অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ১৬, ২০২৬
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রায়হান শরীফ -
শাজারেহ তায়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়

শাজারেহ তায়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়
(মিনাব, হরমোযগান, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
রায়হান শরীফ

এক.
শনিবার। কর্মব্যস্ত দিন। মিনাব, হরমোযগান।
সেখানে সেময় গাছের নামে এক স্কুল :
শাজারেহ তায়্যেবেহ—
যে গাছ পবিত্র বাক্যের রূপক,
যার মূল মাটিতে দৃঢ়, শাখা আকাশচুম্বী!

সকালের আলোর গোলাপি-সাদা ইউনিফর্ম
সাত বছরের শিশুরা শিখছিলো বর্ণমালা।
কে জানতো? টমাহক দরজায় টোকা দেয় না।
সে আসে তাপ আর মাধ্যাকর্ষণের গণিত হয়ে
সে আসে সহসা—দুই হাজার পাউন্ডের এক লক্ষ্যভেদী বিস্মৃতি!
স্কটল্যান্ডের কারখানায় গড়া যার প্রতিটি ভাঁজ
মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এসেছে মিনাবে—
শিশুদের স্কুলের এই একটিমাত্র স্থানাঙ্ক খুঁজে নিতে!

দুই.
প্রথম হামলা ছাদ উড়িয়ে নেওয়ার পর,
শিক্ষিকা আর প্রধান শিক্ষিকা
জীবিতদের জড়ো করলেন:
‘নামাজের হলঘরে চলো। হল টিকবে।’
প্রধান শিক্ষিকা ফোন করলেন অভিভাবকদের
‘তাড়াতাড়ি আসুন, বাচ্চাদের নিয়ে যান।’

নামাজের হলঘর—
যেখানে মেয়েরা কপাল ঠেকিয়েছিল মাটিতে।
দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র অপেক্ষা করেনি;
এসেছিল ‘ডাবল-ট্যাপ’-এর দ্বিতীয় ঘাতক টোকা হিসেবে।
আশ্রয় নেওয়া মানুষদের
অল্প কয়েকজনই আজ ধুলোবালি মেখে বেঁচে আছে।

তিন.
১৬৮। ১৭৫। ১৮০।
সংখ্যাগুলো হরমোজগানের হাওয়ায়
বালুর মতো ঘষঘষ করে সরে যায়।
সাত থেকে বারো বছরের শিশু।
গোলাপি-সাদা ইউনিফর্ম
এখন প্লাস্টারের ধুলোয় পাণ্ডুর, ধূসর।

কী হবে আর মৃতের সংখ্যা দিয়ে?
সংখ্যা চুল বিনুনি করে দেয় না।
সংখ্যা পেন্সিল চোখা করে দেয় না।
সংখ্যা ব্যস্ত সন্ধ্যায় ‘মামান’ বলে ডাকে না।

যে গাছ পবিত্র বাক্যের রূপক,
সে আজ গুনছে তার ঝরে পড়া ফল—
১৬৮, ১৭৫, ১৮০।
ডালিমের মতো ফেটে গেছে প্রতিটা কচি প্রাণ
দানা ছড়িয়ে পড়েছে তপ্ত ধুলোয়।
রক্তিম দানাগুলো এখন
প্লাস্টারের ধূসরে বিলীন।

চার.
স্কটল্যান্ডের গ্লেনরোথেসে,
রেথিয়ন কারখানা শিফট চালিয়ে যায়।
শ্রমিকেরা ঠান্ডা ঘরে জোড়া দেয় গাইডেন্স সিস্টেম, ফিউজ, খোলস।
তারা দেখে না তাদের শ্রমের গন্তব্য
দেখে কেবল মাস শেষে মাইনে আর নিশ্চিত পেনশন।
কারখানা নির্বিকার;
চাকা ঘোরে, চাকা ঘোরানোই নিয়ম।

পাঁচ.
হাজার হাজার মানুষ আজ মিনাবের রাজপথে।
মৃতদের ছবি—ছোট্ট মুখ, কালো স্থির চোখ।
কফিনগুলো সড়কে সারি সারি—যেন নিথর স্বপ্নের মিছিল।
পতাকা ওড়ে প্রবল বেগে, কিন্তু পতাকা উষ্ণতা দেয় না।
স্লোগান ওঠে আকাশ চিরে, কিন্তু স্লোগান শ্রেণিকক্ষ ভরাতে পারে না।
মায়েরা সামনের সারিতে।
কারও হাতে কিছু নেই।
হাতগুলো এখনো শূন্যে বাঁকা হয়ে আছে—
সন্তানের শরীরের সেই গোলাকার ঢেউ ধরে রাখার চিরচেনা ভঙ্গিমায়।

বাজারের ফেরিওয়ালা ডালিম চিরে।
দানাগুলো এখনো লাল কিন্তু কেউ স্বাদ পায় না।
সবাই শুধু দেখে রস গড়িয়ে পড়ছে,
যেন আজ ফলেরও রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

শাজারেহ তায়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়—
যে গাছ পবিত্র বাক্যের রূপক,
যার মূল মাটিতে দৃঢ়, শাখা আকাশচুম্বী!

Read Previous

সময়ের আলখাল্লা

Read Next

ময়নাকাটা নদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *