অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আরিফুল আলম -
লোহিত তিয়াস

লোহিত তিয়াস

আরিফুল আলম


গাছপালার আচ্ছাদন কাটিয়ে ঠিক দুপুরে এক চিলতে রোদ এসে ভর করে জং ধরা লোহার রড বসানো জানালার ধারে। শীতের দুপুরে গোসল সেরে গা এলিয়ে বসতেই কাঠের দরজায় ঠক ঠক শব্দ হলো। আজকাল চকচকে টায়ার্লস করা ফ্ল্যাটবাড়ির যুগে ঘরে থাকে বাহারী সুরের কলিং বেল। বোতাম টিপলেই বেজে ওঠে অজানা কোনো এক পাখির সুর। তবে টিনের চালের আধা পাকা ঘরে লাল আভার এডিসন বাল্বের আলো কেন যেন পিছুটানে আমাকে। তাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে বেশ দূরে গ্রাম্য পরিবেশে পুরোনো নির্জন এই বাড়িতে আমার বাস। বর্ষায় টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ ছাড়াও গরমের সন্ধ্যায় ঝিঁ ঝি পোকার ডাক, শরতের অলস বিকেল সবই উপভোগ করা যায় এখানে। শরীরে রোদ পড়ায় কিছুটা ঝিমুনি চলে এসেছে, তার সাথে যুক্ত হয়েছে কেরোসিনের স্টোভে চাপানো খিচুড়ির মিষ্টি গন্ধ। শতসহস্র আড্ডা আর আমোদ-প্রমোদের চেয়ে এজাতীয় একাকিত্বেরও অন্যরকম এক আবেদন রয়েছে জীবনের কাছে। নিজেকে নিজে সময় দেয়াটা হয়তো সব থেকে বেশি জরুরি।
দরজায় আবার ঠক ঠক শব্দ। ভর দুপুরে বাসায় মেহমান উপস্থিত হওয়া বেশ বিরক্তিকর। নাকি ভুল বললাম; এখনকার যুগে এসে হয়তো যেকোনো সময়েই মেহমান আসাটা বিরক্তিকর।  আগে একসময় গ্রামাঞ্চলে অতিথির আগমণ ছিল উৎসবের মতো। অতিথির জন্য ঢেকিতে পাড় দিয়ে চাল কুটে পিঠা তৈরি করা হতো। গাছ থেকে ডাব পাড়া, পুকুরে জাল ফেলে বড়ো মাছ ধরা, মোরগ জবাই করে মাটির চুলায় রান্না। রাতে মেঝেতে খড়-পাটি বিছিয়ে গাদাগাদি করে সবাই একসাথে ঘুমানো। ছোটোদের স্কুল যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকত যতদিন না অতিথিদের প্রস্থান ঘটে।
দরজায় শব্দের তীব্রতা বেশ বাড়ল। যে লোকটা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে তিনি নিশ্চয় স্বল্প শিক্ষিত। শিক্ষিত মানুষ দরজায় এক দুবার নক করার পরেই ইতস্তত বোধ করা শুরু করে, আবার নক করবে কিনা ভেবে উঠতে পারে না। তাই দুএকবার নক করার পর লম্বা বিরতি কিংবা খুক খুক কাশতে শোনা যায়।
বয়স হলে এই এক সমস্যা, নানান ভাবনায় মূল কাজে বিলম্ব সৃষ্টি হয়। নাকি আমার অবচেতন মন আমাকে উঠতে বাধা সৃষ্টি করছে, নানান ভাবনায় ডুবিয়ে রাখছে আমাকে, আভাস দিচ্ছে অজানা কোনো এক বিপদের!
জড়তা ভেঙে উঠে গিয়ে দরজা খুললাম।
চাদরে সারা শরীর ঢাকা আধ বয়স্ক এক লোক কিছুটা কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখখানি শুধু বের করা, সেটাও পেঁচিয়ে রাখতে পারলে খুশি হতেন মনে হয়। কালো চামড়ার ওপর খোচা খোচা সাদা দাড়ি। দাড়ির ওপর দিয়ে বোঝা যাচ্ছে মুখে অসংখ্য কাটা ক্ষত দাগ।
ভেতরে আসতে বলব কিনা বুঝে উঠতে না পেরে ইতস্তত করে বললাম, ‘আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না।’
আগন্তুক খসখসে গলায় উওর দিলেন, ‘না চিনোনেরি কতা স্যার। আমি গরিব মানুষ। গরিব মাইনষেরে কেউ চিনে না। আমার নাম ফোরকান আলী, আমি  এই পাশের গেরামেই থাকি।’
‘ও…ও…ও… আচ্ছা, তা কি করেন আপনি?’
‘আমি ডেরাইভার, গাড়ি চালাই। লাশ টানা গাড়ি।’
‘আমার কাছে ঠিক কি মনে করে?’
‘আপনের নামে মেলা আধ্যাত্মিক গল্প শুনছি, আপনের লগে তাই দেখা করবার আইলাম।’
‘ঠিক বুঝলাম না। আমার ব্যাপারে আবার কি শুনলেন?’
‘একটু ভেতরে আহি স্যার। আপনের লগে কিছু কতা কইতে পারলে মনডা হালকা হইতো।
‘আচ্ছা আসুন।’
আমার ঘরে আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছু নেই। কাঠের একটা চেয়ার, চৌকি আর কেরোসিনের স্টোভ। আমি চৌকির ওপরে বসে উনাকে চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললাম।
‘স্যার আপনে অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ। ভার্সিটির পিছে করিমের চায়ের দোকানে মাঝেমধ্যে আপনেরে নিয়া নানান আলোচনা অয়। সেহানেই শুনলাম আপনে্র কাছে জিন-ভূত, পেত-পিশাচ সবকিছু নাকি পানি ভাত।’
এতক্ষণে বুঝতে পারলাম। শিক্ষা সফরে গিয়ে একরাতের ভৌতিক গল্পের সেই আড্ডা ডালপালা ছড়িয়ে শুধু বৃক্ষই হয়নি সেই সাথে শিমুল তুলার বীজের মতন বাতাসে ভেসে ছড়িয়ে পড়েছে  দূর-দূরান্তে।
আমি উঠে গিয়ে কেরোসিনের স্টোভের আগুন কিছুটা কমিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘জানি না আমার ব্যাপারে কি শুনেছেন তবে বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক হিসেবে অদ্ভুত কোনো  ঘটনা আমার নজরে এলে আমি তার ব্যাখ্যা খুঁজি মাত্র। এর চেয়ে বেশি কিছু না। আপনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন।’
‘আইচ্ছা স্যার কন তো পিশাচ কি মরা মাইনসের লাশ খায়?’
‘পিশাচ বলতে কিছু আছে কিনা সে বিষয়টাই আমার কাছে স্পষ্ট না। আর যদি অশরীরী কিছু থেকে থাকে তবে তা পার্থিব কোনো বস্তু নয় বলে আমাদের মতো নিয়মে তারা খাদ্য গ্রহণ করবে না। এই ধরুন গাছও তো খাদ্য গ্রহণ করে কিন্তু তারা তো আমাদের মতন ভাত, মাছ, মাংস খায় না।’
‘কিন্তু আমি যে নিজের চোক্ষে দেকছি স্যার।’
একটু বিরক্তি নিয়ে লোকটির দিকে তাকালাম। এজাতীয় মানুষ এটেনশন পেতে গল্প ফাঁদতে পছন্দ করে এবং একবার গল্প শুরু করলে তাদের থেকে সহজে রেহাই পাওয়া যায় না। কিন্তু নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করলাম-
‘কি দেখেছেন?’
আমার কথায় লোকটা বেশ উৎসাহ পেল। জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে লোকটি বলল, ‘মেট্টিক পরীক্কা দিওনের আগের বছর আমার বাপজান মারা গেল।  অভাবের কারণে আর পড়ালেখা হইল না। পেটের তাড়নায় কাজের উদ্দেশ করতে থাকলাম। কোনো কামকাজ খুঁইজা না  পাইয়া আশুলিয়ায় এক গুরুস্থানে পাহারাদারির কাম নিলাম। তহন ঢাকা শহরের অবস্থা এহকার মতন আছিল না। ঢাকার মাঝখানেই মানুষজন আছিল কম, আর উত্তরা, আশুলিয়া এই এলাকাগুলান ছিল এক্কেবারে মরুভূমির নাহাল। দিনের বেলাতেই শিয়াল শকুন ঘুইরা বেড়াইত। গোরস্থানের কাছে ধানের জমিতে দিনের বেলায় কিছু মানুষ কাজে আসত তয় সন্ধ্যা নামার আগেই সবাই চইলা যাইত। সন্ধ্যার পর পুরা অঞ্চলে আমি ছাড়া আর কারো দেহা পাওয়া যাইত না।
প্রথম কয়দিন পাহারা দিয়াই বুইঝা ফেলাইলাম জায়গাডা ভালা না। সন্ধার পর থাইকা শিয়ালের ডাক ছাড়া ত্রিভুবনের আর কোনো শব্দ কানে আসে না। মাঝেমধ্যে দূর থাইক্যা কবর দেওয়া উঁচা মাটিতে খাড়ায়া আমার দিকে আগুনের নাহাল জ্বলজ্বলা চোক্ষে তাকায় থাকে শিয়াল। সেই চোখ যে না দেখছে সে জানে না, দুনিয়ার বুকেও জাহান্নাম দেখা যায়। মাঝেমধ্যে তিন ব্যাটারির টর্চ ফেলাইলে দেহা যাইত ধারাল নখ দিয়ে আছড়ায়া মাটি খুঁইড়া কব্বর থাইকা লাশ বাইর কইরা টানাটানি কইরা লাশ ছিড়া খাইতাছে শিয়ালের দল। খণ্ড বিখণ্ড লাশ, ছেড়া নাড়ি-ভুঁড়ি আর জমাট বাধা পচা রক্ত। মৃত্যুর আলাদা এক গন্ধ আছে স্যার, লাশ থাইক্যা পচা মানুষের গন্ধ ছাড়াও মৃত্যুর সেই গন্ধ পাওয়া যাইত। বাশের বেড়া দেয়া একচালা ঘরে একখান টর্চ আর লাঠি নিয়া জাইগা বইস্যা থাকতাম সারা রাইত। গেরাম গঞ্জের শিয়াল আর গোরস্থানের মানুষের মাংস খাওয়া শিয়ালের মধ্যে বিস্তর ফারাক। এরা সুযোগ পাইলে জ্যান্ত মানুষরেও  কামড়ায়া খাইয়া ফেলাইতে পারে।’
আমি পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে দেয়াশলাই খুঁজতে খুঁজতে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘যদিও আপনার অভিজ্ঞতা খুবই লোমহর্ষক। তবুও শেয়াল মাংসাশী প্রাণী; সে সুযোগ পেলে কবর খুঁড়ে মাংস বের করে খাবে এটাই স্বাভাবিক। দেশের সব অঞ্চলেই এমন ঘটনা ঘটে।’
এমন জমাট গল্প বলার ফাঁকে একটি সিগারেট খেতে পছন্দ করতে পারে লোকটি। তাই নিজে একটি সিগারেট ধরিয়ে আরেকটি সিগারেট তার দিকে বাড়িয়ে দিতেই আতকে উঠলাম।
চাদরের নিচ থেকে হাত দুটি বের করে করল। চাদরে নিচে থাকায় এতক্ষণ দেখা যায়নি। লোকটির দুটি হাতই কনুইয়ের সামান্য নিচ থেকে কাটা। দুহাতে চেপে ধরে সিগারেট মুখে নিচ্ছে লোকটি। বোঝাই যাচ্ছে এমন কাটা হাতেই দৈনন্দিন নানান কাজ করার অভ্যাস লোকটির। তবে এই হাত নিয়ে গাড়ি চালানো কোনোভাবেই সম্ভব না, ড্রাইভিং লাইসেন্সই দেওয়া হবে না তাকে। তবে কি লোকটি কোনো কারণে মিথ্যা বলছে আমার সাথে। কী উদ্দেশ্য তার? শুধুই কি গল্প শোনানো নাকি অন্য কিছু?
স্যার আপনের সামনে সিগ্রেট খাওয়া খুবই বেয়াদবির কাজ। তাও আপনে যখন দিছেন তাই খাইতাছি। তয় কাটা হাতে সিগারেটে আগুন ধরাইতে পারি না। কিছু মনে না করলে সিগারেট টা একটু ধরাই দেন স্যার।
লোকটি কাটা হাতে অদ্ভুত কায়দায় সিগারেট ধরে মুখে নিলো। ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে আবার বলতে শুরু করল, ‘মাস খানেক না যাইতেই এক রাইতে দেখলাম গোর-পিশাচ। আমি সে রাইতেও টর্চ আর লাঠি নিয়ে মাটিতে বিছানা পাইতা বইসা আছি। কিন্তু রাইতটা কিরুম জানি খুব শুনশান মনে হইল। কি জানি নাই সেই রাইতে। একটু পড়েই বুঝলাম আইজকা রাইতে শিয়ালের ডাক নাই। শীতের রাইতে শিয়াল ডাকবনা এইডা কেরুম কথা। নাহ এক্কেবারে চুপচাপ চাইরদিক। ঘরের পিছনে শিয়ালের আনাগোনার কোনো হদিস পর্যন্ত নাই। সব শিয়াল যেন গর্তে লুকাইছে। বিছানা ছাইড়া আস্তে আস্তে উইঠা খাড়াইলাম। বাইরে হালকা আলো, জ্যোসনা নাই তয় আসমানের আলো দিয়াই পুরা গোরস্থান দেহা যাইতাছে। ঐ তো দূরে কিছু শিয়াল দেহা যায়। কব্বরের উপর দাঁড়ায়া কি জানি খাইতাছে। আমি সেইদিক টর্চ উঁচা কইরা বুতাম টিপলাম। এক মুহূর্ত্বের মধ্যে যা দেখলাম তা শিয়াল না। আলো পড়নে খাওয়া বন্ধ কইরা জিনিসটা আমার দিক তাকাইল। শিয়ালে মতনই খানিকটা দেখা যায় কিন্তু শিয়ালের চেয়ে সাইজে অনেক বড়ো। ভাল্লুকের মতো সারা শরীর লালা লোমে ভর্তি, ভয়াল এক চেহারা তাতে করাতের মতন লম্বা লম্বা দাঁত। শরীর ধনুকের নাহাল বেকা, উপুর হইয়া পইড়া কামড়াইয়া লাশ খাইতাছে।
আমি টর্চ ফেলাইয়া দিলাম দৌড়, মাঠ-ঘাট, উঁচা উঁচা ঘাস সব ভাইঙ্গা দৌড়। জীবন বাচানি দৌড়। যতক্ষণ পারছি দৌড়াইছি।’
বলতে বলতে জোরে জোরে নিশ্বাস ছাড়ছিলেন তিনি। উনার গল্প শুনে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালাম। আমার খিচুড়ি ততক্ষণে হয়ে এসেছে। কেরোসিনের চুলাটা বন্ধ করে দিয়ে আবার এসে বসলাম। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আমার কতা মনে হয় স্যার বিশ্বাস করেন নাই।’
‘না, বিশ্বাস করব না কেন। আর শুধু শুধু আপনি এত কষ্ট করে এসে আমাকে মিথ্যা কথাই-বা কেন বলবেন। তবে আমার ধারণা পুরো বিষয়টিই আপনি স্বপ্নে দেখেছেন। সেই রাতে আপনি আকাশে চাঁদ দেখেননি কারণ স্বপ্নের ডিটেইলিং খুব কম থাকে। তাই স্বপ্নে রাতের কোনো ঘটনা দেখলে সেই ঘটনায় সাধারণত চাঁদ তারা থাকে না। আপনার কথা থেকেই বোঝা যায় গোরস্থানের পাহারাদারির কাজটা শুরু থেকেই আপনার পছন্দ ছিল না। তার ওপর শিয়ালের লাশ খাওয়ার দৃশ্য আপনার মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। সেই থেকে জায়গাটার প্রতি আপনার প্রবল ঘৃণা তৈরি হয়। বেড়ার ঘরে আপনি জেগে রাত কাটালেও সে রাতে আপনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আর স্বপ্ন দেখে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। পরদিন দিনের বেলা আপনি সেখানে গেলে দেখতে পারতেন টর্চলাইট ঘরের বাইরে না আপনার বিছানার ওপরেই ছিল। স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙতেই আপনি ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসেন তাই টর্চ খুঁজা বা হাতে নেয়া আপনার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আর যদি অশরীরী দেখার ঘটনাটি সত্যি হতো তবে মানুষের সাইকোলজিক্যাল সেলফ ডিফেন্স মেকানিজম হাতে থাকা একমাত্র আলোর উৎসটি কোনোভাবেই ফেলতে দিত না।’
লোকটা এবার কোনো কথা না বলে আমার দিকে একবার তাকিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
আমি চুলা থেকে গরম খিচুড়ি নামিয়ে একটি ডিম ভেজে নিলাম। এই খাবারটি আমার যথেষ্ট প্রিয় একটি খাবার। রান্না করাও সহজ। সাথে এক চামচ ঘি কিংবা ঝাল আমের আচার ছড়িয়ে নিতে পারলে ভালো হতো।
বাড়ির কাছেই রাস্তার মোড়ে মাছ বিক্রি হচ্ছে। মানুষজন গোল হয়ে ভিড় করে মাছ দেখছে, কেউবা মাছের দাম জিজ্ঞেস করছে। অনেকেই আগ্রহ নিয়ে মাছ কাটা দেখছে। খাবার হিসেবে বেশির ভাগ মানুষের কাছে মাছের চেয়ে মাংস বেশি প্রিয় হলেও বাঙালিদের মাঝে মাছের আলাদা এক আবেদন রয়েছে। মাংস কাটা কেউ আগ্রহ নিয়ে দেখে না কিন্তু নদীর বড়ো মাছ দেখার মাঝেও আনন্দ আছে। এখনকার সময় অবশ্য মাছ কেনার পর সবাই বাজার থেকে কেটে নিয়ে যায়। কিন্তু আগে বড়ো মাছ বাড়িতে আনলে তা কাটার ভেতরেও এক উৎসব মিশে ছিল। মাটির উঠোনে বড়ো মাছ রেখে দা আর ছাই এনে নিপুণ হাতে বাড়ির গৃহিণী মাছ কাটতে শুরু করত। বাড়ির কর্তা পাশে পিড়িতে বসে গম্ভীর ভঙ্গিতে মাছ কাটার নির্দেশনা দিতেন। আর বাড়ির ছোটোরা অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকত মাছের পেট থেকে ডিম বের হয় কিনা দেখার জন্য।
মাঝারি সাইজের এক বোয়াল কিনে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ঘরের পেছনে মস্ত বড়ো মানকচুর গাছ। বেশির ভাগ মানকচু খুব গলা চুলকায় কিন্তু নারিকেলি মানকচু বোয়াল মাছ দিয়ে ঠিকঠাক মতন রান্না করতে পারলে খেতে অমৃত। তবে মানকচুর খোসা ছাড়াতে হবে অনেক গভীর করে। এই রান্নায় বোয়াল মাছ তেলে ভাজা যায় না। মশলাও ব্যবহার করতে হবে খুবই সীমিত। মানকচু ভালোভাবে ভাপ দিয়ে পানি ফেলে অল্প তেলমশলায় সিদ্ধ হয়ে এলে বোয়াল মাছ ওপর থেকে আস্তে করে ছেড়ে দিতে হবে। একবার মাছ উলটে দিলেই রান্না শেষ, শুধু নামানোর আগে কয়েকটা কাঁচা মরিচ আর করমচা ছড়িয়ে দিতে হবে।
সাধ করে কোনো কাজ করতে গেলেই দেখা যায় কেউ না কেউ এসে ব্যাঘাত ঘটায়। দরজায় শব্দ শুনে উঠে গিয়ে সেদিনের লোকটিকে আবার দেখলাম। প্রায় মাস খানেক পর আবার এসেছেন। আজও গায়ে জড়ানো সেই চাদর । শীতের প্রকোপ বেশ কমে এসেছে তবুও চাদর পরা দেখে বোঝতে পারলাম লোকটি নিজেকে সবসময় আড়াল করতে চান। মাঝে মাঝে আমারও মনে হয় শামুকের মতো খোলস থাকলে নিজেকে সম্পূর্ণ সেই খোলসে আবৃত করে সমাজসংসার থেকে কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দিই।
কিছু জিজ্ঞেস না করে নিঃশব্দে ঘরের ভেতরে চলে এলাম। লোকটিও পেছনে পেছনে ঘরে ঢুকলেন, নাম কি বলেছিলেন যেন লোকটি, ও , ফোরকান মিয়া।
দুজনেই আগের বারের মতোই মুখোমুখি বসলাম।
আমি বেশ বিরক্তি নিয়ে একটি সিগারেট ধরাতে ধরাতে একটু কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
‘আপনি সেদিন বললেন আপনি গাড়ি চালান। হাত ছাড়া গাড়ি কীভাবে চালানো যায়?’
লোকটি দাঁত বের করে হেসে বলল,
‘দুনিয়াতে অনেক কিছুই হয় স্যার। আপনের মতন জানলেওয়ালা মানুষও অনেক সময় অনেক কিছুই জানেন না।’
‘আপনার ভূতের কাহিনি তো শেষ হয়েছে তা আজকে আবার কী মনে করে।’
‘আফনে সেদিন ঠিক কতাই কইছিলেন। ঐ রাইতে যে আমি হপন দেকছিলাম তা আমি নিজেও পরে বুঝবার পারছিলাম। আফনের মেলা বুদ্ধি, সব ঠিকঠাক ধরবার পারছেন। হেরজন্যই তো আপনেরে আমার খুব দরকার স্যার।’
কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে লোকটি আবার বলল,
‘আমার বাপজান আমারে খুব আদর করত। আমার আর কোনো ভাইবোন আছিল না তো তাই আমিই ছিলাম বাপজানের পুরা দুনিয়া। হেও লাশটানা গাড়ির ডেরাইভার ছিল, আমারে গাড়ি চালানি আমার বাপজানেই শিখাইছে। আমি যহন খুব ছোড, বাপজান আমারে কোলের ওপর বসাইয়া গাড়ির স্টেয়ারিং হাতে ধরাই গাড়ি চালানি শিখাইত। আমার পা তহন এক্সেলেটর পর্যন্ত পৌঁছাইত না। বাপজানের কোলে বইস্যা আমি শুধু স্টিয়ারিং ঘুরাইতাম, বাপজান পা দিয়ে এক্সেলেটর আর ব্রেরেক সামলাইত।  বাপজানের পা আর আমার হাত মিইলা পূর্ণ হইত একজন ড্রেরাইভারের শরীর।
শ্রাবণ মাসের এক সকালে মোতালেব কাকা দৌড়াইয়া ঘরের পরে আইসা কইল, ফুরকান জলদি আয়, বড়ো রাস্তার মোড়ে তর বাপ গাড়ি এক্সিডেন্ট করছে। আমি দৌড় দিলাম কাকার পিছন পিছন। আমাদের গেরাম থাইক্যা মাটির রাস্তা যেহানে গিয়া পাকা সড়কে উঠছে সেখানেই বাপজানের গাড়ি চাপা দিছে এক টেরাক। গাড়ির দরজা কাইটা যহন বাপজানরে বাইর করা অইল তহন বাপজানের অর্ধেক শরীর কাটা, পেটের নিচ থাইকা গাড়ির বডি ডুইয়া দুই খণ্ড কইরা দিছে শরীরডারে। আমি বাপজানরে অনেক ডাকলাম কিন্তু বাপজান আমার কোন কতা কইল না।’
জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে আছে ফোরকান আমার দিকে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
‘এরপর লেহাপড়া বাদ দিয়া কাজের সন্ধানে বাইর হই। গোরস্থানে বেশিদিন কাজ করতে পারি নাই হেইডা তো আপনেরে আগেই কইছি। ছোনোবেলায় বাপজানের কাছে গাড়ি চালানি শিখছিলাম তাই আমিও বাপজানের মতন গাড়ি চালানি শুরু করলাম। প্রথমদিকে লেগুনা চালাইতাম,কিন্তু তখন আশুলিয়ার জিরাবোর দিকে মানুষজন বেশি আছিল না। তাই আয়-রোজগার খুব বেশি হইতো না। সেই তুলনায় লাশটানা গাড়িতে আয় অনেক বেশি। গাড়িতে লাশ নিয়া রাইতের বেলা অনেক দূর দূরান্তে যাইতে হ্‌ মনের মধ্যে অনেক সাহস লাগে, তাই এই গাড়ি সকলে চালাইতে পারে না। অভাবের তাড়নায় আমিও বাপজানের লাশটানা গাড়ি চালানি শুরু করলাম। মোবারক কাকা সেই গাড়ি ঠিক সারানোর সব ব্যবস্থা করে দিছিল। একদিন রাইতে টঙ্গী থাইকা এক্সিডেন্টে মরা এক লাশ নিয়া যাইতাছি নেত্রকোণা। গাড়ি যহন গাজিপুর চৌরাস্তা পার হয় তখন দুপাশে ঘন শাল আর গজার গাছের বন। হঠাৎ দেহি আমার  পাশের ছিটে কে যেন বসা। অন্ধকারে পরথমে ঠায়ুর করবার পাই নাই। ডরে আমার শরীর শক্ত হইয়া গেল। একটু পরে লোকটা নিশব্দে আমার দিকে তাকাইল। আমি চিনতে পারলাম, আমার বাপজান। ডর লাগলেও আমার মনডা পোড়ায়া উঠল। আহারে আমার বাপজান আমার গাড়ি চালানি দেকবার আইছে। কত দিন পর বাপজানের সেই মুখখানি দেখতাছি। হে কি যেন বুঝাইতে চায় আমারে। কিন্তু মুখে কোনো কতা কয় না। চুপচাপ মূর্তির মতন বইয়া আছে। চোখ দিয়া খালি কি জানি ইশারা করে। আমার সামনে সামনে যাইতাছে একটা টেরাক। গতি ষাইটের উপর হইব। ততক্ষণে বুইঝা গেছি বাপজান আমারে কি কইতে চায়, এইডাই সেই টেরাক যেইডা বাপজানের গাড়ি চাপা দিছিল। আমি বুইঝা গেলাম আমার কি করা লাগব, হঠাৎ আমি স্পিড বাড়াইলাম। ঠিক টেরাকের পিছনে গিয়া হর্ন বাজাইতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর সাইড দিলো হে। আমি ওভারটেক করলাম। টেরাকের সামনে নিয়া স্পিড আসতে আসতে কমাই দিলাম। এবার টেরাকের ডাইভার বিরক্ত হইয়া হর্ন দিতে থাকল। আমি গাড়ি বামে না চাপাইয়া আরো ডাইনে চাপাইলাম। এমন একটা জায়গায় আমার গাড়ি আনলাম যাতে পিছন থাইকা দেখা না যায় সামনে থাইকা অন্য কোনো গাড়ি আসতাছে কিনা। এই জায়গাডার নাম দিছি আমি বেলাইন্ড স্পট। এইবার আমি গাড়ির স্পিড বাড়াই দিলাম। বাপজান আমার পাশে আগের মতনই নিথর হইয়া বসা। আমার পেছন পেছন টেরাকের গতিও বাড়ল। যাইতে যাইতে উলটা দিক থেকে আরেকটা টেরাক আসতে দেখলাম। বাপজান আমার দিক তহন আবার তাকাইল। আমি বুইঝা গেলাম আমার কি করণ লাগব। আমি গাড়ির স্পিড একটু কমাইয়া হালকা বামে চাপাইয়া হাতের ইশারা দিয়া পিছনের ডেরাইভাররে ওভারটেক করার সিগনাল দিলাম। সিগনাল পাইয়া হে স্পিড বাড়াইয়া আমার পাশে গাড়ি নিয়া আইলো আর আইসাই দেখল সামনে থাইকা আইতাছে তার জম।
বিষাক্ত এক হাসি ফুটে উঠল তার কালো ঠোঁটে, সেই রাইতে খুব শান্তির একটা ঘুম দিলাম। এই ঘটনার পর মেলাদিন আর বাপজানরে দেহি নাই। তয় আরেকবার রাইতে সাভার তনে লাশ নিয়া টাঙ্গাইল যাইতাছি। আগেরবারের মতোই সামনে একটা টেরাক, হঠাৎ পাশে তাকায় দেখি আমার পাশে বাপজান। আমি বুঝে গেলাম আমার কি করণ লাগব। এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই বাপজানরে দেহি, আর যহনই তারে দেহি তহনই…
বলতে বলতে ভয়ানক শব্দে খিক খিক করে হেসে উঠল লোকটা। হাসতে হাসতেই বলল,
‘পরথম পরথম টেরাকগুলারে খালি শায়েস্তা করতাম, তয় আস্তে আস্তে এইডা নিশার মতন হইয়া গেল। রক্ত না দেকলে ভালো ঘুম হয় না। তাই গাড়ি, বাস, মিনিবাস, পিকআপ সবগুলানরেই নিয়া খেলা শুরু করলাম। বাপজান যদিও মুখে কিছু কয় না তয় আমি টের পাই  বাপজান আমার বেজাই খুশি।
জানেন কি স্যার, পাপ বেশি হইয়া গেলে তার শাস্তি দুনিয়াতেই পাওন লাগে। একদিন বনানী রোডে গাড়ি নিয়া যাইতাছি, রাস্তা ফাঁকা। বালুর একটা টেরাক সামনে। পাশে তাকায় দেহি বাপজান। আমি আমার সেই খেলা শুরু করলাম। টেরাকটারে ওভারটেক কইরা পজিশন নিছি। এবার সামনে থাইকা আসতাছে একটা স্কুল বাস। বাচ্চা বাচ্চা পোলাপানে ভর্তি। তত দিনে রক্তের নেশা আমারে পিশাচ বানায় দিছে তাই কোনো কিছুই আমার মনরে আর গলায় না। বাসটা এক্কেবারে মিল মতন আছে। এহন সাইড দিয়া পিছের টেরাকটারে সিগনাল দিলেই কেল্লা ফতে। কিন্তু কি আজিব কারবার…
চিৎকার করে উঠে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল ফোরকান। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
একটা মানুষরে বাচায় রাখতে উপরওয়ালা লাখ লাখ ফেরেশতা শরীরে দিয়া রাখেন। খালি চোখে দেইখা মনে হয় মানুষ কি সহজেই গাড়ি-ঘোড়া চালায়, কিন্তু দীর্ঘদিন যারা ডেরাইভারি করে তারা জানে। গাড়ি চালানিতে ফেরেশতারা সব সময় ডেরাইভারদের সাহায্য করে। নাইলে এত বড়ো বড়ো গাড়ি আন্দাজের উপর কহনই এত নিখুঁতভাবে চালানি যাইত না।
কি হয়েছিল সেদিন? গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
আমি যহন গাড়িটা ঠিক জায়গা মতন নিয়া সিগনাল দিমু হেই সময় সামনের স্কুল বাসে কাচে রোদ পইড়া সেই রোদের ঝলকানি আইস্যা আইসা লাগল আমার চোক্ষে। নিমেষেই আমার চোখ এক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হইয়া গেল। চোখ খুইলা দেহি আমার গাড়ি রাস্তার ডিভাইডারের একবারে সামনে আইসা পড়ছে, আমি সামলাই নেওয়ার আগেই ডান পাশের চাকা উইঠা পড়ল রাস্তার ডিভাইডারের উপর। এরপর আমার আর কিছু মনে নাই। যখন চোখ খুললাম তহন আমি হাসপাতালে। আমার হাত বেন্ডিস দিয়ে বান্ধা। যেই স্টিয়ারিং-এ হাত রাইখা আমি শত শত মানুষের জীবন লইয়া খেলছি সেই স্টিয়ারিং ভাইঙ্গা আমার হাতে ঢুইকা আমার দুইডা হাতই কাটা পরে। বন্ধ হয় আমার গাড়ি চালানি।
এমন বীভৎস গল্প শোনার পর মনটা স্বাভাবিকভাবেই খুব বিচলিত হয়ে উঠে। একটু সময় নিয়ে বললাম, ‘আপনি ভয়ানক রকম সাইকিক ডিসওয়াডারে আক্রান্ত। অল্প বয়সে পিতৃ বিয়োগের ব্যাপারটি আপনার মনে গভীর দাগ কাটে। বাবার মৃত্যুর কারণে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়, পারিবারিকভাবেও নিশ্চয় খুব কঠিন সময় পার করতে হয় যার জন্য যানবাহন বিশেষ করে ট্রাকের ওপর আপনার চরম আক্রোশ সৃষ্টি হয়। আপনার বাবার লাশবাহী গাড়ি আপনার বিক্ষিপ্ত মানসিক অবস্থাকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যায়। এক রাতে যখন এক্সিডেন্টে মৃত লাশ আপনার গাড়িতে উঠানো হয় তখন আপনার মনোজগৎ পুরো ভেঙে পড়ে।  ব্রেন সেসময় আপনার সামনে তৈরি করে আপনার মৃত বাবাকে। ট্রাক চালকের ওপর প্রতিশোধ নিয়ে সে একপ্রকার স্বস্তি লাভ করার চেষ্টা করে। কিন্তু এজাতীয় ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসা না হলে সাইকিক ডিসওয়ার্ডার বাড়তে থাকে। মন কখনই শান্ত হয় না, একের পর এক পুনরাবৃত হতে থাকে ঘটনা। আর এভাবেই জন্ম হয় সিরিয়াল কিলারের।
লোকটি উচ্চস্বরে হেসে উঠল,
‘হা হা হা হা আপনে কিচ্ছু জানেন না স্যার। দুনিয়াডা এত সহজ না। সব জিনিস আপনাগো ওই শিক্ষিত মানুষদের বইয়ের মধ্যে থাকে না। এর বাইরেও অনেক কিছু আছে।
ইবলিশ এর কতা জানেন তো স্যার। ইবলিশ আমার মতন খারাপ মানুষরে সাহায্য করে। হাত হারায়া যহন আর গাড়ি চালাইতে পারি না, তহন কি যে কষ্ট হওয়া শুরু হইল স্যার। রাইতে ঘুম হইত না। এরচেয়ে মরণ অনেক ভালো আছিল। খালি ছটফট করতে থাকলাম আর আমার বাবজানরে ডাকতে থাকলাম। কিন্তু বাবজানের আর দেহা পাইলাম না।
এর মধ্যে একবার বাসে চইড়া নবীনগর যাইতাছি। বাসভর্তি মানুষ, কোনো সিট ফাঁকা নাই। আমি আস্তে আস্তে গিয়া বইলাম ডেরাইভারের পাশে ইঞ্জিনের উপরের বনারে। ড্রাইভার গাড়ি চালাইতাছে, তার হাতে স্টিয়ারিং, পায়ে এক্সেলেটর। আমি খুব মন দিয়া তার গাড়ি চালানি দেখতাছি। মনের মধ্যে আমার তীব্র আফসোস। ছোটো থাইকাই এই গাড়ি চালানি আমার নেশা। তীরের নাখাল নজর দিয়া তাকাই আছি তার গাড়ি চালানির দিকে। হঠাৎ মনে হইল, আরে গাড়ি হেই ডাইভার না, গাড়ি তো চালাইতাছি আমি। আমি যেই রকম মনে মনে চাইতাছি সেই ডাইভার ঠিক সেইভাবেই গাড়ি চালাইতাছে। আমি যেন হের মাথার ভেতরে ঢুইকা বইসা আছি, আমি যেমন চামু তার বাইরে যাওনের কোনো সাধ্য তার নাই। পাশে তাকায় দেহি আমার বাপজান আমার পাশেই বসা। চুপচাপ তাকায় আছে আমার দিকে। যদিও এত দিনে আমি বুইঝা গেছি যারে আমি আমার বাপজান ভাবতাম হে আসলে আমার বাপ না। হে হইতাছে ইবলিস। আমার বাপের রূপ ধইরা সে আমারে রক্তের তিয়াস লাগাইছে। আমার তহন দরকার রক্ত, লাল রঙের তিয়াসে তহন আমার বুক ফাইটা যায়। এই তো সামনে থাইক্যা একটা পেরাইভেট কার আসতাছে… আমি ডেরাইভারের পুরো শরীর বসে নিয়া শুরু করলাম আমার সেই পুরানা খেলা।’
লোকটা এই পর্যন্ত বলেই উঠে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে হেটে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আমি পিছন থেকে লোকটার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বলে উঠলাম, এই মানুষটাকে থামাতে হবে, যে করেই হোক থামাতে হবে।
বসন্তের  বাতাস একই সাথে মনকে ভালো অথচ খুব উদাস করে দেয়। বটগাছের নিচের ছোটো এই চায়ের হোটেলটাতে সকালে রুটি আর ডাল পাওয়া যায়। রুটির সাথে ডাল খাওয়ার জন্য চামচ দেয় কিন্তু চামচে করে ডাল খেয়ে তৃপ্তি পাই না। রুটি ছিড়ে তা ডালে ডুবিয়ে হাতে করে মুখে পুরে দেওয়ার মাঝেই রুটির আসল স্বাদ। ডালে রুটি ভেজাতে ভেজাতে ঠিক করে ফেললাম করণীয় সম্পর্কে।
মানুষের ব্রেন খুব জটিল জিনিস। খুব জনপ্রিয় একটি মিথ রয়েছে, সাধারণ মানুষের ব্রেনের নাকি মাত্র ১০ শতাংশ সচল। কদাচিৎ দুএকজন মানুষের ব্রেনের চেয়ে কিছুটা বেশি সক্রিয় থাকে তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি কর্মক্ষম হয়। আইনস্টাইনকে নিয়েও এমন গল্প শোনা যায়। মানুষের ব্রেন যদি শতভাগ সক্রিয় হয় তবে মানুষের ক্ষমতা হয়ে যাবে নাকি অসীম।
ফোরকানের মানসিক বিকৃতি ওর সাইকিক পাওয়ারকে আনলিশ করেছে। ও এখন খুব সহজের ওর টেলিপ্যাথি দ্বারা অন্য ডাইভারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।
সব ঘটনার শুরু হয় সেই লাশবাহী গাড়ি থেকে। তাই এর সমাধানও লুকানো আছে সেই গাড়িতেই। আশুলিয়া গোরস্থানের কাছাকছি মোবারক নামক লোকটাকে খুঁজে বের করতে হবে। তার মাধ্যমেই জোগাড় করতে হবে গাড়িটি। এরপর ফোরকানকে নিয়ে এক রাতে উঠতে হবে সেই গাড়িতে। অনেক দিন পর আবার গাড়ির স্টিয়ারিং নিতে হবে আমার হাতে। চলে যেতে হবে কোনো এক হাইওয়েতে, ধীরে ধীরে বাড়বে গাড়ির গতি। সামনে কোনোএক ট্রাক পড়তেই ফোরকান দেখবে তার বাবাকে। সে প্রচণ্ডভাবে চেষ্টা করবে আমার ব্রেনকে কন্ট্রোল করার। আমারও পুরো নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে আমার মস্তিষ্কের ওপর। দুজনের চলবে  টেলিপ্যাথিক লড়াই। এই লড়াইয়ে কোনোভাবেই আমার পরাজয় হলে চলবে না। এর আগেও আমি প্রচণ্ড মানসিক শক্তিসম্পন্ন এক ব্যক্তির মুখোমুখি হয়েছিলাম। তাই নিজের মানসিক শক্তির ওপর আমার বেশ আস্থা রয়েছে।
সাইকো কিলাররা একবার হেরে গেলে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। একবার পরাজিত করতে পারলেই ফোরকানের বাবা চিরদিনের জন্য ওকে ছেড়ে চলে যাবে…

লেখক পরিচিতি :
আরিফুল আলম বর্তমান ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্গত শেরপুর জেলায় ১৯৯৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নিজ জেলায় অবস্থিত সুরেন্দ্রমোহন মডেল স্কুল হতে তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালাভ হয়। এরপর উত্তরা আদর্শ বিদ্যালয় হতে ২০০৮ সালে এস. এস. সি ও শেরপুর সরকারি কলেজ হতে ২০১০ সালে এইচ. এস. সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজের সাথে যুক্ত রয়েছেন। ইতোপূর্বে তরুণ লেখক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে লেখকের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে।

Read Previous

শ্রাবণ মেঘের দিন :  আবেগ, নন্দন এবং সংগীতের এক অপূর্ব সমাহার

Read Next

পথ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *