অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মাহবুবুল আলম পলাশ -
বন্ধু আমার

১.
কলকাতা নিউ মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে জনস্রোতের দিকে তাকিয়ে আছি। একবার যেনো মনে হলো কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে কেইবা আছে আমার পরিচিত যে ডাকতে পারে। ভুল শুনেছি ভেবে আবার নজর ফেরালাম মানুষের অবিরত চলার দিকে। আমি পরশুদিন এসেছি ‘বৈকুণ্ঠ সাহিত্য ক্লাব’ নামে একটি সংগঠনের আমন্ত্রণে। ওরাই আমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে পার্ক স্ট্রিটের একটি আশ্রমে। রাতটা ওখানে ঘুমানো বাদে কাল থেকে সারাক্ষণ শুধু ঘুরছি পথে পথে। জীবনে প্রথমবারের মতো ভিন দেশে এসে যা দেখছি তাই ভালো লাগছে।

আজ সকালে গিয়েছিলাম বাসে করে হাওড়া ব্রীজ পার হয়ে দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে। দুপুর পর্যন্ত ওখানে কাটিয়ে লঞ্চে নদী পার হয়ে বিড়লা মন্দির দেখে ফিরে এসেছি। এখন এখানে দাঁড়িয়ে রকমারি পসরার সাথে দেখছি হাজারো অচেনা মানুষের মুখ। সবচেয়ে ভালো লাগছে এই দেশের তরুণী মেয়েদের, এরা পোশাক-আশাকে কী ভীষণ আধুনিক দেখলে একেবারে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এতোদিন মফস্বল শহরের চাকচিক্যহীন মেয়েদের দেখে চোখ একেবারে পচে গেছে। এইসব তরুণীদের দিকে তাকিয়ে নিজের ফুরিয়ে যাওয়া তারুণ্য যেন আবার নতুন করে অনুভব করছি।

অপূর্ব এক সুন্দরীর লোভনীয় বুকের দিকে নজর রেখে শেষ টান দেয়া সিগারেট ছুঁড়ে ফেলতেই হঠাৎ কেউ আমার ঘাড়ে হাত রাখলো। বিরক্ত হয়ে ঘুরে তাকাতেই চোখ পড়লো একটি হাসিমুখের উপর। লোকটি আমার বয়সীই হবে, দেখে কেমন চেনা চেনা লাগছে কিন্তু ঠিকমতো চিনে উঠতে পারছি না। আমার মাঝেমধ্যেই এরকম হয় অনেককে চিনতে পারি না বেমালুম ভুলে বসে থাকি। মনের মধ্যে ক্রমেই একটা দ্বিধা আচ্ছন্ন করে ফেলতে লাগলো, কে হতে পারে? আমার এসব দ্বিধা থোড়াই কেয়ার করে লোকটি এবার ঘাড় ছেড়ে আমার একটা হাত বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে ধরলো। একরাশ খুশির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলো,

-পলাশ তুই এখানে কি করছিস?
-জ্বালা, আমি এখানে দাঁড়িয়ে সুন্দরীদের দেখছি, তোর বাপের কি? মনে মনে বললাম। তবে কণ্ঠ শুনেই আমি এতক্ষণে গায়ে পড়া মানুষটাকে চিনতে পেরেছি। অনেকদিন দেখা না থাকলেও মুখ থেকে নির্গত প্রথম শব্দই খুলে দিয়েছে স্মৃতির সমস্ত দুয়ার।
-ভালো আছিস নিখিল? মৃদু হেসে বললাম। এখানে এভাবে হঠাৎ তোর সাথে দেখা হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি।
-আমিও পারিনি, তোকে হঠাৎ দেখে প্রথমে একেবারে অবাক হয়ে গেছিলাম। তবে দেখা যখন হয়েছে দুইজন মিলে আগের মতো আবার কিছু উড়াধুড়া মজা করা যাবে।

যাবে কি? আমি দ্বিধান্বিত। প্রায় বিশ বছর দেখা নাই, কোন প্রকার যোগাযোগ নাই, হঠাৎ দেখা হলেই কি আগের মতো মজা করা যায়? তারপর যেটুকু শুনেছি কিংবা এখন পোশাক-আশাক দেখে বুঝতে পারছি, ও এখন অনেক টাকা-পয়সার মালিক। এদিকে আমি নেহায়েত ছাপোষা স্কুলমাস্টার, আর্থিক অনটন যার নিত্যসঙ্গী। ইচ্ছে করলেই কী নিজের অবস্থান উপেক্ষা করে আগের মতো গলাগলি করে বেড়াতে পারি?
-কিরে কথা বলছিস না কেনো? আমাকে চুপ দেখে ও বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলো।
-তোর দেখি বয়সই বাড়েনি, অবশেষে আমার মুখে কথা ফুটলো। চুল সব কালো আছে অথচ আমার প্রায় সবই সাদা হয়ে গেছে। এই বয়সেও এতো তরতাজা আছিস কি করে?
-আরে এগুলো সব উপরের ভং, ভিতরে সদরঘাট হয়ে বসে আছে। কলপ দিয়ে কালো করে রেখেছি, চুল আমারও কম পাকেনি।
-যাই বলিস, তোকে অনেক কমবয়সী মনে হচ্ছে আমার চেয়ে। ইচ্ছে করলে এখনো দু-চারটে মেয়ে পটাতে পারিস।

আমার কথা শুনে নিখিল উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলো, আমিও যোগ দিলাম হাসিতে। এতক্ষণে মনের মধ্যে আবার ফুর্তির ভাব ফিরে আসা শুরু করেছে। একা একা ঘোরার চেয়ে একজন সঙ্গী পেলে আসলেই মন্দ হয় না। নিখিল হঠাৎ আমার হাতে টান দিয়ে বললো,
-একেবারে গলা শুকিয়ে গেছে, চল কফি খেয়ে গলা ভিজিয়ে নেই।

ওর পিছে হাঁটতে হাঁটতে আমার বুকের ভিতর ছ্যাৎ করে উঠলো। মাত্র তিন হাজার টাকা নিয়ে আমি এসেছি, ভাঙানোর পর চব্বিশশো টাকার মতো হয়েছে। এর মধ্যে ছয়শো টাকা প্রায় শেষ, সবচেয়ে বড়ো খরচ করেছি দুইশো বিশ টাকা দিয়ে এক বোতল কম দামি হুইস্কি কিনতে। কফি খাওয়ার বিলাসিতা আমি কিভাবে করি? রাস্তার ধারে ভাঁড়ে চা খাওয়াই আমার কাছে বেশি হয়ে যাচ্ছে।

এইসব ভাবনার মধ্যেই একটা ছিমছাম কফিশপের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। বাইরের হই-হট্টগোল থেকে হঠাৎ করে এমন শান্ত পরিবেশে ঢুকে একেবারে হকচকিয়ে গেলাম। টেবিলের দুপাশে চেয়ার টেনে বসতেই ওয়েটার এগিয়ে আসলো। নিখিল কফির সাথে দুটো চিকেন বার্গার অর্ডার করে আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বললো,

-হঠাৎ এভাবে তোর সাথে দেখা হয়ে খুব ভালো হয়েছে, একা একা মোটেই ভালো লাগছিল না।
-একা না এসে ভাবিকে সঙ্গে আনলেও পারতি, তাহলে আর এমন একা লাগতো না।
-আরে বাবা এসেছি ফুর্তি করতে, বউ ঘাড়ে তুলে আনবো এত বোকা আমি নই। দুই-চারদিন ইচ্ছামতো মজা করে ফিরে যাবো, এর মধ্যে বউ নিয়ে টান-পাড়াপাড়ি কি পোষায়?
-কবে এসেছিস?
-গতকাল। দিনেরবেলা মধু খেয়ে আর রাতে বারে বসে হুইস্কির গ্লাস হাতে সময় কাটিয়েছি। আসলে একা এসে বোকামিই করে ফেলেছি, এখন তোকে পেয়ে সব উসুল করা যাবে।
-মধু? মধু খেলি এখানে এসে, দেশে মধু নাই?
-এই দেশে মধুর স্বাদ বেশি। কাল তোকে খাওয়াবো, দেখিস কেমন স্বাদ! ফিচেল হাসিতে চোখ নাচিয়ে বললো নিখিল।
ওয়েটার দুইজনের সামনে বার্গার রেখে যেতে সুগন্ধে আমার পেটের মধ্যে পাক দিয়ে উঠলো। দুপুর বেলায় কখন লুচি আর আলুর দম খেয়েছিলাম, মনে হচ্ছে অনেক আগেই হজম হয়ে গেছে। নিজের ক্ষুধার্ত ভাব যাতে বোঝা না যায় সে ব্যাপারে সচেষ্ট থেকে খুব ভদ্রভাবে বার্গার তুলে কামড় দিলাম। খাওয়া শেষ হতেই কফিতে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম, এতক্ষণে নিজেকে বেশ তরতাজা লাগছে।
-তুই কি শুধু ঘুরতেই এসেছিস নাকি কোনো কাজ আছে? নিখিল জিজ্ঞেস করলো।
-ঠিক ঘুরতে নয় একটু কাজ আছে।
-তোর কাজের খ্যাতা পুড়ি। একবার যখন পেয়েছি কোনোভাবেই তোকে ছাড়ছি না। ননস্টপ ফুর্তি চলবে, সব কাজ আপাততো মুলতবি রাখ।

ওর কথা শুনে হেসেই ফেললাম। যে কাজে এসেছি সেটা কি বাদ দেওয়া যায়। হাজার হোক ভিনদেশে যারা সম্মান দিয়ে ডেকে এনেছে তাদেরকে অগ্রাহ্য করার কথা চিন্তাও করতে পারি না। তবে অন্যসময়, যেমন এখন, বেপরোয়া আড্ডাবাজিতে আমার কোনো আপত্তি নাই। কাজেই ওর সাথে তাল মেলাতে এমন কোনো অসুবিধা হয়তো হবে না। অবশ্য পকেটের দৈন্যদশা মাথায় রেখে যতোটুকু করা যায় আরকি! কাজের সময় সটকে পড়লেই হবে, ভেবে নিখিলের সাথে ভেসে পড়তে প্রস্তুত হয়ে গেলাম।

২.
বাইরে বের হয়েই নিখিল ঘোষণা করলো,
-তোকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে, যেখানে আছিস সেখান থেকে ব্যাগপত্র সব নিয়ে আসবি।
-তা কেমন করে হয়? আমি মিনমিন করে প্রতিবাদ জানালাম।
-অতশত বুঝি না এখন থেকে পুরা সময় দুইজনে একসাথে থাকবো, তাই তোর অন্য জায়গায় থাকা চলবে না।
আমি একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, কি বলবো, একেবারেই বুঝতে পারছি না। না জানি যে হোটেলে ও আছে সেখানকার ভাড়া কতো? অতো ভাড়া দিয়ে থাকার ক্ষমতা যে আমার নেই সেকথা ওকে কিভাবে যে বলি! ফ্রী থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে বলেই আমি কোনোভাবে টিকে আছি।
-কিরে মহাচিন্তায় পড়ে গেলি মনে হয়? নিখিল বিদ্রূপের স্বরে বললো। কোন সুন্দরীর বিছানায় তোর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে যে আসতে বলায় এতো চিন্তিত হয়ে পড়লি?
-না মানে, আসলে…
-এতো মানে মানে করতে হবে না, চল, এখন বারে যাই। দুই-চার পেগ পেটে পড়লে সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে।

পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেট বের করে একটা আমাকে দিয়ে নিজের ঠোঁটে আরেকটা ঝুলিয়ে ম্যাচ বের করে ও দুটিতেই আগুন জ্বালিয়ে দিলো। সিগারেটে বড়ো একটা টান দিয়ে বিষয়টি আপাততো মনের কোণে চাপা দিয়ে রাখলাম। পরে সময় করে ওকে বুঝিয়ে বললেই হবে হোটেল ভাড়া দিয়ে থাকার ক্ষমতা আমার নেই। সিগারেট টানতে টানতে ভিড়ের মধ্যে হেঁটে চলা সুন্দরীদের দিকে নজর রেখে চললাম। হঠাৎ একটি মেয়ের দিকে চোখ পড়তেই আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। খুব টাইট একটা টি-শার্ট পরেছে, গায়ে দ্বিতীয় চামড়ার মতো লেগে আছে। বিশাল সাইজের বুক এতো লোভনীয় যে চোখ ফেরাতে রীতিমতো কষ্ট হলো।
নিখিল হাত দিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

-গুরু চল, তোকে সুন্দরীদের মেলা থেকে ঘুরায়ে আনি, গ্লাসে চুমুক দিবি আর যতো খুশি দেখবি।
-কোথায় যাবি? বেশ উৎফুল্ল স্বরে জানতে চাইলাম।
-দেখতেই পাবি কোথায় যাচ্ছি? চিন্তা করিস না সব আমার চেনা আছে, যাবতীয় ফুর্তির খবর আমার নখদর্পণে।
ও হাঁটতে শুরু করতে অগত্যা পিছু পিছু আমাকেও হাঁটতে হলো। কিছুদূর মানুষের ভিড় ঠেলে হাঁটার পর একটা বারের সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে ঢোকার উপক্রম করতেই আমি ওকে আটকালাম।
-আসলে হয়েছে কি, এইসব বারে তো মনে হয় অনেক খরচ আমার পক্ষে ঠিক…
আমাকে কথা শেষ না করতে দিয়ে ধমকে উঠলো নিখিল,
-তুই আমাকে এত ছোটোলোক ভাবতে পারলি? আমি কি তোকে বলেছি খরচ দিতে হবে? খবরদার আর এ ধরনের কথা বলবি না। এখন সব তালবাহানা বাদ দিয়ে আমার সঙ্গে আয় না হলে কলেজের মতো এক ঘুসি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দিবো।

ওর কথায় ধাম করে পুরনো স্মৃতি মাথার মধ্যে সিনেমার মতো ঝিলিক দিয়ে উঠলো। সুতপা নামের এক মেয়ের জন্য নিখিল আমাকে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল। কিছুই না আমি শুধু বলেছিলাম সুতপা একটা মাল, দেখলেই শরীর চিড়বিড় করে। তবে আমার উপর বীরের মতো হামলা করলেও সুতপার সামনে দাঁড়িয়ে ও কোনোভাবেই বলতে পারেনি কিছু। ফলাফল স্বরূপ কিছুদিনের মধ্যেই আমরা দেখতে পেলাম কলেজের টপ মাস্তানের সাথে সুতপার বেজায় মাখামাখি। শেষ পর্যন্ত নিখিলের কপালেও না জোটায় তখন বেশ মজাই পেয়েছিলাম।

ঘুষির অপরাধ ক্ষমা করে দিলেও সুযোগমতো টিপ্পনি কাটতে কখনও ছাড়িনি,

-দেখ নিখিল তোর সুতপা যায়, টিপুনি খেয়ে বুক দুটি কেমন ভারী হয়ে উঠেছে দেখেছিস। আমার কথা শুনে ও কেমন ফ্যালফ্যাল করে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতো।

বারের মধ্যে ঢুকে পড়তেই মুহূর্তে সব ঘোর কেটে গেলো। বেদম মিউজিকে সচকিত হয়ে সামনে তাকাতেই অবাক হয়ে দেখলাম আশ্চর্য দৃশ্য। মঞ্চের উপর একসাথে দশ-বারজন মেয়ে মিউজিকের তালে নাচছে, শরীর উপচে পড়ছে যৌবন সবার। একসঙ্গে এতগুলো সুন্দরীর লোভনীয় শরীরের দুলুনি দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। ডান্স ফ্লোরের সরাসরি সামনে একটি টেবিলে দুটি চেয়ার টেনে বসতেই ওয়েটার এগিয়ে আসলো অর্ডার নেওয়ার জন্য। নিখিল কি অর্ডার করছে করুক আমার দেখার সময় নেই। আমি নিবিষ্ট মনে সুন্দরীদের বুকের দুলুনি আর নাভির সৌন্দর্যে মগ্ন হয়ে রইলাম।

টাকাওয়ালাদের জন্য পৃথিবী কতোই না সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে রেখেছে, যেখানে আমার মতো দরিদ্রদের জন্য প্রবেশাধিকার খুবই সীমিত। আজ নিখিলের সাথে দেখা না হলে আমি এমন জায়গায় আসার কথা চিন্তাও করতে পারতাম না। আহা! শুধু দেখেও শান্তি!

-কিরে কেমন লাগছে? নিখিল আমার উরুতে চাপড় দিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
-মনে হচ্ছে স্বর্গে এসে ঢুকেছি! এতোসব অপ্সরাদের নাচ দেখে স্বর্গ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না।
-এর চেয়ে উন্নত মানের স্বর্গও আছে এখানে, কাল তোকে দেখাবো। ওটা দেখলে এটা অনেক পানশে মনে হবে তখন।
-সেটা আবার কোথায়?
-ধীরে বৎস, এতো অস্থির হলে চলবে? ঠিক সময়মতো নিয়ে যাবো, সব স্বর্গ থেকেই একটু করে রস খাইয়ে দেবো তোকে।
-আপাতত এই রস যতটুকু পারি খেয়ে নেই তারপরে অন্য কিছু চিন্তা করা যাবে।

এতক্ষণ কথা বলার ফাঁকে আমার নজর একবারও ডান্সফ্লোর থেকে সরেনি। বুভুক্ষের মতো গিলে চলেছি নারী শরীরের লোভনীয় সৌন্দর্য। হঠাৎ করে গান শেষ হয়ে যেতে চারপাশ থেকে মানুষের মাতাল কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। সুন্দরীরা নাচ থামিয়ে মঞ্চের পেছনে রাখা টুলে বসে পড়ল ক্ষণিক বিশ্রামের জন্য। এতক্ষণে পাশ ফিরে নিখিলের দিকে তাকালাম। আমি তাকাতেই ও ফিক করে হেসে ফেললো, আমিও পাল্টা হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেললাম। ওয়েটার এসে আমাদের টেবিলে গ্লাস, বোতল, বরফ, পিরিচ ভর্তি চানাচুর রেখে দিতে দুইজন গ্লাস তুলে চুমুক দিলাম। ছোট্ট চুমুকে সামান্য হুইস্কি মুখের মধ্যে নিয়ে খানিকক্ষণ আটকে রেখে গিলে ফেললাম। উফ! কি দারুণ স্বাদ!

আমি যে হুইস্কি কিনেছিলাম ওটা গিলতে রীতিমতো কষ্ট হয়। অথচ এটা মুখের মধ্যে নিয়ে মনে হচ্ছে না গিলে আটকে রাখি। শালার টাকাওয়ালাদের জন্যই পৃথিবীর সব সেরা জিনিস বরাদ্দ কেনো থাকতে হবে? আমার মতো দরিদ্ররা শখ করে গিললেও গিলতে হয় যতসব বস্তাপচা মাল!

নতুন করে মিউজিক শুরু হতেই সুন্দরীরা আবার শুরু করেছে নাচের তালে লোভনীয় শরীরের দুলুনি। গ্লাসে চুমুক দেওয়ার পর আগে যাদের একটু কম সুন্দরী মনে হচ্ছিল এখন তাদেরকেওে অপরূপা মনে হচ্ছে। গ্লাস শেষ হতে হতে সারা শরীরে আনন্দময় ঝিমুনি আচ্ছন্ন করে ফেললো। নিখিলের বাড়িয়ে দেওয়া সিগারেটের ধোঁয়া বুক ভরে টেনে নিয়ে ক্রমেই আরো সুন্দরী হয়ে ওঠে রমণীদের হাঁ করে গিলতে থাকলাম। নিখিল আবার ভরে দিতে গ্লাস তুলে নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম। যতো গিলছি ততোই আরও বেশি সুন্দরী হয়ে উঠছে মেয়েরা। মিউজিকের তালে যেনো নিজের শরীরও দুলতে শুরু করেছে। চারদিক থেকে মাঝেমধ্যেই চাপা হাসির শব্দ ভেসে আসছে। কে জানে স্বর্গ বোধ হয় এমনই হয়!
কতোক্ষণ মদ আর নারীতে মগ্ন হয়েছিলাম জানি না, হঠাৎ নিখিলের ডাকে চেষ্টা করলাম সম্বিত ফেরানোর। তবে শরীরের নিয়ন্ত্রণ আর পুরোপুরি নিজের উপর নেই তাই অকারণেই হাসতে শুরু করলাম। নিখিল আমার হাত ধরে চেয়ার থেকে টেনে তুলে বাইরে বের করে আনল।

ইরের গরম বাতাসের হলকা গায়ে লাগতেই নিজের মধ্যে খানিকটা ফিরে আসতে পারলাম।

৩.
-তুই কোথায় উঠেছিস চল ওখান থেকে তোর জিনিসপত্র নিয়ে আসি, বাইরে বের হয়ে নিখিল তাড়া দিলো।
আমি কোনো জবাব না দিয়ে ইশারায় সিগারেট চাইতে ও একটা বাড়িয়ে দিলো। সিগারেট জ্বালানো হতে বুক ভরে ধোয়া টেনে ওর দিকে তাকালাম। প্রস্তাবের কোনো জবাব না দিয়ে রাস্তার মোড়ে একটি চায়ের দোকান দেখিয়ে ওকে বললাম,
-আগে চল চা খাই।

দুইজন হেঁটে মোড়ের দোকান থেকে মাটির ভাঁড়ে চা নিয়ে চুমুক দিলাম। চায়ে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে চিন্তা করার চেষ্টা করছি কিভাবে নিখিলের প্রস্তাব না করে দেওয়া যায়। মাথায় কোনো বুদ্ধি আসছে না। এতক্ষণ ওর পয়সায় ফুর্তি করার পর না বলা খুব সহজ কাজ নয়। চা শেষ হতে নিখিল আমার হাত টান দিয়ে বললো,

-এখন চল আর দেরি করা যাবে না।
-কোথায় যাবো? আমি যেন দিশেহারা হয়ে বললাম।
-তুই যেখানে আছিস, তোর জিনিসপত্র যা আছে নিয়ে আসতে হবে। আজ থেকে তুই আমার সাথে থাকবি।
-আমি কি বলবো ভেবে না পেয়ে চুপ করে থাকলাম।
-উঠেছিস কোথায়? নিখিল আবার জিজ্ঞেস করলো।
-পার্কস্ট্রিটে একটা আশ্রম আছে ওখানে উঠেছি।
-এই শালা আশ্রমে কেন? সাধু বাবা হয়ে গেছিস নাকি?
-না মানে, যারা আমার এখানে আসার ব্যবস্থা করেছে ওরাই ওখানে থাকার আয়োজন করেছে।
-ভালো কথা, এখন আমি তোর থাকার আয়োজন করছি আগের আয়োজন বাতিল।
এতক্ষণে খানিকটা গাইগুই করে বলে ফেললাম,
-আমি দরিদ্র মানুষ হোটেল ভাড়া দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।
-তুই বারবার একই কথা বলে আমাকে বিরক্ত করছিস, নিখিল চরম ক্ষিপ্ত হয়ে বললো।
-আমি কি তোকে টাকার কথা বলেছি? তুই থাকবি আমার সঙ্গে, এখানে টাকার প্রশ্ন আসছে কোথায়?
-কিন্তু….
-কিসের কিন্তু? আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নিখিল রাগী কন্ঠে বললো।
-মনে হচ্ছে তুই আমার আনন্দ মাটি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিস। আমি যে রুমে আছি তুই সেখানেই থাকতে পারবি তোকে আলাদা রুম নিতে হবে না। কাজেই টাকা-পয়সার চিন্তা করে অযথা মাথা গরম করিস না। তুই তো আগে এমন ছিলি না, এখন এরকম করছিস কেনো?
-ঠিক আছে! কন্ঠে আমার চিরতার তিক্ত স্বাদ। তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিখিলের সঙ্গে এসে ওঠা আমার আসলেই খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না। খানিকক্ষণ একসঙ্গে সময় কাটানো আর একটানা একসঙ্গে থাকা এক হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত হয়তো একগাদা তিক্ততা এসে ভর করবে মনে তবুও বাধ্য হয়ে রাজি হলাম।

ও একটা সিগারেট এগিয়ে দিতে হাত বাড়িয়ে নিয়ে যেনো প্রবল আক্রোশে ম্যাচের আগুনে জ্বালিয়ে দিলাম ক্ষোভ। বুক ভরে ধোঁয়া টেনে নিতেই নিখিল হাতে টান দিয়ে বললো,

-চল হাটি। দুজন ফুটপাত ধরে সিগারেট টানতে টানতে হেঁটে চললাম।
হঠাৎ দেখি নিখিল গান ধরেছে, তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও। প্রথম লাইন শেষ হওয়ার আগে আমিও কন্ঠ মেলালাম। গান গাইতে গাইতেই মনের মধ্যে সব ক্লেদ যেনো তপ্ত বাতাসে ভেসে গেলো। মনের মধ্যে আবার ফিরে এলো ফুর্তির ভাব, ঠিক আছে দেখাই যাক কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে থামে।

হুইস্কির প্রভাবে পুরা শরীর যেন বাতাসে দুলছে, রাস্তা দিয়ে যেন ভেসে ভেসে সামনে এগিয়ে চললাম। বেশ খানিকক্ষণ হাটার পর পৌঁছে গেলাম আশ্রমের সামনে।

-তুই তোর ব্যাগ নিয়ে আয় আমি এখানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট টানি, নিখিল বললো।
আমি মৃদু হেসে ওকে ওখানে রেখে ভিতরে ঢুকে গেলাম। মিনিট কয়েকের মধ্যে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বাইরে এসে দেখি ও দেয়ালে হেলান দিয়ে আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি গায়ে হাত দিতেই চমকে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
-এখন থেকে আমি তোর দখল নিলাম, দন্ত বিকশিত করে ও ঘোষণার সুরে জানিয়ে দিলো।

দুইজনে হেঁটে হেঁটে ফিরে চললাম আবার উলটো পথে। নিখিল ভরাট কন্ঠে গান ধরলো, আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার। আমিও বেসুরো কন্ঠে কন্ঠ মেলালাম। রাস্তায় হেঁটে চলা পথচারীদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে দুই মধ্যবয়সী বন্ধু হাতে হাত রেখে গেয়ে চললাম আমাদের যৌবনের গান। আমাদের উদ্দাম যৌবন হারিয়ে গেছে বলেই যে আমরা ক্ষণিকের জন্য ফিরিয়ে আনতে পারবো না সেইসব স্মৃতিময় সময় এমন দিব্যি কেউ আমাদের দেয়নি আর দিলেও সেসব পাত্তা দিতে আমাদের বয়েই গেছে।

সারাদিন অনেক হেঁটেছি, নিখিলের সাথে এখনকার হাঁটায় যে আনন্দ পাচ্ছি তা আগে একেবারেই পাইনি। হঠাৎ করে যেন আবার কলেজের সেই উদ্দাম দিনগুলোতে ফিরে গেছি যখন ও ছিল আমার সবচেয়ে সেরা বন্ধু সবসময়ের সাথি। যেন ভুলেই গেছি মাঝখানে প্রায় বিশ বছর দুজনের একবারও দেখা হয়নি। হঠাৎ দেখা হওয়ার পর আমরা ভুলে গেছি বিশ বছরের অনন্ত ব্যবধান। হঠাৎ পথে একটা ওয়াইন স্টোর পড়তে নিখিল আমাকে দাঁড় করিয়ে ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বোতল হাতে বের হয়ে আসলো।

-রাতে তৃষ্ণায় যাতে না মরি সে ব্যবস্থা করে রাখলাম, বোতল উঁচিয়ে হেসে বললো নিখিল।
আমি কিছু না বলে মৃদু হাসিতে প্রত্যুত্তর করলাম। আরেকটু সামনে এগুতেই ওর হোটেলে পৌঁছে গেলাম। রিসেপশনে আমার পাসপোর্ট জমা দিয়ে নিখিলের সাথে চলে আসলাম ওর রুমে। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে আলো জ্বলতেই আমি সত্যি সত্যি অবাক হয়ে গেলাম। এতো বড়ো রুম একজন নিজের জন্য নিতে পারে তা ভাবা আমার জন্য সত্যিই খুব আশ্চর্যজনক ব্যাপার। ঘরে একটি ডাবল বেড ও একটি সিঙ্গেল বেড থাকার পরেও পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। নিখিল এসি চালু করতেই ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে মৃদু স্পর্শ বুলিয়ে যেতে থাকলো।
-তুই সিঙ্গেল খাটে থাকবি, নিখিল বললো। আমি বড়ো বিছানা ছাড়া ঘুমাতে পারি না।
-কোন সমস্যা নেই আমি যেকোনো বিছানাতেই ঘুমাতে পারি।
ব্যাগ নামিয়ে রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার উপক্রম করতেই নিখিল আমাকে বাধা দিলো।
-এখনই শোয়ার তোড়জোড় করছিস যে বড়ো, এদিকে পেট যে একেবারে গড়ের মাঠ হয়ে আছে সেই হিসাব আছে। চল আগে খেয়ে আসি তারপর বিশ্রাম করবি।

বিছানা থেকে যদিও উঠতে ইচ্ছা করছিল না তবুও উঠলাম। অবশ্য ক্ষুধাও লেগেছে অনেক তবে এখন খাওয়ার চেয়ে বিশ্রামই বেশি টানছে। নিখিলের পিছে বাইরে বেরিয়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে হাঁটতে থাকলাম। খাওয়ার জন্য ও যে হোটেলে ঢুকলো সেটা যথেষ্ট দামি, আসার পর থেকে আমি সস্তা হোটেল ছাড়া কোথাও খাবার খাইনি। এমন হোটেলে ঢুকে কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে লাগলো।

এর আগে টাকা পয়সার কথা বলায় ও খুব বিরক্ত হয়েছে তাই এখন আর আমি এ ধরনের কোনো কথা বললাম না। তবে মনের মধ্যে একটা অস্বস্তির কাটা খচখচ করে বিঁধতে লাগলো। অবশ্য টেবিলে খাবার চলে আসতেই সব অস্বস্তি সরিয়ে রেখে খাবারে মনোযোগ দিতে বাধ্য হলাম। খাবার দেখার পরে অনুভব করলাম প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত আমি। তাছাড়া এখানকার রান্না অসম্ভব সুন্দর, মনে হচ্ছে এতো সুস্বাদু খাবার আমি জীবনে খুব বেশি খাইনি।

দুইজনই হাভাতের মতো গলা পর্যন্ত ঠেসে খেলাম। বাইরে বেরিয়ে আগুন গরম চায়ের সাথে সিগারেট টেনে দুজন রুমে ফিরে আসলাম। রুমে ঢুকে কাপড় পালটিয়ে গোসল করে নিতেই সজীব অনুভূতি ফিরে আসলো। নিখিল এর মধ্যেই বোতল আর গ্লাস সাজিয়ে নিয়েছে। বাথরুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে আমার দিকে একটি গ্লাস বাড়িয়ে দিলো। আমি খুশি মনে গ্লাস হাতে নিয়ে লম্বা চুমুক দিলাম।

-তুই কি কাজে এসেছিস? গ্লাসে চুমুক দিয়ে নিখিল জানতে চাইলো।
-একটি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছি।
-বলিস কি তুই কি সাহিত্যিক হয়ে গেছিস নাকি?
কোন জবাব না দিয়ে মৃদু হাসলাম। আমার মতো কবিদের খবর আর কেইবা রাখে। নিখিলের মতো বিত্তশালি ব্যবসায়ীদের কাছে এসব সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
-কবে তোর সাহিত্য সম্মেলন? নিখিল আবার জানতে চাইল।
-আগামীকাল বিকালে।
-কোথায় হবে সেটা?
-গড়িয়াহাটে, বৈকুণ্ঠ সাহিত্য ক্লাব আয়োজন করেছে।
-তুই তো মনে হচ্ছে অনেক বড়ো সাহিত্যিক হয়ে গেছিস, ভিনদেশের মানুষজন যখন তোকে চেনে।
-তেমন কিছু আসলে নয়, তবে খুব সামান্য হলেও কিছু লোক চেনে। আসলে এরা ভিনদেশি অতিথি আমন্ত্রণ করে নিজেদের অনুষ্ঠানের ওজন বাড়াতে চেয়েছে এজন্যই আমার কপালে শিকে ছিঁড়েছে।
-তবে যাই বলিস বিষয়টি এত ছোটো নয় যদিও এসব থেকে আমি অনেক দূরের বাসিন্দা।
-তোকে কিন্তু আমার সঙ্গে যেতে হবে, আমি হঠাৎ করে আবদার করলাম।
-তোকে আমন্ত্রণ করেছে, ওখানে আমি গেলে কেমন হয়? নিখিল বেশ বিব্রত হবে জবাব দিলো।
-অতো কথা শুনতে চাই না তুই আমার সঙ্গে যাচ্ছিস, ব্যাস।
-ঠিক আছে যাবো, নিখিল নিমরাজি হলো। বিকেলটা না হয় তোর বেরস অনুষ্ঠানেই কাটিয়ে আসলাম ।

নিখিলের বিব্রতভাব দেখে আমার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। বোতল থেকে গ্লাস ভরে নিয়ে বড়ো করে চুমুক দিলাম। এক গ্লাস এরপর আরেক গ্লাস হতে হতে কখন ঘুমিয়ে পড়ছি নিজেই জানতে পারলাম না।

৪.
ঘুম ভাঙলো নিখিলের ডাকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম, এগারটা পার হয়ে গেছে। এতো দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস আমার নেই, অথচ আজ দিব্যি এত বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে নিলাম। উঠতে যেতেই টের পেলাম মাথা ভারি হয়ে আছে, বেশ অসুস্থ লাগছে। নিখিলের তাড়ায় বাথরুমে ঢুকে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আসার পর খানিকটা ভালো অনুভূতি ফিরে আসলো। ও একেবারে কাপড়-চোপড় পরে রেডি হয়ে বসে আছে। বাথরুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তাড়া দিলো,

-ক্ষুধায় পেটের নাড়িভুড়ি হজম হওয়ার জোগাড় তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।

আমি কথা না বাড়িয়ে দ্রুত কাপড় চোপড় পরে ওর সাথে বের হয়ে আসলাম। গরম গরম পরোটা আর নিহারী দিয়ে পেট ভরে খাওয়ার পর নিখিলের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। তেতো স্বাদের মগভর্তি ব্ল্যাক কফি গেলার পর আমার মাথা অনেকটা হালকা হয়ে আসলো। হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দিনের প্রথম সিগারেট জ্বালাতে নিজের মধ্যে পরিপূর্ণ উদ্যম ফিরে পেলাম, সারাদিনের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত মনে হলো।
-কোথায় যেতে চাস এখন? নিখিলকে জিজ্ঞাসা করলাম।
-আপাতত রুমে।
-রুমে? আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। এখন রুমে যাওয়ার আমার কোনো ইচ্ছা নেই, এরচেয়ে রাস্তায় হেঁটে বেড়ালে অনেক ভালো লাগতো। রুমে যেয়ে করার আছেই-বা কি? এ সময়ে রুমে ফিরে যেতে চাওয়ায় নিখিলের উপর বিরক্ত হলেও আপাতত চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। সিগারেট শেষ করে ও রুমের দিকে হাঁটা ধরতেই বাধ্য হয়ে পিছু নিলাম। রুমে ঢুকতেই তিক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
-এখন আবার রুমে ফিরে আসার কি কোনো দরকার ছিল? রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে সময় কাটানো যেতো না?
-বাইরেই যাব, জাস্ট একটু প্রস্তুতি নিয়ে নেই, ফিচেল হাসি দিয়ে নিখিল বললো।
-বাইরে যাওয়ার জন্য আবার কিসের প্রস্তুতি নিতে হবে?
নিখিল কোনো জবাব না দিয়ে হুইস্কির বোতল টেনে নিয়ে দুটো গ্লাসে খানিকটা করে ভরে একটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো।
-এই সকালে আমি এসব খাব না, বিরক্ত হয়ে বললাম।
-আরে খা, সামান্য একটু খেলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না বরং কাজে লাগবে।

নিখিল গ্লাসে চুমুক দিতে আমিও গ্লাস টেনে নিয়ে একটা চুমুক দিলাম। চুমুক দেওয়ার পর বেশ ভালোই লাগলো, বেড়ানোর মুডেই যখন আছি তখন সকালই কি আর সন্ধ্যাই কি? গ্লাসের হুইস্কি শেষ হতে নিখিল ব্যাগের মধ্যে থেকে একটা ছোটো সাইজের প্লাস্টিকের বোতল বের করলো। বোতলের মুখ খুলে দুই গ্লাসেই খানিকটা করে ঢেলে আমার দিকে এগিয়ে দিতে জিজ্ঞেস করলাম,

-এটা কি?
-যৌবনের আরক, কথা না বলে গিলে নে।
হাত বাড়িয়ে বোতল তুলে দেখলাম লেবেলের উপর নাম লেখা, ফাস্ট ফিলিংস।
-অত না দেখে গিলে ফেল। জিনিসে এমন পাওয়ার এসে যাবে যে নিজেই অবাক হয়ে যাবি।
-আমার লাগবে না তুই গেল, বিরক্ত হয়ে বললাম।
আরও খানিকক্ষণ ঝোলাঝুলির পর খাবো না বুঝে আমার ভাগেরটুকু ও গিলে ফেললো।
-খেলে বুঝতি জিনিসটা কতো ভালো আর কেমন কাজের।

এই কথার কোন জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। একটা সিগারেট এগিয়ে দিতে নিয়ে কষে টান দিলাম। নিখিলের কীর্তিকলাপ কিছুই বুঝতে পারছি না। সিগারেটে কয়েকটা টান দিতেই ও উঠে দাঁড়িয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য ইশারা করলো। এতক্ষণে স্বস্তি পেলাম, এ সময় ঘরের মধ্যে বসে এইসব করতে মোটেও ভালো লাগছিল না। হোটেল থেকে বেরোনোর পর থেকেই দেখছি নিখিলের মুখে সারাক্ষণই মৃদু হাসি লেগে আছে। হনহন করে রাস্তা ধরে ওর হাটায় বিরক্ত হয়ে বললাম,

-আস্তে হাঁট? এতো জোরে হেঁটে ক্লান্ত হতে চাই না।

ও আমার কথা পাত্তা না দিয়ে একই গতিতে হাঁটতে থাকায় বাধ্য হয়ে আমাকেও দ্রুত হাঁটতে হচ্ছে। খানিকক্ষণ হাঁটার পর ও এক জায়গায় থেমে দাঁড়ালো, এর মধ্যে আমি বেশ খানিকটা পিছনে পড়ে গিয়েছি। আমার দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে ও রাস্তা পার হয়ে ওপাশে চলে গেলো। ওপাশে দাঁড়িয়ে আমাকে হাতছানি দিয়ে দ্রুত পার হতে তাগাদা দিলো। এপাশ থেকে রাস্তার ওপাশে তাকিয়ে দেখতে পেলাম নিখিল যেখানে দাঁড়িয়ে আছে উপরে সাইন বোর্ডে লেখা- ‘গ্রিন ভ্যালি জেন্টস পার্লার।‘

আমি রাস্তা পার হয়ে ওপারে পৌঁছে যেতেই ও আমার হাত ধরে পার্লারের গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লো। ভিতরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম রিসিপশনে একটা বেশ আকর্ষণীয় ফিগারের সুন্দর মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে খুব মিষ্টি করে হেসে অভ্যর্থনা জানালো।
-কয়জন আছে? নিখিল রিসেপসনিস্টকে জিজ্ঞেস করলো।

-আপাতত দুইজন আছে।
-একটু ডাক দেন দেখি।

রিসেপশনিস্ট মহিলা একটা বেল বাজাতেই ভেতর থেকে দুটি মেয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো। কড়া মেকাপের সাজসজ্জা দেখে আকর্ষণের বদলে আমার কেনো যেন অরুচির বোধ তৈরি হলো। এতোক্ষণে বুঝতে পারলাম কি কাজের জন্য নিখিল এখানে এসেছে, একইসাথে মধু খাওয়ার বৃত্তান্তও বোধগম্য হলো।

-কোনটা নিবি? নিখিল আমাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আশ্চর্যজনকভাবে আমার প্রবৃত্তি নিস্তেজ হতে হতে শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
-কথা বলিস না কেন? নিখিল ধমকে উঠলো।
-আমার লাগবে না তুই কর।
আমার কথা শুনে নিখিল খুব অবাক হয়ে তাকালো। ও যেন বুঝতেই পারছে না এমন সুযোগ কেউ হেলায় ছাড়তে পারে।
-পছন্দ হচ্ছে না? ও ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইলো।
-না, আসলে ঠিক তেমন কিছু না আমার ভালো লাগছে না।
-ঠিক আছে তুই তাহলে এখানে বস, ও বেশ হতাশ স্বরে বললো। আমি কাম সেরে আসি।
-আমি বরং বাইরে যেয়ে চা খাই।
-ঠিক আছে যা, নিখিল তিক্ত স্বরে বললো। এর মধ্যেই ওর মনোযোগ আমার দিক থেকে সরে রঙচঙে সুন্দরীদের দিকে চলে গেছে।

সন্তর্পনে দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে আসলাম। রাস্তার ধারে খানিকটা হাঁটতেই একটা চায়ের দোকান চোখে পড়লো। চায়ের অর্ডার দিয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালালাম। যতক্ষণ ওখানে ছিলাম মনে হচ্ছিল কেমন যেনো দম আটকে আসছে। বাইরে আসতে পেরে এখন স্বস্তি লাগছে। চা খাওয়া হতেই ওখান থেকে সরে এসে দোকানে দোকানে বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখে সময় কাটাতে লাগলাম। নানান রকম জিনিস দেখে বেশ আনন্দেই সময় কেটে যেতে লাগলো। যদিও অধিকাংশ জিনিসই আমার কেনার সামর্থ্য নেই তবুও নেড়েচেড়ে দেখতে বড়োই ভালো লাগছে। কথায় আছে- দর্শনে অর্ধভোজন। আমার অবস্থা ঠিক তাই, দেখেই মনের তৃপ্তি যতটুকু পারি মিটিয়ে নেওয়া আর কি।
হঠাৎ মনে পড়লো বেশ খানিকক্ষণ আগে আমি বের হয়ে এসেছি মোবাইল বের করে দেখলাম চল্লিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। দোকান থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে ফিরে চললাম। পার্লারের সামনে পৌঁছে রাস্তার অপর পাশে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিখিলের অপেক্ষা করতে থাকলাম। আসার মিনিটখানিকের মধ্যেই দেখি নিখিল বাইরে বের হয়ে আসছে। রাস্তার উলটাপাশে তাকিয়ে আমাকে দেখে ওর মুখে হাসি ফুটে উঠলো। দ্রুত রাস্তা পেরিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।

-মিস করলি, মেয়ে দুটির ফিগার এতো সুন্দর আর এমন খেলুড়ে তুই চিন্তাও করতে পারবি না, তৃপ্তি মাখা কন্ঠে নিখিল বললো।
-এতক্ষণ সময় লাগলো তোর? অভিযোগের সুরে বললাম।
-কি আর করবো, তোর ভাগেরটাও আমাকেই নিতে হলো, এজন্যই…
-বলিস কি দুইটাকেই নিয়েছিস?

নিখিলের মুখে অনাবিল হাসি ফুটে উঠলো। আমার দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বললো, -রাস্তায় মেয়ে দেখলে তো গিলে খাস আর ঘাঁটিতে নিয়ে গেলাম না খেয়ে চলে আসলি, বোকা কোথাকার!

ওর কথার কোন জবাব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। একটা সিগারেট ধরিয়ে রুমের দিকে হাঁটা শুরু করতে বিনা বাক্যব্যয়ে পিছু নিলাম। রুমে ঢুকে ও আগে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আসলো। ওর পরে আমি বাথরুমে ঢুকতে যেতেই নিখিল বললো,

-গোসল করে কি করবি কাম তো করিসনি?

আমি কোনো জবাব না দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম নিজেকে কেমন যেন অশুচি মনে হচ্ছে গোসল না করলে কোনোভাবেই পরিচ্ছন্নতার বোধ ফিরে আসবে না।

৫.
বাথরুম থেকে বের হতেই শুনতে পেলাম আমার মোবাইলে রিং বাজছে। তাড়াতাড়ি করে মোবাইল হাতে তুলে নিতেই দেখতে পেলাম বৈকুণ্ঠ সাহিত্য ক্লাবের সেক্রেটারি ফোন করেছে। ফোন রিসিভ করে খানিকক্ষণ কথা বলে সময়মতো অনুষ্ঠানে পৌঁছার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোবাইল রেখে দিলাম। পার্লার থেকে বের হওয়ার সময় থেকে এখন পর্যন্ত নিখিলের মুখে পরিতৃপ্তির অভিব্যক্তি জ্বলজ্বল করছে।
-মনে হচ্ছে খুব মজা করেছিস, হেসে জিজ্ঞেস করলাম।
-ওহ্! দারুণ!! মেয়ে দুটি দুর্দান্ত ছিল, তুই খুব বোকামি করেছিস।
-বোকামি করলে করেছি, আমার ভাগেরটা তো তুইই নিলি কিন্তু জিনিসের এতো পাওয়ার পেলি কোথায়? ফাস্ট ফিলিংস এর বোতল উঁচু করে ও বললো,
-একেই বলে ছোটো সাপের বড়ো বিষ, খানিকটা খেয়ে নিলে জিনিসের এমন পাওয়ার চলে আসে যে দুইজন কেনো আরো দুই একটাকে সামলাতে পারতাম।
ওর কথা শুনে হেসে ফেললাম,
-বাপরে বীরপুরুষ!

নিখিল আবার হুইস্কির বোতল টেনে নিতে মানা করলাম, এখন আর খাস না। আমার সঙ্গে তোকে যেতে হবে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ওখানে যেয়ে তুই আমাকে ডুবাতে পারবি না।

-আরে সামান্য একটু খেলে কিছুই হবে না।

আমি আর বাঁধা দিলাম না তবে দ্বিতীয়বার গ্লাসে ঢালার উদ্যোগ করতেই হাত বাড়িয়ে হুইস্কির বোতল ছিনিয়ে নিলাম। আর মাত্র এক গ্লাস খাওয়ার জন্য ওর আকুতি মিনতি মোটেই কর্ণপাত করলাম না। কিছুটা ক্ষুন্ন মনে সিগারেট জ্বালিয়ে ও উদাস হয়ে টানতে থাকলো। আমি উঠার জন্য তাড়া দিতে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ালো।

-ঠিক আছে চল যাই দেখি তোর অনুষ্ঠান কেমন হয়।

বাইরে বের হয়ে টগবগে গরম চায়ের সাথে সিগারেট টানার পর একটা ট্যাক্সি ডেকে দুইজন রওনা হয়ে গেলাম। গড়িয়াহাট পৌঁছে দুয়েকজনকে বৈকুণ্ঠ সাহিত্য ক্লাবের ঠিকানা জানতে চেয়ে ব্যর্থ হয়ে ক্লাবের সেক্রেটারিকে ফোন করলাম। উনার নির্দেশনা মতো বেশ খানিকটা হেঁটে অবশেষে পৌছাতে পারলাম। আমাকে দেখেই সেক্রেটারি ছুটে এসে অভিবাদন জানালো। সেক্রেটারির সাথে নিখিলের পরিচয় করিয়ে দিলাম বাংলাদেশের বড়ো ব্যবসায়ী বলে। অডিটোরিয়াম প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গেছি আমি। এই দেশে মানুষের মনে সাহিত্যের প্রতি এত টান সত্যিই অবাক করার মতো। অথচ নিজের দেশে কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে কোনো অনুষ্ঠানে গুটিকয় মানুষ ছাড়া এতো জনসমাগম কখনো দেখিনি।

-বেশ জমজমাট অনুষ্ঠান দেখছি, নিখিল বিস্মিত স্বরে বললো।
-আসলেই তাই, এদেশের মানুষ অনেক সাহিত্যপ্রেমী।

হঠাৎ নিখিল আমাকে ইশারা করতেই পিছনে তাকিয়ে দেখি আট দশজন লোকের সাথে আমার আজন্মের ভালোবাসা পূজনীয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হেঁটে আসছে। উনাকে দেখার সাথে সাথে আমার পুরো শরীরে যেন শিহরণ খেলে যেতে থাকলো।
আজন্ম যার কবিতা পূজা করেছি সর্বান্তকরণে তাকে আজ একই অনুষ্ঠানে পাওয়ার সৌভাগ্য আমাকে আপ্লুত করে ফেললো। পাশ থেকে শুনি নিখিল বিড়বিড় করে উচ্চারণ করছে,

-কেউ কথা রাখেনি তেত্রিশ বছর চলে গেল।

উনি আমার সামনে পৌঁছে যেতেই আমি ছুটে গিয়ে উনার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে বসলাম। আমার এমন কাণ্ডে উনি একেবারে অবাক হয়ে গিয়েছেন। আর যাই হোক এমন কিছু অন্তত আশা করেননি উনার অভিব্যক্তিতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। উনি আশীর্বাদের ভঙ্গিতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মুহূর্তটি আমার জীবনে এক অমূল্য স্মৃতি হিসেবে জমা হয়ে থাকলো মস্তিষ্কের এক কোণে। উনি সামনে এগিয়ে নিজের আসন গ্রহণ করতেই আমি ফিরে আসলাম নিজের জায়গায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে গেলো মূল অনুষ্ঠান। একের পর এক কবি সাহিত্যিক দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিতে থাকলো। একবার নিখিলের দিকে তাকিয়ে দেখি দীর্ঘ নীরস বক্তব্য শুনে ও ক্রমাগত হাই তুলে চলেছে। মৃদু হেসে বক্তাদের বক্তব্যে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলাম। এসব বক্তব্য শুনতে আমারও যে খুব একটা ভালো লাগছে এমন নয় তবুও ধৈর্য সহকারে শুনে চলেছি।

একসময় অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আমার নাম ডাকতে আমি গিয়ে দাঁড়ালাম ডায়াসের সামনে। কবিতা নিয়ে আমার সংগ্রাম, অনুভব, অভিব্যক্তি শব্দ আর বাক্যের মূর্ছনায় প্রকাশ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। কতটুকু পারলাম আর কতটুকু পারলাম না সে হিসাব বিরক্ত শ্রোতাদের চোখেই পেয়ে গেলাম। কয়েকদিন ধরে ভেবে রাখা বক্তব্য দ্রুত শেষ করে ফিরে আসলাম নিজের আসনে।

একসময় ডাক পড়লো আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দৃপ্ত পদক্ষেপে ডায়াসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। উনি বক্তব্য শুরু করতেই আমার কানের মধ্যে বারবার বাজতে থাকল, কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখেনি।

উনার উচ্চারিত শব্দ আমার কানের মধ্যে প্রবেশ করলেও মস্তিষ্ক তার অর্থ অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। আমি অপলক চোখে তাকিয়ে লক্ষ্য করছি উনার শব্দের উচ্চারণ, দাঁড়িয়ে থাকার দীপ্ত ভঙ্গিমা। উনার বক্তব্য শেষ হতে পুরা অডিটোরিয়াম হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠলো।

বক্তব্য শেষে উনি নিজের আসনে ফিরে না এসে মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ঘোষণা করলো
-এখন বৈকুণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হবে এবং বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন শ্রদ্ধেয় জনাব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
উনি এবার ঘোষণা করলেন,

– কথাসাহিত্য বিভাগে বৈকুণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কারে মনোনীত হয়েছেন ‘দুঃসময়ের দুয়ার’ উপন্যাসের জন্য জনাব মণীন্দ্র দত্ত। উনি বিনীত কন্ঠে মণীন্দ্র দত্তকে মঞ্চে উঠে আসার আহ্বান জানালেন।

উনার আহবানে আমার পাশের চেয়ার থেকে যে সাদামাটা চেহারার লোকটি উঠে দাঁড়ালো তাকে দেখে এতক্ষণে বুঝতেই পারিনি উনি এমন গুণী সাহিত্যিক হতে পারেন। উনি মঞ্চে উঠে যেতেই জনাব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ওনার হাতে ক্রেস্ট ও চেক তুলে দিলেন। দর্শক প্রবল করতালিতে উনাকে অভিনন্দিত করলো।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এরপর ঘোষণা করলো,

-বৈকুণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কারের কবিতা বিভাগে এবারে মনোনীত হয়েছেন ‘শব্দের পাঁজর ছুঁয়ে’ কাব্যগ্রন্থের জন্য জনাব মাহবুবুল আলম পলাশ। ঘোষণা শুনে আমি একেবারেই চমকে গেলাম, এরা আমাকে আগে কিছুই জানায়নি। অনেকটা হতভম্ব হয়ে স্খলিত পদক্ষেপে মঞ্চে হাজির হলাম।

আজন্মের আরাধ্য কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর হাত থেকে ক্রেস্ট আর চেক নেওয়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন আমি পৃথিবীতে নয় স্বর্গে হাজির হয়েছি। পুরস্কার হাতে নিয়ে আবারও নিচু হয়ে সালাম করতে যেতেই উনি আমাকে হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন। মৃদু স্বরে বললেন, দোয়া করি অনেক বড়ো কবি হও।

দুজনে একসঙ্গে ফিরে আসলাম নিজেদের আসনে। ফিরে আসতে আসতেই ঘোষণা শুনলাম,

– এবার শুরু হবে অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৃত্য পরিবেশন করবেন যাত্রাপালার বিখ্যাত নায়িকা কুমুদিনী দেবী। অকস্মাৎ বেজে উঠলো হিন্দি গানের জোরালো মিউজিক, মঞ্চের পেছন থেকে নাচতে নাচতে সামনে এগিয়ে আসলো সংক্ষিপ্ত এবং উত্তেজক পোশাক পরিহিত কুমুদিনী দেবী। উনার লোভনীয় শরীরের প্রবল দুলুনির সাথে সাথে অডিটোরিয়ামের নানান জায়গা থেকে বাজতে থাকলো শিসের ধ্বনি। এতক্ষণে দর্শক উপভোগ করতে শুরু করেছে অনুষ্ঠান, আমিও বুঝতে পারলাম সাহিত্যানুরাগের মূলে আসলে রয়েছে কি?

পাশ ফিরে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম শ্রদ্ধেয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় গভীর মনোযোগে উপভোগ করছেন কুমুদিনী দেবীর শরীরের লোভনীয় দুলুনি। মৃদু হেসে মুখ ফিরিয়ে আমিও মনোযোগ দিলাম যাত্রাপালা নায়িকার উত্তেজক সৌন্দর্যের লোভনীয় মোহে।

৬.
অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর থেকেই দেখছি নিখিল কেমন চুপসে আছে। কি হলো ওর কে জানে। জিজ্ঞেস করতে গা ঝাড়া দিয়ে পুরা বিষয়টি অস্বীকার করলো। তবে যতোই অস্বীকার করুক ওর চেহারা মলিন হয়ে আছে। সারাক্ষণ যে মানুষটা আনন্দে টগবগ করে ফুটছিল তার হঠাৎ এমন মলিন চেহারা দেখতে মোটেও ভালো লাগছে না। নিরস অনুষ্ঠান দেখার বিরক্তি তো কুমুদিনী দেবীর নাচ দেখে কেটে যাওয়ার কথা। ফিরে আসার পর রুমে গিয়ে ক্রেস্টটা রেখে সাথে সাথেই আমরা বের হয়ে এসেছি। এখন নিউ মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া গলাধঃকরণ এর সাথে সুন্দরী রমণীদের শরীরের খাদ ভাজ দার্শনিকের নির্লিপ্ততায় পর্যবেক্ষণ করছি। নিখিলের আজ যেন কোন কিছুতেই মন নেই, ওর মন কোথায় ঘুরছে সে খবর ওই জানে।

খানিকক্ষণ ঘুরাঘুরির পর ও যখন প্রস্তাব দিলো বারে যাওয়ার, ভাবলাম এবার পরিস্থিতি পালটাবে। কিন্তু বাস্তবে ওর চুপসানো মুড একই রকম থাকলো কোনো উন্নতি হলো না। দ্বিতীয় পেগ হুইস্কি শেষ করার পর যদিও ওর মধ্যে খানিকটা উৎফুল্ল ভাব ফিরে আসলো তবুও ওর স্বতঃস্ফূর্ততায় কিছুটা ঘাটতি যেনো থেকেই গেলো।

কোনোভাবেই ওর মুডের উন্নতি না করতে পেরে আমি নৃত্যরত সুন্দরীদের দিকে মনোযোগ দিলাম। হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে দুচোখ ভরে সুন্দরীদের দেহ চেটেপুটে খাচ্ছিলাম হঠাৎ নিখিল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বের হয়ে যেতে চাইলো। অগত্যা আমাকে উঠতে হলো যদিও ওঠার ইচ্ছা আমার একেবারেই ছিল না। দারুণ উপভোগ করছিলাম কিন্তু নিখিলের মন বিবেচনা করে আর বিতর্কে না গিয়ে ওর সাথে বেরিয়ে আসলাম।

একটা হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে ফেরার পথে ওয়াইন সপ থেকে ও দুটি বোতল কিনে নিলো। দুইটা বোতল দেখে ভ্রু কুঁচকে উঠলেও কিছুই বললাম না, পারলে খাক আমার কি? রুমে ঢুকে আগে ফ্রেশ হয়ে নিলাম তারপর বসলাম বোতল আর গ্লাস নিয়ে। নিখিলের মুড এখনও আগের মতোই আছে যেন হঠাৎ করে ও সব উদ্যম হারিয়ে ফেলেছে।
উদাস হয়ে সিগারেট টানতে টানতে ও আক্ষেপের সুরে বললো,

-তুই যে এত নামি লেখক বুঝতেই পারিনি।
-আরে না, মোটেই তেমন কিছু না।
-নিজেই তো দেখলাম, তুই গুরুত্ব না দিলে কি হবে! দেশ পেরিয়ে তুই যখন এদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে গেছিস তখন তোকে নামি লেখক না মেনে আর উপায় কি।
-আরে, কবিদের কোনো দাম নেই কারো কাছে!
-ওই কবিতা লিখেই তো পুরস্কৃত হলি।
-একটি ক্রেস্টের আর কী এমন মূল্য? চেক তো দিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকার।
-অনেক মূল্য, আর টাকার অঙ্কে এই সম্মানের মূল্য নির্ধারিত হতে পারে না।
-টাকার অঙ্ক যাই হোক, সেটা তবুও টাকা। ফিরে আসার আগে সেক্রেটারিকে বলতেই চেকের বদলে আমাকে পাঁচ হাজার টাকা নগদ দিয়ে দিয়েছে। ক্রস চিহ্ন দিয়ে বাতিল করা চেকটি আমি স্যুভেনির হিসাবে রেখে দিয়েছি।
-আসলে নিজে কখনও এমনভাবে সম্মানিত হওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারি না, নিখিল একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললো। তোর জন্য সত্যিই অনেক গর্ব হচ্ছে আমার একই সাথে নিজের জন্য হতাশা। এভাবে সম্মান আমাকে কেউ কোনোদিন করবে না।
-করবে না কেনো? অবশ্যই করবে।
-কেন করবে? আমার মতো ব্যবসায়ী হাজার হাজার আছে, এদের কেউ হিসাবের মধ্যে ধরে না। এসব পেতে গেলে যত বড়ো ব্যবসায়ী হতে হবে তা আমি কখনো হতে পারবো মনে হয় না।
-দেখ তুই বড়ো ব্যবসায়ী অনেক টাকার মালিক আর আমি একজন দুঃস্থ-দরিদ্র কবি। তোর সাথে আমার কোনো তুলনাই হতে পারে না।
-কিছু টাকা-পয়সার মালিক হয়তো হয়েছি জীবনটাকে ভালোমতো চালিয়ে নিতে পারছি। কিন্তু….
-আমার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্যতা তোর আছে, নিখিলের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম।

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ও হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট টেনে নিলো।
সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে জোরে টান দেওয়ার পরে কলকল করে ধোঁয়া ছেড়ে জানতে চাইলো,

-আসলে দীর্ঘদিন তোর সঙ্গে দেখা নাই বলতে গেলে কিছুই জানি না। কি করছিস এখন তুই।
-একটি গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা করি।
গার্লস স্কুলের কথা শুনে নিখিলের মুখে হাসি ফুটে উঠলো, তাহলে স্কুলের এইসব মেয়েদের নিয়েই তুই কবিতা লিখিস!
-কথা শুনে আমার মুখে হাসি ফুটে উঠলো, কখনও লিখিনি তা বলবো না।
-স্কুলের মেয়েরা নিশ্চয়ই তোকে অনেক পছন্দ করে।
-কি যে বলিস, কচি কচি মেয়েরা কেনো আমার মতো বৃদ্ধকে পছন্দ করবে?
-দু-একটা কচি ফলের স্বাদ নিয়েছিস তো?
-ধ্যাত, কি যে বলিস না? লাজুক কন্ঠে আপত্তি করলাম। চোখেমুখে অস্বীকার করলেও মুহূর্তেই মনের পর্দায় ভেসে উঠলো একটা দিনের স্মৃতি।

তখন বর্ষাকাল প্রায় দিনেই বৃষ্টি হয়। বউ আগের দিন বাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে, বাড়িতে আমি একা। বিকালে প্রাইভেট পড়তে আসার কথা পাঁচজন মেয়ের, আমি ওদের অপেক্ষায় আছি। প্রাইভেটের সময় হওয়ার আধা ঘন্টা আগে এমন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো বুঝতে পারলাম আজ আর কেউ পড়তে আসবে না। ক্যাসেট প্লেয়ারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গান ছেড়ে দিয়ে সিগারেট টানছি হঠাৎ কেউ দরজায় নক করলো। এগিয়ে যেয়ে দরজা খুলে দিতেই অবাক হয়ে গেলাম। প্রাইভেট ব্যাচের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে তিশা দাঁড়িয়ে আছে।

তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়িয়ে ওকে ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলাম। ছাতা নিয়ে আসার পরেও ওর গায়ের পোশাক প্রায় পুরো ভিজে গেছে। এমন বৃষ্টির মধ্যে কেউ পড়তে আসবে একেবারেই ভাবতে পারিনি। তিশার ভেজা শরীর দেখে আমার পুরা শরীর উত্তেজনায় অস্থির হয়ে পড়লো।

-তুমি তো দেখি পুরাই ভিজে গেছো, ওর দিকে লোভী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম।
-ছাতা নিয়ে আসার পরেও যে ভিজে যাবো বুঝতে পারিনি, ওর চোখে কেমন যেন প্রশ্রয়ের মৃদু হাসি।
অতলস্পর্শী লোভ আমার সাহস বাড়িয়ে তুললো,
-তুমি বরং ভেজা কাপড় খুলে ফেলো ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
-ধ্যাত, কি যে বলেন না আপনার সামনে আমি কাপড় খুলবো কেমন করে?
-তোমার খুলতে হবে না আমিই খুলে দিচ্ছি। বলেই সামনে এগিয়ে ওর কামিজ টান দিয়ে খুলে ফেললাম। ভেবেছিলাম বাধা দিবে কিন্তু ও বাধা না দিয়ে আমাকে আরো সাহায্য করলো। কামিজ খোলার সাথে সাথে ধবধবে ফর্সা স্তন আর খয়েরি স্তনবৃন্ত দেখার সাথে সাথে আমি যেন উন্মাদ হয়ে গেলাম। মুহূর্তের মধ্যে শরীরের শেষ কাপড়টুকুও খুলে সম্পুর্ণ নগ্ন করে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। খয়েরি স্তনবৃন্ত মুখের মধ্যে পুরে চুষতে শুরু করতেই ও কোঁকাতে শুরু করলো। প্রবল উত্তেজনায় ওর শরীরের কেঁপে কেঁপে ওঠা আজও আমার স্মৃতিতে একেবারে অম্লান হয়ে আছে।

এরপর কখন ওর শরীরের মধ্যে প্রবেশ করেছি কখন ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছি সবই যেন ঘোরের মধ্যে ঘটে গেল। সবকিছু থেমে যাওয়ার পর খুবই লজ্জা লাগলো নিজের ছাত্রির সাথে এ কি করলাম? লজ্জায় ওর দিকে তাকাতে পারছিলাম না মাথা নিচু করে বসেছিলাম। কিন্তু ও আমাকে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য করলো। সত্যি বলতে জীবনে এতো তুপ্তি আমি আর কখনো পাইনি। সপ্তাহখানেক পর তিশার বিয়ে না হয়ে গেলে হয়তো আরও দুয়েকবার এমন সুযোগ পাওয়া যেতো। তবে বিয়ে হয়ে যাওয়ায়…

-কিরে, একেবারে আনমনা হয়ে গেলি? কোনো ছাত্রির কথা মনে পড়লো নাকি? নিখিল হেসে জিজ্ঞেস করলো।
-ছাত্রিদের মায়ের কথা মনে পড়লো? বলে উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলাম, নিখিলও যোগ দিলো হাসিতে।
-আমি কিন্তু কাল চলে যাবো, হাসি থামিয়ে বললাম।
-কাল তোর যাওয়া হবে না, নিখিল আপত্তি করলো।
-আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে আর থেকে কি হবে? তাছাড়া স্কুলে কাল পর্যন্ত ছুটি নিয়ে এসেছি।
-অতো কথা শুনতে চাই না, আমি পরশুদিন যাবো তুইও ওইদিনই যাবি। একদিন বেশি থাকলে এমন কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।

নিখিলের পীড়াপীড়ি দেখে গাইগুই করে শেষ পর্যন্ত থাকতে রাজি হয়ে গেলাম। ঠিক আছে থাকলামই না হয় আরেকদিন, আর কখনও আসা হবে কিনা কে জানে। দুইজন ক্রমাগত টেনে সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার করে ফেললাম, ক্লান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত গ্লাসের পর গ্লাস হুইস্কি গিলে তারপর একসময় ঘুমিয়ে গেলাম।

৭.
শেষবারের মতো এসেছি বারে, হুইস্কির গ্লাস হাতে ডজনখানেক সুন্দরীদের শরীর দোলানো বেদম মিউজিকের সাথে প্রাণভরে উপভোগ করছি। আর কখনো আসা হবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই তাই যতটুকু পারি উপভোগ করে নিচ্ছি।
নিখিল অবশ্য বলেছে এসব আসলে ডাল-ভাত, থাইল্যান্ডের বারে ব্রা খুলে নাচে। ব্রা খুলে নাচলে নাচুক ওসব চিন্তা করে কি আমার লাভ আছে? ইন্ডিয়া একবার আসতে পেরেছি এই সাত জনমের ভাগ্য। আমার মতো দরিদ্র মানুষের জন্য থাইল্যান্ড যাওয়ার চিন্তা করা আর আকাশ-কুসুম ভাবা একই। মেয়েগুলির শরীরের যেটুকু অংশ উন্মুক্ত দেখতে পাচ্ছি তাই আমার কাছে অনেক বেশি। প্রায় সবার উন্মুক্ত নাভির গভীরতা আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। নিখিল আজ যথারীতি আগের মুডে ফিরে এসেছে, ওর শরীর থেকে আনন্দ-উল্লাস ঠিকড়ে বেরোচ্ছে।
সকালে ওর মধু খাওয়ার অভিযানে আজ আর আমি সঙ্গী হইনি। ও যদিও নানাভাবে আমাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিল তবুও সাথে যেতে রাজি হইনি। রুচিই যদি না হয় তাহলে সেখানে কিভাবে মজা উপভোগ করা যেতে পারে। আর মজায় যদি শরীক নাই হতে পারি তাহলে অযথা ওর সাথে যাওয়া অর্থহীন। বুঝিয়ে-সুজিয়ে একাই ওকে পাঠিয়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি মার্কেটে। তবে শুধু ঘুরেই বেড়াইনি আজ কিছু কেনাকাটাও করেছি। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া পাঁচ হাজার টাকার বেশ কিছুটা মনের আনন্দে খরচ করেছি।
বউটার খুব শখ দামি কসমেটিকস ব্যবহার করার অথচ কখনোই কিনে দিতে পারি না। কসমেটিকসের দোকান চষে বেড়িয়ে আজ বেশকিছু কিনে ফেলেছি।

-বাব্বা! এসব জিনিসের এত দাম ভাবতেই পারিনি।

প্রতিটা আইটেম কেনার আগে দোকানের পর দোকান চষে বেড়িয়েছি ছোটোলোকের মতো দরদাম করে। দোকানদাররা বিরক্ত চোখে তাকিয়ে থাকলেও পাত্তা দেইনি। আমার টাকা আমি গাঙের জলে ভাসিয়ে দিতে আসিনি। যাচাই না করে কিনবো যদি ওরা ভেবে থাকে তাহলে ওরা বোকা। শাড়ির দোকান ঘুরে ঘুরে গাঢ় নীল রঙের একটা কাতান শাড়ি অনেক দাম দর করে পনেরশো টাকা দিয়ে কিনেছি।
এরপর ছেলের জন্য বিভিন্ন দোকানে ঢুঁ মারতে শুরু করি। একটা সুপারশপে বাচ্চাদের সেকশনে কিছু টি-শার্ট দেখে খুব পছন্দ হয়ে যায়। বাচ্চাটা আমার কার্টুন খুব পছন্দ করে সুপারহিরোদের টি-শার্ট পেলে দারুণ খুশি হবে। কয়েকটা টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্টের সাথে সানগ্লাস, ঘড়ি আর বাইনোকুলার কিনে ফেলি। সবশেষে দুই বক্স ডেইরি মিল্ক চকলেট আর এক ডজন ওরিও বিস্কুটের প্যাকেট। নিজের জন্য একটা নতুন জুতা কেনার ইচ্ছা ছিল কিন্তু পকেটের টাকা স্রোতের মতো বের হয়ে যাওয়ায় সে পরিকল্পনা বাদ দেই। সব কেনাকাটা শেষে ফুরফুরে মেজাজে রুমে ফিরে দেখি নিখিল আগেই ফিরেছে।

-এতক্ষণে ফিরলি? তোর জন্য কখন থেকে অপেক্ষা করে বসে আছি। এদিকে আমার ক্ষুধায় পেট শুকিয়ে গেলো, আমাকে দেখেই বিরক্ত কন্ঠে বললো নিখিল।
-মৌমাছির মধু খাওয়া এতো তাড়াতাড়ি শেষ হবে তা তো ভাবিনি, আমি জবাব দিলাম।
-তাছাড়া আজকে ফাস্ট ফিলিংস যতখানি গিললি, ধরেই নিয়েছি সারাদিন ধরে তোর মধু খাওয়া চলতেই থাকবে।
-কি যে বলিস না, এতো কি আর পারি এই বয়সে! প্রতিদিন যেভাবে নিচ্ছিস এত বেশি ত্রিশ বছরের যুবকও পারবে না। আজ কয়টা নিয়েছিস?
-আমার কথা শুনে নিখিল শরীর দুলিয়ে হাসতে শুরু করলো।
-কিরে জবাব দিস না কেন? কয়টাকে নিয়েছিস আজ?
-কি কারণো যেন ওদের ওখানে মেয়েদের সংকট দেখা গেছে। আজকেও দুইটার বেশি ছিল না তবে আজ দুইটাকে একসঙ্গে নিয়েছি।
-আরি শালা, তুই দেখি রাজা-বাদশাদের মতো কাজ কারবার শুরু করছিস, জীবনে সব সুখই করে নিলি!
-তোকে সুখ করতে কে মানা করেছিল? তোকে তো অনেক বললাম তুই গেলি না।
-আসলে ওখানে আমার ঠিক ভালো লাগেনি।
-বড়ো আমার সাধু হয়েছিস, ফিরে গিয়ে স্কুলের কচি ছাত্রিদের সাথে কর।
-সুযোগ পেলে করবো না এমন দিব্যি দেইনি কখনও।
-বুঝেছি কচি মাল ছাড়া মুখে রোচে না তোর। খা, কচি মাল চুষে চুষে খা।
-এমন কপাল কি আমার আছে রে?
-আমিতো জানি শিক্ষকদের কপাল খুবই ভালো। কচি মালে মুখ লাগানোর সুযোগ সবচেয়ে বেশি ওরাই পায় ।
-তোর মহিলা সেক্রেটারি আছে, হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম।
-তা আর রাখতে পারলাম কই? নিখিলের কন্ঠে হতাশা। তোর ভাবী মহিলা সেক্রেটারী নিষিদ্ধ বলে ডিক্রি জারি করে দিয়েছে।
-আহারে! বলেই হেসে ফেললাম। আমার সাথে হাসিতে যোগ দিলো নিখিল।
-আজ বিকালে একবার কলেজ স্ট্রিট যেতে চাই, খেয়ে আসার পর ওকে বললাম,
-কলেজ ষ্ট্রীট কি করতে যাবি?
-বইয়ের দোকানে ঘোরার ইচ্ছা, সুযোগ সুবিধা মতো হয়ত দুয়েকটা বই কিনে ফেললাম।
-বই কিনতে যাবি? আর কোনো বিকল্প কাজ খুঁজে পেলি না? আমাকে আর বই টানে না, পড়ার সময় কোথায়?
-একসময় তো ভালোই বই পড়তি।
-সে সবসময় এখন অতীতের গর্ভে ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে, কতোদিন আগে শেষ বই পড়েছি তা আমার পক্ষে কোনোভাবেই বলা সম্ভব না।
-তোর ভালো না লাগলে না লাগুক তবুও আমার সঙ্গে যাবি।
-ঠিক আছে যাবো, বলা যায় না তোর দেখাদেখি দুয়েকটা বইও না হয় কিনে ফেললাম।

আরও খানিকক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর আমি নিখিলকে ঠেলতে ঠেলতে বের করে নিয়ে আসলাম। কলেজ ষ্ট্রীটে যখন পৌছালাম তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে অনেকখানি হেলে পড়েছে। ঝিরিঝিরি বাতাস আর মরা রোদে কলেজ ষ্ট্রীটকে মনে হলো যেন ভাসমান বইয়ের নগর। কলকাতা আসার পর থেকে এই প্রথম সবচেয়ে পছন্দের কাজটি করতে পারছি। একটা বই পাতা উলটানো গন্ধ নেওয়ার মধ্যে যে অনাবিল আনন্দ আছে তা খুব কম মানুষই অনুভব করতে পারে। এই আনন্দ অনুভব করতে গেলে বইয়ের জন্য চাই অনেক ভালোবাসা। প্রবল মমতা নিয়ে একের পর এক বই দেখে চলেছি। দেখলাম বিরক্তির চিহ্ন মুছে ফেলে নিখিল বই নিয়ে পাতা উলটাচ্ছে। বহুদিন পর যেন ওর মধ্যে আবার সেই আগের পড়ুয়া অস্তিত্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বই দেখতে দেখতে কখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে টেরই পাইনি।
এক দোকানে বই ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ একেবারে অবাক হয়ে দেখলাম আমার একটি কবিতার বই সাজিয়ে রাখা। নিখিলকে ডেকে বইটি দেখাতে ও বইটি কিনে নিলো তারপর আমার দিকে বাড়িয়ে বললো,
-অটোগ্রাফ দে।
-আমি হেসে বইয়ের মধ্যে লিখে দিলাম, প্রিয় বন্ধু নিখিলের মনে জেগে উঠুক কাব্যের অহর্নিশ তৃষ্ণা।
ফিরে আসার আগে আমি তিনটি কবিতার বই কিনলাম। নিখিলের হাতে দেখলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতার এক কপি। একটা চায়ের দোকান পেতেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুইজন চা খেলাম, তৃষ্ণা পেয়েছিল খুব। একটা সিগারেট ধরাতে দেখি নিখিল বইয়ের পাতা উল্টে আবেগী কন্ঠে আবৃত্তি করছে,
-কেউ কথা রাখেনি তেত্রিশ বছর কেটে গেলো।
সিগারেটের ধোঁয়া আকাশের দিকে উড়িয়ে দিতে দিতে কান পেতে শুনলাম নিখিলের দরদি কন্ঠে প্রিয় কবিতার আবৃত্তি। রুমে ফিরে নিখিল ঘোষণা দিলো,
-আজ সারারাত দুইজন জেগে থাকবো।
ওর কথা শুনে হেসে সম্মতি দিলাম। জাগলাম না হয় একটা রাত! আর যদি নেহায়েত ঘুম লেগেই যায় তখন না হয় ঘুমানো যাবে, তার আগে পর্যন্ত জেগেই থাকা যাক। আজকে ও আসার আগে হুইস্কির বদলে রেড ওয়াইন কিনেছে সাথে একগাদা কাবাব আর পরোটা। ভরপেট খাওয়ার পর এতোগুলো খাবার কিনতে দেখে ভাবছিলাম ওর পেটে রাক্ষস ঢুকেছে কিনা? এখন বুঝতে পারছি রাত জাগার প্রস্তুতি হিসেবে ও এসব কিনেছে। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি নিখিল দুটি গ্লাসে রক্ত লাল ওয়াইন ঢেলে আমার অপেক্ষায় বসে আছে। আমি বের হওয়ার সাথে সাথে আমাকে ডেকে হাতে একটি গ্লাস ধরিয়ে দিলো। দুইজন একসাথে চুমুক দিলাম টকটকে লাল ওয়াইনের গ্লাসে। আহা! কি অপূর্ব স্বাদ! একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোয়া গেলার ফাঁকে ফাঁকে গিলে চললাম অপূর্ব স্বাদের ওয়াইন।

গ্লাস শেষ হতে একটি সিগারেট জ্বালিয়ে নিখিল হাত বাড়িয়ে আমার কবিতার বই টেনে নিলো। সিগারেট টানতে টানতে মনোযোগ দিয়ে কবিতা পড়ে চললো। আমি গভীর আগ্রহের সাথে লক্ষ্য করছি ওর অভিব্যক্তি। বেশ খানিকক্ষণ পর মুখ তুলে ও বললো,
-তুইতো দুর্দান্ত লিখিস, অনেকদিন পর এতো ভালো কবিতা পড়লাম।

আমি লাজুক হেসে ওর প্রশংসা গ্রহণ করলাম। হঠাৎ ও আমার একটি কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করলো। ওর গমগমে নেশাতুর কন্ঠে কবিতার শব্দেরা প্রাণ পেয়ে ঘরময় ভেসে বেড়াতে থাকলো-
আমার জন্য দেবে একটু মেঘ,
গায়ে জড়াবো।
দেবে কি
কুয়াশা ঢাকা ভোর? পথ হারাবো।
আমার চাওয়া আজ
এতটুকই,
হৃদয়ের নির্বাণ
কি এতই অসাধ্য?
দাও না একটু ঝমঝম বৃষ্টি, ভিজে
ভিজে জ্বর বাধাবো।
দেবে না জারুল বনে মাতাল
হাওয়ায় পথ হারানোর অবসর,
ফুলের গন্ধে মাতাল হবো।
আহা! ইছামতি নদীর মোহনায়
স্রোতের অতলে
তলিয়ে গেল
আমার
সকল স্বপ্নসাধ।
আমার জন্য দাও না ঝলমলে রোদ, পুড়ে
পুড়ে কালো হবো।
বল কি দেবে
নির্ঘুম রাতে একটু স্পর্শ? তোমার হবো।
ওর আবৃত্তি শেষ হওয়ার পরেও যেন শব্দের অনুরণন মাথার মধ্যে বাজতেই থাকলো। বোতল থেকে গ্লাস পূর্ণ করে ও একটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। নিঃশব্দে দুইজন চুমুক দিতে থাকলাম ওয়াইনে।

-তুই এতো দুর্দান্ত লিখিস আমি ভাবতেই পারিনি, স্বগতোক্তি করে নিখিল বললো।
-তোর ভালো লেগেছে জেনে সত্যিই আমার খুব আনন্দ হচ্ছে, আমি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললাম। এখনকার দিনে কবিতা পড়ার, অনুভব করার লোকের বড়ই অভাব। কবিতা পড়া এখন সবার কাছে অহেতুক সময় নষ্ট আর কবিরা নিতান্তই উপেক্ষার পাত্র।
-তারপরেও পড়ার মানুষ কেউ কেউ আছে। আর আছে বলেই তুই এই দেশে এসেও সেরা কবি বলে পুরস্কৃত হলি।
-এটা আসলেই বিরল ঘটনা তবে এসব পুরস্কারের জন্য তো লিখি না। লিখি কারণ লিখতে ভালোবাসি, শব্দ নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসি। বুকের মধ্যে পাথর হয়ে জমে থাকা বলতে না পারা কথা কবিতার মধ্যে নিঃশব্দে বলতে পারি বলে লিখি।
-এ পর্যন্ত তোর কয়টা কবিতার বই বের হয়েছে?
-ছয়টা। আরেকটা বের হওয়ার বিষয়ে প্রকাশকের সঙ্গে কথা চূড়ান্ত হয়েছে খুব শিঘ্রই বের হবে।
-তার মানে কবিতা লিখে তুই ভালো টাকা ইনকাম করিস।

ওর কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলাম। সত্যি বলতে হাসি থামাতেই আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষণ প্রাণভরে আসার পর অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললাম, দারুণ বলেছিস। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ছয়টা বই বের হলে এপর্যন্ত প্রকাশকের কাছ থেকে রয়েলিটির একটা টাকাও পাইনি।

-কি বলিস? নিখিল খুব অবাক হয়ে বললো।
-কেউ নাকি বই কেনে না। বই বিক্রি হয় না তাই প্রকাশক কোনো টাকা দেয় না।
-বই বিক্রি না হলে বই বের করে কি কারণে?
-জানি না। বই বিক্রি হওয়ার কথা না বললেও বছর ঘুরতেই পান্ডুলিপির জন্য ঠিকই তাগাদা দেয়।
-অন্য কোনো প্রকাশকের কাছে পান্ডুলিপি দিলেই পারিস।
-আসলে সবাই একইরকম, শেষ পর্যন্ত কেউই টাকা দিবে বলে মনে হয় না।
-তাই বলে তুই বিনা টাকায় এভাবে লিখে যাবি!
-টাকার জন্য তো লিখি না, লিখি ভালোবাসার জন্য। ধরেই নিয়েছে কবিতার বই থেকে কখনও কোনো টাকা পাবো না।

নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে নিখিল খুব চিন্তিত মনে টানতে থাকে, ফাঁকে ফাঁকে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দেয়। তৃতীয় গ্লাসের ওয়াইনে চুমুক দিতেই আমার পৃথিবী স্বপ্নময় হয়ে উঠেছে। সবকিছু মনে হচ্ছে আশ্চর্য সুন্দর। সত্যি এমন সুন্দরের জন্যই বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। কে জানে স্বর্গেও হয়তো এমন সুখের পসরা সাজিয়ে রাখা আছে। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে এস্ট্রেতে গুঁজে নিখিল হঠাৎ বললো,

-আমি তোকে কবিতার জন্য টাকা দেবো।

ওর কথা শুনে প্রথমে অবাক এবং হতভম্ব হয়ে গেলাম তারপরেই হাসতে শুরু করলাম। ও বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।

-শেষ পর্যন্ত তুই প্রকাশনা ব্যবসায় নাম লেখাতে যাচ্ছিস নাকি? হাসতে হাসতে বললাম।
-ঠিক তা নয়, খানিকটা বিব্রত কন্ঠে ও বললো।
-তাহলে কি জন্য টাকা দিবি?
-আমার মাথায় একটা ভিন্ন ধরনের চিন্তা এসেছে।

নির্দিষ্ট কোনো চিন্তায় মনোনিবেশ করতে পারার ক্ষমতা অনেক আগেই হারিয়েছি। তাই ও কি বলতে চাচ্ছে সে বিষয়ে মাথা ঘামানোর কোনো চেষ্টাই করলাম না। যা বলতে চায় বলুক, কিছু বললে এমনিই শুনতে পাবো।
-ছয়টা পাণ্ডুলিপি থেকে তুই এক পয়সাও পাসনি কিন্তু সপ্তম পাণ্ডুলিপির জন্য আমি তোকে নগদ এক লাখ টাকা দেবো।

ওর কথা শুনে আমার মুখ হা হয়ে গেলো। এত বড়ো হা হলো যে লোভনীয় জায়গা ভেবে একটা মশা ঢুকে পড়লো। কাশতে কাশতে মুখ বন্ধ করে ফেললাম। আমার দিকে গ্লাস এগিয়ে দিতে ওয়াইনের সাথে মশা গিলে ফেললাম। খানিকটা সুস্থির হয়ে প্রশ্ন করলাম,

-তুই কেনো এতো টাকা দিবি? বই তো বিক্রি হবে না তাহলে টাকা দিবি কেনো?
-বিক্রি হওয়া লাগবে না আমি তবুও তোকে টাকা দেব।
মাথা চুলকে বললাম,
-বুঝতে পারছি না তুই কি বলতে চাচ্ছিস?

বই বিক্রি হবে কি হবে না এসব চিন্তা করে আমি তোকে টাকা দিতে চাচ্ছি না। তুই আমার কাছে পান্ডুলিপি বিক্রি করে দিবি, আমি পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমার নামে বই বের করবো।

-আমার কবিতা তোর নামে বের হবে? আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম।
-তুই রাজি হলে হবে। ছয়টা কবিতার বই নিজের নামে বের হয়েও কপালে তোর কিছুই জোটেনি কিন্তু একটা বই আমার নামে বের হলে তুই এক লাখ টাকা পেতে পারিস।

নিখিল আমার হাতে একটি সিগারেট ধরিয়ে দিতে আগুন জ্বালিয়ে বুক ভরে টেনে নিলাম। মনে মনে হিসাব করে নিলাম এক লাখ অনেক টাকা আমার কাছে। এতো টাকা একসাথে আমি কখনোই উপার্জন করিনি। এই টাকা হয়তো অনেকের কাছেই সামান্য টাকা তবে আমার কাছে বেশ বড়ো অঙ্কের। হাতে এতগুলি টাকা থাকলে নিজেকে এত অভাবি মনে হবে না। যদিও স্কুলের অনিয়মিত বেতন এবং ব্যাচে প্রাইভেট পড়িয়ে যা ইনকাম করি তাতে আমার ভালোমতোই চলে যায়। বড়োলোকের ফুটানি করার ক্ষমতা না থাকলেও দুবেলা দুমুঠো ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা আমার ঠিকই হয়ে যায়। তবুও এক লাখ টাকার কথা শুনে ভেতরে আমার লোভের আগুন জ্বলে উঠলো। কম তো হয়নি, এ পর্যন্ত ছয়টা কবিতার বই বের হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আরও বের হবে যদি বেঁচে থাকি। নিজের কিছু কবিতা না হয় অন্যের নামেই বের হলো, কি আর এমন ক্ষতি?

-কি ভাবছিস? নিখিল উদ্বেলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
-নিজের নামে কবিতার বই বের করে কি করবি?
-ব্যবসা করে কিছু টাকা ইনকাম করেছি তবে জীবনে কখনও কেউ সম্মান দেয়নি। কাল তোকে দেখে আমার খুব লোভ হয়েছে এমন কিছু পাওয়ার। আমি সারাজীবন চেষ্টা করলেও হয়তো এসব অর্জন করতে পারবো না। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এই চিন্তা মাথায় এসেছে।

তুই এতো ভালো লিখিস, তোর কবিতা যদি আমার নামে বের হয় তাহলে নিঃসন্দেহে আমিও তোর মতো নাম করে ফেলবো। টাকা অনেক উপার্জন করেছি কিন্তু সম্মান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এতে মেটেনি। তুই আমাকে একটু সুযোগ করে দিতে পারিস।

যেন আকুল দরিয়ায় মাতাল স্রোতে উথাল পাথাল ভেসে চলেছি। কখনও ঢেউয়ের ধাক্কায় আকাশে উঠে যাচ্ছি আবার কখনোবা পাতালে তলিয়ে যাচ্ছি। নিখিলের কন্ঠ কখনো বজ্রের মতো কানে বাজছে কখনোবা মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। ওর সম্মান পাওয়ার এমন তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখে মনে হলো, আহারে বেচারা! মনে ওর কতো সাধ! সামান্য কয়েকটা কবিতা ওকে ছেড়ে দিলেই ওর সারা জীবনের সাধ পূরণ হতে পারে। আমি বন্ধু হয়ে ওর এটুকু ইচ্ছাপূরণ কি করতে পারি না?

আর ওতো শুধু শুধু আমার কবিতা নিজের নামে চালাতে চাচ্ছে না বরং নগদ এক লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। বন্ধুর উপকার সেইসাথে এতগুলি টাকা প্রাপ্তির সম্ভাবনা আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করলো। খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।

-কি ভাবছিস? নিখিল আবারও উদ্বেল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
-ভাবছি তোর ইচ্ছা পূরণ করবো।
-আমাকে পান্ডুলিপি দিবি?
-হ্যাঁ দেবো।
-নিজের নামে বই প্রকাশ করতে দিবি?
মাতাল হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললাম আমি,
– দেবো রে বাবা, দেব।

আনন্দের আতিশয্যে নিখিল আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।

-তোর সাথে দেখা হয়ে আসলেই আমার জীবনে বড়ো প্রাপ্তির সম্ভাবনা তৈরি হলো। তোর লেখা দিয়েই আমি নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলবো। আগামী বছরের মধ্যে দেখবি সারাদেশের মানুষ আমাকে কবি হিসেবে চিনবে, সম্মান করবে।

-কবি নিখিল জিন্দাবাদ, বলে হেসে ফেললাম। নিখিলও যোগ দিলো মাতাল হাসিতে। দুইজনের উচ্চকিত হাসিতে মুখর হয়ে উঠল রুম। রক্ত লাল ওয়াইন ক্রমাগত মাথার মধ্যে তৈরি করে গেলো স্বপ্নের ধুম্রজাল আর আমরা দুইজন সেই স্বপ্নের জালে আটকা পড়ে ভেসে চললাম উদভ্রান্তের মতো।

৮.
বনগাঁ লোকালে বসে আছি, আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ছে। ট্রেন ছাড়ার সময় হতে এখনও বিশ মিনিট বাকি। নিখিল আমাকে কোনো মতেই একা আসতে দিতে রাজি হচ্ছিল না। ও চাইছিল আমিও ওর সঙ্গে প্লেনে করে দেশে ফিরি। আমি কোনোমতেই রাজি হইনি। প্লেনে করে ঢাকা যাওয়ার পর আবারও আমাকে সেই বাসে করেই পাবনাতে ফিরতে হবে। তার চেয়ে বেনাপোল দিয়ে ফিরে যাওয়াই আমার জন্য ভালো। এত ফুটানি করে প্লেনে চড়ার কোনো মানেই হয় না অন্যের পয়সায়। যদি আমার সামর্থ্য থাকতো তা হলে না হয় চিন্তা করতে পারতাম।

অনেক অনুরোধ করেও রাজি করাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ও ক্ষান্ত দেয়। দুজন একসঙ্গে বের হয়ে আসার পরে ট্যাক্সি নিয়ে ও রওনা হয়ে যায় এয়ারপোর্টে আর আমি লোকাল বাসে চড়ে পৌঁছে যাই শিয়ালদা স্টেশনে। টিকিট কাটার পর একটা কোল্ড ড্রিংকস গিলে খানিকটা ঠাণ্ডা হয়ে অপেক্ষা করতে থাকি ট্রেনের জন্য। সময় হতেই একটা ফাঁকা বগি খুঁজে বের করে জানালার ধারে সিটে বেছে বসে পড়েছি।

কয়েকটা দিন আসলেই স্বপ্নের মতো কেটে গেলো। প্রথমে যাওবা ঢিমেতালে কাটছিল, নিখিলের সাথে দেখা হওয়ার পর উদ্যম গতিতে কেটেছে সময়। বিশ বছর পর দেখা হলেও দুইজন আবারও সেই আগের মতো অন্তরঙ্গভাবে পুরাতন সময়ের মতো একসাথে মিশে যেতে পেরেছিলাম। বিদায় নেওয়ার সময় কষ্টই হচ্ছিল কিন্তু আগেকার সেইসব দিন আর নেই এখন, আমরা সবাই কর্মব্যস্ত। ক্ষণিকের আনন্দময় স্মৃতি বুকের মধ্যে ধারণ করে আবার আমাদের ফিরে যেতে হচ্ছে প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে। স্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত হয়ে ছিলাম হঠাৎ কানে আসলো মহিলা কন্ঠে বাজখাঁই অনুরোধ,

-আরে দাদা একটু সরে বসুন না।

মাথা উঁচু করতেই চোখে পড়লো এক মধ্যবয়সী নারীর উপর। বুঝলাম উনি আমাকে সরে বসতে বলছে। মহিলাকে দেখার সাথে সাথে একেবারে চুপসে গেলাম। আরে বাবা পাশে যদি বসতেই হয় তাহলে এমন কুৎসিত মধ্যবয়সী নারী কেনো? অল্প বয়সী সুন্দরী কেউ হতে পারলো না?
চোখের কোণে দেখলাম পাশেরজন সরে বসছে, দেখাদেখি আমিও যতটুকু সম্ভব সরে বসলাম। মাঝখানে একটু জায়গা হতেই মহিলা দুইজনের মাঝে ঠেলেঠুলে জায়গা করে বসে পড়লো। মহিলা বসতেই দেখতে পেলাম উনার পেছনে একটা কিশোরী মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এতক্ষণ দেখতে পাইনি। বাপরে বাপ এইটুকু মেয়ের এত বড়ো বুক কিভাবে হলো? মহিলা বসেই মেয়েটাকে টান দিয়ে বললো,
– তুই কোলে বসে পড়। মেয়েটি পেছনদিকে ঘুরে সাথে সাথে বসে পড়লো। কিন্তু বসার সময় ওর মায়ের সাথে আমারও একটা পা দখল করে বসলো।

পায়ের উপর আচমকা কিছুর স্পর্শ অনুভব করার পর বুঝতে পারলাম কি ঘটে গেছে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে এক পা বেদখল হওয়া নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করলাম না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিলো স্টেশন থেকে। পরের স্টেশনে বগির মধ্যে ভিড় আরও বেড়ে যাওয়ায় মেয়েটা আরেকটু পিছিয়ে বসে এক পা আমার দুইপায়ের মাঝখানে ঢুকিয়ে দিলো। ট্রেন আবার চলতে শুরু করার পর অবাক হয়ে খেয়াল করলাম মেয়েটি মাঝেমধ্যে পা জোরে চেপে ধরছে আমার দুই পায়ের মাঝখানে।

কিছুক্ষণের মধ্যে আরেকটি স্টেশনে এসে গেলো। মহিলার অপরপাশ থেকে একজন লোক উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে উনি একটু সরতেই মেয়েটি মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় বসে পড়লো। এদিকে লোকটির ছেড়ে যাওয়া জায়গায় আরেকজন ঠেলেঠুলে বসে পড়তে উনার সাথে মহিলার তুমুল ঝগড়া শুরু হয়ে গেছে। তুমুল ঝগড়ার মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিলো।

বেঞ্চিতে একজন লোক বেশি বসায় অসম্ভব চাপাচাপি হয়েছে। সামনাসামনি দুই বেঞ্চের মাঝখানে এতো লোক দাঁড়িয়ে আছে যে মনে হচ্ছে প্রায় গায়ের উপর হেলান দিয়ে আছে। হঠাৎ পিঠের বাম পাশে অসম্ভব তুলতুলে কিছুর স্পর্শ পেলাম। পাশে তাকিয়ে দেখি চাপাচাপির মধ্যে মেয়েটি খানিকটা পাশ ফিরে আমার সিটের পিছনে ডান হাত তুলে বিশাল সাইজের নরম তুলতুলে বুক আমার পিঠের সাথে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আমি তাকাতেই মেয়েটি চোখ টিপে একটুখানি ফিচেল হাসি দিয়ে বুকটা আমার পিঠের সাথে জোরে চেপে ধরলো।
নরম বুকের স্পর্শে আমার সারা শরীরে শিহরন খেলে যেতে থাকলো। মানুষজনের ভিড়ের চাপে পিষ্ট হতে হতে চলতে থাকলো মেয়েটির নরম বুকের চাপাচাপি খেলা। তীব্র গরমে ঘামে ভিজে একাকার প্রায় গায়ের উপরে থাকা মানুষের গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বাতাসে এগিয়ে চলেছি পথ।

এমনভাবে বসে আছি এতোটুকু নড়ার মতো সুযোগ নেই। সারা পথ চলল মেয়েটির নরম তুলতুলে বুক খানিক পরপর চেপে ধরার দুষ্ট খেলা। বনগাঁ পৌছার দুই স্টেশন আগে সাঙ্গ হলো খেলা। এই স্টেশনে ট্রেনের অধিকাংশ যাত্রি নেমে গেলো সেই সাথে মায়ের সাথে মেয়েটিও। এতক্ষণে একরাশ ক্লান্তি যেন ঘিরে ধরলো আমায়। এর কিছুপরেই ট্রেন পৌঁছে গেল বনগাঁ স্টেশনে।

ধীরেসুস্থে ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে আসলাম। অনুভব করলাম খুবই খিদে লেগেছে। কিন্তু খিদে লাগলেও এখানে আর খেতে ইচ্ছে করলো না। বর্ডার পেরিয়ে একবারে দেশের মধ্যে ঢুকেই খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি সিএনজি টেম্পুতে উঠে পড়লাম। বর্ডারে পৌঁছতেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম পার হওয়ার আনুষ্ঠানিকতায়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নিজেদের ইমিগ্রেশন পেরিয়ে যখন বাইরে এসে দাঁড়ালাম মোবাইল বের করে দেখলাম চারটা বেজে গেছে।

ইমিগ্রেশন থেকে বের হয়ে কয়েকদিন পর নিজেকে পরিপূর্ণ স্বাধীন বলে মনে হলো। যতো মজাই করি কয়েকটা দিন নিজেকে কেমন যেনো পরাধীন বলে মনে হয়েছে। দেশের মাটিতে ঢোকার পর এই অনুভূতি বিদায় হলো। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ট্রাভেল ব্যাগ কাঁধের উপর ফেলে হাঁটতে থাকলাম হোটেলের খোঁজে। প্রচণ্ড খিদে লেগেছে আগে কিছু না খেলে রওয়ানাই হতে পারবো না। একটা হোটেলে গরম গরম পরোটা ভাজতে দেখে ঢুকে পড়লাম। পরোটা আর ডাল দিয়ে প্রচণ্ড তৃপ্তির সাথে খাওয়া শেষ করলাম।

খাওয়া হতেই বাইরে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি চা স্টলে চায়ের অর্ডার করে দাঁড়ালাম। দেশে ফিরে যতোটা ফুরফুরে লাগার কথা কেনো যেনো তেমনটা ঠিক লাগছে না। কেমন যেনো একটা অস্থিরতা নিজের মধ্যে সারাক্ষণ কুরে কুরে খাচ্ছে। আগুন গরম চায়ে চুমুক দিয়ে ভাবতে লাগলাম, এমন লাগছে কেনো?

এমন তো হওয়ার কথা নয়। নিখিলের সাথে কয়টা দিন এতো উদ্দামতায় কাটিয়ে আসলাম অথচ এখন কেমন অস্বস্তির কাঁটা বুকের মধ্যে যেন খচখচ করে বিঁধছে। নতুন একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বুক ভর্তি ধোয়া গলগল করে ছেড়ে দিলাম। ধোয়ার সাথে সব টেনশন ও অস্থিরতা বাতাসে ভাসিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম কিন্তু উদ্দেশ্য পূরণ হলো না। সিগারেট টানা শেষ হতেই বিরক্তির সাথে মাথা ঝাঁকিয়ে একটি অটোরিকশায় বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা হলাম। পৌঁছে দেখি একটা বাস স্টার্ট দিয়ে ছাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি উঠে একটা সিট দখল করে বসলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে বাস ছেড়ে দিতেই জানালা দিয়ে আসা হু হু বাতাসে মুহূর্তেই প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। বাতাসের সাথে বাসের ঝাঁকুনিতে আস্তে আস্তে আমার চোখ বুজে আসছে। চোখ বুজে আসতেই নিজেকে ঘুমের কাছে স্বেচ্ছায় সমর্পণ করলাম। বসে বসে অস্থিরতায় বিদীর্ণ হওয়ার চেয়ে ঘুমের কোলে নিজেকে সঁপে দেওয়া অনেক ভালো। এরপর কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না, ঘুম ভাঙলো কন্ডাক্টরের ডাকাডাকিতে। যশোর পৌঁছে গেছি। ব্যাগটা তুলে বাস থেকে নেমে একটা সিগারেট জ্বালালাম। সিগারেটে প্রথম টান দিতেই সামনে একটি রিক্সাওয়ালা এসে জিজ্ঞেস করলো স্টেশনে যাব কিনা। সম্মতি জানিয়ে রিক্সায় উঠে বসলাম।

স্টেশনে পৌঁছে আগে কাউন্টারে টিকিট কাটার জন্য এগিয়ে গেলাম। টিকিট কাটা হতে প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ালাম। ট্রেন আসতে এখনো ঘন্টাখানেক দেরি। বাসে ঘুম পাড়ায় নিজেকে এখন বেশ খানিকটা ফ্রেশ লাগছে। একটা বেঞ্চিতে ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করে বসে পড়লাম ট্রেনের অপেক্ষায় ।

আরাম করে বসার সাথে সাথে আবার পুরোনো অস্থিরতা আমাকে ঘিরে ধরলো। কি আশ্চর্য কথা এমন হচ্ছে কেনো? না জানি কয়েকদিন পর দেশে ফিরলাম বউ-বাচ্চার সঙ্গে দেখা হবে সব মিলিয়ে মন আনন্দে পরিপূর্ণ হওয়ার কথা। অথচ কিসের যেনো এক অজানা বিষণ্নতা মনের মধ্যে চেপে আছে। যেনো ব্যাকগ্রাউন্ডে বিষন্ন সুরের ঐকতান ক্রমাগত বেজে চলেছে। পাত্তা দিতে না চাইলেও কোনোভাবেই ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। বরং ক্রমাগত এক অদ্ভুত বিষন্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। নানান কিছু ভাবার চেষ্টা করলাম কিন্তু কোনোভাবেই সুস্থির হতে পারলাম না।

মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে কল্পনার চোখে সেই বৃষ্টিভেজা বিকেল ফুটিয়ে তুলতে চাইলাম। চোখের সামনে তিরতির করে কাঁপতে থাকলো তিশার স্তনবৃন্ত, কোমরের নিচে লোভী গহবর উন্মুক্ত করলো স্বর্গের ঠিকানা, তারপরেও মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হল মনঃসংযোগ। নগ্ন লোভনীয় শরীর চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল।

অসীম এক শূন্যতার গভীরে ঘুরপাক খেতে খেতে পথ হারিয়ে উদভ্রান্তের মতো পথ খুঁজতে থাকলাম। যেন নিঃসীম এক মরুর বুকে একলা পথিক আমি। দৃষ্টির সীমানায় নেই কোনো মানুষ, নেই কোনো কিছুর অস্তিত্ব। যেদিকে হাত বাড়াই শূন্যতা ছাড়া কিছুই স্পর্শ করতে পারি না। এমন শূন্যতায় বুকের মধ্যে তীব্র হাহাকার ছাড়া আর কোনো শব্দই অস্তিত্বের জানান দিতে পারছে না। বুকের মধ্যে চেপে বসা অস্থিরতায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠতেই মাথা ঝেড়ে সব বিদায় করার চেষ্টা করলাম।

মাথা ঝাড়া দিয়ে সোজা হতেই চোখে পড়লো একটা ছোট্ট শিশুর উপর। প্লাটফর্ম দিয়ে গুটিগুটি পায়ে দৌড়ে চলেছে পিছন পিছন ছুটছে হাসিমুখে বাবা। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে মনের মধ্যে খানিকটা স্নিগ্ধতার ঢেউ বয়ে গেলো। নিজের বাচ্চার মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মনের মধ্যে বাচ্চার স্পর্শ নিজেকে খানিকটা স্থির হতে সাহায্য করলো।

হঠাৎ করেই নিজের মধ্যে সূর্যোদয়ের মতো উদয় হলো অনুভবের অত্যুজ্জ্বল আলোক শিখা। মনে পড়লো রাত্রে নেশার ঘোরে নিখিলের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার কথা। এক লাখ টাকার বিনিময় আমি আমার পান্ডুলিপি নিখিলকে দিতে রাজি হয়েছি। আমার কাছ থেকে পান্ডুলিপি কিনে নিখিল নিজের নামে বই বের করবে। আমার লেখা কবিতা আমার নয় নিখিলের পরিচয়ে পরিচিত হবে। খিলখিল হাসির শব্দে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি সামনে দিয়েই শিশুটি টলোমলো পায় দৌড়ে যাচ্ছে। খানিকটা যেতেই হুড়মুড় করে পড়ে গেল, বাবা দৌড়ে এসে ওকে কোলে তুলে নিলো।

আবার চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার বাচ্চার হাসিমুখ। হঠাৎ চোখের সামনে বাচ্চার মুখ অভিমানে রিক্ত হয়ে উঠলো অভিযোগের সুরে আমাকে বলল, টাকার বিনিময়ে তুমি আমাকে বিক্রি করে দিলে? আমি নিঃশব্দে প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম, না-না-না আমি কখনোই এমন করতে পারি না, পৃথিবীর সব টাকার বিনিময়েও আমি তোকে বিক্রি করতে পারি না।

আমার বাচ্চা অভিমানে চিৎকার করে বলল, তুমি তো ঠিকই আমাকে বিক্রি করে দিয়েছ। লজ্জার ঘায়ে আমার মাথা আপনাআপনি নিচু হয়ে গেল। উপলব্ধি করলাম সত্যিই তো আমি তাই করেছি। প্রবল আবেগে শব্দের পর শব্দ গেঁথে জন্ম দেওয়া আমার প্রতিটি কবিতাই তো আমার নিজস্ব সন্তান। প্রতিটি কবিতাই কি আমি সন্তান ভেবে পিতার স্নেহে বুকের মধ্যে ধারণ করিনি জন্মের পর থেকে? অথচ কতো সহজে সামান্য টাকার বিনিময়ে আমি নিখিলের কাছে আমার কবিতা বিক্রি করে দিলাম। ছিঃ! নিজের সন্তানকেই বিক্রি করে দিয়েছি আমি টাকার লোভে। অপরাধবোধে আমার মাথা নেমে গেলো মাটির দিকে।

মাটির দিকে তাকাতেই ছায়ার মতো দেখতে পেলাম আমার বাচ্চা আর্তনাদ করে বলছে, বাবা প্লিজ, আমাকে বিক্রি করে দিও না, প্লিজ-প্লিজ-প্লিজ। এমন কাতর শব্দের ঘায়ে আমার সমগ্র অস্তিত্ব কেঁপে উঠলো, প্রাণপণে চেপে ধরলাম কান। নিঃশব্দে চিৎকার করে উঠলাম, না বাবা আমি তোকে কখনই বিক্রি করতে পারি না।

মনের মধ্যে দৃঢ় সংকল্প দানা বেঁধে উঠলো। প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা সোজা করে বসতেই দেখলাম সামনে দিয়ে শিশুটি গুটিগুটি পায়ে দৌড়ে চলে যাচ্ছে। শিশুটি দৌড়ে পার হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার সন্তানতুল্য কবিতা আমি কোনোভাবেই নিখিলের কাছে বিক্রি করবো না।

আমি অভাবী, তাই সই, তবুও টাকার লোভে নিজের কবিতা অন্য কারো হাতে তুলে দিতে পারবো না। সিদ্ধান্ত নেয়া হতেই হঠাৎ করে যেন বুকের মধ্যে থেকে চেপে ধরা পাষাণভার এক পলকে উধাও হয়ে গেলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার বাচ্চার হাসি মুখ। হাত বাড়িয়ে ডাকছে,

-বাবা-বাবা-বাবা।

আমার মুখে অনেকক্ষণ পর হাসি ফুটে উঠল, প্রবল স্বস্তির হাসি।

Read Previous

পুনর্জন্ম

Read Next

দুর্যোগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *