অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৮, ২০২৬
৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ১৮, ২০২৬
৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তানভীর আহমেদ হৃদয়-এর গুচ্ছ কবিতা

তানভীর আহমেদ হৃদয়-এর গুচ্ছ কবিতা

শহরের নিঃসঙ্গতা

রাত নামলে শহরটা যেন একটা বিশাল মোবাইল স্ক্রিন হয়ে যায়—চারদিকে শুধু
ধূসর আলো, নোটিফিকেশনের ঝলকানি।
রাস্তার বাতিগুলো দাঁড়িয়ে থাকে
যেন চার্জারে লাগানো ক্লান্ত মানুষ,
নিজের ভেতরের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলেও
বাইরের আলোটা জ্বালিয়ে রাখে।

একটা ছেলেকে দেখি ফুটপাথে বসে
ফোনে স্ক্রল করতে করতে
নিজের জীবনটাকেও স্ক্রল করে ফেলছে—
পুরোনো স্মৃতি, অপূর্ণ স্বপ্ন,
আর ইনবক্সে পড়ে থাকা
কখনো না পাঠানো একটি ‘কেমন আছো?’

এই শহরে এখন আর কেউ আকাশ দেখে না,
সবাই ওয়াই-ফাই সিগন্যাল খোঁজে।
তারাগুলোও হয়তো অভিমান করে
ক্লাউডে আপলোড হয়ে গেছে—ডাউনলোড
করার মতো সময় কারও নেই।

রোবটের হৃদয়ে মানুষের গল্প

একদিন হয়তো মানুষ আর মানুষ থাকবে না,
সবাই হয়ে যাবে প্রোগ্রাম করা অনুভূতির মেশিন।
হাসি হবে একটা ইমোজি, কান্না হবে একটা
স্ট্যাটাস আপডেট, আর ভালোবাসা—
একটা অটো-রিপ্লাই মেসেজ।
আমি কল্পনা করি, একটা রোবট গভীর রাতে
বসে আছে নিজের হার্ডডিস্ক খুলে—
সেখানে জমে আছে হাজারো স্মৃতি,
কিন্তু একটাও স্পর্শ নেই।
সে গুগলে সার্চ দেয়—‘মানুষ কীভাবে ভালোবাসে?’
স্ক্রিনে হাজার ফলাফল আসে,
কিন্তু কোনো উত্তর তাকে শেখাতে পারে না
কেন একজন মানুষ অন্য একজনের জন্য
অকারণে অপেক্ষা করে থাকে।
তখন রোবটটা ধীরে ধীরে বুঝতে পারে—
সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ভেতরেও
একটা পুরোনো জিনিসের অভাব আছে,
তার নাম—হার্ট।

নিয়ন আলোর নিচে

শহরের এই রাতগুলো এখন আর নিস্তব্ধ নয়,
চারদিকে শুধু গাড়ির শব্দ, মোবাইলের আলো,
আর মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নিশ্বাস।
তবু কখনো কখনো মনে হয়—যেন বহুদিন ধরে হাঁটছি
কংক্রিটের এই বন পেরিয়ে, অসংখ্য মুখের ভিড়ে
খুঁজছি একটুখানি শান্তি।
হয়তো কোনো এক ক্যাফের কোণে
কফির ধোঁয়ার ভেতর বসে আছে একটি নরম মুখ—
যে চোখ তুলে তাকালেই সব ক্লান্তি ধুয়ে যায় বৃষ্টির মতো।
আমি জানি না তার কী নাম,
হয়তো সে আজকের দিনের অজন্তা নয়,
হয়তো সে শুধু এক মুহূর্তের আশ্রয়—
তবু তার হাসির ভেতর খুঁজে পাই
হারিয়ে যাওয়া এক গ্রাম, ধানক্ষেতের গন্ধ,
আর একটুখানি নির্ভেজাল…

একাকী শহরের পাশে

রাত নামলে শহরটা যেন ধীরে ধীরে কাঁচের ভেতর ঢুকে যায়—
রাস্তার বাতিগুলো জোনাকির মতো ঝুলে থাকে আকাশের নিচে।
আমি তখন ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে শুনি
মোবাইল টাওয়ারের মাথায় বাতাসের ক্ষীণ গুঞ্জন।
কোনো এক অচেনা ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ,
যেন কারও চোখে জমে থাকা পুরোনো অপেক্ষা।
এই শহরের গলিগুলো আজকাল নদীর মতো—
মানুষ ভাসে, স্মৃতি ভাসে, বিজ্ঞাপনের নীল আলো ভাসে।
একটি কাক উড়ে যায় বহুতলের জানালার পাশ দিয়ে,
তার ডানায় লেগে থাকে সন্ধ্যার শেষ কমলা রোদ।
আমি ভাবি—
আমার শৈশব কি এখনো কোনো গ্রাম্য পুকুরের জলে
শাপলা পাতার নিচে ঘুমিয়ে আছে?
দূরে কোনো বাসের ব্রেক মর্মর শব্দ করে ওঠে,
যেন রাতের বুক চিরে ওঠে এক অস্থির দীর্ঘশ্বাস।
এই শহরে এখন আর তারা দেখা যায় না,
তবু মাঝে মাঝে মনে হয়
কারও নীরব ভালোবাসা আকাশে জ্বলে আছে অদৃশ্য নক্ষত্রের মতো।
হেঁটে যাই—
রাস্তার ধুলো পায়ে লেগে থাকে,
আর আমার ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে
একটি অজানা ভোরের দিকে।

কবি পরিচিতি :
তানভীর আহমেদ হৃদয়ের জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৯৮৫ মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানায়। গল্প কবিতা উপন্যাসসহ এ পর্যন্ত তার ১২টি একক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে লেখালেখি করছেন। কবিতায় এ বছর তিনি দুটি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।

Read Previous

দ্বীপ সরকার-এর গুচ্ছ কবিতা

Read Next

চঞ্চল নাঈম-এর গুচ্ছ কবিতা

২ Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *