অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আতিকুর রহমান হিমু -
পথ

পথ

আতিকুর রহমান হিমু

 

মধ্যরাতের মাঝরাস্তা দাঁড় করিয়ে দেয় গল্পের মুখোমুখি। মানুষ না কি উপমানুষের, বুঝে ওঠার আগে কয়েকটা চরিত্র ঢুকে পড়ে মগজে। অশুভ স্রোতে নদীর পাড় ভেঙে পড়ার অপয়া শব্দ; সিকস্তি। মানুষের শক্ত চেয়াল, উদাসীন চোখ, গন্তব্যহীন দৃষ্টি। কয়েক জন নারী; খোলাচুল, এলোমেল শাড়ি। কাঁচুলি কারো আছে কারো নেই। কৌশলি আঁচল আড়াল করে রাখে স্তন যুগল। শরীরে-মনে হাহাকার । জ্যোৎস্নাস্নাত মাঠে আদিম অনার্য নৃগোষ্ঠীর মতো সংঘবদ্ধ জেগে থাকা। কয়েকটা বাচ্ছার কান্না, কিছু বালিকার টুকরো কথা, গুটিকয় কিশোরের কোলাজ, কয়েকজন বয়স্ক নারীর কান্নাকাছিদা। কয়েক হাজার মানুষের দুঃখ নিয়ে নদীটা মুচকি হাসে। তীরবর্তী গাছগুলো জলছুঁয়ে ডুবে যায়। কয়েকটা টিনের চাল, দেয়াল, আসবাবপত্র, খড়ের নাড়ার বোজা, পুটলি বাঁধা তৈজসপত্র; আরো আরো আরো কিছু। নদীর তীর ঘেসে যে রাস্তাটা তার পাশে সুপারীর বাগান, তারপরে মাঠ। যে বা যারা যাবার ছিলো চলে গেছে আগেই। যাদের যাবার মতো কোনো ঠিকানা নেই, কেবল তারাই অপেক্ষায় ছিলো আপন ভূমি বিলিন হবার দৃশ্য দেখার জন্য।
বিভিন্ন বয়সের কয়েক জোঁড়া স্তব্ধস্থির চোখ অতীত খোঁড়ে। শৈশব চুরি করে জলে ভেসে গেছে পাঠশালা। ধূধূ মাঠ, চৈত্রের ধূসর বাগান। সবুজ ঝিঁঝির ডাক। সাঁকো, খাল, স্কুলফেরা দুপুর। চুপচাপ মাছরাঙা, টলমলে পুকুর। নরম আলোয় মাখানো হলুদ বিকেল। ছিঁ-দৌড় ছিঁ-দৌড় গোল্লাছুট; বউচি, কানামাছি। পঞ্চভিটার বাড়ি। শীতরাতের উঠোন, খেজুর রসের মৌ মৌ ঘ্রাণে জেগে থাকা। রূপকথা রমনীদের ঢেকি পাহাড়। দেয়ালে রমনীদের অস্থির ছায়া; ছায়ায় ছায়ায় কত্থক নৃত্যের করিওগ্রাফি। সংগমরত রাত খড়ের স্তূপ; কুয়াশায় কুয়াশায় শরীরের কুহক। নাটাইছেঁড়া ঘুড়ি। কয়েকটা শালিক; এক জোঁড় ঘুঘুর সুনসান দুপুরের মধ্যদিয়ে হেঁটে যাওয়া। পোষা বিড়াল। গঞ্জের মেলায় ভেল্কি বুড়ির জাদু। রোদে শুকতে দেয়া লাল নীল পারের শাড়ি, পুঁইফুলের রং মাখানো হাত, বনাতী ফুলের ঝোঁপ— যেন সবকিছু চুরি করে জলে ভেসে য়ায় নদী। খোলা রাত্রির ধূসর আকাশ, আষাঢ়ে জ্যোৎস্না, মানুষগুলো বুনো যন্তুর মতো খোলামাঠে ঘুমাচ্ছে কিংবা জেগে আছে ঘুমের মতো; কেউ জেগে আছে প্রকাশ্যে। উত্তর মাঠে আধোচোখে জেগে থাকা কিশোরী, দক্ষিণ মাঠে অপেক্ষামান চাউনিতে জেগে থাকা কিশোরকে ঢুলুঢুলু চোখে কী যেন বলে। জ্যোৎস্নাটা আরো গাঢ় হয়, রক্ত জমে চাঁদের পাশে; ওরা কাছাকাছি আসে, কিশোর একবার দেখে নেয় স্কুল ছুটি, সাঁকোটা পেরিয়ে আসা, আমবাগান, ঝিনুক ঘসে তৈরি করা আমকাঁটার কাঁটার। বিগত সাঁতার আর ডুব সাঁতার। তৈজপত্রের আড়ালে ওরা চলে আসে চুপচাপ; করোতলে করোতল, ঠোঁটে ঠোঁট। ফিরে এসে ঘুমের মতো জেগে থাকা। টিনের আড়ালে বিবাহিতা প্রেমিকাকে তামাটে বাহুতে শেষবারের মতো বন্দি করে নেয় পশ্চিম মাঠের বিবাহিত মধ্যবয়স। অভিধান যাকে বলে পরকিয়া। অথবা অবিবাহিত জীবনে তারা প্রেমিক-প্রেমিকাই ছিল। তাদের বিগত প্রেম ঢেউয়ে ঢেউয়ে না লেখা ইতিহাস। সবুজ ঘাসের শতরঞ্জিতে দুটা শরীর সমাজবাস্তবতাকে আড়াল করে অতিবাস্তবতায় গলে গলে পড়ে পরবাস্তবতার ভেতর। তিন জন অপরাহ্ন বয়সের নারী স্মৃতিতে স্মৃতিতে দৃশ্যায়ন করে বিবাহিত পাঁচ দশক। কয়েকজন পুরুষ জলে বিলিন হয়ে যাওয়া মাটির হাহাকারে আগুন জ্বালায় বিড়িতে কিংবা সস্তা সিগারেডে; শেষ শুকটানটা দিতেই জোঁড়া চোখে রক্তজঁবা ফোটে— যেন চাইলেই পোড়াতে পারে পুরোটা নদীসমেত জল ও স্রোত। এভাবেই ভোর হয়, ইলশেগুড়ি বৃষ্টির ভেতর সূর্যালোকের সবুজ মাঠ।
গন্তব্যহীন মানুষগুলো হারিয়ে যায় বিচিত্র সব পথে—

২.
একটা পথ জ্বলতে থাকে ইটের ভাটায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা মাটি কাটে, মাটিতে জল ঢালে, মাটি ছানে, মাটিকে ডাইসে ফেলে নির্দিষ্ট আকারে কাঁটে এবং মাটির ওপর কোম্পানির সাংকেতিক ছাপ আঁকে। তারপর রোদে শুকায় ইট আকৃতির মাটি ও চামড়া। ইট ভাটার আগুনে ইট আকৃতির মাটিসমেত শরীর ছেকে। পোড়া শরীর নিয়ে সন্ধ্যায় লাইনে দাঁড়ায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অর্ধেকটা মুজুরি মেলে; তা অবশ্য মালিকপক্ষের মন ভালোথাকলে। বাকি অর্ধেকটা গত্তোর বাকি থাকে— সিজন শেষে কি মালিক দেবে শরীর বেঁচা বাকি টাকা?
কেউ আবার রাজযুগালি। বালু-সিমেন্টের মশলায় গাঁথে ইটের পর ইট। শহর সাঁজায়; পলেস্তারা লেপতে লেপতে শরীরটাকেও লেপে নেয় ঘাম আর ধুলায়। রোদে পুড়ে পুড়ে রাজমিস্ত্রি হবে একদিন; স্বপ্নে স্বপ্নে সাবকন্টাকদার— তারপর কি সুখ?

৩.
একটা পথ জীবন সেলাই করবে বলে সুইয়ের খোঁচায় প্রতিদিন রক্তাক্ত করে নিজেকে। কাক ভোরে একটা সস্তা টিফিন ক্যারিয়ারে দুটুকরো রুটির সাথে ভাজি কিংবা গতরাতের বাসি তরকারি (ক্যারিকরে) বয়ে মহানগরীর কালো রাস্তায় সাঁতরিয়ে চলে; গার্মেন্টসের দিকে। বৈদ্যুতিক আলো আর ভাপসা গরমে টুকরো টুকরো কাপড় সুইসুতায় জোড়া দিয়ে তৈরি করে সুখি মানুষের জামা। নিজের গায়ে জড়ানো পুরানো ময়লা বস্ত্রের দিকে ফিরে দেখা হয় না। এভাবেই দিন শেষ হয়, আড়ালে আড়ালে সূর্য নেমে যায় দূর সমুদ্রের নুন জলে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ফিরে আসে অন্ধকার ঘরে। ঘর! ঘর বললে হয়তো ভূল হবে, অন্ধকারের নিবাস। দিনে দিনে মাসে মাসে বছরে বছর পেরুতে যৌবন চুরি যায়; শরীরটা নেতিয়ে পড়ে। দেহের লাবণ্য কতটা সস্তায় কিনে নিয়েছে মালিকপক্ষ! কখনো শরীরটা উৎসবের জন্য ধার নেয় ম্যানেজার, সুপারভাইজার কখনো বা বস্তির মালিক। শেষ পর্যন্ত প্রেমিকের সাথে আর মেয়েটার শোয়া হয় না। এভাবেই বয়স বাড়তে থাকে শরীর-মনের।

৪.
একটা পথ গত্তর বিক্রি করে। স্টেশনে অপেক্ষা করে ঘরমুখো কিংবা ঘরছাড়া মানুষের বোঝা বাইবে বলে। বোঝা তোলে অনেক দামাদামি করে। অর্ধেকটা টাকা সরদারের অর্ধেকটা শ্রমের; শ্রমের অংশ থেকে কিছুটা নেয় পুলিশ কিছুটা মাস্তান। বাকিটা দিয়ে দিন চলে। বাস ছেড়ে যায় আলসে সময়, ট্রাক আসে ব্যস্থতায়। হাল্কা ভারী বোঝা তোলে লঞ্চে-জাহাজে, অথবা নামিয়ে দেয়। বছর পেরোয়। বর্ষায় কার পা ভাঙে, কার-বা ঘাড়ে রক্ত জমে শীতে; কেউ ট্রেক চাপা পড়ে মাল নামাতে বা উঠাতে। হাসপাতালের বারান্দায় কেউ শুশ্রূষাহীন দীর্ঘ ঘুমের ভেতর লাশকাঁটা ঘরে চলে যায়; কেউ ফিরে আসে জীবনের কাছে। কেউ কাজে যোগ দেয়, কেউ ক্রাচে ভর করে এসে বসে পরিচিত সেই ঘাটে- স্টেশনে হাত পাতে জনে জনে সিকি অধুলি নোট নিয়ে ফিরে যায় বস্তিতে কিংবা পাইপের সংসারে। সিমেন্টের পাইপের ভেতর বসত, দুপাশে ছেড়া কাপড়ের পর্দা; ল্যাম্পপোস্টের আলো দক্ষিণে, উত্তরে জ্যোৎস্না। একটা কুপি জ্বলে কিংবা মোম; খুচরা গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্ত শরীর।

৫.
একটা পথ অন্য গ্রামে ঘর বাঁধে। উত্তরমুখো বাড়ি, দক্ষিণে বাগান, পূর্বে সবজির ক্ষেত। ধানিমাঠ, এক টুকরো জমি, রবিশস্যের; হলুদ হলুদ ফুলের ঢেউ শীত বিকেলে পারিযায়ী পাখির আসর। পশ্চিমে পুকুর, টলমলে জলে ঘাই মারে মাছ। কয়েকটা মাছরাঙা ধ্যান করে পাড়ের আমডালে। ফলবতী কাঠাল গাছটা বৃষ্টিতে ভেজে। বাড়ির কাছাকাছি বাজার; ভূসামালের আড়ৎ, সার ও সিমেন্টের ডিলার, সাথে মনোহারির দোকান। বলা চলে ভাগ্যে এসে লক্ষ্মীপেঁচা বাসা বেঁধেছে। তবুও কি ভালো থাকা? আড়চোখে তাকায় নিন্দুকেরা, ঈষাকাতর দৃষ্টির বজ্রআলোয় ঝলমল করে ওঠে উত্তরমুখী বাড়িটা। কেউ একজন শ্লেষকণ্ঠে বলে যায়, ‘হালার গাঙ ভাঙ্গনী‘ সুখে সুখে অসুখ বাড়ে নদী কি কোনো অসুখের নাম?

৬.
একটা পথ বিদেশে পাড়ি জমাবে বলে অচল স্বপ্নে অন্ধ হয়। অভাবি জীবন ভরে উঠবে অর্থে, আশায় শেষ সঞ্চয়টুকু দালালের হাতে তুলে দিয়ে জীবন রাখে জুয়ার কোর্টে। পাসপোর্ট-ভিসা বিহীন বিদেশ যাবে বলে কেউ ডুবে মরে সমুদ্রে, কেউ ভাসতে থাকে ড্রামে; হ্যাঁ তেলের ড্রামে, তেলের ড্রামের ভেতর ভরে ভাসিয়ে দেয়া হয়; একটা জলের বোতল কিছু শুকনা খাবার। পায়খানা-প্রস্রাবের সাথে দিন তিনেক থাকতে হবে অবশ্য। তারপর তো জাহাজ ঘাট করবে বিদেশের বন্দরে। কুলিরা খালাস করবে। ঘাটে নেমেই লোক পাবে, দালালের নাম বললেই আপ্যায়ন। কাজ পাবে ভালো চাকরি, মাসে মাসে মোটা বেতন। সেই বেতনের গন্ধে বিভোর হতে হতে ড্রামবন্দি মানুষেরা ভাসতে থাকে নুনজলে। কেউ আটকে থাকে দ্বীপে- মৃত্যু হয়, হয় সলিল সমাধি। এভাবেই ড্রামে ড্রামে মৃত্যু নামে; ড্রামবন্দি লাশ ভাসতে থাকে অথৈ পাথারে। অবশ্য কেউ জীবনে ফিরে আসে অসুখ মুছে। কেউ তীর খুঁজে পায় অচেনা দেশে। কেউ জাল ফেলে মাছ ধরে নদীতে, বাজারে কাঁচামালের ভ্যান নিয়ে ঘোরে, কেউ ফড়িয়া কেউ হকার। ফেরি করে বিচিত্র মানুষের শহরে— এই মুড়কি মেয়া, মুড়কি মেয়া, পপকর্ন পাপ্পন পাপন পাপন। রাত গাঢ় হলে আলোয় সাঁজানো পথ ছেড়ে বস্তিতে ফেরে; খুসরার হিসাব মিলায়, আগামীকাল বেচা ভালো হলে একটা অস্ত নোটের সামান হবে।

৭.
আরো কিছু পথ পৃথিবীর পথে পথে ছড়িয়ে পড়ে। কলেজ থেকে ফিরে, অবসর যাপনে নদীর কাছে চুপচাপ দাঁড়ায়। আড্ডা দেয়, প্রেম করে, পার্কের নির্জন বেঞ্চিতে ঠোঁট রাখে ঠোঁটে, গোলাপ কিনে কফির মগে চুমু আঁকে, ফুচকা খায়, অফিস ফেরে, অভিজাত বিপণনে যৌথ কেনাকাটা করে; সন্ধ্যার আলোয় বাড়ি ফিরে। মেয়েটাকে নাচের স্কুলে পাঠায়, ছেলে শেখে সারগাম। কেউ বউয়ের সাথে ঝগড়া করে, কেউ সেলুনে বসে দাড়ি কামায়; কেউ কেউ বিউটি পার্লারের আয়নায় মুখ ও মুখোশ মিলায়…

৮.
একটা পথ অথৈ জলে প্রবাল দ্বীপের মতো জেগে ওঠে। হলুদাভ ধূসর দ্বীপে সবুজের স্বপ্ন আঁকে। কাঁশ-হোগলা-খড়ের বিস্তৃর্ণ জঙ্গল আবাদ করে। ঘাসের মাঠে হাল দেয়; আহল্যা ভূমিতে ধান বোনে। প্রথমে আমন ধান। কয়েক বছর পরে পলি জমে জমে আউসের উপযোগী হয় জমি। এভাবেই চৈতালি ফসল লাউকুমড়ার মাচা হলুদ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। পানের বরজ ভেঙে সুপারি-নারিকেলের বাগান, আম-কাঠাল-পেয়ারার গাছ। এভাবেই মানুষের বসতে রোববার বৃহসপ্তিবার হাট বসে। হোগলাপাতা, শুটকি মাছ, নোনা ইলিশ, আখের গুড়, হোগলের গুড়া, মরিচ কিনবে বলে এক মালাই নৌকা নিয়ে খুচরা বনিক অসে। মানুষের কোলাহলে চরটা যখন পূর্ণাঙ্গ গ্রাম হয়ে ওঠে ঠিক তখন ভেসে যায় দ্বীপগ্রাম; সিকস্তি। একই গল্প পুনপাঠ করে জীবন। ভূমি ভেসে যায় জলে, মানুষ পাঠ করে মানুষের অতীত ও বিগত মানুষের ভূমিশোক।

৯.
এভাবেই একটা গল্প মধ্যরাতে মাঝ রাস্তায় অনেকগুলো গল্পের মুখোমুখি হয়।

১০.
পথ হারিয়ে যায় পথের গল্পে। মানুষের গল্প আঁকা থাকে রাস্তায়। এভাবেই মানুষ নিজের ছায়া দেখে। ছায়ার কোনো মুখোশ থাকে না। মধ্যরাতের মাঝরাস্তা; নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে মানুষের যত ভয়।

Read Previous

লোহিত তিয়াস

Read Next

বৈশাখ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *