
মজাপুকুর আর মহল সমাচার
নিলুফা আকতার
গায়ে-গতরে প্রায় দীঘির সমান কিন্তু প্রাণের দিক দিয়ে পুকুরটা পুরাই মজা। ময়লা-আবর্জনা যেন পোকামাকড়ের অভয়াবাসন হয়ে গতরটাতে অনবরত কিলবিল করতে করতে নোংরা এক আসর জমিয়ে রেখেছে। এতকিছুর পরেও দূর থেকে চোখ পড়লে সবুজের স্নিগ্ধতা দৃষ্টিকে মুগ্ধ করে মনকে আরাম দেয়। কাছে গেলে দলবদ্ধ এদের দিকে তাকালে মনে হয় ‘ভিখু’র দেহের সেই দগদগে ঘা কিংবা বিগত যৌবনা কোনো বারবণিতার শরীরের জমাট দুর্গন্ধযুক্ত পঁচে যাওয়া গলিত গোপন কোনো ব্যাধি যেন, কেমন গা গুলিয়ে প্রচণ্ড ঘিন্ ঘিন্ লাগে। কিন্তু মৎস্যমাতারা পুকুরটার প্রতি বড্ড প্রসন্ন। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেও তারা বংশবৃদ্ধি করেই যাচ্ছে। কোনো ক্লান্তি নাই ক্ষান্তি নাই! জল-রৌদ্র-মৃত্তিকার আশীর্বাদে আদরে-অনাদরে চারপাশে লতা-গুল্ম-বৃক্ষের ঘনবসতি অনবরত বেড়েই চলছে। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, বিশৃঙ্খলভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই জঙ্গলকে উপেক্ষা করে ঘাড়টা যথাসম্ভব উঁচু করে চোখকে সামনের দিকে প্রসারিত করলে, বহুদূরে দৃষ্টির সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ একটি বিশাল মহল-সদৃশ্য বাড়ি পথিকের মনকে চমৎকৃত করে, কৌতূহলী করে আবার চোখে বৈচিত্র্যও এনে দেয়।
এর অঙ্গসজ্জা মান্ধাতা আমলের কিন্তু লেপ্টে থাকা সাদা ধবধবে রঙটা যেন এই পোকামাকড়, এই ওঁজলা, এই ক্রমাগত সবুজের ঘোর থেকে মনকে অন্যকোনো জগতে টেনে নিয়ে যেতে চায়। এই মহল-দেহের নিজের শরীরেও আট কুঠরি নয় দরজা আছে, আছে অনেক কথা-কাহিনি! আজ না হয় থাক সেসব কথা! সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা হলো, বসতিশূন্য এই নিষ্প্রাণ মহলটার যত্ন-আত্তির কোনো কমতি নাই। সেই কবে থেকে গায়ের মানুষ দেখছে, একজন বুড়ো চৌকিদার রাখাল হয়ে এর পাহারায় আছে। প্রতিবছর মহলের শরীরটা সাদা রঙে উজ্জ্বল আর পবিত্র করা হয়। গায়ের লোকজন শুধু বাহিরটা দেখে। ভেতরটা কেমন কেউ জানে না! বছরে দুই/একবার বিশাল সাইজের গাড়িতে করে একঝাঁক মৌসুমী পাখির আবির্ভাব ঘটে। এরা সর্বোচ্চ দুই/তিনদিন থেকে আবার উধাও হয়ে যায়। দূর থেকে মানুষের আকৃতির কিছু লোকজনের ঝাপসা ঝাপসা অবয়ব দেখে গায়ের মানুষের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ওখানে যাওয়া তাদের নিষেধ। মোটের উপর এদের আসা-যাওয়া দুটোই আকস্মিক এবং রহস্যময়। গাঁয়ের সহজ-সরল-মূর্খ-ধূর্ত মানুষগুলোর কেউই আসলে এ বিষয়ে অতশত বোঝে না কিন্তু মহলটার প্রতি তাদের নজর আর আগ্রহ ঠিকই বহাল রয়। তাদের সমাজ থেকে একদম বাইরে, নিজের মতো করে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা মহলটার প্রতি এদের এক ধরনের ঈর্ষাও আছে। বিশেষ করে যখন মহলটার দেহে রঙ চড়ানো হয়, তখন এই প্রাণহীন অঙ্গটার উপর গায়ের মানুষ কেমন ক্ষেপে যায়। গঞ্জের দোকানে, পথে-ঘাটে, নদী পাড়ে, পুকুরঘাটলায়, ধানক্ষেতের আনাচে-কানাচে, কখনো প্রাচীন অর্জুন কখনো বুড়ো অশ্বথ গাছটার ছায়ায়, বকুল ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা যৌবনা গাছটার নিচে, এখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে বসে কেউ কেউ আবার হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে বলতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নানাভাবে মহলটাকে নিয়ে, অদৃশ্য মানুষগুলোকে নিয়ে ঈর্ষা-কুৎসায় মেতে গ্রামের সাজানো-গোছানো দেহটাকে বিতিকিচ্ছা বানিয়ে ফুরফুরে মেজাজে যার যার ঘরে ফিরে যায়। মহলটায় রঙ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এভাবেই যেন সেই সময়টাতে গায়ের মানুষের মধ্যে নানা ঈর্ষা-কুৎসা-রঙ্গ-তামাশার মিশ্র মেজাজের ভিন্ন এক উৎসব তৈরি হয়। তাদের একঘেঁয়ে জীবনে এই রঙের আয়োজন নতুন এক জোয়ার নিয়ে আসে। নির্জীব মহলটা যেন এভাবেই গায়ের মানুষগুলোর বেঁচে থাকার এক ধরনের মনের খোরাকের উৎস হয়ে ওঠে। কিন্তু এই উৎস-উৎসব-আলোড়ন ভালো কি মন্দ সে কথা আজ না হয় থাক!
তবে তাদের খোশালাপের নমুনা অনেকটা এরকম, কেউ বলে, আমরা হালা ফেট বইরা দুইবেলা খাইতারিনা, আর এই জমিদার চক্কবত্তির ফুলা টেহা ফালানির জাগা ফায় না! দান-খয়রাতের লাইগ্গা একটা টেহাও হালার আতো উডে না! হালা কিইপ্টা কোনহানের! বিশেষ করে সন্তোষ ঘোষের টঙের দোকানের প্রতিদিনের আড্ডায় গায়ের ছেলে-বুড়োররা ইট-পাথরের মহলটার উপর তাদের যত ঝাল ঝাড়ে। যেদিন মহলটার শরীরে সাদা রঙ মাখানো শুরু হয়, সেদিন রহিমুদ্দিনের মাইজ্জা ছাওয়াল তাগড়া জোয়ান জমিরুদ্দিন, টঙের ভাঙ্গা বেঞ্চিটায় পায়ের উপর পা তুলে বসে, দূরে দৃশ্যমান মহলটার দিকে হিংসাত্মক ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালি-গালাজ করতে থাকে, হালা নবাবের ফুত নবাব মরা ফ্রাসাদটারে রঙচঙ দিয়া অক্করে রানির লাহান বানায়ালচে। হালারফুতে কি কুনু রানিরে হাঙ্গা করব না কিতা? না হের ফিরিতের বেডিরে লইয়া এইনো বাসর ফাতবো? হালা কুলাঙ্গার! গেরামের মাইনষে খাইতে ফায় না, আর রাজার টেহার গর্মে রানির রূফ-যৈবন অক্করে আগুনের লাহান জলসাইতাসে। হালা মাগরা কুত্তা! জমিরুদ্দিনের অনবরত গালিগালাজে হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে শূন্য মহলের বুড়ো চৌকিদার নেড়ি কুত্তার মতো খেঁকিয়ে উঠে, অই মিয়া আফনেরার সমস্যা কিতা, হেঁ? মাইনসের বদলে বাড়িডারে গাইল্লাইতাছইন কেরে হুদাই? বাড়িডা কি দুষ করছে? ফারলে বাড়ির মালিকের দারো যাইন, হেরে গাইল্লাইন গিয়া। বাতাসেরে গাইল্লাইয়া লাব আছে কুনু, কনছাইন? জমিরুদ্দিন গলার স্বর আরও কয়েক দফা বাড়িয়ে, হাত নাচিয়ে বানরের মতো মুখ ভেঙচি কেটে বলে,আরে থইন মিয়া, আফনের বালের জমিদার। বড়লুহের কুত্তার জান। গেরামের মাইনষে খাওন না ফাইয়া মরতাছে, আর হালার ফুতে বাড়িডারে মাগির লাহান ফলিশ মারতাছে। হুনইন বাই, হে একডা চেডের বাল আবদুল্লা! জমিরুদ্দিনের মারমুখী চেহারা দেখে বুড়ো চৌকিদার চোখের নিমিষে নাই হয়ে যায়।
নারায়ণ মজা পুকুরের ঘোলাটে জলের দিকে চোখ রেখে একরাশ বিরুক্তি নিয়ে সালেকের দিকে তাকিয়ে বলে, দেকসে দুস্ত হালার ফুতেরা মরার বাড়িডারে লইয়া কিতা যে শুরু হরছে! বেক হালারা ফাগল। নিজের বিয়ার কবর নাই ,ফাড়ার মাইনসের গুম নাই। বালের বাঙালি, মরলই এই শয়তানিডির লাইগ্গা। হালারার চিল্লানির টেলায় বেক বিচ্চুডি ফলাইছে। তারপর কোমর পর্যন্ত নোংরা জলের মধ্যে দণ্ডায়মান নারায়ণ তার ধাতুতে পেটা কৃষ্ণ দেহের মধ্যে কোমর লেপ্টে থাকা কোথাও আবার বেলুনের মতো ফুলে ওঠা ধুতিটাকে সামাল দিতে দিতে চরম বিরুক্তি নিয়ে বলে, এরমদ্যে চেডের দুতি একটা। এই ঠাডা ফড়া গর্মের মইদ্যে কিতা জাইঙ্গা ফিনতে বাল্লাগে? আবার না ফিনদ্দা যাইতাম কই! সব হালা দেহা যায়। সে অদ্ভুত অসহায় চেহারা বানিয়ে বন্ধু সালেকের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, দুুতি খালি সাদাই অওন লাগবো কেরে! এডার মাজেজাডাতো বুজলাম না দুস্ত! সালেক মুচকি হেসে বলে, দুস্ত সাদা রঙতো তরার গঙ্গার ফানির লাহান ফবিত্র। এবার নারায়ণ দাঁত কেলিয়ে হে হে করতে করতে বলে, বালই কইছোস দুস্ত, ময়না হালার চরিত্র ফুলের লাহান ফবিত্র। ঐ ময়নার জ্বালায়ইতো লঙ্গি ছাইড়া দুতি দরন লাগছে। হালার ধুতি অতো ফবিত্র যে ফুটকি দেহা যায়। এ্যাই মাজা-ফানির মইদ্দে খাঁড়াইয়া আমি তো আদমরা অইয়া ফড়ছি। কোনাইন দিয়া কিতা ডুইক্করবো কেডা জানতো! নারায়ণ খানিকটা শ্বাস নিয়ে আবার সালেকের দিকে চোখ রেখে বলে, আইচ্চা দুস্ত তুই ই ক দেহি, কোন হালারা দুতি আর লঙ্গির মইদ্দ্যে ইন্দু-মুছুলমান লেইক্কা বাজারে ছাড়ছে?। আই যুদি এইডিরে ফাইতাম, কইশ্যা একটা বন চটকানা দিতাম। এবার সালেক চরম বিরুক্তি নিয়ে বলে, দুর্হালা থামসে অহন। বালের দুতি-লঙ্গির ফিছে লাগছস। বড়শির সুতা একবার ঢিলা একবার টান মেরে লোভের খেলা খেলতে খেলতে চাপা উত্তেজনায় সালেক বলে, আহ্! আরেট্টুর লাইগ্গাঅহনি বগাডা ফান্দ ফড়সিন। কিন্তু ধরা পড়ে না। সালেক অসহনীয় ধৈর্য নিয়ে সুতার টান খাওয়ার অপেক্ষায় ঝিম্ মেরে থাকে। নারায়ণ আবার পুরানো রেকর্ড ছাড়ে, হালার ফুত ময়না মহাজনেই তো আমারে এই জ্বালাডাত ফালাইছে। আমার সাতে হের কিয়ের অতো দুশমনি! সে তার পুরানো কাসুন্দি টানা শুরু করে, হারু পোদ্দারের টঙে হেদিন হালা ময়না মহাজন বইয়া বিড়ি টানতাছিল। আমি একটা লঙ্গিত আত দিতেই হে চিল্লাইয়া উডে, অই ব্যাডা করছস কি করছস কি হে! লঙ্গি কেরে? তোরা হিন্দু বেডাইন। তরা ফিনবি দুতি, তরার জাতের ফরিচয় দুতি দিয়া, আর আমরা মুছুলমান, লঙ্গি অইলো আমরার জাতের ফরিচয়। হঠাৎ সালেক নিম্ন কঠিন স্বরে বলে, এ্যাই হালা চোপ্, অক্কবারে চোপ্… কুনু আওয়াজ না। বন্ধুর চোখের দিকে তাকিয়ে সে কেঁচোর মতো গুটিয়ে যায়। তারপর একা একা সালেক বলে সোনার চান্দ ফান্দে ফড়ছে। ধীরে ধীরে সুতা গুটিয়ে হেচকা টানে বড়শিটা ডাঙায় তুলে সালেক কাকে যেন অকথ্য গালিগালাজ শুরু করে! নারায়ণ তাকিয়ে দেখে, ছেঁড়া একটা চটি বড়শিতে গেঁথে আছে। রাগান্বিত সালেক বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলে, হালা কুফা! তোর ঐ বালের দুতি লঙ্গির লাইগ্যা আমার আইজ জুতার মালা ফিন্দন লাগল। হঠাৎ আকাশে মেঘের গর্জনে, নারায়ণ, সালেকের হাত ধরে এক টান মেরে বলে, আরে দোস্ত খালি গাইল দ্যাছ কেরে? চল্ চল্ দিনে ডাকতাছে। বেক সময় বেক জিনিস কি বেহের বাইগ্যে জুটে দুস্ত? ওরা শূন্য হাতে জমির আইল ধরে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই, ঝড়ের তাণ্ডবে কাক ভেজা হয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাঁফাতে হাঁফাতে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায়। নারায়ণ বন্ধুর ভিটা অতিক্রম করে নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। বাইরে তখন শিলাবৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। শিলার কঠিন চাবুক পিঠে নিয়েই আধভেজা নারায়ণ এক লাফে অন্ধকার ঘরের চৌকাঠে পা রেখেই গলা চড়িয়ে একমাত্র বোনকে ডাকতে থাকে, নারায়ণী, নারায়ণী কই তুই? একটা গামছা লইয়া আয় তো। আমার শইলডাত শীত করতাছে। ঝড়ের তাণ্ডবে তার কণ্ঠস্বর আর ভেতরে পৌঁছায় না। নারায়ণ দ্রুত ভেতরে ঢুকতে গিয়ে ভাঙ্গা একটা মাটির কলসির সঙ্গে হোচট খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে ভেতরে পা বাড়ায়। নিঃসীম অন্ধকারে বিজলির চমক পড়তেই সে দেখে, কঙ্কালসারদেহী বৌটা পেটফোলা ছেলেটাকে বুকে চেপে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। পাশের ভাঙা চৌকিতে বুড়ি মা, চোখ বন্ধ করে খক্ খক্ করে কাশতে কাশতে বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গে কথা বলছে! কাঠের পাল্লা থেকে ম্যাচলাইট নিয়ে কুপিটা জ্বালিয়ে সে মাকে ডাকে। আড়মোড়া ভেঙ্গে চোখ মেলে বুড়ি, কম্পনরত কণ্ঠে বলে, এ্যাঁ কে কে কেডায় রে এইনো?! নারায়ণ মায়ের ভঙ্গুরপ্রায় দেহটাকে একহাতে চাপা দিয়ে ধরে, মৃদু কণ্ঠে আমি, আমি তোমার নারায়ণ গো মা! বুড়ি এবার চোখ মেলে তাকায়। নারায়ণ কুপির নিস্তেজ আলোয় চারপাশে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজতে থাকে। মা ক্লান্ত কণ্ঠে ছেলেকে বলেন, হে গরো নাই রে বাফ! হে যে সহালে বারইছে আর তো আইছে না। তুই ভাবিছ না। এই বৃষ্টির মইদ্যে কেউয়ের গরো আটকাইছে। এতক্ষণ চুপ থাকা নারায়ণ এক ধমক দিয়ে ওঠে, আরে থও তুমার ঔকালতি। ছেড়ি কইনো যায়? কিতা করে? কেডায় জানে? হুনো তুমি, হের মতিগতি কিন্তু আমার বালা লাগতাছে না। মায়ের দিকে অঙ্গুলি তুলে বলে, তোমার ছেড়িরে কও সাবদান অইতো, নইলে যহন হাপের ছোবল খাইবো, আর কিন্তুক বাছতো ফারতো না! নিজেও মরবো, আমরার ইজ্জতটাও মারবো। নারায়ণ একা একা গজ গজ করতে করতে ছেড়া লুঙ্গিটা টেনে পড়ে, ভিজা লুঙ্গিটা চিপে বেড়ার ফাঁকে লম্বা করে মেলে দুই কোনা গুঁজে দেয়। তারপর ছেঁড়া কাথার তলে রুগ্ন বউ আর পেটফোলা সন্তানকে জাপটে ক্লান্ত দু’চোখ বুজে পড়ে থাকে। সে রাতে নারায়ণী আর ঘরে ফেরে না। সে রাতে অভুক্ত এই পরিবারের মানুষগুলোও দীর্ঘ এক ঘুম দিয়ে সকালের ফর্সা আলোয় চোখ মেলে। নারায়ণ ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে দাওয়ায় বসে নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজছিল। ঠিক তখনই রাত জাগা নারায়ণী অবসন্ন শরীর নিয়ে দাদার মুখোমুখি পড়ে। ভাইয়ের দীর্ঘ জেরার মুখে নারায়ণী মুখে কুলুপ এঁটে, ঘরে ঢোকে গামছাটা নিয়ে পুকুর ঘাটের দিকে পা বাড়ায়। পেছনে ভাইয়ের খিস্তি-খেউড়ে আশেপাশের বাড়ির মানুষগুলোর কান গরম হয়ে উঠে। মুরুব্বিগোছের একজন এসে নারায়ণকে থামায়। ওর কাঁধে হাত রেখে মৃদু কণ্ঠে বলেন, এবার ক্ষেমা দেরে বাফ। হেয় জুয়ান বেডি, নিজের বালামন্দ বুঁজে। তুই তোর বৌ বাইচ্চা আর বুড়ির কথা ভাব। হের কফালে যা আছে তাই-ই অইবো। নারায়ণীকে নিয়ে আশেপাশে বিক্ষিপ্ত কানাঘুষা হতে হতে এক সময় থেকে যায়। হয়তো রয়েও যায়। নারায়ণ মনে মনে বলে, ভগবান জানেন, সে কী করে বেড়াইতাছে কোথায় যাইতাছে? কে জানে কে কতটুকু কী জানে! একাকী বিড় বিড় করে বলে, তার দিকে নজর রাখতে অইবো।
নিশীথ রাতের আকাশ ফুঁড়ে পূর্ণিমার আলো যেনো উপচে পড়ে অলৌকিক এক মায়ায় গোটা গাঁয়ের ঘুমন্ত শরীরটাকে মুড়ে রেখেছে। প্রচণ্ড দাবদাহের পর হঠাৎ টানা বৃষ্টির ধারা দেহে শীতের প্রলেপ মেখে দিয়েছে। কিন্তু সালেকের দেহের শিরা-উপশিরা, রক্তের উত্তেজনা থামছেই না। ছোট বউয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়ে চনমনে দেহ, ফুরফুরে মেজাজ, রোমান্টিক মন নিয়ে দাওয়ায় পা ছড়িয়ে বসে সালেক বিড়ি ধরায়। পূর্ণ যৌবনা ছোট বউয়ের নরম দেহের নেশা, রক্তের প্লাবন, ঘন নিঃশ্বাসের জোয়ার স্বামীকে নেশায় বুঁদ করে রাখে। এর সঙ্গে প্রকৃতির এই মোলায়েম রূপ তার মনের মাদকতাকে তুঙ্গে তুলেছে। বিড়ি টানতে টানতে হঠাৎ সালেক শর্ষে ক্ষেতের আইলের পথ ধরে উদ্দেশ্যহীন পথে পা বাড়ায়। কণ্ঠ তার আবেগে থরোথরো, সে গান ধরে-
রঙিলা সখি আমার তোর রঙচঙ্গে
দিওয়ানা ফরান আমার।
এই যেবন-যৈবন তোরে ছাড়া কাডে না রে কাডে না,
সুনা বউ আমার তরে ছাড়া ফরান আমার
উতাল ফাতাল করে।
আয়রে সুহাগী বউ আমার আয়
ফিরিতের জুয়ারে নাও বাসাইয়া, যৈবন গাঙ
দেই ফাড়ি।
গান গাইতে গাইতে হঠাৎ ছোট বউয়ের মায়ামুখটা সালেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ব্যথায় অপরাধবোধে তার ভেতরটা কুঁকড়ে যেতে চায়। স্বামী যখন অধীর আদরে-সোহাগে ছোট বউয়ের মোলায়েম দেহে হাত রাখে, বউ তখন যন্ত্রণায় উহ্ করে ওঠে। যৌবনের মত্ততায় বিভোর সালেক ভাবে, বউও তার নেশায় চুর। স্বামীর চূড়ান্ত তৃপ্তির নেশা কেটে গেলেও, ছোট বউয়ের কান্না থামে না। মৃদু হারিকেনের আলোয় সে আবিষ্কার করে ছোট বউয়ের ছোট্ট দেহের ক্ষুদ্র পিঠে স্বামীর অত্যাচারের গভীর ক্ষত ভালোবাসার পাপ হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। স্ত্রীর পিঠে মলম মাখতে মাখতে স্বামী জানতে পারে, এই মারের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ছোটবউ পানিতে গলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দুই চোখের অবাধ্য জল নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সালেক মাটিতে বসে পড়ে। সামনের দিকে চোখ পড়তেই পূর্ণিমার রূপকে ছাপিয়ে মহলের সৌন্দর্য সালেকের সব কষ্ট ভুলিয়ে তাকে বিমোহিত করে দেয়। মুগ্ধ চোখের অদ্ভুত এক ঘোর মহলের দিক থেকে দৃষ্টি ফেরাতে দেয় না।
জনমানবশূন্য মহলের কোনো এক কক্ষ থেকে তীব্র আলো জ্বলে হঠাৎ দপ্ করে নিভে যেতে তার ঘোর কেটে যায়। একটা সময় সে নিজেকে বিস্তীর্ণ মাঠসম উঠানের মধ্যখানে একাকী দাঁড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করে। হঠাৎ সালেকের চোখে পড়ে মহলের সামনে বিস্তৃত মাঠের বিশালতাকে আড়াল করে এক কোনায় ভূতের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো গাড়ি! মহলের ভেতর থেকে থেমে থেমে কার যেন গোঙানির ক্ষীণ শব্দ সালেকের কানের পর্দাকে মৃদু স্পর্শ করে যায়। তার মাথা সজাগ হবার আগেই, বুড়ো চৌকিদারের তীব্র স্বরে সাবদান-হুশিয়ার শব্দের তলায় সেই আওয়াজ ডুবে যায়। বুড়ো চৌকিদার এক হাতে হারিকেন অন্য হাতে লাঠি নিয়ে লম্বা পায়ে হাঁটছে আর উচ্চ গলায় হাঁকছে। সালেক এবার অবাক হয়ে দেখলো বাড়িটার বাইরের সব আলো নেভানো। অথচ সারা গায়ের যে কয়টা ধনীর বাড়িতে কারেন্ট আছে; এই মহলের কারেন্টের পিলার থেকেই সেই বিদ্যুতের লাইনগুলো টানা হয়েছে। তার মনে পড়ে যায়, ভুতুড়ে ঘনজঙ্গল মহলের পেছনটাকে ঘিরে রেখেছে। আগে ঐ জঙ্গলে কিছু কাঠুরিয়া কাঠ কাটতে যেতো। কিন্তু কয়েক বছর আগে কয়েকজন কাঠুরিয়া কাঠ কেটে ফেরার পথে অচেনা এক যুবতী নারীর অর্ধগলিত মৃতদেহ দেখার পর ভয়ে কেউ আর ওমুখো হয়নি। থানা-পুলিশ কয়েকদিন অনবরত আসা-যাওয়া করার পর একটা সময় সব শেয়ালের রাঁ থেমে যায়। গায়ের কেউই সনাক্ত করতে পারে নাই, এই হতভাগিনী যুবতী নারী কার কন্যা? কার বোন? কার প্রেমিকা? কার বধূ? কার স্বজন?! সালেকের ভেতরটা ভয় আর যন্ত্রণায় কেমন গুলিয়ে শিউরে ওঠে! মহলটাকে ঘিরে ভয় আর কৌতূহলের এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি ক্রমশ তাকে গ্রাস করতে থাকে!
বুড়ো চৌকিদার হঠাৎ অন্যমনস্ক সালেকের চোখ বরাবর হারিকেনের আলো ফেলে, চরম বিরুক্তি ভরা রাগান্বিত গলায় জিজ্ঞেস করে, অই মিয়া অত রাইতে এইনো কিতা করইন? গরো বউ-জি-বাইচ্চাকাইচ্চা নাই নাকিতা? মাইজরাইতে জিন-ফরির লাহান গুত্তাসইন কেরে? মাতাত কিতা বায়ুর দুস আচে নি? সালেকের এক ধমকে বুড়ো ভড়কে যায়, অই বুইড়া চোপ্ অক্করে চোপ কইতাছি। অত কতা কছ কেরে? তারপর আঙুল উঁচিয়ে মহলটাকে দেখিয়ে তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বলে, ঐ বেডা তর জমিদার বাড়িত কারেন নাই কেরে? গুস্টি মারি তোর জমিদারের…। থুতু মারি মুতি তোর জমিদারের বিডাত, এই বলে সালেক হন হন করে বাড়ির পথ ধরে। চৌকাঠে পা রাখতেই ছোট বউয়ের মায়ার মুখ, নরম দেহ ছাপিয়ে তার পিঠে স্বামীর নিষ্ঠুর মারের চিহ্নগুলো যেনো বউয়ের কালো দুটি চোখ দিয়ে তার দিকে তিরষ্কারের অগ্নি বর্ষণ করছে। ছোট্ট দেহটার নির্মম আঘাতের ব্যথা কমানোর জন্য পুকুরে গলা ডুবিয়ে মুক চেহারায় বোবা দৃষ্টি নিয়ে ছোট বউয়ের দাঁড়িয়ে থাকার বেদনার্ত দৃশ্য যেন সালেকের পিঠে সপাৎ সপাৎ চাবুক মারতে থাকে। মনে মনে সে বলে, বউ, আমারে তুই মাপ কইরা দেয়, তুই আমারে মাপ কইরা দে, তোরা দুই জনে আমারে মাপ কইরা দে। আমি কেমতে এই মুক লইয়া তরার সামনে আাইবাম? তবুও সে তার পরম আশ্রয়ের পথেই পথ হাঁটতে থাকে। ছোট বউয়ের পিঠের আঘাতের চিহ্ন, তার সঙ্গে পরম তৃপ্তির সঙ্গমের আরাম, মহলের ভেতর হতে থেমে থেমে সেই গোঙানির আওয়াজ, বুড়ো চৌকিদারের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডা সব তালঘোল পাকিয়ে সালেকের চিন্তাকে বিভ্রান্ত করে দেয়। এরমধ্যে আবার জটলা পাকিয়ে শেয়ালের ডাকাডাকিতে মনে হতে লাগলো যেন তার মাথার খুলির ভেতর ধাতব কিছুর মধ্যে লোহার হাতুড়ির আঘাতের মতো কেউ অঘাত করছে! সব চিন্তার জাল ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে শেয়ালের ক্রমাগত ডাকে চরম বিরুক্ত সালেক মনে মনে বলে, এ্যাই সময় হালার হিয়ালের ডাহাডাহিও বাইড়া যায়। আর হালার কুত্তাডির নাটকও শুরু অইয়া গ্যাছে। বাইচ্চা বিয়ানের সময় হালাগো বেক শরম যায়গা। হালারা রাস্তাগাডো যেইনো ফায় লাগাইয়া খাড়ইয়া তাহে। এডির জালায় গঞ্জের দুহানডাত বইয়া শান্তি মতো একডা চা কাওনের উফায় নাই। হালারা বেকটি বেশরমা। সালেক মুখে হাসি টেনে বলে, হালারার যা মুনচায় কত্তে তাহুক, আমার কিতা! আমি অহন বড় বউডার আঞ্চলের তলে বাইচ্চার মতো গুমাইয়া তাকবাম, সুযুগ ফাইলে একটা দাইনও মাইরা দিবাম। বান্দিডা বিয়ার ফরে সেইরহম দাইন মারত, অহন কেমুন জানি জিমাইয়া ফড়ছে। হালির অইছেডা কিতা? আইজ হালির কুনু ছাড়াছাড়ি নাই!
সাত সকালে নারায়ণের চিৎকার আর অনবরত ডাকাডাকিতে সালেকের আয়েশী ঘুম ভেঙে যায়। তিরিক্ষি মেজাজে হাই তুলতে তুলতে সে উঠানে পা রেখে, চিৎকার করে বলে, অই হালার ফুত কি অইছে তোর? এই বেইেন্নাবেলায় হাঁড়ের লাহান চিল্লাইতাছস কেরে? হারাদিন আমার ফুটকিত লাইগ্গা তাহন ছাড়া তর কিতা আর কুনু কাম নাই? নারায়ণ সালেকের কথায় উল্টো আরও ঘাড় ত্যাড়া করে বলে, অই হালার গরের হালা সহাল সহাল বাপ তুইল্লা গাইল্লাইলে তর খবর আছে কইলাম। কিছু অইলেই বাপ তুইল্লা কতা কছ কেরে? কিতা অইছে তর আমি হিন্দু দেইক্কা কিতা আমার মাতা কিন্নালচস? ফাইছসডা কিতা? হঠাৎ তার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে জল ঝরতে থাকে। শরীর কেমন বেসামাল ভাবে কাঁপতে থাকে। হতবাক সালেক ব্যথায় জর্জরিত হয়ে চট করে বন্ধুর হাতদুটো একসঙ্গে মুঠোতে পুরে নেয়। অপরাধী মুখ আর ধরে আসা ব্যথিত কণ্ঠে বলে, নারু দুস্ত আইজ কিতা অইছে তর? তুই তো এইরহম বাইঙা ফরছ নাই কহনো। আইজ কিতা অইজে তর দুস্ত? মনডা অতো খারাফ কেরে? সালেক, ক্রন্দনরত বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে বলে, আমার বুল অইছে দুস্ত। মাপ কইরা দে আমারে। তারপর দুইকান ধরে বলে, এই যে কান দরতাছি, আর কুনুদিন বাপ তুইল্লা মশকরা করতাম না। দুইগালে পাঁচ পাঁচ দশ আঙুল রেখে বলে, এই যে তবা করতাছি, তবা তবা! এবার নারায়ণ নিজের কাঁধ থেকে সালেকের হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। নিজের আচরণে সে যতটা না লজ্জিত হয় তার চেয়ে বেশি অবাক হয়। মনে মনে বলে, কিতা অইছে আমার? আমার মনডা অতো ফুরতাছে কেরে? অতো কষ্ট লাগতাছে কেরে? দ্রুত চোখ মুছে মুখে হাসি ঝুলিয়ে সে বন্ধুকে বলে, না না দুস্ত কই, কিছু অইছে না। কেরে জানি মনডা বশে নাই, মনের গতিও বুজতাছি না। হালার মনডার জানি কিতা অইছে? নিজেকে শান্ত করে নারায়ণ এবার সালেকের দিকে তাকিয়ে বলে, ঐ ময়না হালায় আমার ফিছে আডার মতো লাগছে। কাতর কণ্ঠে বলে, আমার একটা লঙ্গি লাগবোই দুস্ত। আইজ মেলা দিন দইর্যা ঘরে থাহা ছিঁড়া লঙ্গিডা ফিন্দা জলে ডুব দেই, ফরে দুতিটা ফিন্দা দিন কাডাই। এই বালের দুতি ফিন্দনের অব্যাস নাই দেইক্কা কিরম কিরম জানি লাগে। বালা লাগে না। লঙ্গিডার দশাও নাই নাই। সালেক নীরবে বন্ধুর কথা শুনতে থাকে। সে আবার পুরানো রেকর্ড বাজায়, কাইল হাঞ্জাক্ত আবার আমি হারুর দোহানে গেছিলাম। বাহিতে একটা লঙ্গি চাইছিলাম, ফুদ্দারে রাজিও অইলা গেছিল। কোইন্তো জানি হেই কুত্তার বাইচ্চাডা আজির অইলো। মাঙ্গির ফুতে আমারে দেইক্কা এমুন মশকরাডা কচ্ছে, হেশে ফুদ্দারে লঙ্গিতো দিছেই না, উল্ডা হারামিডা আমারে দুর দুর কইরা খেদাইয়া দিছে। একটানে কথাগুলো বলে, ক্লান্ত হতাশ কণ্ঠে নারায়ণ বললো, দুস্ত তুই-ই ক অহন আমি কিতা কত্তাম? করুণ চোখে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে মরিয়া হয়ে বলে, আমার যে একটা লঙ্গি লাগবই দোস্ত। এবার জেদি বাচ্চার মতো মাথা দুলিয়ে বলে, লুঙ্গি আমার লাগবই।
এতক্ষণ চুপ থাকা সালেকের চান্দিটা হঠাৎ আগুনের গোলার মতো দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে। সে বন্ধুর বাম হাতটা শক্ত করে মুঠোতে নিয়ে হন্ হন্ করে গঞ্জের পথে হাঁটা ধরে। সালেক নিজের মনে গজরাতে থাকে, হালা ময়না মোড়ল, বান্দির পুত, বাইঞ্চুদ হালা। সাহস কত্ত তর, আমার দুস্তর লগে তুই মশকরা শুরু করছস। আমার দুস্ত লঙ্গি নিতাত্তাসে না তোর জ্বালায়। আইজ যদি তোর মুরোদ না বাঙ্গি, তইলে আমার নাম সালেক না! জোয়ান তাগড়া রগচটা সালেককে গ্রামের মানুষ ভয় পায়। দূর থেকে ওদের দুজনকে তার দোকানের দিকে আসতে দেখে হারু পোদ্দারের মুখ আপাতত শুকিয়ে গেলেও মনে মনে সে খুশী হয় কিন্তু সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকা লোকটাকে কিছু বুঝতে দেয় না। হারু পোদ্দার মনে মনে বলে, এই আজাত-কুজাতডির জ্বালায় জাত লইয়া টিইক্যা থাহনডাই কটিন অইয়া ফরছে। দ্যাশডা মন অয় একলা হেরার বাপ-দাদার সম্পত্তি। বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষ এই দেশডাতে জন্মানোর ফরও আমরা হালা রিফুজি! বদমাইশ কত্তডি আইসে! ময়না মোড়ল আরামসে বসে প্লেটের মধ্যে রং চা ঢেলে ঢেলে বিড়ালের মতো চুক্ চুক্ করে টেনে টেনে একটু একটু করে পান করছিল। হঠাৎ তার সামনে দণ্ডায়মান স্বয়ং আজরাইলকে দেখে, ভয়ে হাত কেঁপে প্লেট থেকে খানিকটা চা ছলকে মাটিতে পড়ে যায়।
তার দিকে মারমুখী হয়ে সালেক বাজখাই গলায় আওয়াজ তোলে, অই মিয়া ফাইছইনডা কিতা আফনে? সাজইন মুরুব্বি আর কামডা করইন ফোলাফাইনের লাহান! এইডা কুনু কতা? অইছেডা কি আফনের? দুহানডা কিতা আফনের বাফের সম্পত্তি না কিতা? এবার সে হারু পোদ্দারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে আঙুল নাড়িয়ে চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে বলে, আর হারুবাবু আফনের সমস্যাডা কিতা? আফনের মাল আফনি যারে ইচ্চা তারে দিবাইন, হেরে ডরাইন কেরে? হে কিতা আফনের মাতা কিইন্না লাইছে নাকিতা? হের কামই অইলো মাইনষেরে গুতানি। আফনে মিয়া বুজদার মানুষ, আফনে এই চেডের মোড়লের ফাল্লায় ফড়ছইন কেরে? হে একটা বাল! এই বলে সে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে কাঠের রেকে সাজানো সারি সারি লুঙ্গির দিকে নজর দেয়।
ময়না মোড়ল হাতের কাপটা ঠাস্ করে বেঞ্চিতে রেখে, রাগে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে সালেককে উদ্দেশ্য করে বলে, এ্যাই, এ্যাই বেডা, কিতা কইছস তুই? আমি তর বাফের বয়সী আর তুই আমারে…. সালেক হাত নাড়িয়ে ময়না মোড়লকে থামিয়ে দিয়ে বলে, আরে থইন আফনের বাফগিরি। মুখে ভেঙচি কেটে বিড়বিড় করে বলে, বালের বাফ মারায়। বাফ মনে অয় কইলাম আর অইয়া গেলাম! হারু পোদ্দারের ক্যাশের পাশের রেকে সারি সারি করে সাজানো লুঙ্গি থেকে সালেক টান মেরে দুইটা লুঙ্গি বের করে সুদীপ্তর হাতে দিয়ে বলে, নে, আর ক্যান ক্যান করিছ না। এবার হারু পোদ্দারের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে, চিন্তা করইন না যে ফুদ্দার মশাই, সামনের বর্ষাত ফত্তম খেপডা মাইরাই আফনের লঙ্গির দাম দিয়ালবাম।
সালেক তার পেছনে কাঁচুমাচু মুখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা নারায়ণের দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বলে, আর এ্যাই ব্যাডা তর সমস্যাডা কিতা? মুরুব্বি ব্যাডায় মজা লইল আর তুইও ডরাইয়া লেঞ্জা গুডাইয়া আমার লঙ্গির তলে ডুইক্করছস। কিতা খালি হারাদিন শংক্যালগুর সাইনবোড গলাত জুলাইয়া চলছ? তরার সমস্যাডা কিতা? এবার সালেক দুই প্রবীণকে নিয়ে পড়ে, অদ্ভুত এক মুখ বানিয়ে বলে, হুনেন মুরুব্বিরা, দ্যাশডা কিতা কেউর বাফের সম্পত্তি? সাথে সাথে ময়না মোড়ল, গলা খাঁকারি দিয়ে জেগে উঠতে চায়, এ্যাই সলেক্যা, সাবদান কইলাম, বাফ তুইল্যা কতা কবি না। সালেক আরও গলা চড়িয়ে ময়না মোড়লের দিকে তাকিয়ে বলে, আরে মিয়া থামইন আফনে, আগে নিজের বাডি চাইন। বয়সডা কিতা বাতাস দিয়া বাড়তাছে নি? নিজের ইজ্জত নিজে রাখতারইন্না আবার ইজ্জত ইজ্জত করইন, হুদাই ইজ্জত মারাইন্না যে। ঠিক অইয়রইন কইলাম। হদাই মাইনষের ফিছে গুতাইন্না যে। খুব খারাফ অইব, আফনেরে কইয়্যা গেলাম। নিজের ইজ্জত নিজে রাহইন মাইনসেরে ইজ্জত দিলে নিজেও ইজ্জত ফাইবাইন। চল দুস্ত বলে, সালেক বন্ধুর হাতে এক টানে মেরে তাকে প্রায় টেনেহেঁচড়ে নিয়ে হারু পোদ্দারের দোকান থেকে বের হয়ে ধান ক্ষেতের আইলের পথ ধরে।
সালেকের মেজাজ এখনও সপ্তমে চড়ে আছে। সে চোখ লাল করে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলে, এ্যাই ব্যাডা তোগো সমস্যাডা কিতা? হারাদিন বেক্কল সাইজ্যা থাহস কেরে? অতো শংক্যালগু মারাইস না। তোরা এইনে মাইর কাইলে, বারতেও আমরা মাইর কাইতাছি না ক ছে দেহি? বুহআত দিয়া ক ছে দেহি হেরার চে তরা ম্যালা বালা আছস না? এই বান্দরামি ছাড়! তুই বেডা জোয়ান-তাগড়া একটা ব্যাডা মানুষ। বেডা মানুষ বেডাইনের মতো কতা ক, বিলাইয়ের লাহান মেও মেও করছ কেরে? এক ছেরার বাফ অইয়রছস, আর কবে নিজের মাঞ্জাডা সুজা কইরা চলতে হিগবি? অতো ডরানের কিতা আছে? হুদাই ডরাস দেইক্যাই তো বদমাইশডা ডর দেহাইয়া মজা ফায়। তরার সমস্যাডা কিতা? লম্বা গলাটা ঘাড়ো ডুহাইয়া, মাঁজা বাইঙ্গা আর কত দিন চলবি? এইরহম বেক্কল সাজিস না। মাঞ্জাডা সুজা কর। আমার গাড়ো বর দিয়া আর কত চলবি? তুই ব্যাডা মানুষ না? যা যা বাড়িত যা। টিক অইয়া ফর কইলাম, বলে রাগে গর গর করতে করতে সালেক বন্ধুকে রেখেই একাকী বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
সালেকের ভাষণ শেষ হলে, সে অদৃশ্য হয়ে গেলে, এবার নারায়ণ নির্লিপ্ত মন নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। বিড় বিড় করে আপন মনে বলে, হালায় বেশি বগর বগর করে। হালারা বুইল্যা গেছে আমরা দেড় ট্যাহা, হেরা পাঁচ সিকা। এই বলে নারায়ণ খোলা মাঠের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে হো হো করে হাসতে থাকে। তার মনে পড়ে, ছোটবেলায় বন্ধুরা যখন ডাঙুলি খেলতো, তখন ঝগড়া হলেই বন্ধুরা একে অন্যকে দেড় ট্যাহা আর পাঁচ সিকা বলে গালি দিতো। যদিও এখনও সে জানে না, এর অর্থ কী? মনে মনে বলে আরবার দেহা অইলে , দস্তুরে জিগামু। তারপর এক মুখভঙ্গি করে আপন মনে বলে, দূর হালা ! এমুন বাভ দেহায়, মুনে-অ অয় আমার মাতাডা কিন্নালছে। যা বাগ্ হালা বলে নারায়ণ মুখ ভেঙচি দিয়ে এক দলা ধুতু হলুদ শর্ষের ফুলের উপরে ফেলে, লুঙ্গির খালি প্যাকেট দুটোও এলোপাথাড়ি ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর একটা লুঙ্গি গলায় ঝুলিয়ে আর আরেকটা কোমরে বেঁধে শিস দিতে দিতে বাড়ির উঠানে পা রাখতেই মাথাটা চড়চড়িয়ে ওঠে। এবার খানিকটা গলা চড়িয়ে বলে, হালার কফাল! শান্তি লেহা নাই, গরে-বাইরে বারজাতের জ্বালা। যামু কই হালা? প্রায়ান্ধকার খুপড়িতে ঢুকে দেখে তিন বছর ধরে প্যারালাইসিস বুড়ি মা ভাঙা খাটটাতে গুয়ে মুতে লেপ্টে কাতরাচ্ছে, তার কান্নার আওয়াজ নারায়ণ উঠান থেকে শুনেছে। ছেলেকে দেখে কান্নার আওয়াজ থেমে গোঙানি শুরু হয়েছে। হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ছেলেকে বলে, নারু তোর বউ আমারে মারছে বাবা। রুগ্ন রগওঠা হাতের কাঁপতে থাকা আঙুলের ফাঁক-ফোঁকড়ে আটকে থাকা কয়টা সাদা চুল ছেলেকে দেখিয়ে বলে, এ্যাই দ্যাখ ফুত, ডাইনিডা আমার চুল ছিড়ালছে বলে কান্নার বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। মিউ মিউ শব্দ শুনে নারায়ণ নিচে তাকিয়ে দেখে, নাক-মুখে মাটি আর হিঙ্গিলে একাকার হয়ে কোলের শিশুটা বিলাইয়ের মতো মেও মেও করে কাঁদছে। নারায়ণ মাকে এক ধমক দিয়ে বলে, চুপ অক্কবারে চুপ, বুড়ি। তুই মরছও না আবার বালাও অছ না, আমি যামু কই? আর ঐ মাগিডা কই? হারামজাদি কই তুই ? বলে দ্রুত সে ঘরের আরও অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়। পেছনের একহাত উঁচু ভিটায় নারায়ণের বউ চুল এলিয়ে হাঁটু ভাঙা দুই পা চেগিয়ে বসে আছে। স্বামীর অতর্কিত হামলায় রুগ্ন বউটা ভারসাম্য রাখতে না পেরে নিচের কাদামাটির পিচ্ছিল স্তুপের মধ্যে মুখ থুঁবড়ে পড়ে যায়। পরের বাড়িতে অপমানে অবহেলায় কুকুর বেড়ালের মতো জীবন কাটানো অসহায় অসুস্থ মেয়েটি মুখ বুজে স্বামীর সব অত্যাচার সহ্য করে। নারায়ণ বউয়ের চুলের গোছা মুঠিতে নিয়ে টানতে টানতে তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। এবার চুল ছেড়ে তাকে এলোপাথাড়ি মারতে মারতে বলে, হারামজাদি কতা কছ না কেরে? কতা ক, কতা ক কইলাম। তোর অত সাহস, আমার মার শইলো আত দিছোছ। আমার মার চুল তুই ছিঁড়ছস না, আইজ তর মাতার একটা চুলও রাকতাম না। বৃদ্ধা মা, কাকুতি মিনতি করে ছেলেকে বলে, ঐ নারু বাবারে বউটারে আর মারিছ না। হারামজাদির শইলো ইট্টুও মাংস নাই, রইগ্যা বেডি। মইরা গেলে থানা-ফুলিশ অইব। অবাগিরে ছাইড়া দে বাফ। অভিশাপ লাগবো। হতভাগী এই নির্মমতাকে উপেক্ষা করে শাশুড়ির নোংরা কাঁথা-চাঁদর নিয়ে ঘাটের দিকে পা বাড়ায়।
হিংস্র হয়ে ওঠা নারায়ণ এবার খানিকটা শান্ত হলে, নিজেই নিজের আচরণে চমকে ওঠে, নিজেকেই বলে, ঐ সালেক্যা, ময়না মোড়ল, আর পোদ্দার, গাঁওয়ের ঐ ভূতগুলি কি জানে এই নারায়ণ সেন কতটা ভয়ানক হতে পারে? মুখটাতে মৃদু হাসি ছড়িয়ে বৃদ্ধ মায়ের দিকে তাকিয়ে ইয়ার্কির ছলে বলে, ঐ বুড়ি তোর শ্বশুর বুলি রাজা লক্কন সেনের কুটুম আছিন, তইলে আমরার এই ফহিন্নির লাহান মরা অবস্থা কেরে? বুইড়ায় মিছা কতা কওনের জাগা ফায় না। জাগা কয়ডা যা আছিল, হালার বলদ বাফ-ফুত মিল্লা নবাবি কইর্যা জাগাজমি বেইচ্যা আমরারে ফহিন্নি চুদানির গুস্টি বানাইয়া থইয়া গ্যাছে। হালারা ফুর্তি কইরা মরছে, আর আমরা ফত্যেক দিন না কাইয়া মরতাছি। হালার ফুতাইনের গুস্টি মারি। পঙ্গু মা ব্যথায় কাতর কণ্ঠে বলে, অলক্কি কতা কইছনা বাফ। মরা মাইনষেরে গাইল্লাইছ না বগবানে শাপ দিবো! নারায়ণ কুত্তার মতো খেঁকিয়ে বলে, আরে থওসে তুমার বগবান! তারপর চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে বলে, মাগিডা কই? ছিনালডারে ত কাইলেত্তে দেকতাছিনা! নডি গেছে কই? বুড়ি মা, যৌবনবতী মেয়ের পক্ষ নিতে গেলে জোয়ান বেটা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, এ্যাই বুড়ি চোপ্ চোপ্ কইতাছি। অক্করে কতা কইছ না। তরলুবের লাগ্গাইতর ছেড়ির এই দশা। খানকিডা গ্যাছে কই? বুড়ি মা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে, মহলের চক্কবর্ত্তী মশাই বুড়া চৌকিদারডারে গতকাইল হাঞ্জায় ফাডাইছিল, আমি বুইড়া হারামিডারে দূর দূর কইরা বাগাইয়া দিছিলাম কিন্তু তর বইনেই আবার থামাইছে। আমি বুড়া মানুষ কিতা কত্তাম বাফ তুই-ই ক? মাগিডা আমারে কয়, এই রূপ-যৈবন লইয়া কত্তামডা কিতা বুড়ি? আধা খাইয়া আধা ফিন্দা মরতাছি। তর ছেড়ায় তো নিজে বিয়া কইরা মজা লুটতাছে। হের মাতাত কি বইনের বিয়ার চিন্তা আছে? না কাফড়, না খাওন, না বিয়া। এর থেইক্যা ঐ মহলে দুইডা দিন থাইক্যা আইলেও নিজের শখ কিছুডা মিডাইতাম ফারি, এডা কইয়া হারামজাদি গট্ গট্ কইরা চকিদারের সাতে বাইরইয়া যায়। তার মনে পড়ে হতভাগী কয় দিন আগেও ভাইয়ের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করেছে। বোনের মারমুখী চেহারা দেখে সেদিন নারায়ণ নিজের সম্মান নিয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। সেদিন থেকে বোনকে নিয়ে কী এক অজানা ভয় নারায়ণের বুকটার ভেতরে কাঁটার মতো বেঁধে আছে। কোনো কথা না বলে নারায়ণ গলায় ঝুলিয়ে রাখা সাধের লুঙ্গিটা একটানে ছুঁড়ে ফেলে, পাগলের মতো মহলের দিকে দৌঁড়াতে শুরু করে।
সেদিন ছিল চাঁদরাত। গ্রামের বৌ-ঝিয়েরা কেউ ঈদের রান্না-বান্না করছে, কেউ হাতে মেহেদি লাগাচ্ছে, বুড়া-ছোড়ারা টঙে, মাঠে, নদীর পাড়ে বসে খোশালাপে মেতে আছে। নারায়ণ উর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়ে এসে বুড়ো চৌকিদারের খুপড়ির সামনে থেমে হাঁপাতে থাকে। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে, টিম টিম হারিকেনের আলোয় বুড়োটা বসে বসে ঝিমাচ্ছে আর চারপাশটা তীব্র গাঁজার গন্ধে ছেঁয়ে আছে। নারায়ণ বাঁশের নড়বড়ে পাল্লাটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে একটানে বুড়োটাকে টেনে হেঁচড়ে বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে রেখে ক্রমাগত চড়-থাপ্পড় লাগায়। এবার অর্তকিত হামলা আর নেশায় বেসামাল বুড়োর হাড্ডিসার গলাটা শক্ত করে ধরে উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ঐ কুত্তার বাচ্চা, শুয়রের গরে শুয়র! আমার বইন কইনো? নারায়ণের এলোপাথাড়ি চড়-থাপ্পড়ে বেসামাল বুড়োর নেশা ছুটে যায়। একটানে নিজেকে ছাড়িয়ে বুড়ো চৌকিদার দ্বিগুণ গলা চড়িয়ে বলে, অই মালাউনের গরে মালাউন, তোর এত বড় সাহস! তুই আমার শইল আত দিছস কেরে হালা মালাউন! নারায়ণ পুনরায় চৌকিদারের ঘাঁড় ধরে টেনে ক্রমাগত চপেটাঘাত করতে করতে ক্রুদ্ধ ষাঁড়ের মতো চিৎকার করে অনবরত বলতে থাকে, ঐ জানোয়ার, ক আমার বইন কই? তুই হেরে লইয়া আইছস। দুইদিন দইরা হে গরো আয় নাই! ঐ হালা মোল্লার ফুত, তোরে না আমি কইয়া দিছিলাম, আমার বাড়িত ফাড়া না দিতে, কোন সাহসে তুই আমার বাড়িত গেছস? ক আমার বইন কই? এমন সময় অনেক লোকের গলার আওয়াজে নারায়ণ পেছনে তাকিয়ে দেখে কেউ মশাল, কেউ হারিকেন, টর্চ হাতে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। দ্রুতই মহলের উঠানটা গায়ের মানুষে ভরে যায়। বন্ধুকে দেখে নারায়ণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সালেকের মনে পড়ে যায়, সেই দিন পূর্ণিমা রাইতে সে মহলের সামনে অন্ধকারে একটা গাড়ি দেখছিল, ঘরের ভেতর বাতি জইল্যা আবার নিভ্যা যাইতে দেখছিল, কারো গোঙানির আওয়াজ শুনেছিল, বুড়ো চৌকিদারের সাবধান হুশিয়ার শব্দও তার কানে বাজতে থাকে। হঠাৎ সে পাগলের মতো মহলের দিকে ছুটতে শুরু করে। তাকে অনুসরণ করে গ্রামের মানুষও ছুটতে থাকে। এর মধ্যে নারায়ণ বুড়ো চৌকিদারের কাছ থেকে মহলের চাবির গোছা ছিনিয়ে নেয়। গায়ের মানুষগুলো মহলের ভেতরে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটাছুটি করতে থাকে। হঠাৎ একটা কামরার সামনে এসে কিছু লোক নাক কাপড়ে ঢেকে থমকে দাঁড়ায়। দুর্গন্ধে তাদের শরীর গুলিয়ে উঠছে। কেউ কেউ ওখানেই গর গর করে বমি করে দেয়। নারায়ণ সবাইকে ছেড়ে কখন খোলা মাঠে বিশাল আকাশের নিচে অন্ধকারে একাকী দাঁড়িয়ে আছে কেউ জানে না। সে চায় না কেউ তাকে দেখুক, কেউ তাকে ডাকুক। এ মুখ সে কাউকে দেখাতে চায় না কাউকে না! কাউকে দেখতে চায় না!
সালেকসহ কয়েকজন দরজা ভেঙ্গে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকে। নরকসম অন্ধকার ঘরটা মশালের আলোয় বীভৎস চেহারা নিয়ে দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। মেঝেতে এলোমেলো ভাবে কয়েকটা মদের বোতল পড়ে আছে, দুই পাশে মাটিতে বিছানো তোষকের উপর সাদা চাদরে রক্তের দাগ শুকিয়ে বিকট রঙ ধরে আছে। মেঝের মাঝখানে নারায়ণের বোনের অর্ধনগ্ন দেহটা পড়ে আছে। তার ঘাড়ে মুখে কামড়ের চিহ্ন। হাটু পর্যন্ত তোলা কাপড়ের নিচ দিয়ে রক্তের ধারা শুকিয়ে মাটিতে এসে থেমেছে। উফ্ কী ভয়ানক নৃশংসতা! কেউ একজন তোষক থেকে চাদরটা তুলে গায়ের উপরে ছুঁড়ে দেয় যেন শরীরটা ঢাকা পড়ে।
এই নির্মম-বীভৎস হত্যাকাণ্ডের পর থানা-পুলিশ করেও কোনো কাজ হলো না। পরে জানা গেলো, গ্রামের ধনীগোষ্ঠীর কিছু ব্যক্তির সঙ্গে ঐ মহলের মালিক পক্ষেরও যোগাযোগ আছে। তারা ঐদিন একসঙ্গে মজা লুটেছে। হাটবাজারের দিন গঞ্জে বসে থাকা মুরব্বিরা সালেক আর নারায়ণকে ডেকে বললেন, বাফ আমার, অহন তরা ক্ষ্যামা দে। মশার কী সাধ্যি আত্তির সাতে কাইজ্জা করে?! একজন আকাশের দিকে আঙুল তুলে বললেন, হেইলা বেকতা দেকতাছে! মনে রাহিছ, হেইলার দরবারো দের আছে আন্দাইর নাই! এই অমানুশডির যে কি দশা অয়, আমরা মইরা যামু কিন্তু তোরা দেইক্যা যাইতে ফারবি। দুনিয়ার বিচার হেইলা দুনিয়াতেই দিয়া যায়। দৈর্জ্য দর, ফল ফাইবি। অন্যদিকে, খুন হয়ে যাওয়া ঐ যুবতী নারীকে নিয়ে গাঁয়ে গুঞ্জন-গুজবের নতুন এক জোয়ার জেগে উঠলো। নির্জীব মহলের পর এবার খুন হয়ে যাওয়া নারীর অতীত ঘিরে এদের একঘেয়ে জীবনে যেন আলাপ-প্রলাপের নতুন রসদ জুটলো। গায়ের মেয়েছেলেরা পুকুরঘাটে, রান্নাঘরে, ঢেঁকিশালায়, গোয়ালঘরে, মাথায় উঁকুন বাছতে বাছতে এ হেন কোনো জায়গা নেই, সময় নেই যেখানে তাদের প্রধান আলোচ্য বিষয় যুবতী নারীর খুন হওয়ার ঘটনা। মেয়েদের তুলনায় পুরুষরা বরং এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। অবাক বিষয় হলো, মাঠে, ঘাটে, গঞ্জে অতি উৎসাহী কেউ বিষয়টা তুলতে চাইলে, কেউ না কেউ তাকে কৌশলে বা সরাসরি থামিয়ে দেয়। কেউ আবার বলে, বুইল্যা যাইছ না, হে আমরার গেরামের ছেড়ি আছিল, আমরার বইন, আমরার ছেড়ি। চুপ কর, হেরে লইয়া কুনু কতা না। যে গেছে গা তারে লইয়া কতা কইলে উফরআলা নারাজ অয়। কিন্তু মেয়েদের থামায় কে? মেয়েছেলেগুলো বলতে থাকে, হতবাগির কিরম সাবাইশ! ছেড়ির লুবও কেমুন! আরেকজন বলে, চিন্তা কইর্যা দ্যাখ, আমরার সাতে হে গাঙ্গো যাইত, গপ্প করতো, কিন্তু হে যে বিতরে বিতরে অত্ত নষ্ট ছেড়ি কেউ টেরই ফাই নাই! অন্যজন বলে, একবার বাইব্যা দেখ, ঐ জানুয়ারডির কাছে হে নিজেই দরা দিছে। হে মরছে হের নিজের দুশে। কিন্তু হারামজাদি গেরামের ব্যাক ছেইড়াইনের কফালো কলইঙ্ক লাগাইয়া দিয়া গেছে। কি সাহস হের মাইয়া গো মাইয়া! শহরের বেডাইনের সাতে রাইত কাডাইত! হে না মরলে মরব কেডা! বয়স্ক একজন নারী এক ধমক দিয়া সবাইকে থামিয়ে বলে, ঐ হারামজাদিরা চোপ্ অক্কবারে চোপ্। যে মইরা গ্যাছে হেরে লইয়া গিবত গাইতে শরম করে না তরার? বুক কাফে না? তরার ফরিবারের কেউয়ের সাতে এইরহম অইলে, তহন তরা বুজতি কিরম জালা! বুড়ি আসর ভঙ্গ করে লাঠি ভর দিয়ে শ্লথ পায়ে হাঁটা ধরে।
সেই ঘটনার পর অনেক বছর কেটে গেছে। গ্রামের মানুষ অনেক কিছুই ভুলে গেছে অনেক কিছু মনেও রেখেছে। ঐ সময়ের যুবতী নারী-পুরুষরা এখন মধ্য বয়স্ক, মধ্যবয়স্করা বৃদ্ধ হয়েছে, অনেকে বেঁচে আছে অনেকে মরেছে। অনেক ঘটন-অঘটন পটিয়সী কাহিনির সাক্ষী ঐ গ্রামের মানুষগুলো। এরই মধ্যে আরও এক অনাকাঙি্ক্ষত ঘটনার নির্মমতায় হয়তো ধামাচাপা পড়ে গেলো যুবতী নারীর খুনের ইতিহাস। স্বামীর মার খেতে খেতে, সেই ব্যথা কমাতে পুকুরের জলে গাঁ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে, ক্লান্তিতে অভিমানে হয়তো সালেকের বউ গলায় কলসি বেঁধে সেই যে ডুব দিলো আর উঠলো না! পরের দিন সকালে গায়ের মানুষ তার ভাসমান মৃতদেহ দেখে ডুকরে কাঁদলো। ছোট বউ আত্মঘাতী হবার পর সালেকেও কেমন আউল্লা-ঝাউল্লা হয়ে গেছে। বিড়ির পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায়ই তাকে রাত-বেরাতে ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে আপনমনে গান গাইতে উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটতে দেখা যায়। যৌবনকালেই বয়সে ধরে গেছে তাকে। বড় বউ নীরবে সতীনের কাচ্চাবাচ্চা আর নিজেরগুলোসহ সবগুলোকেই সামটে রেখেছে। গায়ে-গতরে এরা সতেজ পুই লতার মতো বেড়েই চলছে। নারায়ণের যুবতী বোন খুন হবার এক মাসের মাথায় ওর মায়ের দেহান্ত হয়েছে। সে যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। মনে মনে বলে, বগবানে রক্কা করছোইন, বাতের ফেট একটা কমছে। গাটের মড়ারে ম্যালাটানছি, আর কত?!
এই সব ঘটনার অবসান ঘটেছে কত বছর হলো? গায়ের মানুষ এখন আর ঐসব হিসেব রাখতে পারে না। তারা চায়ও না, তাদের সময়ও নেই। একদিন সকালে টঙের দোকানে চা খেতে খেতে দূর থেকে গায়ের বুড়ো-ছোকরারা দেখলো, কয়েক গাড়ি শহুরে বাবু এসে গোটা মহলটা ঘুরেফিরে দেখছে। এর প্রায় মাসখানেক পরে বিশাল ক্রেন এসে মহলটাকে গুড়িয়ে দিয়ে গেলো। গাঁয়ের মানুষ ভাবার, কিছু বলার আগেই একটা স্থানের দৃশ্যমান মহল আর এর কাহিনি স্তিমিত হতে হতে একসময় যেন নাই হয়ে গেল। তবুও কোথায় জানি কিছু একটা রয়ে গেল এই অনুভূতি গ্রামের মানুষের মধ্যে থেকে গেল কিন্তু তারা বয়ান করতে পারলো না। রহস্যমাখা, নৃশংস ইতিহাস গাঁথা মৃত মহলের কবরের উপর পাড়া দিয়ে দ্রুতই বিশাল এক কারখানা নির্মাণ হয়ে গেল। গ্রামের মানুষের দুই বেলা পেটপুরে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা হওয়ায় তারা খুশি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হাজার শ্রমিক এখন এই কারখানায় কাজ করে। তাদের জীবন এখন অনেক স্বচ্ছল। ইতোমধ্যে তাদের দেহমনে শহরের হাওয়া এসে লেগে গেছে। তারা যৌথ থেকে একক হতে শুরু করেছে। তাদেরই গ্রামের কোনো এক যুবতী নারীর নির্মম খুন হবার ঘটনা হয়তো তারা বেমালুম ভুলে গেছে কিংবা ভুলে নাই! তবে বাস্তবতা হলো, গায়ের অনেক কিছুই বদলে গেছে।
জীবন তো আর স্থবির না… মানুষও পাথর গাছ না! নদীর স্রোতের মতো জীবনের গতি, কখনো দিকবিদিক শূন্য হয়ে, কখনো গন্তব্য ঠিক করে যে যার মতো চলছে। শুধু সালেক আর নারায়ণ যেনো সেই সময়টাতে আটকে আছে। সেই মজা পুকুরের মধ্যখানে জেগে ওঠা মৃণালের মতো তাদের বন্ধুত্বও আগের চেয়ে আরও দৃঢ় আরও প্রগাঢ় হয়েছে। তাদের চুলে বার্ধক্যের পাক ধরেছে ভাঙ্গন ধরেছে দেহে, তবুও এখনও দুই বন্ধু মিলে মজা পুকুরে মাছ ধরতে যায় নাকি স্মৃতি হাঁতড়াতে যায় কে জানে?! মাছ ধরতে ধরতে অন্যমনস্ক নারায়ণের দৃষ্টির সীমানায় দৃশ্যমান বিশাল কারখানা অদৃশ্য হয়ে, ভেসে ওঠে দানবাকৃতির সেই সাদা মহলটা আর মধ্যখানে ছিন্নবিচ্ছিন্ন রক্তজবা হয়ে পড়ে থাকা তার যুবতী বোনের অর্ধনগ্ন মৃতদেহ! হাঁটু পানিতে নেমে জাল ফেলতে ফেলতে মাঝে মাঝে সালেক তীব্র বেদনায় উহ্ করে উঠলে নারায়ণ নোংরা জল ঠেলে ঠেলে বন্ধুর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, দেহিস দুস্ত ফচা শামুহে ফাও কাটবো! অন্যমনস্ক সালেকের খসখসে শক্ত পায়ের পাতায় নরম কী একটা ঠেকলে পা সরাতে গেলেই পেতলের কলসির ধারালো অগ্রভাগ যেন তার হৃদপিণ্ডকে রক্তাক্ত করে দিয়ে যায়! সদ্য কিশোরী বধুর জলে ভরা মায়াবী মুখটা ছাপিয়ে সালেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা পেতলের কলসের সঙ্গে শাড়ির আঁচল দিয়ে বাধা ছোট বউয়ের ক্লান্ত বিষাদী মৃত অবয়ব!
রচনাকাল : ৩ মে ২০২৬।

One Comment
[…] […]