অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তমোনাশ চট্টোপাধ্যায় -
হেম্মত আলীর চেয়ার

হেম্মত আলীর চেয়ার 
তমোনাশ চট্টোপাধ্যায়

শক্তিশালী বাঙালি গল্পকার মঞ্জু সরকারের সদ্যপ্রকাশিত (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) গল্পসংকলন  ‘শখের বাগানে সাপ’। অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশিত এই গল্প সংকলন মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের সদ্য ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থান। নানাবিধ বিচিত্র কারণের সমাবেশ, নানা দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি, নানা সামাজিক শ্রেণী ও বিবিধ অনুরাগী ও বিরাগী স্বার্থস্বরচালনা কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে শিরোপরি দণ্ডায়মান করে দিতে পারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান তারই স্মারক। মঞ্জু সরকারের গল্প সংকলনটি প্রায় পুরোটাই এই চলনটির গায়ে গায়ে লেপ্টিয়ে আছে। সদ্য উৎখাত হয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সরকার সম্বন্ধে সমাজের নানা স্তর ও শ্রেণীর কী  প্রতিক্রিয়া তা লেখক তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেখানে একেবারে দিনহীন মাজা ভাঙা বুড়ি থেকে ফেসবুক বিলাসী প্রতিবাদী, সাংবাদিক থেকে হেম্মত আলী ভ্যান।
মঞ্জু সরকার বাংলাদেশের এক প্রতিষ্ঠিত লেখক। আজ প্রায় পাঁচ দশক তিনি লেখালেখি করছেন। ‘শখের বাগানে সাপ’ তাঁর চতুর্দশতম গল্পগ্রন্থ। খবর নিয়ে জানা গেল তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘অবিনাশী আয়োজন’ ১৯৮২ সালে। মূলত গদ্যকার, গল্প ও উপন্যাস তাঁর চলনবিল। লিখেছেন শিশু-কিশোরদের জন্যও। এই দীর্ঘযাত্রায় মঞ্জু সরকার সম্ভবত নিজের  যুগদূত ও সমকালৈতিহাসিক ভূমিকাকে নজরে রাখতে চান। এই দিক দিয়ে তিনি তারাশঙ্করের উত্তরসূরি। ‘শখের বাগানে সাপ’ তাই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে সমকালকে। লেখক চেষ্টা করেন বাংলাদেশের প্রতিটি কোণ ও মন থেকে নিঃসৃত স্বর সংকলন করার এবং বেশিরভাগই তিনি সম্পাদনা করেন না, তাকে তার মতো থাকতে দেন। যাত্রাটি খুবই কঠিন। ঐতিহাসিকের নির্মোহদৃষ্টি লেখকের প্রায় স্বচ্ছ। ব্লার্বে কথিত ‘সত্যসন্ধ ও দায়বদ্ধ’ বিশেষণ দুটি লেখকের এ যাবৎ লেখালিখির ফলশ্রুতি।
অনুপ্রাণন একটি প্রত্যয়ী ও দৃষ্টিমান প্রকাশন। সমকালবর্তনের এই চেষ্টা খুবই আন্তরিক ও গুরুত্বপূর্ণ। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন আরেক বিখ্যাত পূর্বাচার্য ‘অগ্রজপ্রতিম প্রতিবাদী লেখক’ আহমেদ ছফাকে। আহমেদ ছফার প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে বক্তব্য, আলোচনা এবং বিস্তীর্ণ সাহিত্যখ্যাতিকে মনে রাখলে মঞ্জু সরকার ঠিক মানুষকেই বেছেছেন। অনুপ্রাণন ইতোমধ্যে লেখক মঞ্জু সরকারের পাঁচটি বই প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে তিনটি গল্পগ্রন্থ। অনুপ্রাণন প্রকাশিত হিসেবে এটি লেখকের চতুর্থ গল্পগ্রন্থ। সদ্য সত্তর পার করা এই লেখক বাংলাদেশের নানা রূপ ও পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তান দেখেছেন। তাই এই ভূখণ্ডটির প্রায় সমবয়সী লেখকের দেশদৃষ্টি প্রখর ও উজ্জ্বল। তিনি নানাকালের দেশ দেখেছেন ও দেখাতে চেষ্টা করেন।
মামুন হোসাইনের আঁকা প্রচ্ছদটি চমৎকার। চোখের ব্যবহারের পিকাসোকে মনে করিয়েছেন শিল্পী। দুটি মানুষ না তিনটি এই ভাবনাও তিনি দক্ষতা নিয়ে উস্কে দিয়েছেন। সাপ ও মানুষকে সমদেহধারী একটি প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তিনি। আবার লাল রঙে আঁকা একটি পাখিও চোখ এড়ায় না যা হয়তো আগুনরাঙা আশার প্রতীক। তিনটি চোখের ডানধারেরটিতে ভয় বিস্ময়, মাঝেরটি ঠান্ডা, নির্বাক, চিন্তাশীল আর বাঁধারেরটি ক্রোধী; নিষ্ফল ক্রোধে যেন ঠোঁট বেঁকে আছে। ডানধারের মুখে জিভের জায়গায় তীরের ফলা বেশ ভাবায়। বাগানের অনুষঙ্গে এসেছে সবুজ রঙের ব্যবহার। সব মিলিয়ে চার রঙের এই আঁকার দুটি সংরাগী হলুদ ও লাল আর দুটি শান্ত নীলচে ও সবুজ। প্রচ্ছদ বইয়ের নামগল্পকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছে। ভুললে চলে না কালো রঙের প্রয়োগ। কালো রাত্রির কয়েকটি মুখ আলোয় এনেছেন প্রচ্ছদকার।
গল্প সংকলনে মোট গল্প আটটি। বেশিরভাগই আকারে মোটেই ছোট না। অনেক গল্পের শেষে একটি চমকে দেওয়া মোচড় আছে সত্যি কিন্তু তীব্রতা গায়ে গতরে কম, যেন একটি নাদুস কিশোরের তীব্র দুটি চোখ ও ভাষার প্রবল বুদ্ধিদীপ্ততা। সাতটি গল্পে পরিবেশিত সময় বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের সামান্য পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকারের শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা।
প্রথম গল্প ‘গৃহপালিত গরুটার গতিপথ’ সরাসরি এই ঐতিহাসিক ঘনঘটার অংশীদার নয়। তবে এক খুদে চাষির মর্মকথা। প্রথম গল্পে খুদে চাষি মামুদ চাষি না পশুপালক তা যেন অস্পষ্ট। চাষসভ্যতা শুরু হবার আগের মানুষের পশুপালনবৃত্তি এই গল্পে একটি নতুন মোচড়ে সামনে এসেছে। ইসলামী গোমাংস রীতিকে পুঁজি করে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে একটি বৃহদায়তন গোপালন শিল্প। মামুদ শুটকুর মতো ছোট মানুষ থেকে বড় বড় অনেকেই এই ব্যবসায়ে যুক্ত ও লাভবান। মামুদের ‘ভালোবাসার বউ’ অত্যন্ত গোছানো সংসারী মহিলা। মূলত তার সেবায় মামুদের বিশ হাজারে কেনা বাছুর লাখ দুই লাখে বিক্রি হয়। দেখা যায় মামুদের দুই ছেলে সবুজ-অবুজকে। অবুজ সংসারবুদ্ধি। কলেজে ভর্তি হয়ে সুবিধে না দেখে চাকরি নিয়েছে ঢাকায়। পড়াশুনোর পথ প্রশস্ত হয়েছে মেধাবী সবুজের। বিদেশে যেতে চায় সে। মামুদের সম্পত্তি বলতে সামান্য ভিটে জমি আর গরু কটা। প্রতিবেশী বন্ধু শুটকুর পরামর্শে তার নিজের দেখানো গরু গেইলকে বেচে বিদেশি পাইকারের কাছে। সাথে ওই পাইকারি ট্রাকে রাত জাগা গরু পাহারার ঠিকাশ্রমিক হয়ে চেপে বসে ১০-১৫ হাজার বেশি পাবার স্বপ্নে। কিন্তু কোথায় যাবে স্নেহ-  “বাড়িছাড়া হওয়ার দুঃখেই কি গেইলের চোখের কোনটা ভেজা ছিল নাকি আর। দশ দিন পর কোরবানি ঈদে নিজের শরীরের সব রক্ত ঢেলে দেওয়ার নিয়তি টের পেয়েছে। দু’বছরের নিত্যসঙ্গী প্রাণিটার এমন রক্তাক্ত পরিণতি কল্পনা করতে ভালো লাগে না।” (পৃষ্ঠা ১৬)
আরও একটা জিনিস উঁকি দেয় গেইল আর সবুজ মামুদের পরিবারের মূলধন। এক মূলধন খাটিয়ে আরেক মূলধন থেকে লাভ তুলতে চায় মামুদ। শেষের দিকে স্নেহ ও এই কঠিন দ্বন্দ্ব মামুদকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির ডাক, ক্লান্তি ও ক্লান্তিজনিত ঘুম তাকে কব্জা করে ফেলে। ঢলে পড়ে সে তার প্রিয় গেইলের শরীরে।
‘কুড়ানি বুড়ি ভাদুর মা’ থেকে সরাসরি আওয়ামী লীগের দুষ্কর্মের ছবি সামনে আসে। ভাদুর মা কুড়ানি পুরনো সংগ্রাহক সভ্যতার এক প্রতিনিধি যেন। মাটিতে পড়া ফলে স্বত্ব স্বামিত্ব অস্বীকৃত। দুর্গাও তাই কত আম কুড়িয়েছে। ভাদুর মার এই ভূমিকায়, দুর্গার মতো অবশ্য কেউ অখুশি হয় না। এটা যেন প্রাকৃতিক। কিন্তু বুড়ির স্থাবর সম্পত্তি তো তা হতে পারে না! তাতে মিঠে কথায় ভাগ বসাতে চেষ্টা করে ভাদু। কিন্তু স্বাধীনচেতা কুড়ানিকে বশ করা ভাদুর কম্ম না। আসরে নামে গায়ের মোড়ল ভূঁইয়া। ছলে কৌশলে ভাদুর মাকে বশ করে স্থাবর হাতাতে চায় আওয়ামী লীগের এই নেতা। কিন্তু বুড়ির বাহাসে এমন কথা উঠে আসে যে মোড়লের সাথে তাবৎ পাঠকও যেন থ’ মেরে যায়-
‘ওই জমির মালিক আমি না বাবা। জমির আসল মালিক আল্লাহ।… আল্লাহর দুনিয়ার ওপর সব বান্দারই  সমান হক আছে। আমি মইরা গেলে আমার বাড়িভিটাতেও সব পোলামাইয়া হক আদায় করব। আল্লাহর জমি বেচাকেনা কইরা টাকা লাগবে না আমার।’ (পৃষ্ঠা ২৭)
ভাদুর মা ছোটবেলায় একবার দৈবক্রমে বিখ্যাত বাংলাদেশি সমানাধিকার প্রবক্তা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গলাভ করেছে। লেখক অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে বাংলাদেশি জনমানুষের অনেক ভিতরে নিহিত তবুও অন্তরে সজাগ মার্কসবাদী ভাবনা ভাদুর মার মতো যথার্থ সর্বহারার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন। একটু অতিকথনদোষ থাকলেও গল্পটি এখানে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
‘শখের বাগানে সাপ’ সংকলনে দুটি গল্পকে রূপক বলে আমার মনে হয়েছে- ‘দাঁতভাঙ্গা হাসি’ ও ‘কবর’। ‘দাঁতভাঙ্গা হাসি’ গল্প হিসেবে বেশ ভালো। অন্য গল্পের মতো শেষতক একটা চমকের বদলে এই গল্পের পরতে পরতে চমক আর সেসবের যোগানদার মূল নারী চরিত্র একটি অজ্ঞাতনাম্নী যুবতী।  গল্পের কোথাও লেখক যুবতী বা তার সঙ্গের যুবকটির নাম উল্লেখ করেননি। মনে পড়ে যায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের বিখ্যাত গল্প ‘শুধু কেরানি’। তবে এখানে কেরানি নয় রানি। প্রেমিক যুবকের কল্পনালতা রানি। প্রেমিক যুগল এক পার্কে বসে আছে। যুবকটি আসন্ন দেহ মিলনের কল্পনাবিলাসী আশায় উদ্দাম। কিন্তু যুবতী বলতে থাকে একে একে তার বহুবিধ কথা যা গত এক বছর যাবৎ এগারোটি ডেটের অন্তেও যুবকের অজানা। সে চমকে চমকে ওঠে। প্রেমিকার প্রাথমিক চেহারা আচরণ কিছুই যুবকের কল্পনা পরিতৃপ্তির পথে প্রবল বাধা তা একবারও মনে হয়নি। তবু এসে পড়ে অদ্ভুত প্রসঙ্গ। যুবতীটি একটি দুর্ঘটনায় হারিয়েছে তার সব দাঁত। আজকে যুবক যে হাসি দেখে আসক্ত, আরক্ত তা সবই নকল দাঁতের… কী নিদারুণ পরিহাস! এমনকি যুবতী নারী ধীরে ধীরে রহস্যের পরত উন্মোচনের মতো প্রকাশ করে এক অলীক ভালোবাসার গল্প। তার আর অ্যাক্সিডেন্টের উদ্ধারকারী, নেপালি, তখন হবু ডাক্তার যুবকটিকে জড়িয়ে সেই গল্প হয়তো মিথ্যা, হয়তো নয়, কে জানতে পারে!
‘কী এক রহস্যের ধূসর বোরখায় নিজেকে আবৃত করে নারী। কী লুকাতে চায়’- যুবকের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব চিরন্তন প্রেমিকের। তবু গল্পের ঘটনায় ধীরে ধীরে শরীরে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় উৎসাহী হয়ে ওঠে যুবক। স্থান প্রস্তুত, কাল তৈরি, এমনকি প্রস্তুত যুবকের পকেটের কনডম। তবু হায় কোথায় সে কত দূর হয়ে থেকে যায় মিলন। যুবক মেয়েটির প্রতিশ্রুতিও আদায় করেই নিয়ে এসেছে আজকের ডেটে। কিন্তু দ্বাদশতম এই ডেটে এসে ধরা দিয়েও নারী থেকে যায় অধরা। চিরন্তন প্রেমকে শরীরের থেকে উঁচুতে তুলে ধরে জানায় ‘শরীর কি শুধু খেলাধুলার জন্য’- এরপরও জোর করলে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে- ‘তুমি শুনলে হতাশ হবে এজন্য ফোনে বলিনি। কাল রাতেই মাসিক শুরু হয়েছে আমার।’ এই গল্পের শেষ পর্বে লেখকের একটি রেখা দারুণ ‘সহসা সচল হয়ে ওঠা জ্যামের একটি বড় বাসের জ্যান্ত হয়ে ওঠার গর্জন’ কার এ গর্জন! এই গল্পের রূপক চেহারাটিতে যুবতী আওয়ামী লীগ সরকার ও যুবক প্রতিশ্রুতিআশ্বস্ত জনতা- হয়তো এটা আলোচকের ভ্রম, হয়তো নয়; শেষ মুহূর্তে ভেঙে দেওয়া সরকারি প্রতিশ্রুতির মতো যুবতীও যেন-বা, আর যুবতীর নয়নলোভন হাসিটি সরকারি শোভনতার মতোই নকল।
‘কবর’ লেখকের রূপকাশ্রয়ী দ্বিতীয় গল্প। গল্পের প্রথমে ভাড়াবাড়ি, শহরের অলিগলি, ক্লান্ত রাস্তাঘাট ঘুপচি বাড়ির ঘরে ঘরে অজস্র ভাড়াটের মধ্যে বাসরত পরিবার ও লোকগুলির চেহারা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে ফুটিয়েছেন লেখক। নগরায়ন, শহরের ক্রমে ক্রমে গিলে চলা শহরতলী, তার  শহরের মর্যাদা পেয়ে যাওয়া, নগরশহরের দিকে ছুটে চলা একরোখা জনস্রোত, একটু সাচ্ছল্য আসতে না আসতেই মরিয়া চেষ্টায় মানুষ ছোটে শহরে, শহর গর্ভিণীর মতো ওঠে বেড়ে – সুনিপুণ বর্ণনায় লেখক অধিকার করেন মন। শহরমুখী এই বিরাট জনস্রোত আকাশে তুলে দেয় ভাড়াবাড়ির মুখ ও চাহিদা। বাড়িওলা বাড়ে, ভাড়াটে বাড়ে, বাড়ি বাড়ে, সম্পর্ক ও রাস্তার জঞ্জাল ওঠে বেড়ে। এমন পরিস্থিতিতে জনৈক সাংবাদিক বাড়ি ভাড়া নেন। সে বাড়ির চোখে পড়ার মতো জিনিস উঠোনে একটি বাঁধানো, পাকা ছাতওয়ালা কবর, বাড়িওয়ালা কুদ্দুস হাজির আব্বা হুজুর শহীদ মাতবরের। ধীরে ধীরে জানা যায় কুদ্দুস হাজির বাবার নানা বিচিত্র খবর। সাংবাদিকের স্ত্রী সংগ্রহ করে জানান-
‘বাড়িওলার বাপ একটা গুন্ডা ছিল। ভেজালি জায়গা কিনে বাড়ি করেছে। আর বাড়িঅলা সহোদর ভাইদের জমি দখল করতেই বাপকে বাড়ির সামনে মাটি দিছে। কেস চলছে এখনো এই বাড়ি নিয়ে।’
এদিকে সাংবাদিকের কাগজের মালিক-সম্পাদক সরকারকে খুশি রাখতে জাতীয় শোক দিবসের খবর বড় করে লিখতে চায়। দায়িত্ব সাংবাদিকেরই। রাষ্ট্রের ক্ষমতা পেয়ে শেখ হাসিনার ক্ষমতার অপব্যবহারে জাতীয় শোক দিবস যেভাবে বৃহদায়তন হয়ে উঠেছিল তা সংগত কারণেই হয়তো কুদ্দুস হাজির মতো নানা মানুষের চক্ষুশূল।  ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময়কার জলাজংলা মিরপুরের ছ’কাটা জমি মুক্তিযোদ্ধা লিডারকে ধরে করে নিয়েছিল মাতবর। পরে মাতবর মামলা চলাকালীন খুন হয়। মরহুম মাতবর এর মৃত্যুদিনও শেখ মুজিবুরের সাথে একই। ধর্ম-বর্ম করে বুদ্ধিমান কুদ্দুস ভেজাল জমিতে পাকাপাকি দখল নেয় কবর করে। কিন্তু অন্যদিকে সাংবাদিকের অ্যাসাইনমেন্ট, জাতীয় শোক দিবসের খসড়া, দেখেই চাকরিতে তার জবাব হয়। এই দুশ্চিন্তা চেপে রেখে তিনি শহীদ মাতবরের জিয়াফতে অংশ নেন। পরে যে অতিভক্ত লেখা না লেখার জন্য তাঁর চাকরি গেল কুদ্দুসের বাবা ভেজাল শহীদ মাতবরের জন্য তাকে ওই ধরনের লেখাই লিখতে হবে ফেসবুকে তাই সাব্যস্ত হয়। সাংবাদিকতা জিনিসটা যে দেশে অব্যবহার্য, পুরনো, মূল্যহীন এই গল্পটি তারই প্রমাণ। আর রূপকার্থে কুদ্দুস কাজী শেখ হাসিনা, শহীদ মাতবর মুজিবুর রহমান।
এই সংবাদ প্রতিবাদ সূত্রেই আসে পরের গল্প ‘পেশাদার প্রতিবাদী’। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কুলিমুল্লা, শেখ হাসিনা সরকারের প্রবল প্রতিবাদী। ঘটনাক্রমে কলিমুল্লা পেয়ে যান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে ডিনারের নিমন্ত্রণ। নিমন্ত্রণ আসে সরকারের পদলেহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক জামাল সাহেবের মাধ্যমে, যিনি ঘটনাচক্রে কলিমুল্লার বিদেশি ডিগ্রির সুপারিশকারী।  এমন শাঁখের করাতে কলিমুল্লাহ জীবনে পড়েননি। নিমন্ত্রণ করে প্রধানমন্ত্রী ভালো কথাই বলবেন, প্রশংসা করবেন, সেই সুতো ধরে জুটে যেতে পারে কোন সরকারি নামজাদা পুরস্কারও- কলিমুল্লা মনগড়া নানা কল্পনায় উড়তে থাকেন। সরকারের প্রতিবাদীদের, বিশেষত বুদ্ধিজীবীদের মুখে পুরস্কার গুঁজে চুপ করানো তথাকথিত সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার পুরনো, কাজের ও প্রচলিত প্রথা। ধমকালে যে কান্না বেড়ে ওঠে সন্দেশে সে চুপ। বিনা কারণে না গেলেও সরকারি গোসার মোকাবিলা করতে হবে কলিমুল্লাকে। ফেসবুকে লিখে, আর টিভিতে চেঁচিয়ে সেই ক্ষত মেরামতের ক্ষমতাই হয়তো তখন আর থাকবে না। নানা শঙ্কা, চোরা-আশা-মাখানো নিষিদ্ধ ফলের মতো সরকারি নেকনজরের, হয়তো নিজের কাছেও লুকিয়ে যাওয়া, হাতছানি বিহ্বল করে তাঁকে। শেষে তিনি, ব্যাড ম্যানেজমেন্ট-এর এবিসিডির এ-র রাস্তায় অ্যাভয়েড- , এড়িয়ে চলেন। নিজে থেকে প্রফেসরকে ফোন করেন না। চুপ করে যান, সময় দেন পরিস্থিতিকে। কিন্তু ‘চালাকি ন চলিষ্যতি, হুহু বাবা’, প্রফেসারই ফোন দেন, স্মরণ করান ও প্রায় জোর করেন ডিনারে উপস্থিত হতে। শেষ পর্যন্ত প্রায় নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়া দিনে দেশের বাড়িতে অসুস্থ দাদিকে দেখতে যাওয়ার বাহানায় ছাড় মেলে। কিন্তু এই শখের সাংবাদিক, ফেসবুক-প্রতিবাদীকে শেষ পর্যন্ত এই না যাওয়া যেভাবে পেড়ে ফেলে তাতে আম ও ছালা দুই-ই হাতছাড়া। দেশের বাড়ির অবস্থায় মনে হয় সরকারি নেকনজরের সম্ভাবনা অথবা প্রতিবাদীর ভাবমূর্তি দুয়ের কোনোটাই বোধহয় কলিমুল্লা শেষ পর্যন্ত বজায় রাখতে পারবে না।
এই সংকলনের সবচেয়ে জমাট গল্প ‘লুণ্ঠিত সিংহাসন’। হেম্মত আলী ভ্যানওয়ালা জুলাই অভ্যুত্থানের লুটপাটে গভীরভাবে অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত অতি মূল্যবান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বসার চেয়ারটির সাথে লুট করে তার একটি শাড়িও। হেম্মত আলী ও বউ সখিনা দুজনেই চেয়ারটা রাখে অতি যত্নে অতি গোপনে খাটের তলায় কাঁথা-কানিতে চাপা। খাটটাকে ইট দিয়ে এজন্য উঁচুও করতে হয়। এইসব মেহনত করে হেম্মত আলী ছক করে বড় দাঁওয়ের। সে একটি ফার্নিচার ও এক একটি ইলেকট্রিক দোকানের বাঁধা ভ্যানওয়ালা। ভ্যান নিয়ে দোকানের পাশেই দাঁড়ায়। বউ সখিনা কাজ করে গার্মেন্টসে। কিন্তু গরমেন্ট উল্টোলে গার্মেন্টস বা ফার্নিচার, ইলেকট্রনিক্স সবই যে বেশ কিছুদিন জলের তলে ‘হান্দায়’ এ খবর কার না জানা! দুজনেরই রোজগারহীন। গ্রামের বাড়িতে সন্তান রেখে কবর গল্পের শহীদ মাতবরের তৈরি করা কোনো বস্তির মতো জায়গায় থাকে দম্পতি। অনটন, যন্ত্রণা, গ্লানি নিত্যসঙ্গী হলেও একদিন যাই হোক করে খাচ্ছিল, অরাজকতা তাদের সেটুকুও রাখতে দিল না। দিন গুজরানো অসাধ্য, দেশ টালমাটাল, জাহাজের খবর আদার ব্যাপারীর গায়েও জোর ছেঁকা দেয়।
যে কয়েকটি চরিত্র মঞ্জু সরকার ‘শখের বাগানে সাপ’ বইয়ে এঁকেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে রংদার এই হেম্মত আলী।  কীর্তির ফর্দ তার লম্বা। এমনকি তার রাজনৈতিক বিবেচনাও রাজনৈতিক কর্মীর চেয়ে মোটেই ন্যুন নয়। ফার্নিচার দোকানের মালিককে সেই বুদ্ধি দিয়েছিল ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলনে- ‘লগি বৈঠার মতো কিছু চ্যালাকাঠ লাঠি ছাত্রগো হাতে সাপ্লাই দেন।’
সে আরো নিশ্চিত করে- ‘হাসিনার গদি কাঁপব কইলাম।’
লেখক জানিয়েছেন গরম চায়ে চুমুক দেওয়া নেশার মতো গরম আন্দোলনের ভিড়ে মিশে থাকার নেশাটাও তার ছোটবেলা থেকেই।  নব্বইয়ের স্বৈরাচারী শাসক এরশাদকে গদিছাড়া করানোর আন্দোলনের সময় সে রাস্তায় বাদাম বেচে। পরে  ধানের শীষের নেতা খালেদা প্রধানমন্ত্রী হলে দাড়িমুচ গজানো হেম্মত টানে রিকশা। পরে আরো নানারকম লাইনে গিয়ে নানা রকম কাজের অভিজ্ঞতা- হোটেলের বয় ম্যাচিয়ার, গুলিস্তানের পকেটমার, ছিনতাইকারি, টাকা নিয়ে এ দলের ও দলের স্লোগান হাঁকা, বেনামি ভোট, আবার গ্রামে ফিরে ক্ষেতের কাজ, হাটে পুরনো কাপড়ের ব্যবসা- এক কথায় হেম্মত আলী বিচিত্রকর্মা, অভিজ্ঞতাও তার বিপুল। অভিজ্ঞতাই তো শেষতক জ্ঞান। তাই  হেম্মত আলী জ্ঞানী। কর্মীও বটে, তাই তো এখনো ঝামেলা-বিপ্লব-আন্দোলনে পাঁচটা সাধারন ভীতু লোকের মতো ঘরে খিল দিয়ে বসে নেই সে। উদ্যম উন্নতির সার বুঝে সে খেয়ে না খেয়ে দিনের পর দিন সংগ্রহ করে আনছে পুরনো গণতন্ত্রের মুখোশে রাজতন্ত্রের ধ্বংসচিহ্নগুলো। মতলব পরে এগুলো চড়া দামে বেচবে। তার মূল্যবানতম চোরাই মূলধনটি সেই চেয়ার যার নিচে গণভবনের ছাপ ও এক নম্বর লেখা। হাসিনার শাড়ি, হাসিনার চেয়ার আর ৩২ নম্বরের ভাঙা ইট বেচে একদিন হেম্মত আলী আর সখিনা কোটি টাকার মালিক হবে এ সুউচ্চ আশ্বাস সখিনা বিশ্বাস না করলেও বিপ্লব করে না। বিদ্রোহ করে বটে শেষে সাহায্য করে। ঠিক চেয়ার বেচতে যাওয়ার রাতের শুরুর দিকে সেই চেয়ারে বসা হেম্মত আলীর হুকুমে বাধ্য হয়ে শেখ হাসিনার শাড়ি গায়ে দেয় সখিনা। এই সময়ের সংলাপ ও ঘটনায় এক অমর চির স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করেছেন লেখক মঞ্জু সরকার, তাঁকে বাহবা। যদিও ওই তুঙ্গবিন্দু থেকেই পাঠককে খোঁচাতে থাকে একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতির আশঙ্কা। রাতে ভ্যানে চাপিয়ে চেয়ার বেচতে গিয়ে খুন হয় হেম্মত আলী। এই গল্পে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে উপস্থাপিত করেছেন লেখক। অন্য কিছু গল্পের মতো এর অতিকথনটা ঝুলে থাকে না, গায়ে এঁটে বসে যায়। গল্প বড় ও গল্প ভালো।
পরের গল্প একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নিনাদ’। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লড়াই ১৯৭১-এ পাকিস্তানের অত্যাচার থেকে মুক্তির। এতে শেখ মুজিবুরের অবদান শ্রদ্ধাসহ স্মরণ করা হয়েছিল কত ৫০ বছরের বেশি। জুলাই অভ্যুত্থানে তা ফরশা। নতুন রাজা বসলে পুরনো ধর্মকে যে মনোযোগ নিয়ে ধ্বংস করেন সেভাবে ভেঙে ফেলা হয় শেখ মুজিবুরের যাবতীয় ধারনা ও ছবি। যুগে যুগে কালে কালে ইতিহাসে নতুন ইতিহাস লেখার দরকার পড়ে শাসকের। তাই এবারে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা পায় মুক্তিযোদ্ধা আকবর। মুক্তহাটে একটা ছোট পানদোকানের মালিক সে। কোন দলেই বা কোন্দলে তার অভীপ্সা নেই। সবার সাথে খাতির, সবার সাথে দোস্তি আর বড় খাঁই না থাকাই বাঁচিয়ে দিয়েছে আকবরকে। ভানু নকশায় মঙ্গলে গেলে তার মঙ্গলদা ভারী গলায় পরামর্শ দিয়েছিলেন- তুমি কোন দলে যেও না, নির্দল থেকো। ভানুর উত্তর- নির্দলও তো এখন একটা দল। আকবর তাই নির্দলও থাকেনি। তবু সে নির্যাতিত হলোই, হয়তো তাই। নতুন যুগের নতুন মতের দুই যুবকের তাকে ধমকানোর দিন চারেক পরে শেখ হাসিনার গদি উল্টোয়। একদিন মুক্তিযুদ্ধান্তে আকবরের সমধর্মী মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের ধরে যা করত তারই কতটা ভাগ পেল সে। এমনই ইতিহাসের পরিহাস স্থানেরও কোনো অমিল হলো না। তাদের হাতে রাজাকারদের লাঞ্ছনাস্থান গ্রামের বটতলে তীব্র অপমানিত হলো আকবর। গলায় জুতোর মালা, মালার একটি ‘ফুলে’ আবার কোনো বর্জ্য সেই সমেত মালাটি গলায় ঝুলিয়ে ছবি ওঠে তার। ফেসবুকে যাবে তা। সে কি পাকিস্থানি সেনাক্যাম্পে বলা ‘জয় বাংলা’ আবার বলে উঠবে!
সংকলনের শেষ গল্পের নামে বইটির নাম ‘শখের বাগানে সাপ’। এতে আছেন অবসরপ্রাপ্ত আশরাফ সাহেব। তিনি মুক্তিযোদ্ধা, হাসিনা আমলের বড় সরকারি কর্মী ও নাস্তিক। আশরাফ সাহেবের স্ত্রী জিনাতের ভাই হাসিনা সরকারের এমপি আর এক বোনপো হাসিনার দলের ছাত্রলীগ সদস্য। সেই বোনপো ইতোমধ্যেই ‘উপযুক্ত শাস্তি’ পেয়ে পঙ্গু আর ভাই পলাতক। আশরাফের মুখেই প্রথম আমরা শুনি একটি দলমত খ্যাতিবৃত্তি পেরনো কণ্ঠস্বর- ‘দেশটার যে কী হবে, কীভাবে থামবে এই টালমাটাল অবস্থা।’
সংকলনের আর কোনো চরিত্রেরই এই সিংহাবলোকন দেখা যায়নি। হতে পারে সংকলনের গল্পক্রমে একটা ইতিহাসের চলনকে ধরেছেন লেখক আর এই চিন্তা উথাল-পাথাল পর্বে কারোরই আসে না।  আসে খানিকটা স্থিতি এলে। হয়তো তাই আশরাফ এখন এমন ভাবতে পারছেন। এই শেষ গল্পটি ২০২৫-এর নভেম্বরে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরের। তখন অন্তর্বর্তী মহম্মদ ইউনুসের সরকার। যাই হোক, দেশ সামান্য স্থিত। আশরাফ সাহেব শেষ জীবন সুখে ও শৈশবে কাটাতে চান। তাই জন্মস্থানে করেছেন এক বিঘা জায়গায় একটি বাড়ি আর একটি বাগান। একটা কথা মাথায় এসেই পড়ে আচ্ছা স্ত্রীদের শৈশব তবে কোনোদিনই ফিরে পাওয়া হবে না! জিনাতেরও তো একটা শৈশব ছিল। আশরাফরা নিজেদের শৈশব আবার বাঁচতে অর্থ, সময়,পরিশ্রম ব্যয় করবেন আর জিনাতরা ভুলেই যাবেন শেষ বয়সে হয়তো তাঁদেরও আবার শৈশব পেতে ইচ্ছা করে। যাক, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের খুশিতে মসজিদের ইমাম এমদাদ মৌলানার মিষ্টি বিলোনোয় ও মিষ্টির প্রথম হকদার হিসেবে আশরাফকে নির্বাচনে জিনাত বিহ্বল। এমনিতেই গ্রামে এসেতক নানান হিংসুটের বাক্যকর্মের জ্বালায় তিনি অস্থির আবার গোদের ওপর বিষফোড়া। এ নিয়ে তুমুল দাম্পত্য কলহের শেষে জিনাত ঢাকা যাবার সিদ্ধান্ত নেন। আশরাফুলও বাধা দেন না। এই দাম্পত্যকলহে বাংলাদেশের অনেকখানি অন্তরজগতের খবর আছে। আসে আশরাফের পুরনো বন্ধু, ছোটবেলার সহপাঠী আবুল। পুরনো বন্ধু হলেও আশরাফকে আবুল শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে ‘আপনি’ বলে, আর নামতে পারে না। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় স্পষ্ট হয় হ্যাবস ও হ্যাবনটদের আসভ্যতা টানাপোড়েন। এই টানাপোড়েনে নেইরা বুঝতে পারে না আছেদের কেন আছে আর আছে; আর আছেরা বুঝতে পারে না নেই তো হিংসে করার কী আছে। ‘তুমি শুয়ে রবে তেতলার…’- দেবতা বলার প্রশ্নই নেই কিন্তু নির্বিবাদে আপন দুরবস্থা মানতে বা তার প্রধানমূল খুঁজতে সাধারণতই মানুষ অনাগ্রহী, উদাসীন। তাই ধনীমাত্রই ‘দুর্নীতিবাজ’ আর গরিব মাত্রই ‘হিংসুটে’। আশরাফও নিজের মানসিক দুরবস্থার কারণ চট করে খুঁজে পাননি। আবুল তার চোখ খুলে দিল। ঝামেলা থেকে বাঁচতে ঢাকায় পালিয়ে যান আশরাফুলরা।
বিশ্বের বহু দেশে পালাবদলকালীন সাহিত্য চিরকালই লেখা হয়ে এসেছে। ইতিহাসে এর গুরুত্ব খুব বেশি। ফরাসি বিপ্লবের প্রায় ১০০ বছর পরে লেখা ভিক্টর হুগোর শেষ উপন্যাস ‘১৭৯৩’, রাশিয়ার নভেম্বর বিপ্লবের পরের লেখা বরিস পাস্তেরনাকের ‘ডক্টর জিভাগো’, হিটলারের সময়কাল নিয়ে ফ্রিড্রিশ স্টোরবেরগের ‘তান্তে জোলেশ’, আফ্রিকার বিভিন্ন ছোট রাষ্ট্রের বিপ্লব ও বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি নিয়ে চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল এপার্ট’, ‘দা ক্যাম্প’ নামে ডাম্বুজও মারেসেরার ছোটগল্প সংকলন-  এগুলো সামান্য কিছু উদাহরণ মাত্র। মঞ্জু সরকারের ‘শখের বাগানে সাপ’ পূর্বোক্ত বইগুলির সমগোত্রীয়। সাহিত্যিক শিল্পগত মূল্য যথেষ্ট এর আছে সাথে ঐতিহাসিক মূল্য। বিখ্যাততম হিন্দি সাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচন্দেরই সম্ভবত একটি বক্তব্য এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় – সাহিত্য আর ইতিহাসে তফাৎ হলো ইতিহাসের নাম তারিখ আর ঘটনা ঠিক বাকি সব অলীক, সাহিত্যের নাম তারিখ ভুল কিন্তু বাকি সব বাস্তব।
পুরো বইতে মঞ্জু সরকারের ভাষা ব্যবহারে মনে হয় তিনি সবস্তরের ভাষা কান করে শুনেছেন, মনে করে রেখেছেন ও সুযোগ বুঝে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, প্রফেসর, বাড়িওয়ালা, বৌ-ঝি সবারই ভাষা স্বকীয়। চোদনা, বোকচোদ, খানকিরপুত, বালের এসব এখনো পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্যলোকে সুপ্রচলিত হয়নি। লেখকের বাস্তবদৃষ্টি, বাস্তব উন্মোচন ও সৎ সাহসের প্রশংসা করতেই হয়।
বইয়ের বানান ও যতিচিহ্ন ব্যবহারের সামান্য ত্রুটি আশা করি পরের সংস্করণেই ঠিকঠাক হয়ে যাবে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কথা ও শিল্পীদের কথা থাকলে সংকলন আরও হয়তো ইতিহাসনিষ্ঠ হতে পারত।
বইয়ের জ্যান্ত কপি হাতে পাইনি। মোবাইলের পর্দায় দেখার ফলে বইটির বাঁধাই কেমন বলতে পারা গেল না। আরো পারা গেল না বইটির আকারপ্রকার, পাতা সম্বন্ধে। বই যদি সহজে বয়ে নিয়ে যাবার যোগ্য হয় তাকে একটু বেশি গুরুত্ব দিতেই হয়। পাঠকের একটানা বসে পড়া আজ দুর্ঘট। তাই যাত্রা পথের অবসরেও অনেকে পড়েন। যদি বইকে আমরা হাতসই ছোট ব্যাগোপযোগী করতে পারি তাহলে মোবাইল বা কিন্ডালের ভার্সনের সাথে হয়তো কিছুটা টক্কর দিতে পারব। সে বিষয়ে সমস্ত প্রকাশকর্মীর ভাবা খুবই দরকার। আকারে চিরাচরিত বইয়ের চেয়ে ছোট হালকা পেপারব্যাক কিন্তু অত্যন্ত ভালো পাতা যা জলেও চট করে নষ্ট হবে না- এইসব ভাবতে পারা খুবই দরকার। তারপর গল্প উপন্যাস খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত হতে শুরু করলে তার কথা আলাদা।
‘শখের বাগানে সাপ’ বইয়ের নামকরণের সমনামী গল্পটিতে যে কাহিনির বিস্তার তাতে সাপ যে কে এ ভ্রম কিছুতেই নিরসন হয় না। মৌলবাদী দল না শেখ হাসিনার দল না সাহেব বিবির মনের মধ্যিকার দুশ্চিন্তা না তাদের সম্পর্কের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব- কোনটা সাপ এ’কথাকে গুলিয়ে দিয়ে লেখক পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেছেন। শখের বাগানের শোখিনটি কে?- বাংলাদেশের জনগণ না অন্য কেউ?-  এটিও একটি দোদুল্যমান প্রশ্ন। মনে হয় কোনো সিদ্ধান্তে আসার সময় এখনো হয়নি। সময়কালীন সাহিত্য থেকে চিরকালীন হয়ে ওঠার উপাদান মঞ্জু সরকারের এই গল্প সংকলনে আছে। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়!

Read Previous

চড়ুইনি ও বানর

Read Next

‘নিষিদ্ধ বাতায়ন’ : অভিমান, প্রত্যাখ্যান ও আধ্যাত্মিক অন্বেষণের সমন্বয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *