অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নুসরাত সুলতানা  -
আলোদায়ী অন্ধকার

আলোদায়ী অন্ধকার

নুসরাত সুলতানা 

 

১৯৬২ সালের ১০ নভেম্বর। সীমান্ত নিয়ে যুদ্ধ চলছে চীন এবং ভারতের মধ্যে। শহরে বিরাজ করছে চরম ভীতিকর পরিস্থিতি। নারী-শিশু-বয়োজ্যেষ্ঠরা তেমন কেউ বাইরে যাচ্ছে না। যুবক এবং পুরুষরা ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনায় চরম উত্তেজিত। দেশপ্রেমের গান গেয়ে ফান্ড সংগ্রহ করছে যুদ্ধের। এর ভেতরেই সন্ধ্যায় কলকাতা বউবাজারের এক কোঠাঘরে মেহফিলের জন্য সাজগোজ করতে ব্যস্ত রুপালী বাঈজী। সকাল-বিকাল যেমন হারমোনিয়াম নিয়ে গলা সাধে রূপালি, তেমনি স্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর খাবার এবং ব্যায়াম করে নিজের শরীরও রাখে সুন্দর এবং ফিটফাট। একইভাবে পরিচ্ছন্ন রাখেন নিজের কোঠাঘর। যে যাই ভাবুক নিজের নাচকে যেমন তিনি পূজা মনে করেন তেমনি নাচঘরকে মনে করেন মন্দিরের মতো পবিত্র। এই কোঠাঘরই নিজেকে এবং পুত্র সুদীপ্তকে অন্ন-বস্ত্র দেয়। মা হয়ে ছেলেকে দিতে পারছে শিক্ষার আলো। রুপালি সেদিন একটা ফিরোজা ব্লু জমিনের ভেতর সোনালি জরি কাজের শাড়ি পরেছে। বড় সোনালি পুঁথির মালা, বড় ঝুমকা, হাত ভর্তি ফিরোজা ব্লু এবং সোনালি চুরি, মাথায় একটা টিকলি, পায়ে চিকন এক জোড়া নুপুর। ঠোঁটে গাঢ় খয়েরি রঙের লিপিস্টিক। পায়ে আলতা, হাতে মেহেদি। কোঠাঘরে ফরাস কাপড় নিয়মিতই পরিষ্কার করায় রুপালি। বড় ঝাড়বাতি লাগিয়েছে দুটো। আজ ফরাসের শেষ মাথায় দুটো নরম গদি এবং কারুকাজ করা কোলবালিশের ব্যবস্থা করেছে রুপালি। কারণ খুব ধনী দুজন মেহমান আসবে। সাজগোজ শেষ করে সারঙ্গ বাদককে প্রস্তুত হতে বলে রুপালি। সহযোগী শিউলি দাসকে বলে- রুপোর মোমদানিতে মোমগুলো জ্বালিয়ে দিতে। এরপর জ্বালিয়ে দিতে বলে ধূপ এবং চন্দন। ফুলদানিতে আছে রজনীগন্ধা এবং গোলাপ। সহযোগী শিউলিকে বলে দিয়েছে মেহফিল শুরু হলে কাসার গ্লাসে করে সব মেহমানকে বিয়ার এবং সোমরস পরিবেশন করতে। কিছু কাবাব, লুচি, সন্দেশ এনে রেখেছে বিকেল বেলায় নিজেই।
সন্ধ্যা সাতটা বাজতে না বাজতেই মেহমানরা আসতে শুরু করলেন। রুপালি তবোলচি এবং সফরদার নিয়ে উঠল স্টেজে। পাশের ঘরে সন্দেশ, চকলেট, চানাচুর এবং খেলনা দিয়ে বসিয়ে রেখে এসেছেন তিন বছরের শিশুপুত্র সুদীপ্তকে। শিউলিকে বলা আছে মেহমানদের শরবত, পান এবং সোমরস পরিবেশন করে সুদীপ্তর দিকে খেয়াল রাখতে।
সবাইকে যুদ্ধ পরিস্থিতির ভেতর মেহফিলে আসার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শুরু করল রুপালি। তানপুরার প্রথম ঝঙ্কার বাজতেই বাঈজীর মধ্যে চলে আসে নিস্তব্ধতা। মৃদু তাল ধরল তবালচি। রুপালি বাঈ হাতের আঙুলে নূপুরের ঝঙ্কার তুললেন, তারপর ভরাট গলায় ঠুমরি শুরু করল-

কেন বসিয়ে রাখো হে শ্যাম,
আমার প্রাণে ব্যথা দিলে কেন?

ব্রজের সব গোপিনীর হিয়া হরণ করো,
বাঁশির সুরে সবার মন ভোলাও,
আমায় যে দাও শুধু অশ্রুর ভার—
হে শ্যাম, এ কেমন লীলা তোমার?

কেন বসিয়ে রাখো হে শ্যাম,
আমার প্রাণে ব্যথা দিলে কেন?

যৌবনের হাসি সব কেড়ে নিলে,
আমার আঁখির আলো মুছে দিলে,
রাধার বুকে শুধু জ্বালা-যন্ত্রণা,
তবুও তোমারেই ডাকি বারেবার।

কেন বসিয়ে রাখো হে শ্যাম…

গানের সঙ্গে মৃদু কোমর দোলানো নাচ। মোমবাতির আলো দুলে দুলে তার শরীরের প্রতিটি ভঙ্গিমাকে যেন জাদুর মতো ফুটিয়ে তোলে। এক মুহূর্তে তার চোখে অগ্নি, পরমুহূর্তে গভীর স্নিগ্ধতা। বাবুরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখেন বাঈজীর আঙুলের কারুকাজ, চোখের চাহনি আর দেহের সর্পিল অঙ্গভঙ্গি।
চন্দন, ধূপ, আতর, গোলাপজল এবং গন্ধরাজ ও গোলাপ মেশানো হাওয়া ঠুমরির সুর, এবং রুপালি বাঈয়ের ভুবন ভোলানো রূপ ও নাচ অতিথিদের যেন বাস্তব জগতের সব ভুলিয়ে স্বপ্নের জগতে নিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে শিউলি পরিবেশন করেছে রুপার পানদানিতে পান, কাসার গ্লাসে মদ এবং কাচের গ্লাসে শরবত। এরভেতরই কেঁদে ওঠে সুদীপ্ত। শিউলি যদিও গেছে অন্দর কক্ষে কিন্তু সুদীপ্ত মা মা বলে চিৎকার করছে। প্রথম ঠুমরি গেয়ে শেষ করে সবার কাছে কিছুটা বিরতি নিয়ে রুপালি গেলেন ছেলের কাছে। শিউলিকে বললেন- খাবার পরিবেশন করতে। আধাঘণ্টায় ছেলেকে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে আবার মেহফিলে ফিরলেন রুপালি। সেদিন আরও এক ঘণ্টা নাচ-গান পরিবেশন করে রাত দশটায় শেষ হয় মেহফিল। স্বর্ণকার অজিত ঘোষ দিলেন পাঁচ হাজার রুপি এবং গন্ধ বনিক সুজন চৌধুরী দিলেন তিন হাজার রুপি। সাজগোজ খুলে একটা ম্যাক্সি পরে শিউলিকে কাবাব, লুচি, সবজি খেতে দিয়ে নিজে খেলেন দুধের সাথে সাবু, কলা আর একটা আপেল। ছেলের জন্য শিউলিকে দুধ গরম করে ভরে দিতে বললেন রুপালি। রাত এগারোটায় ছেলেকে বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুমাতে গেলেন বাঈজী। শুয়ে শুয়েই ভাবতে লাগলেন সাত রাজ্যের ভাবনা। নিজের অজান্তে আজ সমস্ত মন জুড়ে এক অন্যরকম সুখানুভূতি হচ্ছে। বহুকাল নিজের নাচ-গানের পারিশ্রমিক তুলে দিতে হয়েছে চৌধুরীয়া সুনয়না দাসের কাছে। আজ সে বৌবাজার ছেড়ে চলে গেছে বলেই নিজের পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে পারছে রুপালি। এসব ভাবতে ভাবতেই গভীর ঘুম দেশে চলে যায় রুপালি বাঈজী।

০২. 
পশ্চিম বাংলার বাঁকুড়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম লালজোড়া। গ্রামটি ছোট হলেও এর চারপাশের প্রকৃতি অনন্য সৌন্দর্যে ভরপুর। চারপাশে ঘন শাল, পিয়াল, মহুয়া ও সেগুন গাছের বন গ্রামটিকে এক নিসর্গঘেরা পরিবেশ দিয়েছে। বসন্তকালে বনভূমি জুড়ে পলাশ ফুলে লালজোড়া সত্যিই লাল হয়ে ওঠে, নামের সঙ্গে প্রকৃত মিল খুঁজে পায় সৌন্দর্য পিপাসুরা। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঝরনা ও ছোট ছোট খাল-বিল ভরে ওঠে, চারপাশে সবুজের সমারোহে গ্রাম আরও সজীব হয়ে ওঠে। কাঁচা মাটির পথ ধরে গেলে একদিকে দেখা যায় ধানক্ষেত আর সবজি বাগান, অন্যদিকে জঙ্গল টানা রেখার মতো বিস্তৃত। গ্রামের মাঝেমাঝে লাল মাটি উন্মুক্ত হয়ে আছে, যা পুরুলিয়ার ভৌগোলিক পরিচয়ের মূল চিহ্ন। সকালে ও বিকেলে গ্রাম জুড়ে পাখির ডাক, গরুর ঘণ্টার শব্দ, ধূপকাঠির গন্ধ গ্রামের বাতাসে মিশে থাকে।
গ্রামবাসীর জীবনধারাও প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গেছে মহুয়া ফুল সংগ্রহ, শালপাতার থালা বানানো, ঢাক-ঢোল বাজানো; এসব গ্রামীণ ছন্দ লালজোড়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই গ্রামেরই এক হতদরিদ্র পরিবারে ১৯৪০ সালে রুপালি বাঈ জন্মেছিলেন। বাবা কাশীনাথ মালাকার আর মা লীলা দাসের পঞ্চম সন্তান রুপালি। কাশীনাথ ছিলেন দিনমজুর আর মা লীলা দাস শালপাতার থালা-বাটি বানিয়ে বিক্রি করতেন বাজারে। লীলা এর আগে চারটি কন্যা সন্তান প্রসব করেছে। কাশীনাথ যখন শুনলো পঞ্চম সন্তানটিও কন্যা। তখন তাকে পুকুরে ডুবিয়ে মারতে গেল। কাশীনাথের চাচা হরিনাথ জোর করে বাঁচিয়ে রাখে রুপালিকে। হরিনাথ বলে- ভগবানের দান সবই রত্ন। একদিন তোর এই মাইয়া অনেক নাম করতে পারে।
রুপালি পেয়েছিল মায়ের আগুনের মতো রূপ। গায়ের রঙ একেবারে দুধে-আলতা, খাড়া নাক, ডাগর চোখ, সোজা একহারা কালো চুল, চিকন ঠোঁট। হাতের আঙুলগুলো ঢেঁড়সের মতো সুন্দর। আর পেয়েছিল বাবার মতো গানের গলা। ছয় বছর বয়সেই যাত্রাদলের সাথে যোগ দিয়ে ঝুমুর নাচ নেচে টাকা রোজগার করত শিশু রুপালি। তারপর ও পরিবারের ঋণ শোধ করতে দশ বছর বয়সে বিয়ের নামে পাঁচ হাজার রুপিতে বেচে দেয়া হয় রুপালিকে। বিয়ের দুই বছর পর বৌবাজারে এক কোঠায় সুনয়না দাসের কাছে দশ হাজার রুপিতে বিক্রি করে দেয় রুপালির দেবর। অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে কোঠাবাড়ির জীবন শুরু হয় রুপালির। দুই বছর সুনয়না তাকে গজল, ঠুমরী, চৈতী, কাজরি গান শেখান। আর শেখান কত্থক নৃত্য। তেরো বছর বয়সে রুপালি বাঈজীর মুজরোতে অভিষেক হয়। প্রথম মুজরোতেই চৈতী গান এবং কথক নাচে সকলের দৃষ্টিতে পড়ে যায় রুপালি । এরপর রুপালির মুজরোতে সবসময়ই লোক সমাগম ঘটতো। রুপালি মুজরো নিয়ে যেতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কিন্তু টাকা সব নিয়ে নিতো সুনয়না দাস। অল্প কিছু টাকা হাতে পেতেন। চীন-ভারত যুদ্ধে সুনয়না কলকাতা ছেড়ে চলে যায় দূরের এক গ্রামে। আর রুপালিও পায় নিজের কোঠায় স্বাধীন নাচ-গানের জীবন।

০৩
মোঘল আমলে বাঈজী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল উত্তর ভারতে। সেখান থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বাঈজীরা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইংরেজদের আগমনের পর শেষদিকে বাঈজী সংস্কৃতিতে ভাটা পড়তে থাকে। কারণ ইংরেজরা কখনো একে শিল্পের মর্যাদা দেয়নি। ৪৭-এ দেশ ভাগের পর বাঈজীদের আরও দুর্দশা নেমে আসে। ৬২-র চীন-ভারত যুদ্ধের সময় বহু বাঈজী এই পেশা ছেড়ে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করে। তেমনই দুজন বাঈজী রঞ্জনা এবং সুনেত্রা। এরা রুপালির সাথে একই কোঠায় ছিল। এখন থাকে বউবাজার বেশ্যাবাড়ি। এই পরাজিত বাঈজীরা সবসময়ই মুখিয়ে থাকে রুপালিকে বেশ্যা হিসেবে দেগে দেওয়ার জন্য। তথাপি রুপালি এসব একেবারেই থোড়াই কেয়ার করে।
চলে গেছে ইতোমধ্যে তিন বছর। সুদীপ্তকে দিয়েছে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। সাথে যায় নতুন সহযোগী ফুলবালা। সকালবেলা ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েই গানের রেওয়াজ করতে বসে রুপালি বাঈজী। ইদানীং একজন রবীন্দ্র সংগীতের ওস্তাদ ও রেখেছেন রুপালি। এরই ভেতর আসেন রুপালির নিয়মিত দর্শক-শ্রোতা-পৃষ্ঠপোষক কোটিপতি স্বর্ণ ব্যবসায়ী আদিত্য চৌধুরী। এই তো কয়েক বছর আগেও তাদের পরিবার বানারসে জমিদার ছিল। রুপালির জন্য নিয়ে এসেছে সাত ভরি স্বর্ণ। সীতা হার, বালা, ঝুমকা, টিকলি, এনেছে দশ হাজার টাকার সবুজ স্বর্ণ কাতান, হীরার আংটি আর বিশ কেজি মিষ্টি। এসে হাত পেতে বলছে বাঈজী তোমার দুয়ারে ভিক্ষ চাইতে এসেছি। তোমার এ হাতদুটো আমাকে ভিক্ষা দাও। রুপালি মাটিতে পড়ে পায়ে প্রণাম দেন আদিত্যর। বলেন- আপনার এ সম্মান আমার মাথার তাজ। কিন্তু এ কোঠা আমি ছেড়ে যেতে পারব না। কোনো সম্পর্কেও জড়াতে পারব না। এ কোঠা আর আমার ছেলে এই আমার জীবন। আপনি যখন যেমন চাইবেন আমি তেমন গান শোনাবো আপনাকে। যদি শুধু একা আপনি মুজরো শুনতে চান তাও শুনাবো। আদিত্য বলেন- ঠিক আছে বাঈজী। বড় ব্যথা পেলাম বুকে। তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা আর সুদীপ্তকে পুত্রের মর্যাদা দিয়েই রাখতাম। রুপালি বলেন- এই ইচ্ছেটুকুই আমার মুকুট হয়ে রইলো বাবু। তবে তুমি মিষ্টিমুখ করবে, পান খাবে, গান শুনবে তারপর যাবে খন। সেদিন রুপালি আদিত্যকে শোনান – আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে, এত পাখি গায়…
রুপালির দুই গাল বেয়ে পড়ে শ্রাবণ ধারা। চোখে জল আসে আদিত্যরও। যাবার সময় আদিত্য বলে যান- যদি কখনো রুপালি মত পালটায় তাঁকে জানালেই হবে। রুপালিকে তিনি আলাদা বাড়ি কিনে রাখবেন। প্রথম স্ত্রীর সাথে রাখবেন না। অযত্ন হবে না সুদীপ্তরও। রুপালির বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস। আর মনে পড়ে পড়ে সমীরণ চট্টোপাধ্যায়ের মুখচ্ছবি। তিন বছর যার রক্ষিতা ছিল রুপালি। টাকা খেয়ে সুনয়না দাসই ঘরে জায়গা দিয়েছিলেন গুদাম ব্যবসায়ী সমীরণ চট্টোপাধ্যায়কে। তখনই সুদীপ্তর জন্ম হয়। এসব প্রণয় প্রার্থনা রুপালিকে ভেতর থেকে আরও দৃঢ় করে তোলে। সে কেবলই নিজের পুত্র এবং নাচ-গানের ব্যাপারে আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
একটু পরেই ফুলবালা ফেরে সুদীপ্তকে নিয়ে। ছেলেকে চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস- আমার সুদীপ্ত সোনা টিফিন খেয়েছে? সুদীপ্ত বলে, হ্যাঁ মা। আমার বন্ধু সোলায়মান টিফিন আনেনি। ওকেও দিয়েছি। ছেলেকে আদর করে বলে- লক্ষ্মী ছেলে আমার!
ফুলবালার মুখ কালো। রুপালি জিজ্ঞেস করে- কিরে ফুল। তোর মন খারাপ ক্যান? কেউ কিছু বলছে? সুদীপ্ত বলে মা দুই মাসি জানি কী বলছে ফুল পিসিকে। ফুলবালা বলে- রঞ্জনা বাঈ আর সুনেত্রা বাঈ বলে আপ্নে নাকি বেশ্যাগিরি করেন। আমাগো বাড়ি নাকি বেশ্যা বাড়ি। নাইলে তিন বছর আগে যুদ্ধে সকলের নাচ-গান বন্ধ অইছে। আপনেরডা কেমনে চলে? একটু কষ্ট পায় রুপালি। ফুলকে বলে- যে যা বলতে যায় বলুক আমি আমার কাজ করি। তুই ডিম আর টক দই মিশা। আমি চুলে লাগাবো। আর মেহেদী বাট, হাতে দিই। পায়ে আলতা সন্ধ্যায় লাগাবো।
সেদিন সন্ধ্যায় আদিত্য চৌধুরীর শাড়ি-গহনা সব পরে রুপালি মুজরোতে গাইতে ওঠেন। রুপালিকে সবুজ শাড়ি, স্বর্ণের গহনা, বাদামি লিপিস্টিক আর সবুজ টিপে এক স্নিগ্ধ দীঘির মতো স্বচ্ছ সুন্দর লাগছে। মুজরোতে গাইতে বসে রুপালির চোখ খুঁজছিল আদিত্য চৌধুরীকেই। কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সেদিন মুজরোতে এল শম্ভুনাথ দাশ। বৌবাজারের কুখ্যাত মাস্তান, সন্ত্রাসী। মুজরোর মাঝখানে দল-বল নিয়ে প্রবেশ করে শম্ভু। ঘেমে যাচ্ছে রুপালি। তথাপি অন্যান্য মেহমানদের সম্মানে গান গেয়ে যায় সে। সেদিন এসেছিলেন বিখ্যাত সংগীত শিল্পী অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও। দুটি ঠুমরী গাওয়ার পরে রুপালি ধরলেন গজল-

লগ জা গলী কে ফির যহ
হসীন রাত হো না হো…
শাযদ ফির ইস জনম মৈং
মুলাকাত হো না হ

লগ জা গলী… আএ… আএ…

হমকো মিলী হৈং আজ যহ
ঘড়িযাঁ নসীব স
…………
……….
ফির আপ কে নসীব মৈং
যহ বাত হো না হো…
শাযদ ফির ইস জনম মৈং
মুলাকাত হো না হ

সেই মুজরোতে রুপালি বাঈজীর গান শুনে অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অঝোরে কাঁদলেন। মুজরো শেষে তিনি বললেন- রুপালি আজ আমি এমন সংগীত শুনলাম যা আমার হৃদয়, কান, আত্মা সব ঠাণ্ডা করে দিয়েছে। আমি আশীর্বাদ করি তোমার গায়কী বহু মানুষের আত্মায় পৌঁছে যাক। কিন্তু রুপালির গান, আঙুল, চোখ, ঠোঁট সব অঙ্গভঙ্গি গোগ্রাসে গিলছিল শম্ভু। মুজরো শেষে রুপালিকে গিয়ে বলে- আজ থেকে তুমি আমার বাঈজী। কেউ অসুবিধা করলে আমারে বলবা। অর বাপের নাম ভুলাইয়া দিমু।

০৪.
লাল ভেলভেট পাড়ের ভেতর জরি সুতার কারুকাজ, জমিনে সোনালি বুটি, হাত ভর্তি সোনার চুড়ি, গলায় সীতাহার, চোখ লেপ্টে কাজল, কপালে বড় লাল টিপ, ঠোঁটে সিঁদুর লাল লিপিস্টিক, মাথায় টিকলি, হাতে মেহেদী, পায়ে নূপুর, চোখের পাতায় শ্যাডো। ব্লাউজের গলা বেশ বড়, দেখা যায় পিঠের অনেকখানিও। আদিত্য চৌধুরী একা মুজরো দেখবেন। সাক্ষাৎ দুর্গা রূপে সেজেছে রুপালি। ছেলেকে গৃহ শিক্ষিকের কাছে পড়তে বসিয়ে শুরু করেছেন মুজরো। নিজ হাতে কেক, কলা, মিষ্টি নাশতাও দিয়ে এসেছেন। আদিত্য বাবুর জন্য আনিয়েছেন রেড ওয়াইন, কাবাব, চানাচুর, সন্দেশ আর বানিয়ে রেখেছেন মালাই চা, আর তবক দেয়া পান।

আদিত্য চৌধুরী যথাসময়ে সাদা ধুতি, পাঞ্জাবি আর চপ্পল পরে এলেন। রুপালি শুরু করল ঠুমরি দিয়ে-

পিয়া মোসে বল না বোলে,
প্রিয় আমায় কথা না কয়,

নৈনন মে আঁসু ডোলে,
চোখে আমার অশ্রু রোলায়।

কহুঁ ক্যাসে মন কি পির,
কীভাবে বলি অন্তরের ব্যথা এই,

ঘির আয়ি সাওন কি ঘোরে বদরিয়া,
বর্ষার কালো মেঘে ঢেকে যায় ধরি,

ভিগে মোরে চিতবা কি চীর,
মনটা আমার ভিজে ব্যাকুল ভরি।

পিয়া মোসে বল না বোলে…
প্রিয় আমায় কথা না কয়…

এভাবে টানা দুই ঘণ্টা নাচে-গানে আদিত্য চৌধুরীকে বিনোদন দেয় রুপালি। গান গাইতে গাইতে আদিত্য চৌধুরীকে মদ পরিবেশন করতে গেলে আদিত্য চৌধুরী রুপালিকে জড়িয়ে ধরতে গেলে রুপালি নাচতে নাচতেই সরে আসে। ওইদিন মুজরো শেষে আদিত্য চৌধুরী রুপালিকে বুকের ভেতর গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরেন। আর বলেন- তোমার রূপ আর গলা ভগবানের দান। তুমি বাঈজী হয়েই বেঁচে থাকো। তোমাকে আমি নিজের কামনার কারাগারে বন্দি করব না বাঈজী।

০৫.
নাচ-গান, সুদীপ্তর পড়ালেখা আর নিজের শরীর-স্বাস্থ্যের পরিচর্যা এই নিয়েই রুপালির জীবন। এর ভেতরই আছে পুরুষের মুগ্ধতার অত্যাচার। কারো রক্ষিতা করতে চাওয়া, কারো বিয়ে করতে চাওয়া। শম্ভু বিবাহের কার্ড অবধি ছাপিয়ে ফেলেছিল। রুপালি বউবাজারের পুলিশ কমিশনারের সাহায্য নেয় তখন। এভাবেই নরমে-গরমে কখনো ছল করে, কখনো বুঝিয়ে আবার কখনো তীব্র উপেক্ষার তীর হেনে রুপালি বাঈজী পুরুষের কামনার চিতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে কোঠাঘরে স্বাধীন জীবন চালিয়ে যায়। সাথে চালিয়ে যায় কিছু সামাজিক কার্যক্রম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রুপালি শরনার্থী শিবিরে দান করে পঁচিশ হাজার টাকা।
এইসব সফলতা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার পাশাপাশি রুপালিকে আরও একটি বিষয় খুব খেয়াল করতে হয়। সেটা হল সুদীপ্তর সাথে বোঝাপড়া। সুদীপ্তকে রুপালি কিছুই লুকায় না। এক রাতে এক কোটিপতি ব্যবসায়ী দুজন বন্ধু নিয়ে উপভোগ করে রুপালির মুজরো। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত এগারোটা অবধি রুপালি তাদের জন্য নাচ-গান করে। এক রাতেই রুপালি পায় বিশ হাজার রুপি। সেই রাতে রুপালির সাজগোজ ছিল খুবই হাল ফ্যাশন যুক্ত। ব্লাউজের বড় গলা, পাতলা শাড়ি, প্রচুর গহনা, ঠোঁটে কড়া লাল লিপিস্টিক। মুজরো শেষে যখন ছেলেকে নিয়ে খেতে বসে রুপালি তখন ছেলেকে খুব বিষাদগ্রস্ত এবং আনমনা মনে হয় তার। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই জল ভরা চোখে ছেলে বলে- মাম বাঈজী আর বেশ্যা কী একই? রুপালি বলে না, কখনো না। বাঈজী একজন ধ্রুপদী শিল্পী। আর বেশ্যা একজন দেহ শ্রমিক। কিন্তু তাকেও যেচে অপমান, অশ্রদ্ধা করার অধিকার কারো নেই। তারপর ছেলে জানায় তার স্কুলের এক বন্ধুর বাবা-মা সুদীপ্তর সাথে মেলামেশা করতে নিষেধ করেছে। কারণ রুপালি বেশ্যা তাই। রুপালি ছেলেকে বাঈজী, বেশ্যা, কোঠাঘর সব সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয় খোলামেলাভাবে। এও বলে কত প্রশিক্ষণ এবং সাধনা শেষে একজনকে নারী বাঈজী হতে পারে। এই কোঠাঘর কিভাবে তাদের বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়েছে সেটাও বলে। এরপর ছেলে আর কখনো প্রশ্ন করেনি।

০৬.
এক সকালে কোমরে তীব্র ব্যথা নিয়ে শুয়ে আছে রুপালি। কিছুতেই নড়তে পারছে না। ডাক্তারের কাছে সহযোগী মালতীকে পাঠিয়ে ব্যথার ঔষধ খেয়ে নেয়। এরপর যায় অর্থপেডিক ডাক্তার সুধীর চন্দ্রের কাছে। এক্সরে করে দেখা যায় রুপালির কোমরের ডিস্ক সরে গেছে। একেবারে বিছানার বিশ্রাম দেয় ডাক্তার তিন মাসের। সাথে ঔষধ। আর সব ধরনের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে বলে। রুপালি ডানা কাটা পাখির মতো ছটফট করে। শুয়ে শুয়ে গজল গায়। কিন্তু বিছানা ছাড়ে না। আর ছেলেরেও কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আছে যেন বিছানা না ছাড়ে সেজন্য। শুয়ে শুয়ে নিজের জীবনের সাত রাজ্যের চিন্তা ভর করে। আর ভাবে- সুদীপ্তর পড়াশোনা অনেক বাকি। এখনই যদি অচল হয়ে যাই!
সুদীপ্ত পড়াশোনায় খুব ভালো ফলাফল করছে। নাইনে উঠে সে কলকাতার বিখ্যাত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল সেন্ট লরেন্সে ভর্তি পরীক্ষা দেয়। এবার সে একাই দৌড়ঝাঁপ করতে শিখে গেছে। রুপালি বিছানায় শুয়ে শুয়েই ছেলের স্কুলে সুযোগ পাওয়া ও নিজের সুস্থতার জন্য ভগবানকে নিবিড়ভাবে স্মরণ করে যায়।
তিনমাস পর এক্সরে করে ডাক্তার বলে রুপালি গাইতে পারবে। তবে এখনই জোরালো নাচ নয়। হালকা নাচ করলে অসুবিধা নেই। এর এক সপ্তাহ পরে রুপালি মুজরোর আয়োজন করে। সফরদারকে দিয়ে শহরে লিফলেট বিলিয়েছে। সন্ধ্যা ছটায় রুপালি সাজতে বসেছে মুজরোর জন্য। ফিরোজা ব্লু শিফন জরজেটের ওপর রুপালি চুমকির কারুকাজ করা শাড়ি, সব রুপার গয়না। বড় সীতাহার, রুপার ঝুমকা, টিকলি, হাত ভর্তি রুপালি চুড়ি, পায়ে নূপুর, মাথায় রুপার মুকুট। ঠোঁটে ম্যাজেন্টা লিপিস্টিক, কপালে বড় ফিরোজা টিপ। এর ভেতর হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি নিয়ে প্রবেশ করে সুদীপ্ত। বলে- মাম আমি সেন্ট লরেন্সে চান্স পেয়েছি। রুপালি বাঈজীর চোখে জল। ছেলেকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে কপালে চুমু খায় বাঈজী মা।
সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হয়েছে মুজরো। চারশত চোখ রূপ আর নাচের দিকে আর আটশো কান রুপালির গানের নিবিড় স্রোতা। লাগ যা গলিই.. গানের সাথে হালকা নাচছিল রুপালি । মন-প্রাণ উজাড় করে আজ গাইছে সে। মানুষ করতে হবে পুত্রকে। অনেক বড় হবে তার সুদীপ্ত। হঠাৎ অভ্যাসবশত একটু জোরে নাচতে গিয়েই চন করে ওঠে কোমর। রুপালি হাসতে হাসতে নাচ স্লো করে ফেলে। চোখে তখন চিকচিক করে অশ্রুবিন্দু…

Read Previous

নূর-ই দরিয়া

Read Next

পরবর্তী মৃত্যুর দুয়ারে কড়া নাড়ার আগে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *