
ভয়ংকর রাত
জোনাকী দত্ত
কিরে শুভ তোর হলো? তপু কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছে। মেয়েদের মতো তৈরি হতে তোর এতো সময় লাগে কেন বাপু বুঝতে পারি না। শুভর মা গজগজ করতে করতে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর জন্য কিছু খাবার ব্যাগে ভরে ড্রইং রুমে এলো। তপু বললো, কাকিমা শুভ কি এখনো সাজছে? আমার চা নাশতা খাওয়া শেষ হয়ে গেল এখনো সে তৈরি হতে পারল না। শুভর মা ব্যাগটা টেবিলে রেখে বললো, আর বলিস না, ওকে তো ছোট বেলা থেকেই দেখছিস। এতো স্লো, আমি আর পারি না ওকে নিয়ে। এত করে বললাম যে আজ ভূত চতুর্দশী। একটু সন্ধ্যার আগে পৌঁছে যা। দিদির বাড়িতে কালি পূজাতে যাওয়ার শখ হয়েছে যখন একটু বেলা থাকতে গেলে কি হয়। তপু হেসে বললো, আরে কাকিমা তুমি চিন্তা করো না, আজকাল ভূত বলে কিছু নেই। আমরা বাইকে করে দুই বন্ধু দিদির বাড়িতে সময় মতো ঠিক পৌঁছে যাব। শুভ এসে বললো, চল তপু, আমি তৈরি। মা ব্যাগটা নিয়ে শুভর হাতে দিয়ে বললো, এটা সাবধানে নিস। তোর দিদির পছন্দের খাবার। তারপর ওরা দুজন বেরিয়ে গেল। মা হাত মাথায় ঠেকিয়ে বললো, সাবধানে যাস, দুর্গা দুর্গা।
শুভ আর তপু ছোটবেলা থেকেই ওদের একসাথে বড় হয়ে ওঠা, বন্ধুত্ব, কোথাও বেড়াতে যাওয়া, খেলাধুলা, মাঝে মাঝে অভিমান, খুনসুটি, ঝগড়া, ভালোবাসা। এখন দুজন ভার্সিটিতে পড়ে। ওরা এবছর ঠিক করেছে শুভর দিদির গ্রামের বাড়িতে কালি পূজাতে যাবে। তপুরা যখন রওনা দিল তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। শুভ বললো, এই তপু সামনে দয়াময়ি ভাণ্ডার, গাড়ি থামা। তপু বললো, কেন? দিদির বাড়িতে কাকিমা বলেছে সন্ধ্যার আগে পৌঁছে যেতে। শুভ বললো, আরে রাখতো। আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। আগে গরম গরম মিষ্টি, আলুপুরি আর চা খেয়েনি। তারপর ওরা দুজন গাড়ি থেকে নেমে দয়াময়ির দোকানে এসে ঢুকলো। তপু খেতে খেতে বললো, তুই ঠিক বলেছিস শুভ। খুব ভালো খেতে। শুভ বললো, হ্যাঁ। দিদির জন্য মিষ্টি আর দই নিয়ে যাব।
এরপর ওরা আবার গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করলো। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ওরা তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর জন্য জমির আল দিয়ে যাওয়া শুরু করলো। কিন্তু কোনোভাবেই পথ যেন শেষ হচ্ছে না। শুভ বললো, কিরে ভাই, কোনদিকে যাচ্ছিস, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। পথ মনে হয় হারিয়ে ফেলেছিস। আমাদের কি সত্যিই ভূতে ধরেছে? তপু বললো, আমারও তাই মনে হচ্ছে রে। কাকিমার কথাই সত্যি হলো। আমি কেনো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। কোনো মানুষও দেখতে পাচ্ছি না যে জিজ্ঞেস করব রাস্তা কোন দিকে। শুভ বললো, আরে ফোনে নেটওয়ার্কও নেই। এখন কি হবে? তপু বললো, কেন যে মিষ্টি খেতে গেলাম। হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে গাছের একটা ডাল এসে পড়লো ওদের গাড়ির সামনে। শুভ ভয়ে চমকে উঠলো। তপু গাড়ি থামালো। তারপর দুজনে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো কোথাও আর রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। শুভ বললো, ভাই আমার কেমন শীত শীত লাগছে। তপু বললো, আমারও। আমার তো মনে হচ্ছে আমরা একই জায়গায় রয়ে গেছি। শুভ তপুর হাত ধরে বললো, একটা কাজ কর, আমরা বাইকটা এখানে রেখে চল ঐ গাছের নিচে কিছুক্ষণ বসি। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে পথ খুঁজে নেবো। তপু বললো, চল, আমিও আর পারছি না গাড়ি চালাতে। কিন্তু আগে গাছের ডালটি সরাতে হবে। না হলে পার হবো কি করে? এখন হয়তো অনেক রাত হয়ে গেছে। মোবাইলে টাইমটা দেখ তো। শুভ মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল মোবাইল অন হচ্ছে না। তপুর মোবাইলেও একই অবস্থা। তারপর গাছের ডালটি সরিয়ে ওরা একটু দূরে গিয়ে গাছের নিচে বসে পড়লো। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝে মাঝে ঝিঁঝি পোকার ডাকে ওরা চমকে উঠছে। দুজন পাশাপাশি বসে ভাবতে লাগলো কীভাবে পথ খুঁজে পাবে। হঠাৎ গাছের ডালপালা নড়াচড়া শুরু করে দিলো। একটা গুমোট ভাব চারপাশে। তপু ফিসফিস করে বললো, এই শুভ, তোর ভয় করছে? শুভ তপুর গা ঘেঁষে বসে বললো, একটু তো লাগছে। উফ্ রাস্তাটি পেয়ে যেতাম! চল তপু, গাড়ি আবার স্টার্ট দে। আমার মনে হয় এবার পাওয়া যাবে। তাছাড়া গাড়িতে তো হ্যাডলাইট আছে। তপু হঠাৎ ফিক করে হেসে উঠলো। অন্ধকারে ওর এই হাসির শব্দ শুনে শুভর মনে হলো যেন কোন ডাইনীর হাসি। ও আরো ভয় পেয়ে গেল। তপু শুভর কাঁধে হাত দিয়ে বললো, আরে ভয় পাচ্ছিস কেন? এখানে ভূতটূত বলে কিছু নেই। একটু বিশ্রাম কর সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিছুক্ষণ পর শুভ খেয়াল করলো তপু তার নিজের কাঁধে হাত দিয়ে বিরক্ত হয়ে বারবার কি যেন সরানোর চেষ্টা করছে। শুভ বললো, এই তপু কি হয়েছে তোর? তোর কাঁধে কি হয়েছে? তপু বললো, আরে অন্ধকারে বুঝতে পারছি না কি একটা যেন কাঁধে সুড়সুড়ি লাগছে। শুভ ভালো করে তাকিয়ে দেখলো তপুর মাথার উপরে এক জোড়া চোখ জ্বলজ্বল করছে। তারপর তপুকে ওখান থেকে একটানে সরিয়ে বললো, তপু দেখ। তখন ওরা দেখলো, ওরা যে গাছের নিচে বসেছিল সেই গাছে উল্টো করে ঘুরিয়ে ঝুলে আছে এক পেত্নী। ও হাত দিয়ে তপুকে বিরক্ত করছিল। তপু বললো, চল শুভ পালাই। ওরা যেই দৌড়াতে যাবে ঠিক তখনই পেত্নীটা হাত লম্বা করে ওদের দুজনকে ধরে রাখলো। তারপরূ বললো, অ্যাঁই, তোঁরা কোঁথায় পাঁলাচ্ছিস? আঁমি এঁই তেঁতুল গাঁছের উঁল্টো পেঁত্নী। আঁজ আঁমার থেঁকে তোঁদের নিঁস্তার নেঁই। তপু ভয়ে কাঁপতে লাগলো। শুভ সাহস করে বললো, এই তু…তু… তুই কি চা…স? পেত্নী তখন হো হো করে হেসে উঠলো। আঁমি দঁয়াময়ি ভাঁন্ডারের মিঁষ্টি আঁর দঁই খাঁবো। আঁমাকে এঁক্ষুনি দেঁ। শুভ বললো, এগুলো তো আমি দিদির জন্য কিনেছি। তোকে দেবো কেন? তপু বললো, ভাই, দিয়ে দে, দিয়ে দে। না হলে যে আমাদের ছাড়বে না! পেত্নী তখন তার লকলকে জিভ বের করে বললো, দিঁবি কিঁনা বঁল? নাঁ হঁলে তোঁদের ঘাঁড় মঁটকে খাঁবো! হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ। শুভ বললো, আগে ছাড় আমাদের, তারপর দেবো। পেত্নী বললো, আঁমার সাঁথে কিঁন্তু চাঁলাকি কঁরবি নাঁ। তোঁকে ছাঁড়লাম, যাঁ নিঁয়ে আঁয়। তাঁরপর তোঁর বঁন্ধুকে ছাঁড়বো। শুভ দৌড়ে গিয়ে মিষ্টি আর দই এনে পেত্মীকে দিলো। পেত্নী তার উল্টো মুখে গোগ্রাসে খেয়ে নিলো। সেই দৃশ্য দেখে শুভ আর তপু আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। তপু গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দেখলো সামনে বড় রাস্তা। ওদের এতোক্ষণ এই রাস্তাটি চোখেই পড়েনি। তারপর ওরা নিরাপদে শুভর দিদির বাড়িতে পৌঁছে গেলো।
লেখক পরিচয়
নাম : জোনাকী দত্ত
পেশা : সহকারী শিক্ষক
প্রবর্তক স্কুল এন্ড কলেজ প্রভাতী শাখা
পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম।
