অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শফিক হাসান -
সিঙ্গেল মাদার বইয়ের পাঠ উন্মোচন

অনুপ্রাণন সংবাদ ১০ মে ২০২৬
সিঙ্গেল মাদার বইয়ের পাঠ উন্মোচন

শফিক হাসান

 

দুপুরে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সঙ্গে মৃদু ঠুসঠাস বজ্রপাতও। রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত জনজীবন থমকে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। তবে রেশ রেখে দিয়েছিল আর বেশি সময় যাবত।
দিনটি ১০ মে, রবিবার। বিকেল ৫টায় হাতিরপুলস্থ অনুপ্রাণন প্রধান কার্যালয়ে কাজী লাবণ্য সম্পাদিত ‘সিঙ্গেল মাদার’ বইয়ের পাঠ উন্মোচনের অনুষ্ঠান। এই দুর্যোগে আমন্ত্রিত অতিথি তথা সংশ্লিষ্ট লেখকরা যথাসময়ে উপস্থিত হতে পারবেন তো! এমন একটা আশঙ্কার মেঘ তো ছিলই। কিন্তু সব দুর্ভাবনার অবসান ঘটিয়ে একে একে উপস্থিত হতে শুরু করলেন অতিথিরা। গল্পে গল্পে, কথার পিঠে কথায় জমে উঠল আসর।
নির্ধারিত সময়ে অনুপ্রাণন প্রকাশন সম্পাদক ও প্রকাশক আবু এম ইউসুফ অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন। স্বাগত ব্যক্তব্যে তিনি বলেন— ‘সিঙ্গেল মাদার বইয়ের পাঠ উন্মোচনে আমরা এমন একদিনে মিলিত হয়েছি, কাকতালীয়ভাবে আজকের দিনটা মাদার্স ডে বা মা দিবস। মাকে স্মরণ করার ও শ্রদ্ধা জানানোর দিন।’ প্রকাশক হিসেবে বইটি প্রকাশের কারণ ও প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন আবু এম ইউসুফ। এরপর তিনি অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বভার অর্পণ করেন বইয়ের সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক কাজী লাবণ্য’র ওপর। কাজী লাবণ্য তার সম্পাদনার ইতি-নেতি অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। বিভিন্নজনের প্রশ্নের জবাব দিয়ে কৌতূহল নিবৃত্ত করেন।
কবি ও কথাসাহিত্যিক তাহমিনা কোরাইশী অনুপ্রাণন প্রকাশন ও অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হতে না পারার মর্মবেদনার গল্প শোনান। তিনি আরও বলেন, ‘সন্তানের বাবারা সেভাবে দায়িত্ব পালন করে না। মায়ের চাপই বেশি থাকে। সন্তানকে ঘিরেই মায়ের ভুবন, জীবন। বর্তমানে ঘরে ঘরেই সিঙ্গেল মাদার আছে। আমার পরিচিত একজনের গল্প নিয়ে সংকলনে স্থান পাওয়া গ্রাস গল্পটা লিখেছি।’
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস বিষয়ভিত্তিক গল্প লেখার যাতনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তিনি লেখকের বিকাশের জন্য একজন প্রকাশকের দায়িত্ব ও ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে। কাজী লাবণ্যকে ধন্যবাদ জানান, চমৎকার সংকলনটি সম্পাদনার জন্য।
কবি ও কথাসাহিত্যিক রুখসানা কাজল বলেন, ‘যখন যার সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়, তার সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় নোট রাখি। এই অভ্যাস ভবিষ্যতে কাজে দেয়। এই সংকলনে যে গল্পটা লিখেছি, সেটা অতীতে শোনা অভিজ্ঞতার আলোকে। গল্পটাকে বর্তমান সময়ের উপযোগী করে তুলেছি। এই সংকলনের লেখকরা একাকী মাকে যেভাবে দেখেছে, প্রত্যেককে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।’
গল্পকার ইসরাত জাহান বলেন, ‘আমার গল্পের নাম হার্ডকাভার ও পেপারব্যাক। এখানে দুজন মায়ের গল্প বলার চেষ্টা করেছি।’
লেখক পারভীন সুলতানা বলেন, ‘আমি ঘরকুনো, কিন্তু আজ সিঙ্গেল মাদার আমাকে বের করে এনেছে। এই সংকলনের গল্পগুলোতে দরদ ও দ্রোহ উঠে এসেছে। আমার গল্পের নাম প্ররোচিত কৃষ্ণচূড়া ও একটি খুন। কুমারী অথচ মা হতে চলেছে, এখানে একজনের মা হওয়ার নীরব বেদনা উঠে এসেছে। মানুষ হিসেবে আমি আবেগপ্রবণ নই, কিন্তু এই গল্প লিখতে গিয়ে একফোঁটা পানি চলে এসেছে চোখে। অনেক মা, সন্তানের বাবা থাকাসত্ত্বেও সিঙ্গেল। এটা সামাজিক সমস্যা।’
কথাসাহিত্যিক মিলা মাহফুজা বলেন, ‘যে কোনো লেখকেরই একটা লেখা প্রকাশ হলে মা হওয়ার মতোই আনন্দ আসে। আমি একটা কিছু নির্মাণ করেছি⸺যে কেউ পড়বে, দেখবে এটা আমার জন্য আনন্দের। সম্পাদকের তাগাদার কারণেই গল্পটা লেখা সম্ভব হলো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজেও সিঙ্গেল মাদার। ছোট ছেলের এসএসসি পরীক্ষার আগে আমার স্বামী গত হলো। বাবা থাকলে সন্তানের মনস্তাত্ত্বিক সংকট কেমন হয়? সন্তানের মনে হয় বাবা না থাকায় বুঝি এটা হয়েছে, ওটা হয়নি। এটা অন্যরকমভাবে হতো!’
লেখক তাহমিনা শিল্পী বলেন, ‘লেখার সময় চারপাশের অসঙ্গতি তুলে ধরার দায় লেখকের আছে। আমি নারী। নারীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা প্রেম আছে। সুযোগ থাকলে আমি বারবার নারী হয়েই জন্মাতাম।’
কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক স্বাতী চৌধুরী নিজের বিভিন্ন গল্পবইয়ের গল্পে সিঙ্গেল মাদারের উপস্থিতি বর্ণনা করেন। গ্রামীণ জীবনে যে নারীর স্বামী বিদেশে থাকে, দেবরকুল তাকে নানাভাবে জ্বালাতন করে। এখানে সংশ্লিষ্ট পরিবারের অভিভাবকদেরও প্রচ্ছন্ন সায় থাকে। অনুপ্রাণন অন্তর্জালে প্রকাশিত নিজের লেখা গল্প ‘ক্ষেত্রজ’ও যে সিঙ্গেল মাদার বিষয়টিকে ধারণ করেছে সেটা তুলে ধরার পাশাপাশি গল্পের সারক্ষেপ বর্ণনা করেন স্বাতী চৌধুরী।
নিও হ্যাপি চাকমা বলেন, ‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে আমি জয়িতা গল্পটা লিখেছি। গল্পে বর্ণিত মা ঢাকার শ্যামলীতে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে শুধু নয়, বাবারাও অনেক সমস্যা মোকাবেলা করেন। বাবাদের সংগ্রামকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। যে কোনো পরিবারেই সামর্থ্যের বেশি খরচ করতে গেলে বিপর্যয় ঘটে। যে জ্বালানি দিয়ে সে হয়তো পুরো পথ পাড়ি দিত, দেখা যায় অর্ধেক পথ পেরোতেই জ্বালানি ফুরিয়ে যায়!’
অনুপ্রাণন প্রকাশন সহকারী সম্পাদক কবি সদ্য সমুজ্জ্বল পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রণ ব্যবস্থাপনা দেখভালের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য সম্পাদকের পরেই সব গল্প পড়তে পেরেছি। পড়ে খুব ঋদ্ধ হয়েছি। আমার চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতায় কোনো বইয়েরই কাজ এত দ্রুত শেষ করতে পারিনি। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের সক্ষমতা সম্বন্ধেও অবগত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।’
অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক সহকারী সম্পাদক শফিক হাসান বলেন, ‘সিঙ্গেল মাকে নিয়ে প্রকাশ করা বইটা নিশ্চয়ই দারুণ ঘটনা। যতটুকু জানি, এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রথম বই এটাই। তবে আমি প্রত্যাশা করব, বিয়ে হয়নি কিন্তু সন্তানের মা হয়েছেন এমন মায়েদের নিয়েও পৃথক একটা সংকলন কেউ একজন উদ্যোগী হয়ে সম্পাদনা করবেন। সমাজ-সংসারের প্রতিকূলে লড়ে যাওয়া এই মায়ের সংগ্রাম তুলনামূলক আরও বেশি। অন্ধকার ঠেলে কীভাবে তারা আলোর মুখ দেখছেন ও সন্তানকে দেখাচ্ছেন⸺এর নেপথ্যে জমা হচ্ছে সাহসিকতার অনেক গল্প ও অশ্রুগাথা।’
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ঝর্না রহমান বলেন, ‘অগ্নিতা নামে আমার একটা বই আছে। নামগল্পটাই দিয়েছি কাজী লাবণ্যকে। একটা ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হওয়ার পর গল্পটা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে একজন পাঠক বইমেলার স্টল থেকে আমাকে আবিষ্কার করেন। জানতে চান, আমিই সেই লেখক কিনা! আক্ষরিক অর্থেই এটা গত শতাব্দীতে লেখা; নির্মাণনির্ভর গল্প।’
এসময় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, কোনো কোনো কাগজে অতীতে তার নাম বানান ভুল বানানে লেখা হয়েছে। ন-এর বদলে কোনো কোনো সম্পাদক ণ ব্যবহার করেন, ‘শুদ্ধতা’ বজায় রাখতে গিয়ে। সংশ্লিষ্ট সম্পাদকদের উদ্দেশ্যে লেখার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নোট দেওয়ার পরেও কাজ হয়নি। ভুল ভুলই থেকে গেছে। এটা লেখক হিসেবে বেদনার বলে উল্লেখ করেন ঝর্না রহমান।
সিঙ্গেল মাদার বইয়ের বিভিন্ন আলোচনা ও বাস্তব সমস্যাবলির আলোকে অনুষ্ঠানের শেষাংশে লেখক মিলা মাহফুজা ‘সিঙ্গেল ফাদার’ নামে একটা বই সম্পাদনার ঘোষণা দেন। এতে থাকবে একাকী বাবার সংগ্রাম, দুঃখ-যাতনার গল্প। আগ্রহী লেখকদের গল্প পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানান সম্পাদক মিলা মাহফুজা।
বিদায়লগ্নে অতিথিদের উপহার হিসেবে অনুপ্রাণন নামাঙ্কিত মগ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন⸺সৈয়দ আহসান কবীর, রাহমান ওয়াহিদ, পার্থসারথি, বর্ষা রায় চৌধুরী, শাহীন আলম শেখ প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, ‘সিঙ্গেল মাদার’ সংকলনের স্থান পেয়েছে ৩৬টা গল্প। সংশ্লিষ্ট লেখকরা হচ্ছেন—আনিসুজ জামান, ইসরাত জাহান, কঙ্কন সরকার, কানিজ ফাতেমা সোমা, জেবুন্নেসা জ্যোৎস্না, ঝর্না রহমান, তাহমিনা কোরায়শী, তাহমিনা শিল্পী, দিলারা মেসবাহ, দীলতাজ রহমান, দেবদ্যুতি রায়, নাসরীন জাহান, নাসিমা আনিস, নিও হ্যাপি চাকমা, নিবেদিতা আইচ, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, পলি শাহিনা, পারভীন সুলতানা, বিষ্ণু সরকার, মাহবুব ময়ুখ রিশাদ, মিলা মাহফুজা, মোজাফফর হোসেন, মোহছেনা ঝর্ণা, রওশন রুবী, রুখসানা কাজল, লাজ্বাতুল কাওনাইন লীনা, শাহনাজ পারভীন, শাহাব আহমেদ, শিউলী জাহান, শেলী সেনগুপ্তা, সাদিয়া সুলতানা, সাহানা শিমু, সেমিমা হাকিম, সোনালী ইসলাম, সেলিম জাহান, হানিফ ওয়াহিদ।

Read Previous

রক্তকরবী : মুক্ত প্রাণের অপরাজেয় গান

Read Next

মজাপুকুর আর মহল সমাচার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *