অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২১, ২০২৬
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোমিন মেহেদী-র গুচ্ছ কবিতা

মোমিন মেহেদী-র গুচ্ছ কবিতা

গালিচা

স্বামীহীন নারী আর রোদহীন দিন সমান হলেও নারী বেছে নেয় স্বামীহীন দিন।
কেননা, এখানে অসংখ্য পুরুষের মুখ থাকে। থাকে অসংখ্য সুখের আনাগোনা।
থাকে রোদহীন নরম গালিচায় বিছানো আদর। থাকে মখমলের মতো মায়াময়
ঘুম। থাকে ধমকহীন সাময়িক সুখের পায়রা। থাকে কাঠিন্যময় পৌরুষ।
থাকে শব্দকর আর বাজিকর। থাকে সুঠাম বুকের নিচে কোমলতার যাচ্ছেতাই
বর্তমান। থাকে নির্মমতার রেশ। থাকে আরো অনেক কিছুই। যা কবিতায় বড়োই বেমানান।
হয়তো একারণেই আমাদের দেশশাসকগণ ইদানীং হচ্ছেন স্বামীহীন। হয়েছেন পরকীয়
পথের পথিক। এভাবেই সুখি হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন কেউ কেউ।
কিন্তু সুখ; সে কেবল অনন্ত পথের পথিক হয়েই আসে। ক্ষণিকের নয়।
আজন্মকালের রোদহীন নারী বোধহীন বর্তমানে হেঁটে হেঁটে আর কতকাল ঠকাবে নিজেকে?
প্রশ্ন করে গভীরতর রাতে নিজেকে নিজেই। তবুও মোহ পথ আগলে দাঁড়ায়।
নারী এগিয়ে যায় তার চিরচারিত প্রচলিত পথ ধরে ধরে। হওয়ার মতো করে। অথবা সীতা
অথবা কালি অথবা অন্য কোনো ধর্মীয় অবতার বউ সেজে সেজে…

অন্ধকার-বিষ আর বেদনা

সুঠাম দেহের ভাজে লুকাতে চায় মুখ। ঘুমাতে চায় কোমল কোনো বেদিতে।
পেতে চায় অবারিত পৌরুষ। সুখের ভাজে ভাজে থেকে যেতে চায় অনন্তকাল।
আর তাই তীরে ভেড়া নাও ডুবিয়ে চলে যায় ছিন্ন করে মায়া। মায়ার কোনো দাম নেই
বিচিত্র মনের বাজারে। এখানে কেবল তার-ই আছে দাম, যার আছে প্রশস্থ প্রাচুর্য
আছে রসালো আখের মতো দেহ আর কামনার অন্ধকার।

অন্ধকারে নিবেদিত হতে হতে হয়ে যায় অদৃশ্য কোনো বেদনা।
তবু যেন আর কিছুই বোঝে না।
বোঝে কেবল বিষাক্ত বিশ্রাম।

মেঘের রঙে রঙিন এই নারী পৃথিবী জুড়েই কেবল বিবাদ নির্মানে ব্যস্ত।
সেখানে সহজতর সুন্দরও নির্মাণ করতে পারে তারা। তাদের পরিযায়ী সুন্দর পৃথিবী চাইলেও অধিকাংশ নারীই ঢালে অন্ধকার-বিষ আর বেদনা…

রোদঘর

পাখি ডানা মেলে। আমি মেলি মন। মনের চেয়ে বড়ো আর দ্রুততর ডানা
জানা নেই কোনো পাখির ছিল কি-না। মনের ডানায় ভর করে রোজ উড়ে যাই সেখানে
যেখানে রোদ খুব দেরি করে আসে। বিষণ্ন বিকেলে তাকে দেখে যেমন পুলকিত হয়েছিল মন; মনের ঘরে জমেছিলো রসালো আদর।

আজ আরো পুলক জাগলো মনে। বিরহ কেটে কেটে কাছে যাই। আরো কাছে ক্যানভাসে এঁকে যাই সুখ।
সুখের পশরা সাজানো থাকে থরে থরে রোজ।
আমি নেই খোঁজ সেই স্বপ্নবতির। যার দেখানো স্বপ্ন
আজো যুদ্ধ জয়ের রংধনু।

মেঘ মানে যখন কালো, তখন আলো হিসেবে রোদের পথযাত্রা।
আমি মাঝে মাঝে রোদ। মাঝে মাঝে আলোকিত প্রেম। মাঝে মাঝে মন।
মাঝে মাঝে স্বপ্ন। মাঝে মাঝে মৃদঙ্গ অঙ্গনা নৃত্য। মাঝে মাঝে ময়না পাখির ঠোঁট। বলে যাই নির্ভয়ে অসংখ্য কথা।
কথাগুলো ভালোবাসার আলোআশার এবং অফুরন্ত পথের…

পথ

রেললাইনের মতো করে কষ্ট হজম করছি প্রতিনিয়ত। উপর দিয়ে বয়ে যায় রেলগাড়ির চেয়েও বড়ো বড়ো দানব।
তবুও নির্বিকার; কাটাই কোকিল দিন। কুহু কুহু করে উঠি নিজের অজান্তেই। মানুষ মনে করে অনেক কিছুই…
‘কোকিলা কালো বলে গান শোনে না কেউ’ গান ধরে অনেকে। আমি শুধু সহ্য করে যাই পাষণ্ড পথ হয়ে।
একদিন এভাইে মিশে যেতে যেতে বিলিন হয়ে যাবো হয়তো ইতিহাসে। কিন্তু দীর্ঘশ্বাস বয়ে যাবে নদীর মতো।
নদী হতে হতে হয়ে যায় যারা শুকনো মরুভূমি, তাদেরই একজন হয়তো আমি হয়ে উঠছি। আমার বেদনারাও
বিষণ্নমুখে দাঁড়িয়ে থাকে কাকরাইলের মোড়ে সন্ধ্যার আড়ালে ঘুপটি মেরে থাকা মুখগুলোর মতো। অবসর মানেই
চাকার নিরন্তর ছুটে চলা। আমি সেই সাহসচাকার নিচে মাথা ডুবিয়ে বসে থাকা পথ…

ত্রিভূজফুল

গোলাপ কিংবা গাঁদা নয়; এবার আমি তুলনা দেবো বইঠা দিয়ে,
যে ফুলের কাছে যেতে হয় সে ফুলের।
ত্রিভুজফুল। কেউ ঘ্রাণ নিলে মনের ঘরে সে ঘ্রাণ শত বছরের জন্য থেকে যায়। এই ফুলের মতো তুমি।
তোমার মন। তোমার চলা। তোমার বলা।
তোমার সাহসটাও আজ বড়ো ত্রিভূজ হয়ে উঠেছে।
মাঝে মাঝে ফুলেরাও সাহসী হয়ে ওঠে। যার প্রমাণ এঁকেছো তুমি।
প্রমাণ দিতে দিতে ইউসুফের জন্য বা চণ্ডিদাসের জন্য তোমার যে অপেক্ষা
তা আমার হাতে তুলে দিলে। আহারে আমার ত্রিভূজফুল তোমায় পেয়েও পুরুষ অন্যদিকে ধাবিত হয়!
যদি হয়, নদী বইয়ে দিও রাতের আঁধারে আদরের…

শিশিরের সাথে সাথে স্বপ্নরাও ভিড় জমায়

গুলবাগ সন্ধ্যায় সে আমার চুলের মুঠি ধরে বলেছিল কখনো ছেড়ে গেলে
তোর কপালে নয় চুলে আগুন দেবো। আজ সে আমার পাশে নেই আমি
কার চুলে আগুন দেবো? প্রশ্নের পর প্রশ্ন বুনে বুনে বিরহি ঠোঁট
আমার ক্লান্ত এখন। শিশিরের সাথে সাথে স্বপ্নরাও ভিড় জমায়
রাতের বুকে। আমি চেয়ে থাকি। কখনো আঁধারের বুক চিরে
আলোর নেশায়, কখনো দূরত্ব ভেদ করে কাছে যাওয়ার আশায়…
তবু কে যেন আমার আশার গুড়ে বালি দেয়।
আমি তিক্ত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে করে কঠিন থেকে তরল হয়ে উঠি।
পদার্থ তিন প্রকার; পড়তে পড়তেও যেন আর মনে থাকে না এখন।
খেয়ে ফেলে খোক্কসের দল আমার স্মৃতির প্রতিটি হার-মাংস-মজ্জা।
প্রথম থেকে প্রমথ অথবা প্রমথ থেকে প্রথমে ফিরে যাই নকশিকাঁথার লোভে।
এই নকশিকাঁথাটাই আমার কাছে অবশিষ্ট ছিল…

খোলা দরোজায় আগন্তুক কষ্ট

দরোজা খুলে রেখেছি তার জন্য; যার ভালোবাসার রোদ পোহাতে পোহাতে কেটেছে
আমার কাকহীন ভোর। দাঁড়কাক এখন আর আসে না ফিরে এই যান্ত্রিক শহরে। কাকের চেয়ে কবিরাই আজ বেশি অভুক্ত থাকে।
কাকের ঘর আছে, স্ত্রী আছে, আছে সন্তানও; হোক না সন্তান নিজের বা কোকিলের। কিন্তু কবির কিছুই নেই কেবল ক’খানা
হাড্ডি জিরজিরে কবিতা ব্যতীত। অসহায় এই কবিদের সারিতে নয়; আমি আমাকে রোজ আবিস্কার করি সালভাদর দালীর মতো অনন্ত সম্ভাবনার রোদের ক্যানভাসে। পাঁজরের একটা হাড় দিয়ে গড়া সেই সুবোধ বালিকার হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে আজো যখন পুলকিত হই, ঘুম ভেঙে যায়। জেগে উঠি অন্ধকার ঠেলে ঠেলে। দেখি খোলা দরোজায় আগন্তুক কষ্ট। কষ্ট টইটই পইপই করে রাতদিন শুধু হেঁটেই চলে।  আর আমি হই রোদের রংধনু-কষ্টের কারাগার থেকে সদ্য পালানো পুরুষ। কাকের মতো না হোক, কবির মতো না হোক, মোল্লা-মৌলভীর মতো না হোক, পুরোহিত ঠাকুরের মতো না হোক মানুষের মতো বেঁচে থাকার রপ্ত করা ইচ্ছেটা এগিয়ে যাবে আগামীর দিকে…

কবি পরিচিতি

মোমিন মেহেদী

রাজপথে-পত্রিকার পাতায় আর সমাজসেবায় জনতার সাথে সবসময় এগিয়ে চলছেন মোমিন মেহেদী। তিনি বিশ্বাস করেন—‘ক্ষমতায় থেকে কবি হওয়া যায় না, কিন্তু কবি ক্ষমতায় যেতে পারে সততার হাত ধরে…’ । আর একারণেই পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে কেউ কেউ। নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার চেতনায় একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম নির্মাণের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৮৫ সালের ২৮ আগস্ট ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে। ২০০৫ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার আন্দোলন জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা মোমিন মেহেদীর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে। বর্তমানে তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৬৭। উপন্যাস—ডিভোর্স (২০০৫), তেরো বণিতা (২০১৩); কাব্যগ্রন্থ—শকুনেরা উড়ছে (২০০৬), দেয়ালে টাঙানো রোদ (২০১১), জীবনজুড়ে যুদ্ধ (২০০৭), সাহসের জোৎস্নায় শান্তজ সুখ (২০১০), যে শহরে তুমি নেই (২০১০), ভুল করেছি ভালোর আশায় (২০০৯), এই চাকাটা ভালোবাসার (২০০৯), রাজপথে রাত নেমেছে (২০০৯), বৃত্ত ত্রিভুজ এবং ভালোবাসা (২০১২), পক্ষী তুমি আর কতকাল থাকবে দূরে… (২০১৩); ছড়াগ্রন্থ—কাকতাড়ুয়ার দেশে (২০০৭), ছন্দ ছড়ায় বঙ্গবন্ধু (২০০৯), আমাদের পিতা তিনি আমাদের মিতাও (২০১০), হিং টিং টিংকি, কালো বিড়াল (২০১৩); শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ+ভূত—ভয় (২০১২), কাগজের ভূত (২০১২), ফার্স্ট গার্ল (২০১৩), ফেসবুক ভূত (২০১৩); ছোটোগল্প—বহুনদীর চোখ; প্রবন্ধগ্রন্থ—সময়কথন (২০১২), সংবাদ-এর ক্লাস (২০১৭), গুলিবিদ্ধ দেয়ালে গণতন্ত্র (২০২৫), সাংবাদিকতা (২০২৬) উল্লেখযোগ্য। সাহসের পথে নির্ভিক পথিক মোমিন মেহেদীর মূল লক্ষ্য সাংবাদিকতা, লেখালেখি, গান, গল্প, নাটকের সাথে সাথে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে স্বাধীনতার সুখকে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্মাননা (২০০১), মেহেন্দীগঞ্জ ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক (২০০২), অর্নিবান সম্মাননা (২০০৩), বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র সম্মাননা পুরস্কার (২০০৪), বাঁধনহারা সম্মাননা (২০০৬), কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্মাননা (২০০৭), বঙ্গবন্ধু সম্মাননা (২০০৮), চন্দ্রিমা সাহিত্য সম্মাননা (২০০৯), আনন্দ আড্ডা সাহিত্য পুরস্কার, ভারত (২০০৯), কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ সম্মাননা (২০১০), নক্ষত্র সাহিত্য পদক (২০১০), পুণ্ড্রবর্ধন সম্মাননা ও কবি আলাওল সম্মাননা (২০১১), শেরে বাংলা সম্মাননা (২০১২), কবি সুফিয়া কামাল স্বর্ণপদক ( ২০১২) এবং বঙ্গবীর ওসমানী স্বর্ণ পুরস্কার (২০২৫) বর্তমানে নতুনধারার রাজনীতির পাশাপাশি দৈনিক পূর্বাভাস-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

Read Previous

শঙ্খশুভ্র পাত্র-র গুচ্ছ কবিতা

Read Next

দ্বীপ সরকার-এর গুচ্ছ কবিতা

One Comment

  • লেখা এবং কবি পরিচিতি সবই ভালোলাগলো কবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *