
দ্বীপ সরকার-এর গুচ্ছ কবিতা
নীলিতারা
জানালা খুললেই
বাতাসের প্লেনে উড়ে আসে হিমযাত্রী
আমার লোমকূপের রাস্তা ধরে বরফের ঘোড়া দৌড়োয়
ঘোড়ার পায়ের শব্দে আমার ঘুম ভাঙে
আমাদের এখানে পৌষের ভোর নামে—
ফুটপাথের ছায়াগুলো যেনো খবরের কাগজের ছাপা অক্ষর,
কালো কালো অক্ষরগুলো হকারের কণ্ঠে চড়ে দৌড়োচ্ছে—
পৃথিবীর সংবাদগুলো সুন্দরী রমণীর হাসি হয়ে যেই
চায়ের কাপে এসে ধুঁয়ো হয়
আমরা তা চা’য়ের লিকার বানিয়ে খাচ্ছি
পৌষ বিকেলে আমরা ছাদে উঠি—
হিম হিম কুয়াশা
গ্রামের উঠতি বয়েসী বালিকারা খোঁপায় পিন্দেছে নিওরের বেণি
বেণির বাহাদুারিতে ভরকে যাচ্ছে গোধূলি
এরপর আস্তে আস্তে, রাত্রী নামতে শুরু করে
বাঁকা চাঁদ, সাদা দস্তানায় চড়ে এদেশ থেকে ওদেশে যায়
কী সুন্দর করে কথা কয় বাঁকা চাদ আর মেঘ—
বাঁকা চাঁদ আর মেঘের ভাষা বুঝেছিলো নীলিতারা
আমার বাড়ির সাথেই ওদরে বাড়ি
তারাও এখন বরফের ভাষায় কথা কয়, হাসে
রাগী প্রেমিক বরফের মতোন ঠান্ডা হয়ে যায়, মুহূর্তে
পৌষ আসলে নীলিতারা পাখি হয়ে যায়
প্রতিদিন ভোরে, খেজুরে রসে চুমু জমা রাখে—
তারপর আকাশের নীল দিগন্তে হারিয়ে যায়
সকালে রস বিক্রেতা হাঁক ছাড়ে ‘এই রস নিবি, রস’
আমি তখন আশি টাকা দরে এক কেজি রস কিনে নেই
পৌষের ভাষা
আমার গ্রামের স্কুল ঘরে নোটিশ টাঙানো—
‘ইদানিং লক্ষ করা যাচ্ছে
ছাদের কার্নিশে শীতের ফিসফিসানি বেড়ে গেছে
তোমাদের জন্য ছুটি ঘোষণা’
স্কুলের পাশেই গেদাদের কুঁড়েঘর—
সেখানেও উস্কে দিচ্ছে শীতের মিছিল
আমার পুরাতুন বাড়িটা মাটির তৈরি
বাইরের দেয়ালে অসুস্থ শিশুর মতো ঝুলে আছে শীতের পা
রাত গভীর হলে, শীতের শরীর আরো খারাপ হয়
জ্বর জ্বর ভাব—নাক দিয়ে সর্দির স্রোত
শীতের কোন পিতামাতা নেই—
গায়ে লেপ জড়িয়ে দেবে কে?
একবার শুনেছিলাম, শীতকে বনবাসে রেখে
চলে গেছে ওর পিতা মাতা
সেই থেকে আমার গ্রামে, মাঘ পড়লে
শীতের ভয়ে আমরা বাহির হতে পারি না
শীতের রাজত্বে চলে যায় আমাদের ঘরদোর—রাস্তাঘাট
আমরা মূলত মাইনকা চিপায় পড়ে গেছি
বাঁশঝাড়ে ওঁত পেতে আছে শীত
মাটির দেয়ালে ওঁত পেতে আছে শীত
চাদরের ভেতর ওঁত পেতে আছে শীত
এর থেকে কবে কখন নিস্তার পাবো হে ঈশ্বর!
দাদা
আমার বাড়ির উঠোনে একটা বয়স্ক আমগাছ—
আমার বৃদ্ধ দাদার মতো কাঁপছে সে-ও
মাঘের শীত যখন দরজায় এসে অনুমতিহীন
প্রেমিকার মতোন হির হির করে ঢুকে পড়ে
বৃদ্ধ দাদা আমার বৃক্ষের ভঙ্গিমায় দাড়িয়ে
থত্থর থত্থর করে কাঁপতেন
এখন দাদা নেই—আমগাছ আছে
শীতে আমগাছ কাঁপলে দাদার কথা মনে পড়ে—
আমগাছের কাঁপুনির ভেতর
কী সুন্দর হুমড়ি খাচ্ছিলো দাদার সাদা শুভ্র দাড়ি!
ভাবি, দাদা আমার এখনও বেঁচে আছেন
