
জীবন মরণ
সুশীল কুমার বল্লভ
নতুন অফিসে যোগদানের পর মনটা ভালো হয়ে যায় সমরেশের। একেবারে ঝকঝকে-চকচকে। আগের অফিসের চেয়ে শতগুণে ভালো। তাছাড়া অফিস, বাসা এবং বাচ্চার স্কুলও কাছাকাছি। পায়ে হেঁটে যেতে সর্বসাকুল্যে পাঁচ-সাত মিনিটের পথ। বাচ্চার স্কুলের ঠিক উল্টো পাশের গলিতে সমরেশের ভাড়া বাড়ি। ছয়তলা ভবনের চারতলায় থাকে সে। বউ বাচ্চাসহ তিন সদস্যের পরিবার। বাসা ভাড়া তুলনামুলক কম। বাইরের প্রাকৃতিক পরিবেশটাও খুব সুন্দর। শুধু বাচ্চার স্কুলে যাওয়ার গলিপথটি একটু ঘিঞ্জি। সে পথের দুই পাশে লম্বা টিনের ঘর। ছোটো ছোটো অনেকগুলো কক্ষ সেই ঘরে। বর্ষার দিনে পথটা স্যাঁতসেঁতে ও কর্দমাক্ত হয়ে যায়। কলোনির মধ্যের এই পথটাই সমরেশের অফিস এবং বাচ্চার স্কুলে যাবার একমাত্র পথ। গলির শেষ প্রান্তে একটি মাত্র চা-পান-বিড়ির দোকান। সেখানে লোকজন কম। মাঝে মাঝে দুএকজন পুরুষ লোক দোকানের সামনে ঢুঁ মারে আর দোকানীর সাথে কি যেন আলাপ করে।
প্রথম দিন বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে সমরেশ লক্ষ করে কলোনির ছোটো ছোটো ঘরগুলোতে মহিলাদের বসবাস। পুরুষ লোক সহজে চোখে পড়ে না। কি জানি, হয়তো পুরুষ লোকগুলো দিনের বেলা কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। আর মহিলারা ঘর গৃহস্থালী সামলায়। একহাতে বাচ্চার স্কুল ব্যাগ আর অন্য হাতে বাচ্চাকে ধরে সমরেশ যখন কলোনীর মধ্য দিয়ে হাঁটছিল তখন মহিলারা সবাই তার দিকে হাঁ করে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে দেখছিল। সমরেশের একটু লজ্জা লাগল। অমন করে কেউ তাকায়! সাধারণত একজন সুন্দরী মহিলা দেখলে পুরুষ লোকেরা যেভাবে তাকায় কিছুটা ঠিক তেমনভাবেই মহিলারা তাকে দেখছিল। হতে পারে এই এলাকায় সে নতুন, তাই হয়তো-বা।
বাচ্চাকে স্কুলে রেখে ফেরার সময় সেই একই পথে কলোনির সরু রাস্তা দিয়ে আসতে হয়। কলোনীর মধ্যে প্রবেশ করলেই সমরেশকে দেখলে মহিলারা আবারো বাঁকা চোখে তাকায়। কেউ কেউ অকারণে মিটিমিটি হাসে। সমরেশ অনেকটা অস্বস্তি বোধ করে। তাকে দেখে এমন অকারণ হাসির কি আছে সে বুঝতে পারে না। প্রথম প্রথম কয়েকদিন এভাবেই চলে যায়। এরপর মিটিমিটি হাসির পরিবর্তে অট্টহাসি আসে। বাঁকা চাহনির পরিবর্তে বাঁকা মন্তব্য আসে। তবে সবাই যে বাঁকা মন্তব্য করে এমনটি নয়। গলির একপ্রান্তে বৈদ্যুতিক খুঁটিটার পাশের রুমের একজন মহিলার মুখে কখনো বাঁকা মন্তব্য শোনেনি কিংবা তার মুখে কখনো হাসিও দেখেনি। নিরস বদনে সে সবসময় একটা বেঞ্চে বসে থাকত। আবার কখনো বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে থাকত।
একদিন সকালবেলা। বাচ্চাকে স্কুলে রেখে সমরেশ বাড়ি ফিরছিল। কলোনির মধ্যে প্রবেশ করতেই একজন মহিলা অন্য একজন মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলে, হ্যাঁ রে মুক্তা, অমন কইরা তাকাইয়া কি দ্যাখোস? উনি ভদ্দরলোক, তাকাইয়া কোন লাভ হইবো না। মহিলার কথা শেষ হতে না হতেই মুক্তা মুখে একটা ঝামটা মেরে বলে, ‘আরে রাখ তোর ভদ্দরলোক। পুরুষ মানুষ যদি ভদ্দরলোক হইতো, তাহলে আমরা এই নিষিদ্ধ পল্লিতে এলাম কীসের জন্য? বলেই আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
হঠাৎ এমন অনাকাঙ্খিত মন্তব্য শুনে সমরেশের কানটা ঝাঁঝাঁ করতে থাকে। একরাশ বিরক্তি আর ঘৃণায় ছেয়ে যায় তার মন। ছি! মহিলারা এত নোংরা হয় কী করে? মাথা নিচু করে দ্রুত পদক্ষেপে কোনো রকমে সরু গলিটা অতিক্রম করে। এতদিন পরে সে বুঝতে পারে তার এই চলাচলের পথটি আসলে একটি নিষিদ্ধ পল্লি। ছোটো ছোটো ঘরগুলোতে মক্ষীরানিরা সস্তা প্রসাধনী আর কড়া পারফিউম মেখে মৌমাছির অপেক্ষায় বসে থাকে। দিনের বেলায় মৌমাছির সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে রাতের চেহারা ঠিক উল্টো। নিষিদ্ধ পল্লিতে নিশি নেমে আসে, আর নিশিপদ্মের মধুর আশায় ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি আসতে থাকে। রাত ক্রমশ বাড়তে থাকে। সমরেশ তার চারতলা বাস ভবনের ব্যালকনিতে একটা ইজি চেয়ারে বসে। এখান থেকে নিষিদ্ধ পল্লির সকল কার্যকলাপ সুন্দরভাবে অবলোকন করা যায়। গলির শেষ প্রান্তে সেই চায়ের দোকানের সামনে এখন অনেক লোকজনের সমাগম। তবে চা পান করার মতো কোনো লোকজন নেই। সবাই এখন মধু পান করার জন্য তৈরি হচ্ছে। চায়ের দোকানটা মূলত বুকিং সেন্টার। আর দোকানদার লোকটা এই বুকিং সেন্টারের ম্যানেজার। খদ্দেরদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তিনি রুমের ঠিকানা দেখিয়ে দেন। ব্যালকনিতে বসে সমরেশ এই সব দৃশ্য লক্ষ করেন, আর ভাবেন সভ্য সমাজ আজ কোথায় এসে দাড়িয়েছে? দেহ আর রুপকে পুঁজি করে মানুষের এ কেমন জীবনযাত্রা? এ কি শুধু দুমুঠো অন্নের জন্য? না কি জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য? আর পুরুষ মানুষগুলো? এদের ঘরে কি মৌমাছি নেই? এরা সবাই কি প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আর সংসারে অশান্তি করে এখানে এসেছে? সমরেশ আর ভাবতে পারেন না। একরাশ ঘৃণায় ছেয়ে যায় তার মন। মাথার মধ্যে টনটন করে একটা ব্যথা অনুভব করেন। একটা সিগারেট ধরায় সে। কিছুদিন যাবৎ তার মাথার ব্যথাটা বেড়েছে। বিশেষ করে যেদিন সে মানসিক চাপ একটু বেশি নেয় সেদিনই তার মাথা ব্যথাটা বেড়ে যায়। তাড়াতাড়ি তার একজন ডাক্তারের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। মাথাব্যথার ওষুধটাও ইদানীং কোনো কাজ করছে না।
কয়েকদিন যাবৎ তার মাথায় আর একটি চিন্তা কাজ করছে। এই পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নেবে সে। এই ঘৃণিত নরকপুরীতে আর থাকা যাবে না। তার মন জুড়ে এখন শুধু ঘৃণার বসবাস। সে নিজেও জানে না আসলে সে কোনটাকে ঘৃণা করে, এই পেশাটাকে? নাকি এই পেশায় নিয়োজিত মানুষগুলোকে। তাই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সে নতুন বাসা খোঁজে। কিন্তু পছন্দমতো বাসা আর পাওয়া যায় না। কিংবা বাসা পছন্দ হলেও ভাড়া অতিরিক্ত বেশি, অথবা বাচ্চার স্কুলের দূরত্ব বেড়ে যায়। এ রকম বিভিন্ন কারণে বাসাটা ছাড়া হয় না। অফিসের এক কলিগের কাছে সে জানতে পারে তার ভাড়া বাসাটি নিষিদ্ধ পল্লি এলাকার মধ্যে হওয়ার কারণে এখানে জেনেশুনে কোনো ভদ্রলোক আসতে চান না। বাসা ভাড়াও তাই অন্যান্য এলাকার থেকে অর্ধেকেরও কম। ভাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসলে অন্যত্র বাসা ভাড়া নেয়ার আগ্রহ কিছুটা কমে আসে। কিন্তু যখনই ঐ চাপা গলিটুকু অতিক্রম করার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে হয় তখনই মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে আসে। মাথার ব্যথাটা হঠাৎ হঠাৎ বেড়ে যায়।
এখন সে চাপা গলিপথটুকু অতিক্রম করার সময় পারতপক্ষে কোনো মক্ষীরানির দিকে তাকায় না। তবে বিদ্যুতের খুঁটির পাশের রুমের সেই বিরস বদনে বসে থাকা ছিপছিপে গড়নের মহিলার দিকে মাঝে মাঝে তাকায়। মহিলাও যে সমরেশের দিকে তাকায় না এমনটা নয়। তবে সে চাহনিতে কোনো প্রকার ইঙ্গিত নেই। বড়ো দুশ্চিন্তাগ্রস্থ সেই মুখখানা। আর অন্য মহিলাদের থেকে তার চেহারায় একটা অন্যরকম জৌলুস আছে। কাঁচা হলুদের মতো তার গায়ের রং। মাঝে মাঝে সেই বেঞ্চে তাকে বসা না দেখলে জানালা দিয়ে এক পলকের জন্য তাকাত সমরেশ। হয়তো দেখা যেত সে ছোট্ট রুমের কোণে বসে টিভি দেখছে। সমরেশ মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে—সে তো এদেরকে ঘৃণার চোখেই দেখে। তবে কেন শুধু এই মহিলার দিকেই সে তাকায়? সে কি শুধু এই মহিলার বাক্যহীন ভদ্রতার খাতিরে?
সেদিন সমরেশ অফিস থেকে বাসায় ফিরছিল। গলির মধ্যে প্রবেশ করতেই সেই বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশের ঘরের মহিলার সাথে মুখোমুখি দেখা। দুজন দুজনার দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়েছিল। আর তাতেই সর্বনাশ। পাশের ঘরের এক মক্ষীরানি তাদের দেখে মন্তব্য করে—কিরে ছবি, তোর নাগর তো তোরে অনেকদিন ধইরা দ্যাখতাছে। আইজ তো তোর শুভদৃষ্টিও হইয়া গেল। যা, তোর রুমে নিয়া ভদ্দরলোকরে এট্টু ফ্রি আদর কইরা দে।
সমরেশ যেন হঠাৎ বৈদ্যুতিক শক খেয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কোনো রকমে বাসায় ফিরে আসে সে। সে ভেবে পায় না কেন তার সাথেই শুধু এমন ব্যবহার হয়। সে তো কারোর কোনো ক্ষতি করেনি। ভাবতে ভাবতে তার মাথার ব্যথাটা আরও বেড়ে যায়। ব্যালকনিতে এসে একটা ইজি চেয়ার টেনে বসে পড়ে। তার মাথা জুড়ে কেবলই আজকের অনাকাঙ্খিত ঘটনাটা ঘুরপাক খেতে থাকে। হঠাৎ নিষিদ্ধ পল্লির দিকে চোখ পড়তেই মাথাটা যেন আরও বেশি ঘুরপাক খেতে থাকে। আর ঘুরপাক খেতে খেতে চেয়ার থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে যায় সে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাতে সঙ্গাহীন হয়ে পড়ে।
যখন জ্ঞান ফেরে তখন হাসপাতালের বেডে নিজেকে আবিষ্কার করে সমরেশ। আশপাশে তার স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন। ডাক্তার তাকে কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছেন। আর বলেছেন—জরুরি ভিত্তিতে তার মাথার একটা সিটি স্ক্যান করা প্রয়োজন।
যথাসম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিটি স্ক্যান করা হয়। রক্তের কয়েকটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সিটি স্ক্যান রিপোর্ট দেখার পর ডাক্তার তাকে জানান তার মাথায় একটা ব্রেন টিউমার দেখা দিয়েছে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। অর্থাৎ ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ব্যাধি বাসা বেঁধেছে তার মস্তিস্কে। ক্যান্সারের খবর শোনার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সমরেশ। ডাক্তার তাকে আশ্বস্ত করেন—ভয়ের কিছু নেই। ক্যান্সারের এখন অনেক আধুনিক চিকিৎসা আছে। আপনার টিউমারটি ক্যান্সারের প্রথম স্টেজে আছে। কয়েকটা কেমোথেরাপি দিলে এবং সাথে কিছু ওষুধ খেলেই সেরে যাবে। ডাক্তারের অভয়বাণীতে সমরেশ কিছুটা ভরসা পান। কিন্তু কেমোথেরাপি যে অনেক ব্যয়বহুল চিকিৎসা।
একদিকে আর্থিক টানাপোড়েন, অন্যদিকে মৃত্যুভয়—এই দুই মিলে মিশে শুরু হয় জীবন-মরণের যুদ্ধ। তার ব্যাংকে সঞ্চিত কিছু অর্থ এবং জিপি ফান্ডের অর্থ উত্তোলন করে ইতোমধ্যে দুটি কেমোথেরাপি দেয়া হয়েছে। তার মাথার চুল সম্পূর্ণ ন্যাড়া হয়ে গিয়েছে। শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন সম্পূর্ণ সুস্থ হতে আরও দুই থেকে তিনটি কেমোথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এত অর্থের যোগান কোথা থেকে হবে এই চিন্তায় তার শরীরটা আরও ভেঙে পড়ে।
আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করেও কিছু অর্থের যোগান হয়েছে। স্থানীয় এনজিও থেকেও অধিক সুদে ঋণ নেয়া হয়েছে। সর্বশেষ কিছু স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি এবং স্ত্রীর গহনা অলংকার বিক্রি করেও কিছু টাকার যোগান হয়েছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এক একটি কেমোথেরাপি দিতে প্রায় তিন লাখের মতো টাকা খরচ হচ্ছে। শরীর এখন অনেকটাই সুস্থ। ডাক্তার সতর্কবাণী দিয়েছেন মানসিক চাপ মোটেই নেয়া যাবে না এবং একটি থেরাপিও বাদ দেয়া যাবে না । কিন্তু মাত্র একটি থেরাপি যখন বাকি তখনই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বেশি আর্থিক টানাপড়েন। এনজিও-র লোকজন বাড়িতে এসে কিস্তির টাকার জন্য চাপ দিচ্ছেন। আত্মীয় স্বজনরাও ইতোমধ্যে তাগাদা দিতে শুরু করেছেন। অথচ এখনই তার শেষ থেরাপিটির জন্য প্রায় তিন লাখ টাকার প্রয়োজন। কিন্তু কোথায় পাবে সে টাকা? টাকার আর কোনো উৎসের সন্ধান সে জানে না। সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে দুঃশ্চিন্তা করে কাটায়। তার প্রায় সেরে ওঠা স্বাস্থ্যটা আবার ভেঙে পড়তে শুরু করে।
সেদিন অফিসের এক কলিগ সমরেশের বাসায় আসে তার স্বাস্থ্যের খোঁজ খবর নিতে। সমরেশ তার কাছে তার স্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থা এবং আর্থিক দৈন্যের বিষয়ে আলোচনা করেন। দীর্ঘ আলাপচারিতার পর তার কলিগ বলেন, আমার এক বন্ধু আছে। ও একটি টিভি চ্যানেলে চাকরি করেন। আপনি চাইলে আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিতে পারি। ও ইচ্ছে করলে টেলিভিশনে আপনার একটা সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করিয়ে দিতে পারে এবং এর মাধ্যমে মানবিক সাহায্যের আবেদন করিয়ে দিতে পারে। আমার বিশ্বাস, এভাবে আপনার অর্থের সংস্থান হবে। বিষয়টি আপনি ভেবে দেখতে পারেন।
প্রস্তাবটি সমরেশের মনে ধরে। এবং অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তার কলিগের বন্ধুর মাধ্যমে একটি টিভি চ্যানেলে তার সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা হয়ে যায়।
সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রথমে সমরেশকে পরিচয় করিয়ে দেন। তার চিকিৎসার অতীত ও বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন এবং মানবিক সাহায্যের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। টিভির স্ক্রিনে সমরেশের ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নাম্বার এবং মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বার দেয়া হয়েছে। সবাইকে সেই নাম্বারে মানবিক সাহায্য পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালীন অনেকেই টাকা পাঠানো শুরু করেছে। কেউ দুই হাজার, কেউ এক হাজার, আবার কেউ পাঁচশ। তবে সমরেশের প্রাপ্তি সর্বসাকুল্যে ছাপ্পান্ন হাজার পাঁচশত টাকার মধ্যে থেমে যায়। হঠাৎ করে জ্বলে ওঠা আশার প্রদীপটি আবার নিভু নিভু করতে থাকে। কেমোথেরাপি দেয়ার তারিখও ঘনিয়ে আসছে। মাত্র আর কয়েকটা দিন বাকি আছে। কিন্তু অর্থের সংস্থান আর হয় না। তবে কি তীরে এসে তরী ডুবে যাবে? সমরেশ আর ভাবতে পারে না। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে তার বিনিদ্র রজনী কাটে। এমনিতেই তার শরীরের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। আর এখন রাত জেগে জেগে শরীরটা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ক্লান্তিতে শেষ রাতে তার দুচোখের পাতা এক হয়ে ঘুম এসে গিয়েছিল। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে দেখে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে। আড়মোড়া দিয়ে বিছানায় উঠে বসে সে। ঘেমে তার শরীরটা ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। টেবিলের ওপর রাখা জলের জগ থেকে এক গ্লাস জল পান করে সে। রাত এখন কটা বাজে? টাইম দেখার জন্য সে মোবাইল ফোনটা হাতে নেয়। প্রায় সাড়ে তিনটা। হঠাৎ তার নজরে আসে তার মোবাইল ফোনে একটি বার্তা এসেছে। বার্তাটি পড়েই তার চোখ ছানাবড়া। তার অ্যাকাউন্টে কে যেন দুই লক্ষ টাকা পাঠিয়েছে।
তার মোটেও বিশ্বাস হচ্ছে না। হয়তো হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় ঘুমের ঘোরে সে ভুল দেখে থাকবে। তাড়াতাড়ি সে তার অ্যাকাউন্ট চেক করে। দেখে সত্যিই কেউ একজন তার অ্যাকাউন্টে দুই লক্ষ টাকা পাঠিয়েছে। কিন্তু লোকটা কে? জীবনের এই চরম ক্রান্তিলগ্নে কে এলো দেবদূত হয়ে! তার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। ঈশ্বরকে সে ধন্যবাদ জানায়। একদিকে টাকা প্রাপ্তির রহস্য, অন্যদিকে টাকা পাওয়ার আনন্দে তার দুচোখের কোণে অশ্রু নেমে আসে। এমন সময় তার মোবাইল ফোনে আরো একটি দীর্ঘ বার্তা আসে। যে বার্তায় তার সমস্ত রহস্য উন্মোচিত হয়। বার্তায় লিখেছে—সমরেশ বাবু, সেদিন টেলিভিশনে আপনার স্বাক্ষাৎকার দেখলাম। দেখলাম আপনি খুব অসহায়। আমিও জীবনের কাছে অসহায়। এতদিন আমি শুধু আপনাকে দেখেছি, কথা হয়নি। সেদিন টেলিভিশনে প্রথমবার আপনার কথা শুনলাম। সামনাসামনি প্রথম দেখাতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনি একজন ভদ্রলোক। আর টেলিভিশনে আপনার কথা শুনে বুঝলাম আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে ভদ্র ব্যক্তিটি আপনি। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে আপনার এখন অনেক টাকা প্রয়োজন। আমার অবশ্য টাকার প্রয়োজন মিটে গেছে। তাই আমি আপনাকে সামান্য দুই লক্ষ টাকা পাঠালাম। যদিও আপনার প্রয়োজনের তুলনায় এ টাকা সামান্যই। তবে আমার সমগ্র জীবনের অর্জন এই দুই লক্ষ টাকা। যদি আপনার মতো ভদ্রলোকের এই টাকায় সামান্যতম উপকার হয় তবেই আমি কৃতার্থ হবো। আপনি জানেন আমাদের অর্জিত টাকা বৈধ পথে নয়। অন্তত আপনার মতো ভদ্রলোকের দৃষ্টিতে তা পাপের টাকা। কিন্তু কি আর করব বলুন। জীবন যে বড়ো অসহায়। আপনার কাছে অনুরোধ, আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবেন না। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো আমি অনেক দূরে চলে যাব। আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন এই প্রার্থনা করি।
ইতি-
আপনার ঘৃণিত নিষিদ্ধ পল্লির
ছবি
বার্তাটি সমরেশবার কয়েক ভালো করে পড়ে। কিন্তু ছবি মেয়েটি কে তা সে মনে করতে পারে না। অনেক ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মনে পড়ে সর্বশেষ যেদিন সে নিষিদ্ধ পল্লি থেকে ফিরে এসে মাথা ঘুরতে ঘুরতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, মুখোমুখি দেখা হওয়া সেদিন সেই বিরস বদনে বসে থাকা মেয়েটিকে পাশের এক মহিলা ‘ছবি’ নাম ধরে ডেকেছিল।
সমরেশ আর ভাবতে পারে না। তার জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে একজন গণিকার টাকা ঈশ্বর তার কাছে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছে। একজন গণিকাকে দেবদূত হিসেবে পাঠিয়েছে। সে ঠিক ভাবতে পারে না এই মহিলাকে সে কোন ভাষায় গালি দেবে, নাকি কোনো ফুলে পূজা দেবে। তারপর সে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয় আগে তার চিকিৎসা হোক। তারপরই সে ছবির মুখোমুখি হবে।
সমরেশের সব কটি কেমোথেরাপি শেষ হয়েছে। এখন সে প্রায় পুরোপুরি সুস্থই বলা চলে। হাসপাতাল থেকে ফিরেছে তা-ও প্রায় সপ্তাখানেক হলো। আজ সে নিষিদ্ধ পল্লিতে যাবে। ছবি নামের মেয়েটির মুখোমুখি হবে। আজ সে পল্লির সকল নারীদের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখবে। চাপা গলিটার মধ্যে প্রবেশ করে দেখে বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশের ঘরটির দরজা বন্ধ। যে ঘরে ছবি মেয়েটি থাকত। কী যে করি, কার কাছে জিজ্ঞাসা করি, ভাবতে ভাবতে সমরেশ শেষ পর্যন্ত গলির মাথার সেই চা দোকানদারের শরণাপন্ন হয়। দোকানে এখন লোকজন মোটেও নেই। শুধু দোকানদার আর সমরেশ। ছবির কথা জিজ্ঞাসা করার এই তো উপযুক্ত সময়। এক কাপ চা খেতে খেতে সমরেশ দোকানীকে জিজ্ঞাসা করেন—ভাই, এখানে ছবি নামের একটি মেয়ে থাকে না? আমি একটু তার কাছে যেতে চাই। কত টাকা দিতে হবে বলুন।
-সে তো আর নেই।
-নেই মানে? কোথায় গেছে সে?
-আপনি তাকে চিনতেন বুঝি। গত পরশুদিন সে মারা গেছে।
-মারা গেছে! সমরেশের কানটা যেন ঝাঁঝাঁ করতে থাকে। নিজের কানকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। ব্যস্ত হয়ে দোকানীকে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছিল তার?
-আর বলবেন না। ও ছিল এই পল্লির সবচেয়ে সুন্দরী ও ভদ্র মেয়ে। তাই ওর ঘরে খদ্দেরও ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ওর দুর্ভাগ্য, মরণব্যাধি এইডস্ ওকে আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। অনেকদিন ধরে তাই ও সবসময় মনমরা হয়ে বসে থাকত। কথাও খুব কম বলত। গত পরশুদিন সে হঠাৎ বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সবাই মিলে ধরাধরি করে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
সমরেশ আর বেশি কিছু ভাবতে পারে না। তার মাথাটা আবার টন টন করে ব্যথা করে। আকাশটা হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে যায়। একটা ঝড়ো ও শীতল হাওয়া বইছে। এখনই বৃষ্টি নামবে। দ্রুত সে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। তখন মনে হলো তার পা দুটো যেন আর সামনের দিকে চলছে না।
