অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২২, ২০২৬
৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২২, ২০২৬
৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিন্টু রহমান -
নূর-ই দরিয়া

নূর-ই দরিয়া

পিন্টু রহমান

 

আমি বলি জলসাঘর। দূতের অনুচর হয়ে ওই ঘরে বাইজীকে প্রথম প্রত্যক্ষ করেছিলাম। তার রুপে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ভরপুর মজলিস। নেশার পেয়ালায় চুমুক দিয়ে যে যার মতো নৃত্যরত। আমি নাচি, সে নাচে, উজির নাচে, নাজির নাচে- নাচে দরিয়া। শুধু কি তাই, যৌবন উন্মাতাল হয়ে নাচে বিশ্বময়। নারীর শরীর সৌন্দর্যের আঁধার। শরীরের ভাঁজে ভাজে লুকানো সৌন্দর্যে দৃষ্টি আটকে যায়। মেয়েটির রূপ নিয়ে অসংখ্য আলোচনা-
দেবী যে!
দেখছো না, দেবী দূর্গার মতো টানা টানা চোখ।
আহা, কী রূপরে ভাই! ওই রূপ দেখে মরতেও দ্বিধা নেই!
মরণে ভয় আমার। তবু দ্বিধা-সংকোচ কাটিয়ে নূরকে ছুঁয়ে দিয়েছিলাম। পুলকিত হয়ে উচ্চারণ করেছিরাম, আহ, কী প্রশান্তি!
আমার প্রশান্তি তো গোপালে অশান্তি। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে থেয়ে থাকে। হয়তো মাপ-পরিমাপ করে। শান্ত অথচ ভয়ংকর দৃষ্টি। অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। অসহায় বোধ করি। কি হবে এখন- বুড়িগঙ্গার জলে নতুন আরেকটি লাশ ভেসে উঠবে নাকি?
ভয়ে কুঁকড়ে যাই। মাথা গুজে দাঁতে নখ কাটি। রাজদণ্ডের আশে পাশে অবস্থান, তথাপি গোপালের চোখকে ভয়। তার চোখের ম্যারপ্যাঁচে অনেক কিছু ঘটতে পারে। লোকটাকে সুবিধার মনে হয় না। রাজদূত। রাজ্যের গুরু দায়িত্ব তার কাঁধে। সময় বদলিয়েছে। রাজসভায় গোপালরা একদা ভাঁড়ামি করতো। হাসির খোরাক যোগাতো। প্রজাদের মনোরঞ্জণ করতো। কিন্তু সাম্প্রতিক চিত্র ভিন্ন। গোপালের মর্জির ওপর রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত। তার হাত ধরে মসনদে না বসলে রাজার অকল্যাণ। রামলালের মতো ক্ষমতাশালীকে সে নস্যি জ্ঞান করে।
খুব সাধারণ আমি। আমার ক্ষোভ নূরের উপর। সাধারণ মানুষের হাতে ধরা দিলে খুব কি ক্ষতি ছিল! নাকি মহাভারত অশুদ্ধ হতো? অভিমান ভাঙাতে মেয়েটি আমাকে বলে, আরে বাপু, আমি তো সাধারণ হতে চেয়েছিলাম।
আমি প্রতিবাদ করি, তাহলে জলসাঘরে কেন?
সে দায় নাকি আমার। আমি ও আমরাই তার পরিণতির জন্য দায়ী। আমাদের কারণে সে পতিতার খাতায় নাম লিখিয়েছে। পৃথিবীর পথে পথে বেশ্যাবৃত্তি করে চলেছে।
হায়, বেশ্যার প্রেমিক আমি। নষ্ট মেয়ের জন্য বিপথগামী। ঘর-সংসার ফেলে রাস্তায় নেমেছি। নেশার ঘোরে মাতলামি করি। নূরের জীবন থেকে সরে আসার জন্য কেউ কেউ পরামর্শ দেয়। তা না-হলে নাকি অমঙ্গল হবে। মঙ্গল-অমঙ্গলের ওরা কি বোঝে? যদি নূরের কাছে আসতো, সৌন্দর্য উপভোগ করতো, তাহলে তারাও ফিরতে পারতো না।
নূরের জন্য মায়া লাগে। কজনের মন যুগিয়ে চলবে সে! পাচারকারীদের প্রতি মন বিষিয়ে ওঠে। শালারা এখনো থেমে নেই। অপ্সরীদের নিয়ত পাচার করে চলেছে। সদরঘাটের যে জলসায় নূরের অবস্থান, এমন অসংখ্য জলসাঘর বিদেশের মাটিতে। রাত নামলেই আলো ঝলমল ঘরে কামুক পুরুষ জড়ো হয়।
বুড়িগঙ্গার তীরে অন্ধকার। বুকের মধ্যে হাহাকার। জলের গহিনে আলোর বিচ্ছুরণ। ছোট ছোট ঢেউ ওঠে। ঢেউ ভেঙে এগিয়ে চলি। পায়ে পায়ে নূর পাশে এসে দাঁড়ায়। পালিয়ে এসেছে। প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়েছে। মেয়েটির সাহস আছে। আমি হলে পারতাম না। আলতো করে কাঁধে হাত রাখে। আমার চোখে তখনো দূরের বাতিঘরে। নূরের ছোঁয়া পাওয়া পরম সৌভাগ্যের। ভাগ্যবান আমি। প্রেমের আকর্ষণে তাকে রাস্তায় নামাতে পেরেছি। কেউ দেখলে মৃত্য নিশ্চিত জেনেও সদরঘাটের এই নির্জনে চলে আসি। জলের সংস্পর্শে রাত্রির রূপ উপভোগ করি। গোলাম আলীর কথা ভেবে খানিকটা আস্বস্ত হই।
নূরের পানি তাকিয়ে অবাক- একি তোমার চোখে জল যে!
প্রেমিকার চোখে জল। গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। হুহু করে কাঁদে সে। কি করবো বুঝতে পারি না। সান্ত্বনার ভাষা নেই। নির্বাক চেয়ে থাকি। কাঁদুক মেয়েটি। পাপ করেছে। আজন্ম কাঁদতে হবে তাকে। কেঁদে কেঁদে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। কি ভেবেছে সে- খুন হওয়া মানুষগুলো কি সহজেই তাকে ছেড়ে দেবে!
রক্তের কথা মনে হলে মাথার মধ্যে গুলিয়ে যায়- রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশে আর কত রক্তপাত!
হতাশায় নুয়ে পড়লে মেয়েটি নতুন গল্প শোনায়। এক সাগর রক্ত পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যায় ঐশ্বর্য্যের কাছাকাছি। এ এক অচেনা দ্বীপ। চর্তুদিকে ছড়ানো ছিটানো রয়েছে, হীরা, পান্না, মনি-মুক্ত-মানিক্য। ঔজ্জ্বল্যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আলো ঝলমলে প্রান্তর। রানির বেশে নূর আমার বাহুডোরে। নিজেকে রাজা-বাদশাহ মনে হয়। মনে হয়, চাউলের পাহাড়ে আসন পেতেছি। অসম্ভব কি! টাকায় আট মন চাউল হলে পাহাড় গড়তে কতক্ষণ!
বাংলা ও বাঙালির সুদিনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গৌরবময় অতীত। অতীত স্মৃতি রোমন্থন করি। এক চিলতে সুখের আশায় অসংখ্য ভিনদেশি এই জনপদ চষে বেড়িয়েছে। কামলা খেটেছে। নবাবদের ঋণ স্বীকার করে বলি, হুম, আজব ব্যাপার। ইতিহাসের পাতায় শায়েস্তা খাঁ অমর হয়ে থাকবে।
বুড়িগঙ্গার কুল ধরে ভেসে চলি যমুনার পথে। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আগ্রার তাজমহল। প্রেমিক শাহজাহানের অমর কৃতি। প্রাসঙ্গিক হয়ে আলোচিত হয় কোহিনুর উপাখ্যান- কোহিনুরকে মনে পড়ে তোমার?
ঠিকঠাক বুঝতে পারি না- কোন কোহিনুর? কার কথা বলছো?
ওমা, কোহিনুরকে জানো না!
সবাইকে চেনা অসম্ভব। তবু চেনাজানা কহিনুরের কথা স্মরণে আনি। টান বাজারে কোহিনুর নামে এক পতিতার সাথে পরিচয় ছিল। প্রতিবেশীর স্কুল-পড়ুয়া মেয়ের নামও কোহিনুর। তাছাড়া কোহিনুর শিল্পগোষ্ঠী নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নূর ঠিক কাকে বোঝাতে চাচ্ছে?
কি মশাই, পারলে না তো!
না, মনে করতে পারছি না। স্কুলে পড়া না-পারা ছাত্রের মতো বলি। নূর আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আরে মশাই বিশ্বের সবচেয়ে দামি পাথরের কথা বলছি।
ইয়েস, মনে পড়েছে। রানি এলিজাবেথের মুকুটের কথা মনে পড়ে। এককালে রত্নটি আমাদের ছিল। কোহিনুর আমাদের গর্বের প্রতীক। মুঘল সম্রাট সাহজাহান তার পাগড়িতে প্রথম রত্নটি ব্যবহার করেন। মহামূল্যবান। কথিত আছে, সারা বিশ্বের সাত দিনের আয়ের সমান তার মূল্যমান। কহিনুরের সৌন্দর্য সম্পর্কে পারস্যের সম্রাট নাদির শাহ উল্লেখ করেছে, ‘এটা চিলের ডিমের মতো এবং তা এতো উজ্জ্বল যে, যেন সূর্যের হৃদয় ধারণ করে আছে।’ দুর্ভাগ্য, কেহিনুরকে আমরা সংরক্ষণ করতে পারিনি। আফসোস- যা ছিল মুঘল সম্রাজ্যের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতীক তা এখন ব্রিটেনের রাজ পরিবারের শোভা আর আভিজাত্যের স্মারক!
কহিনুরের দুর্ভাগ্যের জন্য নূর ব্যথিত। আমিও। জলের পানে চুপচাপ চেয়ে থাকি। জল গড়ায়। সময় বয়ে যায়। রাত্রি গভীর হয়। নূর আরো বেশি তন্ময়তায় ডুব দেয়। মহলে ফেরার কথা বললে একদিন আপত্তি করেছিল, না, ওখানে আর ফিরবো না। একটু ভালো লাগে না। চার দেওয়ালের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসে।
সে পালাতে চায়। মহল ছেড়ে জীর্ণ কুঠিরে ঠাঁই চায়। রাজপ্রাসাদ ভালো না। প্রথমে মনে হয়েছিল হেঁয়ালি। আমিও হেঁয়ালি করি, তাহলে এসো রানি। হাতে হাত রাখো। এক্ষুণি পালাবো। চোখের নিমেষে পৌঁছে যাবো চন্দনদ্বীপে। পুনরায় সংসারী হবো।
নূরের মনে শংসয়, সত্যি বলছো কবি! সত্যি সত্যি তুমি আমাকে গ্রহণ করবে?
বাহ,‘কবি’! মহাজনদের সাথে সখ্যের কারণে সে আমাকে মশাই ডাকতো। এই প্রথম কবি! খুব ভালো লাগে। আমি না হয়ে অন্য যে কেউ নূরকে গ্রহণে দ্বিধা করতো না। প্রয়োজনে জীবন বিসর্জন দিত। আমিও চেয়েছিলাম, কিন্তু সাহসে কুলায়নি। গোপাল ও রামলালের কথা স্মরণ করে ভয়ে আঁতকে উঠেছিলাম মাত্র।

দুই.
বুড়িগঙ্গার জলে নতুন আরেকটি লাশ ভেসে উঠলে মনের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়। নিজেকে নিরাপত্তাহীন মনে হয়। পাথর চোখে লাশের পানে চেয়ে থাকি। যে যাই বলুক আমি তো জানি, লাশের সাথে নূরের কী সম্পর্ক। কিন্তু সাধারণ মানুষ জানে না। তারা ভুল বোঝে। ভুল করে। মিডিয়াকর্মীরা তৎপর। লাইভ স্বাক্ষাৎকার প্রচার করে। মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে ভিন্ন মত-
লোকটি নেশা করতো।
সাধারণ মানুষকে পাত্তা দিত না।
নিশ্চয় উনি অপরাধী; তা না হলে খুন হবে কেন?
যাই হোক, লোকটি তো মানুষ ছিল! খুনের কারণ উৎঘাটন হওয়া প্রয়োজন। উপস্থাপকরা আশার কথা শোনায়। সাত হাত মাটির নিচে থাকলেও খুনীরা রেহাই পাবে না। শিকড়সুদ্ধ তাদের উৎপাটন করা হবে। কি ভেবেছে শালারা, দেশটা কি মগের মুল্লুক!
মগরা নেই। স্বদেশে ফিরে গেছে। যা করার আমাদের করতে হবে। রাজদূত গোপাল চিন্তিত। সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক তাকে ছাড় না দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। মানুষ খুন হলে রামলালের গুরত্ব ও ব্যস্ততা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। নিরাপত্তা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তি সে। তার মুখে কড়া কথা শুনে দেশবাসীর বুকে আশা সঞ্চার হয়। না, খুনির বোধহয় রেহায় নেই।
লাশের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ টিপে হাসি। নূরকে আড়াল করতেই যত সব আয়োজন। মেয়েটি আর কত প্রাণ হরণ করবে। কত নাগর লাশ হয়ে নদীর জলে ভেসে উঠবে? মৃত মানুষগুলো জলসাঘরের সাথে সম্পৃক্ত। দেকভাল করার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু সুন্দরী নারীর পাশে পুরুষ কতক্ষণ নিরাপদ? আর নারী যদি হয় ছলনাময়ী তাহলে তো কথা নেই। ফাঁদে পা দিতে বাধ্য। নূরের প্রেম উপেক্ষা করা সত্যি সত্যি কঠিন। সম্ভোগ শেষে মহাজনরা ফিরে গেলে ঘরের কর্মচারীরা সুযোগ নেয়। লোলুপ দৃষ্টিতে ঘুরঘুর করে। কেউ কেউ প্রেম অনুভব করে। যারা প্রেমিক তারা আরো অগ্রসর হয়। ছুঁয়ে দেখে। স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নবাজ মানুষগুলোই বুড়িগঙ্গার জলে লাশ হয়ে ভেসে ওঠে।
এবার যিনি খুন হয়েছেন তিনি সাধারণ কেউ নন, ঘরের তত্ত্বাবধায়ক কালাচাদ বিশ্বাস স্বয়ং নিজে! গোপালের চোখেমুখে বিস্ময়! লোকটিকে সে বিশ্বাস করেছিল। ভেবেছিল, কালা-বোবা হয়ে দায়িত্ব পালন করবে। আরে বাপু, রাজা-বাদশাদের মাল ছুয়ে দেখার দরকার কী? তোর কাজ পাহারা দেওয়া। বেশতো দিচ্ছিলি। বুড়ো বয়সে ভিমরতি ধরলে কি হয় এবার বোঝ!
আমি বুঝেছিলাম। এজন্য নূরকে প্রত্যাখান করতে বেগ পেতে হয়নি। বুকে হাহাকার নিয়ে ফিরে এসেছি। কালাচাদের জন্য দুঃখ হয়। লোকটিকে আমি চিনতাম। সৎ। সরল-সোজা। নূরের সাথে তার সম্পর্ক মেলাতে সচেষ্ঠ হয়ে উঠি। সম্ভোগের বিষয়টি অমূলক। বরং ভিন্ন কিছু- নূরের জীবনের গোপন অধ্যায় সম্পর্কে সে অবগত ছিল। মেয়েটিকে নিয়ে কানাকানি শুরু হয়েছিল। আর একারণেই সে খুন হয়ে থাকতে পারে।
মানুষ খুন হলে জলসাঘরের দৃশ্যপট বদলে যায়। কিছুদিনের জন্য শালিসঘরে পরিণত হয়। গোপালের আনাগোনা বেড়ে যায়। দেশিবিদেশি মেহমান উপস্থিত হয়। ঘটে যাওয়া ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে। নূরের নিরাপত্তা বিষয়ে নতুন নতুন ছক আটে। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। চোখের ইঙ্গিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ইঙ্গিত অনুধাবনে রামলালের দক্ষ। দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে।
কালাচাদ খুন হওয়ায় গোপাল বিব্রত। রামলালের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে- তুমি ভুল করেছো অফিসার।
গোপালে চোখকে রামলালও ভয় পায়। ভয় জড়ানো কণ্ঠে বলে, জি, হুজুর। একটু ভুল হয়ে গেছে।
একটু না, বলো মস্তবড় ভুল।
জি, ছ্যার মস্তবড় ভুল।
এর ফল কি জানো?
ফলাফল সে জানে। তার চাইতে ভালো আর কে-ই-বা জানে! অনেক ঘটনার স্বাক্ষী সে। গোপালের পা জড়িয়ে ধরে রামলাল হাউমাউ করে কাঁদে, ক্ষমা করুণ হুজুর। এবারের মতো অধমকে ক্ষমা করুণ। কিছু হলে ছেলেমেয়েরা পথে বসবে। না খেয়ে মরবে।
কে কাকে ক্ষমা করবে! গোপালের কপালে চিন্তার ভাজ। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কষ্টকর। রামলালের মতো সেও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

তিন.
নূরের নিখোঁজ হওয়ার খবর চাউর হলে পুনরায় হাসি আমি। এটাই বাকি ছিল। যাক ভালো হলো- সাপও মরলো লাঠিও ভাঙলো না। আমার বুকের মধ্যে ঝড়। বিবেক তাড়িয়ে বেড়ায়। নীরবে অন্যায় সহ্য করা অনুচিত। দেশপ্রেম প্রবল হয়। এ মাটির সন্তান আমি। কিছু দায় তো আছে! নিজেদের স্বার্থে মেয়েটিকে ফেরানো দরকার। মেয়ে বলতে বাস্তবের কেউ না; কল্পিত নারী। নূরকে আমি প্রেমিকা হিসেবে কল্পনা করেছি। তবে সে নারীও। আর যাকে জলসাঘর বলছি সেটা আসলে সোনালী ব্যাংকের সদরঘাট শাখা। মৃত কালাচাঁদ বিশ্বাস সদরঘাট শাখার ব্যবস্থাপক ছিল। ব্যাংকের ভোল্টে গচ্ছিত ছিল ‘নূর-ই দরিয়া’ নামের অমূল্য রত্ন। বাংলায় যার অর্থ- আলোর নদী। মুঘল সম্রাটদের কাছে রত্নটির খুব কদর ছিল। সম্রাজ্যের পতন হলে অন্ধপ্রদেশের মারাঠা রাজা সেটি কিনে নেন। পরে হায়দ্রাবাদের নবাবদের পূর্বসূরির নিকট ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকায় (তখন এক টাকায় আট মন চাউল পাওয়া যেত) বিক্রি করেন। ১৮৫০ সালের দিকে কোহিনুরের সাথে নূর-ই দরিয়া ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির করায়ত্ব হয়। সেখান থেকে রাজ পরিবারে! রানি এলিজাবেথ নিজের সৌন্দর্য আর আভিজাত্য বৃদ্ধির জন্য রত্ন পরিধান করতেন। ঘটনাক্রমে ১৮৫২ সালে ঢাকার জমিদার খাজা আলিমুল্লাহর কাছে নূর-ই দরিয়াকে বিক্রি করা হয়। তিনি ও তার পরিবার এটিকে বাজুবন্দ হিসেবে ব্যবহার করতো। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর রত্নটি তার স্টেটের ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে চলে যায়। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে খাজা নসরুল্লাহ ১৯৪৯ সালে এটিকে ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকা শাখায় হস্তান্তর করেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকার শাখা বন্ধ করে চলে গেলে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্থানের ঢাকা সদরঘাট শাখায় পুনরায় হস্তান্তরিত হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে নূর-ই দরিয়াকে দেখভালের দায়িত্ব পড়ে সোনালী ব্যাংকের ওপর।
মূল্যবান এ রত্ন সম্পর্কে দেশবাসী তেমন অবগত নন। কিংবা যারা উৎসাহ দেখাতো; নূরকে কেন্দ্র করে শুভ সম্ভবনার কথা ভাবতো, বুড়িগঙ্গার জলে তাদের লাশ ভেসে উঠতো।
নূর-ই দরিয়ার নিখোঁজ হওয়া ও তার মূল্যমান জেনে কতিপয় দেশপ্রেমিক নড়েচড়ে বসেছে। ইতিহাস ছেড়ে আমি অঙ্কের পাঠ নিচ্ছি। যোগ-বিয়োগের ধারায় সময় আবর্তিত হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে নূর-ই দরিয়া অমূল্য রত্ন। কোহিনুর যদি হয় পৃথিবীর সাত দিনের আয়ের সমান তবে নূর-ই দরিয়া কমপক্ষে ছয় দিন তো হবেই! অথচ এই সম্পদ হাতছাড়া হতে চলেছে। গোপালরা বসে নেই। লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়মিত বৈঠক চলছে। ব্যাংক কর্মচারীরা আতঙ্কিত। তারা নজরবন্দি অবস্থায়। চোখের ইশারায় নিত্যনতুন আইন জারি হচ্ছে। যে যার মতো চুপচাপ। নূর বিষয়ে তারা অজ্ঞ। কিন্তু বৃদ্ধ পাহারাদার গোলাম আলী দেশপ্রেমিকের খাতায় নাম লিখিয়েছে। মিডিয়ার সামনে মুখ খুলেছে। সে নাকি নূরের খবর জানে!
ভয়ানক খবর!
একাত্তরেও লোকটি খবরের শিরোনাম হয়েছিল। জাতির বুক থেকে জগদ্দল পাথর সরিয়েছিল। কারো কারো মতে এবারো সে সফল হবে। কী যে করি! আড়ালে-আবডালে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি। দ্বিমুখী সম্ভাবনা মনের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারে- হয় নূর উদ্ধার হবে, না-হয় বুড়িগঙ্গার জলে নতুন আরেকটি লাশ ভেসে উঠবে!

রচনাকাল : ৯ অক্টোবর ২০১৬।

Read Previous

মজাপুকুর আর মহল সমাচার

Read Next

আলোদায়ী অন্ধকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *