অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
ডিসেম্বর ৭, ২০২৩
২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
ডিসেম্বর ৭, ২০২৩
২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

অনুবাদ : লুনা রাহনুমা -
উত্তরসূরি
মূল গল্প : জেন জুলিয়ান

মেয়েটার কথাটি অন্যভাবে বলা উচিত। এই যেমন বলা যায়, “আমার একটি বাচ্চা আছে।” এভাবে বললে অন্যদের কাছে মনে হতে পারে বাচ্চাটি সে নিজে বানিয়েছে। যেন মেয়েটা কোন কারখানার এসেম্বলী লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বানিয়ে এনেছে বাচ্চাটিকে। বরং এটা বলা বেশি মানানসই হয় যে, একটা পরিস্থিতিতে পড়ে বাচ্চাটিকে সে নিজের কোলে পেয়ে গিয়েছে। তাই আপনার একটি ছোট্ট বাচ্চা আছে মানে হলো বাচ্চাটি আপনা আপনি চলে এসেছে আপনার কাছে, ঠিক যেভাবে আপনার ঠান্ডা লাগে, মাসিকের সময় আপনার পেটে ব্যথা হয়, শীত লাগে, এপসম লবনমাখা গরম পানিতে গোসল করেন, একটা ভেজা নরম কাপড় দিয়ে নিজের মুখটি ঢেকে রাখেন, তেমন একটি ঘটনার ফল।

মেয়েটির নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে। আরাম করে শুয়ে বসে থাকা চমৎকার একটি শৈশবকাল ছিল। কিন্তু সেই সময়, তাদের পরিবারে ঘটেছিল একটি অপ্রত্যাশিত মৃত্যু। তারপর বাবার বন্ধুর ছেলের সাথে মেয়েটির ডিনারে যাওয়া আর সারারাত উগ্র পারফিউমের গন্ধে অনভ্যস্ত কোমল নাকে জ্বলুনি হওয়া। অল্প দিনের পরিচয়ে ছেলেটি ও মেয়েটির ভেতর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হওয়া, শারীরিক ও মানসিক পরিতৃপ্তি পাওয়া এবং দুজনে কিছুক্ষণ স্বর্গীয় সময় কাটানো। কিন্তু তার কিছুদিন পর, মেয়েটির শরীরে এক গূঢ় রহস্যের সংকেত আবিষ্কৃত হওয়া। সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা মেয়েটি একবার গর্ভপাতের চিন্তা করেছিল, আবার পরমুহূর্তেই দ্বিতীয় পরিণতির কথা ভাবে। না দেখা সন্তানের জন্য মমত্ববোধ তাকে দ্বিধান্বিত করে। বুক ঠেলে বেরিয়ে আসে একটি গোঙানির মতো কান্না। আবার, এক ভয়ঙ্কর ক্রোধ। তারপর, একটি বিচ্ছেদ।

বাচ্চা থাকা বলতে মেয়েটি বুঝত তার শরীরের ভেতর কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল, একটি নতুন প্রাণের অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল, কিন্তু তাকে ধরে রাখা হয়নি, এমন কিছু ঘটনা। অবশ্য একটি প্রাণকে ঠিক সেভাবে ধরে রাখা না যেভাবে মানুষ জিজ্ঞেস করে, আপনার গাড়ির ইন্সুরেন্স আছে? কিংবা আপনার কি পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার আছে? কিংবা আপনার কি কিছু সিক্রেট আছে?

কিছু বাচ্চা মায়ের শরীরে উৎপন্ন হয়, এবং তারা থেকে যায়। মানুষ যখন প্রশ্ন করে, আপনার কি বাচ্চা আছে, তখন আসলে তারা জানতে চায় আপনি শরীরের ভেতর কোনো বাচ্চাকে লালন করেছেন কিনা।

মেয়েরা যখন কোনো পুরুষের সাথে ডেটিংয়ে যায়, পুরুষরা মেয়েদেকে প্রশ্নটি বহুবচনে করে থাকে- “তোমার বাচ্চা-কাচ্চা আছে?” —যেন তারা ধরে নেন যে আপনার বাচ্চা আছে এবং আপনার কমপক্ষে দুইটি বাচ্চা আছে। অথবা এর কারণ এমন হতে পরে যে প্রশ্নকর্তারা তাদের কথার একক বিকল্প অর্থের কদর্যতা এড়াতেই প্রশ্নটি এভাবে করে থাকে— “আপনার কি একটি বাচ্চা?” এই ব্যক্তিদের কথা থেকে মনে হতে পারে যে, একটার বেশি বাচ্চা হওয়া এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখা খুব অপ্রয়োজনীয় অনুচিত কাজ। তারা ভাবে না, তাদের এই অনুমানগুলি অন্যদের অনুভূতিতে কীভাবে আঘাত করতে পারে।

এই লোকটি, মেয়েটির বর্তমান প্রেমিক, সুচতুরভাবে দুটি প্রশ্নকে একত্রে একটি করে মেয়েটির অতীতের কথা জানার চেষ্টা করছে। নিজের একটি হাত নাটকীয়ভাবে বেঁকিয়ে প্রেমিক ছেলেটি প্রশ্ন করে, “তোমার কোনো উত্তরসূরি আছে কি?”

প্রশ্নটি শুনে মেয়েটির মনে হয় যে তার বর্তমান প্রেমিক পুরুষটি আসলে স্বপ্নের জগতে বাস করা একজন মানুষ। যদিও তৃতীয় যে কেউই বলবে, ছেলেটির এই কৌতুকপূর্ণ আচরণ অনেক আগে থেকে শিখে রাখা। কিন্তু প্রেমিকের এই প্রশ্ন মেয়েটির মনে প্রেমিকের উপর রাগ বা বিরক্তির উদ্রেক করল না। বরং, কথা বলার সময় নতুন প্রেমিকের নির্ভয় শব্দচয়ন মেয়েটিকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলল। মেয়েটি হেসে বলে, তুমি মনে হয় জানতে চাইছ আমার সন্তান আছে কিনা? আমি ডিম ফুটিয়েছি কিনা? আমরা তো আসলে এক প্রজাতির প্রাণী। আমরা স্যামন মাছ।

এক প্রজাতির মাছ আছে যারা ক্লোনিং করে বংশবৃদ্ধি করে। এই লোকটাকে জ্ঞানী বলে মনে হচ্ছে। তাই এই লোকটি সম্ভবত মেয়েটিকে জানাতে পারবে সেই মাছের নাম। লোকটি হয়তো মেয়েটির এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে আগ্রহী হবেন, কারণ তিনি নিজে যে প্রশ্নটি করেছেন তার একটা স্পষ্ট উত্তর জানা প্রয়োজন। ততক্ষণে মেয়েটির চঞ্চল মনের প্রেমজোয়ার অন্যপথে বইতে শুরু করেছে। যখন, মেয়েটির মুখ এক মুহূর্তের মধ্যে পদ্মপাতার মত শুকিয়ে গিয়েছে। মনের ভেতর মেয়েটা সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছে। তার বুকের ভেতরটা কেবল নিষ্ফল অর্থহীন মনে হতে থাকে।

এই প্রেমিক লোকটি এখন, আরো কিছুক্ষণ নিজের হাতের মধ্যে মেয়েটির হাতটিকে আটকে রাখতে পারে। মেয়েটির নরম হাতটি নিয়ে খেলতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না মেয়েটি সেই কথাটি বলে দিচ্ছে শব্দ করে।

“আমার একটা বাচ্চা…. ছিল, আমি রাখিনি। ছিল, আমি রাখিনি। ছিল, রাখিনি।”

জেন জুলিয়ান : জেন জুলিয়ানের প্রথম গল্প সংকলন, অর্থলি ডিলাইটস এন্ড আদার এপোক্যালিপসেস, ২০১৮ সালে প্রেস ৫৩’র ফিকশন প্রাইজ জিতেছে। তার সাম্প্রতিক কল্পকাহিনীগুলো বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশ হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। লেখিকা ও তার তুলতুলে বিড়াল বর্তমানে জর্জিয়াতে থাকেন, যেখানে তিনি ইয়ং হ্যারিস কলেজে ইংরেজি পড়ান।

 

+ posts

লুনা রাহনুমা

দেশের জাতীয় দৈনিক, বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা, মুদ্রিত লিটল ম্যাগাজিন ও ওয়েবজিনে নিয়মিত লিখছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ "ভালোবেসে এঁকে দিলাম অবহেলার মানচিত্র"(১৯৯৯) এবং "ফুঁ"(২০০০), বিশাকা প্রকাশনী।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "নারীবৃক্ষ" (ডিসেম্বর, ২০২১), অনুজ প্রকাশনী।
প্রকাশিত অনুবাদ গল্পগ্রন্থ "দিগন্তের দিকে হেঁটে যাওয়া মেয়েটি," (একুশে বইমেলা, ২০২২), অনুপ্রাণন প্রকাশন।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সুইন্ডনে বসবাস করছেন।

Read Previous

অগ্নিবাসর

Read Next

নুশান : দ্য স্পেশাল চাইল্ড – প্রথম পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *