
শৈলজানন্দ রায়-এর গুচ্ছ কবিতা
পূর্বাভাস
যে ঝড়ের সংকেত নেই তার তাণ্ডবে ছিন্নভিন্ন ঘরবাড়ি,গাছপালা—এখন পুনর্বাসন চায়! হয়তো তুমি ছিলে আবহাওয়া অফিসের নিরীহ কর্মীর ভূমিকায়!
যে কবিতাটি লেখার ক্ষীণতম সম্ভাবনা নেই, তারজন্য ছাপাখানার কী সমীচীন বর্ণবিন্যাস— অহেতুক প্রকাশনায়! সেই কবিতার একটি উপমা দিনরাত ক্ষতবিক্ষত করে।
পাঠশালার স্মৃতিচারণে পড়ার চেয়ে বেত্রাঘাতের কথাই মনে পড়ে বেশী—এই শাস্তি অন্তরের মাধুর্য নিয়ে শ্রদ্ধা জানায়! এখানে সমস্ত আঘাতের কষ্ট মর্যাদায় ম্লান হয়ে পড়ে!
যে ভালোবাসা কস্মিনকালেও সত্যি হবার নয় তার নিষ্ফলা স্বপ্নে বিভোর যামিনী—মনকে আর কতটুকু বেঁধে রাখা যায়! সময়ে অসময়ে সেও প্রজ্জ্বলনের অগ্নিমন্ত্র পড়ে!
একটি দীন-হীন বৃষ্টির ফোঁটা—কতটুকু আর ভেজানোর ক্ষমতা তার, তবু সে মেঘের অস্তিত্ত্বকে মুখোমুখি চ্যালেঞ্জ করে।
দুইটি বাহুদিয়ে অসমাপ্ত একটি ত্রিভুজের কথা প্রাসঙ্গিক হতে পারে—পরিশ্রম সর্বদা সাফল্যের চাবিকাঠি নয়! বাস্তবতা ও ভাগ্যের ভূমিকা থাকে অন্তরে।
দেশপ্রেমের কথা বলে যে নিষ্ঠুর হত্যা, তার মর্যাদা ও অমর্যাদা দুই-ই ক্ষমতার হাতে। যে কারণে ধর্মের আচরণ আর পাপ আপোসে কখনো কখনো একই পথে হাঁটে।
যে বিচারের কথা মানুষ কখনো ভাবে না—দৃশ্যত তার কোনো আদালত নেই—বিচারক নেই। অদৃশ্যত সেই বিচারের ধারা ন্যস্ত থাকে প্রকৃতির হাতে।
বিভাজন
ভাগ একটি হৃদয়বিদারক নিষ্ঠুর ও মর্মান্তিক গাণিতিক প্রক্রিয়া হলেও এর মুহুর্মুহু প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার কিন্তু বিষাদগ্রস্ত ও অনিবার্য। সমষ্টিবাদীরা এই তছনছ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থেকেও যাদুবাস্তবতায় কাছে চলে আসে। কথিত আছে, আনন্দ ভাগ করলে বর্ধিত হয় এবং দুঃখ হ্রাস পায়। বাল্যকাল : খোকা, তোর এত একা খাওয়ার স্বভাব কেন রে?… তা কিন্তু এই ভাগ করতে না পারার ব্যর্থতায় নিমজ্জিত…
জগতে এমন অনেককিছু আছে যা ভাগ করা যায় না—থাকুক না হয় তারা অবিভাজ্য! সব দুঃখ নিঃশেষে বিভাজ্য নয়। কারণ সেখানে নির্ঘাত অবশিষ্ট রয়ে যায়, যা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
কোনো কোনো ভাগের উত্তর ঘুরে ফিরে একই হতে থাকে… আপন-পর। কে কাকে ছেড়ে যাবে কার সাথে কে বাঁধবে ঘর? ভাগের এমন মাহাত্মা—কিছু ভাঙন অসম্ভবের মতো জোড়া লাগানো প্রকৃতই কষ্টকর ।
ভাগ কিন্তু ছেড়ে দেওয়া মোহময় ব্যাপার! একটা ভাগের দিকে আরেকটা ভাগ ভঙ্গুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে… মনস্তত্ত্বগত, সংখ্যাগত, সম্পর্কগত এবং অবশ্যই বস্তুগত…
মানুষমাত্রই জীবনভর বিভাজনের শর্তে নিয়তির কাছেই নত।
লড়াই
এত যুদ্ধ যাপনের পর জীবন কী দিল হাতে
শান্তি-প্রশ্নে সন্ন্যাসীর ঘর উন্মুক্ত থাকার রীতি
যুদ্ধের কি-বা সামর্থ্য শান্তি নিয়ে আসে তাতে
সেই শর্তে নৈঃশব্দ্যের অন্তরালে শান্তির জ্যামিতি
কুন্তী জানে পুত্র-মৃত্যু সংশয়ে কতটা যাতনা
হায়! যুদ্ধ সেতো হারানোর বেদনাই লিখে রাখে
নদীর জ্ঞাতব্য কিবা কূলের ভাঙনের বেদনা
উদ্ধত শিকারী আজ পাখির দুঃখ কতটা মাখে!
এই যে বিশ্ব মেতেছে নিয়ত-যুদ্ধ ধ্বংসের খেলা
প্রেষ্ঠার আঙুল-স্পর্শ নেই ঘরহারা দীর্ঘশ্বাস
মাছি ভনভন স্বস্তি নেই একাকী যাবার পালা
এক টুকরো শান্তির প্রশ্নে আর কতটা সর্বনাশ?
মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ, সমাধিকল্পে সামীপ্য নাই
প্রকৃতি বলো শান্তির জন্য আর কী তোমার চাই?
শিকার
দৌড়ে পালাচ্ছে, আবার খাচ্ছে সবুজ তৃণ…
পুরো জগতটা মৃগ আর শিকারির খেলা
রাত্রিবেলা… রক্তাক্ত ধূসর মাংসের ভোজ,
সবুজ তৃণ পালাচ্ছে মৃগরা আসছে তেড়ে…
পুরো জগতটা তৃণ আর মৃগর খেলা
ভোরবেলা… শিশির ঝেড়ে সবুজ তৃণভোজ,
যেন, এভাবে খোঁজ আর ভোজ… প্রতিমুহূর্তেই
সেই সূত্রে পৃথিবীর তাবৎ ভোজই
রক্তাক্ত এবং বিশেষ হিংসাত্মক!
শুধু চন্দ্রভুক গ্রহণের কথা বলি কেন?
উনুন
পুড়তে পুড়তে এই যে কাবাবজীবনের তপ্ত-জ্বালা…
তবে, পোড়া মাংসের স্বাদ বরাবরই লোভনীয় হয়
কে জানে কাল কার মাংসের ভেতরে শিক যাবে
কার পুড়ে খাবার হবার পালা!
প্রাণ যায়, প্রাণ ফিরে পায়…
হায়! এই প্রাণ-সংশয়-রহস্য পৃথিবীময়
লণ্ঠনকে যাচিয়া প্রশ্ন করা যায়—
নিভে যাবার আগে তার অনির্বাণ প্রতিক্রিয়া?
আগুন সে তো জানে উত্তাপের সমস্ত পোড়-খাওয়া বাঁক
উদ্দেশ্যহীন অপেক্ষায় পোড়ামন—
ফিরে না আসা রাত্রিগামী পাখিদের ঝাঁক
পুড়েই তো শেষে দেশ স্বাধীন হয়
এভাবে অগ্নিমনষ্ক মন ছাই হবার আগে
প্রজ্জ্বলন সম্পর্কে ধারণা নেয়
যে কারণে দহনবাহিত দেহ কদাপি নিরপেক্ষ নয়
আর শ্মশানের অগ্নিসংষ্কার জন্মের সমস্ত দাগ ধুয়ে দেয়
বনের মিছিলে মর্মে মর্মে পুড়লে দাবানল…
হয়তো, অগ্নিবাজ রাঁধুনির ভূমিকায় তুমি ছিলে?
