
শঙ্খশুভ্র পাত্র-র গুচ্ছ কবিতা
অলংকার
মে মাসের প্রথম সকাল যেন সূর্যের সংলাপ।
যেখানে আলোয় দীপ্ত অগণন শ্রমিকের ঘাম।
কারখানা, পথ, মাঠ—সর্বত্র তাদের দৃপ্ত ছাপ,
তবু ফলকে খোদাই থাকে না তাদের নাম-ধাম!
এদিন শুধু স্মরণ নয়, এক তীব্র অনুভব—
শ্রম মানে শুধু কাজ নয়, সম্মানের অধিকার।
নীরব হাতগুলিই গড়ে তোলে সকল সম্ভব
আর সেই হাতগুলোর মর্যাদাই হোক অলংকার৷
বাঁশি
‘শি’—প্রথমার্ধ৷ এই টুকু বলে অন্তত সান্ত্বনা পাই৷
পুরো বললেই দৃশ্যপটের সঙ্গে
একটা ধ্যানময়তা এসে যায়—অথবা চৈত্রের
সম্মোহিত ফুল নয়তো শীর্ষদেশ, ময়ূরীর
অঝোর শ্রাবণ! কী কথা বলতে এসে—সলতে
পাকাই আর মনে-মনে হেসে উঠে নিজেই স্বরূপা…
দ্যাখো, নাম নিয়ে প্রণয়াদি চিহ্নিতকরণ ঠিক
বশে আনা নয়৷ তবু বালখিল্য টুপটাপে
ভরে যায় যত বৃষ্টিপাত! আসলে হাওয়ার ওই
উড়ন্ত শিমুল, সেই শিখিপাখা, শিরোধার্য—’শি’…
এর পরে আর কী থাকতে পারে কথাহারা, লতা!
ফেলনা ভেবেছ? ভাবো! তবে এতটা সহজ নয় বাঁশি…
ভবিতব্য
কেউ পাশে না থাকলে—সিদ্ধান্ত বেদান্ত হতে পারে।
অহেতুক খেদ পুষে সেতুবন্ধে নেই কোনো লাভ।
একা সাঁকো। নিরিবিলি। অন্যদিকে জটিল প্রলাপ
জুটি বেঁধে থাকে। ছুটি। মাঝেসাঝে নদীর কিনারে
হাওয়া দেয়। অগ্নিশিষ। দোলাচলে খলবল ঢেউ!
সীমানা, মানা কে করে? ডাক দিলে সহসা দক্ষিণ,
থেমে যাবে? আপন সম্পর্ক বাদে মূল্যবান কেউ
ফুল্ল-কুসুমিত হবে, এই আশা একেবারে ক্ষীণ।
ক্ষতির সম্মুখে এসে আবার নতুন করে শুরু।
পাঁচখণ্ড? হাসি পায়৷ অধিকরণেই এত সুখ!
ঈর্ষার অস্তিত্ব দেখে ভুলে যাই মিত্র, লঘু-গুরু।
সমতা কোথায়? শ্রোতা, স্রোতাপন্ন। সহসা ময়ূখ—
কবিতায় এসে গেলে করবে কি উচাটন-ঝোঁক?
উঠোনে হোঁচট খাবে! হে পাঠক, তবে তাই হোক৷
তত্ত্ব
অক্ষরের ভিড়ে হঠাৎ থেমে যায় একটি পাখি,
ডানার তলায় লুকিয়ে রাখে অজানা কোনো দিশা।
বাতাস জানে—সব কথা বলা যায় না, অগোচরে,
কিছু থাকে শুধু ছুঁয়ে থাকার মতো লতাবিতান।
পাতার গায়ে আলো পড়ে, ছায়া, আবার সরে যায়,
কেউ তার হিসেব রাখে না। নদী অস্থিরতায় চুপ…
অসংখ্য অনুচ্চারিত নাম—জলের ভেতরে তারা
আর আলাদা থাকে না। আমার ভেতরেও আশ্চর্য তেমনই কিছু, কখনও জেগে ওঠে, আবার নিস্তব্ধ!
সেই স্তব্ধহীনতাই কি শেষ? নাকি অপর কোনো আলোয় আঁধার হওয়া? দূরের আকাশে মেঘ জমে, ভেঙে পড়ে না, কেবল রং বদলায় ধীরে ধীরে।
আমি তাকিয়ে থাকি—কিছু বোঝার জন্য নয়,
শুধু না-বোঝাটুকু ধরে রাখার জন্য। হয়তো সেখানেই তত্ত্ব লুকিয়ে থাকে—যেখানে উত্তর নেই, তবু প্রশ্ন থেমে থাকে না।
কবি পরিচিতি
শঙ্খশুভ্র পাত্র
গ্রাম : উলদপুর, পোস্ট : বালিঘাই
জেলা : পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ (ভারত)।
জন্মসাল : ১৮ অক্টোবর ১৯৬৩
জন্মস্থান : পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহানগর গ্রামে, মাতুলালয়ে।
ভালো লাগা : বই পড়া ও ভ্রমণ।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : আত্মার সাক্ষাৎকার।
কবি শঙ্খশুভ্র পাত্র পেশায় শিক্ষক। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর কবিতা ও ছড়া লেখার সূচনা। এপার-ওপার দুই বাংলার বিভিন্ন বাণিজ্যিক পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
ফোন : +৯১৯৭৩২৫৭০৮৬০
E-mail: sadapalak@gmail.com
