসের (Μίνως) কন্যা, তা সত্ত্বেও তিনি অপরাধের মাধ্যমে তার রাজত্ব অর্জন করেছিলেন। বাস্তবে তার বংশপরিচয় এবং তার সৌন্দর্য ছাড়া বলতে গেলে অন্য কোনেকিছুর জন্যই তিনি তেমন একটা উল্লেখযেগ্য ছিলেন না। বরং, তার লোলুপতা, নিষ্ঠুরতা, ও অমিতাচারের জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত ছিলেন।

আমরা তার রাজত্বের শুরুর গল্পটা তুলে ধরি যখন, কেউ কেউ বলে, ইউলিওস কেসারাসের প্রথম কনসালশিপের সময়১৮, রোমান জনতার প্রতি খুবই বন্ধুত্বসুলভ, দিওনিসোস বা মিনোস, তার জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে, তিনি এক ইচ্ছেপত্রে এই ঈঙ্গিত করেন যে, তার মৃত্যুর পর, তার পুত্রদের মাঝ থেকে বড়ো জন, যাকে কোনো কোনো সূত্র লুসানিয়াস (Λυσανίας) বলে উল্লেখ করেছে, তার দুই কন্যার মাঝ থেকে বড়ো জন, ক্লেওপাত্রাকে বিয়ে করার পর, তার সঙ্গে একত্রে রাজত্ব করা উচিত। এই নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছিল কারণ, মিশরীয়দের মাঝে, শুধু মায়েদের ও বোনদেরকে বিয়ে থেকে বাদ দেয়ার লজ্জাজনক রীতিটি সচরাচরই ঘটতে দেখা যাচ্ছিল। পরে, ক্লেওপাত্রা, শাসন করবার আকাঙ্ক্ষায় অন্ধ হয়ে, কথিত আছে পনের বছর বয়স্ক নিষ্পাপ বালক, তার ভাই ও স্বামীকে বিষ প্রয়োগ করেন (এর কোন সাক্ষি নেই), এবং রাজত্বটিকে নিজের করে নিয়েছিলেন। সূত্রসমূহ একমত যে, পোম্পেয়ুস ম্যাগনুস তার সেনাবাহিনীর সাহায্যে প্রায় সমগ্র এশিয়া দখল করে, মিশর গমন করেন এবং ক্লেওপাত্রার বেঁচে থাকা ভাইকে প্রতিস্থাপন করেন এবং তাকে মিশরের রাজা করেন। ক্লেওপাত্রা এতে ক্ষিপ্ত হয়ে, তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন।

বাস্তবতা ছিল এই যে, থেস্সালিয়া (Θεσσαλία) থেকে বিতাড়িত পোম্পেই, মিশরীয় বেলাভূমিতে এমন এক বালকের দ্বারা নিহত হন যাকে তিনি রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। পোম্পেইর পর কায়জার উপস্থিত হলে, এই দুজনকে নিজেদের মাঝে যুদ্ধরত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি যখন তাদেরকে তাদের অভিযোগের সপক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তার সামনে উপস্থিত হবার নির্দেশ দেন ‘আমি তলেমিকে পদচ্যুত করব’। ক্লেওপাত্রা, নিজের প্রতি অত্যন্ত আস্থা নিয়ে, তার রাজকীয় পোশাক পরে হাজির হন এবং নিশ্চিত ছিলেন যদি বিশ্বজয়ী ব্যক্তিটিকে তিনি প্রলুব্ধ করতে সক্ষম হন তাহলে এই রাজত্ব তারই হবে। তিনি ছিলেন ভীষণ সুন্দরী এবং তার ঝলকানো চোখ আর বাকপটুতার সাহায্যে চাইলেই যে কাউকে প্রায় মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলতে পারতেন, তাই খুব একটা কসরত ছাড়াই তিনি কামুক শাসককে তার বিছানায় আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। অসংখ্য রাত্রি জুড়ে, এ্যালেকসান্দ্রিয়া ভীষণ বিশৃঙ্খলার মাঝে ডুবেছিল, এবং সাধারণভাবে তা সয়েও গিয়েছিল, এমন এক পরিস্থিতিতে, তিনি তার মাধ্যমে গর্ভে একটি পূত্র সন্তান ধারণ করেন, পরে ওর পিতার অনুকরণে, তিনি যার নাম রেখেছিলেন ক্যাসারিয়ন।

অবশেষে, তরুণ তলেমি, কায়জার কর্তৃক মুক্ত হয়ে, তার সমর্থকদের তাগাদায় নিজ মুক্তিদাতাকে আক্রমণ করে বসেন, এবং, ব-দ্বীপে, তিনি পেরগামোনের (Πέργαμον) মিথরাদাতেসের মুখোমুখি হন, যিনি কায়জারকে সমর্থন জানাতে আসছিলেন। সেখানে তিনি কায়জারের কাছে পরাজিত হন, যিনি সেখানে তার আগমনের কথা আঁচ করতে পেরে, অন্য পথে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তলেমি ছোট্ট একটি নৌকায় করে পালাবার চেষ্টা করলে, ওর পাটাতনে যারা বিক্ষপ্ত ছুটোছুটি করছিলেন তাদের ওজনে সেটা ডুবে যায়। এভাবে শান্তি স্থাপন এবং এ্যালেকসান্দ্রীয়েরা আত্মসমর্পণ করলে, পন্তুর (Πόντου) রাজা ফারনাকেস (Φαρνάκης) কে, যিনি পোম্পেইকে সমর্থন করেছিলেন, কায়জার আক্রমণ করতে উদ্যত হন। যে রাতগুলো তিনি তার সঙ্গে অতবাহিত করেছেন এবং তার প্রতি অনুগত থাকায় উপহারস্বরূপ, তিনি ক্লেওপাত্রাকে, মিশরের রাজত্ব উপহার দেন, কেননা, এর বাইরে সে তার কাছে আর কিছুই কামনা করেনি। এবার ক্লেওপাত্রা শাসক, তার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ হতে পারে, এই আশঙ্কায় কায়জার তার বোন আরসিনয়ে কে সঙ্গে নিয়ে যান।

এভাবে, ক্লেওপাত্রা, যিনি এক দ্বৈত অপরাধের মাধ্যমে তার রাজত্ব অর্জন করেছেন, এবার তিনি নিজেকে আরাম আয়েশে নিরত করে, বলতে গেলে, প্রাচ্য রাজেদের বারাঙ্গনায় পরিণত হন। সোনা আর জহরতে অভিলাষী হয়ে, এসবের জন্য তিনি কেবল তার প্রেমিকদের প্রতি তার অপনোদন কৌশল প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং এটাও বলা হয়ে থাকে যে তিনি মিশরীয়দের মন্দির আর তীর্থস্থান সমূহের যাবতীয় পাত্রাদি, প্রতিমূর্তি আর ভাণ্ডারের সবকিছু হরণ করতে থাকেন।

এরপর, সিজার হত্যাকাণ্ড এবং ব্রুতুস ও ক্যাসসিউসের পরাজয়ের পর, আন্তোনির সিরিয়া গমনের সময় তিনি নিজেকে তার সামনে উপস্থিত করেন। খুব সহজেই তিনি এই দুরুচার ব্যক্তিটিকে তার রূপ ও প্রেমবিলাসী নয়ন দ্বারা মোহিত করেন আর এই নরাধমকে তার প্রেমে এতটাই মোহগ্রস্ত করেন যে ক্লেওপাত্রা, যিনি বিষ প্রয়োগে তার ভাইকে হত্যা করেছিলেন, নিজ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে একমাত্র হুমকি অপসারণে, আন্তোনির সাহায্যে তিনি তার বোন আরসেনয়েকে হত্যা করান। এই অপরাধ সংগঠিত হয় এফিসোসে (Ἔφεσος) অবস্থিত দিয়ানার মন্দির নামে পরিচিত আর্তেমিদার (Αρτεμίδα) মন্দিরে, যেখানে হতভাগা মেয়েটি পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় ভিক্ষা করছিলেন। ঘটনাটি এমন ছিল যেন ক্লেওপাত্রা তার প্রেমিকের কাছ থেকে একটি বলি গ্রহণ করলেন: তাদের ব্যভিচারের প্রথম ফল।

এবং যেহেতু এই দুষ্টা নারী আন্তানির স্বভাব-চরিত্র সম্বন্ধে জানতেন, তিনি তার কাছ থেকে সিরিয়া ও এরাবিয়ার রাজত্ব চাইতে মোটেই শঙ্কিত ছিলেন না। আন্তোনির কাছে এটি প্রকৃতপক্ষেই অত্যধিক এবং সম্পূর্ণভাবে অনুচিত মনে হলেও, তিনি তার প্রিয়তমের ইচ্ছে পূরণে, উভয় রাজ্যের সামান্য হিস্যা এবং এছাড়াও, সিদোন (Σίδον) ও তাইয়ের বা তীরোস (Τύρος) নগর বাদে এলেথেরোস (Ελεύθερος) নদী ও মিশরীয় সীমান্ত মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত সিরীয় উপকূলের সকল নগর তাকে প্রদান করেন।

এই সমস্ত অঞ্চল বুঝে পাওয়ার পর, তিনি আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে আন্তোনির অভিযান পরিচালনার সময় অথবা যেমনটা কেউ কেউ বলতে পছন্দ করেন, পার্থীয়দের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময়, তিনি তাকে ইউফ্রাতিস (Εὐφράτης) পর্যন্ত অনুসরণ করেন। সিরিয়া হয়ে মিশর ফিরে আসার পথে, তিনি আন্তিপিতর পূত্র, সেই সময়কার ইহুদিরাজ ইরোদিস (Ἡρῴδης) দ্বারা অমিতভাবে আপ্যায়িত হন। এসময় সঞ্চারিকাদের মাধ্যমে, একথা বলতে তিনি মোটেই লজ্জাবোধ করেননি যে, তার সঙ্গে বিছানায় গেলে, তিনি রাজি থাকলে, পুরস্কারস্বরূপ সে জুদেয়া রাজত্ব গ্রহণ করবেন, খুব বেশিদিন হয়নি আন্তোনির সহয়তায় ইরোদিস যা পুনরুদ্ধার করেছিলেন।

কিন্তু ইরোদ জানতেন সে কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে এবং আন্তোনির প্রতি সম্মানেরখাতিরে, কেবল প্রত্যাখ্যানই নয় বরং, আন্তোনিকে এ ধরনের এক কুখ্যাত নষ্টামতির থেকে মুক্ত করতে এমনকি তার তরবারির সাহায্যে হত্যা করতে উদ্যত হলেও, তার বন্ধুরা এর বিরোধিতা করতো না। ক্লেওপাত্রা, সত্যিকার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলে, ভান করেন যেনো সে তাকে ইয়েরিখো (Ιεριχώ) থেকে অতিরিক্ত আয়ের কোনো ঠিকা দিতে চেয়েছিলেন, বালসামো (βάλσαμον) ছিল যেখানকার দেশীয় সুগন্ধীতরু। পরে, তিনি এই গাছটি মিশরীয় ব্যাবিলনে এনে রোপন করেছিলেন, সেখানে তা আজো জন্মে। এরপর, ইরোদের কাছ থেকে দুর্দান্ত এই উপহার গ্রহণ শেষে তিনি মিশর ফিরে আসেন।

এর কিছুদিন বাদে, পার্থীয়দের কাছ থেকে পালায়ন করে আন্তোনির ফিরে আসার পর, তলব করা হলে তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আন্তোনি প্রয়াত তিগরানিস ও ম্যাগাস (Τιγράνης ὁ Μέγας) পুত্র আর্মেনীয় রাজ আর্তাবাজদি (Արտավազդ/Άρταβαζντ) কে তার সন্তান-সন্ততি ও অধস্তন শাসনকর্তাদেরসহ বন্দী করেন।১৯ তিনি গুপ্তভাণ্ডারে রক্ষিত অঢেল ধন-সম্পদ লুট করেন এবং রাজাকে রূপোর শেকলে বেঁধে টেনে আনেন। ধনল্পিসু ক্লেওপাত্রাকে তার আলিঙ্গনে প্রলুব্ধ করতে, সে উপস্থিত হলে পরে লুণ্ঠিত মালামালসহ তার রাজকীয় সকল সাজ-সজ্জায় সজ্জিত বন্দী রাজাকে তিনি নারীসুলভভাবে তার হাতে তুলে দেন। এই অর্থলোলুপ নারী, উপহারে আনন্দিত হয়ে, তার ব্যগ্র প্রেমিককে এতটাই কৃতজ্ঞচিত্তে জাপটে ধরেন যে, তিনি অক্তাভিয়ানের বোন অক্তেভিয়াকে তালাক দেন এবং তার সকল আবেগসহ এমনভাবে তার সঙ্গে যোগ দেন যেন ক্লেওপাত্রা তার নিজ স্ত্রী।

আমি এরাবিয়ান যতো তৈলাক্ত প্রসাধন, সাবেয়ান সুগন্ধি ধূপ আর সুরার মত্ততার কথা উল্লেখ করবো না, যা এই পেটুকের অবিরাম অপব্যয়ী ভোজ উপভোগ করাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করতো। এরপর তিনি ক্লেওপাত্রার কাছে জানতে চাইলেন, যেন তিনি এই নারীর ভোজকে আরও অলঙ্কৃত করতে ইচ্ছুক, তাদের এই প্রত্যাহিক ভোজে আর কী বৈভব যুক্ত করা যেতে পারে। জবাবে এই অসতী নারী বলেন যে, সে যদি তিনি চান, দিনের একটি প্রধান ভোজনে এক কোটি সেস্তেরতিউস ব্যয় করবে। এটা কখনই করা হবে না আন্তোনির এরকম বিশ্বাসের পরও তা দেখতে ও উপভোগ করতে তিনি ভীষণ আগ্রহী ছিলেন, তাই তারা এটি নিয়ে বাজি ধরে বসেন এবং এর বিচারক হিসেবে লুচুস প্ল্যাঙ্কুসকে মনোনিত করেন।২০

পরদিনের, ভোজ সাধারণ খাবারকে ছাপিয়ে না গেলে, আন্তোনি ক্লেওপাত্রার দাবি নিয়ে হাসাহাসি শুরু করলে, ক্লেওপাত্রা তার দাসদের সবশেষের পদগুলো আনতে বলেন। এ ব্যাপারে তাদের আগে থেকেই বলে রাখা হয়েছিল এবং তাকে এক গ্লাস খুব কড়া সিরকা এনে দেয়া হয়। ক্লেওপাত্রা তৎক্ষণাৎ তার এক কান থেকে অমূল্য একটি মুক্তো খুলে নেয় (প্রাচ্য কায়দায় তিনি অলঙ্কার হিসেবে এটা ওখানে পরে ছিলেন), তিনি এটা সিরকায় দ্রবীভূত করেন এবং যখনই এটা গলে যায় তিনি তা পান করেন। যখন সে অপরটির গায়ে হাত রেখে, যা ছিল সমমূল্যের আর তার অপর কানে পরা ছিল, প্রায় একই কাজ করতে যাচ্ছিলেন, কালবিলম্ব না করে লুচুস প্ল্যাঙ্কুস ঘোষণা করেন যে আন্তোনি হেরে গেছেন এবং ক্লেওপাত্রা জিতে যাবার কারণে, দ্বিতীয় মুক্তোটি রক্ষা পেয়েছিল। পরে, এই মুক্তোটি আধাআধি করে কাটা হয় এবং রোমে পানথেইউনের (Πάνθειον) কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে এটি ওয়েনুসের মুর্তির কানে স্থাপন করা হয়। তারও বহুদিন পর, ক্লেওপাত্রার ভোজের অর্ধেকের প্রমাণস্বরূপ তা দর্শকদের সামনে প্রদর্শন করা হয়।

কিন্তু রাজ্যের জন্য অতৃপ্ত এই নারীর লোভ প্রতিদিন বাড়তে থাকে, সবকিছু একত্রে জড়ো করবার ইচ্ছেতে, সে আন্তোনিকে বলে, যিনি তখন ছিলেন বদ্ধ মাতাল এবং সম্ভবত সবে অসমাপ্ত একটি ভোজ থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন, রোমান সাম্রাজ্যের জন্য, যেন তা দেবার ক্ষমতা আন্তোনির ছিল। যেহেতু মনের দিক থেকে তিনি ধাতস্থ ছিলেন না এবং নিজের বা রোমানদের ক্ষমতা আমলে না নিয়েই, তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তা তাকে প্রদান করবেন।

হায় খোদা, প্রতিশ্রুতিদানকারী এই ব্যক্তির নিবুদ্ধিতা যিনি এটা চেয়েছিলেন তার হঠকারিতার চাইতে কোনো অংশেই কম ছিল না! একজন ব্যক্তি কতটা উদার হতে পারে! যে সাম্রাজ্যের জন্য বহু শতাব্দী জুড়ে প্রচেষ্টা অব্যহত ছিল, সঙ্গে এমনই সব প্রতিবন্ধকতা, সঙ্গে এতো এতো রক্তপাত এবং একইভাবে আরও অসংখ্য লোকসহ অগণন অভিজাত ব্যক্তির মৃত্যু, সঙ্গে অগণিত অসামান্য সাফল্য, সঙ্গে সংগঠিত অসংখ্য যুদ্ধ, দ্বিতীয়বার চিন্তা ব্যতিরেকে চাহিবামাত্র তিনি সেই আস্ত একটি সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ এক নারীর হাতে ছেড়ে দেন, যার সঙ্গে তার নিজের মামুলি ছোট্ট একক একটি বাড়ির মালিকারা তুলে দেয়ার কোনো পার্থক্য ছিল না।

কিন্তু তারপর? এরইমধ্যে, অক্তেভিয়াকে তালাক দেবার কারণে, অক্তাভিয়ান ও আন্তোনির মাঝে যুদ্ধের বীজ বপিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। ফলে, এমন ঘটেছিল যে, যখন উভয় পক্ষের সেনাদল সমবেত হয় তারা যুদ্ধের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে।

কিন্তু আন্তোনি ও ক্লেওপাত্রা ইপিরোস (Ήπειρος) গিয়ে সোনা আর তার সঙ্গে ময়ুরপঙ্খীবর্ণের পাল দ্বারা তাদের বহর সজ্জিত করেন। সেখানে তারা শত্রুর মুখোমুখি হলে, একটি স্থল যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, এবং পরাজিত হলে পিছিয়ে আসেন, এরপর আন্তোনির লোকেরা তাদের স্ব স্ব জাহাজে ফিরে যায় এবং সাগরে একটি নৌযুদ্ধে নিজেদের ভাগ্য যাচাইয়ের জন্য আকতিউম রওনা হয়। অক্তাভিয়ান তার শ্যালক আগ্রিপ্পার সঙ্গে মিলিত হয় এবং তাদের বিশাল নৌবহর নিয়ে তারা অসীম সাহসিকতার সঙ্গে আক্রমণ করে। এক সময় যুদ্ধ শুরু হলে, প্রচণ্ডভাবে সমান সমান উদ্যামে সেই লড়াই চলতে থাকে এবং কিছু সময়ের জন্য ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অবশেষে, যখন আন্তোনির লোকেরা আত্মসমর্পণ করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল, উদ্ধত ক্লেওপাত্রা, তাদের সবার প্রথমে, সঙ্গে বাড়তি ষাটখানা জাহাজসহ, স্বর্ণাভ জাহাজ যাতে সওয়ার হয়ে তিনি যাত্রা করেছিলেন তাতে করে পলায়ন করেন। আন্তোনি তৎক্ষণাৎ, প্রধান জাহাজ থেকে তার তকমাসূচক পতাকা নামিয়ে ক্লেওপাত্রার পিছু নেন। মিশর পৌঁছাবার পর, নিজেদের সঙ্গে একত্রে থাকা শিশুদের লোহিত সাগরে পাঠিয়ে দেবার পর, তারা রাজত্বের প্রতিরক্ষায় বৃথাই তাদের সৈন্যবাহিনী বিন্যস্ত করেন।

কেননা বিজেতা অক্তাভিয়ান তাদের পিছু নিয়েছিলেন এবং বহু সংখ্যক যুদ্ধ জিতে তাদের পরাক্রম খর্ব করেছিলেন। যখন তারা শান্তি স্থাপনের জন্য একটি বিলম্বিত অনুরোধ পেশ করে, তা প্রত্যাখ্যাত হয়। আন্তোনি আশাহত হয়ে পড়েছিলেন, বহু তথ্যসূত্রে যেমনটা উল্লেখ রয়েছে, এবং রাজকীয় মৌসলিউমে প্রবেশ করে, তার তরবারির সাহায্যে আত্মহত্যা করেন।

এ্যালেকসান্দ্রিয়া হস্তগত হলে, তরুণ অক্তাভিয়ানকে মন্ত্রমুগ্ধ করতে, ক্লেওপাত্রা তার পুরাতন আকর্ষণীয়তা সমূহ ব্যবহারের ব্যর্থ চেষ্টা করেন, যেগুলোর সাহায্যে তিনি কায়জার ও আন্তোনিকে বশ করেছিলেন। তার বিজয় শোভাযাত্রায় তাকে জীবন্ত উপস্থিত রেখে প্রদর্শন করবার স্পর্ধা এবং মুক্তির নিরাশায় ক্লেওপাত্রা ক্ষুব্ধ হয়ে নিজেকে রাজকীয় লেবাস পরান এবং তার আন্তোনিকে অনুসরণ করেন। নিজেকে তার পাশে রেখে, সে তার হাতের শিরাগুলি উন্মুক্ত করেন এবং মারা যাবার স্থিরসংকল্প নিয়ে সেই ক্ষতে বিষাক্ত সাপ রাখেন। কেউ কেউ বলে, এইসব সাপ ঘুমের সঙ্গে মৃত্যু নিয়ে আসে। আর তাই, ঘুমের মাঝে নিশ্চিন্তে ভাগ্যহত এই নারী তার লোভ, তার কামুকতা, এবং তার জীবনের ইতি টানেন, যদিও অক্তাভিয়ান তাকে পুনরায় জীবিত করতে চেষ্টা করেন, তার বিষক্ষতগুলোর যত্ন নিতে, সময় মতো সিলি (সাপুড়ে) ডাকতে পারলে, তা সম্ভব হতে পারতো।

তারপরও, এমন অনেকেই ছিল, যারা বলেছিলেন যে সে অনেক আগেই মারা গেছে এবং অন্যভাবে। তারা বলে যে, আন্তোনি, আকতিউম যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের সময়, ভয় পাচ্ছিলেন যে তিনি ক্লেওপাত্রাকে সন্তুষ্ট করতে পারছেন না। এই কারণে, পরীক্ষার আগ পর্যন্ত তিনি খাবার বা পানীয় গ্রহণ হতে বিরত থাকেন। ক্লেওপাত্রা এটা জানতে পেরে, তার কাছে নিজের বিশ্বস্ততা প্রমাণ করতে, ফুল নিয়ে, এর সাহায্যে, আগের দিন, তাদের মুকুটগুলো শোভিত করে, নিজের মাথায় স্থাপনের আগে বিষে ডুবিয়ে নেন। তিনি আন্তোনির সঙ্গে কৌতুকপূর্ণ কথপোকথনে ব্যস্ত হন এবং আমোদ বাড়লে, সে প্রস্তাব দেয় যে তারা তাদের মুকুটগুলো পান করবে। ফুলগুলো পেয়ালায় ডুবানোর পর, আন্তোনি প্রায় পান করতে যাবেন এমন সময় ক্লেওপাত্রা তার হাত দিয়ে তাকে থামিয়ে বলেন, “প্রিয় আন্তোনি আমার, আমি সেই ক্লেওপাত্রা আপনি যাকে সন্দেহজনক মনে করে, পরীক্ষার জন্য চাকনদারদের নব্য ও উদ্ভটভাবে ব্যবহার করেছন; এ কারণে, যদি আমি আপনাকে পান করাতে পারতাম, তাহলে আমি আপনাকে হত্যার সুযোগ ও অভিপ্রায়টি কাজে লাগাতে সক্ষম হতাম।” অবশেষে আন্তোনি চালাকিটি বুঝতে পারলে, তার খুলে বলার পর, তিনি তাকে বন্দী করেন এবং যে পেয়ালাটি থেকে সে তাকে পান করতে বাধা দিয়েছিল সেটি থেকে পানীয়টুকু পান করতে তাকে বাধ্য করেন। তারা বলে যে সে এভাবেই মারা গিয়েছিল।

আগেকার বিবরণটি অধিক প্রচলিত। আমি এখানে একটু যোগ করছি, অক্তাভিয়ান আদেশ জারি করেছিলেন যে মৌসলিউমের নির্মাণকাজ আন্তোনি ও ক্লেওপাত্রা শুরু করেছিলেন তা সম্পন্ন করতে হবে এবং একই সময়ে তাদেরকে সেখানে একত্রে সমাধিস্থ করতে হবে।

পাদটিকা –
১. দে মুলিয়ারিবুস ক্লেরিস (বিখ্যাত মহিলাদের সম্পর্কে)।
২. মিদিয়া, ইয়েসোনের (জেসোন) ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নিজ সন্তানদের হত্যা করেন।
৩. ফ্লোরা ছিলেন পুষ্পক উদ্ভিদের ইতালীয় দেবী। তার উৎসব, ফ্লোরিয়ায় (Φλώρια), অশ্লীল সব চমকপ্রদ প্রদর্শনী অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৪. সেপ্রোনিয়া সেই নারী যিনি রোমান সরকার হটাবার যাবতীয় প্রয়াসে ক্যাতিলিনের সমর্থন করেছিলেন।
৫. পেনেলোপি (Πηνελόπη) ছিলেন ওদিসসাসের (Ὀδυσσεύς) স্ত্রী, যিনি ত্রোইয়া হতে তার প্রত্যাবর্তনের জন্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে অপেক্ষা করেন।
৬. লুক্রেসিয়া, অনৈচ্ছিক ব্যভিচার মার্জনীয়, রোমান নারীদের জন্য এ ধরনের উদাহরণ স্থাপন এড়াতে ধর্ষিত হবার পর আত্মহত্যা করেন।
৭. সুপিচা ছিলেন একজন রোমান কবি, তিনি আগুস্তুস আমলে প্রেমের এলেগিয়া রচনা করেছেন।
৮. গ্রাৎসি (Γκράτσι) বৈপ্লবিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং আসন্ন বিরোধের জেরে হত্যার শিকার হন।
৯. আন্নিবাস ছিলেন দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের কার্তেজীয় সেনানায়ক। তিনি ইতালি আক্রমণ করেন এবং তার পরাজয়ের আগ পর্যন্ত সেখানে প্রচুর ক্ষতিসাধন করেন।
১০. উগুর্তা ছিলেন নুমিদিয়ান রাজা; তিনি রোমানদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
১১. রোমান সেনানায়ক সুল্লা ও ম্যারিউস প্রজাতন্ত্রের সময় গৃহদ্বন্দ্বে সম্পৃক্ত ছিলেন।
১২. ধনাঢ্য ব্যক্তি ক্রাসুস ছিলেন প্রথম ত্রিয়ামভিরাতের একজন সদস্য।
১৩. লিওনিদাস ছিলেন স্পার্তার একজন রাজা যিনি থেরমোপিল্লের (Θερμοπύλαι) পারশিয়ান আগ্রাসন যুদ্ধে নিহত হন।
১৪. জেনারেল স্কিপিয় আফ্রিকানুস ও স্কিপিয় আইমিলানুসসহ স্কিপিয় পরিবার বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান ব্যক্তির জন্ম দিয়েছে।
১৫. মার্ক্যুস পরকিউস ক্যাতো চেসরিউস ও মার্ক্যুস পরকিউস ক্যাতো উতিক্যানসিস, এই দুজনই ছিলেন আপোষহীন ন্যায্যতার জন্য খ্যাতিসম্পন্ন রোমান রাজনীতিক।
১৬. ফাব্রিকিউস ছিলেন প্রজাতন্ত্রকালীন একজন সিনেটর যার সম্পর্কে অবিকার্যতার অসংখ্য বর্ণনা প্রচারিত ছিল।
১৭. বারোতম তলেমি আউলেতেস (Αὐλητής), নব্য দিওনিসোস তথা তলেমাওস নেওস দিওনিসোস (Πτολεμαῖος Νέος Διόνυσος) নামেও পরিচিত ছিলেন।
১৮. ৫৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
১৯. প্রাদেশিক শাসক।
২০. কাহিনিটি উদ্ভট, বিক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে চব্বিশঘণ্টা বা তারও অধিক সময়ের প্রয়োজন হলেও সিরকা ও মুক্তার মতো স্থাবর সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ রানির ছিল, তবে মনে করা হয় এর সময়সূচি খানিকটা অতিরঞ্জিত। তারপরও, লেখক ও শিল্পীদের কাছে এটি প্রিয় একটি দৃশ্য, যাদের কাছে এটি এমন একটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে যা ক্লেওপাত্রার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে।

তথ্য সহায়: Giovanni Boccaccio, On Famous Women, (1362, Latin, prose)

Read Previous

লাতিন আমেরিকার কবি রোকে ডালটন’র দুটি কবিতা

Read Next

ব্রোকা অ্যাফেজিয়া, ক্রিয়াপদ ও মনোগত লেক্সিকন
রোয়েলিয়েন বাসতিয়ানস এবং রন ভ্যান জনেভেল্ড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *