অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৮, ২০২৬
৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ১৮, ২০২৬
৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাবিবুল্লাহ রাসেল -
কুকুর বিষয়ক উপপাদ্য ও অন্যান্য অণুগল্প

কুকুর বিষয়ক উপপাদ্য ও অন্যান্য অণুগল্প
হাবিবুল্লাহ রাসেল

 

কুকুর বিষয়ক উপপাদ্য

কুকুরের দলটি শাহবাগ-টিএসসি ঘুরে জগন্নাথ হলের কাছে এসে থামল। তারপর দূর থেকে রবীন্দ্র ভবনের সড়কে কিছু একটা দেখতে পেয়ে একযোগে ছুটল।
একটি কুকুর চিৎকার করে উঠল, আব্বা! আব্বা!
আর একটি কুকুর বলল, আরে, এরা আমাদের আব্বা না; আব্বাদের ছবিমাত্র। মুক্তির দুষ্টু পোলাপান এঁকে রাখছে।
—কেন আঁকছে?
—যাতে সবাই পায়ে মাড়িয়ে ঘৃণা জানাতে পারে।
এমন কথায় দুটো কুকুর কেঁদে উঠল। তারা ছবির ওপর পায়ে-মাড়ানো ধুলো চেটে চেটে পরিষ্কার করতে লাগল।
একটি কুকুর বলল, আরে পাগল, আঁকা ছবিতে ঘৃণা জানালে কী হয়? আমরাই তো আমাদের আব্বাদের একেকটা প্রকৃত ছবি।
আরেকটি কুকুর বলল, তবু আয়, ছবিগুলো চেটে চেটে মুছে ফেলি। তারপর পুরো ক্যাম্পাস ঘেউ ঘেউ করে স্বগর্বে ঘুরে বেড়াই।
—হ্যাঁ, হ্যাঁ! ওরা দেখুক—আমাদের আব্বাদের জীবন্ত ছবিগুলো এখনো কীভাবে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়!

জন্তু

চিড়িয়াখানার বাঘ হঠাৎ কেঁদে উঠল।
পাশের খাঁচা থেকে সিংহ জিজ্ঞেস করল, কী হলো দোস্ত, কাঁদছিস কেন?
বাঘ জবাব না দিয়ে কেঁদেকেটে বুক ভাসায়।
সিংহ আবার প্রশ্ন করল, আহা, বলবি তো, কী কষ্ট তোর?
বাঘ চোখ মুছল তারপর বলল, শুনছিস না? একদল মানুষ হিংস্রতায় আমাদের ছাড়িয়ে গেছে!
সিংহও এবার কেঁদে উঠল, পথেঘাটে বিনা টিকিটে যদি দলে দলে জন্তু দেখা যায়, তাহলে টিকিট কেটে আমাদের দেখতে আসবে কে?

সম্পাদিত মুখ

লোকটি নেতা হতে চাইল। কিন্তু জনতা তাকে গ্রহণ করল না।
দুঃখ নিয়ে কসমেটোলজিস্ট বন্ধুর কাছে গেলে বন্ধু বলল, আয় মুখটা সম্পাদনা করে দিই।
বন্ধু মুখটাকে মায়াবী, বিনয়ী একটা মুখে রূপ দিলো। কিন্তু জনতা এবারও আগ্রহ দেখাল না।
দ্বিতীয় ধাপে বন্ধু জ্ঞানী, সূর্যদীপ্ত একটা মুখাবয়ব দিলো। কিন্তু তা কোনো কাজেই এলো না।
বন্ধু হতাশ হয়ে এবার একটা অজ্ঞ, বর্বর, অন্ধকারমগ্ন মুখে রূপ দিলো। জনতা এবার তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করল।

ফুটবল

ফসল ওঠার পর শিশুরা মাঠে ফুটবল খেলতে জড়ো হলো। কিন্তু প্রত্যেকে বল নিজের পায়ে রাখতে চায়। তাই এক বলের পেছনে বিশৃঙ্খলার এক উৎসব শুরু হলো। পক্ষ-বিপক্ষ দল না থাকার কারণে তা ঠিকঠাক ফুটবল খেলা হয়ে উঠল না।
হঠাৎ একজন বলল, আমরা দুই দলে ভাগ হয়ে খেলি না কেন? আমরা কি বোকা?
সবাই সমস্বরে বলল, তাই তো, তাই তো!
দুই দলে ভাগ হতে গিয়ে দেখা গেল একজন বেশি হয়ে গেছে। কী করা যায়?
কিছুক্ষণ পরে সমাধানে আসা গেল- অতিরিক্ত খেলোয়াড়কে বলা হলো, তুমি একদলে কিছুক্ষণ, আবার অন্যদলে কিছুক্ষণ খেলবে।
অতিরিক্ত খেলোয়াড় বলল, তাতে আমার কী লাভ?
কেউ কেউ হেসে বলল, যে দলই জয়ী হোক না কেন, তুমি জয়েল আনন্দে মাততে পারবে।
অতিরিক্ত খেলোয়াড় রাজি হলে খেলা শুরু হলো।
কিন্তু খেলা কিছুক্ষণ না গড়াতেই বলটা হঠাৎ ফেটে গেল। দুই দল একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর সবাই মুচকি হাসল।
সমাধান সহজ—অতিরিক্ত খেলোয়াড় আসলে কোনো কাজে আসে না, শুধু ঝামেলা সৃষ্টি করে।
অতঃপর ওর মাথা কাটলে উভয় দলের জন্য একটি চমৎকার বল হয়ে গেল!

উদ্ভট পশুর পাল

একপাল পশু লোকালয়ের ভেতর হেঁটে বেড়াচ্ছে।
তারা ধূর্ত শেয়াল না ডাসবাঘ, গরু না গাধা, হায়না না রামছাগল—কিছুই বোঝা যায় না।
মজার বিষয়, এই দৃশ্য যে-ই দেখে, সে আর শুধু দেখে না— নিজেই উদ্ভট পশুদের একজন হয়ে যায়।

চুরিবিষয়ক পলিসি

প্রথম রাতে চোর চোর বলে চিৎকার করে উঠবে। জনতাও ঘুম ছেড়ে লাফিয়ে উঠবে। তারাও চোর চোর বলে হাঁক দেবে। নিজেদের সম্পদ রক্ষা আর হাতেনাতে চোর ধরার জন্য সারারাত পাহারা দেবে।
দ্বিতীয় রাতও এভাবে চলবে। একইভাবে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম রাতও পার হবে। তারপর ঘোষণা দেবে দূর গ্রাম চোর ধরা পড়েছে। আর রাত জাগতে হবে না, এবার শান্তি। অষ্টম রাতে সাত দিন না ঘুমানো চোখে রাজ্যের ঘুম নামবে। কিছুই টের পাবে না জনতা।
এটাই হচ্ছে গৃহস্থের সাত দিন চোরের এক দিন।

কুহু কুহু

কোকিলেরা উড়ে উড়ে কুহু কুহু ডাকে সারা বন মাতিয়ে রাখল। কাকেদের একদম সহ্য হলো না এসব। কী পেয়েছে কোকিল? জঙ্গলটা কিনে নিয়েছে নাকি?
কাকেরা দলবেঁধে জড়ো হলো শকুনের আস্তানায়। এর একটি বিহিত করুন। সারাদিন ‘কুহু কুহু’ ডাকবে, এটা কিছুতেই মেনে নেব না। ‘কুহু কুহু’ ডাক ওদের কেনা সম্পত্তি নাকি?
সভায় বাজরপাখিও যোগ দিলো। বলল, ঠিক আছে যার যেভাবে ইচ্ছে ডাকো না। ‘কুহু কুহু’ তো আর কোকিলের পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। কা কা না ডেকে তোমরাও না হয় আজ থেকে কুহু কুহু করে ডাকো।
কাক ভীষণ খুশি হয়ে ‘কুহু কুহু’ ডাকতে চাইল। যতবার কণ্ঠ খুলল, কা কা ছাড়া আর কোনো শব্দ হলো না।
কাক ভীষণ অপমানিত হলো। রাগে উন্মাদ হয়ে লাফিয়ে উঠল, এই ‘কুহু কুহু’ ডাক জঙ্গলে চলবে না। আজই নিষিদ্ধ করা হোক এই ডাক।

রাক্ষস

রাক্ষস আতঙ্কে নগরবাসী ঘুমাতে পারে না। নগরপিতাকে জানালে তিনি হেসেই উড়িয়ে দিলেন।
নগরবাসী বলল, তবে কি আমরা ভুল শুনেছি পিতা?
নগরপিতা বললেন, গুজব গুজব, সব গুজব। নিড়ে ফিরে নিশ্চিন্তে ঘুমাও। আহা! বৃথাই কত রাত নির্ঘুম কেটে গেছে তোমাদের!
নগরবাসীর আনন্দে চারদিকে আলো নেচে উঠল। তবু ঘুমাতে হবে যে! কত দিন প্রশান্তির ঘুম নেই!
নগরবাসী ঘুম থেকে উঠে দেখে- দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেছে। আশ্চর্য! রাক্ষস তো তাদের খেতে আসেনি। তারা একে অপরের মুখের দিকে চায় আর নগরপিতাকে স্মরণ করে স্তুতি গায়।
সবাই উৎসবে মেতে উঠে যখন আনন্দরেলি নিয়ে পথে নামে; দেখে- নগরীটাই রাক্ষসের পেটের ভেতর।

আত্মহত্যা

লোকটি বিবিধ আঘাতে জর্জরিত হয়ে মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়ল। কোথাও থেকে কোনো আশার বাণী শোনে না। যে দিকেই তাকায় চোখে দেখে অন্ধকার। জীবনের সব স্বপ্ন রং হারালে লোকটির আর বাঁচার ইচ্ছে রইল না। সিদ্ধান্ত নিলো রাতেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করবে।
আত্মহত্যার সমস্ত আয়োজন শেষ করে লোকটি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। জ্যোস্না জোয়ারে যেন ভেসে যাচ্ছে প্রকৃতি। হঠাৎ লোকটির কবিতা পড়তে ইচ্ছে হলো। শেল্ফ থেকে বের করল সরকার আমিনের কবিতা। পড়তে পড়তে আটকে গেল চোখ- ‘আত্মহত্যার পরিবর্তে এক কাপ চা খাও।’
লোকটি ঘন দুধ দিয়ে চা খেল- যেন এক পেয়ালা জ্যোৎস্না। শরীরটা তার ভীষণভাবে দুলে উঠল। বিছানায় হেলিয়ে পড়তেই ঘুমিয়ে পড়ল। ফাঁসের রশিটা সিলিংফ্যানের সাথে ঝুলছে।
ভোরে লোকটির যখন ঘুম ভাঙল, দেখল, জিহ্বা বের করা একটি রাষ্ট্র ফাঁসের রশির সঙ্গে ঝুলে আছে।

স্বপ্ন খামার

দিন-রাত কঠোর পরিশ্রমের পর সবুজ হয়ে উঠেছে কৃষকের সবজিখামার। কৃষকের আনন্দ আর ধরে না। কয়েকদিনের মধ্যেই বিক্রিযোগ্য হয়ে উঠবে।
কিন্তু নিজ গোয়ালের গরু দড়ি ছিঁড়ে মাঠের এক কোণের সবজি খেয়ে নিলো। কৃষক রাগে আর নিজেকে সামাল দিতে পারল না। এলোপাথারি পিটিয়ে শান্ত হলো কৃষক। আর গরুটা হাম্বা হাম্বা করে কাঁদল।
কিছুদিনের মধ্যে মাঠের সবজি বিক্রয়যোগ্য হয়ে উঠল। কিন্তু কৃষকের কপালে হাত। দাম এত কম যে উৎপাদন খরচই উঠবে না। কৃষক প্রতীক্ষা করে, এই বুঝি দাম বাড়ে। কিন্তু না, উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, মাঠ থেকে তোলার খরচই তো উঠছে না।
রাগ ধরে কৃষকের। গরু এনে খাওয়াতে থাকে স্বপ্নের সবজি ক্ষেত।
গরু উৎসবের আনন্দ নিয়ে খাচ্ছে আর হাম্বা হাম্বা করে বলছে, সেই তো খাওয়ালে আমায়, শুধু শুধু মেরেছিলে।

 

লেখক পরিচিতি :

হাবিবুল্লাহ রাসেল
সহকারী অধ্যাপক,
ফজিলা রহমান মহিলা কলেজ,
কৌরিখাড়া, স্বরূপকাঠি, পিরোজপুর।
ফোন: ০১৭৬১৭৪৫৯৭১

Read Previous

অনুপ্রাণন প্রকাশন রাজশাহী বিক্রয় ও বিপণন শাখা উদ্বোধন

Read Next

রক্তকরবী : মুক্ত প্রাণের অপরাজেয় গান

৪ Comments

  • চমৎকার রূপক । সবগুলো তাৎপর্যপূর্ণ। লেখকের জন্য শুভকামনা।

    • অনেক ধন্যবাদ। আপনার মঙ্গল হোক।

  • গল্পগুলো খুবই সুন্দর হয়েছে। রাক্ষস কিংবা স্বপ্ন খামার তো অনবদ্য। আরও লেখো। তোমার লেখা পড়ে প্রাণিত হই। খুব ভাল থেকো।
    অরুণ দা

    • শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, দাদা। বৌদিকে শুভেচ্ছা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *