
নাকফুল
পার্থসারথি
রাবেয়া বেগমের এমন অপরূপ সৌন্দর্য এই জীবনে অন্তত দেখেননি মহিদুল ইসলাম। শান্ত মুখাবয়বে যেন স্বর্গের দ্যুতি খেলা করছে; পৃথিবীর সকল সুখ, শান্তি, সৌন্দর্য এখন শান্ত মুখাবয়বে লেপ্টে আছে। মহিদুল ইসলাম নির্বাক তাকিয়ে স্ত্রীকে দেখছেন; স্নিগ্ধ সকালের সকল মুগ্ধতা যেন রাবেয়া বেগমকে ঘিরে আলো ছড়াচ্ছে। সবকিছুরই একটা সীমা থাকে কিন্তু দুঃখ আর সৌন্দর্যে সীমা যেন মহাকালের অতল গহ্বরে ডুবে আছে এখন। জোছনা ভরা ঝকঝকে আকাশে লক্ষ-হাজার তারার ভিড়ে তাকালে মনটা যেমন অজানা ভালোলাগায় উথাল হয় ঠিক তেমনি মহিবুল সাহেবের মনটা; স্ত্রীর অপূর্ব লাবণ্যে ডুবে আছেন অথচ জানেন এই ভালোলাগাটুকুতেই জীবনের অতৃপ্তি থাকবে অনন্তকাল। বুকের ভেতরটা কান্নার ঢেউয়ে হু হু করে ওঠছে অথচ কাঁদতে ভুলে গেছেন। এমন শান্ত, শ্রান্ত, স্নিগ্ধ রাবেয়াকে জীবনে কখনো দেখেননি; চিরঘুমের রাবেয়াকে আর ডেকে লাভ নেই! কষ্ট চাপা দেয়া বুকের ভেতর অনুভব করছেন স্ত্রী রাবেয়ার শূন্যতা; দুদিন আগেও হাসতে হাসতে বলেছিলেন, মহিদুল তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না! খুব ভয় হয়, তোমাকে ছাড়া কেমন করে কবরে একাকি থাকবো!
মহিদুল সাহেবের বুকটা হাহাকার করে ওঠে- রাবেয়া, আমার রাবেয়া!- বলেই জড়িয়ে ধরেন স্ত্রী রাবেয়াকে এবং বেশ আবেগতাড়িত হয়ে বলেন- তুমি সারাজীবন আমার বুকের মধ্যে থাকবে! তোমাকে আমি চলে যেতে দেবো না!
দুজন দুজনকে কতক্ষণ জড়িয়ে ধরেছিলেন মনে নেই। কিন্তু এটুকু মনে আছে দুজনার ভালোবাসার স্পর্শ আকাশ ও আকাশের রং-কে ছুঁয়েছিল, ছুঁয়েছিল মন মাতাল করা জোছনার আলো। অথচ ওদের দুজনার বুক জুড়ে ছিল রাজ্যের কষ্ট আর দুঃখ। সকল দুঃখ কষ্ট ডিঙিয়ে ওরা দুজন হেসেছিল বসন্তের কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো। একজন অন্যজনকে ভালোবেসেছিল, কিইবা আর করার ছিল এই শেষ বয়সে। ওদের থাকার কথা ছিল নিশ্চিন্ত প্রহরে, নিশ্চিন্ত জীবনে আর প্রশান্তির মুহূর্তে! ছিল তো গত সপ্তাহেও, ওরা আনন্দের ভেলায় ভেসেছিল আর ডুবেছিল ফাগুনের ঢেউ খেলানো মুগ্ধতায়-
মহিদুল-রাবেয়ার সোনার সংসার। দুই ছেলে আহসান আর মহসিন। তিন মেয়ে সেঁজুতি, সুকন্যা আর সুজাতা। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি ভালো বিয়েশাদিও দিয়েছেন। এখন প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত এবং রাজার হালেই আছে বলা চলে। তবে কেউ এখন আর দেশে নেই; অস্ট্রেলিয়া, কানাডা আর আমেরিকার মতো বিশ্বের উন্নত জীবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ ফোনে কথা বলে। মহিদুল আর রাবেয়া বেগম বেজায় খুশি। শুধু সন্তানদের শূন্যতায় বুকের ভেতরটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে। ওদের ওখানে বেড়াতে যাওয়া হয়নি এখনো। ওরা নাকি ভীষণ ব্যস্ত জীবনে থাকে কর্মস্থলে, একা একা ঘরে থাকা ভালো লাগবে না। তাই ছেলেমেয়েরা সময় সময় বেড়াতে আসে। এবারের ঈদে সবাই আসছে বাংলাদেশে। আনন্দে আর খুশিতে মহিদুল সাহেব আর রাবেয়া বেগম প্রায় পাগলপারা! ঘর সাজাতে-গোছাতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন। সন্তানদের কে কোনটা পছন্দ তা নিয়ে আসতে কিন্তু উনারা ভুলেননি। হোয়াটসঅ্যাপ কলেই জেনেছেন নাতি-নাতনিদের ভালোলাগাগুলো। বেড়াতে এলে নাতি-নাতনিরাও যেন সর্বদা আনন্দে থাকে সেই সকল ব্যবস্থা সেরেছেন। আনন্দের দিন নাকি বসন্ত আর ফাগুনের হাওয়ায় ভেসে চলে। সকল ছেলেমেয়েরা তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে হাজির যথাসময়ে। মহিদুল সাহেব আর রাবেয়া বেগমের ঘর যেন আনন্দের পসরায় আলোকিত। উঠতে বসতে রাবেয়া বেগম হাসি ছড়াচ্ছেন মহিদুল সাহেবের ভালোবাসার পুরো বাগানে। যেদিকে তাকানো যায় শুধু হাসি আর খুশি; যেন ফাগুনের বনে ফুলে ফুলে ভ্রমরের ওড়াউড়ি। সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনি নিয়ে মহিদুল-রাবেয়ার সংসার যেন চাঁদের হাট এখন!
কথায় বলে না, সুখ-দুঃখ হলো মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ; পিঠ উল্টে যাবে কখন কেউ জানে না। রাবেয়া বেগম কনিষ্ঠা কন্যার কন্যা সাবাহকে কোলে তুলে আদর করতে করতে বললেন- লক্ষ্মী দিদিভাই আমার, চাঁদের মতো দিদিভাই আমার!- বলতে বলতে টোল পড়া গালে আলতো টোকা দিয়ে বলেন- ফুলপরি দিদিভাই আমার! বলতে বলতে চুমোয় চুমোয় আর আদরের প্লাবনে ভাসিয়ে মনের গভীর থেকে বলে ওঠেন- তুমি বড় হও! আমার মায়ের দেয়া এই নাকফুলটা তোমার নাকে পরিয়ে দেবো!
পাশ দিয়ে মেজো কন্যা সুকন্যা যাচ্ছিল; কথাগুলো শুনতে পেয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে- মা, তুমি এটা কি বললে!
কিছুই বুঝতে না-পেরে অবাক নয়নে মেজো মেয়ের দিকে তাকালেন এবং সংক্ষিপ্ত উত্তর- কি বললাম?
ওই যে বললে, তোমার নাক ফুলটা এই আদরের নাতনিকে (ছোট বোন সুজাতার মেয়ে সাবাহকে দেখিয়ে) দিবে। তো আমার মেয়ে দোষ করলো কি!- বলেই রাগে আর গোস্সায় যেন ফেটে পড়তে লাগলো।
রাবেয়া বেগম যেন আকাশ থেকে পড়লেন। সত্যি বলতে কি, মহিদুল সাহেব কিংবা রাবেয়া বেগম তাদের সকল সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের সমান তালেই আদর করেন। মন থেকে কখনো এই আদর আর ভালোবাসাকে উনিশ-বিশ করেন না। এই নাতনিটা একটু বেশি আহ্লাদী তাই আদর করতে করতে কথাটুকু বলেছেন। মেয়ের কথার জবাবে আবার বলেন- তাতে কি হয়েছে? সাবাহ তো তোর বোনেরই মেয়ে।
সুকন্যা খোঁচা দিয়ে বলে- তা তো আমি মানা করিনি! তোমার কাছে আমার ছেলে-মেয়েদের কোন দাম নেই।
রাবেয়া বেগম বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন মেয়ের দিকে। মেয়ে সুকন্যা বলেই চলে- এই নাকফুলটা তুমি আমার মেয়েকে দিবে।
কথার ফাঁকে সেঁজুতি এসে হাজির। সে অবাক হয়েই বলে- মা, তুমি কাকে কি দিয়ে দিচ্ছো?
রাবেয়া বেগম চুপচাপ। সুকন্যা আবারো তার মনের কথাটি বলে ফেলে আবেগের তোড়ে।
এবার সেঁজুতি বলে অন্য কথা- শোন সুকন্যা, তোর যেমন অধিকার আছে তেমনি আমারও। শুধু নাকফুল কেন? মা-বাবার সবকিছু ভাগাভাগি হবে।
নাকফুল কী ভাগ করা যাবে?- সুকন্যা বেশ রাগান্বিত হয়ে বলে।
কেন ভাগাভাগি করা যাবে না! বিক্রি করে টাকা ভাগ করলেই তো হয়ে যাবে, তাই না?
ছোট মেয়ে সুজাতা এসে হাজির। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই সুকন্যা বলে- দেখ সুজাতা, বুবু কেমন স্বার্থপরের মতো কথা বলে?
কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে বলে- কেন, কী হয়েছে?
আমি আম্মুকে বলেছি, আম্মুর নাকফুলটি আমার মেয়ে লাবনীকে দিতে। আর বুবু বলে কিনা ওর মেয়েকে দিতে! কেমন হিংসুটে দেখ!
রাবেয়া বেগম এবার দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে উচ্চারণ করেন- তোরা এমন ঝগড়া করছিস কেন! আমি তো এমনি এমনি আমার দিদিভাই সাবাহকে আদর করতে করতে বলেছিলাম যে, নাকফুলটা ওকে দেবো। আমি কি দিয়ে দিয়েছি?
সুজাতা এবার অবাক হয়েই বলে- আম্মুর যাকে ভালো লাগবে তাকে দেবে, এতে আমাদের ঝগড়া করার কী আছে?
এবার তিন বোনের মধ্যে প্রায় তুমুল ঝগড়াই বেঁধে গেল। চেঁচামিচিতে বাড়ি সবাই এসে হাজির। কথায় কথায় এবার মহিদুল সাহেব আর রাবেয়া বেগমের সন্তানেরা নিজে নিজেই দফারফা করে নেয়; পেনশনের সকল টাকা, সকল স্বর্ণালংকার সহ বিক্রয়যোগ্য সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির থেকে প্রাপ্ত নগদ টাকা যথার্থভাবে ভাগাভাগি হবে। মহিদুল সাহেব নিরবে স্ত্রীর দিকে তাকান। রাবেয়া বেগম নির্বিকার।
পেনশনের পুরো টাকা, মায়ের সকল গয়না, বাজারের দুটো দোকান, সবগুলো আবাদী জমি; সবকিছু বিক্রয় হিসেবের খাতায় চলে এলো। সবকিছু বিক্রি করার পর শুধু বসতভিটাটুকু থাকবে। আর বিক্রয়ের এই পুরো টাকা ভাইবোনদের মধ্যে ভাগাভাগি হবে।
বিমর্ষ কণ্ঠে মহিদুল সাহেব বলেন- বাবা আহসান, তোরা যদি সবকিছু বিক্রি করে নগদসহ সব নিয়ে যাস তবে আমরা কি দিয়ে চলবো?
কেন, তোমার মাসিক পেনশনের টাকা পাও না? তাছাড়া এগুলোর হিসাব-নিকাষ করতে করতে অসুস্থ হয়ে যাবে। এই বয়সে এত ভার নেওয়া ঠিক না।
ছেলেমেয়ে বউ-সহ সকলেই আহসানকে সমর্থন করে প্রায় সমস্বরে বলে- ঠিক বলেছো ভাইয়া। হ্যাঁ আব্বা, ওই টাকাতে তোমাদের অবশ্যই চলবে।
যা মাসিক-পেনশন পাই যৎসামান্য, ওতে কী সংসার চলবে? তাছাড়া ওষুধপত্র লাগে প্রতি মাসে।– কথাগুলো বলতে বলতে মহিদুল সাহেব অসহায় দৃষ্টিতে সন্তানদের দিকে তাকান।
তোমরা দুজন মানুষ ভালোভাবেই চলবে।- বলে আহসান অন্যদের দিকে তাকায়।
রাবেয়া বেগম কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে- বাবারা! তোদের তো অভাব নেই, তাছাড়া তোর আব্বার বয়স হয়েছে মাসে মাসে অনেক ওষুধপত্র লাগে!
ছোট ছেলে মহসিন এবার প্রায় রাগান্বিত হয়েই বলে- তোমাদের হাতে এতগুলো টাকা শুধু শুধু পড়ে থাকবে। তাছাড়া আমরা তো আছিই নাকি!- কথাগুলো বলে অন্য ভাই-বোনদের দিকে তাকায় সে।
সবাই সমস্বরে বলে- হ্যাঁ আব্বা, যখনই দরকার হবে আমাদের জানিও। আমরা তো আছিই নাকি!
আহসান আবার বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে- আম্মু আমরা তো আছি। যখন দরকার পড়বে আমাদের জানিও, ব্যস্।
সব ভাইবোন ও বউরা আহসানের কথা সমর্থন জানিয়ে পক্ষ নেয়।
মহিদুল সাহেব ছেলেমেয়েদের ব্যবহার প্রায় বাকরুদ্ধ! এই মুহূর্তে কোনো কথাই বলতে পারছেন না। রাবেয়া বেগমের চোখের কোণ বেয়ে ঝরছে অশ্রুজল। মেয়েরা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে- আম্মু কাঁদছো কেন? আমরা তোমাদের ভালোর জন্যে বলছি। তাছাড়া আমরা আছি কি করতে?
সুকন্যা রাবেয়া বেগমকে জড়িয়ে ধরে বলে- আম্মু তুমি এত ভেঙে পড়ছো কেন? সমস্যা হলে আমাদের জানিও।
সুজাতা ও সেঁজুতি সমর্থন জানিয়ে বলে- আম্মু! আম্মু কোনো চিন্তা করো না, আমরা সবাই মিলে তোমাদের পাশে আছি।
রাবেয়া বেগম ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন স্বামীর দিকে। মহিদুল সাহেব দৃষ্টি সরিয়ে নেন। আসলে বলার ছিল অনেক কিছুই কিন্তু পরিস্থিতির বাঁকে বাঁকে তিনি ভীষণরকম পর্যুদস্ত। সকল বাঁধা ডিঙিয়ে শুধু উচ্চারণ করেন- আমাদের সবকিছুই তো তোদের। কিন্তু এখন যদি নিয়ে যাস তবে বিপদের মুহূর্তে আমাদের কী হবে!
তোমরা চিন্তা করছো কেন? আমরা আছি তো!- আহসান বেশ সুন্দরভাবে গুছিয়ে গুছিয়ে কথাগুলো বলে। ভাইবোন সকলেই আহসানের কথায় সম্মতি জানায়।
তা ঠিক আছে।- অস্পষ্ট কণ্ঠস্বরে বলেন মহিদুল সাহেব। তবে মনে মনে ভাবেন- তোরা প্রতিটা সন্তান কেমন যেন স্বার্থপর হয়ে গেছিস! বিদেশে থাকিস প্রায় এক যুগ অথচ একটিবারও আমাদের দুজনের কাউকে বেড়াতে নিয়ে যাসনি কেউ! একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সন্তানদের কল্যাণার্থে বলেন- তোরা যা ভালো মনে করিস!- বলেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি উঠে চলে যান।
সুকন্যা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে- আম্মু, তোমার নাকফুলটা আমার মেয়েকে দিও, ঠিক আছে?
রাবেয়া বেগম অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকান কিন্তু নির্বাক ও চুপচাপ।
সাথে সাথেই সুজাতা বলে ওঠে- আম্মু, নাকফুলটা আমার মেয়েকে দিতে চেয়েছিল, ওটার কথা আর বলবি না।
সেঁজুতি ধমকে বলে ওঠে- এই, তোরা এসব কী শুরু করেছিস! দফারফা তো হলো, সবকিছু বিক্রি করে যার যার প্রাপ্য মতে ভাগ-বাটোয়ারা হবে।
সুজাতা ম্লান কণ্ঠে বলে- ছোট্ট একটা নাকফুল, এটার দামইবা কত হবে! এটাতে ভাগ না বসালে হয় না?
ওমা! তুই বলিস কি! স্বর্ণের দাম জানোস! আজকের স্বর্ণের বাজারদর দুই লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার টাকা। নাকফুলটা কম-সে-কম চার রতি হবে। ওটা এমনি এমনি নিয়ে যাবি! ওটাতে তো আমাদেরও ভাগ আছে। কারো আলাদা করে কিছু নেয়ার দরকার নেই। বিক্রির পর টাকা ভাগ হবে। আর কেউ কোনো কথা বাড়ায় না।
রাবেয়া বেগমের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ, চোখের চাহনি যেন কেমন রকম ঝাপসা ঝাপসা আর কানের ভেতরজগৎ যেন চৈত্রের খরতাপে দগ্ধ। ছেলেমেয়েদের আচরণে একেবারে দিশেহারা। উনার এখনো মনে পড়ে বিয়ের দিন মা জহুরা খাতুন নাকফুলটি পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন- মা-রে! এটা শুধু নাকফুল নয়! আমার মা আমাকে নাকে পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন আমি আমার মেয়েকে যেন দেই। এই নাকফুলে মায়ের ভালোবাসার ছোঁয়া, মমতা, পরম্পরায় ছুঁয়ে যাওয়া সম্পকের স্নিগ্ধতা ও বন্ধন জড়িয়ে আছে।- ভাবতে ভাবতে রাবেয়া বেগমের চোখ জোড়া অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে চলে যাওয়া স্বামীর দিকে পা বাড়ান।
পেনশনের টাকা হাতে পাবার খবর পৌঁছানোর সাথে সাথেই সকল ছেলেমেয়েরা হুড়মুড়িয়ে দেশে আসে। মাসখানেক থেকে আনন্দ ফুর্তিতে দিন কাটিয়ে, সবকিছুর ভাগ পইপই করে কড়ায়গণ্ডায় হাতিয়ে আবার ফিরতি পথে সকলে। মহিদুল সাহেব এবং রাবেয়া বেগম নানান রকম দুঃখের মাঝেও সুখ খুঁজে নিয়েছিলেন; এতকিছুর পরও কিছুটা হলেও খুশিতে আর আনন্দে ছিলেন। ছেলে-মেয়েদের বিদায় বেলায়, বিশেষ করে নাতি-নাতনিদের করুন চাহনিতে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন দুজন।
তোরা রীতিমতো ফোন দিস কিন্তু!- রাবেয়া বেগম বেশ আবেগ তাড়িত হয়ে বলেন।
সন্তানেরা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে- কোনো চিন্তা করো না আম্মু, ফোন দেবো, কথা বলবো, দেরি হলে মনে কিছু করো না ভীষণ ব্যস্ত থাকি তো তাই।
রাবেয়া বেগম সন্তানদের কপালে আর কপোলে হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলেন- ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস আর স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখিস কিন্তু!
নাতি-নাতনিরা রাবেয়া বেগম আর মহিদুল সাহেবকে জড়িয়ে ধরে। সবকিছু ভুলে গিয়ে উনারা আবেগের তোড়ে ভাসতে ভাসতে সব দুঃখ ভুলে গিয়ে কাতর হয়ে পড়েন। কাঁদু কাঁদু কণ্ঠে আদরের হাত বুলাতে বুলাতে হয়ে পড়েন বেশ আবেগতাড়িত।
গাড়ি রেডি, এসো সবাই। সময়ের অতল গহ্বরে পা বাড়িয়ে সকলে বিদায় হয়। মহিদুল সাহেব ও রাবেয়া বেগম অপলক তাকিয়ে থাকেন সন্তানদের বিদায়ের মুহূর্তে। উনাদের থেকে সন্তানদের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে সময়। একসময় উনাদের দৃষ্টির আঁড়ালে চলে যায় সকলে। যেমনভাবে অদৃশ্য হয়েছে নাকফুলে বেঁচে থাকা পারিবারিক বন্ধন, হৃদ্যতা, ভালোবাসা আর চিরমমতা।
আশ্চর্য পাঁচ-পাঁচটা ছেলেমেয়ে, কেউ ফোন কল তো রিসিভই করছে না! দুসপ্তাহ হয়ে গেল অথচ পৌঁছে গিয়েও কোনো খোঁজ জানায়নি। কোন মেসেজও সিন করছে না।– শিক্ষিত তো করিনি সবগুলো সন্তানকে অমানুষ বানিয়েছি!- মনে মনে ভাবেন আর পর্যুদস্ত হৃদয়ে আশাহত পাখির মতো বিছানায় শায়িত স্ত্রী রাবেয়া বেগমের দিকে তাকান।
ছেলেমেয়েরা চলে যাবার পর থেকেই তিনি বিপর্যস্ত সময়ে পাড়ি দিয়েছেন। মহিদুল সাহেব নিজেকে সামলে নিয়েছেন কোনোমতে। কিন্তু রাবেয়া বেগম এমনিতেই নরম প্রকৃতির মানুষ তার ওপর সন্তানদের নির্মম আচরণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। চলে যাবার পর কোন ছেলেমেয়ে এখন পর্যন্ত যোগাযোগ করেনি। এছাড়া আদরের নাতি-নাতনিদের মুখগুলো দেখতে পাচ্ছেন না অনেকদিন! সাধারণত হোয়াটসঅ্যাপ কলে অথবা মেসেঞ্জার কলে নাতি-নাতনিদের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতেন। অবশ্য এই সুযোগটা পেয়েছেন পেনশনের টাকাটা হাতে পাবার পর। তখন যেন ছেলেমেয়েদের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা লেগেছিল মা-বাবার সাথে কথা বলার জন্য। এসব মনে মনে ভাবেন আর ভেতর ভেতর ভেঙে খানখান হন প্রতি মুহূর্তে; বিপর্যস্ত ভঙ্গুর মনে আহত হতে হতে এখন প্রায়ই ভুলে যেতেন হাইপ্রেসারের ওষুধ খেতে। ফলে যা হবার হয়েই গেল। ডাক্তারের ভাষ্য; মেজর স্ট্রোক, এই উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সম্ভব নয়। ঢাকা নিয়ে গেলে ভালো হয়। ন্যূনতম জেলা পর্যায়ে নিয়ে যেতেই হবে। এখানে হাসপাতালে বেডে সময় নষ্ট করা অনর্থক। যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে নিয়ে যান। নতুবা যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কিন্তু দরকার তো বিশাল অঙ্কের টাকা। ভাবতে ভাবতে মহিদুল সাহেব নিরুপায় হরিণীর মতো হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা নির্বিকার রাবেয়া বেগমের চোখে চোখ রাখেন। রাবেয়া বেগমের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কোনো কথা বলতে পারেন না। স্ত্রীর অচল হাতে হাত চেপে মহিদুল সাহেব বলেন- তুমি চিন্তা করো না, আমি টাকার ব্যবস্থা করছি যেভাবেই হোক। প্রয়োজনে ভিটাটুকু বিক্রি করে হলেও তোমার চিকিৎসা আমি করাবো।
মনে মনে ভাবেন, আবার চেষ্টা করে দেখি, ভেবেই বড় ছেলে আহসানকে সরাসরি ফোন কল দেন। রিসিভ করেই আহসান বলে- আব্বু এত বিরক্ত করছো কেন? এখন অফিসে আছি, পরে কল ব্যাক করবো।- বলেই ফোন কেটে দেয় আহসান।
বাবা আহসান… বাবা আহসান… শোন, শোন আমার কথাটা আগে শোন!
ওপার থেকে কোনো শব্দ নেই। ফোন ডিসপ্লেতে তাকান। কল কেটে দিয়েছে! মহিদুল সাহেবের মনটা ভেঙে খানখান হয়ে যায়! অস্ফুট উচ্চারণ- এতগুলো টাকা পেয়েও স্ত্রী আমার বিনা চিকিৎসায় চলে যাবে! না, আমি এ হতে দেবো না। ভিটেটুকু বিক্রি করেই তবে রাবেয়ার চিকিৎসা করাবো। কিন্তু মহিদুল সাহেবের সকল চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী রাবেয়া বেগম শান্ত হয়ে গেলেন।
মহিদুল সাহেবের বুকের ভেতর চলছে নিরব তাণ্ডব। কষ্টের তাণ্ডবে পর্যুদস্ত হতে হতে নিঃস্তব্ধ হয়ে স্ত্রীর পাশে বসে আছেন। খবর পেয়ে প্রতিবেশী আহাদ সাহেব ছুটে এলেন। মহিদুল সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললেন- মনটা শক্ত করুন, সবই আল্লাহর ইচ্ছা। ছেলেমেয়েদের খবর দিয়েছেন?
নীরব দৃষ্টিতে তাকান মহিদুল সাহেব কিন্তু কোনো কথা বলেন না।
বিপর্যস্ত মহিদুল সাহেবকে সান্ত্বনা দিয়ে আহাদ সাহেব বলেন- আপনি চিন্তা করবেন না। আমিই সবাইকে জানাচ্ছি।
না, কাউকে জানাতে হবে না ভাই!- বলেই মহিদুল সাহেব চোয়াল শক্ত করে বলেন- দয়া করে আপনি দাফন-কাফনের ব্যবস্থাটুকু করুন।
জি মুহিদ ভাই, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।
মহিদুল সাহেবের দৃষ্টি হঠাৎ করে বিগতা স্ত্রী রাবেয়া বেগমের নাকের উপর পড়তেই হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন- রাবেয়া! আমার রাবেয়া, তুমি হারালে নাকফুলটা আর আমি হারালাম তোমাকে, চিরতরে!
