
চড়ুই জীবন
স্বাতী চৌধুরী
ও ঝর্ণা! আরে এট্টুক তাড়াতাড়ি কইরা আও রে গো!
বারান্দার সোফায় গা এলিয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আহমদ কবীর তার বউকে আকুল হয়ে ডাকে। সেই আকুলতার থোড়াই পরোয়া করে ঝর্ণা গজগামিনীর মতো হেঁটে এসে ধীরে সুস্থে সোফায় বসে। তার হাতে রূপা রঙ ঝিকমিক করা সুদৃশ্য পান সুপারির বাক্স। সে বাক্সটি সামনের টি টেবিলে রেখে, ট্রে থেকে নিজের চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলে, অত উতলা হইয়া ডাকতাছো যে!
সামনে চাইয়া দেখো!
সামনে কিতা?
আরে আগে দেখো না!
কই কিছু তো দেখতাছি না! আহমদ কবীরের হেঁয়ালিতে কিছুটা বিরক্ত হয়ে ঝর্ণা চায়ের মগে ঠোঁট ছোঁয়ায়। সামনে তাদের উঠান। গ্রামের বাড়ি হলেও বাউন্ডারিঘেরা। উঠানের দুপাশে ফুলের গাছ। বাউন্ডারি ঘেষে আম জাম কাঁঠালের গাছ। উঠানের শেষে কালো গেটের উপর দিয়ে যতদূর চোখ যায় তার সীমারেখায় সবুজ গ্রাম, তার উপরে শরৎ কালের ঝকঝকে নীল আকাশ। কিন্তু এসব দৃশ্যের কিছুই তো নতুন নয়।
তুমি কানা অই গেলায় নি? চউখের সামনে চড়াই দুইটারে দেখো না নি?
এবার ঝর্ণার নজর পড়ে চড়ুই দুটোর ওপর। তাদের উঠোনের ধুলায় চড়ুই দুটো গড়াগড়ি করছিল। আবার পাখনা থেকে সব ধুলো ঝেড়ে সাফসুতরো হয়ে উঠছিল যেভাবে মানুষেরা স্নান করে শুদ্ধ হয়। চড়ুই পাখির ধুলোস্নান দেখে সে হেসে ফেলে। বলে ওহ্ এইবার বুঝলাম! তা চড়া-চড়ির প্রেম দেখাইবার লাগি নি অত ডাকাডাকি?
কেনে চড়াই পাখির প্রেম বুঝি প্রেম নায়? শোনো গো ঝর্ণা, চড়াই ছোট হইলেও তারার প্রেম মোটেই ছোট না। জানো নি, একটা হাতিও তার হাতিনির লগে প্রেম করে। তেই তারার আকার আকৃতি বড় অইছে কইরা নিশ্চই তারার প্রেম বড় কইতায় না তুমি!
ও আল্লাহ্ একশ্বাসে সব কথা কইলিতাছো। আমারে কিছু কইতে দেও তে! আর আমি কোন সময় কইলাম চড়াই পাখির প্রেম ছোটো? আমি তো খালি প্রশ্ন করলাম, চড়াই পাখির প্রেম দেখাইবার লাগি অততা ডাকাডাকির কারণ কিতা?
ওহ্! কারণ জানতে চাওনি? আইচ্ছা গো সোনা, কারণ কইতাছি। কারণ বেশি কিচ্ছু না। আসলে তারার ইরকম প্রেম দেইখ্যা আমার খুব ভালা লাগতাছে। মনে চাইল এরার প্রেমলীলা তোমারে লইয়া দেখি। আমরাও তো দুই চড়াই চড়াইনি! কিতা কও!
ঝর্ণা আড়চোখে আহমদ কবীরকে চেয়ে দেখে। এক নিখাদ সরল আনন্দে উদ্ভাসিত মুখখানা তার। দেখে ঝর্ণার খুব মায়া লাগে। তার মনে পড়ে যায় – এই মানুষটা সংসারের যাঁতাকলে পড়ে জীবনে প্রেম করার সুযোগ পায়নি। সে কোমরটা একটু তেরচা করে এবার কবির আহমদের মুখোমুখি বসে তার কাঁধে একটা হাত রাখে। এতেই আহমদ কবীরের চোখ ছলছল করে ওঠে। সে ঝর্ণার আরেকটা হাত নিজের হাতে তুলে নেয়।
আহমদ কবীর শুনেছে, গোষ্ঠীর এবং গ্রামের কিছু লোক তাদের নিয়ে হাসাহসি করে। তাদের কেউ হাসতে হাসতে বলে, বাপরে বাপ! বুড়া বয়সেও তারার কী জাত প্রেম দেখলায়নি বা! বুড়াবুড়িরার বিয়া করারও কত শখ আছিল কও! চায়ের দোকানে, পুকুর পাড়ের জটলায় তাদের নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়–কিতা বা তারা কি বোঝোইন নানি যে, তারার গাঙ শুকাই গেছে, শুকনা গাঙে জোয়ার আইত না আর!
যে চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে এক কাপ চা খাওয়ার আনন্দ উপভোগ করার জন্য আহমদ কবীর আমেরিকায় থাকতে পারেনি সেই চায়ের দোকানের আড্ডাটাই এখন তাকে নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বলে সেখানে তার আর যেতে ইচ্ছে হয় না। আহমদ কবীর আনমনে বলে, সত্যি কি জীবনের গাঙ শুকাই যায়? জীবনের গাঙ নাহয় শুকাই গেলই কিন্তু মনের সরস ভাবও কি একবারে শুকাই যায়? যায় না ত! ঐ যে চড়া চড়ি দেখতাছো, তারা যুদি ধুলার মাঝে জীবনের রস খুঁজি পায় আমরা পাইতাম না কেনে গো ঝর্ণা?
তুমি মাইনষের কথায় কান দেও কেনে?
কানত দেই না। কানে ঢুকাইবার চেষ্টা করে যে মানুষ।
মানুষ তোমার কে?
কেউ না।
বেশ। অখন একটা কথা কই–
কও।
আমরার আশেপাশের কত ভরা গাঙের জীবন তো দেখলাম! তুমিও দেখতাছো। দেখলাম তো এরার কতজনার ভরা গাঙের জীবনেও যেন কত রস আছে! জানোনি এরার ঘরো না আছে প্রেম, না আছে মায়া মমতা, না কোনো আনন্দ! এর লাগি তারার মনের মাঝে খালি হিংসা আছে। আমরা বুড়া-বুড়ির চর পড়া জীবনেও যে ঐ চড়া-চড়ির মতো ধুলাময় শুকনা গাঙে অপার আনন্দ ইটা বুঝার সাধ্য তারার নাই!
আহমদ কবীর ঝর্ণার হাতে ধরা হাত নিয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। ঝর্ণার জ্বলজ্বলে চোখের তারায় প্রেমময় হাসির ঝিলিক তাকে বিভোর করে। সে চুয়ান্ন পার করা ঝর্ণার বলিরেখাহীন কপাল, মসৃণ ত্বকের টোলপড়া গাল আর টানটান চিবুক দেখে। মুগ্ধ হয়ে দেখে চড়ুই পাখীর মতোই নির্মেদ তার সারা দেহ। হঠাৎ তার মনে হয় তার ষাট বছরের জীবন থেকে কমসে কম ত্রিশ বত্রিশটি বছর ঝরে পড়ে গেছে। বত্রিশ বছর আগে বিয়ের পর পর দীর্ঘ এক বছরের প্রবাস জীবনের বিচ্ছেদ শেষে বাড়ি ফিরে এসে দ্বিতীয়বার যখন সে তার প্রথম স্ত্রীর কাছে ঘনিষ্ট হয়ে বসেছিল এখন ঠিক সেই মূহূর্তের অনুভূতিকেই উপলব্ধি করতে পারছে সে। যদিও এরকম অনুভূতির স্বাদ জীবনে সে খুব কমই পেয়েছে।
সংক্রামক রোগের মতো আহমদ কবীরের অনুভূতি সঞ্চারিত হলো ঝর্ণারও মনে। সেও অপলক দৃষ্টিতে আহমদ কবীরকে দেখে। দেখে খুব ধীর স্বরে বলে– চড়াই পাখির গল্প কি শেষ হই গেল?
আহমদ কবীর হেসে বলে চড়াই পাখীর গল্প শেষ হয় না। আমরার স্কুলোর প্রথম না দ্বিতীয় শ্রেণীর বইয়ের ‘ফূয়াদের গল্প বলা’ গল্পোর কথা তোমার মনো আছে নি?
খুব মনো আছে। ঝর্ণাও হেসে বলে, ঐ যে খালি ফুড়ুৎ আর ফুাড়ুৎ?
অয় অয়। তেই তোমারে চড়াই পাখীর প্রেমলীলা দেখাইতে ডাকছিলাম ওই একটাই কারণে গো ঝর্ণা! দেখো, চড়াই পাখিরা কেমন অল্পে তুষ্ট! ঐ এট্টুক খড় খুটার বাসা, ধুলার গোসল আর সামান্য খুদ কুড়া খাইয়া সারাদিন তারার কী ফুড়ুৎ ফাড়ুৎ আনন্দ!
হুম। তেঅইলে কইতাছো যে, আমরার জীবনেও অখন বেশি কিছু না থাকউক, খুদকুড়ার আনন্দ তো আছে নাকি?
আনন্দের চোটে হাসতে হাসতে ভেঙ্ঙ পড়ে ঝর্ণা। বলে, কবীর মিয়া, তুমি তো কবি অইগেছো গি! চড়াই পাখির মতো খুদ কুড়া খাওয়ার আনন্দর লগে মাইনষের জীবনের আনন্দ মিলাইত পারে খালি তারাই, যারা কবিতা লেখে। নেও নেও, একটা পান খাও। কবিত্বর ভাব আরও ঘন হইব নে। একটা পান সেজে আহমদ কবীরের হাতে দিয়ে সে নিজের জন্য আরেকটা পান সাজায়। পানের গায়ে চুন লাগাতে লাগাতে তার হঠাৎ মনে পড়ে- নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজনের মিটিং করার জন্য তাদের আজ বিকালে আলাকপুরের বুবুর বাড়ি যাওয়ার কথা।
আলাকপুর গ্রামের কথায় আহমদ কবীরের নিকট অতীতের গল্প মনে পড়ে যায়। এই আলাকপুর গ্রামে একটি বিয়েবাড়ির আমন্ত্রণে যোগ দেয়ার কারণেই আজ তার নিসঙ্গ নিরালম্ব জীবন এমন আনন্দময় হয়ে উঠেছে। সেদিন আলাকপুর গ্রামে সেই বিয়ে বাড়ির খানাপিনার আসরে বসে চকিতে দেখা একটি মুখ আহমদ কবীরের মগজে স্মৃতির সুরসুরি তুলে। স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে যখন আর তাকে মনে পড়ছিল না তখন সামনে দৃশ্যমান ঘটনা দেখতে দেখতে তার খুব বিরক্ত লাগে এবং কিছুটা ক্রোধের উদ্রেক হয়। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় গ্রামীণ জীবনযাত্রার ব্যাপক পরিবর্তন সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। তার নিজের ছেলেমেয়েদের বিয়ে গ্রামে হয়নি। তাদের সকলেরই ঢাকায় কম্যুনিটি সেন্টারে বিয়ে হয়েছে। বিদেশের পাট চুকিয়ে গ্রামে বাস করতে এসে গত কয়েক বছরে সে খেয়াল করেছে, প্রায় সব গ্রামের উঠানেই এখন শহুরে কায়দায় টেবিল সাজানো থাকে। টেবিল উপচে পড়ে অনেক পদের খাবারে। টেবিলে বসে যে যার ইচ্ছেমতো পছন্দের খাবারগুলো তুলে নেয় যেমন এখানেও নিচ্ছে। এই যে কেউ কেউ হামলে পড়ে সবটুকুই খাচ্ছে সেটা না হয় মানাই যায় কিন্তু কিছু লোক সবকিছু নিয়ে যে লাট সাহেবের ব্যাটার মতো এমন ফেলিয়ে ছড়িয়ে খাচ্ছে সেটা দেখে আহমদ কবীরের গা জ্বলে যায়। সে মনে মনে ভাবে, এই ব্যাটারা কি নিজেদের বাড়িতেও এমন করেই খায়? এরা কি এখনো বাপ দাদার হোটেলেই খায় নাকি নিজেরা রোজগার করে খায়? নিজে রোজগার করে খেলে এদের তো জানার কথা, এই খাবার জুটাতে গিয়ে গায়ের রক্ত কেমন জল হয়ে যায়!
বিয়েবাড়ির মালিকের প্রতিও রাগ হয় আহমদ কবীরের। সে মনে করে এত পদ খাবার আয়োজন করা মোটেই ঠিক নয়। দেশে এখনো কত লোক শুধু দুটো ডালভাতের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আর কত লোক তো দুবেলা শুধু ডালভাতও যোগাড় করতে না পেরে না খেয়ে থাকে! আর এরা কিনা সব লাটের বাট এখানে এসে একটুকরো খাচ্ছে তো তিন টুকরো ফেলে দিচ্ছে! নিজেকে শুনিয়ে সে বলে, যদি এই লোকটা আমার নিজের কেউ হতো না, বেশ করে দুকথা শুনিয়ে দিতাম। তাতে লোকে যে যাই বলতো! বিড়িবিড় করতে করতে আহমেদ কবীরের পুরনো কথা মনে পড়ে যায়! দুবেলা ভাতের কষ্ট যাতে না হয়, সেজন্য পড়াশোনা বাদ দিয়ে, পরিবার পরিজন, মাতৃভূমি ছেড়ে জীবনের মহামূল্যবান সময়টাই তাকে বিদেশ বিভূঁইয়ে কাটাতে হয়েছে। কুয়েত আর ওমানের শেখদের উটের বাথানে কত উটের ময়লা পরিষ্কার করে, খেজুর বাগানের কাঁটার কত খোঁচা খেয়ে কাজ করে তবেই না বাড়িতে টাকা পাঠানো যেত! সেই টাকা দিয়েই না পরিবারের লোকের ভাতকাপড় জুটেছে। আর এরা পরের বাড়িতে দাওয়াত খেতে এসেছে বলে খাবার অপচয় করে! মনে মনে ধিক্কার জানায় সে তাদের।
বিয়ে বাড়ি হলেই মানুষকে কেন এত খেতে হবে আর খাওয়াতে হবে এটা কোনো যুক্তিতেই মানতে পারছে না আহমেদ কবীর। হ্যাঁ দুএকটা ভালো মুখরোচক পদ না হয় করাই গেল। তাই বলে এত? খেতে খেতে এসব দেখে দেখে আহমদ কবীরের মনটা খিচিয়ে গেল। খাওয়া শেষ করে সে একটু তফাতে বসে রইল। এত মানুষের ভিড়ে এখানে তেমন পরিচিত মানুষ চোখে পড়ছে না। চকিতে দেখা মুখখানা আবার তার মগজে সুরসুরি তোলে। সে অপেক্ষা করছে যাওয়ার আগে এ বাড়ির মুরুব্বি আজগর আলী চাচার সাথে একটু কথা বলার আর এই ফাঁকে যদি সে মুখখানা আবার সামনে এসে দাঁড়ায় তার জন্যও। সামাজিক অনুষ্ঠানাদি ছাড়া আজকাল তো আত্মীয় স্বজন বন্ধুদের বাড়িতে আসা দূরে থাক, যোগাযোগও হয় না। বিশেষ করে মুরুব্বীদের সাথে তো একেবারেই না। আহমদ কবীর আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুদের বাড়ি এলে মুরুব্বীদের সাথে যতটা পারে সময় দেয়। কথা বলে। তাতে মুরুব্বীগণ খুশিও হন আর সম্মানিত বোধ করেন।
বিয়েবাড়ির খানাপিনার এসব কথা বছর খানেক আগের। আহমেদ কবীরের বাড়ি আলাকপুর গ্রামের পাশের গ্রাম আমবাড়িয়ায়। তবে তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা বিশমাইল দূরের ধানতলিয়া গ্রামে। তার ছেলেবেলার বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া শান্ত নদীটি যে কোনোদিন এমন দূরন্ত হয়ে উঠবে আর অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে নদীর তলদেশে ডুবিয়ে দেবে কেউ কখনো ভাবেনি। আহমদ কবীরও ভাবেনি। ধানতলিয়া গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার পরে আমবাড়িয়া গ্রামে এসে তারা নতুন আবাস গড়েছিল সেও অনেকদিন আগের কথা। তখনও বিয়ে হয়নি আহমদ কবীরের। এই আলাকপুরে চাচা ও মামার বৈবাহিক সূত্রে তাদের দুচারঘর আত্মীয় স্বজন আছে। তাদেরই এক ঘরের ছেলের বিয়ে উপলক্ষ্যে আজ এখানে আসা। বিয়ের বরযাত্রী যাওয়া হয়নি। বৌভাত উপলক্ষ্যে এই খানাপিনার দাওয়াতে আর না এসে উপায়ও ছিল না। বরের পিতা নিজে গিয়ে দাওয়াত দিয়েছিল। এমন দাওয়াতের কারণ শুধু আত্মীয়তার ঘনিষ্টতাতেই নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান ও কুয়েতে তারা দুজন বহুবছর একই খেজুর বাগানে, পশু শালায় কাজ করেছে। আবার একই ছাদের তলায় থেকে একই হাঁড়িতেও রেঁধে খেয়েছে। যেকারণে দুজনেই দুজনের জীবনের বহু সুখদুঃখের সাক্ষী হয়েছে। খাওয়াদাওয়া শেষে এককোণে বসে এহেন বন্ধু ও তার পিতার কাছে থেকে বিদায় নেয়ার জন্য অপেক্ষার সময় সেই চকিত দেখা মুখটি এবার একদম চোখের সামনে পড়ল। কারো সাথে কথা বলতে গিয়ে এবার তার পান খেয়ে লাল করা ঠোঁটে চপল হাসি উপচে পড়ছে। খুব যেন চেনা চেনা লাগলো। কিন্তু চেনার আগেই মুখের অধিকারী সরে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে আবার একটু মুখ ঘুরাতেই চেনাটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। অনেক দূর সময়ের চেনা। তবু এই চেনা যেন অল্প চেনা নয়, বহুদিনের চেনা মনে হলো। কিন্তু নাম ধাম কিছুই মনে পড়ছে না। শেষে লাজের মাথা খেয়ে বলেই ফেলল- ওগো বইন ওবায়দি এট্টু আওচাইন দেখি!
চেনা মুখের নারী এগিয়ে এলে আহমদ কবীর সকল দ্বিধা সংকোচ ঝেড়ে বলে, ও বইন! কিচ্ছু মনে না করো যুদি একখান কথা জিগাই? চেনা চেনা বোন হেসে সায় দিল।
-বলি তোমার নাম কিতা আর বাড়িটা কোনানো আছিল আমারে এট্টু কইবায়নি? তোমারে বড় যে চিনা চিনা লাগতাছে তাও ইয়াদ আইতাছে না।
সেই চিরচেনা হাসির জন এবার মুখ ঘুরিয়ে প্রশ্নকর্তাকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে দেখে। দেখে আর তার চোখের পলক পড়ে না। অনেকক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে তার মুখে হাসি ফুটে। আমার যুদি ভুল না অয়, তেঅইলে তুমি ধানতলিয়ার কবীর ভাই! ঠিক কইছি নি কও আগে?
আহমেদ কবীর লজ্জা পায়। এখনো সে তার নাম ধাম কিছু মনে করতে পারছে না। অথচ সে ঠিকই চিনে ফেলেছে। লজ্জিত মুখে বলে তুমি তো ঠিকঅই চিনিলাইছো কিন্তু আমার যে তোমার নাম ইয়াদ অইতাছে না।
কবীর ভাই আমি ঝর্ণা। কাউয়াজুরির আরব আলী বেটার ফুড়ি।
হায় হায় কী কাণ্ড দেখো। এর লাগি তো কই অত চিনা চিনা লাগের কেনে? সত্যি বয়স অইগেছেগি গো বইন! কিচ্ছু মনো রাখতাম পারিনা অখন আর।
‘অথচ স্কুলো ভালা ছাত্র কইয়া তোমার কত সুনাম আছিল কবীর ভাই। স্যারোরা একবার পড়া কইয়া দিলে লগে লগে তোমার মুখস্থ অই যাইত।’ হাসতে হাসতে ঝর্ণা বেগম বলে- নিজেরে অত দোষ দিওনা কবীর ভাই! কত বছর আগের কথা কও দেখি চাইন। কিলা মনো থাকবো অত? তবু যে আমার হাসি দেখি আমারে তোমার চিনা চিনা লাগলো ইটাই বা কম কিতা?
কথা এক্করে ঠিক কইছো। তবে স্কুলোর ভালা ছাত্রী হিসাবে তোমার সুনামও কম আছিল না! অখন আমারও সব মনো পড়তাছে। আইচ্চা পুরান কথা পরে কইমুনে। অখন কও দেখি কেমন আছো? কই থাকো? ইকানো কিলা কিলা আইলায়?
আহমদ কবীরের প্রশ্নগুলোর উত্তর কঠিন নয় তবু ঝর্ণা বেগমের মুখে সহসা কোনো উত্তর আসে না। জটিল ঠিকানা ও অবস্থানের কথা বলতে একটু ভেবে নিতে হলো তাকে। বলল ভালামন্দ জানি না কবীর ভাই। তবে ভালা থাকার চেষ্টা করি। আর ইখানো কিলা আইলাম? আসল কথা অইল আমি অখন ইখানোই থাকি। সিফাত- ঐ তুমি যার বিয়া তো আইছো, হে আমার বইনপুত লাগে। সিফাতের মা আমার বড় মামার ঘরের বইন। আমি একলা থাকি দেইখ্যা আপায় আমারে ইখানো নিয়া আইছইন।
এমন হাসিখুশি মানুষটা একা বলে কারো আশ্রয়ে থাকে, ভেবে আহমদ কবীরের মনটা খারাপ হয়ে যায়। একলা কেনে, তোমার সংসার, ছেলেমেয়ে নাই?
ঝর্ণা হেসে বলে, আছে। তবে একলা থাকার কারণ অইল, আমার তিন মেয়ে তিন দেশো থাকইন। একজন সৌদি, একজন ইতালি আরকজন তুর্কির দেশো। জামাইরায় নিয়া গেছইন তারারে। মেয়েরার বাপ নাই আইজ সাত বছর অইছে। আমার তিনো মেয়ে আমারে তারার ধারো নিয়া যাইতা চাইন। গেছলামও একবার। ইতালির জনের কাছে। ওখানো গিয়া এট্টুও ভালা লাগল না। চাইরদিকে অচিন ভাষা, অচিন কালচারর মানুষ। এক মেয়ে আর জামাইর লগে কথা কইয়া কইয়া কত আর সময় কাটে কও? একবছর থাইক্কা দেশও আইলাম। না, বাকি দুই দেশো অখনো গেছি নায় যুদিও, কিন্তু মনো অয় না খুব একটা ভালা লাগব। তারারে কইছি বেড়াইবার লাগি একবার যাইমুনে। কিন্তু যাওয়া আর অইছে না। অখন একলা একলা থাকলেও ভয় ভয় লাগে। আমার বিষয় সম্পদও বেশি কিছূ নাই। কিন্তু ঐ অল্পবিস্তর বিষয় আশয়ও কাল অই গেছিলগি। জ্ঞাতিগোষ্ঠীর অত্যাচারে কই যাইমু দিশা পাইনা যখন, মামার ঘরের বইন কইল তুই আমার ওখানো আইয়া থাক। তেই আইলাম।
তেই তোমার বিষয় আশয়ের কিতা অইল?
সিফাতের বাপে গিয়া বেইচ্যা আইনছোইন কিছু। ঐ টেকা ব্যাংকো ফালাইয়া থইছি। মেয়েরাও মাঝে মাঝে যা পাঠায় সব ঐ ব্যংকোই পইড়া আছে। কুনো কামো লাগে না। এরানু আমার থাকি একটা টেকাও নেয়না। আমি বড় শরমর মাঝে আছি।
তোমার বাপের বাড়ি গেলায় না?
কই যাইমু। আম্মা, ভাই-ভাবি কেউ নাই। ভাইপুতাইন আছইন। তারারও ফুফু আম্মার লাগি অত মায়া নাই। আইচ্ছা আমার কথা তো সব কইলাম। অখন তোমার কথা কও।
কিছু না বলে আহমেদ কবীর শুধু হাসে। করুণ সে হাসির মাঝে আনন্দেরও ঝিলিক আছে।
অমা! আমার কথার উত্তর না দিয়া হাসতাছো কেনে?
হাসতাছি গো বইন কারণ তোমার দুঃখের লগে আমার দুঃখের কথাও মিলি গেল যে! জানো, সবকিছু থইয়াও তোমার মতো আমারও যেন কেউ নাই, কিচ্ছু নাই!
ওহ্ ই কথা? তেই দুঃখের কথায় বুঝি কেউ হাসে?
হাসে।যখন দুই দুঃখীর কথা একজাগাত মিলি যায় তখন দুঃখে দুঃখে যোগ হইয়া হাসি অই যায়। স্কুলোর পড়ালেখা ভুলি গেচো নি? ক্লাস সেভেনো উঠি আমরা যে এলজেব্রা অঙ্ক করতাম- প্লাসে প্লাসে প্লাস, প্লাসে মায়নাসে মায়নাস। আর মায়নাসে মায়নাসে কী আছিল মনো আছে নি?
ঝর্ণাও এবার হাসে। খুব মনো আছে। মায়নাসে মায়নাসেও প্লাস। আমরা সূত্রটা মুখস্থ করতাম।
তেই আমার কথা ভুল অইলনি কও? দুঃখে দুখে মিলিয়া হাসি।
বিয়ে বাড়িতে কত লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঝর্ণা ও কবীর অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে যাচ্ছে। ছড়ানো ছিটানো মানুষগুলো তাদের খেয়াল করছে কি না সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই দুই সহপাঠীর। দীর্ঘ চার দশক পর অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হয়ে যাওয়ার আনন্দে তারা এখন পারিপার্শ্বকে ভুলে গেছে।
আহমদ কবীরের কথায় ঝর্ণা আবারও হেসে ওঠে। তুমি বড় মজার মানুষ কবীর ভাই। এক্কেরে আগের মতোই।
দেখলায়নি অখন তুমিও কুনু হাসতাছো। দুঃখে দুঃখে হাসি অয়।
আইচ্চা বেশ! দুঃখে দুঃখে হাসি অয়! অখন কও তোমার দুঃখের কথা।
কথা খুব সামান্যই গো ঝর্ণা। তোমার মতো আমার ছেলে মেয়েরাও প্রবাসী। তারা চিরদিনের লাগিই দেশ ছাড়ি দিছে। যে দেশও আছে ওখানোর সিটিজেনশীপ পাইলাইছে তারা। আর ই দেশো থাকবার লাগি আইতো নায়।
শুনতে শুনতে ঝর্ণার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়।
জানোনি গো ঝর্ণা আমার দুই ছেলে আর এক মেয়েরে বড় শখ কইরা লেখাপড়া শিখাইছলাম। তুমি তো আর জানো না, মেট্রিক পাশ দিয়া যে আমি কলেজো ভর্তি অইছলাম কিন্তু কলেজোর পড়া আর শেষ করতাম পারলাম না! আব্বায় কইলা কলেজোর পড়া বাদ দেও। সংসার চলে না, পড়া অইব কেমনে? আমি পড়ার লাগি জোরাজুরি করতে চাইলে আব্বার অভিমান অইল। কইলা, হোনরে পুত, অতবড় সংসার আমার পক্ষে আর চালানি সম্ভব না। তুমি বড় অইছো। অখন সংসারের হাল ধরণ লাগবো! মনের কষ্ট মনর মাঝে লইয়া পড়া ছাইড়া ওমান গেলাম। কত যে কষ্টের কাম গো ঝর্ণা কিন্তু পয়সা দেয় না। আমার কষ্টের পয়সা দালাল নিয়া যায়। ওখান থাকি গেলাম কুয়েত। একদিন ভাগ্য মুখ তুলি চাইল। পরিশ্রম করলে পয়সা আয়। যাই হোক মা বাপরে খুশি করলাম। এরপরে বিয়াও করলাম। বড় ভালা মানুষ বউ। কিন্তু একলগে থাকার ভাগ্য বিদেশিরার কপালে নাই। ছেলেমেয়ে অইল। ভাবলাম আমার ছেলেমেয়েরার যেন অভাবের কারণে পড়ালেখা বন্ধ না হয়। তার লাগি গো সোনা বচ্ছরের পর বচ্ছর, বচ্ছরের পর বচ্ছর, বচ্ছরের পর বচ্ছর পড়ি রইলাম কুয়েত।
তারার লেখাপড়া হইলো?
খুব হইছে।
ছেলেমেয়েদের কথা বলতে গিয়ে আহমদ কবীরের মুখ গৌরবের আনন্দে উদ্ভাসিত হয়।
বুঝলায়নি ঝর্ণা, আমার মনের আশা ততখানই পূরণ অইছে যতখান আমি আশা করতেও জানতাম না। ই দেশর পড়া শেষ কইরা আমার ছেলেমেয়েরা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়া আরো পড়ালেখা করছইন। অখন তারা দুই জন ঐসব দেশের বড় ইঞ্জিনিয়ার আর একজন প্রফেসার।
আহমদ কবীর একটু থামে। আনন্দের মাঝেও কোথাও একটা শূন্যতার ভার তার মনে এসে ভর করে। জানো ঝর্ণা, আমার ছেলেমেয়েরা খালি পড়ালেখায় না তারা সত্যি খুব ভালা মানুষও হইছে। আমারেও তারা নিজেরার কাছে নিয়া রাখতো চায়। একবার গেছলাম আমেরিকা। মানুষ কয় স্বপ্নের দেশ বুলে আমেরিকা। সত্যই স্বপ্নের মতোই সুন্দর এক দেশ। সুযোগ সুবিধাও অনেক। কিন্তু গো বইন ইতা আমরার লাগি না। আমার যুইত লাগছে না হখানো থাকতে। দুই চাইরদিন বা মাস খানেক থাকা যায়। কিন্তু অবসর জীবনে ঘুম থকি উইঠ্যা সকাল বিকাল চাস্টলো বইয়া যুদি চিনা পরিচয় বন্ধুরারে লইয়া এক সিঙ্গল চা খাওয়া না গেল তো এমন স্বপ্নের দেশো থাকলেও সুখ নাই।
আমেরিকার তিনমাসের জীবনে আহমদ কবীরের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল। ছেলে, ছেলের বউ সারাদিন বাইরের দুনিয়ায় কর্মব্যস্ত থাকে। ঘরে এসেও তাদের অনেক কাজ। ছেলে বলে দিয়েছে বাড়ির পাশে যে একটা লেক সংলগ্ন পার্ক আছে সেখানে সকাল বিকাল গিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে। কিন্তু একা একা কত আর তা ভালো লাগে। আরো দুইচার জন বুড়াবুড়িও যে সেখানে ছিল না তা নয়। কিন্তু তারা ইন্ডিয়ান। হিন্দি ভাষায় কথা বলে। ইংরেজি কিছু কিছু বুঝলেও হিন্দি ইংরেজি কোনোটাই বলতে পারে না কবীর আহমদ। ইশারা ইঙ্গিতে, কখনোবা একটু হাসিতে ভাব বিনিময় হয় বটে, তাতে কি আর প্রাণের স্পর্শ মিলে? অস্ট্রেলিয়ায় বাস করা ছেলে মেয়ে জামাই কতবার বলেছে আব্বা এসো। অন্তত দেশটা দেখে যাও। আহমদ কবীর রাজি হয়নি। ছেলে মেয়েরা আসে মাঝে মাঝে। কখনো একা, হঠাৎ কখনো তিনজন মিলে একসাথে আসে। তখন খুব আনন্দ হয় আহমদ কবীরের। এছাড়া আনন্দের কোনো উপলক্ষ্য আর নেই। এখন শুধু সেই দিনগুলোর অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে থাকা।
হুম! বোঝলাম তোমার আর আমার এক দশা। হক্কলই আছইন আরকবার কেউই নাই। ঐযে কয় না, থইয়াও নাই! যার লাগি অখন আমরার পররে আপন কইরা জোড়া তালি দিয়া থাকন লাগে। কি করবায় কও? কপালো যা লেখা আছে তাতো মানন লাগবোই।
নাগো বইন আমি আর দুঃখ করি না। পর আপন বোধও আমার আর নাই। কিয়ের পর আর কিয়ের আপন? মায়া থাকলে সবই আপন। মায়া না থাকলে আপনও পর হয়।
আহমদ কবীরের সাথে সহমত পোষণ করে ঝর্ণা। মামাতো বোন আয়শা বুবু তার বর ও ছেলে সিফাত ইফাতের আদর ও মায়ায় সে ভুলে যায় যে, ওরা তার ছেলে না বোনপো। মামাতো বোনের পরিবারের সকলের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে ঝর্ণার মুখখানা জুড়ে ঔজ্জ্বল্য ছড়ায়। কিন্তু আহমদ কবীরের মনটা হঠাৎ বিষাদে ভরে ওঠে।
সেটা খেয়াল করে ঝর্ণার মনে হয়, আহমদ কবীরের মনে অনেক দুঃখ আছে। যে সংসারের উন্নতি ও বউ বাচ্চার সুখের জন্য লোকটা সারাজীবন ঘর সংসার ছেড়ে দূরে থাকল, অবসরে যখন দেশে ফেরার সুযোগ হলো তখন না পেল সেই সংসার, না রইল বউ বাচ্চা।
সবই কপাল কবীর ভাই। সংসারে সব কিছু নিজের হাতে থাকে না। যত শক্ত লড়াই করো না কেনে ভাগ্য সবসময় সব জাগাত জিততে দেয় না মানুষরে! ঝর্ণা লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ে।
জবাবে আহমদ কবীরও কেবল একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে স্বগতোক্তির মতো বলে, ভাগ্য! হুম ভাগ্যর লগে কে কোনোদিন পারছে? তাইলে আমিই বা পারমু কেমনে। থাউক। দুঃখ-টুঃখ নাই আমার। খালি একলা থাকতে খারাপ লাগে আর কি! অয় ইকথা তো সত্যিই যে অতদিন বিদেশ আছলাম একলা একলা। অখন দেশও আইছি , তাও একলাই রইলাম! এর লাগি দেশ আর বিদেশ আমার কাছে অখন একরকমই। তবে পার্থক্য একটা তো আছেই, বিদেশে থাকতে আশা আছিল যে একদিন কর্তব্য শেষ অইলে দেশও যাইমু। ছেলেমেয়ে পরিবার সবরে লইয়া একসাথে থাকমু। কিন্তু অখন আর কোনো আশাও নাই!
ঝর্ণা আর কিছু না বলে চুপ করে থাকে। আহমদ কবীরের জন্য তার খুব কষ্ট হয়। সহসা নিজের সব কষ্ট তুচ্চ মনে হয় তার। তার আরও মনে হয় আহমদ কবীরের সাথে শুধু তার দুঃখের মিল একটাই যে তাদের উভয়ের ছেলেমেয়েরা প্রবাসী আর জীবনসঙ্গী বিগত হয়েছেন কিন্তু তবু দুজনের দুঃখের ব্যাপ্তি এবং ধরণ সমান নয়। তার বর যতদিন জীবিত ছিল ততদিন তাদের মাঝে কখনো বিচ্ছেদ ছিল না। মেয়েরাও যতদিন বিদেশ যায়নি কাছাকাছিই ছিল। তারা মা-বাপ মিলে মেয়ে তিনজনকে একসাথে বড় করেছে। সকলকে নিয়ে একসাথে হাসি আনন্দে অনেকগুলো বছর কাটিয়েছে। আজকে তার এই যে নিঃসঙ্গতা বা একাকীত্ব, সবই তো সাম্প্রতিক। কিন্তু কবীর আহমদ এর সারাটা জীবনই যে নিরবচ্ছিন্ন দুঃখের! নিরবচ্ছিন্ন একাকীত্বের! বছরের পর বছর বিদেশ বিভূঁইয়ে প্রিয়জনের সান্নিধ্যবিহীন একাকী জীবন কাটিয়েছে সে। বিয়ের পর কখনো স্ত্রীর সাথে তার একটানা দুতিনমাসের বেশি থাকা হয়নি। ছেলেমেয়েদের জন্মানো, বড় হওয়া দেখা হয়নি। সকলকে নিয়ে একসাথে টানা একবছরও থাকা হয়নি সারাজীবনে। যখন বিদেশের পাট ঘুচল, তখন ছেলে মেয়ে হয়েছে প্রবাসী আর স্ত্রী চলে গেছে না ফেরার দেশে! তবে ঝর্ণা তার এই কষ্টের উপলব্দি প্রকাশ করে ব্যথিতজনের ব্যথার জায়গায় আঘাত না দিয়ে উল্টো কথা বলে- কবীর ভাই, বীজগণিতের ভাষাতেই কইতাছি, জীবনটা আসলেই প্লাস মায়নাসের খেলা। তবে তুমি ভাই একজন স্বার্থক বাপ। তিন তিনটা ছেলে মেয়েরে যোগ্য কইরা গইড়া তুলছো। ইটা কয়জন পারে?
আহমদ কবীর হাসে। আরে না! আমি আর গড়লাম কই গো বইন? ছেলেমেয়েরা তারার যোগ্যতায় যোগ্য হইছইন। এরপর যুদি কারওর অবদানের কথা কইতেই হয় তবে তারার মা’র কথাই কওন লাগে। তাইনও বড় কষ্ট করছইনগো বইন। আমার অবর্তমানে একলা একলা গোটা সংসার সামলাইয়া তারারে মানুষ করছইন। বড় কঠিন কাজ ছিলগো ঝর্ণা। অনেক ত্যাগ তাইনও করছইন।
তাতো করছইনই। কিন্তু তুমি করছো না, ইতা কিতা কও কবীর ভাই? তুমি যুদি টেকা পয়সা না পাঠাইতায় এমনে কী আর অইত! তোমরা দুইজন মিইল্যাই সব করছো। সংসার সামলানি একলার কাজ হইলে তোআর জোড়া বান্ধন লাগত না!
ই ঠিক আছে। যুদিও সারা জীবন টাকার পিছে ঘুরছি তাও আমি মনে করি খালি টেকায় সবকিছু হয় না। কত টেকাওয়ালা লোকত আছে আমরার আশেপাশে তারার ছেলেমেয়েরা কী আমার ছেলেমেয়ের মতো হইছে? এর লাগি কই, সব কৃতিত্ব আমার ছেলেমেয়ে আর তারার মা’র।
আহমদ কবীরের মুখে নিজের মৃত স্ত্রীর প্রশস্তি ঝর্ণার খুব ভালো লাগে শুনতে। তার বরও তাকে ভালোবাসত, বিশ্বাসও করত। তবে এরকম প্রশংসা করেছে শোনেনি কোনোদিন। হয়তোবা করেছে তার আড়ালে তাই জানতেও পারেনি। যা আর কোনোদিন জানাও সম্ভব নয়।
আবার একদিন বেড়াতে আসবে এই কথা দিয়ে সেদিন আহমদ কবীর চলে যাওয়ার সময় তার ইচ্ছে করছিল আরো খানিকটা সময় ঝর্ণার সাথে বসে গল্প করতে। কিন্তু বিয়ে বাড়ির এত লোকের মাঝে বসে কেবল একজনের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বললে সেটা অশোভন দেখায় ভেবে আর থাকতে পারেনি।
একদিন সিফাতের বাবা রফাত এর সাথে বসে গল্প করার সময় ঝর্ণা বেগম হাঁসের মাংস ভুনা আর ছিটা রুটি এনে টেবিলে রাখলে কবীর আহমদের পূরনো দিনের কথা মনে পড়ে। সেই স্কুলে পড়ার সময় কোনো একদিন সকালবেলা সে বাবার সাথে ঝর্ণাদের বাড়িতে গিয়েছিল। ঝর্ণার বাবার সাথে তাদের জমিজমা সংক্রান্ত কোনো কাজ ছিল সম্ভবত। সেদিন ঝর্ণার মা ছিটা রুটি আর হাঁসের মাংসভূনা খেতে দিয়েছিলেন। হামলে পড়ে খেয়েছিল কিশোর কবীর। সেকথা মনে করেই কি ঝর্ণার এই আয়োজন! এ বাড়িতে এসব খাবার দাবারের আয়োজন যে ঝর্ণার ইচ্ছেমতো হয় সেটা এতদিনে জানা হয়ে গেছে। এখন সিফাতদের বাড়িতে একটু ঘনঘনই আসা হয় তার। সেটা যে ঝর্ণার টানে একথা বুঝতে মনে হয় এবাড়ির আর কারো বাকি নেই। কিন্তু তাতে থোড়াই পরোয়া করে সে। ঝর্ণাও যে তাতে বিব্রত নয় সেটা বোঝা যায় তার এই আদর আপ্যায়নে।
হাঁসের মাংসভুনা দিয়ে ছিটারুটি খেতে খেতে রফাত মিয়া মুচকি মুচকি হাসে। ঝর্ণা বেগম রান্নাঘরে। বারান্দার আড্ডাখানার খাওয়ার টেবিলে রফাত মিয়ার পাশে বসা ছিল সিফাতের মা। এই মুচকি হাসির রহস্য বুঝতে না পেরে সে ডান কনুই দিয়ে বরের বাম কনুইয়ে একটা গুঁতো মারে।
গুঁতা মারছো কেনে?
তুমি হাসতাছো কেনে?
একটা কথা ভাবতাছি।
কিতা ভাবতাছো ওটাইত জানতাম চাই।
আইচ্চা? তেঅইলে কই। আগে হোনবায় তারপরে মতামত দিও। মাঝখানো কোনো কথা কইবায় না।
ঠিক আছে কও।
তোমার বইন ঝর্ণার লগে কবীর ভাইয়ের বিয়া দিলে কেমন অয়?
রফাত মিয়ার ভাবটা এমন যেন ওখানে আহমদ কবীর নেই। কথোপকথন হচ্ছে কেবল তাদের দুজনের মাঝে। আহমদ কবীর অবাক হয়ে বন্ধুর মুখের দিকে চেয়ে থাকে।
কেমন হয় মানে? খুব ভালা হয়। আমার মনের কথা কইছো তুমি। আসলে ঝর্ণাটা তাও তো আমরার লগে থাকে। কিন্তু কবীর ভাইয়ের লাগি আমার খুব মায়া লাগে। বেচারা এক্করে একলা একলা মনমরা দিন কাটায়।
এর লাগিই ভাবলাম কথাটা। আমরা থাকতে আমরার প্রিয় দুইজন মানুষ একলা একলা জীবন কাটাইব ইটা তো চলতে দেওয়া যায় না। অখন তুমি কী কও কবীর ভাই?
কবীর আহমদ আকস্মিক এই প্রস্তাবে কিছুটা তথমত খায়। ঝর্ণার টানে তার এখানে ঘনঘন আসা হয়, ঝর্ণার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে এসবই সত্যি। কিন্তু তাকে বিয়ের কথা মাথায় আসে নি তো।
আরে কবীর ভাই কিছু তো কও!
কী কইমু?
কী কইবায় মানে? তুমি রাজি কিনা জিগাইতাছি…
কিয়ের রাজি-অরাজি দুলাভাই? ততক্ষণে ঝর্ণাও চায়ের ট্রে এনে টেবিলে রাখতে রাখতে কিছু একটা রাজি হওয়ার বিষয় শুনতে পেয়েছে।
আইচ্ছা তুমিও আইছো! ভালা অইছে। অখন গো বইন তুমিও কও রাজি কি না?
আরে আগে তো কও কীয়ের রাজির কথা কইতাছো?
ঝর্ণা তার বড় বুবু, দুলাভাই রফাত মিয়া আর আহমদ কবীরের দিকে চেয়ে কিছু বুঝতে পারে না।এদের দুজনের মুখে দুষ্টু হাসির ঝিলিক আর আহমদ কবীর বিব্রতমুখে কিছু বলতে গিয়ে থেমে আছে।
আরে কবীর ভাই শরমিন্দা হইবার কিচ্ছু নাই, চা খাও, সিফাতের মা আর ঝর্ণা তুমি তাইনও চা লও। চা খাইতে খাইতে কইতাছি।
চায়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির একটা আওয়াজ তোলে রফাত মিয়া। হোনো ঝর্ণা, কবীর ভাইরে কইছি, অখন তোমারেও জিগাই- আমরা ঠিক করছি তোমরা দুইজনরে দুইজনের লগে বিয়া দিমু তবে যুদি তোমরা রাজি থাকো।
ঝর্ণা সলাজ কটাক্ষে বলে- ধুর! বুড়া অইগিছইন তাও খালি ডঙের কথা!
নারে ঝর্ণা, ইতা ডঙডাঙের কথা না। আমরা হাছাই কইতাছি। দেখ তোর আর কবীর ভাই-এর জীবনটা এমন এক জায়গায় দাঁড়াইছে বুল্যাইয়াই আমরা এমন চিন্তা করলাম। আইজ তোরার সব থইয়াও কেউ নাই! দুইজনেই একলা। একলা দুইজন দুইজনের সাথী হইলে তো আর কেউ একলা থাকে না! ঠিক কি না?
আমি আর একলা কই? তোমরা তো আছোই!
আমরা তো আছিই কিন্তু ই থাকা আর দুইজন মানুষের এক থাকার মাঝে বেশকম আছে তো নাকি? আর একটা কথা, তর না হয় আমরা আছি, কবীর ভাই তো খুব একলারে! তার তো একজন সঙ্গী দরকার?
তে কবীর ভাইরে কে না করছে? ধরুক না একজন সঙ্গী। এবার ঝর্ণার মুখে হাসি ফুটে।
রফাত মিয়া ঝর্ণার কথার জবাব না দিয়ে বন্ধুর উদ্দেশ্যে বলে কবীর ভাই এইবার তুমি কিছু কও!
সেদিন আহমদ কবীর চুপ করে সবার কথা শুনেছিল। নিসঙ্গতার যন্ত্রণা মাঝে মাঝেই তাকেও কষ্ট দেয় বৈকি কিন্তু এই বয়সে ছেলেমেয়েদের বিয়ে শাদির পর আবার বিয়ে করার কথা সে ভাবেনি কোনোদিন। তাকে চুপ থাকতে দেখে রফাত মিয়া বিষয়টি বুঝতে পারে। আরে ভাই যখন শরীরে মনে তাকদ আছিল তখন বিদেশে আমরা বছরের পর বছর তো একলাই থাকছি নাকি! কোনো অসুবিধা কী হইছে? হইছে না। কিন্তু অখন বয়স হইছে বলেই না একলা থাকাটা অসুবিধা। আমার সংসারোতো ছেলেমেয়ে, ছেলের বউ আছে, মেয়ে জামাই নাতিনাতনিও আসা-যাওয়ার মাঝে আছে। সবরে লইয়া আমার ভরাপুরা সংসার। কিন্তু তারপরেও সিফাতের মা কয়দিন বাড়িত না থাকলে আমার সব শুন্য লাগে। আমার মনে কয় কি আমি না থাকলেও সিফাতের মার এমনই লাগে। ভাইরে জীবনে সঙ্গী বা সাথী বা জামাই বউ যাই কও না কেনে বয়সকালেই বেশি দরকার। আমি কই কি তোমরা কোনো শরম ভরম না কইরা বিষয়টা নিয়া ভাবো।
সিফাতের মা, চলো আমরা ঘরো যাই। এরা দুইজন অখন বইয়া বইয়া ভাবনা চিন্তা কইরা নিজেরা ফয়সালা করোউক। যদি তারা রাজি হয় তারপর আমরা যা করার করমুনে।
তারা দুজন চলে গেলেও সেদিন আহমদ কবীর ও ঝর্ণা দুজনেই চুপ করেছিল অনেক্ষণ। একসময় ঝর্ণা বেগম নিরবতা ভাঙে। তুমি চুপ করি রইছ কেনে কবীর ভাই? তোমার কি সত্যি কিছু কওয়ার নাই?
আছে তো। রফাত ভাই আর ভাবি যখন তারার মনের আগল খুলিয়া দিলাইছইন অখন কথা তো কইতাম পারি। কিন্তু তোমার মনের মাঝে কিতা আছে ওখান আগে কওচাইন গো সোনা?
ঝর্ণা মুচকি হেসে বলে- সব কথা বুঝি কওন লাগে? না কইলে কি বোঝা যায় না? আমার লগে দেখা হইবার পর থাকি ই বাড়িত কেনে তোমার ঘনঘন আসাযাওয়া ইকথা দুলাভাইরা বোঝইন আর আমি বুঝি না মনো করছো?
আহমদ কবীরের মুখেও হাসির রোদ ঝিলিক দেয়। আমি কোন সময় কইলাম গো সোনা যে তুমি বোঝো না? তুমি যে বোঝো ইকথা বুঝি দেইখ্যাই তো আমি ইবাড়িত ঘনঘন আই। তবে সত্যি কথা কই- ঘনঘন যে আই, তার লাগি কোনু বিয়া বা সংসার করন লাগব এমন কোনো কথা একদিনো ভাবছি নায়। ইটা সত্য কথা।
হুম।
এরপর খানিকটা সময় চুপচাপ কেটে যায়। কবীর আহমেদের কথার জবাবে কিছু বলার জন্য উসখুস করলেও ঠিকঠাক কথাগুলো যদি বলা না যায় সেজন্য কথাগুলো মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে রিহার্সাল দেয় ঝর্ণা- কবীর ভাই, এও সত্য যে তুমি আইলে, তোমার লগে কথা কইলে আর তোমারে যত্ন কইরা কিছু খাওয়াইলে আমার ভালা লাগে কিন্তু এর লাগি জীবনে আরকবার বিয়া বা সংসারের কথা আমিও কুনুদিন ভাবছি নায়। যেদিন প্রথম ই বাড়িত তোমার লগে দেখা অইছিল আর তোমার একলা থাকনের কথা জানছিলাম ঐদিনই তোমার লাগি মায়া লাগছিল। খালি মনে অইছিল, আহারে! বেচারারে একজড়া যত্ন করার কেউ নাই! একজড়া মায়া করার কেউ নাই! যখন স্কুলো যাইতাম তখন থাকিই তো আমরা একজন আরেকজনরে চিনি, নাকি কও! আমরার লগের রওশন আরা আর সালাম ভাই যে প্রেম করছিলা মনো আছে নি? আমরা কিন্তু এমন কথা ভাবছিও না কুনোদিন! আমরার বাড়িত তুমি দুই একবার গেছো, স্কুলের সহপাঠী হিসাবে যেরকম সম্পর্ক থাকে এর বাইরে কি আমরা কিছু ভাবছিলাম কও? না তো? এর লাগিই তো যার যার জীবন যার যার পথে আগাই গেছিল। যদিও আগাইয়া আর গেল কই? মাঝপথেই থামি গেল।
মনে মনে কথার রিহার্সেল দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ঝর্ণা। তারপর হেসে বলে, একটা সত্যি কথা কই কবীর ভাই, আমরার স্কুলের পড়া শেষ হই গেলে একবার যে তুমি আমরার বাড়িত গেছলায় এরপরে আর তোমার কথা আমার মনেও আছিল না। সম্ভবত তোমারও না। কিন্তু আমরার জীবনের বাঁক ঘুরিফিরি কেমনে একজাগাত মিলি গেল কও! অখন সবকথার শেষ কথা অইল রফাত ভাই ও বুবুর প্রস্তাবে যুদি তোমার কুনো আপত্তি না থাকে, তো আমারও নাই।
তুমি কি আমারে খালি দয়া কইরা সিদ্ধান্তটা নিতাছো ঝর্ণা?
ই কী কথা তুমি কও কবীর ভাই? দয়ার কথা আইতাছে কেনে? আমি তো মায়ার কথা কইলাম! দয়া আর মায়া কুনো এককথা না।
ঝর্ণার কথা শুনে কবীর আহমদ নিঃশব্দে হাসে। ঠিক আছে বুঝলাম দয়া আর মায়া এক না। মায়া অইল মমতা স্নেহ। যে স্নেহর লগে ভালোবাসাও থাকে! কি, ঠিক কইলাম তো?
ঠিক। আর একটা কথা কই, জীবন দিয়া বুঝছি, মানুষ- তারা নারীপুরুষ যেই হউক একটু মায়ামমতা না থাকলে বাঁচত পারে না।
আমরা কি অতদিন ধরি বাঁচিয়া আছি না?
ই বাঁচারে বাঁচা কয় না গো কবীর ভাই।
তেঅইলে আর যেকয়দিন বাঁচমু আমিও বাঁচার মতো বাঁচতাম চাই গো ঝর্ণা। তোমার বুবু দুলাভাই তোমারে অনেক মায়া দেইন। কিন্তু আমারে সত্যি মায়া করার কেউ নাই। তোমার কাছে আইলে এট্টু মায়ার আশ্রয় পাই; এল্যাগিই তো লাজ লজ্জার মাথা খাইয়া ইখানও বারবার আই। রফাত ভাই আমার বন্ধু। এল্যাগি তাইনও কিছু মনে না করি আমরারে মিলাইয়া দিতা চাইছইন! ঝর্ণা! আমিও না করতাম না।
পরস্পরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে তাদের দুজনের সিদ্ধান্ত এক হলেও তারা আরও একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা দুজনেই মনে করে ছেলেমেয়েরা যত দূরেই থাকুক, এদের থেকে বেশি প্রিয় ও আপনজন আর তাদের কেউ নাই! তারা মনে করে জীবনের এই পর্যায়ে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি ছেলেমেয়েদেরকে জানানো দরকার।
আহমদ কবীরের ছেলে মেয়ে দুজন শুনে খুবই খুশি হয়। অন্য জন হ্যাঁ না কিছুই বলেনি। ফোনে মেয়ে সায়মার কণ্ঠের উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ছিল। আব্বা! তোমার পক্ষে যখন আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া এসে থাকা সম্ভব না আবার আমাদের পক্ষেও দেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব না তখন এটাই বরং ভালো হলো। তোমার সারাটাজীবন তো তুমি আমাদের জন্য খরচ করেই দিয়েছো আব্বা! সংসারের সুখ কী তুমি বুঝতেই পারোনি। এখন যতটুকু বাকি আছে যদি কারো সাথে সুখে থাকো, একটু আনন্দ নিয়ে বাঁচো তাতেই আমাদের আনন্দ আব্বা!
খুশি হয়েছিল ঝর্ণার মেয়েরাও। মা একা একা দেশে থাকে। মায়ের জন্য বড় চিন্তা ছিল। তবু বিদেশে সন্তানসহ বরের সঙ্গসুখ ত্যাগ করে মাকে সঙ্গ দেয়ার সাধ্য তাদের ছিল না। লোকে যা বলে বলুক, এই বয়সে মায়ের জীবনে যদি একজন সঙ্গী জোটে আর তাতে মা ভালো থাকে তাহলে তারা বিদেশে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। কিন্তু তারা তাদের মাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারে না। তিনজনের বরই খুব নাখোশ হয়। শাশুড়ির এই বয়সে ভীমরতি ধরেছে শুনলে দেশে তাদের পরিবারের নাকি মান সম্মান থাকে না।
এসব জেনে ঝর্ণার মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-লজ্জা সব একসাথে হুড়মুড়িয়ে ঢোকে। তার খালি মনে হয় নিজের একটু সুখের জন্য মেয়েদের সংসার ভেঙে যাবে? না ইটা ঠিক না গো বুবু। তুমি কবীর ভাইরে জানাইয়া দেও।
ই কী কথা কইতাছস ঝর্ণা? মেয়েরার সংসার ভাঙার কথা আইতাছে কেনে? দ্বিতীয় বিয়া কোনো অপরাধনি? না আমারার ধর্মত নিষেধ আছে?
না গো বুবু তার আগে ধরণী দুই ভাগ অউক। আমি গিয়া তানর ভিতরে লুকাই।
বাহ্ ঝর্ণা! বাহ্! খালি নিজের কথাই ভাবছস? কবীর ভাই এর মনের কী অইব একবার ভাবছস নি?
কবীর ভাই এর লাগি আমার খুব কষ্ট লাগতাছে বুবু। তাও আমি অপারগ।
না তোমার অপারগ অইবার সুযোগ নাই। তোমার তান ফুড়ির জামাইর আত্মীয় স্বজন কে কী কইবা ইতা আমরার দেখার সময় নাই। কাইল সইন্ধ্যা সময় কাজী আইবা। কবীর ভাইর দুই চাইরজন আত্মীয় বন্ধু থাকবা।
কেনে তান ভাই ভাতিজা থাকতা না?
না। তারাও সব জাইন্যা শুইন্যা বেজার। কবীর ভাই বিয়া করলে তারার লুইট্যা ফু্ইট্যা খাইতে যুদি অসুবিধা হয় ঔ অইল চিন্তা। আমি কই কি যার যার অসুবিধা লইয়া যে বা যারা থাকে থাউক। যার যার জীবন তার তার। যে কেউরই অধিকার আছে তার একদিনের জীবন অইলেও নিজের মতো কাটাইবার। ঝর্ণা তুমি নতুন কইরা কিছু ভাবতে যাইও না বইন। জানো তো, আমি তোমার দুলাভাই খালি না, বড় ভাইও। ইটা আমার আদেশ মনে করলে আদেশ অনুরোধ মনে করলে অনুরোধ। ফালাইবার ক্ষমতা তোমার নাই। দুলাভাইয়ের এমন কথার পরে ঝর্ণার আর কিছু বলার থাকে না। তার বিপদের দিনে যারা নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়িয়ে, ছায়া দিয়ে, মায়া দিয়ে আগলে রেখেছে তাদের কথার বিরূদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা নেই তার।
ধানতলিয়া গ্রামের মতো আলাকপুর গ্রামের পাশ দিয়াও একটা নদী বয়ে গেছে। তবে সেটা ধানতলিয়ার নদীর মতো খরস্রোতা নয়। শুকনা মৌসুমে রবি ঠাকুরের ছোট নদীর মতোই তার বুকে হাঁটুজল না হলেও কোমরজল থাকে। ছোট ছেলেমেয়েরা তাতে পেলুন জাল ঠেলে মাছ ধরে। মাছ বলতে তেমন কিছু এখন আর নেই। বর্ষার সময় নদীটি দুকুল ছাপিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠে। এবারে শরতের মাঝামাঝি সময়েও নদী ভরা জল। আহমদ কবীর ও রফাত মিয়া মিলে সেই নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করেছে। আলাকপুরসহ আশেপাশের গ্রাম থেকে অনেকগুলো নৌকা বাইচের দল এসেছে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে। নদীর পাড়ের প্রায় সব বাড়ির পেছনেই দর্শকরা জটলা করে আছে। সিফাতের বন্ধুরা মিলে তাদের বাড়ির পেছনের জায়গাটা পরিষ্কার করে চেয়ার পেতে নৌকাবাইচ দেখার ব্যবস্থা করেছে। রফাত মিয়া নিজের স্ত্রীসহ আহমদ কবীর ও ঝর্ণাকে নিয়ে বসেছে নৌকা বাইচ দেখতে। পশ্চিমের নির্মেঘ আকাশ থেকে শেষ বিকলের রোদ ঠিকরে পড়ে ঝিকমিক করছে নদীর জল আর সেই জলের বুক চিরে বাইচের নৌকাগুলো সুতীব্র গতিতে ছুটে চলেছে। এক একটা নৌকায় বিশ ত্রিশ চল্লিশ জন দাঁড়ি গানের তালে তালে দাঁড় টানছে। তারা গাইছে সেই বিখ্যাত সারিগান-ঝিলমিল করে রে ময়ূর পঙ্খী নায়। তীব্রবেগে ধাবমান নৌকাগুলোর দিকে চেয়ে চেয়ে আহমদ কবীর ঝর্ণার কাঁধে একটা মৃদু ঠেলা দেয়। ঝর্ণা নদীর বুকে চলমান নৌকা থেকে চোখ না ফিরিয়ে বলে, কিতা অইল?
কিচ্ছু অইছে না। ভাবছি।
কি ভাবছো?
ভাবছি মানুষের জীবনটাও সারি নৌকার মতেই দৌড়াইয়া যায়। দেখো না কেমনে আমরার জোড়া বান্ধনের এক বছর পার অই গেল!
হুম! ঠিকঅই কইছ। তবে জীবনটা খালি সারি নৌকার মতোও না। নদীর মতোও। আইজ দুইকুল উপচাইয়া পড়তাছে কাইল দেখবায় শুকনা খটখটা। ঐ যে পড়ছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা– আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। ওখন ভরা তারপর হাঁটুজল। আর দেখো না নদীর গায়ে কত বাঁক যেমন আমরার জীবনেরও বাঁকের অভাব নাই!
আহমদ কবীর চুপ করে ঝর্ণার কথা শোনে। শুনতে শুনতে ভাবে যত দিন জল আছে ততদিনই নদীর সব খেলাধুলা। তার জলে হাঁসের পাল সাতার কাটে, কচুরিপানা ভাসে, আর তার বাঁকে বাঁকে নৌকা চলে। যেমন জল না থাকলে মানুষের জীবনের দৌড়ের নৌকাও চড়ায় আটকে যায়! তাই তো যতটা পারি জীবনের এই দৌড়ের নৌকা আমরা দৌড়াইয়া যাইমুগো ঝর্ণা! জানোই তো আমরার জীবনের বেলাও চড়াই পাখির চেয়ে খুব বেশি বড় নায়। ঝিলমিল ঝিলমিল ময়ূরপঙ্খী নাও আমরারে যেকোনোদিন মরণের পথে নিয়া যাইব। তবু কই জীবন সুন্দর। সুন্দর এই নৌকা বাইচের খেলা!

One Comment
[…] স্বাতী চৌধুরী – চড়ুই জীবন […]